(দুই)

সত্য সত্যই আজাহেরের বিবাহ স্থির হইয়া গেল। বউঘাটা ছাড়িয়া গাছবাইড়ার চক। তাহারই দক্ষিণে ভাটপাড়া গ্রামে আলিমদ্দীর মেয়ের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইবে। গ্রামের মোড়ল তিনকুড়ি টাকাতেই বিবাহের খরচ সারিয়া দিবে। কিন্তু তিনকুড়ি টাকাতেই বিবাহের সমস্ত খরচ কুলাইয়া উঠিল না। আলিপুর গ্রামের শরৎ সাহার বাড়ি হইতে আজাহেরকে আরো পনর টাকা কর্জ করিতে হইল। টাকা প্রতি মাসে মাত্র এক আনা করিয়া সুদ দিতে হইবে। তা হোক; শরীর যদি ভালো থাকে আজাহের পৈড়াত বেচিয়া দুই মাসের মধ্যেই। দেনাটা শোধ করিয়া দিবে।

গরীবের বিবাহ–তবু গরীবানা মতে তাহারই মধ্যে যতটা আনন্দ করা যায় কেউ সে। বিষয়ে কম করিল না। মেনাজদ্দী মাতব্বরের উৎসাহই এ বিষয়ে সকলের চাইতে বেশী। সে ফরিদপুরের খলিফাপট্টী হইতে তাহার জন্য লাল ফোঁটা দেওয়া একটি পিরান (জামা)। কিনিয়া আনিল। নিজের যে চাদরখানা একদিন তেলে ও ঘামে সিক্ত হইয়া নানা দরবারের সাক্ষ্য হইয়া তাহার কাঁধের উপর ঘুরিয়া বিরাজ করিত, তাহা সে আজ বেশ সুন্দর করিয়া পাকাইয়া পাগড়ীর মত করিয়া আজাহেরের মাথায় পরাইয়া দিল। একজোড়া বার্নিশ জুতাও। মোড়ল আজাহেরের জন্য সংগ্রহ করিল। এ সব পরিয়া নতুন “নওশা” সাজিয়া আজাহের বিবাহ করিতে রওয়ানা হইল। তখন তাহার ইচ্ছা হইল এই নতুন পোশাকে সে একবার। সমস্ত গ্রামখানি ঘুরিয়া আসে। গাঁয়ের লোকদের সে অবাক করিয়া দিয়া আসে। সবার। বাড়িতে যে এতদিন পৈড়াত বেচিয়া আসিয়াছে, সে অতটা তুচ্ছ নয়। কিন্তু তখন রাত অনেকটা হইয়াছে। তাড়াতাড়ি যাইতে হইবে। বউঘাটা ছাড়াইয়া গাছবাইড়ার মাঠ পারাইয়া। যাইতে হইবে, সে ত সোজা কথা নয়।

অন্ধকারের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া পাঁচ ছয়জন গাঁয়ের লোক বর লইয়া রওয়ানা হইল। যেমন ভাবে গাঁয়ের আরো দশজন বিবাহে রওয়ানা হয় আজাহেরের বিবাহে তেমন জাঁকজমক কিছুই ছিল না। গাঁয়ের বর্ধিষ্ণু পরিবারের ছেলেরা নতুন নওশার সাজ পরিয়া পাল্কিতে অথবা ঘোড়ায় চড়িয়া কনের বাড়িতে যায়। মশালচি আগে আগে মশাল জ্বালাইয়া পথ রোশনাই করে। গ্রামের মালাকর বরের জন্য শোলা দিয়া সুন্দর কারুকার্য খচিত একটি ছাতা তৈয়ার করিয়া দেয়। সেই ছাতা বরের মাথায় মেলিলে সুন্দর সুন্দর শোলার পাখি, নৌকা, ভ্রমর, প্রজাপতিগুলি বাতাসে দুলিতে থাকে। আজাহেরের বিবাহে এত সব : বন্দোবস্ত কিছুই হয় নাই। তবু আজাহেরের মন আজ খুশীতে যেন আসমানে উড়িয়া। বেড়াইতে চাহে। নিজের মনের খুশী দিয়াই সে তার বিবাহের সকল দৈন্য ভরাইয়া লইবে।

