চৌষট্টি বছর বয়সে ইসলামুদ্দিন ঢাকা ছেড়ে তার গ্রামের বাড়ি ধূপখালির দিকে রওনা হলেন। তাঁর সঙ্গে একটা সুটকেসে কিছু কাপড়চোপড়, টুথপেস্ট-টুথব্রাশ, সাবান। পকেটের মড়ি ঘরে ছয় হাজার তিনশ টাকা। প্যান্টের পকেটের মানিব্যাগে সাতশ একুশ টাকা এবং একশ টাকার দুটা প্রাইজবন্ড। ইসলামুদ্দিনের দীর্ঘ চাকরি জীবনের এই হলো সম্বল।

ঢাকায় তিনি ভালো চাকরি করতেন। রিটায়ার করেছিলেন ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হিসাবে। পেনশন এবং গ্রাচুইটির টাকায় উত্তরায় পাঁচ কাঠা জমি কিনেছিলেন। জমির দখল নিতে পারলেন না। জানা গেল জমির মালিক তিনজনকে একই জমি বিক্রি করেছেন।

তিনি তার অফিসের এক কলিগকে (আবুল কালাম) ব্যবসায় খাটানোর জন্যে ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। প্রথম দুমাস আট হাজার টাকা মুনাফা পেলেন। তৃতীয় মাস থেকে সব বন্ধ। এলসি খোলার কী ঝামেলায় না-কি সব টাকা লোকশান গেছে। নিজের পকেট থেকে টাকা ঢালতে হবে এমন অবস্থা।

ইসলামুদ্দিন ঝিগাতলায় দুই কামরার বাসা ভাড়া করে থাকতেন। নিজেই রান্না করে খেতেন। বুধবার রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, খালি গায়ে ভিক্ষা করছেন। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ির লম্বা লাইন। তিনি প্রতিটি গাড়ির দরজার সামনে দাড়িয়ে বলছেন, জনাব, দুই দিনের না খাওয়া। একটু দয়া করেন।

স্বপ্ন ভাঙার পরই তিনি ঠিক করলেন, দেশের বাড়ি চলে যাবেন। সেখানে বসতবাড়ি ছাড়া কিছু নেই। দশ বছর আগে একবার এসে দেখেছেন বসতবাড়ির। অবস্থা শোচনীয়। কিছু দরজা-জানালা লোকজন চুরি করে নিয়ে গেছে। কিছু ঘুণে খেয়ে নষ্ট করেছে। একতলা পাকা দালান ঝোপ-জঙ্গলে ছেয়ে গেছে। দেয়ালে বড় বড় ফাটল। সেখানে নিশ্চয় সাপের আড। একটা রাত নিঘুম কাটিয়ে ফিরে এসেছেন।

বতিনি বসতবাড়ি বিক্রি করার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কেউ কিনতে রাজি হয় নি। নদী ভাঙতে শুরু করেছে। আশেপাশের অনেক বাড়ি নদী টেনে নিয়েছে। এই বাড়িও নিবে। কার গরজ পড়েছে কেনার!

কার্তিক মাসের এক সন্ধ্যায় তিনি নিজ বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। আশেপাশের বাড়িঘর সবই নদী টেনে নিয়েছে। তারটাই টিকে আছে। বনজঙ্গলে ঢাকা দালান। মনে হচ্ছে, যে-কোনো মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়বে। ইসলামুদ্দিন ভীত চোখে নিজের বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাড়ির পাশেই নদী। নদীর পানি ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করছে। সেই শব্দ ভৌতিক শোনাচ্ছে। ঝোপঝাড়ে নিশ্চয়ই কামিনী ফুলের গাছ আছে। কামিনী ফুলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেই গন্ধটাও যেন। কেমন কেমন।

ইসলামুদ্দিন ঝোলা থেকে মোমবাতি-দেয়াশলাই বের করলেন। ট্রেন থেকে নেমেই তিনি বুদ্ধি করে মোমবাতি-দেয়াশলাই ছাড়াও একটা টর্চ কিনেছেন। খিচুড়ি রাধার জন্যে চাল-ডাল তেল-মসলা কিনেছেন। একটা সসপেন কিনেছেন। হারিকেন কেনার ইচ্ছা ছিল। হারিকেন পাওয়া যায় নি। যেভাবে অন্ধকার নামছে তাতে মোমবাতি জ্বালানো অর্থহীন। মোমবাতির আলো অন্ধকার দূর করবে না, বরং আরো বাড়াবে। দীর্ঘপথ হেঁটে আসায় শরীর ভেঙে পড়তে চাইছে। প্রচণ্ড পিপাসা বোধ হচ্ছে। জঙ্গুলে এই বাড়িতে পানি কোথায় পাবেন?

