অক্কামের ক্ষুরকে দর্শনশাস্ত্রে অনেক সময় মিতব্যয়িতার নীতি’ (Principle of Parsimony/Economy) কিংবা ‘সরলতার নীতি’ (Principle of Simplicity) হিসেবে অভিহিত করা হয়। সংক্ষেপে এর মূলনীতিটি হলো–

Pluralitas non est ponenda sine neccesitate (Plurality should not be posited without necessity).

বাংলা করলে দাঁড়ায়– ‘অনাবশ্যক বাহুল্য সর্বদাই বর্জনীয়।

এই নীতি প্রয়োগ কিন্তু বিজ্ঞানে, ধর্মে, দর্শনে খুবই ব্যাপক। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘অক্কামের ক্ষুরের প্রয়োগ হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা অষ্কামের যে মূলনীতিটি অনুসরণ করেন তা হলো ‘যদি দুটি বৈজ্ঞানিক মডেল একই রকম ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা ফলাফল প্রদান করে থাকে, তবে অপেক্ষাকৃত সহজ মডেলটি সমাধান হিসেবে গ্রহণ করো’ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা সময় গ্রহদের অনিয়ত-গতিপ্রকৃতি জ্যোতির্বিদদের কাছে বড় ধরনের তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কেপলার এই সমস্যা সমাধান করতে আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন তিনটি সূত্র। আর পরবর্তীকালে একই সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কেপলারের এই তিনটি নিয়মের বদলে নিউটন আমাদের দিলেন একটি মাত্র সূত্র ‘মহাকর্ষীয় ব্যস্তবর্গীয় নিয়ম (Inverse Law of Gravity) যা দিয়ে গ্রহ উপগ্রহের চলাচলজনিত সমস্যাগুলোর একটা সহজ সমাধান পাওয়া যায়। দেখা গেল, এই একটি নিয়ম থেকেই কেপলারের পূর্বেকার নিয়মগুলো স্বতঃসিদ্ধভাবে বেরিয়ে আসে। কাজেই যখন থেকে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রটিকে ‘বৈজ্ঞানিক মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হলো, কেপলারের সূত্রগুলো ‘অনর্থক বাহুল্য হিসেবে পরিত্যক্ত হলো সংগত কারণেই। এটি অক্কামের সূত্রের একটি খুবই সার্থক প্রয়োগ।

অক্কামের ক্ষুরের আরেকটি সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় ইথারের ক্ষেত্রে। ঊনবিংশ শতাব্দীর পদার্থ বিজ্ঞানীরা আলো চলাচলের জন্য মাধ্যম হিসেবে ইথার’ নামক একটি অদৃশ্য, ঘর্ষণহীন, রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং ‘সর্বভূতে বিরাজমান’ এক রহস্যময় পদার্থ কল্পনা করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল শব্দ চলাচলের জন্য যেমন মাধ্যমের প্রয়োজন, তেমনই আলো চলাচলের জন্যও একটি মাধ্যম থাকতেই হবে। তারা ধরে নিয়েছিলেন এই পুরো মহাবিশ্বটাই ডুবে রয়েছে ইথার নামক এক অদৃশ্য পদার্থের অথৈ মহাসমুদ্রে। আর এই ইথার নামক মাধ্যমের সাহায্যেই আলো অনেকটা শব্দের মতোই তরঙ্গাকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ১৮৮০ সালে মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত পরীক্ষা এবং তারও পরে ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ব’ তাত্ত্বিকভাবে ইথারের অস্তিত্বকে নস্যাৎ করে দিল। গন্ধহীন, স্পর্শহীন রহস্যময় ‘ইথার’ ‘অহেতুক বাহুল্য হিসেবে পরিত্যক্ত হলো।

অক্কামের ক্ষুরের ব্যাপকতর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় দর্শনেই। নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকরা, অক্কামের ফুরের প্রযোগে যুক্তি দেখিয়ে থাকেন, ঈশ্বরের অনুমান নিতান্তই একটি অপ্রয়োজনীয় অনুকল্প। কীভাবে? নিম্নোক্ত দুটি হাইপোথিসিস বা অনুকল্প বিবেচনায় আনা যাক—

