পিতৃতন্ত্র প্রণয়ন করেছে বিপুল পরিমাণ আইন বা বিধিবিধান, যার এক নৃশংস অংশ সুপরিকল্পিতভাবে বানানো হয়েছে নারীদের পীড়নের জন্যে। পিতৃতন্ত্রের আইনসংশ্রয়টি তার বলপ্রয়োগ সংস্থা, যার বিধিগুলো এক বহুমুখি হিংস্র খড়গ, যা নারীর জীবনের দিকে উদ্যত হয়ে আছে কয়েক হাজার বছর ধরে, এবং ওই খড়গের ধারাবাহিক বলি নারী। ওই বিধিগুলো তৈরি করেছে পুরুষ, তৈরির সময় নারীর কোনো বক্তব্য শোনে নি; নারী সম্পর্কে প্রথম থেকে শেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুরুষ, তার শাস্তির সব বিধি প্রণয়ন করেছে নারীবিরোধী পুরুষতন্ত্র। পুরুষ নিজে প্রণয়ণ করেছে ওই নিষ্ঠুর সংহিতাগুলো, নারীকে স্থান দিয়েছে দণ্ডিতের শ্রেণীতে; ওই বিধিগুলোকে প্রচার করেছে ঐশী ব’লে। পুরুষ তার পুরুষ বিধাতার হাতে লিখিয়ে নিয়েছে নিজের রচনা; বিধাতা হয়ে উঠেছে। পুরুষের প্রস্তুত বিধানের শ্রুতিলিপিকর। পুরুষ একই সাথে নারীর বিরুদ্ধে বাদী, বিধিরচয়িতা ও বিচারক: নারীর তাতে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নেই। পলা দ্য লা বার বলেছেন, ‘পুরুষেরাই প্রণয়ন করেছে সমস্ত আইন, তাই তারা পক্ষপাত দেখিয়েছে নিজেদের লিঙ্গের প্রতি, আর বিচারকেরা ওই সমস্ত বিধিবিধানকে উন্নীত করেছে নীতির স্তরে’ [দি দ্য বোভোয়ার (১৯৪৯, ২২)]। পুরুষ জানে তার তৈরি বিধি নারীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, নারী মেনে নেবে না ওই দণ্ডাদেশ; তাই পুরুষ সেগুলোকে ঘোষণা করেছে ঐশী, এবং পুরুষাধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের স্বর্গীয় শাশ্বত অধিকার ব’লে। পুরুষের লেখা বিধিবিধানে নারী চিরদণ্ডিত। পৃথিবীর নারীসমাজ এখন প্রধানত পাঁচ ধরনের আইনের অধীনে জীবনদণ্ড ভোগ করছে, যার মাঝে চারটিকে বলা যায় সনাতন, যেগুলোর উৎস ধর্ম ; হিন্দু আইন, ইংরেজি সাধারণ আইন [ইংলিশ কমন ল], রোমান আইন [রোমান ল], ইসলামি আইন [শরিয়া]; আর পঞ্চম ধরনের আইনগুলো প্রণীত হয়েছে এ-শতকে, যেগুলো চলছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে। পুরোনো সমস্ত আইন নারীকে পীড়নের জন্যেই তৈরি করা হয়েছিলো, ওগুলোর লক্ষ্য ছিলো নারীকে মানুষের স্তরে উঠতে না দেয়া; আর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিধিবিধান যদিও নারীকে দিয়েছে প্রচুর স্বাধীনতা ও অধিকার, তবু নারী সেখানেও মানুষেব স্বাধীনতা ও অধিকার পায় নি। পুরুষের তৈরি আইনে পুরুষের সুবিধার শেষ নেই, পুরুষের সুবিধার সাম্রাজ্যে সূৰ্য কখনো অস্ত যায় না; আর নারীর অসুবিধার অমারাত্ৰিও কখনো কাটে না। পিতৃতন্ত্রের বিধিবিধানের খড়গের নিচে বেঁচে আছে চিরদণ্ডিত নারী।

নারীর প্রতিদিনের জীবন শৃঙ্খলিত যে-আইনের শেকলে, তা হচ্ছে ব্যবহারিক বা অধিকার বিধিগুলো [সিভিল ল], বিশেষ ক’রে বিবাহ ও পারিবারিক বিধিগুলো। এর কিছু প্রথা হিশেবে চলে এসেছে, কিছু বিধিবদ্ধ হয়েছে; তবে এগুলো নারীর জীবনকে পরিণত করেছে নরকে। অধিকার আইনেই বিধিবদ্ধ হয়ে আছে নারী কখন কীভাবে বিয়ে বসতে বা করতে পারবে, কীভাবে বিয়ে ভাঙতে পারবে না বা পারবে, সন্তানের ওপর তার অধিকার কতোটা, সে কী ধরনের সম্পত্তির মালিক হ’তে পারে না বা পারে, ওই সম্পত্তির ওপর তার কতোটা অধিকার থাকবে, কী কী শর্তে সে ব্যবসাবাণিজ্যে জড়িত হতে পারে, বিধবা অবস্থায় সে হতে পারে কতোটা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, বিয়ে ভেঙে গেলে সে কতোটা ধন দাবি করতে পারে প্রভৃতি। এর সব এলাকায়ই পুরোনো আইন নারীর জন্যে ভয়াবহ, তা সাধারণত নারীর কোনো অধিকার স্বীকার করে না, যদিও এখন নানা সংস্কার করা হচ্ছে। অধিকার আইনগুলো কোনো সুসংবদ্ধ সংহত বিধি নয়, এগুলো বিচিত্র বিভীষিকাজাগানো বিধির সমষ্টি। এগুলোর ভেতরে রয়েছে। নানা স্ববিরোধিতা; হয়তো সংবিধানে উচ্চকণ্ঠে নারীকে দেয়া হয়েছে। পুরুষের সমান অধিকার, কিন্তু বিয়ের আইনে চুপচাপ বিধিবদ্ধ হয়েছে যে স্ত্রী স্বামীর দাসী, বা নারীকে দেয়া হয় নি ভোটাধিকার, এমনকি নিজের ইচ্ছেমতো বাইরে বেরোনোর অধিকার। নারীর আইনগত অধিকার এখনো অনেক কম পুরুষের তুলনায়। ওই পুরোনো আইনগুলো বিভিন্ন ব্যাপারে পোষণ করে বিভিন্ন বিরোধী বিশ্বাস, কিন্তু এক ব্যাপারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গভীর ঐক্য, সেটা নারীপীড়নে; নারীপীড়নে সব বিধিই সমান নির্মম। কয়েক হাজার বছর ধরে এ-বিধিপুঞ্জ নারীকে যেভাবে পীড়ন করেছে, ক্রীতদাসদেরও ততোখানি পীড়ন করা হয় নি। ওই আইনে কেড়ে নেয়া হয়েছে নারীর সব মানবিক ও সামাজিক অধিকার, এমনকি নিজের শরীরের ওপর তার নিজের অধিকার। পুরুষতন্ত্রের খড়গের নিচে নারী যাপন করেছে রক্তাক্ত জীবন, কিন্তু তাকে হাহাকার করার আইনগত অধিকারও দেয়া হয় নি।

পিতৃতন্ত্রগুলোর মধ্যে মানুষ ও নারীর বিরুদ্ধে সৰ্বগ্রাসী ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে নিপুণ হিন্দু পিতৃতন্ত্র। অন্যরা যা করেছে বলপ্রয়োগে, হিন্দু পিতৃতন্ত্র করেছে যেনো মন্ত্রপ্রয়োগে; নিষ্ঠুরতম শোষণপীড়নকেও তারা ব্ৰহ্মার বিধান ব’লে গ্রহণযোগ্য ক’রে তুলেছে। হিন্দু পিতৃতন্ত্রে সমাজের অধিকাংশ মানুষই বলি; এবং নারী ওই খড়গের নৃশংসতম বলি। যে-সমস্ত বিধি দিয়ে কয়েক হাজার বছর ধ’রে হিন্দুনারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তার অধিকাংশই প্রথাগত; ওই সমাজে ঋষির পর ঋষি জন্ম নিয়েছে, ব্ৰহ্মার সাথে আলাপ ক’রে এসে তারা বিধান লিখেছে, এবং সবাই মিলে নারীকে ক’রে তুলেছে পুরুষের শিকার। হিন্দু বিধানগুলো নারীপীড়নের স্বর্গীয় অনুমতিপত্র। হিন্দু আইনের প্রধান উৎস বেদ; হিন্দুরা যেমন পুরুষের তৈরি সমস্ত কিছুকেই ব্ৰহ্মার মুখনিসৃত ব’লে প্রচার করেছে, তেমনি আইনকেও ক’রে তুলেছে ঐশ্বরিক, চিরন্তন, শাশ্বত, অবিনাশী। হিন্দু আইনের প্রথম ও প্রধান প্রণেতা মনু। মনু দাবি করেছেন যে ব্ৰহ্মা প্রথম আইন প্রণয়ন ক’রে তাকে শেখায়, এবং তিনি সে-আইন শেখান মরীচি ও অন্য ন-জন ঋষিকে [দ্র মনুসংহিতা, ১১:৫৮]। বেদ, শ্রুতি, ভাষ্য, প্রথার সমষ্টি হচ্ছে হিন্দু আইন। হিন্দু আইনে নারীর কোনো মূল্য নেই, নারী অস্থাবর সম্পত্তিমাত্র; নারী কোনো সম্পত্তির মালিক হতে পারে না, পারে না সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে। পিতৃতন্ত্র নারীকে অস্তিত্বহীন করার জন্যে যে-ফাঁদটি পেতেছে, এবং যাতে ঢুকতে বাধ্য করেছে, তার নাম বিবাহ। মনু [৯:২২] বলেছেন, ‘নদী যেমন সমুদ্রমিলনে লবণায়ু হয়, নারীও তেমন; যেমন পুরুষের সাথে বিবাহিত হয় তেমন গুণযুক্ত হয়।’ নারী নির্গুণ, আর পুরুষ গুণের মহাসাগর, যেখানে অস্তিত্ব হারিয়ে নারী ধন্য হয়। বিয়ে হচ্ছে নারীর অস্তিত্বলোপ; এ-বিষয়ে হিন্দু ও খ্রিস্টান একমত। হিন্দু পিতৃতন্ত্রে নারীকে বিয়ের ফাঁদে আটকে রাখার সুপরিকল্পিত বিধি তৈরি করা হয়েছে। মনু [২:৬৭] বিধান দিয়েছেন :

বৈবাহিকো বিধিঃ স্ত্রীণাং সংস্কারো বৈদকঃ স্মৃতঃ। ।
পতিসেবা গুরৌবাসো গৃহার্থোহগ্নিপরিক্রিয়া৷
বিয়েই নারীর বৈদিক উপনয়ন,
পতিসেবা হচ্ছে গুরুগৃহবাস, এবং গৃহকর্মই
প্রভাত ও সন্ধ্যায় হোমস্বরূপ অগ্নিপরিচর্যা।