নওশার দল রওয়ানা হইল। নিস্তদ্ধ গ্রাম্য-পথ। দু’ধারে ঝি ঝি পোকা ডাকিতেছে। গ্রামের কুকুরগুলি ঘেউঘেউ করিয়া তাহাদের অভ্যর্থনা জানাইতেছে। দূরের বন হইতে শিয়ালগুলি ডাকিয়া উঠিতেছে। নওশার দল ধীরে ধীরে চলিয়া যায়। গ্রামের পর গ্রাম ছাড়াইয়া যায়।

বউঘাটা পার হইয়া তাহারা গাছবাইড়ার মাঠে আসিয়া পড়িল। সদ্য কেনা বার্নিশ জুতাজোড়া পায়ে লাগাইয়া চলিতে আজাহেরের পা ছুলিয়া যাইতেছিল। তবু সে জুতাজোড়া খুলিল না। এমনি নওশার সাজে, এমনই জুতা-জামা পরিয়া সে তাহার কনের বাড়িতে যাইয়া উপস্থিত হইবে। তাহার সমস্ত অন্তর ভরিয়া খুশীর ঋঝর যেন আজ বাজিয়া ঝুম ঝুম করিয়া আকাশে বাতাসে ছড়াইয়া পড়িতেছে।

যাইতে যাইতে তাহারা কনের বাড়ির কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন বরযাত্রীর দল সকলে একস্থানে দাঁড়াইল। সবাই ভালমত করিয়া কাপড়-চোপড় পরিতে লাগিল। দশ বার বৎসর আগে মোড়ল সেই কবে এক জোড়া জুতা কিনিয়া রাখিয়াছিল–সে কথা আজ। ভাল করিয়া মনেও পড়ে না,–কিন্তু জুতাজোড়ার রঙ সেই প্রথম কেনার দিনের মত। আজো চকচক করিতেছে। এতদিনে রৌদ্রে জুতাজোড়া খড়ির মত শুখাইয়া কোচকাইয়া গিয়াছে। এমনই কোন বিশেষ দিনে কিংবা কোন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাইতে মোড়ল অল্প কয়েক মিনিটের জন্য সেই জুতাজোড়া পরিধান করিয়া থাকে। অর্থাৎ আত্মীয় বাড়ির। কাছে যাইয়া জুতাজোড়া পায়ে দেয় এবং সে বাড়িতে পৌঁছা মাত্রই জুতাজোড়া পা হইতে খুলিয়া ঘরের চালের সঙ্গে লটকাইয়া রাখে। ফেরার পথে জুতাজোড়া হাতে করিয়াই ফেরে। আজো মোড়ল জুতাজোড়া হাতে করিয়াই আনিয়াছিল। এখন বিবাহ-বাড়ির নিকটে আসিয়া জুতাজোড়া কাঁধের গামছা দিয়া মুছিয়া তাহার মধ্যে অবাধ্য পা দুটি ঢুকাইয়া দিল। এই কার্যটি করিতে বলিষ্ঠ-দেহ মোড়লকেও সেই জুতাজোড়ার সঙ্গে প্রায় পনর মিনিট যুদ্ধ করিতে হইল।

আজাহের তার রঙীন গামছাখানি অর্ধেকটা বুকপকেটে পুরিয়া দিল, বাকি অর্ধেক কাঁধের উপর ঝুলিতে লাগিল।

লোকে বলে,–”যেইনা বিয়া তার আবার চিতারি বাজনা।” কনের বাড়ির সামনের পথে গ্রামের ছেলেরা কলাগাছ পুঁতিয়া গেট বানাইয়াছে। সেই গেটের সামনে দারোয়ান হইয়া কলাপাতার টোপর মাথায় দিয়া কাঁধে গোড়ালী-লাঠি লইয়া তাহারা দাঁড়াইয়া আছে। তাহাদের দেখিয়া আজাহেরের গা কাঁপিতে লাগিল। মোড়ল কিন্তু কোনই ভয় করিল না। সে দলের আগে যাইয়া দাঁড়াইল। বরযাত্রীর দল আস্তে আস্তে বলাবলি করিল–”তোরা। কেউ কথা কবি না। যা কয় আমাগো মোড়ল কবি।”

মোড়ল এমনই করিয়া সকলের আগে যাইয়া দাঁড়াইল; দেখিয়া আজাহেরের মন মোড়লের প্রতি শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে একেবারে ভরিয়া গেল। আজীবন তার বাড়িতে বিনা। বেতনে খাঁটিলেও বুঝি ইহার শোধ হইবে না।

মোড়ল সকলের আগে যাইয়া বলিল, “বুলি, তুমরা দারোয়ানী দরছাও ক্যান?”