১) আমাদের সামনে এক জটিল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে, যেটি প্রাকৃতিক নিয়মে (Natural Process) উদ্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ,

০ মহাবিশ্বের অস্তিত্ব > প্রাকৃতিক নিয়ম

২) আমাদের সামনে এক জটিল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে, এবং একজন ঈশ্বর’ও রয়েছেন যিনি এই মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন। এখানে ‘ঈশ্বর স্বভাবতই একটি পৃথক সত্ত্বা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অর্থাৎ,

০ মহাবিশ্বের অস্তিত্ব > নিয়ম + ঈশ্বর

যদি এই দুইটি পথের মধ্যে একটিকে পছন্দ করতে হয়, তবে ‘অক্কামের সূত্র এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজটিকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে বলবে অর্থাৎ প্রথম সমাধানটি এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

কেউ কেউ অবশ্য তৃতীয় একটি সমাধানকে অপেক্ষাকৃত সহজ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন–

আমাদের সামনে কোনো জটিল। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নেই আসলে সবই মাযা আমাদের কল্পনা!

তবে এই তৃতীয় সমাধানটি আমাদের সলিপসিজমের (Solipsism) পথে নিয়ে যায় যা অধিকাংশ যুক্তিবাদীর কাছে অগ্রহণযোগ্য।

জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অক্কামের সূরের চমৎকার একটি প্রয়োগ আমরা পাই যখন চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন তত্ত্ব উইলিয়াম প্যালের ‘ডিজাইন আর্গুমেন্ট’ বা সৃষ্টির পরিকল্পিত যুক্তিকে বাতিল করে দিয়েছিল। উইলিয়াম প্যালে (১৭৪৩ ১৮০৫) ‘র বিখ্যাত বই ‘Natural Theology, or Evidence of Existence and Attributes of the Deity, collected from the Appearences of Nature’–প্রকাশিত হয় ১৮০২ সালে। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ছিল সেসময়। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়েও প্যালে ভেবেছিলেন বিস্তর, কিন্তু নিজেই শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন ‘বুদ্ধিদীপ্ত স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞান উপযুক্ত মাধ্যম নয়’; এ ক্ষেত্রে প্যালের ‘উপযুক্ত মাধ্যম মনে হয়েছিল বরং জীববিজ্ঞানকে। আর পূর্ববর্তী অন্যান্য ন্যাচারাল থিওলজিয়ানদের মতোই প্যালেও জীবজগতকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জীবের অভিযোজনের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। প্যালে লক্ষ্য করেছিলেন যে, প্রতিটি জীবদেহে নির্দিষ্ট কাজ করবার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যা জীবটিকে নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশে টিকে থাকতে সহায়তা করে। তিনি জটিল জীবদেহকে ঘড়ির কাঠামোর সাথে তুলনীয় মনে করেছিলেন, এবং তার মধ্যেই দেখেছিলেন স্রষ্টার সুমহান পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য আর নিপুণ তুলির আঁচর। আর চোখকে প্যালে অনেকটা জৈব-টেলিস্কোপ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, ঘড়ি কিংবা টেলিস্কোপ তৈরি করার জন্য যেহেতু একজন কারিগর দরকার, চোখ ‘সৃষ্টি করার জন্যও প্রয়োজন একজন অনুরূপ কোনো কারিগরের। সেই কারিগর যে একজন ব্যক্তি ঈশ্বর’ (Personal God) ই হতে হবে তা প্যালে খুব পরিষ্কার করেই বলেছিলেন তার গ্রন্থে।