হিন্দু নারীর অধিকার নেই কোনো কিছুতে; মন্ত্রে নেই, শিক্ষায় নেই, ধর্মে নেই। ব্ৰাহ্মণ বালকের জীবনে উপনয়ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, উপনয়ন তার সামনে বিদ্যা ও ধর্মের পথ খুলে দেয়; কিন্তু নারীর উপনয়নের অধিকার নেই, তাই নারী বেদপাঠ করতে পারে না, পুজোয় উৎসর্গ করতে পারে না। [ দ্র দ্বারকানাথ (১৯১৩, ৯৬-৯৭)]। বিয়েই তার জীবনকারাগার। বঙ্কিম ‘দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন’ [লোকরহস্য, ১৮৭৪] নামে একটি কৌতুককর রচনা লিখেছিলেন, কিন্তু নারীর চোখে দেখলে রচনাটিকে মনে হয় বেদনাদায়ক; পুরুষের জন্যে যা কৌতুক, নারীর জন্যে তা মৃত্যু। ‘পূৰ্ব্বজন্মকৃত পাপের জন্য পুরুষের প্রায়শ্চিত্তবিশেষকে বিবাহ বলে’ সংজ্ঞাটিকে একটু বদলে পুরুষের জায়গায় ‘নারীর’ বসালেই সংজ্ঞাটি হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর সত্য। বঙ্কিম বলেছেন, ‘অধীন যে সচল অস্থাবর সম্পত্তি, তাহাকে স্বামী বলা যায়’ : উনিশশতকের ঋষির সংজ্ঞা কৌতুক; কিন্তু সনাতন ঋষিাদের সংজ্ঞায় স্ত্রী স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তিই। তা লোকরহস্য নয়, কয়েক হাজার বছরের মর্মান্তিক সত্য। নারী অসম্পূর্ণ মানুষ, যার শক্তি নেই নিজেকে রক্ষার। হিন্দু ঋষিরা ও বাইবেলের সন্তরা এ-বিষয়ে একমত; নারীকে তারা বিন্যস্ত করেছেন শিশু ও উন্মাদের শ্রেণীতে। মনুর [৯:৩] বিধানে নারী চিরস্বাধিকারহীন অসহায় শিশু:

পিতা রক্ষতি কৌমারে ভৰ্ত্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষন্তি স্থবিবে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।

নারীকে কুমারীকালে পিতা, যৌবনে স্বামী
ও বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা কববে,
নারী কখনোই স্বাধীন থাকার যোগ্য নয়।

হিন্দুবিধানে বিয়ে বাধ্যতামূলক নারীর জন্যে, যে-প্রক্রিয়ায় নারীকে পরিণত করা হয় দাসীতে। কোনো নারী যদি অবিবাহিত থাকতে চায়, তবে হিন্দু পিতৃতন্ত্র তার ওপর চরম প্রতিশোধ নেয়; নারী ম’রেও বিয়ের শেকল থেকে মুক্তি পায় না।

মহাভারত-এ সুভরূ, ঋষি কুণির কন্যা, চিরকুমারী থাকে; মৃত্যুশয্যায় সে জানতে পারে যে সারাজীবন ধৰ্মপালন করেও সে স্বর্গে যেতে পারবে না, কেননা বিয়ের দ্বারা তার দেহ পবিত্র হয় নি। তাই অসহায় মুমূর্ষ কুমারীটি এক ঋষিকে বিয়েতে রাজি করিয়ে একরাত্রি তার সাথে কাটিয়ে স্বর্গে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। একটি সূত্রে রয়েছে কুমারী নারী মারা গেলেও তার লাশকে বিয়ে দিতে হবে, তারপরই হবে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া [দ্ৰ আলতেকার (১৯৫৯, ৩৩)]। পুরুষ দ্বারা দূষিত না হওয়া পর্যন্ত নারী পরিশুদ্ধ হয় না। বিয়ে দিতেই হবে, মানুষ না হ’লে বস্তুর সঙ্গে; যেমন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির প্রতিভাবান বিদ্রোহী তরুণী সরলা যখন কুমারী থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আলোড়ন তৈরি হয়ে যায়। স্বামী ছাড়া কী ক’রে থাকতে পারে একটি নারী, যতোই মেধাবী হোক? মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পুরুষতন্ত্রের মহিমা রক্ষার জন্যে মেয়েটিকে বিয়ে দিতে চান একটি খাপখোলা তলোয়ারের সাথে। তলোয়ারের সাথে পুরুষের বা পুরুষাঙ্গের মিল খুবই স্পষ্ট। হিন্দু বিয়ের অর্থ হচ্ছে নারীটির জন্যে জন্মজন্মান্তর ধ’রে একটি পুরুষ, এবং পুরুষটির জন্যে জন্মজন্মান্তর ধ’রে বহু নারী। হিন্দুপুরাণে বহুপতির কথা আছে, নারীদের কামোত্তেজনার মুহূর্তে যাকেতাকে আহ্বান করে গর্ভবতী হওয়ার কথাও আছে, কিন্তু হিন্দু বিয়ে হচ্ছে স্বামীর অধীনে নারীর কঠোর দাসীত্ব। স্বামীব প্ৰভুত্ব নিশ্চিত করার জন্যে ঋষিরা শ্লোকের পর শ্লোক লিখে স্বামীকে উত্তীর্ণ করেছেন ঈশ্বরের পর্যায়ে। স্বামী শব্দটিই বোঝায় ঈশ্বর। মনু [৫:১৫২] বলেছেন : ‘বিয়েতে যে বাগদান করা হয়, তাতেই নারীর ওপর পতির স্বামিত্ব জন্মে; সুতরাং স্বামীর সেবা করা নারীর কর্তব্য।’ এক শ্লোক পরেই তিনি বিধান দিয়েছেন :

পতি সদাচারহীন, পরদাররত বা গুণহীন হ’লেও সাধ্বী স্ত্রী পতিকে দেবতার মতো পুজো করবে [৫:১৫৪]

স্ত্রীদের স্বামী ছাড়া পৃথক যজ্ঞ নেই, পতির অনুমতি ছাড়া কোনো ব্ৰত বা উপবাস নেই। শুধু স্বামীসেবার সাহায্যেই নারী স্বৰ্গে যাবে [৫:১৫৫]।

স্বামীকে ক’রে তোলা হয়েছে গৃহের দেবতা, তবে গৃহে কোনো দেবী নেই, রয়েছে দাসী; দাসী স্ত্রীটি। স্বামীগৃহে নারীকে দাসী ক’রে রাখার বিধান দিয়েছেন মনু [৯:৩] সুচিন্তিত বাক্যে : ‘স্বামী ও স্বজনগণ স্ত্রীলোকদের দিবারাত্রির মধ্যে কখনো স্বাধীনভাবে থাকতে দেবেন না; কাজে ব্যস্ত রেখে সব সময় তাদের নিজেদের বশে রাখবেন।‘ হিন্দুবিধানে স্বামী কখনো মারা যায় না, স্বৰ্গলোকে যায়; তাই তার স্বৰ্গযাত্রার পরও নারী আর কোনো পুরুষের কথা ভাবতে পারবে না। মনু বলেছেন : ‘পতির মৃত্যু হ’লে স্ত্রী পবিত্র পুষ্পফলমূল দিয়ে অল্পাহারে দেহ ক্ষয় করবে, তবু পরপুরুষের নাম করবে না।’ [৫:১৫৭]; এবং যদি পরপুরুষের নাম নেয়, তাহলে রয়েছে শাস্তি : ‘পরপুরুষ উপভোগের ফলে নারী ইহকালে নিন্দিত হয়, পরকালে শৃগালযোনিতে জন্ম নেয় ও নানা পাপরোগে আক্রান্ত হয়’ [৫:১৬৪]। নারীটি তো আর পরপুরুষের নাম নেবে না, কিন্তু পুরুষটি কী করবে? মনু [৫:১৬৮] নিশ্বাসপ্রশ্বাসের মতো সহজ বিধান দিয়েছেন : ‘ভাৰ্যার মৃত্যু হ’লে দাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ ক’রে পুরুষ আবার বিয়ে ও অগ্ন্যাধ্যান করবে।‘ পুরুষ কখনো কামবিরহিত থাকবে না, থাকবে নারী।

হিন্দুবিধানে নারীর মূল্য নারী হিশেবে নেই, স্ত্রী হিশেবেও নেই। তবে নারী দরকারী, কেননা সে সম্ভোগের বস্তু—‘রতিরুত্তমা’; এবং দরকারী কেননা এ-জন্তুটি উত্তরাধিকারী প্রসব করে। মনু [৯:২৬] বলেছেন : ‘সন্তান উৎপাদনের জন্যে স্ত্রীরা বহুকল্যাণভাগিণী, গৃহের দীপ্তি ও পূজনীয়া।’ স্ত্রীর সমস্ত কৃতিত্ব হচ্ছে প্রজনন। তাদের কাজ পিতার উত্তরাধিকারী, এবং পুত নরক থেকে ত্রাণকারী, পুত্র জন্ম দেয়া; কন্যা জন্ম দেয়া অপরাধ। আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে : ‘পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়াই নারীর প্রধান কর্তব্য’; মৈত্রায়নী সংহিতায় বলা হয়েছে: ‘নারীর প্রকৃষ্ট কর্তব্য হচ্ছে পুত্র উৎপাদন করা’ [দ্র সুকুমারী (১৯৮৯)]। কন্যা শুধু হিন্দুসমাজেই নয়, সব সমাজেই অবাঞ্ছিত; তবে হিন্দু পিতৃতন্ত্র কন্যাকে ভয় পেয়েছে ও অসহায় ক’রে রেখেছে সবচেয়ে বেশি। অথর্ববেদ-এ পুত্ৰলাভের ও কন্যানিরোধের মন্ত্র রয়েছে। কন্যানিরোধ না ক’রে কোনো উপায় ছিলো না; হিন্দু পিতৃতন্ত্র তার বিধিবিধানে নারীর জীবনকে এমন নারকীয় ক’রে তুলেছিলো যে কন্যা কামনাই ছিলো নিষ্ঠুরতা। মেয়েকে লেখাপড়া শেখানো যাবে না, বিয়ে দিতে হবে শৈশবে [তিরিশ বছরের পুরুষ বারো বছরের কন্যাকে বিয়ে করবে; চব্বিশ বছরের পুরুষ আট বছর বয়সের কন্যাকে বিয়ে করবে, নইলে ধর্ম নষ্ট হয়: [মনুসংহিতা, ৯:৪], কিন্তু আন্তবর্ণ বিয়ে নিষিদ্ধ ব’লে বর পাওয়া যাবে না, সে কোনো কিছুর উত্তরাধিকারী হবে না, স্বামীর মৃত্যু হ’লে তাকে আর বিয়ে দেয়া যাবে না, তাকে তুলে দিতে হবে স্বামীর চিতায়, হিন্দু পিতৃতন্ত্রে এ হচ্ছে নারীর সম্পূর্ণ জীবনী।