ডাব খান।

ইসলামুদ্দিন চমকে পেছনে তাকালেন। এগারো-বারো বছরের একটা ছেলে কাটা ডাব হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার খালি গী। পরনে লুঙ্গি। চেহারা মেয়েলি। মাথার চুল বড় বড়। চোখও বড় বড়। গায়ের রঙ ফর্সা। এত চমৎকার গায়ের রঙ গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় না। ফর্সা ছেলেপুলেও রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যায়।

তুমি কে?

ছেলেটা জবাব না দিয়ে ডাব বাড়িয়ে দিল। ইসলামুদ্দিন বললেন, তুমি কে? নাম কী?

ছেলেটা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আমি এই বাড়িতে থাকি।

এই বাড়িতে থাকি মানে? তুমি একলা থাক?

হুঁ।

কিছুই তো বুঝলাম না। তুমি বাচ্চা একটা ছেলে, এই ভাঙা বাড়িতে একা থাক, মানে কী?

ভাব খান।

ইসলামুদ্দিন ঘটনায় চমকে গিয়েছিলেন বলেই তৃষ্ণা ভুলে ছিলেন। ডাব দেখে তৃষ্ণা আকাশ স্পর্শ করল। ডাব এক চুমুকে শেষ করলেন। মিষ্টি পানি। ডাবের পানি এত মিষ্টি হয় না। ভেতরে শাস হলেই পানি মিষ্টি হয়। ইসলামুদ্দিন বললেন, তোমার বিষয়টা পরে জানব, আগে ডাবটা দুই ফাঁক করে নিয়ে আস। দেখি শাঁস আছে কিনা। বিরাট ক্ষুধা লেগেছে।

ছেলে ডাব নিয়ে অন্ধকার বাড়িতে ঢুকে গেল। দা দিয়ে ডাব কাটার শব্দ আসছে। ইসলামুদ্দিন স্বস্তি বোধ করছেন। তিনি নির্বান্ধব না। একজন কেউ আছে, যে এখন দা দিয়ে ডাব দুফাঁক করছে। একসঙ্গে অনেকগুলি ঝিঝিপোকা ডাকছে। তিনি একা থাকলে ঝিঝিপোকার ডাকেই অস্থির হয়ে যেতেন।

ডাব দুফাঁক করা বৃথা হয়েছে। কোনো শাস নেই। ছেলেটা লজ্জিত ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে, যেন ডাবে শাঁস না থাকার অপরাধটা তার।

ইসলামুদ্দিন বললেন, বাবা, নাম কী তোমার?

ছেলেটা অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দিল, নাম নাই।

নাম কেন থাকবে না? নাম বলতে না চাইলে সেটা ভিন্ন কথা। তুমি কি সত্যি এখানে একা থাক?

হুঁ।

বাড়ি থেকে রাগ করে পালায়ে আসছ?

ছেলে জবাব দিল না। পায়ের নখ দিয়ে মেঝের মাটিতে আঁকিবুকি কাটতে লাগল। ইসলামুদ্দিন নিঃসন্দেহ হলেন, ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। এইজন্যেই নাম বলতে চাচ্ছে না।

কতদিন ধরে এখানে আছ?

মেলা দিন।

খাওয়া দাওয়া কী করো?

আমি খাই না।

কী বলে এই পাগলা ছেলে? না খেয়ে থাকবে কীভাবে? ইসলামুদ্দিন নিঃসন্দেহ হলেন, ছেলেটা আজই এসেছে। সারাদিন না খেয়ে আছে। ইসলামুদ্দিন বললেন, ঘটনা কী আমাকে খুলে বলো তো। পরীক্ষা খারাপ করেছ? বাবা বকা দিয়েছে? পালিয়ে চলে এসেছ?

আমি লেখাপড়া করি না।

লেখাপড়া করো না এটা তো ভালো কথা না। যাই হোক, এই বিষয়ে পরে কথা বলব। কোনো ভয় নাই, আমি নিজে তোমাকে তোমার বাবার হাতে তুলে দিয়ে আসব। তাকে বলব যেন বকাঝকা না করেন। ঠিক আছে?

