মেদিনীপুর জেলার ‘গোলগ্রাম গ্রামোন্নয়ন সংস্থা’র আমন্ত্রণে আমাদের সমিতির সদস্যরা ও আমাদের সহযোগী ক্যানিং যুক্তিবাদী সংস্থার সভ্যরা ৮৮-র ১১ ফেব্রুয়ারী ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান করতে যান।

গ্রামোন্নয়নের সংস্থার তরফ থেকে গুণধর মুর্মু অনুষ্ঠানের মাস দুয়েক আগে যখন প্রথম আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন তখনই তাঁর কাছ থেকে জেনেছিলাম, ডেবরা ও গোলগ্রাম অঞ্চলের ওঝা, গুণিন, জানগুরু সখারা কি কি তথাকথিত অপ্রাকৃতিক ক্ষমতা দেখিয়ে স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। উদ্দেশ্য, সেই সব অপ্রাকৃতিক ক্ষমতার পরিচয়ই আমাদের সমিতি সভ্যরা অনুষ্ঠানে দেবেন এবং তারপর প্রতিটি অলৌকিক ক্ষমতার অলৌকিক কৌশলগুলো দর্শকদের বুঝিয়ে দেবেন। এর ফল স্বভাবতই ওঝা, গুণিন, জানগুরু সখাদের লোক ঠকানো ব্যবসা বন্ধ হবে। ইতিপূর্বে আমরা এই ভাবে কাজ করে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছি।

আমাদের ছেলেরা ওখানে গিয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের সাএ জাগিয়েই অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই সঙ্গে সভায় এই ঘোষণাও করেন- আপনারা যদি কোন অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা চান, আমাদের সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন অথবা গোলগ্রাম গ্রামোন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমরা আপনাদের জানতে চাওয়া অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা করে দেব।

ওই সভাতেই গ্রামোন্নয়ন সংস্থারই এক কর্মকর্তা গুণিন এম কে মান্নার কথা জানান। মান্না ওই অঞ্চলের অধিবাসী। তিনি সাধারণ মানুষদের সামনে বহুবার প্রমাণ করেছেন ভূত আছে। ভূত নিয়ে এসে প্রমাণ করেছেন ভূতের অস্তিত্ব। কেমনভাবে ভূতের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন? এটা কাঁচের গ্লাসে তাড়ি রাখা হয়। তাড়ির গ্লাসে-র উপর তিনি একটি মড়ার মাথা বসিয়ে দেন। নানা ধরনের তন্ত্র-মন্ত্রের সাহায্যে নরমুন্ডকে জাগ্রত করেন। নরমুন্ড তখন চোঁ- চোঁ করে গ্লাসের তাড়ি পান করতে থাকে। শ্রীমান্না ভক্তদের নানা বিপদ আপদ থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দেন, নানা সমস্যা সমাধানের উপায় বাতলে দেন। এই সবই তিনি করেন ভূতের পরামর্শমত। বাংলা চলচ্চিত্রের অতি জনপ্রিয় এক নায়কও নাকি মাঝে মধ্যে শ্রীমান্নার কাছে আসেন।

আমাদের ছেলেরা সেখানেই এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। জানিয়েছিলেন, এই বিষয়ে তাঁরা নিশ্চয়ই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গোলগ্রামের মানুষদের কাছে ব্যাখ্যা হাজির করবেন।

সমিতির সভ্যরা ফিরে এসে শ্রীমান্নার বিষয়টি আমাকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের ছবি এঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, স্রেফ লৌকিক কৌশলেই বাস্তবিকই এই ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব।

২১ ফেব্রুয়ারী দমদম কিশোর ভারতী স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রতিনিধি ও অঞ্চলের বিজ্ঞান কর্মীদের নিয়ে সারাদিনব্যাপী এক কুসংস্কার বিরোধী শিক্ষা শিবিরের আয়োজন করি। সেখানে শ্রীমান্নার ভূতে তাড়ি খাওয়ার প্রসঙ্গটি আলোচনা করি। হাজির করি একটি দুধ ভর্তি গ্লাস, অর্থাৎ তাড়ির অভাবে দুধ। একটি মড়ার খুলি গ্লাসের উপর চাপিয়ে বিড়-বিড় করতেই দর্শক অবাক হয়ে দেখলেন গ্লাস থেকে কোন অলৌকিক ক্ষমতায় দুধ দ্রুত কমে যাচ্ছে। দর্শকদের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে ব্যাখ্যা হাজির করতেই বিস্ফারিত চোখে নেমে এলো আনন্দের জোয়ার।