হিন্দু পিতৃতন্ত্রে তিন প্রধান পিতা, স্বামী, ও প্রভু; তাদের বর্তমানে কেউ সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। মনু [৮:৪১৬] বলেছেন : ‘ভাৰ্যা, পুত্র, ও দাস শাস্ত্রানুসারে অধম, তাই তারা যে-ধন উপার্জন করবে, তাতে তাদের অধিকার থাকবে না; তারা যার, ওই ধন হবে তার।’ স্ত্রী, পুত্র, দাস হচ্ছে স্বামী, পিতা, প্রভুর সম্পত্তি; তাই তারা সম্পত্তির মালিক হ’তে পারে না মালিকের জীবনকালে; এবং স্ত্রী ও দাস মালিক হ’তে পারে না কখনোই। পুত্ৰই যখন পিতার বর্তমানে নিজেরই অর্জিত ধনের মালিক হ’তে পারে না, তখন কন্যার ধনে অধিকারের কথাই ওঠ না ব’লে শ্লোকে মনু কন্যার উল্লেখও করেন নি। কন্যা উল্লেখযোগ্যও নয়। সে কোনো ধন উপার্জন করতে পারতো না; তবে পিতা তাকে স্বামীর কাছে বিক্রি ক’রে ধন অর্জন করতে পারতো। কন্যা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য নয়, যদি পিতার কোনো পুত্র থাকে। আদিকালে কোনো ভাই না থাকলে বোন উত্তরাধিকারী হতে পারতো। পিতার সম্পত্তির। তবে ভাইহীন নারীটি পিতার সম্পত্তি পেয়ে যে সুখের সাগরে ভাসতো, তা নয়; ওই ধন অভিশাপ হিশেবে দেখা দিতো তার জীবনে, কেননা অধিকাংশ সময় ভাইহীন নারীর বিয়েই হতো না। অপুত্ৰক পিতা পুত্রের শোকে কন্যাটিকেই ঘোষণা করে যেতো পুত্র হিশেবে; এবং নিজের বংশ রক্ষার জন্যে এমন ব্যবস্থা ক’রে যেতো যে ওই মেয়েটির প্রথম পুত্ৰ চ’লে আসবে মাতামহের বাড়ি, রক্ষা করবে তাঁর বংশ। পুত্র ও স্বৰ্গ হারানোর ভয়ে পুরুষেরা অমন মেয়েকে বিয়ে করতেই রাজি হতো না। তবে পুত্র থাকুক বা না থাকুক। মনু, বশিষ্ঠ, গৌতম কন্যার উত্তরাধিকার একেবারেই স্বীকার করেন নি। যাজ্ঞবল্ক, বৃহস্পতি, নারদ কন্যার কিছুটা উত্তরাধিকার স্বীকার করেছেন। ভাই থাকলে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকারের কথাই ওঠে না, খ্রিপূ ৩০০ অব্দ থেকে হিন্দু আইনে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার কোনো অধিকার নেই। পিতার বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে নারী যায় স্বামীগৃহে; এবং সেখানে সে পরিণত হয় আরেকজনের সম্পত্তিতে। স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি, তাই স্ত্রীর কোনো সম্পত্তির অধিকার নেই, সে কোনো সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। মৈত্রায়নী সংহিতায় বিধান দেয়া হয়েছে : ‘সম্পত্তিতে নারীর কোনো অধিকার থাকবে না’; বলা হয়েছে : ‘স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর কোনো অধিকার থাকবে না ; হিন্দু স্ত্রীর শোচনীয় পরিণতি হচ্ছে বিধবা, যার জীবনেরই অধিকার ছিলো না, তাই তার সম্পত্তিতে অধিকারের কথা ভাবাও হাস্যকর। খ্রি:পূ: ৩০০ অব্দ থেকে কন্যা ও বিধবা পিতা ও স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত। বেদ আর অধিকাংশ ধর্মসূত্র বিধবার উত্তরাধিকার অস্বীকার করেছে। বৌধায়ন বিধবার উত্তরাধিকার অস্বীকার করেছে; আপস্তম্ব সাত স্তরের উত্তরাধিকারী বের করেছেন, এমনকি রাজাকে এবং ছাত্রকে উত্তরাধিকারী করেছেন, কিন্তু বিধবাকে করেন নি [দ্র আলতেকার (১৯৫৯, ২৫০-২৭০)]। বিধবার উত্তরাধিকার হচ্ছে সহমরণ, স্বামীর চিতার আগুনে ছাই হওয়া, বা দুৰ্গত কলঙ্কিত জীবন।

বিধবা হিন্দু পিতৃতন্ত্রের দুঃস্বপ্ন, তার খড়গের শোচনীয়তম বলি। ঋষিরা বিধবার জীবনকে অস্বীকার করেছে, আর যখন সে বেঁচে থেকেছে তখন তাকে চূড়ান্ত অপমান করেছে। বিধবাকে সতী নাম দিয়ে দাহ করার ব্যবস্থা করেছে হিন্দুবিধি। জেসাসের জন্মের অনেক আগে থেকেই একটি-দুটি ক’রে হিন্দু বিধবা সহমরণে ও অনুমরণে গেছে, বা যেতে বাধ্য হয়েছে। ৭০০ খ্রিস্টাব্দে থেকে সতীদাহ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আঙ্গরা বলেছেন, বিধবার ধর্ম হচ্ছে সহমরণ; হারীত বলেছেন, সহমরণ বরণ ক’রে স্ত্রী স্বামীকে চরম পাপ থেকে উদ্ধার করতে পারে। সতীদাহবাদীদের পবিত্র যুক্তি রামমোহন রায় ‘সহমরণ বিষয় প্ৰবৰ্ত্তক ও নিবৰ্ত্তকের সম্বাদ’-এ (১৮১৮, ৩-৪) দিয়েছেন প্রবর্তকের মুখে :

স্বামী মরিলে পর যে স্ত্রী এ পতির জ্বলন্ত চিতাতে আরোহণ করে সে অরুন্ধতী যে বশিষ্ঠের পত্নী তাঁহার সমান হইয়া স্বৰ্গে যায়। আর যে স্ত্রী ভৰ্ত্তার সহিত পরলোক গমন করে সে মনুষ্যের দেহেতে যত লোম আছে যাহার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি তত বৎসর স্বৰ্গে বাস করে।….যে স্ত্রী ভৰ্ত্তার সহিত পরলোকে গমন করে সে মাতৃকুল পিতৃকুল এবং স্বামিকুল এই তিন কুলকে পবিত্র করে।…পতি যদি ব্ৰহ্মহত্যা করেন কিম্বা কৃতঘ্ন হয়েন কিম্বা মিত্রহত্যা করেন তথাপি ঐ পতিকে সৰ্ব্বপাপ হইতে মুক্ত করে ইহা অঙ্গিরা মুনি কহিয়াছেন।

সব বিধবা স্বামীর চিতায় ওঠে নি; কিন্তু এক সময় দাবানলের মতো জ্বলে উঠেছিলো সতীদাহের চিতা। এটা প্রথম ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। উত্তর ভারতে ও কাশ্মীরে, প্রধানত রাজপরিবারে। রানীরা, এমনকি উপপত্নীরা, দলেদলে রাজাদের চিতায় উঠে সতী হ’তে থাকে। উত্তর ভারতের রাজপুতদের মধ্যে সতীদাহের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিলো বর্ণাঢ্য মড়করূপে। মারওয়ারের রাজা অজিত সিংহের চিতায় (১৭২৪) উঠেছিলো ৬৪টি সতী, পানিতে ডুবে বুন্দির রাজা বুধ সিং মারা গেলে তার চিতায় ওঠে ৮৪টি, ১৬২০ অব্দে এক রাজপুত রাজা মারা গেলে তার চিতায় উঠেছিলো ৭০০ সতী। হুমায়ুন ও আকবর সতীদাহ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হয় নি। বাঙলায়ও সতীদাহ ছিলো হিন্দুসমাজের স্বর্গীয় ও পার্থিব সুখের ব্যাপার। ১৮১৫-১৮২৮ সালের মধ্যে বাঙলায় ৩৭৮+৪৪২+৭০৭+৮৩৯+৬৫০+৫৯৮+৬৫৪+৫৮৩+৫৭৫+ ৫৭২+৬৩৯+৫১৮+৫১৭+৪৬৩=৮১৩৫ জন নারী সতী হয়। এ-সময়ে এতো সতী আর কোথাও হয় নি; বোম্বাই, মাদ্রাজ, এমনকি রক্ষণশীল বেনারসেও হয় নি। হিন্দুবিধি বিধবাকে সম্পত্তির অধিকার দেয় নি, আর নিয়তির পরিহাস হচ্ছে বাঙলায় একটি বিধিই বিধবাকে সম্পত্তির অধিকার দিয়ে তাকে ঠেলে দেয় চিতার আগুনে। দায়ভাগ আইনে বাঙলায় নিঃসন্তান বিধবারাও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো; তাই স্বজনেরা সম্পত্তির লোভে বিধবাদের ঠেলে দিতো স্বামীর চিতায়। সতীদাহের চিতার আগুনের রূপে কিন্তু মুগ্ধ ছিলেন কবিরা; কিশোর বয়সে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ’; এবং চল্লিশোত্তর বয়সে চিতার আগুনের শোভায় ভরে উঠেছিলো তার মন : ‘দাম্পত্যলীলার অবসানদিনে সংসারের কার্যক্ষেত্ৰ হইতে বিদায় লইয়া তেমনি সহজে বধূবেশে সীমান্তে মঙ্গলসিন্দূর পরিয়া পতির চিতায় আরোহণ করিয়াছ। মৃত্যুকে তুমি সুন্দর করিয়াছ, শুভ করিয়াছ, পবিত্র করিয়াছ; চিতাকে তুমি বিবাহশয্যার ন্যায় আনন্দময় কল্যাণময় করিয়াছ’ [বিচিত্ৰ প্ৰবন্ধ, ‘মা ভৈঃ’, ১৩০৯]। পিতৃতন্ত্রের খড়গের ক্ৰোধ থেকে নারীদের বাঁচানোর প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয় উনিশ শতকে, যার সূচনাকারী রামমোহন রায় [১৭৭২-১৮৩৩]। নারীদের মর্মান্তিক পরিণতি ছিলো বিধবা, তাই বিধবাকে বঁচিয়েই রামমোহন শুরু করেন নারীবাঁচানোর আন্দোলন। ১৮২৯ সালে বেন্টিংক সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেন। সতীদাহ নিবারণে বেন্টিংক যে-ভূমিকা নেন, তার জন্যে হিন্দুবিধবার কৃতজ্ঞতা বেন্টিংকের বিশেষভাবেই প্ৰাপ্য।

রামমোহন ও বেন্টিংক হিন্দু বিধবাকে প্ৰাণ দিয়েছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর [১৮২০–১৮৯১] দেয়ার চেষ্টা করেন জীবন। সব বিধবা সহমরণে যেতো না, তবে যারা বেঁচে থাকতো তারা বাঁচতো চরম লাঞ্ছনা, অপমান, কলঙ্কের মধ্যে। বিদ্যাসাগর বিধবাদের বিয়ে দেয়ার আন্দোলন শুরু করেন; অশ্লীল রক্ষণশীলেরা প্রথমে সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে, পরে মেতে ওঠে বিধবার যোনির ক্ষতাক্ষত বিচারে; তবে ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়। বিদ্যাসাগর কিছু বিধবাকে বিয়েও দেন; তবু আজো হিন্দুসমাজ বিধবার বিয়ে মেনে নেয় নি। বিধবার বিয়ের কথা ভাবতে এখনো হিন্দুসমাজের রক্ত জমে বরফ হয়ে যায়; এমনকি নারীরাও বিধবা বিয়ের কথা শুনলে মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম করে। সতীদাহ বন্ধ হয়েছে, কেননা প্রকাশ্য নৃশংসতা বন্ধ করা সহজ; বিধবার এখনো বিয়ে হয় না, কেননা গোপন নৃশংসতা বন্ধ করা কঠিন। বিধবাকে বোঝার মতো সংবেদনশীলতা বা মনুষ্যত্ব হিন্দুসমাজ আজো আয়ত্ত করে নি। অধিকাংশ হিন্দু বিধবার জীবনে দুৰ্গতির শেষ নেই; শ্বশুর বা পিতার পরিবারে তারা যাপন করে লাঞ্ছিত জীবন। তাদের যে-ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে পুরুষতন্ত্র, তা পতিতার; যেনো হিন্দু বিধবা কাম ক্ষুধার্তা নারী, যার দিবসরজনী কাটে নিরন্তর কামযন্ত্রণায়, পুরুষ পেলেই যে লিপ্ত হয় রতিক্রিয়ায়। বালবিধবাদের শারীরিক জ্বালার কথা অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু তারা পুরুষখেকো ডাইনি নয়, পুরুষেরাই বিধবাখের দানব। কোনো পাড়ায় একটি তরুণী বিধবা থাকলে ওই এলাকার সব পুরুষের কাম তাকে ঘিরে জ্বলতে থাকে; এক সময় তা পোড়ায় বিধবাটিকে। বিদ্যাসাগর ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’-এ (১৮৫৫) লিখেছিলেন :