ছেলে অন্যদিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলের স্বভাব বিচিত্র। কখনোই মুখের দিকে তাকায় না।

ইসলামুদ্দিন বললেন, বাবা, আগুন জ্বালাতে পারবে? সঙ্গে জিনিসপত্র সবই আছে। খিচুড়ি বেঁধে ফেলব। দুজনে মিলে আরাম করে খাব। ভালো কথা, পানি আছে?

নদীর পানি।

নদীর পানিতে রান্না চলতে পারে, খাওয়া যাবে না। তুমি কি নদীর পানিই খাও না-কি?

আমি পানি খাই না।

বোকা ছেলে বলে কী? মরুভূমির প্রাণী যে উট, তাকেও পানি খেতে হয়। বিপদের দিনের জন্যে সে তার কুঁজে পানি জমা করে রাখে। আশেপাশে টিউবওয়েল আছে?

ছেলে জবাব দিল না। হুট করে ঘরে ঢুকে বালতি নিয়ে বের হলো। হনহন করে রওনা দিল। ছেলে কাজের আছে। এত বড় বালতি ভর্তি করে পানি আনা তার কর্ম না। গামা পালোয়ানের ছেলে হলেও একটা কথা ছিল।

ইসলামুদ্দিন মোমবাতি হাতে সাবধানে ঘরে ঢুকলেন। খুবই আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, প্রতিটি কামরাই পরিষ্কার! দরজা-জানালা নেই, কিন্তু মেঝে ঝকঝক করছে। দেয়ালে মাকড়সার জাল নেই। পাটি পেতে আরাম করে রাত পার করে দেয়া যায়। বোঝা যাচ্ছে ঘর পরিষ্কারের কাজ এই ছেলেই করেছে। এক-দুই দিনে এই কাজ করা সম্ভব না। ছেলেটা মনে হয় কিছুদিন ধরেই এখানে আছে। রাতটা পার হোক কাল দিনেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে। রাজপুত্রের মতো ছেলে বাবা-মার ওপর রাগ করে একা পড়ে আছে। কোনো মানে হয়! বাবা-মা নিশ্চয়ই নিঘুম রাত পার করছে।

শুকনো লতাপাতা জোগাড় করে ইট বিছিয়ে ইসলামুদ্দিন আগুন ধরিয়ে রান্না চড়িয়েছেন। ছেলেটা বালতি ভর্তি করে পানি নিয়ে এসেছে। বিস্ময়কর ঘটনা। রোগী পটকা ছেলে, দেখে মনেই হয় না গায়ে এত জোর।

ঘি থাকলে ফার্স্টক্লাস একটা খিচুড়ি হতো। যি কিনতে হবে। থালা কেনা। বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কলাপাতা কেটে আনি। কলাপাতায় করে খাব।

ছেলে কলাপাতা কেটে নিয়ে এল।

কাগজি লেবুর চার-পাঁচটা গাছ ছিল। দেখ তো বাবা, লেবু পাওয়া যায় কি। লেবু না থাকলে কচি দেখে কয়েকটা লেবু পাতা ছিঁড়ে নিয়ে এসো। খিচুড়িতে দিয়ে দেব। মারাত্মক বাস ছড়াবে।

ছেলেটা লেবু এবং লেবু পাতা দুইই নিয়ে এল। সে বসেছে একটু দূরে। আগ্রহ নিয়ে রান্না দেখছে। ইসলামুদ্দিন যতবারই তাকাচ্ছেন ততবারই সে চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ইসলামুদ্দিন বললেন, পানি যা এনেছ আরাম করে একটা গেসিলও দেয়া যাবে। জার্নিতে শরীর নষ্ট হয়ে গেছে। গোসল করলে শরীর ফ্রেস হবে। খেয়েও আরাম পাৰ। তুমি কি আজ গোসল করেছ?