কৌশল মড়ার খুলিতে ছিল না। কৌশল ছিল না দুধে বা শ্রীমান্নার তাড়িতে। কৌশল যা ছিল, সবই ছিল গ্লাসে। দুটি ভিন্ন মাপের স্বচ্ছ প্লাস্টিক গ্লাস জুড়ে তৈরি করা হয়েছিল গ্লাসটি। একটি গ্লাস যত বড় আর একটি গ্লাস তার চেয়ে সামান্য ছোট। দেখতে হবে ছোট গ্লাসটা যেন বড় গ্লাসটার মধ্যে ঢুকে যায়। ছোট গ্লাসের তলায় একটা ছোট্ট ফুটো করা রয়েছে। বড় গ্লাসের উপরে কানা ঘেঁষে ওই ধরনের আর একটা ছোট্ট ফুটো রয়েছে। দুটো গ্লাসের কানা এমনভাবে জুড়ে দেওয়া যাতে সামান্যতম বাতাস ওই কানার কোনও অংশ দিয়ে ঢুকতে না পারে। ছবিতে গ্লাস দুটো এঁকে বোঝাবার চেষ্টা করছি।

এবার গ্লাসের ভিতর দুধ ঢাললে ছোট গ্লাসের ফুটো দিয়ে দুধ দু’গ্লাসের ফাঁকে এসেও জমা হয়। বড় গ্লাসের কানায় যে ফুটো আছে সেটা সেলোটেপ দিয়ে বন্ধ করে দিই। এবার গ্লাসটা উপুর করে দিলে ছোট গ্লাসের দুধ যায় পড়ে। দু’গ্লাসের মাঝে ঢুকে থাকা দুধ থেকে যায়। নরমুন্ডটা গ্লাসে বসিয়ে মন্ত্র পড়ার সময় সেলোটেপটা খুলে নিতেই বাইরের বাতাস বড় গ্লাসের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়তে চাপ দিতে থাকে। বাইরের বাতাসের চাপে ছোট গ্লাসের দুটো দিয়ে দুধ বেড়িয়ে এসে ছোট গ্লাসের তলায় জমতে থাকে এবং দু’গ্লাসের ফাঁকের দুধ একই সমতলে এসে হাজির হয়। দর্শকরা দেখতে পান, বিশ্বাস করেন নরমুন্ডই দুধ খেল, পড়ে রইল সামান্য তলানি।

পরবর্তীকালে গোলগ্রামের “অলৌকিক নয়, লৌকিক” অনুষ্ঠানে ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’র সভ্যরাই ভূতের তাড়ি খাওয়ার রহস্য উন্মোচন করেন স্থানীয় মানুষদের বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে।

তারপর থেকে এখন পর্যন্ত বহু সংস্থাই “অলৌকিক নয়, লৌকিক” শিরোনামের অনুষ্ঠানে এই ঘটনাটি ঘটিয়ে দেখাচ্ছেন।

‘জাগ্রত’ নরমুণ্ড সিগারেট টানল

তারাপীঠের মহাতান্ত্রিক নির্মলানন্দের নির্দেশে

১৬ জানুয়ারী ৯০ আজকাল পত্রিকায় চোখ বোলাতে গিয়ে চমকে উঠলাম। তিন কলম জুড়ে ছবি সহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি নিঃসন্দেহে অলৌকিক বিশ্বাসীদের এবং অলৌকিক ব্যবসাদারদের নব বলে বলীয়ান করবে, কিছু দোদুল্যমান মানুষকে অলৌকিকতায় বিশ্বাসীদের শিবিরে টেনে নিয়ে যাবে, কিছু যুক্তিবাদীদেরও অস্বস্তি ঘটাবে, বিভ্রান্ত করবে।

প্রতিবেদনটি এই রকমঃ

‘জাগ্রত’ নরমুণ্ড  সিগারেট টানল

আজকালের প্রতিবেদনঃ গা ছমছমে তারাপীঠ শ্মশানেই শুটিং হচ্ছে ‘তান্ত্রিক’ ছবির। এই ছবিতে অভিনয় করছেন তারাপীঠের মহাতান্ত্রিক নির্মলানন্দ তীর্থনাথ স্বয়ং। দ্বারকা নদীর ধারে তারাপীঠ শ্মশানের ওপরেই নির্মলানন্দের তীর্থনাথের ছোট আশ্রমটাই লোকেশনে। আশ্রম না বলে একটা ছোটখাটো কুঁড়েঘরই বলা উচিৎ। যার মধ্যে বসে নির্মলানন্দ তান্ত্রিক সাধনা করেন। তাঁর বেদির নিচেই পোঁতা রয়েছে একটা ন বছরের মেয়ের মৃতদেহ। ঘরের চারধারে নরমুণ্ড সারি সারি সাজানো। মাঝখানে হোমকুন্ড। এর মধ্যে একটা নরমুণ্ডের পুরোপুরি অভিনেতা।