বাল্যকালে যাহারা বিধবা হইয়া থাকে, তাহারা যাবজীবন যে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে, তাহা যাহাদের কন্যা, ভগিণী, পুত্ৰবধু প্রভৃতি অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছেন, তাহারা বিলক্ষণ অনুভব করিতেছেন। কত শত বিধবারা, ব্ৰহ্মচৰ্যনিবাহে অসমর্থ হইয়া, ব্যভিচারদোষে দূষিত ও ভ্রূণহত্যাপাপে লিপ্ত হইতেছে; এবং পতিকুল, পিতৃকুল ও মাতৃকুল কলঙ্কিত করিতেছে। বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত হইলে, অসহ্য বৈধব্যযন্ত্রণা, ব্যভিচারদোষ ও ভ্রূণহত্যাপাপের নিবারণ ও তিনিকুলের কলঙ্ক নিরাকরণ হইতে পারে। যাবৎ এই শুভকরী প্ৰথা প্রচলিত না হইবেক, তাবৎ ব্যভিচারদোষের ও ভ্রূণহত্যাপাপের স্রোত, কলঙ্কের প্রবাহ ও বৈধব্যয়ন্ত্রণার অনল উত্তরোত্তর প্রবল হইতেই থাকিবেক।

বিদ্যাসাগর বিধবার বৈধব্যযন্ত্রণার, এবং তিনটি পাপের কথা বলেছেন : ব্ৰহ্মচৰ্যনির্বাহে অসামৰ্থ ব্যভিচারদোষ, ও ভ্ৰাণহত্যাপাপ। যন্ত্রণাটি সত্যিই বিধবার, কিন্তু পাপ তিনটি বিধবার নয়, নারীলোলুপ পুরুষের। পুরুষেরাই বিধবাদের পরিণত করে সহজ শিকারে। বিধবা মানেই সম্ভাব্য কলঙ্ক, এমন ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো সমাজে; সে যে একদিন কুলত্যাগিনী হবে, এ-বিষয়ে সমাজ ছিলো নিশ্চিত। প্রতিটি বিধবাকে বইতে হয় এমন কলঙ্কের বোঝা, যার জন্যে সে দায়ী নয়। বিধবা সম্পর্কে সমাজের এ-হীন ধারণার প্রতিবাদ করেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘নারীর মূল্য’-এ (১৯২৪)। বিদ্যাসাগরের বক্তব্য কিছুটা তরল ক’রে প্রচার করা হয়েছিলো যে বিধবাদের বিয়ে দেয়া হয় না ব’লে কুলত্যাগিনীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। শরৎচন্দ্র প্রশ্ন করেছেন, ‘কথাটা প্রচার করিবার সময, বিশ্বাস বদ্ধমূল করিয়া লইবার সময়, একবারও সে মনে করিয়াছে কি, কি গভীর কলঙ্কের ছাপ সে নারীত্বের উপর বিনা দোষে ঢালিয়া দিতেছে?” বিধবারা কেনো কুলত্যাগ করে? শরৎচন্দ্ৰ দেখিয়েছেন কামজ্বলায় নয়, বাস্তব দুৰ্গতি সহ্য করতে না পেরেই তারা কুলত্যাগ করে :

ভদ্ৰ-ঘরেক বিধবার অবস্থা ঠিক নীচজাতীয়া সধবার অনুরূপ। তাহাকেও স্বাধীনভাবে কায়িক পরিশ্রম করিয়া জীবিকা অর্জন করিতে দেওয়া হয় না, কারণ তাহাতে পিতৃকুলের বা শ্বশুরকুলের মর্যাদা হানি হয়, অথচ বাড়ির মধ্যে ভদ্ৰ-বিধবার অবস্থা কাহারো অবিদিত নাই। শতকরা সত্তরজন হতভাগিনী অন্ন-বস্ত্রের অভাবে এবং আত্মীয়-স্বজনের অনাদর, উপেক্ষা, উৎপীড়নেই গৃহত্যাগ করে, কামের পীড়নে করে না।

ভারতের স্বাধীনতার পর হিন্দুতন্ত্রের খড়গ কিছুটা কোমল হয়েছে। ১৯৫৫ সালে গৃহীত হয় হিন্দুবিবাহ অ্যাক্ট, যাতে দুটি মৌলিক পরিবর্তন সম্পন্ন করা হয়। এতে পুরুষের একবিবাহ, নারীর তো চিরকালই ছিলো, বিধিবদ্ধ করা হয়, এবং বিবাহবিচ্ছেদ স্বীকৃত হয়। সম্পত্তিতে এখন কিছুটা অধিকার এসেছে হিন্দুনারীর : ১৯৫৬র ‘হিন্দু উত্তরাধিকার অ্যাক্ট’ ও ১৯৫৯এর ‘বিবাহিত নারীর সম্পত্তি (পরিবর্ধিত) অ্যাক্ট’ নারীকে কিছুটা অধিকার দিয়েছে সম্পত্তির [দ্র আলমেনাস-লিপোস্কি (১৯৭৫, ৪৫-৫২)]। তবু আজো হিন্দু নারী পুরোনো বিধিবিধানের শিকার, এখনো স্বামীর পায়ের নিচে তার স্বৰ্গ হিন্দুবিধি পৃথিবীর একটি বিশেষ খণ্ডে সীমাবদ্ধ; কিন্তু যে-দুটি আইনের জগতে সূর্য কখনো ডোবে না, সে-দুটি হচ্ছে ইংরেজি সাধারণ আইন, ও রোমান আইন, পরে যার নাম হয় ‘কোড নেপোলিয়ন’ বা ‘নেপোলিয়নি বিধি’। দুটি বিধিই নারীর জন্যে নৃশংস; দুটিরই প্রণেতা নারীবিদ্বেষীরা, যারা নারীকে দেখছে প্রচণ্ড ঘৃণার চোখে, এবং আইনের নামে বিধিবদ্ধ করেছে বিনাবিচারে চরম দণ্ড। এ-দুটি বিধির পেছনে হিংস্র পিতৃতান্ত্রিকের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইবেল; প্রাণভরে শাস্তি দিয়েছে নারীকে। খ্রিস্টান সন্তরা নারীবিদ্বেষে হিন্দু ঋষিদেরও ছাড়িয়ে গেছেন; তাদের চোখে একটি নারী, মেরি, ছাড়া আর সব নারীই পাপিষ্ঠা; তাই তারা নারীদের জন্যে যে-সব বিধি রচনা করেছেন সেগুলো পাপিষ্ঠাদের জন্যে রচিত বিধি। ইহুদি ও খ্রিস্টান সন্তদের কাছে নারী হচ্ছে ‘শয়তানের খেলার মাঠ’, ‘বিষ্ঠার ছালা’; লুথার বলেছেন, নারী কখনো নিজের প্রভু নয়। ঈশ্বর তার দেহ তৈরি করেছে। পুরুষের জন্যে, সন্তান ধারণ ও লালনের জন্যে; নারীকে সন্তান বিয়োতে বিয়োতে মরতে দাও, এজন্যেই তাদের তৈরি করা হয়েছে।’[দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭৬, ৮০)]|

ইংরেজি সাধারণ আইন ও রোমান আইনে প্রকাশ পেয়েছে পিতৃতন্ত্রের এ-মনোভাবই; এ-দু-আইনেই নারী পুরুষের সম্পূর্ণ অধীন। নারীকে পুরুষের বাধ্যতামূলক ক্রীতদাসী করার একটি নিপুণ কৌশলের নাম হচ্ছে বিবাহ, যার কবলে পড়ে নারী হারায় তার অস্তিত্ব ও অধিকার। ইংরেজি সাধারণ আইনে স্ত্রীকে স্বামীর রক্ষণাবেক্ষণে থাকতে হ’লে পালন করতে হয় কতকগুলো শর্ত [কোভেরচার], যেগুলোর কাজ হচ্ছে নারীকে অস্তিত্বহীন করা। এ-শর্তের উৎস বাইবেলের একটি অনুশাসন : ‘মনুষ্য আপন পিতামাতাকে ত্যাগ করিয়া আপন স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, এবং তাহারা একাঙ্গ হইবে’ [আদিপুস্তক, ২.২৪] ; শুনতে সুখকর শোনালেও আইনে এর তাৎপর্য হচ্ছে স্ত্রীর ‘ব্যবহারিক মৃত্যু’। আইনের ভাষায় এ-অনুশাসন বোঝায় স্বামী-স্ত্রী এক ব্যক্তি; অর্থাৎ স্ত্রীর কোনো ভিন্ন সত্তা নেই। ধর্মের এক কথায় স্বামীর শরীরে বিলীন হয়ে গেছে স্ত্রীর সমগ্র অস্তিত্ব। বিচারক ব্ল্যাকস্টোন এর আইনগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন : ‘আইনে, বিয়ের ফলে, স্বামী ও স্ত্রী অভিন্ন ব্যক্তি : অর্থাৎ বিবাহিত অবস্থায় নারীর সত্তা বা আইনগত অস্তিত্ব বাতিল, বা অন্তত নারীর অস্তিত্ব স্বামীর অস্তিত্ত্বে গৃহীত ও সংহত’ [ দ্র মিলেট (১৯৬৯, ৬৮)]; রিস বলেছেন, ‘আইনে নারী তার বিবাহিত পুরুষের সম্পত্তি; সে তার অস্থাবর মাল’; এলিজা কুক লিখেছেন, ‘স্বামী স্ত্রীর, স্ত্রীর সম্পত্তির, ও স্ত্রীর সন্তানের নিরঙ্কুশ প্রভু’ [দ্র বাস্ক (১৯৭৪, ১৭)]। হিন্দুবিধানেও স্ত্রীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় স্বামীর অস্তিত্বের মহাসমুদ্রে [মনুসংহিতা, ৯:২২]৷ স্বামী-স্ত্রীর একদেহে বিলীন হওয়া কাম ও কাব্যিকভাবে চমৎকার, কিন্তু আইনের দিকে ভয়াবহ। এতে স্বামীর শরীর বা অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না, বিলুপ্ত হয় নারীর শরীর ও অস্তিত্ব; এ-বিলুপ্তির মূল্য দিতে হয় নারীকে তার মাত্র একটি সামান্য জীবন দিয়ে। স্বামী হয় প্রভু, স্ত্রী ভূমিদাসী। বিয়ের অনুষ্ঠানেই বধুটিকে দীক্ষা দেয়া হয় সন্ত পলের অনুশাসনে : ঈশ্বরের প্রতি সে যেমন অনুগত থাকবে তেমনই অনুগত থাকবে স্বামীর প্রতি।

