(চার)

দেখিতে দেখিতে ভাদ্র মাস আসিল। সত্য সত্যই আজাহেরের খেতে ভাল পাট হইয়াছে। সকলেই বলিল মোড়লের বরগার ভাগ দিয়া আজাহের এবার প্রায় কুড়ি মণ পাট পাইবে।

সেই পাট শুখাইতে বউ-এর কি উৎসাহ। উঠানে সারি সারি বাশের আড় পাতিয়া তাহার উপরে পাটগুলি মেলিয়া দেওয়া হইয়াছে। মাঝে মাঝে সমস্ত বাড়িখানা যেন নকল বনে পরিণত হইয়াছে। এর মধ্যে মাঝে মাঝে বউটি হারাইয়া যায়। তাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে আজাহেরকে বড়ই বেগ পাইতে হয়। সে যদি এদিকে যায় বউ ওদিক হইতে খিলখিল করিয়া হাসিয়া ওঠে। বউকে ধরিবার জন্য ওদিক যাইতে বিস্ময়ে আজাহের দেখে বউ অপরদিকে যাইয়া ক করিয়া শব্দ করিয়া ওঠে।

মোড়লের বউ বেড়াইতে আসিয়া বলে, “কি লো! তোগো হাসি মস্করা যে ফুরায় না?”

বউ তাড়াতাড়ি পিড়াখানা বাড়াইয়া বলে, “বুবু আইছ–বইস, বইস।”

আজাহের বড়ই অপ্রস্তুত হইয়া তামাক সাজিতে রান্নাঘরের দিকে যায়।

পাট শুখান শেষ হইতে না হইতে আজাহেরের বাড়িতে পাটের বেপারী অছিমদ্দীর আনাগোনা শুরু হইল। আজাহের শুনিয়াছে, ফরিদপুরে প্রতিমণ পাট ছয় টাকা দরে বিক্রি হইতেছে। অছিমদ্দী কিন্তু তাহার পাটের দাম চার টাকার বেশী বলে না। অছিমদ্দীর জন্য তামাক সাজিতে সাজিতে আজাহের বলে, “তা বেপারীর পো, চার টাকার পাট আমি কিছুতেই ছাড়ব না।” অছিমদ্দী বলে, “আরে মিয়া তোমার পাট ত তেমুন বাল না? কোম্পানী-আলা এ পাট নিতিই চায় না, তবে আমি কিন্‌তি আছি, দেহি বাল পাটের সঙ্গে মিশায়ানি বেচতি পারি।”

“হুনলাম ফইরাতপুরি পাটের দাম ছয় টাহা মণ।”

“অবাক করলা আজাহের! মার কাছে মাসী-বাড়ির গল্প কইতি আইছাও? ফরিদপুর, তালমা, গজাইরা, ভাঙ্গা, কালিপুর, চোদ্দরসি, ফুলতলা কোন আটের খবর আমি জানি না? যাও না ফৈরাতপুর পাট লয়া। তোমার ভিজা পাট দেকলি পুলিশেই তোমাকে দৈরা নিব্যানে। তারপর যদি স্যাত পাট বিক্রিও অয়, মণকে দশ সের নিব্যানে তোমার তুলাওয়ালা, তারপর বাকি রইল তিরিশ সের। ওজনদার নিব্যানে মণকে পাঁচ সের–কয় সের রইল মিঞার বেটা বিশ সের ত? শব্দেই হুনা যায় ছয় টাহা। চার মণ মানে সেহানে দুই মণ।”

বেপারীর আরো একটু কাছে ঘেঁষিয়া আজাহের বলিল,–”কওকি বেপারীর পো! ফইরাতপুর এমন জায়গা!”

বেপারী দেখিল তাহার ঔষধ কাজে লাগিয়াছে। গলার সুরটি আরো একটু নরম করিয়া বলিল,–”আজাহের মিঞা! আমি তোমার দেশের মানুষ, রাইত দিন চক্ষি দেহি। আমি তোমারে ফৈরাতপুইরা বেপারীগো মত ঠকাইতি আসি নাই।”

আজাহেরের মনটি যেন নরম হইয়া মাটিতে গলিয়া পড়িতে চাহে। অছিমদ্দী শোভারামপুরের ধনী মহাজন। সে তাহাকে আজাহের মিঞা বলিয়া ডাকিতেছে। কত মুলাম করিয়া তাহার সঙ্গে কথা কহিতেছে। তবু আজাহের হাল ছাড়িল না।

“বেপারীর পো! আরো দুই একদিন দেহি। আর কুনু বেপারী যদি বেশী দাম দেয়?”

“আজাহের মিঞা! আমারে তুমি অবিশ্বাস করলা! আমার চাইতি তোমারে আর কোন বেপারী বেশী দাম দিবি? ও সগল কতা থাক। তোমার মনের আন্ধার ঘুচাই। তোমার পাটের দাম মণ প্রতি আরো আটআনা বাড়াইয়া দিলাম, না হয় নিজেই লোকসান দিলাম।”

আজাহেরের দুইখানা হাত ধরিয়া বেপারী বলিল–”আজাহের মিঞা! কথা দাও। এবার পাটে ওজন দেই?”