ছেলেরা সমস্বরে উত্তর করিল, “বিবির হুকুম আছে, কেউরে দরজার মদ্দি যাইতে দিব । তবে যদি বাদশা আমাগো কিছু বকশিশ দ্যান তয় আমরা যাইতে দিতি পারি!”

মোড়ল বলিল, “কত বকশিশ চাও?”

তারা উত্তর করিল, “দশ টাহা।”

মোড়ল উত্তর করিল, “আরে বাপুরা ছাইড়া দাও। গরীব মানুষির বিয়া, কিছু কমটম কর।”

“আচ্ছা তয় পাঁচ টাহা।”

“আরে না, অত দিবার পারবনা।”

“তবে এক টাকা দেন।”

“আরো কম কর।”

“তবে আট আনা।”

“আরে গরীব মানষির বিয়া, আরো কিছু কমাও। মোটে চাইর আনা দিমু।”

ছেলের দল তাহাতেই খুশী হইয়া দরজা ছাড়িয়া দিল। আজাহেরের কিন্তু ভাল লাগিল না। কথায় বলে,–বিবাহের দিনে সকলেই আড়াই দিনের বাদশাই করে। আজ তার বাদশাইর দিন। না হয় মোড়ল আরো চার আনা ধরিয়া দিত। জন খাঁটিয়া ত খাইতে হয়ই। না হয় আজাহের আরো একদিন বেশী খাঁটিয়া সেই ঋণ পরিশোধ করিত। ছেলেদের কাছে। এতটা গরীব সাজা মোড়লের উচিত হয় নাই।

আজাহেরের শ্বশুরের নাম আলিমদ্দী। সে বড়ই গরীব। বাড়িতে কাছারী ঘর নাই। গোয়াল ঘরখানা পরিষ্কার করিয়া গোটা কতক খেজুর পাতার পাটি বিছাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহাতেই বরযাত্রীর দলটিকে অতি আদরের সহিত আনিয়া বসান হইল। আজাহেরের বড়ই ভাল লাগিল। আজ বিবাহ বাড়ির সকলেরই দৃষ্টি তাহার দিকে। বরযাত্রীর দলের সবার চাইতে সে বেশী আদর পাইতেছে। খাইবার সময় তারই পাতে সব চাইতে ভাল ভাল জিনিসগুলি পড়িতেছে। গাঁয়ের মাত্র পাঁচজন লোক সে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছে। সবাই যদি আসিত, আজ দেখিয়া যাইত, আজাহের একেবারে কেউকেটা নয়। তাকেও লোকে খাতির করে।

বরযাত্রীদের খাওয়া দাওয়া সারা হইল। এবার বিবাহ পড়ানোর পালা। ভাটপাড়া গ্রামের বচন মোল্লাকে ডাকিয়া আনা হইয়াছে বিবাহ পড়াইতে। সাক্ষী উকিল ঠিক করিয়া বাড়ির ভিতর পাঠান হইল। উকিল যাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে কনের কাছে, “অমুক গ্রামের অমুকের ছেলে অমুক, তার সঙ্গে তোমার বিবাহ হইবে। দুইশত টাকা দেনমোহর, পঁচিশ টাকা আদায়–একশত পঁচাত্তর টাকা বাকি; এই শর্তে কবুল ত?” তিনবার এইভাবে কনেকে জিজ্ঞাসা করা হইবে। উহার উত্তরে কনে কি বলে তাহা জানিয়া দুইজন সাক্ষী বিবাহ সভায় সকলকে তাহা জানাইয়া দিবে। কিন্তু সাক্ষী উকিলেরা মজা করিবার জন্য বাড়ির মধ্যে কনের কাছে না যাইয়া বাহির হইতে একটু ঘুরিয়া বিবাহ সভায় আসিয়া বলিল, “কনে এই বিবাহে রাজি অয় নাই।”

বচন মোল্লা হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন রাজি অয় নাই।”

“কনের একটি কতা জিগাইবার আছে।”

“কি কতা জিগাইবার আছে?”

“বচ্ছরকে দুইটা পাখি আসে। তার একটা সাদা আর একটা কালা। আপনারা কালাডা খাইবেন না ধলাডা খাইবেন। কোনভা আপনাগো জন্যি আনবো?”