তন্ত্র নিয়েই ছবি। পরিচালক অঞ্জন দাসকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি সাহায্য করছেন তান্ত্রিক নির্মলানন্দ তীর্থনাথ নিজেই। তন্ত্র হল বিজ্ঞান, কোণের দিকে আঙ্গুল তুলে নির্মলানন্দ বললেন, এটা জাগ্রত। আমিই জাগিয়ে রেখেছি একে। দিনে সিগারেট ও খাবেই। বলেই একটা সিগারেট নরমুণ্ডের মুখে গুঁজে দিলেন তীর্থনাথ। নরমুণ্ড সিগারেট খেতে শুরু করল অবিকল জীবন্ত মানুষের মত। নির্মলানন্দ এদিকে শুটিং জোনে গিয়ে নিজের সংলাপ বলে এলেন। সন্ধ্যা রায়, অনুপকুমারের সামনে। এ ছবিতে তন্ত্রের সমস্ত ধারাই আসবে। আসবে শবসাধনা। যেখানে মৃত এহ সরাসরি চিতা থেকে তুলে আনবেন নির্মলানন্দ তীর্থনাথ। পরিচালক অঞ্জন দাস নিজেই এই তান্ত্রিক ছবির আলোকচিত্রী। তাঁর ভয় এই সব দৃশ্য তিনি ক্যামেরায় সাহস করে শেষ অবধি ধরতে পারবেন কিনা।

‘তন্ত্র’কে আকর্ষণীয় করার জন্যে এই ছবিতে একটা গল্প থাকছে। আর সেখানেই অভিনয় করছেন সন্ধ্যা রায়, অনুপকুমার প্রমুখরা। আসলে তন্ত্রের গোপন রহস্যকে তুলে ধরার জন্যই এই ছবি। আর সেই শর্তেই এই ছবিতে অভিনয় করতে রাজী হয়েছে তারাপীঠ শ্মশানের তান্ত্রিক নির্মলানন্দ ও তাঁর সাধন মা শুক্লাতিথি বসু।

রাত্রে শ্মশানে চিতায় হোম সেরে ভোর হতেই শুটিংয়ে নেমে পড়ছেন এখন তারাপীঠের তান্ত্রিক। যিনি দীর্ঘ বার বছর সাধনার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁকে ফিল্মে বন্দী করার মত কঠিন কাজ করছেন পরিচালক অঞ্জন দাস।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য জানতে চেয়ে রাশি রাশি চিঠি এলো।

২৬ ফেব্রুয়ারী সমিতির তরফ থেকে একটা চিঠি পাঠালাম ‘আজকাল’ পত্রিকার দপ্তরে। ৬ মার্চ চিঠিটি প্রকাশিত হল।

জাগ্রত নরমুণ্ডঃ একটি চ্যালেঞ্জ

১৬ ফেব্রুয়ারী আজকাল পত্রিকায় প্রকাশিত ‘জাগ্রত নরমুন্ড সিগারেট টানল’ প্রতিবেদনটি পড়ে জানতে পারলাম ‘তান্ত্রিক’ ছবির শুটিং হচ্ছে তারাপীঠ শ্মশানে। তন্ত্র-সাধনা নিয়ে তোলা হচ্ছে ছবিটি। তন্ত্র সাধনাকে তুলে ধরার স্বার্থে অভিনয়ে রাজি হয়েছে তান্ত্রিক নির্মলানন্দ তীর্থনাথ ও তাঁর সাধন মা শুক্লাতিথি বসু। ছবিটির পরিচালক অঞ্জন দাস। নির্মলানন্দ নাকি দাবী করেছেন- তন্ত্র হল বিজ্ঞান। তিনি নাকি নরমুণ্ডকে তন্ত্র বলে জাগ্রত করে রাখেন। প্রমাণ হিসেবে নরমুণ্ডের মুখে গুঁজে দিয়েছিলেন একটা সিগারেট। নরমুণ্ড সিগারেট টানতে লাগল অবিকল জীবন্ত মানুষের মত।

‘আজকাল’-এর মত একটি সমাজ সচেতন ও যুক্তিবাদী আন্দোলন প্রসারে অগ্রণী পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হওয়ায় স্বভাবতই বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে খুবই গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিমধ্যে এই বিষয়ে আমার ও আমাদের সমিতির  বক্তব্য জানতে চেয়ে রাশি রাশি চিঠি এসেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারী লেকটাউন  বইমেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে আমাদের সমিতির ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ অনুষ্ঠানে তিনজন জাগ্রত নরমুণ্ডের সিগারেট টানার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে ব্যাখ্যা চান। একজন তো কাগজের কাটিংটি পর্যন্ত হাজির করেছিলেন। সাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তির অবসান কল্পে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্মলানন্দকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। তিনি নিরপেক্ষ স্থানে প্রকাশ্য সমাবেশে কৌশল ছাড়া মড়ার খুলিকে দিয়ে সিগারেট টানাতে পারলে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এবং সমিতির কয়েক’শত সহযোগী সংগঠন ও শাখা সংগঠন তাঁদের সমস্ত রকম অলৌকিক বিরোধী কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকবেন। প্রণামী হিসেবে আমি দেব ৫০ হাজার টাকা। এই চিঠিটি ‘আজকাল’-এ প্রকাশিত হওয়ার দশ দিনের মধ্যে নির্মলানন্দ আমাদের আমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করলে ধরে নেব নির্মলানন্দ একজন বুজরুক, প্রতারক। যদি তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, তবে আমরা তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের এক মাসের মধ্যে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনেই তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার পরীক্ষা নেব।