ইংরেজি সাধারণ আইনে স্ত্রীকে ফেলা হয় শিশু, নির্বোধ ও বদ্ধপাগলের দিলে, যে অক্ষম নিজের দায়িত্ব নিতে; যার নেই কোনো বিবেচনাশক্তি। অস্তিত্বলোপের অর্থ খুবই ভীতিকর; এতে স্বামীকে দেয়া হয় স্ত্রীর শরীরের সম্পূর্ণ মালিকানা, স্বামী ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারে যথেচ্ছভাবে। বেকন এ-মালিকানার মানে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : ‘স্বামী পিটোতে পারে স্ত্রীকে, তবে খুব ভয়ঙ্কর বা নিষ্ঠুরভাবে নয়; দরকার মনে করলে স্বামী স্ত্রীকে আটকে রাখতে পারে, তবে সে স্ত্রীকে কারারুদ্ধ করে রাখতে পারে না।’ [দ্র বাঙ্ক (১৯৭৪, ১৭)]। অস্তিত্বলীনের মানে হচ্ছে স্বামী বা কারো বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়ার কোনো অধিকার তার নেই; সে কারো সাথে কোনো চুক্তি সম্পাদনের অধিকারী নয়; ঋণ আদায়ের জন্যে সে মামলা করতে পারে না; কারো বিরুদ্ধে সে পারে না মানহানির অভিযোগ আনতে, এবং তার বিরুদ্ধেও পারে না কেউ। অর্থাৎ বিয়েতে বাতিল হয়ে যায় তার নাগরিক অধিকার, আইনের চোখে সে নিরস্তিত্ব। তার হাতপা বাধা: তার অস্তিত্ব নেই, গৃহ নেই, সহায় নেই, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নেই। সে নিজেই তো নেই : বিয়ে হচ্ছে নারীর অস্তিত্বহীনতা–কিছুদিনও আগেও ইংরেজি সাধারণ আইনে বিয়ে ছিলো এতোই মধুর ও মর্মান্তিক। বিয়েতে নারীর অস্তিত্বলীনের ব্যাপারটি মোটেই আধ্যাত্মিক নয়, সম্পূৰ্ণ বৈষয়িক; ওই আইনে বিয়ের পর নারীর নিজের অধিকারে কিছুই থাকে না। সে নিজের মালিক নয়, সে নিজের আঁকাবাঁকা দেহখানির মালিক নয়, সে মালিক নয় কিছুরই। যে কোনো কিছুর মালিক হতে পারে না, তার আবার কিসের অস্তিত্বস্বাতন্ত্র্য? একই কারণে হিন্দুবিধানেও বারবার বলা হয়েছে ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যামর্হত’ [মনুসংহিতা, ৯:৩]।

স্বামী-স্ত্রীর একাঙ্গ হওয়ার তাৎপর্য হচ্ছে বিয়ের পর স্ত্রীর সমস্ত সম্পত্তির, এমনকি তার নিজের, মালিক হয় স্বামী। এর বিনিময়ে স্বামী তার রক্ষণাবেক্ষণ করে, তার ভরণপোষণ করে। বিয়ের সময় নারীর যা-কিছু স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থাকে, তা হয়ে ওঠে স্বামীর সম্পত্তি, আর স্ত্রী হয়। স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তি! এমনকি বিয়ের পরও সে যা কিছুর মালিক হয়, তাও তার থাকে না, অবলীলায় হয়ে ওঠে। স্বামীর। স্বামীর এ-অধিকার শুধু বিবাহিত কালের নয়, ১৮৫৭র আগে বিবাহবিচ্ছেদের পরও স্বামী ভোগ করতো স্ত্রীর ওপর এ-অধিকার। ১৮৩৭-এর আগে সন্তানের ওপরও নারীর ছিলো না অধিকার, সব অধিকার ছিলো স্বামীর। আইন, পিতৃতান্ত্রিক রীতিতে, মাকে স্বীকারই করতো না; স্বীকার করতে শুধু পিতাকে। পিতার জীবনকালে মায়ের কোনো অধিকার ছিলো না; তার প্রাপ্য ছিলো। শুধু ‘সম্মান’, আর তখন একেই মনে করা হুতো নারীর গৌরব। পিতা সন্তানদের শাস্তি দিতে পারতো, মায়ের কাছে থেকে কেড়ে নিতে পারতো, নিজের রক্ষিতার কাছে রাখতে পারতো; এবং মাকে নিষিদ্ধ করে দিতে পারতো। কুমারী অবস্থায় তার বেশ কিছু অধিকার ছিলো, কিন্তু একাঙ্গ হওয়ার পর সে হারায় সব কিছু। ইংরেজি আইন ছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিধি; তাই এ-আইন ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা পৃথিবীতে। এ-আইন কোনো কোনো দেশে নারীকে প্রথাগত নিষ্ঠুরতর আইনের কবল থেকে কিছুটা উদ্ধার করে, যেমন ভারতে; আবার কোনো কোনো দেশে এ-আইন নারীর বহুদিনের অধিকার হরণ করে, যেমন ব্ৰহ্মদেশে। ব্ৰহ্মদেশে স্বামীস্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি পালন করতে হতো ‘পাঁচটি আনুগত্য’, কিন্তু এ-আইন স্বামীর আনুগত্য লোপ ক’রে স্ত্রীকে করে স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তি ও দাসী।

রোমান আইনে ইংরেজি সাধারণ আইনের থেকে পিতৃতান্ত্রিক হিংস্ৰতা আরো প্রচণ্ড। ইংরেজি আইনে অবিবাহিত নারীদের কিছু অধিকার আছে, কিন্তু রোমান আইনে কোনো অধিকার নেই অবিবাহিতাদেরও। তাদের চিরকাল বাস করতে হয়, কোনো রোমান মনুর বিধানেই যেনো, কোনো পুরুষ অভিভাবকের অধীনে। রোমান আইন কোনো অবস্থায়ই নারীকে স্বাধীনতার যোগ্য মনে করে না। নেপোলিয়ন রোমান আইনকে মান-ও বিধি-বদ্ধ করে গ্রহণ করে তার সাম্রাজ্যের আইনরূপে। এর নতুন নাম হয় নেপোলিয়নি বিধি [কোড নেপোলিয়ন]। একনায়কের বিধিবদ্ধ আইনে চরমভাবে প্ৰকাশ পায় একনায়কের স্বৈরাচার। নেপোলিয়নের কাছে নারী এমন একটি রাজ্য, যাকে শুধু জয় করলেই চলবে না, তাকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত পর্যুদস্ত পদদলিত করতে হবে। তার বিধি নারীকে তাই করে; এ-বিধিতে নারী হয়ে ওঠে সবচেয়ে লণ্ডভণ্ড রাজ্য। নারী সম্পর্কে তার ধারণা খ্রিস্টান সন্তদেরই মতো। এ-একনায়ক বলেছে, ‘প্রকৃতি চেয়েছে যে নারী হবে আমাদের দাসী। তারা আমাদের সম্পত্তি, আমরা তাদের সম্পত্তি নই। ফলবান গাছের মালিক যেমন মালি, আমরাও তেমনি তাদের মালিক। নারীর সমানাধিকার দাবি নিছক পাগলামো! নারী সন্তান উৎপাদনের কল ছাড়া আর কিছু নয়’ [দ্র নিউল্যান্ড (১৯৭৯, ১৩)]। এ-বিধি পশ্চিম ইউরোপে ও ফরাশি উপনিবেশে চাপিয়ে দেয়া হয়, এবং হঠাৎ অনেক দেশে নারী নিজেকে দেখতে পায় গৃহদাসীরূপে। এ-আইনেও নারী শিশু আর নির্বোধদের শ্রেণীভুক্ত; তাই তারা কোনো চুক্তি করতে পারে না, স্বামীর স্বাক্ষর ছাড়া স্বাধীনভাবে আইনসম্মত লেনদেন করতে পারে না, বাকিতে কিছু কিনতে পারে না, ব্যাংকে একটি হিশেবেও খুলতে পারে না। এ-আইনে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তির এবং জীবনের পরিচালক। স্ত্রী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায় বা চাকুরি করতে চায, তাহলেও স্বামীর অনুমতি নিতে হয়। এ-আইনে স্বামীর প্রতি আনুগত্য শুধু সামাজিক বা ধর্ময়ি নয়, তা আইনগত।

এখন উগ্রতম পিতৃতন্ত্র মুসলমান পিতৃতন্ত্র, এর বিকাশ ঘটেছে কম। ইসলাম কনিষ্ঠ ধর্ম, এটি যে-অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে সে-অঞ্চলের দুটি পুরোনো ধর্মের উত্তরাধিকার বহন করে অনেকখানি; এ-ধর্ম নারীকে দিয়েছে কিছু অধিকার, যা আগের পিতৃতন্ত্রগুলো দেয় নি। তবে মুসলমান দেশগুলোতেই নারী এখন সবচেযে শৃঙ্খলিত, কেননা অন্যান্য পিতৃতন্ত্রগুলোর বিবর্তন ঘটেছ, আর এটি বিবর্তন রোধ ক’রে চলছে। এখন অনেক দেশে এর অবলম্বনকারীদের সহনশীলতাও এতো কম যে এর সম্পর্কে নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ কিছু লেখাও বিপজ্জনক। প্রচারের ফলে মুসলমানদের মধ্যে জন্মেছে এমন এক বদ্ধমূল ধারণা যে ইসলামপূর্ব আরবে নারীদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়; ইসলাম উদ্ধার করে তাদের। প্রতিটি ব্যবস্থা পূর্ববতী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়; তবে তা ঐতিহাসিকভাবে সাধারণত সত্য হয় না। আরব নারীদের নানা ইতিহাস লেখা হয়েছে; সবগুলোতেই স্বীকার করা হয় যে ইসলামপূর্ব আরবে অনেক বেশি ছিলো নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার। তারা অবরোধে থাকতো না, অংশ নিতো সমস্ত সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডে: এমনকি তাদের প্রাধান্য ছিলো সমাজে। শিশুকন্যা হত্যার জন্যে আরবরা খুব নিন্দিত ইতিহাসে, কিন্তু তারা সব শিশুকন্যা হত্যা করতো না, করলে জাতিটিই লুপ্ত হয়ে যেতো। শিশুকন্যা হত্যা একান্ত আরবি রীতি ছিলো না, পৃথিবীর নানাদেশে, যেমন ভারতেও, ছিলো। এ-ধর্ম শিশুকন্যাদের বঁচিয়েছে, তবে নারীদের মুক্ত সমাজ থেকে স্থানান্তরিত করেছে অবরোধে [দ্ৰ সোহা আবদেল কাদের (১৯৮৪, ১৪০)]।

কোরান-এ আছে :