শুনিয়া আজাহেরের মাথা ঘুরিয়া গেল। সে গরীব মানুষ, কারো বিবাহে কোন দিন যায়। নাই–গেলে সহজেই বুঝিতে পারিত এমনই প্রশ্নের বাদ-প্রতিবাদ প্রত্যেক বিবাহেই হইয়া থাকে। আজাহের ভাবিল এইবারই বুঝি তার বিবাহ ভাঙ্গিয়া গেল। এই প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারিবে না, বিবাহও হইবে না। মোড়ল কিন্তু একটুও দমিল না। সে সামনে আগাইয়া আসিয়া একটু হাসিয়া উত্তর করিল, “মিঞারা, বুঝতি পারলাম ঠকাইবার চাও। বচ্ছরকে দুইডা পাখি আসে রোজার মাসে, কালা পাখি ঐল রাইত আর ধলা পাখি ঐল দিন। তা আমি কালা পাখিই খাইলাম। রোজার মাসে ত কালা রাত্তিরেই ভাত খাইতে হয়।”

“পারছেরে, পারছে” বলিয়া কনে পক্ষের লোকেরা হাসিয়া উঠিল। এইবার মোড়ল গায়ের চাদরখানা মাজার সঙ্গে জড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা মিঞারা! আপনাগো কতার জবাব আপনারা পাইলেন। এইবার আমি একটা কতা জিজ্ঞাস কইরা দেহি :

“মাইটা হাতুন কাঠের গাই–
বছর বছর দুয়ায়া খাই।”

কওত মিঞারা ইয়ার মানে কি?”

কনে পক্ষের সাক্ষী উকিলদের মাথা ঘুরিয়া গেল। বর পক্ষের মাতব্বর যে এমন পাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া বসিবে ইহা তাহারা ভাবিতেই পারে নাই।

তাহাদিগকে মুখ কাচুমাচু করিতে দেখিয়া বর পক্ষের লোকদের মুখে ঈষৎ বাঁকা হাসি ফুটিয়া উঠিল।

কনে পক্ষের মোড়ল বরান খ তখন উঠিয়া দাঁড়াইল চীৎকার করিয়া উঠিল –”আরে খার বিটা! পুলাপানের কাছে ওসব কথা জিজ্ঞাসা করেন ক্যান? আমার কাছে আসেন।

মাইটা হাতুন কাঠের গাই,
বছর বছর দুয়ায়া খাই।

মানে খেজুর গাছ। এক বছর পরে খাজুইর গাছ কাটা হয়। মাটির হাঁড়ী গাছের আগায় বাইন্দা রস ধরা হয়, কি মাতব্বর সাব! ওইল? সেই জন্য কইছে বছর বছর দুয়ায়া খাই। আচ্ছা এইবার আমি একটা কতা জিজ্ঞাসা করি,–

নয় মন গোদা, নয় মন গুদি,
নয় মন তার ছাওয়াল দুটি।

নদী পার অইব। কিন্তুক নৌকায় নয় মনের বেশী মাল ধরে না। কেমন কইরা পার অবি? কন ত দেহি সোনার চানরা।”

মোড়ল এবার লাফাইয়া উঠিয়া বলিল,–”তবে শোনেন, পেরতমে দুই ছাওয়াল পার হ’য়া ওপারে যাবি। এক ছাওয়াল ওপারে থাকপি, আর এক ছাওয়াল নাও বায়া এপারে আসপি। তারপর গোদা নৌকা বায়া ওপারে যাবি। গোদার যে ছাওয়াল ওপারে রইছে সে নৌকা বায়া এপারে আসপি। আইসা দুই ভাই আবার ওপারে যাবি। ওপার ত্যা এক ভাই নৌকা লয়া এপারে আসপি। এবার গোদার বউ নৌকা লয়া যাবি। ছাওয়ালডা এপারেই থাকপি। ওপার যে ছাওয়ালডা রইছে সে নৌকা নিয়া আইসা এপার ত্যা তার বাইরে লয়া যাবি। ওইল ত? আচ্ছা, আমি জিজ্ঞাসা করি আবার।”

এবার কনের বাপ আসিয়া বলিল, “রাহেন মাতব্বরসাবরা, আপনারা কেউ কারো চাইতে কম না। এ তো আমরা সগলেই জানি। এবার বিয়ার জোগাড় কইরা দেন। হগল মানুষ বইসা আছে।” এ কথায় দুই মাতব্বরই খুশী হইল।

তখন সাক্ষী, উকিল, বাড়ীর ভিতরে যেখানে নতুন শাড়ী পরিয়া পুটলীর মত জড়সড় হইয়া দুই একজন সমবয়য়ী পরিবৃতা হইয়া বিবাহের কনে বসিয়া ছিল, সেখানে যাইয়া উপস্থিত হইল। উকিল জোরে জোরে বলিতে লাগিল,

“আলীপুর গ্রামের বছিরদ্দী মিঞার ছেলে আজাহের মিঞার সঙ্গে তোমার বিবাহ হইবে। দুইশত টাকা দেনমোহর, পঁচিশ টাকা আদায়, একশত পঁচাত্তর টাকা বাকী। এই শর্তে কবুল ত?”