প্যালের এই ‘ঘড়ির কারিগরের যুক্তি’ দর্শনশাস্ত্রে পরিচিত ‘পরিকল্পিত যুক্তি’ বা ‘আমেন্ট অব ডিজাইন নামে। এই যুক্তি ঈশ্বর নামক একটি সত্ত্বার অস্তিত্বের পেছনে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি হিসেবে বিশ্বাসীরা ব্যবহার করতেন। ডারউইনের বিবর্তন তত্বই প্রথমবারের মতো এই ডিজাইন আর্গুমেন্টকে শক্তিশালীভাবে চ্যালেঞ্জ করে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছিল। ডারউইন প্রস্তাব করলেন জীবদেহকে কেবল ঘড়ির সদৃশ যন্ত্রের মতো কিছু ভেবে বসে থাকলে চলবে না। জীবজগৎ যন্ত্র নয়; কাজেই যন্ত্র হিসেবে চিন্তা করা বাদ দিতে পারলে এর পেছনে আর কোনো ডিজাইন বা পরিকল্পনার মতো ‘উদ্দেশ্য খোঁজার দরকার নেই। জীবজগতে চোখ বা এধরনের জটিল। প্রত্যঙ্গের উদ্ভব ও বিবর্তনের পেছনে ডারউইন প্রস্তাব করলেন এক ‘অন্ধ কারিগরের’, নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ বছর ধরে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা পরিবর্তনের ফলে চোখের মতো অত্যন্ত জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গড়ে ওঠা সম্ভব। এ প্রক্রিয়াটির নাম ক্রমবর্ধমান নির্বাচন (Cumulative selection। একাধিক ধাপের এই ক্রমবর্ধমান নির্বাচনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে যে জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ভূত হতে পারে তা ইতোমধ্যেই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

চিত্র : ডারউইন দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ বছর ধরে ধাপে ধাপে গড়ে। ওঠা পরিবর্তনের ফলে কাঠঠোকরার ঠোঁটের মতো অত্যন্ত জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গড়ে ওঠা সম্ভব।

শুধু তাই নয়, এ পদ্ধতিতে আংশিকভাবে চোখের উৎপত্তি ও বিকাশ যে সম্ভব এবং তা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে যে একটি জীবের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে তুলতে পারে তারও অজস্র উদাহরণ রয়েছে আমাদের চারপাশে। বিবর্তন তত্ত্ব ডিজাইন আর্গুমেন্টকে। বাতিল করে দেয় বলেই আমরা আজ প্রজাতির ‘উৎপত্তির কথা বলি, ‘সৃষ্টি’র নয়। বিবর্তন তত্বই প্রথমবারের মতো আমাদের দেখিয়ে দিল যে, মানুষসহ অন্যান্য জীবের উদ্ভবের পেছনে কোনো স্বর্গীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই; অন্যান্য পশুপাখি, গাছপালা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ নামের দ্বিপদী প্রাণীটিও ঠিক একই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ পৃথিবীতে এসেছে, কোনো ধরনের ‘সৃষ্টি’ (কিংবা সৃষ্টিকর্তার হস্তক্ষেপ) ছাড়াই। বিবর্তন তত্ব কীভাবে সৃষ্টির পরিকল্প যুক্তি বা ডিজাইন আর্গুমেন্টকে সরাসরি বাতিল করে দেয়, সেটার তেরো পর্বের একটা flaps (written by Dylan Evans & Howard Selina) রাখা আছে মুক্তমনা সাইটে[৩৫০]। এর দার্শনিক অভিব্যক্তি এতই বিশাল ছিল যে, অধ্যাপক ডকিন্স বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, ডেভিড হিউম কিংবা বার্ট্রান্ড রাসেলেরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের যুক্তিগুলো বহুভাবে খণ্ডন করলেও ডারউইনের বিবর্তন তত্বই তাকে intellectually fulfilled atheist’-এ রূপান্তরিত করতে পেরেছে অত্যন্ত সার্থকতার সাথে। দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট সেজন্যই তার একটি বইয়ে বিবর্তন তত্বকে রাজাম্ল বা ইউনিভার্সাল এসিড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