প্রবীর ঘোষ

সাধারণ সম্পাদক

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি।

কলকাতা-৭৪

চিঠি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাহু মানুষ দেখা করে, ফোনে অথবা চিঠিতে অভিনন্দন জানালেন, এঁদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল, “আপনার চ্যালেঞ্জে নির্মলানন্দ আসবেন না। যতসব ফালতু ব্যাপার।” আমার স্ত্রী সীমার তবলচী গোবিন্দ লাহিড়ি ৮ তারিখ সকালে এসে জাগ্রত নরমুণ্ড প্রসঙ্গটি তুলে জানালেন, “গোরক্ষবাসী রোডে এক জ্যোতিষী থাকেন। যিনি আবার তান্ত্রিকও। প্রায় শনিবারই তারাপীঠে যান। পরশুও আমি ও আমার পাড়ার কয়েকজন ‘আজকাল’টা নিয়ে গিয়েছিলাম দেখাতে। আমরা বললাম, নির্মলানন্দ কি প্রবীরবাবুর চ্যালেঞ্জ নেবেন? তান্ত্রিক ভদ্রলোক বললেন, নির্মলানন্দকে খুব ভালরকমই চিনি। তারাপীঠের সব তান্ত্রিককেই চিনি। নিজেও তন্ত্র বিষয়টা ভাল রকম জানি। তন্ত্রে কেউ নরমুণ্ডকে জ্যান্ত করে সিগারেট খাওয়াবে এমন আজগুবি গপ্পো কোন দিন শুনিনি। পত্রিকার সাংবাদিক সিনেমাকে তোল্লা দিতে নিজেই বানিয়ে টানিয়ে ওসব লিখে দিয়েছে।

গোবিন্দবাবুকে বললাম, “আপনাদের পাড়ায় তান্ত্রিকটি বেজায় ধূর্ত। তাই সাংবাদিকদের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে নির্মলানন্দকে ও তন্ত্রশক্তিকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনার তান্ত্রিক প্রতিবেশী নরমুণ্ডের সিগারট খাওয়া ব্যাপারটা ঘটানো একেবারেই অসম্ভব বলে সাংবাদিকের উপর খবরটির সব দায়-দায়িত্ব চাপাতে চাইছেন বটে, কিন্তু যদি প্রমাণ করে দিই নরমুণ্ডকে দিয়ে সিগারেট খাওয়ানো আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব তখন তিনি কি বলবেন? যে চিঠিটা আজকাল পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দিয়েছিলাম, তার থেকে শেষ কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়নি। প্রকাশিত হলে ওই তান্ত্রিকবাবাজী ও কথা বলতেন না।’

“শেষ অংশে কি ছিল?” গোবিন্দবাবু জানতে চাইলেন।

‘অফিস কপি’ বের করে ওই অংশটুকু পরে শোনালামঃ

“প্রসঙ্গত জানাই, ২৫ ফেব্রুয়ারী ৯০ লেকটাউন বইমেলার অনুষ্ঠানে দর্শকদের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া একটি ছবির মুখে সিগারেট গুঁজে দিয়ে আগুন জ্বেলে দিতেই ছবিটি সিগারেট টেনেছে, রিং ছেড়েছে জীবন্ত মানুষের মতই। উপস্থিত দর্শকরাই সাক্ষী। ঘটনাটা ঘটিয়ে ছিলাম লৌকিক কৌশলে, ছবির ভূতকে জাগ্রত করে নয়।

একই সঙ্গে পরিচালক অঞ্জন দাসের কাছে দাবী জানাচ্ছি- সত্যের নামে মিথ্যা করা থেকে এবং অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন অথবা আমাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রমাণ করুন তন্ত্র হল বিজ্ঞান।’

আশা রাখি আমাদের এই দাবীর সঙ্গে প্রতিটি সৎ ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ও গণসংগঠন একমত হবেন এবং সোচ্চার হবেন।”

৯ মার্চ ৯০ বর্তমান পত্রিকাতেও ছবি সহ চার কলম জুড়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হল- বাংলায় তন্ত্র নিয়ে ছবি হচ্ছে- তান্ত্রিক। প্রতিবেদনটির শেষ অংশে ছিল- “তারাপীঠের শ্মশানে দাঁড়িয়ে শুটিং স্পটে নির্মলানন্দ বলেছিলেন, ‘তন্ত্রের প্রভাব এখনও নষ্ট হয়ে যায়নি। কিছু অপপ্রয়োগে তন্ত্র নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হচ্ছে। তন্ত্র এখনও জাগ্রত।’ -সেই সময় জনৈক সাংবাদিক বলে ফেললেন, ‘দেখাতে পারবেন?’ -হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বলেই পাশের কুটিরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে দেখালেন বিশাল হোমকুন্ডের সামনে সার সার খুলি। সেই খুলির মুখে জ্বলন্ত সিগারেট দিলেন-  অবিকল মানুষের মত সেই খুলি সিগারেটে ঘন ঘন টান দিচ্ছে। সাংবাদিক রা বিস্মিত হলেন- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর।