হে নবীপত্নীগণ,… তোমাবা নিজেব গৃহে থাকবে; প্রাচীন যুগের মতো নিজেদেব প্রদর্শন ক’রে বেড়িও না [আহজাব : ৩২.৩৩]।

বোখারিতে [দ্র নূর মোহাম্মদ (১৯৮৭, ১৯৬)] আছে :

বিবি আয়েশা (রাঃ) বলিয়াছেন : নারীগণ এখন যে ধরনের চালচলন এখতেয়ার করিয়াছে তাহা যদি রছুলুল্লাহ (ছঃ) দেখিতেন, তবে নিশ্চয় তাহাদিগকে মসজিদে যাইতে বাধা দিতেন।

এ থেকে বোঝা যায় ইসলামের আগে ও প্রথম পর্যায়ে নারীদের যে-অধিকার ও স্বাধীনতা ছিলো, তা পরে হরণ করা হয়। ফাতনা এ সাবাহ [ফাতিমা মেরনিস্‌সির ছদ্মনাম] নামক এক নারী ও মুসলমান ঐতিহাসিক মুসলমানের অবচেতনায় নারী (১৯৮৪) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইসলামে নারী হচ্ছে বিকলাঙ্গ প্ৰাণী’; তিনি আরো লিখেছেন, ‘যতোবারই আমি সেই ক্লান্তিকর ভণিতাটি শুনি যে সপ্তম শতাব্দী থেকে ইসলাম নারীকে দিয়েছে উচ্চ স্থান, ততোবারই আমি বিবমিষা বোধ করি’ [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭৫)]। নারীকে ইসলাম কতোটা অধিকার দিয়েছে বা দিতে পারে, তা বোঝার জন্যে নারী সম্পর্কে ইসলামি ধারণার সাথে কিছুটা পরিচয় থাকা দরকার।

ইসলামি শাস্ত্ৰে নারী ও কাম সম্পর্কে ধারণার পরিচয় দিয়েছেন ফাতিমা মেরনিস্‌সি তাঁর ‘বোরখা পেরিয়ে’ (১৯৭৫) গ্রন্থে। তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামে কামকে দেখা হয় এক আদিম শক্তিরূপে, যা শুভও নয় অশুভও নয়। তার শুভাশুভ নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। ইসলামে মনে করা হয় যে নারীপুরুষের মধ্যে নারীর কামই প্রচণ্ড, তাই তা দারুণ সামাজিক উদ্বেগের ব্যাপার। নারীর ওই কামকে যদি বশে রাখা না হয়, তবে তা সৃষ্টি করবে ফিৎনা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা, যা নষ্ট করে দেবে সমাজকে। ইসলাম মনে করে নারীর পক্ষে নিজের কামকে বশে রাখা সম্ভব নয়, কেননা নারীর সে-চারিত্রিক শক্তি নেই; কিন্তু পুরুষের আছে, কেননা পুরুষ শারীরিক, মানসিক ও নৈতিকভাবে নারীর থেকে উৎকৃষ্ট। তাই স্বাভাবিকভাবেই পুরুষ পেয়েছে নারীর ওপর প্রভুত্বের ও নারীকে রক্ষার অধিকার। নারীকে যে বোরখায় মুড়ে বা অবরোধে আটকে রাখা হয়, তা সমাজকে নারীর অনিবার কামের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচানোর জন্যে [দ্র আমল রাসসম (১৯৮৪, ১২৯)]। পুরুষ সম্পর্কে উচ্চ ও নারী সম্পর্কে নিম্ন ধারণা ইসলাম পেয়েছে ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে; এবং তাকে বদ্ধমূল ক’রে তুলেছে। পুরুষকে যে-চারিত্রিক শক্তির অধিকারী ব’লে মনে করা হয়, তা আসলে পুরুষের নেই; আর নারীর মধ্যে চারিত্রিক শক্তির যে-অভাব রয়েছে ব’লে মনে করা হয়, তাও ভুল। কামের বেলা তা অত্যন্ত স্পষ্ট : নারীর কামসংযমের পাশে পুরুষ কামইতর প্রাণী। ইসলামে নারী সম্পর্কে রয়েছে যে-অবিশ্বাস, তা বিশেষভাবেই আরববিশ্বাস; আরবরা সম্ভোগ্যপরায়ণ, তারা নারী থেকে নারীতে ছোটে, কিন্তু কলঙ্ক দেয় নারীদের। আরব্য রজনীর উপাখ্যানগুলোতে রয়েছে এর বিশ্বস্ত পরিচয় ; উপাখ্যানগুলোতে পুরুষেরা সম্ভোগে অক্লান্ত, কিন্তু অসতী অবিশ্বাসিনীর অপবাদ বইতে হয়েছে নারীদের। আরব্য রজনীর কবি পুরুষদের শিখিয়েছেন [দ্র ক্ষিতীশ (১৯৮২, ১০)] :

ওগো বন্ধু, বিশ্বাস করো না তাকে।
মুচকি হেসে উপেক্ষা কবো তার ভালোবাসার প্ৰতিজ্ঞা
দয়িতের জন্যে ছলাকলা,
আর প্রতারণা– কিছুই অসাধ্য নয় তার।
একান্ত নিবিষ্ট মনে যখন সে পশমের কারুকার্যে রত,
তখনো আচ্ছন্ন থাকে পরকীয়া প্রেমে
মনে রেখো সেই কথা– ইউসুফের,
কান পেতে শোনো সেই আদমের মর্মভেদী করুণ ক্ৰন্দন–
আজও শোনা যায়.

সব ধর্মেই নারী অশুভ, দূষিত, কামদানবী। নারীর কাজ নিষ্পাপ স্বর্গীয় পুরুষদের পাপবিদ্ধ করা; এবং সব ধর্মেই নারী অসম্পূর্ণ মানুষ। নারী কামকৃপ, তবে সব ধর্মই নির্দেশ দিয়েছে যে নারী নিজে কাম উপভোগ করবে না, রেখে দেবে পুরুষের জন্যে; সে নিজের রন্ধটিকে একটি অক্ষত টাটকা সতীচ্ছদে মুড়ে তুলে দেবে পুরুষের হাতে। পুরুষ সেটি ইচ্ছেমতো ভোগ করবে, নিজের জমি যেভাবে ইচ্ছে চাষবে। ইসলাম নারী সম্পর্কে এ-ধারণাই পোষণ করে। ইসলামে একজন নারী, সে যতোই অসাধারণ হোক, একজন পুরুষের, সে যতোই তুচ্ছ অপদাৰ্থ পাশবিক হোক, অর্ধেক। গাজালি বলেছেন, ‘হাওয়া নিষিদ্ধ ফল খেয়েছে ব’লে আল্লা তাকে আঠারো রকমের শাস্তি দিয়েছে।’ এর মাঝে রয়েছে ঋতুস্রাব, গর্ভ নিজের পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্নতা, অচেনা পুরুষের সাথে বিয়ে ও তার বাড়িতে বন্দীজীবন কাটানো প্রভৃতি, এবং নারীকে দেয়া হয়েছে মেধার ১০০০ উপাদানের মধ্যে মাত্র একটি, আর পুরুষকে, সে যতোই দুশ্চরিত্র হোক, দেয়া হয়েছে বাকি ৯৯৯টি [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৬৯-৭০)]। ইসলামে পুরুষ নারীর থেকে তুলনাহীনভাবে শ্রেষ্ঠ, এবং নারী হচ্ছে কামসামগ্ৰী– পৃথিবী থেকে বেহেশত পৰ্যন্ত।

কোরান-এ আছে :

পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লা তাদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এজন্যে যে পুরুষ ধনসম্পদ ব্যয় করে।…স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন করো এবং তাদের প্রহার করো [সুরা নিসা : ৩৪]।

হাদিসে রয়েছে। [মিশকাত, দ্র। রফিক (১৯৭৯, ১৮১)] :

যদি আমি অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ দিতাম তাহলে নারীদেরই বলতাম তাদের স্বামীদের সিজদা কবতে।

পুরুষ ও নারী ইসলামে ব্যক্তি হিশেবে প্ৰভু ও দাসী। পুরুষের প্রতিনিধিরূপে প্রতিটি পরিবারে কাজ করে স্বামী, নারীর প্রতিনিধিরূপে স্ত্রী। নারী দাসী, তবে সম্ভোগের বস্তুও। সব রকম সম্ভোগের চূড়ান্তরূপ হচ্ছে নারীসম্ভোগ; এবং এ-ধর্মেও নারীকে নির্দেশ করা হয়েছে কামসামগ্ৰীৱৰূপে: পুরুষের কামকে পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আর নারীর কামকে ক’রে দেয়া হয়েছে নিষিদ্ধ।

কোরান-এ আছে :

তোমাদের স্ত্রী তোমাদের শস্যক্ষেত্র, তাই তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছে প্রবেশ কবতে পারো [সুরা বাকারা : ২২৩] ;

হাদিসে আছে [দ্র নূর মোহাম্মদ (১৯৮৭, ১৮৭-২০০১); রফিক (১৯৭৯, ১৮১-১৮৩)] :

পুরুষের পক্ষে নারী অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর বিপদের জিনিস আমি আমার পরে আর কিছু রাখিয়া যাইতেছি না।
সতর্ক হও নারী জাতি সম্পর্কে। কেননা বনি ইসাইলের প্রতি যে প্রথম বিপদ আসিয়াছিল তাহা নারীদের ভিতর দিয়াই আসিয়াছিল।
অকল্যাণ রহিয়াছে তিন জিনিসে নারী, বাসস্থান ও পশুতে।
নারী শয়তানের রূপে আসে আর শয়তানের রূপে যায়।
নারী হইল আওরত বা আবরণীয় জিনিস। যখন সে বাহির হয় শয়তান তাহাকে চোখ তুলিয়া দেখে। যখন কোনো রমণীকে তার স্বামী শয্যায় আহ্বান করে এবং সে অস্বীকার করে এবং তার জন্য তার স্বামী ক্ষোভে রাত কাটায়–সেই রমণীকে প্রভাত পৰ্যন্ত ফেরেশতাগণ অভিশাপ দেয়।
স্ত্রীগণকে সদুপদেশ দাও, কেননা পাঁজরের হাড় দ্বারা তারা সৃষ্ট। পাজরের হাড়ের মধ্যে ওপরের হাড় সবচেয়ে বাঁকা–যদি ওকে সোজা করতে যাও তবে ও ভেঙে যাবে, যদি ছেড়ে দাও তবে আরো বাঁকা হবে।
পুরুষ নারীর বাধ্য হলে ধ্বংসপ্ৰাপ্ত হয়।

এর সারকথা হচ্ছে নারী অবাধ্য, অশুভ, ও কামুক। তবে নারী তার কাম চরিতার্থ করতে পারবে না, পুরুষ নারীতে চরিতাৰ্থ করবে কাম। ইসলামে কামসামগ্ৰী নারীর চরম রূপ হূর বা স্বর্গের উর্বশী। পুরুষের কামকল্পনা চূড়ান্ত রূপ ধরেছে হূর-এ। বেহেশত সম্পূর্ণরূপে পুরুষের প্রমোদপল্লী; অধিকাংশ নারী জুলবে দোজখে [হাদিসে আছে : ‘দোজখ পরিদর্শনকালে আমি দোজখের দ্বারে দাঁড়ালাম এবং জানতে পারলাম যে দোজখীদের মধ্যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ’ : হাদিস, দ্র বোখারী শরীফ, ২১৬], আর যাদের দেহ হচ্ছে পুরুষের আদিম কামকল্পনার প্রতিমূর্তি।

