(পয়ত্রিশ)

দুপুরের রৌদ্রে ঘামিয়া শ্রান্ত-ক্লান্ত হইয়া বছির আরজান ফকিরের বাড়ি আসিয়া পৌঁছিল। ফকির ভিক্ষা করিতে গাওয়ালে গিয়াছে। ফকিরনী তাহাকে দেখিতে পাইয়া জড়াইয়া ধরিল, “আরে আমার গোপাল আইছে। আমি পথের দিগে চায়া থাহি। এই পথদ্যা নি আমার। গোপাল আসে।” ফকিরনী বছিরকে ধরিয়া লইয়া ঘরের মেঝেয় একটি খেজুরের পাটি। বিছাইয়া বসিতে দিল। তারপর একখানা পাখা লইয়া বাতাস করিতে করিতে লাবণ্যভরা তাহার শ্যামল মুখোনির দিকে চাহিয়া রহিল। আহা! এই ছেলে যদি তাহাকে মা বলিয়া ডাক দিত! কিন্তু ফকিরনীর কি আছে যে এই আসমানের ফেরেস্তা-শিশুকে সে স্নেহের বন্ধনে বাঁধিবে? ঘরে ভাল খাবার নাই যে তাহার হাতে দিবে? সমস্ত বুকভরা তার বাৎসল্য-স্নেহের শূন্যতার হাহাকার। এখানে এই দেব-শিশু কি কাজল মেঘের বারিধারা বহিয়া আনিবে?

খানিক বাতাস করিয়া ফকিরনী ঘরের মুড়ির কোলা হাতাইতে লাগিল। শূন্য কোলায় ফকিরনীর হাতের রূপা-দস্তার বয়লার লাগিয়া টন টন করিয়া শব্দ হইতে লাগিল। সেই শব্দ তাহার মাতৃ-হৃদয়কে যেন ভাঙ্গিয়া চুরিয়া দিল। ফকিরনী বলিল, “বাজান! তুমি একটু বইসা জিড়াও। আমি এহনই আত্যাছি।” সামনে আরসাদের বাড়ি। আরসাদের বউকে যাইয়া বলিল, “বউ! ভাত আছে নি?”

বউ বলিল, “ভাত ত আছে চাচী, কিন্তুক খাইবার ছালুন নাই। আমাগো বাড়ির উনি গ্যাছে মাছ মারতি। ভাত রাইন্দা বইসা আছি। দেহি মাছ যদি মাইরা আনে তয় ছালুন। রানব। না হৈলে কাঁচা মরিচ আর নুন দিয়া আইজ বাত খাইতি অবি। তা বাতের কথা জিজ্ঞাসা করলা ক্যান চাচী?”

ফকিরনী বলে, “আমার এক ছোট বাজান আইছে শহর থইনে। গরে একটাও চাইল নাই। বাজানের কি খাইতে দিব? তয় দেলো বউ! এই ক্যালা পাতাড়ার উপর চারডা বাত দে। বাজানের সামনে দরবানি।”

বউ কলাপাতার উপর সামান্য কিছু ভাত দিল। বেশী দিতে পারিল না। তাহাদের ত দুইজনের মাপা ভাত। সেই ভাত লইয়া ফকিরনী আর এক বাড়ি হইতে একটু শাক আর ডাল লইয়া আঁচল আড়াল করিয়া তার ছোট রান্নাঘরে ঢুকিল। তারপর মাটির সানকিতে সেই ভাত বাড়িয়া বছিরের সামনে আনিয়া ধরিল।

বছির হাত মুখ ধুইয়া খাইতে বসিল। ফকিরনী তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

“বাজান! এবার আর তোমারে যাইবার দিব না। আমার চক্ষের কাজল কোঠার ঘরে। তোমারে বন্দী কইরা রাখপ।”

খাইতে খাইতে বছির বলিল, “ফকির মা! আমার মতন জনম দুঃখী আর কেউ নাই। আমি তোমাগো বাড়ি আশ্রয় নিবার আইছি।”

বছিরের মুখে ফকির-মা ডাক শুনিয়া ফকিরনীর বুক যেন জুড়াইয়া গেল। তার বুকের মাতৃস্নেহের সারিন্দাখানি সহস্র তারে বাজিতে লাগিল।

“বাজান! তুমি যদি দয়া কইরা আমাগো এহানে থাহ তয় যে আমি আসমানের চান আতে পাই। আমি নগরে ভিক্ষা মাইঙ্গা তুমারে খাওয়াব।”