১৯ মার্চ ৯০ বর্তমান পত্রিকায় এর উত্তরও প্রকাশিত হল ‘জনমত’ বিভাগে।

তান্ত্রিকঃ চ্যালেঞ্জ জানালো যুক্তিবাদী সমিতি

৯ মার্চ বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাংলায় তন্ত্র নিয়ে ছবি হচ্ছে- তান্ত্রিক’ প্রতিবেদনটিতে প্রতিবেদক অপূর্ব গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তান্ত্রিক নির্মলানন্দ তীর্থনাথ একটি মড়ার খুলির মুখে জ্বলন্ত সিগারেট গুঁজে দিয়ে দেখালেন যে সেই খুলি সিগারেটে ঘন ঘন টান দিচ্ছে। অর্থাৎ এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন যে, ‘তন্ত্র এখনও জাগ্রত’।

‘বর্তমান’-এর মত একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিমধ্যে এই বিষয়ে আমার ও আমাদের সমিতির মতামত জানতে চেয়ে রাশি রাশি চিঠি এসেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারী লেকটাউন বইমেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে আমাদের ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ অনুষ্ঠানে তিনজন জাগ্রত নরমুণ্ডের সিগারেট টানার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে ব্যাখ্যা চান। কারণ ইতিপূর্বে অন্য একটি পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল। একজন তো ওই পত্রিকার কাটিং পর্যন্ত হাজির করেছিলেন। সাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তির অবসানকল্পে ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্মলানন্দকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, তিনি নিরপেক্ষ স্থানে প্রকাশ্য সমাবেশে কৌশল ছাড়া মড়ার খুলিকে দিয়ে সিগারেট টানাতে পারলে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি ও সমিতির কয়েকশো সহযোগী সংস্থা এবং শাখা সংগঠন তাদের সমস্ত রকম অলৌকিক বিরোধী কাজকর্ম থেকে বিরত থাকবে। প্রণামী হিসেবে আমি দেব ৫০ হাজার টাকা।

এই চিঠিটি ‘বর্তমান’ পত্রিকায় প্রকাশের দশ দিনের মধ্যে নির্মলানন্দ আমাদের সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করলে অবশ্যই ধরে নেবো নির্মলানন্দ পিছু হটেছেন। যদি তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, তবে আমরা তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের একমাসের মধ্যে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনেই তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ নেবো।

প্রসঙ্গত জানাই, ২৫ ফেব্রুয়ারী লেকটাউনে বইমেলার অনুষ্ঠান দর্শকদের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া একটি ছবির মুখে সিগারেট দিয়ে আগুন জ্বেলে দিতেই ছবিটি

একটি 'অলৌকিক নয়, লৌকিক' অনুষ্ঠানে সিগারেট টানছে মড়ার খুলি

সিগারেট টেনেছে, রিং ছেড়েছে জীবন্ত মানুষের মতই। উপস্থিত দর্শকরাই সাক্ষী। ঘটনাটা ঘটিয়ে ছিলাম লৌকিক কৌশলে, ছবির ভূতকে জাগ্রত করে নয়।

একই সঙ্গে পরিচালক অঞ্জন দাসের কাছে দাবি জানাচ্ছি সত্যের নামে মিথ্যা প্রচার করা থেকে এবং মানুষকে অন্ধকারের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। অথবা আমাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রমাণ করুন ‘তন্ত্র’ হল ‘বিজ্ঞান’।

প্রবীর ঘোষ

সাধারণ স্মাপাদক

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

৭২/৮, দেবীনিবাস রোড,

কলিকাতা-৭০০ ০৭৪

৩১ মার্চ ৯০ ‘আজকাল’ পত্রিকায় নির্মলানন্দের পাল্টা চ্যালেঞ্জ প্রকাশিত হয়। চিঠিটা এখানে তুলে দিচ্ছি।