এর উপর আর কথা বলা চলে না। এত বড় মহাজন। নিজে তার বাড়ি আসিয়াছে। তার কথা কি করিয়া অগ্রাহ্য করা যায়? আজাহের চারটাকা আটআনা দামেই পাট বেচিবে কথা দিয়া ফেলিল।

আজাহের আগেই পাট ওজন দিয়া রাখিয়াছিল। তাহাতে তাহার পাটের ওজন হইয়াছিল ছাব্বিশ মণ। কিন্তু অছিমদ্দী নতুন করিয়া পাটগুলিকে ওজন করিল। তাহাতে কুড়ি মণ পাট হইল। আজাহেরের মন কেবলই খুঁতখুঁত করিতে লাগিল। সে নিজে ওজন করিয়াছিল ছাব্বিশ মণ আর এখন হইল কুড়ি মণ। কিন্তু কথাটা কি করিয়া বেপারীকে বলা যায়? অনেক চিন্তা করিয়া বহুবার ঢোক গিলিয়া আজাহের বলিল, “বেপারীর পো! একটা কতা কব্যার চাই।”

“কি কতা আজাহের মিঞা? একটা ক্যান বিশটা কও না ক্যান?”

“কব আর কি? আমি নিজে ওজন দিছিলাম। পাটের ওজন ঐছিল ছাব্বিশ মণ। কিন্তুক আপনার ওজনে ঐল মোটে কুড়ি মণ।”

বেপারী এবার রাগিয়া উঠিল, “কি কইলা আজাহের, আমি অছিমদ্দী বেপারী, পাটের ওজনে তোমারে ঠকাইছি। শুয়ারের গোস্ত খাই যদি তোমারে ঠকাইয়া থাহি। কোথাকার নকল পালা-পৈড়ান দিয়া তুমি ওজন দিছিলা। তাইতি ওজনে বেশী ঐছিল। একথা কারও কাছে কইও না, যে তোমার কাছে নকল পালা-পৈড়ান আছে। একথা পুলিশি জানতি পারলি এহনি তোমারে থানায় ধইরা নিয়া যাবি। আমার পালা-পৈড়ানে কোমপানি বাহাদুরের নাম লেহা আছে। ইংরাজী পড়বার পার মিঞার বেটা?” বলিয়া বেপারী উচ্চ হাসিয়া উঠিল। ইতিমধ্যেই অছিমদ্দীর লোকজন পাটগুলি বাঁধিয়া নৌকায় উঠাইয়া ফেলিয়াছে। অছিমদ্দী কোমরে গোজা চটের ছালার খুতিটি খুলিয়া টাকা, আনি, দু’আনি প্রায় তিন চারিশত টাকা আজাহেরের উঠানের উপর ঢালিয়া দিল।

আজাহের ফ্যাল ফ্যাল করিয়া অছিমদ্দীর অপূর্ব ঐশ্বর্য্যের পানে চাহিয়া বিসায়ে অবাক হইয়া রহিল।

সেই টাকা হইতে গণিয়া গণিয়া অছিমদ্দী কুড়ি মণ পাটের দাম নব্বই টাকা আজাহেরের হাতে খুঁজিয়া দিল।

এত টাকা একসঙ্গে পাইয়া খুশীতে আজাহেরের ইচ্ছা করিতেছিল, অছিমদ্দী বেপারীর পায়ের কাছে লুটাইয়া ছালাম জানায়। সে যেন নিতান্ত অনুগ্রহ করিয়াই তাকে টাকাগুলি দিয়া গেল। পাটগুলি যে লইয়া গেল সে যেন একটা তুচ্ছ উপলক্ষ মাত্র।

বেপারী চলিয়া গেলে বউ ঘরের মধ্য হইতে আসিয়া আজাহেরকে বলিল, “বলি, আমাগো বাড়ির উনি এত বোকা ক্যান? সে দিন মাইপা পাট ঐল ছাব্বিশ মণ আর আজই বেপারী আইসা সেই পাট মাইপা কুড়ি মণ করল। ও-বাড়ির মেনাজদ্দী মোড়লেরে ডাইকা আইনা পাটের একটা বুঝ কইরা নিলি ঐত না?”

“বাল কই কইছ তুমি। আমার উয়া মনেই আসে নাই। যাক–খোদা নছিবে যা লেখছে তাই ত আমি পাব। এর বেশী কিডা দিবি।”

এ কথার উপরে আর কথা চলে না। তবু বউর মনটা খুঁৎখুঁৎ করিতেছিল।

বউকে খুশী করিবার জন্য আজাহের বলিল, “আইজই রহিমদ্দী কারিকরের বাড়ি ত্যা তোমার জন্যি একখানা পাছা পাইরা শাড়ী কিন্যা আনিগা।”

বউ বলিল, “আমার শাড়ীর কাম নাই। আগে শরৎ সাহার কর্জ টাহাডা দিয়া আসুক গিয়া।”

“বাল কতাই কইছ তুমি। আমি এহনি যামু শরৎ সহর বাড়ি।”

গোটা তিরিশেক টাকা কোমরে বাধিয়া বাকি টাকাগুলি আজাহের ঘরের মেঝেয় গর্ত খুঁড়িয়া একটা হাড়িতে পুরিয়া তাহার মধ্যে পুঁতিয়া রাখিল। বউ তাড়াতাড়ি সেই গর্তটি মাটি দিয়া বুজাইয়া তাহার উপরটা লেপিয়া ফেলিল।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x