কোরান-এ আছে :

ওদের সঙ্গিনী দেবো আয়তলোচনা হূর [সুরা দুখান : ৫৪]।
সাবধানীদের জন্যে রয়েছে সাফল্য উদ্যান, দ্রাক্ষা, সমবয়স্কা উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণী এবং পূর্ণ পানপত্র [সুরা নাবা : ৩১-৩8]।
সে সবের মাঝে রয়েছে বহু আনতনয়না যাদের এর আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করে নি। [সুরা রাহমান : ৫৬]।
আমি তাদের মিলন ঘটাবো আয়তলোচনা হূরের সঙ্গে [সুরা তূর : ২০]।

হাদিসে আছে [দ্র রফিক (১৯৭৯, ৩০১)] :

হরিণনয়না স্বৰ্গসুন্দরীগণ তাদের পত্নী হবে। তারা সবাই (৩৩/৩৪ বছরের পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত) সমবয়স্ক হবে।
যদি বেহেশতের কোনো নারী পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতো। তবে তার দেহভবা মৃগনাভির সৌরভো পৃথিবী ভরপুর হয়ে যেতো এবং তার সৌন্দর্যে সূর্য ও চন্দ্ৰ মলিন হতো।

গাজ্জালি নিজের সমস্ত ইন্দ্ৰিয়ভারাতুর কল্পনা প্রয়োগ ক’রে দিয়েছেন এ-নারীদের রূপের ইন্দ্ৰিয়উত্তেজক, আধুনিক দৃষ্টিতে হাস্যকর, বর্ণনা [দ্র রফিক (১৯৭৯, ৩০২)] :

সেখানে অন্সরাসদৃশ পুণ্যময়ী নারীরা রয়েছে, আল্লাহ তাদের আলোকের দ্বাবা সৃষ্টি করেছেন, তারা যেন মরকত ও প্রবালের মতো। আনতনয়না সে-নারীরা তাদের স্বামী ব্যতীত আর কোরো প্ৰতি দৃষ্টিপাত করে না, জ্বিন ও মানবদের মধ্যে কেউই তাদের ইতিপূর্বে স্পর্শ কবে নি, তাদের স্বামীরা যখনই তাদের সাথে মিলিত হবে তখনই তাদেব কুমারী দেখতে পাবে ; তাদের শলায় থাকবে নানা রঙেব সত্তরটা ক’রে হার, কিন্তু সেগুলো তাদে্র শরীরে একটা কেশের মতোও ভারী মনে হবে না। যেমন কাচের গোলাসের লাল শরাব বাইরে থেকে দেখা যায় তেমনি তাদের অস্থি, মাংস, চর্ম, কণ্ঠনালীর মধ্য দিয়ে তাদের সর্বাঙ্গ দেখা যাবে। তাদের মাথায় চুল মুক্তা ও পদ্মরাগমণি দ্বা্রা সুশোভিত থাকবে।

বেহেশত পুরুষের বিলাসস্থল, সেখানে পার্থিব নারী বা স্ত্রীদের স্থান নেই। পৃথিবীতে তারা চুক্তিবদ্ধ দাসী, স্বর্গে অনুপস্থিত বা উপেক্ষিত। ইসলামি আইনে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এ-দৃষ্টিকোণ থেকেই।

শরিয়া আইনের উৎস কোরান ও সুন্নাহ, এ-আইনও ঐশী। তবে এতে প্রাকইসলাম আরবের নানা রীতির মধ্য থেকে বিশেষ কিছু রীতিকে বেছে নিয়ে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে ইসলামি রীতি বা আইনরূপে। প্রাকইসলাম আরবের সে-সমস্ত রীতিই গৃহীত হয়েছে ইসলামে, যা খর্ব করে নারীর অধিকার; যা আগের স্বাধীন নারীকে পরিণত করে পুরুষের দাসীতে। ইসলামি আইন বিবর্তনশীল নয়, তাই দেশেদেশে মুসলমান নারীর মৌলিক অধিকার চোদ্দো শো বছর আগে যা ছিলো, এখনো তাই আছে; তবে নানা দেশে নারীকে দেয়া হয়েছে এমন কিছু অধিকার, যা ইসলামসম্মত নয়। বাঙলাদেশি ও সৌদি নারীর মূল অধিকার একই, যদিও বাঙলাদেশি নারী সৌদি নারীর থেকে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে, ধর্মের বিধি অনুসারে যা তার প্রাপ্য নয়। এ-আইন নারীকে দিয়েছে কিছুটা সম্পত্তির অধিকার, যা অন্য কোনো সনাতন আইন দেয় নি; তবে এ-আইনে দুটি নারী একটি পুরুষের সমান, আর স্বামী হচ্ছে নারীর প্রভু। অনেক মুসলমান দেশে এখন সংবিধানে বলা হয় নারীপুরুষের অধিকার সমান, কিন্তু বিশেষ আইনে এসে দেখা যায় ওই সাম্য সংবিধানের সৌন্দৰ্য বাড়িয়েছে, কিন্তু নারীকে রাখা হয়েছে পুরুষের অধীনে। যেমন, কাতারের সংবিধানে (১৯৭০ : বিধি ৯) বলা হয়েছে ; ‘জাতি, লিঙ্গ বা ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক ভোগ করবে সমানাধিকার’; তবে কাতারে, ও আরো নানা মুসলমান রাষ্ট্রে, নারীর ভোটাধিকারই নেই। মরক্কোর সংবিধানে এক জায়গায় নারীদের আইনগত, রাজনীতিক, ও আর্থনীতিক সমানাধিকার দেয়া হয়েছে, কিন্তু একটু পরেই আরেক বিধিতে নারীকে ক’রে তোলা হয়েছে স্বামীর আইনসঙ্গত দাসী। এ-বিধিতে বলা হয়েছে : স্ত্রী বাধ্য ও বিশ্বস্ত থাকবে স্বামীর কাছে, স্বামীর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের সম্মান করবে, এবং স্ত্রী যদি নিজের বাপমাকেও দেখতে যেতে চায়, তখনো স্বামীর অনুমতি নিতে হবে [দ্র নিউল্যান্ড (১৯৭৯, ২৪)]। ইসলামি আইনে স্বামীর বাধ্য থাকা স্ত্রীর আইসঙ্গত দায়িত্ব। এ-আইন স্ত্রীকে কিছুটা আর্থ অধিকার দিয়ে তাকে বেঁধে রেখেছে বহু ব্যক্তিগত অসুবিধার শেকলে।

পিতৃতান্ত্রিক আইনে বিয়ে হচ্ছে নারীবলি, শরিয়ায়ও তাই। ইসলামে বিয়ে ঐশী ধর্মানুষ্ঠান নয়, বিয়ে একটি রাসকসহীন কর্কশ চুক্তি [দ্র এম হিদায়াতুল্লাহ (১৯০৬, ২৮২)]। এ-চুক্তি দুটি সমমানুষের মধ্যে নয়, অসম মানুষের মধ্যে; তাই ইসলামে বিয়ে এক অসম চুক্তি, যাতে পুরুষটি ভোগ করে চুক্তির সুবিধা আর নারীটি ভোগ করে পীড়ন। এ-আইনে স্ত্রী হয়ে ওঠে। চুক্তিবদ্ধ দাসী; সে নিজেকে চুক্তি ক’রে সমর্পণ করে একটি পুরুষের খেয়ালখুশির কাছে। বিয়ের চুক্তিকে এঙ্গেলস (১৮৮৪, ২২৮) তুলনা করেছিলেন মালিক ও শ্রমিকের অসম চুক্তির সাথে। তিনি দেখান যে মালিক ও শ্রমিক যখন চুক্তি করে, তখন কাগজেকলমে মনে হয় যেনো তারা স্বেচ্ছামূলক চুক্তি করেছে; আইন এ-নিয়েই খুশি থাকে। মালিক পক্ষ যে বেশি শক্তিশালী, তার চাপ যে মারাত্মক, আইন মাথা ঘামায় না তা নিয়ে; যতোক্ষণ চুক্তি বলবৎ থাকে ততোক্ষণ মনে করা হয় যে তারা ভোগ করছে সমান অধিকার। বিয়ের চুক্তিও এমনি; আইন এটুকুতেই সন্তুষ্ট যে দু-পক্ষই সম্মতি জানিয়েছে। বাস্তব জীবনে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে আইনের উদ্বেগ নেই। ইসলামি আইনে বিয়ের চুক্তি মালিক-শ্রমিকের চুক্তির থেকেও ভয়াবহ ও শোষণমূলক, কেননা এখানে চুক্তি ক’রেই একজনকে দেয়া হয় অশেষ অধিকার এবং আরেকজনের প্রায় সমস্ত অধিকার বাতিল হয় কিছু সুযোগসুবিধার বিনিময়ে। ইসলামি আইনে স্ত্রী হচ্ছে চুক্তিবদ্ধ দাসী, যে স্বামীকে দেবে যৌনতৃপ্তি ও বৈধ সন্তান, কিন্তু স্বামী যখন ইচ্ছে মনের খেয়ালে শুধু তিনবার ‘তালাক’ বলে ছেড়ে দিতে পারবে তাকে। চুক্তির কথা বলা হলেও ইসলামি বিয়েতে পুরুষ ও নারীটি চুক্তিতে আসে না, চুক্তিতে আসে পুরুষ ও নারীর অভিভাবক। বিয়েতে নারীর সম্মতির কথাও বলা হয়, কিন্তু তা সম্মতির অভিনয়। ইসলামি বিয়ের চুক্তির ব্যাখ্যা আনোয়ার আহমদ কাদারির বই থেকে, কিম্ভূত বাঙলায়, অনুবাদ করেছেন এক ভাষ্যকার। তাঁর অনুবাদ : ‘ইহা এমন এক চুক্তি যাহার দ্বারা একজন পুরুষ কর্তৃক একজন নারীকে সম্ভোগের অধিকার দ্বারা দখল করা বুঝায়’ [দ্র মোঃ মজিবর (১৯৮৯, ৫৩)]। ইসলামি বিবাহ চুক্তির নৃশংসতা স্পষ্ট ধরা পড়েছে উৎকট বাঙলায় অনুদিত ভাষ্যটিতে। বিয়েতে একটি পুরুষ ‘দখল করে’ একটি নারীকে; দখল করে ‘সম্ভোগের অধিকার দ্বারা’! ‘সম্ভোগ’ ও ‘দখল’ দুটিই নৃশংস প্রভুর কাজ। এ-চুক্তির অনন্ত সুফল উপভোগ করে পুরুষ, নারী হয় শিকার। ‘ক্রীতদাসীও এমনভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নিজেকে সমর্পণ করে না প্রভুর কাছে যেভাবে করে মুসলমান স্ত্রী। ইসলামে বিয়ে যেহেতু চুক্তি, তাই তা চিরস্থায়ী নয়; যে-কোনো সময় স্বামী তা বাতিল করতে পারে। তবে এতেও পুরুষ সুখ পায় নি, তারা নিয়েছে একেবারে অস্থায়ী চুক্তির সুবিধাও, যা দেখা যায় শিয়া সম্প্রদায়ের ‘মুতা’ বিয়েতে। মুতা বিয়ে হচ্ছে এক বিশেষ সময়ের জন্যে, একদিনের বা একরাতের জন্যেও হ’তে পারে, বিয়ে বা যৌনচুক্তি। এ-বিয়ের চুক্তিতে নারী হয়ে ওঠে শুধুই উপভোগ্য মাংস।