জাগ্রত নরমুণ্ডঃ পাল্টা চ্যালেঞ্জ

৬ মার্চের আজকাল ‘জাগ্রত নরমুণ্ডঃ একটি চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক চিঠি চোখে পড়ল। চিঠিটি লিখেছেন প্রবীর ঘোষ। বলতে বাধ্য হচ্ছি, চ্যালেঞ্জ করাটা প্রবীর ঘোষ মহাশয়ের কাছে একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। ওঁর চিঠিতে ‘বুজরুকি’ কথাটা উল্লেখ করা হয়েছে বলেই নেশা কথাটা লিখতে বাধ্য হলাম। হয়তো ওঁর জানা নেই, আত্মার কোন মৃত্যু নেই এবং অভেদানন্দের লেখা ‘মরণের পরে’ বইটাও হয়তো পড়া নেই। তন্ত্র সাধনা আত্মা নিয়ে খেলা এবং এটা বই পড়ে হয় না। এজন্য চাই কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা। ওর প্রণামীর চাইতে তারা মা এবং গুরুর আশীর্বাদ আমার কাছে যথেষ্ট। নরমুণ্ডের সিগারেট টানার ব্যাপারটা বিতর্কিত ছবির মধ্যে নেই কারণ আমার সাধনার বস্তু কখনোই এভাবে প্রকাশিত করা যায় না। তবে বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকেরা যখন ছবির শুটিং দেখতে যান তখন অন্য সকল দর্শনীয় দ্রব্যের সঙ্গে এই নরমুণ্ডের সিগারেট টানা দেখে অবাক হন। তাঁরা পত্রিকায় একথা প্রকাশ করেন চ্যালেঞ্জ থেকে চ্যালেঞ্জে আসতে বাধ্য হলাম। প্রবীর ঘোষ যেন এই চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার দশ দিনের মধ্যেই নিজের হাতে আমার সামনে এসে পরীক্ষা করেন। ওই পরীক্ষা ওই মহাশ্মশান বা আশ্রমেই করতে হবে। কারণ সাধনার বস্তু কখনোই বাজারের ফলমুলের মত তুলে আনা যায় না। যদি উনি না আসেন, তাহলে আমার যা করণীয় তা করব। আমি তান্ত্রিক না সাধক জানি না তবে মাকে নিয়ে পড়ে আছি।

নির্মলানন্দ তীর্থনাথ।

তারাপীঠ মহাশ্মশান

চন্ডীপুর। বীরভূম।

৪ এপ্রিল ৯০ ‘বর্তমান’ -পত্রিকাতেও প্রকাশিত হল নির্মলানন্দের চিঠি।

প্রসঙ্গঃ তান্ত্রিক

গত ৯ মার্চ ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রে ‘বাংলায় তন্ত্র নিয়ে ছবি হচ্ছে তান্ত্রিক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, আমি সাংবাদিকদের সামনে একটি মাথার খুলির মুখে জ্বলন্ত সিগারেট গুঁজে দেওয়ায় সেই খুলি সিগারেটে ঘন ঘন টান দিচ্ছিল। একথা সম্পূর্ণ সত্যি। এরপর গত ১৯ মার্চ আমায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সম্পাদক প্রবীর ঘোষ একটি চিঠি লিখেছেন । ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জানাই, স্বামী অভেদানন্দের লেখা বইটি হয়ত তাঁর পড়া নেই। আত্মার কোনও মৃত্যু নেই। তন্ত্র সাধনা আত্মা নিয়ে খেলা এবং এটা বই পড়ে হয় না। কঠোর পরিশ্রম, সাধনা সেই সঙ্গে ঈশ্বরের কৃপা থাকলে তবেই এটা সম্ভব হয়। নরমুণ্ডের সিগারেট টানার ব্যাপারটা ‘তান্ত্রিক’ ছবির মধ্যে নেই। সাংবাদিকরা অন্য সকল দর্শনীয় বস্তুর সঙ্গে এটা দেখে অবাক হয়ে যান এবং একথা পত্রিকায় প্রকাশ করেন।

আমি চ্যালেঞ্জের জবাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে বাধ্য হলাম। এই চিঠি প্রকাশিত হবার দশ দিনের মধ্যে প্রবীরবাবু যেন নিজের হাতে আমার সামনে এই পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষা তারাপীঠের মহাশ্মশানেই করতে হবে। কারণ, সাধনার বস্তু কখনোই বাজারের ফলমূলের মত তুলে আনা যায় না। যদি উনি না আসেন তবে আমার যা করার তাই করবো। আমি তান্ত্রিক না সাধক জানি না- তবে মা-কে নিয়ে পড়ে আছি। পত্রলেখককে অভিনন্দন সহ শ্মশানবাসী এই অনভিজ্ঞ-র এই আবেদন রইল।

নির্মলানন্দ তীর্থনাথ

তারাপীঠ মহাশ্মশান, চন্ডিপুর, বীরভূম।

‘আজকাল’ ও ‘বর্তমান’ দুটি পত্রিকাতেই আমরা বক্তব্য পাঠালাম ১ এপ্রিল ও ৪ এপ্রিল ৯০। কিন্তু চিঠি দুটি যে কোনও কারণে হোক প্রকাশিত হয়নি। এ বিষয়ে সাধারন মানুষের আগ্রহ ছিল। আমরাই কয়েক শো চিঠি পেয়েছি- যেগুলোতে পত্রলেখক জানতে চেয়েছিলেন নির্মলানন্দের চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করছি কি না?

