বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড আয়োজিত সেমিনারে পঠিত বক্তৃতা

মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার তরুণ বন্ধুগণ! আজকের এই সভায় যোগদানের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি এবং এজন্য এই সভার আহ্বায়ক সাহেব ও তাঁর সহকর্মীবৃন্দকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আজকের এই সভায় উপস্থিত সুধীবৃন্দের মধ্যে বোধহয় প্রত্যেকেই একে অন্যের জানা ও চেনা, কিন্তু দু’চার জন ছাড়া অন্য কেউই আমাকে চেনেন না বা আমার সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। অজানাকে জানার স্পৃহা মানুষের চিরন্তন, কোনো আগন্তুক সম্বন্ধেও তাই। আজকের সভায় আমি নবাগত ব্যক্তি। কাজেই আমার পরিচয় জানবার জন্য আপনাদের কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। আপনাদের এই সভায় আমার যোগদানের ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়, আকস্মিক। তাই আমি আমার পরিচয় সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নিতে চাই।

আজকের এই সভায় উপস্থিত জনগণের মধ্যে নামি হলাম সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। কয়েকটি ব্যতিক্রম সম্বন্ধে বলছি।

(১) আমার মনে হয়, আপনারা অনেকেই শহরবাসী, কেউই পল্লীবাসী নন, অন্তত বর্তমানে। বোধ হয় যে, এ সভায় আমি একাই পল্লীগ্রামের অধিবাসী। নিবাস আমার বরিশাল জেলার লামচরি নামক গ্রামে। কোনো শহর-বন্দরে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে আমার কোনো বাসাবাড়িও নেই।

(২) সকলে না হলেও হয়তো আপনারা অনেকেই চাকুরীজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ইত্যাদি ভদ্রজনোচিত কাজে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু আমি হলাম একজন নিম্নশ্রেণীর কৃষিজীবী লোক। একমাত্র কৃষিই আমার উপজীবিকা।

(৩) শিক্ষার ক্ষেত্রে এ সভায় আমি যে অদ্বিতীয়, তা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। কেননা শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার সেকেল, পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। অন্য কোন শিক্ষাপীঠে প্রবেশের সুযোগ আমার হয় নই কখনো এবং সহযোগিতা লাভ করতে পারি নি কোনো শিক্ষকের।

(৪) স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক আমরা। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এবং রাষ্ট্রভাষাও। কিন্তু এ দেশের শিক্ষার মানদন্ড এখনো ইংরেজি। যেমন ম্যাট্টিকুলেট, বি.এ., এম.এ. ইত্যাদি। আজকাল শিক্ষিত মানেই ইংরেজি-শিক্ষিত ব্যক্তি। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় সুপণ্ডিত হলেও আধুনিক সমাজ তাঁকে একবাক্যে শিক্ষিত বলতে ইতস্তত করে, যদি না সে ইংরেজি জানে। কিন্তু এটা সমাজের নিছক হঠকারিতা নয়। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। এ ভাষা না জানা ব্যক্তির পক্ষে বিশ্বমানবের সাথে ভাবের প্রত্যক্ষ আদান-প্রদান সম্ভব নয়। মানুষের জ্ঞান অনুশীলনের প্রায় সমস্ত বই-পুস্তক রয়েছে ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজি ভাষা না জানা কোন ব্যক্তির পক্ষে কোন বিষয়েই উচ্চতর জ্ঞান লাভের সম্ভাবনা নেই। বাংলা সাহিত্যের বাজারে ইংরেজি গ্রন্থের কিছু কিছু অনুবাদ গ্রন্থ আমদানি হয়েছে বটে, কিন্তু তা আবশ্যকের তুলনায় নেহায়েত কম। তাই উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বাংলাবাসীর বা বাংলাভাষীর এখনো কথায় কথায় বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। বাংলাভাষী না থাকলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইংরেজি ভাষা উঠিয়ে দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে যাবে।

এহেন ইংরেজি ভাষার সাথে আমার পরিচয় নেই মোটেই। কায়ক্লেশে সহজ বাংলা ভাষা পড়ার অভ্যাস করেছিলাম আমাদের গ্রামের একজন পুঁথিপাঠকের কাছে, মোক্তল হোসেন ও সোনাভানের পুঁথি পড়ে। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার কোন সুযোগ আমার হয়নি কখনো। বাংলা ভাষার বেলায় না বললেও দু’চারটে ইংরেজি শব্দ দেখতে পারেন, তা অন্যকে দিয়ে লেখানো।

জীবনের ৭৭টি বছর অতিবাহিত করেছি কৃষিকাজ ও তাঁর ফাঁকে ফাঁকে সামান্য পড়াশুনা করে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিন্দুমাত্র আলোও পৌঁছেনি আমাদের গ্রামখানিতে। বরং অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার প্রভৃতি অজ্ঞানতার অন্ধকারে গ্রামখানি আচ্ছন্ন। আর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামেই আমি বাস করে আসছি অহর্নিশ গরু-মোষের সাহচর্য নিয়ে।