যা হোক, লেখার এই পর্যায়ে এসে অক্কামের ক্ষুরের ইতিহাসটি পাঠকদের সামনে একটু ছোট করে বান করতে চাচ্ছি। অক্কামের ক্ষুর’ নামক এই অদ্ভুতুড়ে পরিভাষাটি আসলে এসেছে ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম অকহামের (William Ockham, ১২৪৫-১৩৪৯) নাম থেকে। অকহাম নিজে যদিও এই সূত্রটির উদ্ভাবক ছিলেন না, তবে এই সূত্রটি তিনি প্রায়শই বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতেন বলে শোনা যায়। আর সেজন্যই তার নাম এই সূত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আমরা অবশ্য জানি না যে, নাপিতের ‘দাঁড়ি কামানোর ক্ষুরের মতো ভয়ংকর একটা কিছুর আদলে তার নাম নিয়ে এই উদ্ভট পরিভাষা সৃষ্টির সাথে তিনি একমত হতেন কিনা, তবে তিনি চান বা না চান তার নামটি কিন্তু বিখ্যাত এই সূত্রের সাথে আজ ওতপ্রোতভাবেই জড়িয়ে রয়েছে। ‘অক্কামের ক্ষুর’ মধ্যযুগীয় দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

রসিকজনেরা কিন্তু এই সূত্রটি নিয়ে নানা ধরনের রসিকতা করতেও ছাড়েন নি। যেমন কেউ কেউ এই সূত্রটিকে অভিহিত করেন ‘Kiss’ সূত্র (Keep it simple, stupid) হিসেবে। কেউবা এই সূত্রটির নির্যাসকে তুলে ধরেন এভাবে–

যখন কোথাও ঘোড়ার ডাক শোনো, তখন ঘোড়ার কথাই মাথায় রেখো, জেব্রা বা জিরাফের নয়।

বিখ্যাত চিত্রকর ও বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) ছিলেন অকহামের সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। তিনিও তার মতো করে একটি ‘অক্কামের সূর’ তৈরি করেছিলেন। তার রচিত ‘অষ্কামের ক্ষুরটি ছিল এ রকম–

Simplicity is the ultimate sophistication

ইতিহাসে অক্কামের ফুরের একটি সার্থক প্রযোগের উল্লেখ পাওয়া যায় বিজ্ঞানী লাপ্লাস এবং নেপোলিয়নের একটি মজার ঘটনায়। মুক্তমনার প্রথম বই ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী,[৩৫১] শেষ হয়েছিল এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির উল্লেখে। তবে, ঘটনাটি বানানো কিছু নয়। ঘটনাটি আমাদের নজর কাড়ে বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহার ‘হিন্দু ধর্ম-বেদ-বিজ্ঞান সম্পর্কিত একটি চিত্তাকর্ষক বাদানুবাদ থেকে (আধুনিক বিজ্ঞান ও হিন্দুধর্মঃ অনিলবরণ রাযের সমালোচনার উত্তর, মেঘনাদ সাহা, মেঘনাদ রচনা সংকলন, শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, ওরিয়েন্ট লংম্যান, কলিকাতা, ১৯০৮, পৃষ্ঠা ১২৭-১৬৯ দ্র.)। বর্ণিত ঘটনাটি এরকম–

বিখ্যাত গণিতজ্ঞ লাপ্লাস তার সুবিখ্যাত ‘Mechanique Celeste’ গ্রন্থে গ্রহসমূহের এবং চন্দ্রের গতির খুব সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, গতিবিদ্যা ও মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে পর্যবেক্ষিত সকল গ্রহগতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দান সম্ভব। তিনি যখন গ্রন্থটি নেপোলিয়নকে উৎসর্গ করার জন্য অনুমতি চাইতে গেলেন, তখন নেপোলিয়ন রহস্য করে বলেন,

মসিঁয়ে লাপ্লাস, আপনি আপনার বইয়ে বেশ ভালোভাবেই মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের চালচলন ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু আমি দেখলাম আপনি কোথাও ঈশ্বরের নাম উল্লেখ করেন নি। আপনার মডেলে ঈশ্বরের স্থান কোথায়?

লাগ্লাস উত্তরে বললেন, স্যার, এই বাড়তি অনুকল্পের কোনো প্রয়োজন নেই।

 

ঈশ্বরই কি সৃষ্টির আদি বা প্রথম কারণ?