বিকালে ফকির ভিক্ষা হইতে আসিয়া বছিরকে দেখিয়া বড়ই খুশী হইল। বিশেষ করিয়া বছির যে চিরস্থায়ী ভাবে তাহার বাড়িতে থাকিতে আসিয়াছে ইহাতে যেন সে হাতে স্বর্গ পাইল। নিজের সমস্ত ঘটনা বলিতে বলিতে বছির কাঁদিয়া ফেলিল।

গামছা দিয়া তাহার মুখ মুছাইতে মুছাইতে ফকির বলিল, “বাজান! আমার সানালের আস্তানায় যখন আইছ, দুঃখ কইর না। দুঃখের অবহেলা করার শিক্ষাই আমার ফকির আমারে দিছে। একদিন আমিও তোমার মত দুঃখ পায়া চোখের পানিতে বুক ভাসাইতাম। সেই দুস্কৃ ভুলবার জন্যি সারিন্দা বাজান ধরলাম। একদিন সেই সারিন্দার সুরির উপর সানাল চান আইসা সোয়ার ঐল। তিনি আমার সগল দুষ্ণু লয়া গ্যালেন।” এই বলিয়া ফকির গান ধরিল–

“তুমি যে হালে যে ভাবে
রাখছরে দয়াল চান তুই আমারে?
ও আমি তাইতে খুশী আছিরে।
কারে দিছাও দালান কোঠা,
আরে দয়াল আমার গাছের তলারে।”

গান শেষ হইলে বছির ফকিরকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা ফকির বাবা! কও ত? তোমার এই সানাল চান কেডা?”

ফকির হাসিয়া বলিল, “বাজানরে! সে যে কেডা তা আমিও জানতি পারি না। হুনছি নুরুল্লাপুরে এক সানালের বাড়ি ছিল। তা তানার খোঁজ আমি করি না। আমি খুঁজি আমার মনের সানালরে। যে সানাল দুঃখী মানষির দুক্ষু হরণ কইরা লইয়া যায়। যার কেউ নাই। তার সঙ্গে যায়া বসত করে। আমার সানাল চান বাণিজ্যে যায়, জলের কৃম্ভীর বইঠা বায়। দুঃখী তাপিত ব্যথিত-জনের অন্তরে অন্তরে তার আসা যাওয়া। আমার গুরু, তার গুরু, তার গুরু, সয়াল সংসারের যত মানুষ আল্লার আলম ভইরা গানের বাজনায় সুখি-দুঃখী যে দরদের দরদীরে মনে মনে চিন্তা করছে, আমার দয়াল চান সেইজন। তারে মনের চক্ষি দেখা যায়। বাইরের চোহে সে ধরা দ্যায় না। এই বলিয়া ফকির আবার গান ধরিল–

“মন চল যাইরে,
আমার দরদীর তালাশেরে;
মন চল যাইরে।
হাল বাও হালুয়া ভাইরে হস্তে সোনার নড়ি,
এই পথদ্যানি যাইতে দেখছাওরে আমার
সানাল চান বেপারী।
জাল বাও জালুয়া ভাইরে হস্তে সোনার রশি,
এই পথদ্যানি যাইতে দেখছাওরে আমার
সানাল চান সন্ন্যাসী।
দেইখাছি দেইখাছিরে আমরা সানাল চান সন্ন্যাসী,
ও তার হাতে আসা বগলে কোরান করে মোহন বাঁশী।
হাইটা হাইটা যায়রে সানাল দীঘল পন্থরে বায়া,
আমার মনে বলে তারে আমি কোলে লই যায়।”

“বাজানরে! এই আমার সানাল চান। যারে দেইখ্যা আমার ভাল লাগে সে-ই আমার সানাল চান। এই যে তুমি আইছ আমার ঘরে তোমারে দেইখা আমার বুকির মায়া উতলায়া। উঠছে। আইজ তুমিই আমার সানাল চান।” ফকিরের কথাগুলি যেন ফকিরনী সারা অন্তর দিয়া অনুভব করিতেছিল। এ যেন তারি মনের কথা ফকিরের মুখে প্রকাশ পাইল। কিন্তু এত সব তত্ত্ব-কথা বছির বুঝিতে পারে না। কেমন যেন লজ্জায় তার শ্যামল, মুখোনি রাঙা হইয়া ওঠে।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x