কনে লজ্জায় আর কোন কথাই বলিতে পারে না। একজন বর্ষিয়সী মহিলা কনের মাথায় হাত দিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “হ, কনে কবুল আছে।” এইভাবে তিনবার জিজ্ঞাসা করিয়া উত্তর লওয়া শেষ হইলে সাক্ষী উকিলেরা বিবাহ সভায় যাইয়া বলিল, “বিয়ায় বিবি রাজি আছেন।”

তখন বচন মোল্লা বিবাহ পড়াইতে বসিলেন। প্রথমে কোরান শরিফ হইতে খানিকটা পড়িয়া মোল্লা সাহেব পূর্বের মত বলিতে লাগিলেন, “ভাটপাড়া গাঁয়ের আলিমদী মিঞার কন্যা আয়েসা বিবির সঙ্গে আপনার বিবাহ হইবে। দুইশত টাকা দেনমোহর, পঁচিশ টাকা আদায়, একশত পঁচাত্তর টাকা বাকী। এই শর্তে কবুল ত?” আজাহের লজ্জায় যেন মাটিতে লুটাইয়া পড়ে তবু বলে, “কবুল”।

এইভাবে তিনবার মোল্লা তাহাকে উপরোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনবার সে বলিল, “কবুল”। মোল্লা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “বিবি যখন তখন বাপের বাড়ীতে আসতি পারবি, তারে কুনু কারণে মাইর ধইর করতি পারবা না। তারে তুমি সাধ্যমত রোজা নামাজ শিখাইবা। তার ইজ্জত-হুঁরমত রক্ষা করবা। তোমার সঙ্গে বিবির যদি কোন কারণে বনিবনাও না অয়, হে আইসা বাপের বাড়ি থাকপি। তুমি তার খোরপোষ দিবা। এই শর্তে কবুল ত?”

আজাহের বলিল, “কবুল”।

মোল্লা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি যদি বিদেশে সফরে যাও তবে রীতিমত বিবিকে খোরপোষ পাঠাইবা, সপ্তাহে একবার পত্র দিবা। যদি ছয়মাস একসঙ্গে বিবির তালাস না লও তবে ইচ্ছা করলি বিবি তোমার কাছ ঐতে তালাকনামা লইতি পারবি। এই সত্য কবুল?”

আজাহের বলিল, “কবুল”।

তখন মোল্লা কোরান শরিফ হইতে আর একটি আয়েত পড়িয়া মোনাজাত করিলেন। বিবাহের পান-শরবত আগেই আনা হইয়াছিল। বিবাহ পড়াইয়া মোল্লা আজহেরকে পান-শরবত খাওয়াইয়া দিলেন। এইভাবে রাত্রি ভোর হইয়া গেল। কাছারী ঘরে গাঁয়ের লোকেরা সারাদিন গুলজার করিয়া কেতাব পড়িতে লাগিল, কেহ গল্প-গুজব করিতে লাগিল।

বিকাল বেলা আজাহেরকে বাড়ির ভিতর লইয়া যাওয়া হইল। নতুন দুলার (বরের) সঙ্গে কনের ক্ষীর-ভোজনী হইল। প্রথমে উঠানে কনেকে আনিয়া একখানা পিড়ির উপর। দাঁড় করান হইল। এয়োদের নির্দেশ অনুসারে আজাহের কনের সামনে আর একখানা পিড়ির উপর দাঁড়াইল। কনে আর বরের মাঝখানে একখানা চাদর টানান, সেই চাঁদরের দুই কানি ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে দুইটি কিশোরী মেয়ে। চাঁদরের সামনে দাঁড়াইয়া আজাহেরের বুক কপিতে লাগিল। কি জানি কেমন যেন তাহার লাগিতেছিল। এই কাপড়ের আড়ালে তাহার কনে রহিয়াছে! এই বউ তাহার সুন্দর হইবে কি কুৎসিত হইবে সে ভাবনা আজাহেরের মোটেই ছিল না। কিন্তু কেন জানি তার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগিল। বাড়ির মেয়েরা কৌতূহলী দৃষ্টি লইয়া একটু দূরে দাঁড়াইয়াছিল।