আমি গোসল করি না।

তোমার কথা কিছুই বুঝলাম না। পানি খাও না, গোসল করো না। বাবা শোন, রান্না হয়ে গেছে। তুমি এখানে এসে বসো। আমি চট করে গায়ে একটু পানি দিয়ে আসি। তারপর আরাম করে খানা খাব।

ইসলামুদ্দিন সময় নিয়ে গোসল করলেন। তাঁর কাছে মনে হলো, দীর্ঘদিন গোসল করে এত আরাম পান নি। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসার মতো আরাম।

খেতে এসে তিনি ছেলেটাকে পেলেন না। কোথাও নেই। তিনি এই খোকা, এই খোকা বলে অনেক ডাকাডাকিও করলেন। অদ্ভুত ছেলে তো! কিছু না বলে কোথায় চলে গেছে। ইসলামুদ্দিনের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। তার ধারণা হলো, ছেলেটার মাথায় কিছু দোষ আছে।

খিচুড়ি খেতে খুবই সুস্বাদু হয়েছিল, কিন্তু তিনি খেয়ে একেবারেই আরাম পেলেন না। ছেলেটার জন্যে খারাপ লাগছে। বেচারা না খেয়ে কোথায় ঘুরছে কে জানে!

ইসলামুদ্দিন মেঝেতে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। নদীর বাতাস। কার্তিক মাসের ঠান্ডা হাওয়া। কানের কাছে মশার গুনগুনানি নেই। আহ্, কী শান্তি! ঘুমে যখন চোখ জুড়িয়ে আসছে, তখন দেখলেন তাঁর পাশেই ছেলেটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। কোন ফাঁকে এসে শুয়ে পড়েছে কে জানে! ইসলামুদ্দিন বলতে যাবেন–খিচুড়ি রাখা আছে খেয়ে আস–তার আগেই ঘুমিয়ে পড়লেন। এক ঘুমে। রাত পার। ভোরে উঠে দেখেন ছেলেটি নেই।

সারাদিন ইসলামুদ্দিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটালেন। কাঠমিস্ত্রি এনে দরজা ঠিক করানো, চৌকি কেনা, মশারি কেনা, থালাবাসন কেনা। একসঙ্গে অনেকগুলি টাকা বের হয়ে গেল। উপায় কী? যখন নিঃস্ব হয়ে পড়বেন তখন দেখা যাবে। কপালে যদি ভিক্ষাবৃত্তি লেখা থাকে ভিক্ষাবৃত্তি করবেন। উপায় কী?

সিরাজউদৌলার মতো মানুষকে বলতে হয়েছিল উপায় নেই গোলাম হোসেন। তিনি কোন ছার!

রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘুমুতে এসে দেখেন, নতুন কেনা চৌকিতে পা ঝুলিয়ে ছেলেটা বসা। তার মুখ হাসিহাসি। সে পা দোলাচ্ছে। নতুন কেনা হারিকেনের আলো পড়েছে ছেলেটার মুখে। সুন্দর দেখাচ্ছে।

বাবা, তুমি সারাদিন কোথায় ছিল?

ছেলে জবাব দিল না। তার পা দোলানো আরো দ্রুত হলো। ইসলামুদ্দিন বললেন, আমার মতো বৃদ্ধ একজন মানুষকে তুমি মহাদুশ্চিন্তায় ফেলেছিলে। কাজটা তো ঠিক করো নাই। রাতের খাওয়া কি হয়েছে? না হয়ে থাকলে বলো ভাত চড়াব, একটা ডিম ভেজে দিব! যা বেঁধেছিলাম সবই খেয়ে ফেলেছি।

আমি খাই না।

আবার ফাজলামি শুরু করেছ? মানুষ মাত্রই ক্ষুধার প্রাণী। তাকে খেতে হয়।

আমি মানুষ না।

তুমি মানুষ না, তাহলে তুমি কী?

আমি ভূত।

তোমাকে থাপ্পড় দেয়ার টাইম হয়ে গেছে। দুই গালে দুই থাপ্পড় দিলে স্ট্রেইট লাইন হয়ে যাবে। স্ট্রেইট লাইন বুঝ?

না।

স্ট্রেইট লাইন হলো সরলরেখা। যারা বক্র থাকে, তাদেরকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে সরুল করতে হয়। তুমি বক্র।

আমি বক্ত?