আজকাল পত্রিকায় পাঠান চিঠিটির একটি প্রতিলিপি, এখানে প্রকাশ করলাম। ‘বর্তমান’ পত্রিকাতেও এই বক্তব্যের চিঠিই পাঠিয়েছিলাম।

 

১-৪-৯০

৩১ মার্চ আজকাল পত্রিকায় ‘জাগ্রত নরমুণ্ডঃ পাল্টা চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে প্রকাশিত চিঠিটি পড়লাম। তাঁর চিঠির প্রথম অভিযোগের উত্তরে জানাই, ‘চ্যালেঞ্জ’ ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির কর্মধারার বিভিন্ন পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায় মাত্র। আমাদের সমিতি কুসংস্কার ও জাতপাতের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলতে আমরা তৃণমূল পর্যায়ের জনসাধারণের মধ্যে হাজির হয়ে তাদেরই সঙ্গে মিশে গিয়ে কুসংস্কার ও তার মূল কারণগুলোর বিষয়ে সচেতন করছি, নাটক, প্রদর্শনী, গণসঙ্গীত, প্রতিবেদন, বইপত্র, আলোচনাচক্র, শিক্ষাচক্র, ইত্যাদি মাধ্যমে। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে কেউ কোনও অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা চাইলে দেব। সাধারণ মানুষকে অবতার ও জ্যোতিষীদের ‘নেশা’ মুক্ত করতেই আমাদের চ্যালেঞ্জ। যতদিন সাধারনের মধ্যে ব্যাপকভাবে অবতার ও জ্যোতিষীদের ‘নেশা’ থাকবে ততদিন ‘নেশা’ কাটাতে আমাদের চ্যালেঞ্জের নেশাও থাকবে।

নির্মলানন্দ জানিয়েছেন, স্বামী অভেদানন্দের ‘মরণের পরে’ বইটা হয়তো আমার পড়া নেই। উত্তরে বিনীতভাবে জানাই বইটির নাম ‘মরণের পারে’, ‘পরে’ নয়। কিন্তু বইটির প্রসঙ্গ টানলেন কেন, বুঝলাম না। আমার পড়া থাকা বা না থাকায় কি আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়?

বইটি পড়া আছে। অভেদানন্দের কথা মত আত্মা মানেই ‘চিন্তা’, ‘চেতনা’, বা ‘মন’। শরীর বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ জেনেছে, মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের কাজ-কর্মের ফলই হল ‘চিন্তা’, ‘চেতনা’, বা ‘মন’। মানুষের মৃত্যুর পর তার মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের অস্তিত্ব বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই চিন্তারূপী চৈতন্যরূপী আত্মারও মৃত্যুর পর বাস্তব অস্তিত্ব সম্ভব নয়।

নির্মলানন্দের পরীক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম নিরপেক্ষ স্থানে এবং প্রকাশ্যে। একবারের জন্যেও অনুরোধ করিনি, আমাদের সমিতির কার্যালয়ে এসে তাঁকে প্রমাণ দিতে হবে। জানতাম নির্মলানন্দ কখনোই নিরপেক্ষ স্থানে প্রকাশ্যে কোনও কৌশল ছাড়া নরমুণ্ডুকে সিগারেট খাওয়াতে পারবেন না। তাই একান্ত বাধ্য হয়েই উনি প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ স্থানে হাজির হতে অক্ষমতা জানিয়েছেন। নারাজ হওয়ার পিছনে একটি কুযুক্তিও হাজির করেছেন- “কারণ সাধনার বস্তু কখনোই বাজারের ফলমূলের মত তুলে আনা যায় না।”

সিনেমার তো এখন আন্তর্জাতিক বাজার। সেই বাজারে সাধনার ফলকে হাজির করতে পারলে নিরপেক্ষ স্থানে প্রকাশ্যে হাজির করতে অসুবিধে কোথায়? ওঁর আশ্রমে আমি গেলে আমি হারলেও হারবো, জিতলেও হারবো।

চিঠির শেষে নির্মলানন্দ যে প্রচ্ছন্ন হুমকী দিয়েছেন, আমার বা আমাদের সমিতির কাছে সেটা নতুন কিছু নয়। এর আগে যখনই আক্রান্ত হয়েছি, দুর্বার জনরোষ আক্রমণকারীদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আক্রমণকারীরা কখনো হয়েছে ফেরার, কখনো বা সচেষ্ট হয়েছে আত্মহননে।

নির্মলানন্দকে আবারও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, প্রকাশ্য নিরপেক্ষ স্থানে আপনার ক্ষমতার পরীক্ষা দিয়ে কৌশল ছাড়া নরমুণ্ডকে দিয়ে সিগারেট খাওয়ান। আর প্রকাশ্য স্থানটা কলকাতা প্রেস ক্লাব হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ধৃষ্টতা যদি নির্মলানন্দ দেখান, তাঁর মাথা যুক্তিবাদের কাছে নত হতে বাধ্য হবে। আবারও প্রমাণ হবে অলৌকিকত্বের অস্তিত্ব আছে শুধু কল্পকাহিনীতে।