সচরাচর দেখা যায়, অনুন্নত গ্রামগুলোই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে ভরপুর। আমাদেরটিও তার ব্যতিক্রম নয়, তা আগেই বলেছি। কিন্তু আশৈশব আমার মনটি ছিল যুক্তিবাদী। তাই আমি ছিলাম, আজও আছি, ,আমাদের গ্রামের জনগণের মধ্যে একটু ব্যতিক্রমও। বলা যায় বেয়াড়া গোছের।

গ্রামের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি ও আখ্যানগুলোকে যুক্তিবাদের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে গিয়ে আমার মনে কতগুলো জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিল এবং সত্যসন্ধানের অদম্য স্পৃহায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি ‘সত্যের সন্ধান’ নামে একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক লিখেছিলাম বিগত ১৩৫৮ সালে। মনের কথা কলমকে দিয়ে বলাবার সময় আমার ক্ষমতার অভাব। তদুপরি লিখতেও জানি না ভালভাবে। তবুও লিখেছি অন্তরের এক অজানা আবেগবশে। তা যেন দন্তহীন শিশুর মিছরি খাবার মতো – চিবুতে না পেরে চুষে খাওয়া। বহু বাধা-বিপত্তির মধ্যে উক্ত পুস্তকখানা দীর্ঘ ২২ বছর পর ১৩৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আজও আমি সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন নই। তার কিঞ্চিৎ আভাস দিয়েছি উক্ত পুস্তকখানার ভূমিকায়।

আলোচ্য পুস্তকখানা গোষ্ঠিবিশেষের গাত্রদাহের কারণ হলেও সুধীমহলে বিশেষভাবে সমাদর লাভ করেছে। আমার মনে হয় আপনাদের সভায় আমাকে অংশগ্রহণের সুযোগ এনে দিয়েছে আমার ক্ষুদ্র পুস্তকখানাই।

যদিও আমি মুক্ত মন ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী নই, তবুও উক্ত গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিদের নামি আন্তরিক ভালোবাসি। আর আমার সেই ভালোবাসার প্রতিদানেই পেয়েছি আমি ঢাকাস্থ কিছু সংখ্যক বিদগ্ধমনার সাথে মেলামেশার সুযোগ। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ধারক ও বাহক হল মানুষের গতানুগতিকতা এবং তা মানব সমাজের প্রগতির পরিপন্থী। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের মূল উৎস উদঘাটন করে জনগণের দৃষ্টিগোচর করানোর উদ্দেশ্যে ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামে আমি সম্প্রতি আর একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক লিখেছি। এ পুস্তকখানাও মুদ্রিত হয়েছে। তবে এখনো প্রকাশিত হয়নি। আমি আশাকরি সুধী পাঠকবৃন্দ উক্ত পুস্তিকা দু’খানা গ্রহণ করবেন আমার লেখার উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং সমালোচক বন্ধুগণ সমালোচনা করবেন আমার মূঢ়তাজনিত ত্রুটিগুলোকে ক্ষমার চোখে দেখে। তা শুধু আশা নয়, নিবেদনও।

স্থানীয় গ্রামীণ সমাজে ভুক্ত থেকেও আমি গুরুবাদীর সমাজের সামিল হতে না পারায় প্রাণঘাতী বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নিতান্তই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। এমতাবস্থায়, ‘সুধীবৃন্দ তাঁদের এই মূঢ় সেবকের প্রতি কৃপাদৃষ্টি রাখলে উপকৃত হবো – এ আশা নিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।

১. মানুষের পক্ষে

২. নিবেদন

৩. সৃষ্টি রহস্য

৪. ম্যাকগ্লেসান চুলা

অপ্রকাশিত

৫. কৃষকের ভাগ্য গ্রহ

৬. সীজের ফুল

৭. সংক্ষিপ্ত জীবন বাণী

৮. ভাষণ সংকলন

৮.১ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ভাষণ

৮.২ বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড সেমিনারে ভাষণ

৮.৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৪ নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৫ গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৬ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৭ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.৮ মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা সেমিনারে ভাষণ

৮.৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ভাষণ

৮.১০ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ

৮.১১ বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১২ বাংলাদেশ কুটির শিল্প সংস্থায় ভাষণ

৮.১৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.১৪ বাংলাদেশ দর্শন সমিতিতে ভাষণ

৮.১৫ বার্ষিক বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১৬ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীতে ভাষণ

৮.১৭ বাংলা একাডেমীর সংবর্ধনা ভাষণ

৮.১৮ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ

৯. নির্ঘণ্ট

১০. বিভিন্ন আলোকচিত্র

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x