হ্যাঁ, তুমি মহা বক্র। এখন থেকে তোমাকে ডাকব বক্র।

আচ্ছা।

বক্র মনে হচ্ছে কথাবার্তায় খুবই আমোদ পাচ্ছে। তার মুখভর্তি হাসি। সে সমানে পা দোলাচ্ছে।

বক্রের ব্যাপারটা ইসলামুদ্দিন ঠিক বুঝতে পারলেন না। এবং মনে হয় বোঝার চেষ্টাও করলেন না। আবার এও হাতে পায়ে যে, তিনি আঁচ করতে পারছেন কিন্তু ভাব করছেন না। তিনি বক্রের বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। বক্রের কিছু কিছু জিনিস মেনেও নিলেন।

যেমন–

১. বক্র আসলেই কিছু খায় না।

২. তাকে দিনে কখনোই দেখা যায় না।

৩. সে প্রথম দিন যে লুঙ্গি পরে দেখা দিয়েছিল, এর বাইরে কিছুই পরে না। ইসলামুদ্দিন তাকে শার্ট-প্যান্ট জুতা কিনে দিয়েছিলেন, সে ছুঁয়েও দেখে নি।

৪. সে গল্প শুনতে খুবই পছন্দ করে, কিন্তু নিজ থেকে কোনো গল্প কখনোই করে না।

রাতে খাবার পর্ব শেষ হবার পর ইসলামুদ্দিনের প্রধান কাজ গল্প বলা। বক্র আদর্শ শ্রোতা। সে ঝিম ধরে গল্প শোনে। সমস্যা একটাই, সে হুঁ হা কিছুই করে না। একজন ঘনঘন হুঁ দিলে গল্প বলে মজা পাওয়া যায়। এই মজাটা ইসলামুদ্দিন পাচ্ছেন না। তাতে অবশ্যি তার সমস্যা হচ্ছে না।

বুঝলে বক্র! আমার জীবন কেটেছে দুঃখে দুঃখে। বিয়ে করেছিলাম, বাসর রাতেই বউ মারা গেল। কীভাবে মারা গেল শুনলে থ মেরে যাবে। সাপের কামড়ে। একেবারে বেহুলা-লখিন্দর গল্প। বেহুলা-লখিন্দরের গল্প জানো?

না।

বাসর রাতে কালনাগিনী লখিন্দরকে দংশন করেছিল। আমার বেলায় উল্টোটা হলো, আমার স্ত্রীকে দংশন করল। সে যখন উহ্ করে উঠল তখন আমি চমকে দেখলাম, কুচকুচে কালো একটা সাপ খাট থেকে নেমে গেল। এমনভাবে নামল যেন কিছুই হয় নি। সে জানেও না কী সর্বনাশ করে চলে গেল। এরচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা কি শুনাবে?

বক্র মাথা নাড়ল। সে শুনবে। ইসলামুদ্দিন সাপের কামড়ের চেয়েও অদ্ভুত এক গল্প শুরু করলেন। গল্প শেষ হতে রাত হয়ে গেল। ইসলামুদ্দিন বললেন, যাপ শুয়ে পড়। Early to bed early to rise is the way to be healthy and vise. কী বললাম, অর্থ বুঝেছ?

না।

পড়াশুনা শিখতে হবে। পড়াশুনা ছাড়া চলবে না। বাল্যশিক্ষা, এবিসিডির বই কিনে আনব। প্রতিরাতে এক ঘণ্টা পড়াশোনা, তারপর গল্প।

ইসলামুদ্দিন বইখাতা কিনে নিয়ে এলেন। জোরেশোরে পড়াশোনা শুরু হলো। বক্রেরও আগ্রহের কমতি নেই। অল্পদিনেই সে পড়তে শুরু করল–

জল পড়ে
পাতা নড়ে।
কালো জাম
লাল আম।
বায়ু বয়
ভয় হয়।

এক রাতে ঘুমুতে যাবার সময় ইসলামুদ্দিন দেখলেন, তাঁর বালিশের কাছে। পিতলের একটা লোটা। ইসলামুদ্দিন বললেন, এটা কী রে? (এখন তিনি বক্রকে আদর করে তুই ডাকেন।)।

বক্ৰ বলল, আপনার জন্যে এনেছি।

পিতলের লোটা দিয়ে আমি করব কী?

এটা পিতলের না।

পিতলের না তো কিসের?