আজাহেরের সঙ্গে মোড়লও বাড়ির ভিতরে গিয়াছিল। সাধারণতঃ এরূপ স্থানে বরের বোনের জামাই অথবা ইয়ার্কি ঠাট্টার সম্পর্ক জড়িত আত্মীয়েরাই বাড়ির ভিতরে যাইয়া থাকে। কিন্তু আজাহেরের কোন আত্মীয়-স্বজন নাই বলিয়াই মোড়ল তাহার সহিত বাড়ির মধ্যে আসিয়াছে। গ্রাম্য মুসলমান মেয়েরা পর-পুরুষের সঙ্গে কথা বলিতে পরদা প্রথার শাসন মানিয়া থাকে। কিন্তু বিবাহ ব্যাপারে তাহারা সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার অতটা অনুশাসন মানিয়া চলে না। তাহারা সকলেই কলরবে বলিয়া উঠিল, “টাহা না অইলে কনের মুখ দেহাব না।”

মোড়ল তখন তার কেঁচার খুঁট হইতে অতি সন্তর্পণে বাধা আট আনা পয়সা বাহির করিয়া মেয়েদের কাছে দিল। মেয়েরা তাহাতে রাজী হইবে না,–কিছুতেই না। মোড়লও বেশী দিতে চাহে না, আজাহেরের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিবার উপক্রম হইতেছিল। এমন শুভদৃষ্টির সময়ে মোড়ল কেন দরাদরি করে। এতগুলো মেয়ে তাহাকে কি মনে করিতেছে।

অবশেষে বার আনায় রফা হইল। বার আনা পয়সা পাইয়া মেয়েরা শা-নজর করাইতে রাজী হইল। মোড়ল আগেই আজাহেরকে শিখাইয়া দিয়াছিল, এই সব জায়গায় সহজে চোখ মেলিয়া চাহিবি না–লজ্জা লজ্জা ভাব দেখাইবি। কিন্তু কনের সামনের পরদা তুলিয়া দিতেই আজাহের মোড়লের সকল উপদেশ ভুলিয়া গেল। সে চোখ দুইটি সম্পূর্ণ মেলিয়া কনের দিকে একদৃষ্টিতে খানিক চাহিয়া রহিল। তারপর মনের খুশীতে একবার হাসিয়া উঠিল। আজাহেরের হাসি দেখিয়া সমবেত মেয়ের দল একবারে হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল। আজাহের ভাবিয়া পাইল না কেন তাহারা এত হাসে।

এবার ঘরের মধ্যে যাইয়া কনের সঙ্গে ক্ষীর-ভোজনী হইবে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে আজাহের তাহার কনে-বউকে কোল-পাথালী করিয়া কোলে তুলিয়া ঘরে লইয়া গেল। বউকে মাটিতে নামাইয়া দেওয়ার পরে বহুক্ষণ তাহার কোমল গায়ের উষ্ণতা আজাহেরের সমস্ত দেহে ঢেউ খেলিতে লাগিল।

তাহার হাতের কানি আঙ্গুলে ক্ষীর জড়াইয়া এয়োরা বউয়ের মুখের কাছে ধরিল। বউ-এর কানি আঙ্গুলে ক্ষীর জড়াইয়া আবার আজাহেরের মুখের কাছে ধরিল। আশেপাশের মেয়েরা মিহি সুরে বিবাহের গান গাহিতে লাগিল :

ওদিকে সইরা বইস হারে দামান
আমার বেলোয়া বসপি তোমার বামেনারে।
কেমনে বসপি আমার বেলোয়া হারে দামান
তাহার সিন্তা রইছে খালি নারে।
দুলার মামু দৌড়াইয়া তখন বাইনা বাড়ি যায় নারে।
কেমনে বসপি আমার বেলোয়া হারে দামান
ও তার গায়েতে জেওর নাইরে।
দুলার চাচা দৌড়ায়া তখন
সোনারূ বাড়ি যায় নারে।

আজাহেরের মনের খুশীর নদীতে যেন সেই সুর তরঙ্গ খেলিতে লাগিল।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x