ইসলাম নারীকে কিছু আর্থ সুবিধা দেয়, যা অন্য কোনো ধর্ম দেয় না। বিয়ের চুক্তির ফলে স্ত্রী স্বামীর কাছে থেকে পায় দেনমোহর ; কিছু টাকা বা সম্পত্তির লিখিত প্রতিশ্রুতি। ওই দেনমোহর শুধু কাবিনে লেখা থাকে, স্ত্রী তা সাধারণত পায় না, এমনকি বিচ্ছেদ হ’লেও দেনমোহর সাধারণত আদায় করতে পারে না। দেনমোহর পরিমাণে হয় খুবই কম ; হানাফি আইনে কমপক্ষে ১০ দিরহাম, মালিকি আইনে কমপক্ষে ৩ দিরহাম, আর হাদিস অনুসারে কমপক্ষে ১টি লোহার আংটি! বিয়ে স্ত্রীকে খোরপোষের অধিকার দেয়; স্ত্রীটির ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। ভরণপোষণের অধিকারের জন্যে স্ত্রীকে থাকতে হবে স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত, মেনে চলতে হবে স্বামীর নির্দেশ। স্বামী যেখানে থাকবে বা যেখানে থাকার জন্যে স্ত্রীকে নির্দেশ দেবে, সেখানেই থাকতে হবে স্ত্রীকে; স্ত্রী তা অমান্য করলে ভরণপোষণের অধিকারী হবে না। ইসলামে কন্যা পিতার সম্পত্তির ও স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে; কিন্তু তাদের অংশ খুবই কম। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার উত্তরাধিকার রয়েছে। পিতা যদি শুধুই একটি কন্যা রেখে মারা যায়, তবে সে পায় পিতার সম্পত্তির ১/২; আর ভাই থাকলে বোনের অংশ ভাইয়ের অংশের ১/২। স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির কতোটা পায়? সামান্য। স্বামী কিন্তু পায় স্ত্রীর সম্পত্তির একটি বড়ো অংশ। স্ত্রী কোনো সন্তান না রেখে মারা গেলে স্বামী তার সম্পত্তির ১/২ পায়, কিন্তু স্বামী কোনো সন্তান না রেখে মারা গেলে স্ত্রী পায় স্বামীর সম্পত্তির ১/২; আর সন্তান রেখে গেলে পায় স্বামীর সম্পত্তির ১/৮। তাই কন্যা বা স্ত্রী অর্থাৎ নারী আর্থিকভাবেও প্রতারিত, যদিও অর্থের প্রয়োজন তারই বেশি।

শরিয়া নারীকে কিছু আর্থ ও সম্পত্তির অধিকার দিয়ে কেড়ে নিয়েছে তার অন্যান্য অধিকার। মুসলমান পুরুষ বিয়ে করতে পারে ঐশীগ্রন্থে বিশ্বাসী যে-কোনো ধর্মের নারী; অগ্নি বা মূর্তিপূজারিণীও বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মুসলমান নারী অমুসলমান বিয়ে করার অধিকারী নয়। তবে শরিয়া আইনে নারীর প্রধান সংকট হচ্ছে স্বামীর বহুবিবাহের ও স্বেচ্ছাচারী তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার। তালাক মুসলমান নারীর জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ, ওই বজ্র যে-কোনো সময় নীলাকাশ থেকে তার মাথায় এসে ফাটতে পারে। মুসলমান পুরুষ চারটি বৈধ বিয়ে করতে পারে, পঞ্চম একটিও করতে পারে। পঞ্চম বিয়ে করলে বিয়েটি বাতিল হয় না, শুধু তার দরকার পড়ে আগের একটি স্ত্রীকে এক-দুই-তিন ক’রে তালাক দেয়া। মুসলমান পুরুষের জন্যে তার চারটি স্ত্রী সম্ভোগই শুধু বৈধ নয়, সে তার ক্রীতদাসীদের সাথেও সঙ্গম করার অধিকারী। মোহাম্মদ ইবনে সাদ এল তবকত এল কোবরা-য় (১৯৭০) ক্রীতদাসী সম্ভোগের একটি আকর্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন [দ্র নওঅল (১৯৮০, ১৯৭)]।

কোরান-এ আছে :

বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাদের তোমাদের ভালো লাগে, দুই তিন, অথবা চার, আর যদি আশংকা করো যে সুবিচার করতে পারবে ন তবে একজনকে, অথবা তোমাদের অধিকাবভুক্ত দাসীকে [সুরা নিসা : ৩]।

হাদিসে আছে [দ্ৰ নুর মোহাম্মদ (১৯৮৭, ২৪৬)] :

হজরত জাবের (রাঃ) বলেন : এক ব্যক্তি রজুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু অলাইহে ওয়া ছাল্লাম-এর নিকট আসিয়া বলিল : হুজুর, আমার একটি দাসী আছে; সে আমাদের খেদমত কবে। আমি তাহাকে উপভোগ করি অথচ তাহার গর্ভধারণ করাকে আমি পছন্দ করি না। হুজুর বলিলেন : ইচ্ছা থাকিলে ‘আজল’ করিতে পার।
হজরত আবু ছায়ীদ খুদরী (রাঃ) বলেন : আমরা রাজুলুল্লাহর (ছঃ) সাথে বনি মুস্তালিক যুদ্ধে বাহির হইলাম এবং তথায় আমরা বহু যুদ্ধবন্দী লাভ করিলাম। এ সময় আমাদের নারী সঙ্গমেব আকাঙ্খা জাগিল এবং নারীবিহীন থাকা আমাদের পক্ষে কষ্টকর হইয়া পড়িল কিন্তু আমরা (যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে) ‘আজল’ করাকেই পছন্দ করিলাম;…আমরা তাঁহাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন : না করিলেও তোমাদের কোনো ক্ষতি হইবে না।

শরিয়া আইনে প্রতিটি নারীর ভাগে পড়ে একচতুর্থাংশ স্বামী, যদিও এ-ধর্মের বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম অত্যন্ত প্ৰবল। মিলেট (১৯৬৯, ১১৯) হিশেবে ক’রে দেখিয়েছেন এক স্বামীর চারটি স্ত্রী থাকলে স্বামী ও প্রতিটি স্ত্রীর সঙ্গমসুযোগের অনুপাত হয় ১:১৬, প্রতিটি নারী যেখানে পায় তার স্বামীর যৌনপ্রতিভার সিকিভাগ, সেখানে স্বামীটি ভোগ করে চারটি স্ত্রীর প্রবল কাম। তবু আরবি চেতনায় নারী হচ্ছে ফিৎনা, যার কাম এলোমেলো ক’রে দিতে পারে সমাজ। বলা হয় চারটি বিয়ে সে-পুরুষই করার অধিকারী, যে সমান আচরণ করতে পারবে স্ত্রীদের সাথে। সমান আচরণ নারীকে সম্মানিত করে না, শুধু জানিয়ে দেয় তারা পুরুষের সম্ভোগের সামগ্ৰী। ওই সাম্য চুক্তিবদ্ধ দাসীদের বা শয্যাসঙ্গিনীদের মধ্যে মৌখিক বা চুক্তির সাম্য; কিন্তু কামে আর আবেগে সাম্য কখনোই সম্ভব নয়।

শরিয়ায় বিয়ে হচ্ছে পুরুষাধিপত্যের চুক্তি; পুরুষ ওই চুক্তি রদ করতে পারে স্বেচ্ছাচারিতার সাথে। ইসলামে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক গেলাশ থেকে জল ঢালার থেকেও সহজ–স্বামীর জন্যে; আর স্ত্রীর জন্যে ফাঁসির রজ্জু খোলার মতোই কঠিন। অধিকাংশ মুসলমান রাষ্ট্রেই নারী জীবন কাটায় তালাকের খড়গের নিচে, যে-কোনো সময় ওই খড়গ নেমে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে তালাক সাধারণ ঘটনা, সেখানে সম্পদশালীরা নিয়মিতভাবে তরুণী স্ত্রী গ্ৰহণ ক’রে বেহেশতের কিছুটা স্বাদ পেতে চায় ব’লে ব্যবহৃতাদের বাতিল না করলে চলে না। মুসলমানের এক সাথে চারটি স্ত্রী রাখার অধিকার রয়েছে, তবে তাতেও তার ক্ষুধা মিটতে নাও পারে; এবং সাধারণত মেটে না। ইসলামে স্বামীর পক্ষে তালাক দেয়া এতো সহজ ও সুবিধাজনক যে ওই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তার পক্ষে একই সাথে অসংখ্য স্ত্রী রাখা সম্ভব; এবং আরব অঞ্চলে ধনীরা এ-সুবিধা নিয়ে থাকে। আরব অঞ্চলে ‘ইদ্দা’ নামক একটি বিধান রয়েছে। ওই বিধান অনুসারে স্বামী তিন মাসের জন্যে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে; এবং তারপর তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে। এ-সময়ে স্বামীটি আরেকটি বিয়ে করতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে স্বামীটি ঘরে চারটি স্ত্রী রাখতে পারে, এবং আরো চারটি রাখতে পারে ‘ইদ্দা’ তালাকে বেঁধে। অর্থাৎ এ-সময়ে তার থাকে চারটি সক্রিয় স্ত্রী, আর চারটি ছুটিভোগরত স্ত্রী। এভাবে সে চারটিকে ঘরে ও চারটিকে তালাক-ছুটিতে রেখে সম্ভোগ করতে পারে অসংখ্য নারী। এ হচ্ছে ইসলামে নারীর মর্যাদা [দ্র নওঅল (১৯৮০, ২০৬)]। মুসলমান স্বামী কোনো কারণ না দেখিয়েই যে-কোনো সময় শুধু তিনবার ‘তালাক’ উচ্চারণ ক’রে স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে পারে; তবে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। স্ত্রীর তালাক দেয়ার সহজাত স্বাধীন অধিকার নেই। তবে স্ত্রীও স্বামীকে তালাক দিতে পারে, যদি বিয়ের কর্কশ। কবিনে স্বামী তাকে সে-অধিকার দিয়ে থাকে! তালাক দেয়ার প্রভু হচ্ছে পুরুষ, সে কোনো কারণ না দেখিয়ে একের পর এক স্ত্রী তালাক দিতে পারে; আর নারীকে ওই অধিকার পেতে হয় প্রভুরই কাছে থেকে। স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিলে দেনমোহরটুকুও সে পায় না, আর স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলে স্ত্রী শুধু দেনমোহর ছাড়া স্বামীর সম্পত্তির একরাত্তিও পায় না, দেনমোহর আদায় করাই হয়ে ওঠে কঠিন কাজ। বাঙলাদেশে বহুবিবাহ ও তালাকরীতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (১৯৬১) গৃহীত হওয়ার পর। তবে এ-আইনও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে নি, শুধু সামান্য নিয়ন্ত্রণের, এবং তালাকে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা হ্রাসের চেষ্টা করেছে। নারী এখনো হয়ে আছে শরিয়ার শিকার।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x