সোনার। নদীর তলে পড়েছিল। আপনার জন্যে এনেছি।

ইসলামুদ্দিন বললেন, আরে রাখ রাখ, সোনা এত সস্তা না। নদীতে কেউ সোনার লোটা ফেলে রাখে না। মুখে এই কথা বললেও ইসলামুদ্দিন নিশ্চিত বুঝলেন, লোটাটা সোনার। ওজন খুব কম করে হলেও দুই কেজি হবে। সোনার ভরি এখন কত তিনি জানেন না। জানলে দুই কেজি সোনার লোটাটার দাম কত বের করে ফেলতে পারতেন।

বক্র।

হুঁ।

আমার মধ্যে কোনো লোভ নেই, এটা কি জানিস?

হুঁ।

লোটা যেখান থেকে এনেছিস সেখানেই রেখে আসবি।

এখন যাব?

হ্যাঁ, এখন যাবি।

আপনার তো টাকাপয়সা শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরে খাবেন কী?

প্রয়োজনে ভিক্ষা করব। তুই তোর ললাটা নিয়ে বিদায় হ।

আরেকবার সে সোনার রাধাকৃষ্ণ মূর্তি নিয়ে উপস্থিত। দশ-বারো কেজি ওজন। এতই সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায় না। কৃষ্ণের চোখে কোনো নীল মণি বসানো। চোখ থেকে নীল আলো বের হচ্ছে।

ইসলামুদ্দিন বললেন, এটা কী জন্যে এনেছিস? আমি কি পূজা করব না-কি?

বক্ৰ বলল, দেখার জন্য এনেছি। সুন্দর না?

হ্যাঁ সুন্দর। যেখানকার জিনিস সেখানে রেখে আয়। কোথায় ছিল?

নদীর তলে। পুরনো একটা ভাঙা জাহাজ আছে। তার ভেতরে ছিল। আরো অনেক কিছু আছে। দেখবেন?

না। বক্র শোন, আমাকে লোভ দেখাবি না।

আচ্ছা। আপনাকে খুশি করতে ইচ্ছা করে।

আমাকে খুশি করতে ইচ্ছা করলে নিজের সম্পর্কে বল। তুই আসলে কী? তোর বাবা-মা কে? এইসব।

বলব না।

আচ্ছা যা বলিস না। বই নিয়ে বোস।

পাঁচ বছর পরের কথা। ইসলামুদ্দিনের শরীর খুবই খারাপ করেছে। একচোখে কিছুই দেখেন না। অন্যচোখে আবছা দেখেন। হাঁপানির সমস্যা হয়েছে। দিনের মধ্যে কয়েকবার হাঁপানির টান ওঠে, তখন তার মরে যেতে ইচ্ছা করে।

দিনে হাঁপানির টান উঠলে বড়ই কষ্ট। দেখার কেউ নেই। রাতে বক্র পাশে থাকে। বুকে রসুন দিয়ে জ্বাল দেয়া সরিষার তেল মালিশ করে দেয়। তালের পাখায় হাওয়া করে। তখন একটু আরাম লাগে।

পৌষ মাসের এক সকালে ঢাকা থেকে তার এক সহকর্মী আবুল কালাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আবুল কালাম হচ্ছে সেই ব্যক্তি যাকে তিনি ব্যবসার জন্যে ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। আবুল কালাম বললেন, একী অবস্থা!

ইসলামুদ্দিন চাদর গায়ে রোদে বসেছিলেন। তিনি ক্ষীণগলায় বললেন, কে?

আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি আবুল কালাম।

ও আচ্ছা।

আপনার এই অবস্থা তা তো জানি না। জানলে আগেই আসতাম।

ইসলামুদ্দিন বললেন, জনাব, আপনার পরিচয়?

আবুল কালাম বললেন, কী আশ্চর্য! চিনতে পারছেন না?

ইসলামুদ্দিন বললেন, চিনেছি। চিনব না কেন? তবে ঠিক…

আপনার দেখাশোনা কে করে?

আমার এক পালকপুত্র আছে। সে-ই করে। তার নাম বক্র।

নাম বক্র? সে কোথায়?

দিনেরবেলা সে নদীর তলে থাকে। সন্ধ্যাবেলা উঠে আসে। সারারাত থাকে আমার সঙ্গে।

আপনার কথা কিছুই বুঝলাম না। নদীর নিচে থাকে মানে কী?

আমি নিজেও ঠিক জানি না। সে মানুষ না, অন্যকিছু।

আবুল কালাম বললেন, অন্যকিছুটা কী?