ঠাকুরনগর খেলার মাঠে ১৩ এপ্রিল বিকেল তিনটেয় আমাদের সমিতির ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ অনুষ্ঠানে নির্মলানন্দের ছবিকে দিয়েই সিগারেট খাওয়াবো। নির্মলানন্দসহ উৎসাহিতদের উপস্থিতি কামনা করছি।

শুভেচ্ছা সহ

প্রবীর ঘোষ

সাধারণ সম্পাদক

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

৭২/৮, দেবীনিবাস রোড

কলিকাতা-৭০০ ০৭৪।

এরপরও আরও কিছু বলার রয়ে গেছে। নির্মলানন্দকে রেজিস্ট্রি ডাকে একটি চিঠি পাঠাই ২৬-৫-৯০। দীর্ঘ চার পৃষ্ঠার চিঠির প্রথম অংশটা ছিল ‘আজকাল’ ও ‘বর্তমান’-এ পাঠান জবাব -যা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। শেষ অংশটুকু আপনাদের কৌতুল মেটাতে তুলে দিচ্ছি।

“ইতিমধ্যে আমরা বহু ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে ছবিকে দিয়ে সিগারেট পান করিয়েছি। ছবি সিগারেট টেনেছে জীবন্ত মানুষের মতই। পরবর্তী অনুষ্ঠানগুলোতেও যে কোনও নিরপেক্ষ স্থানে প্রকাশ্যেই এমন ঘটনা ঘটিয়ে দেখাবেন আমাদের সমিতির বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংস্থার হাজার হাজার সভ্যরা। এর জন্য আমরা আশ্রয় নিয়েছি তন্ত্রের নয়, কৌশলের।

মাসিক পত্রিকা ‘আলোতপাত’ পাঠে জানলাম, আপনি নরকঙ্কালের মুণ্ডুকে দিয়ে কারণবারিও পান করান। ইতিমধ্যে আমাদের সমিতি ও কয়েকশত সহযোগী সংস্থা ও শাখা সংগঠন নরমুণ্ডকে দিয়ে দুধ (মদের পরিবর্তে) পান করিয়ে দেখিয়েছেন অন্তত কয়েক হাজার অনুষ্ঠানে।

আমাদের সঙ্গে আপনার পার্থক্য, আমরা এগুলো ঘটিয়ে দেখিয়ে কোনও অলৌকিক ক্ষমতার দাবি রাখি না। আপনি এগুলো ঘটিয়ে দাবি করেন অলৌকিক ক্ষমতার।

যেহেতু নরমুণ্ডকে দিয়ে সিগারেট পান বা মদ্যপান লৌকিক কৌশলেই করা সম্ভব, তাই আপনার অলৌকিক ক্ষমতার দাবী বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। আমরা ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি অলৌকিক ক্ষমতা ও জ্যোতিষ ক্ষমতার দাবিদারদের দাবির যথার্থতা জানতে সত্যানুসন্ধান চালিয়ে থাকি। আপনি একজন সৎ মানুষ হলে আমাদের এই সৎ প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে আপনার দাবীর ক্ষেত্রে আমাদের সত্যানুসন্ধান চালাতে সমস্তরকম সহযোগিতা করবেন- এ আশা রাখি।

আগামী ১৬ জুন রবিবার প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করেছে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি। সময় বিকেল চারটা। সেদিন সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে আপনি মড়ার খুলিকে জাগ্রত করে সিগারেট ও মদ খাওয়াতে পারলে আমি ও আমাদের সমিতি পরাজয় স্বীকার করে নেবো। তবে অবশ্যই ঘটনাগুলো আপনাকে ঘটাতে হবে কৌশল ছাড়া।

আমাদের সমিতির এই সত্যানুসন্ধান বিষয়ে সহযোগিতা না করলে অবশ্যই ধরে  নেব আপনার তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাগুলো আর যাঁদেরই দেখান না কেন। আমাদের নিরপেক্ষ পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ আপনিও আমাদের মতই কৌশলের সাহায্যেই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে থাকেন।

শুভেচ্ছা সহ

প্রবীর ঘোষ

না, নির্মলানন্দ চিঠিটি গ্রহণ করেননি। সম্ভবত প্রেরক হিসেবে আমাদের সমিতির ও আমার নামটিও চিঠিটি গ্রহণ করার পক্ষে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চিঠিতে পুরো ঠিকানাই অবশ্য ছিল।

শ্রীনির্মলানন্দ

তারাপীঠ মহাশ্মশান, চন্ডীপুর, বীরভূম।

নির্মলানন্দের জন্য খোলা চ্যালেঞ্জ আজও রইল। সাধ্য থাকলে যেন গ্রহণ করেন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x