ভূত হতে পারে।

ভাই, কিছু মনে করবেন না, আপনার তো মনে হয় মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।

ইসলামুদ্দিন বলেন, হতে পারে। আমার স্ত্রী যখন সাপের কামড়ে মারা গেল, তখন একবার মাথা খারাপ হয়েছিল। বছরখানিক ছিল। তখন পশুপাখির কথা বুঝতে পারতাম।

এখন পারেন?

না। পারি না।

ভূতের কথা তো মনে হয় বুঝতে পারছেন। ঐ ভূতটা কই?

সন্ধ্যার পর আসবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলে দেখতে পারবেন। ভালো ছেলে।

আবুল কালাম বললেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকব না। আমি এখনি বিদায় হব। আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন আছে? যাদের খবর দিলে আপনাকে নিয়ে যাবে। দেখাশোনা করবে।

তেমন কেউ নাই। তার প্রয়োজনও নাই। ছেলে আছে। ছেলে আমাকে দেখছে।

ভূতটার কথা বলছেন?

জি।

আপনার অবস্থা দেখে খুবই মনে কষ্ট পেলাম। কিছু টাকা এনেছিলাম। দশ হাজার। টাকাটা রাখেন।

ইসলামুদ্দিন বললেন, ভিক্ষাবৃত্তি এখনো শুরু করি নাই। ছেলে চায়ও না আমি ভিক্ষা করি। সে সন্ধ্যাবেলা নদী থেকে মাছ ধরে আনে। আগুনে পুড়িয়ে লবণ মাখিয়ে দেয়। তাই খেয়ে শুয়ে পড়ি। সে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ায়।

টাকাটা রাখবেন না?

না।

আমি কি এখন চলে যাব?

আপনার ইচ্ছা।

আবুল কালাম সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে গেলেন। তিনি কিছুই দেখলেন না। তবে লক্ষ করলেন, ইসলামুদ্দিন অদৃশ্য কারো সঙ্গে বিড়বিড় করছেন। হাসছেন।

ইসলামুদ্দিন বললেন, বক্র জিজ্ঞেস করছে আপনি রাতে খাবেন কি-না। রাতে যদি খান তাহলে বড় একটা মাছ ধরে আনবে।

আবুল কালাম উঠে দাঁড়ালেন। একটা উন্মাদ মানুষের সামনে বসে থেকে তার কথা শোনার কোনো মানে হয় না।

আকাশে পৌষ মাসের চাঁদ উঠেছে। ইসলামুদ্দিন চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কাছেই কোথাও বক্ত আছে। রাতের খাবারের আয়োজন করছে। ভাবতেই ভালো লাগছে। মাছ পোড়াবার জন্যে আগুন তাকে জ্বালতে হবে। বক্র আগুন ভয় পায়।

ইসলামুদ্দিন ডাকলেন, বাবা বক্র!

হুঁ।

শুকনা লতাপাতা কিছু আন। আগুন করব। শীত লাগছে।

আচ্ছা।

আগুনে হাত মেলে ইসলামুউদ্দিন বসে আছেন। অনেকটা দূরে বসেছে বক্র। বক্র বলল, গল্প বলুন।

ইসলামুদ্দিন আগ্রহ নিয়ে গল্প শুরু করলেন, আমার স্ত্রী অর্থাৎ তোর মার নাম ছিল নীলিমা। নীলিমা নামের অর্থ নীল। নীলের ইংরেজি কী বল তো, দেখি মনে

আছে কি-না।

বুলু।

বুলু না। ব্লু। BLUE. বল ব্লু

ব্লু।

এই তো হয়েছে। আচ্ছা এখন শোন, তোর মাকে নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকলাম, মনটা একটু খারাপ। কারণ তোর মার দিকে তাকিয়ে দেখি সে কাঁদছে। আমার মনে হলো স্বামী পছন্দ হয় নাই এইজন্যে সে কাদছে। আমি বললাম, নীলিমা, কেঁদো না। বলার সঙ্গে সঙ্গে কান্না বন্ধ করে সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। এক জীবনে কত মানুষকে হাসতে দেখলাম, কিন্তু তোর মার মতো সুন্দর করে কাউকে হাসতে দেখলাম না।

ইসলামুদ্দিনের চোখে পানি এসে গেছে। বক্র একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় সে বলল, বাবা, কাঁদবা না। হাসো! হাসো।

ইসলামুদ্দিন চোখ মুছলেন। হাসলেন।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x