বার্ট্রান্ড রাসেল তার বিখ্যাত ‘Why I am not a Christian প্রবন্ধে প্রথম কারণ সম্বন্ধে বলেন–

আমাদের আগেই বুঝে রাখা দরকার যে জগতের যা কিছু আমরা দেখতে পাই, সবকিছুর একটি কারণ আছে। এই কারণকে প্রশ্ন করতে করতে আপনি পেছনের দিকে এগিয়ে গিয়ে অবশ্যই প্রথম কারণের (First Cause) সম্মুখীন হবেন, এবং এই প্রথম কারণকেই স্বতঃসিদ্ধভাবে ‘ঈশ্বর হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।… আমিও বহুদিন ধরেই এটিকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলাম কিন্তু একদিন, যখন আমার বয়স আঠারো, আমি জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনী পড়ছিলাম, আর পড়তে গিযেই সেখানে এই বাক্যটি পেলাম: ‘আমার বাবা আমাকে প্রশ্ন করলেন। ‘কে আমাকে তৈরি করেছে?” আমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি নি। কিন্তু এই প্রশ্নটি আমাকে আরও একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের দিকে ঠেলে দিল। যেটি হলো ঈশ্বরই যদি আমাকে তৈরি করে থাকেন, তবে ঈশ্বরকে তৈরি করেছে কে? আমি এখনও মনে করি ঈশ্বরকে তৈরি করেছে কে? এই সহজ সরল বাক্যটি প্রথম কারণ সম্পর্কিত যুক্তির দোষটি। সেই প্রথম আমাকে দেখালো। যদি প্রতিটি জিনিসের একটি কারণ থাকে, তবে ঈশ্বরেরও কারণ থাকতে হবে। আবার যদি কারণ ছাড়াই কোনোকিছু থাকতে পারে (যেমন ঈশ্বর), তবে এই যুক্তি ঈশ্বরের জগতের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

‘বিগব্যাং তত্বটি বৈজ্ঞানিক সমাজে গৃহীত হওয়ার পর পরই বিশ্বাসীদের মধ্যে নতুন করে প্রথম কারণটিকে প্রতিষ্ঠিত করার নব উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেল। ১৯৫১ সালে Pope Pius XII পন্টিফিকাল অ্যাকাডেমির সভায় বলেই বসলেন–

যদি সৃষ্টির শুরু থাকে, তবে অবশ্যই এই সৃষ্টির একজন স্রষ্টাও রয়েছে, আর সেই স্রষ্টাই হলেন ঈশ্বর।

জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এবং ধর্মযাজক জর্জ হেনরি লেমিত্রি (যিনি ‘বিগব্যাং’ প্রতিভাসের একজন অন্যতম প্রবক্তা) পোপকে সেসময় বিনয়ের সঙ্গে এধরনের যুক্তিকে ‘অভ্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ইদানীংকালে ‘কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (Kalam Cosmological Argument) নামে একটি দার্শনিক যুক্তিমালা সাধারণ বিশ্বাসীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত সুদর্শন দার্শনিক এবং পেশাদার বিতার্কিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ (William Lane Craig) ১৯৭৯ সালে লেখা The Kalam Cosmological Argument বইয়ের মাধ্যমে যুক্তির এই ধারাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। ধারাটিকে নিচের চারটি ধাপের সাহায্যে বর্ণনা করা যায়–

১। যার শুরু (উৎপত্তি) আছে, তার পেছনে একটি কারণ রয়েছে।

২। আমাদের আজকের এই মহাবিশ্বের একটি উৎপত্তি আছে।

 ৩। সুতরাং এই মহাবিশ্বের পেছনে একটি কারণ আছে।

 ৪। সেই কারণটিই হলো ‘ঈশ্বর।

দার্শনিকেরা কালামের যুক্তিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন বিভিন্ন সময়েই[৩৫২]। এ বইয়েও কয়েকটি প্রবন্ধে ‘আদি কারণের’ যুক্তিগুলোর খণ্ডন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখানে ‘বাহুল্য বিধায় সেগুলোর পুনরুল্লেখ করা হলো

। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়। সবকিছুর পেছনেই কারণ আছে বলে পেছাতে পেছাতে বিশ্বাসীরা ঈশ্বরের কাছে গিয়ে হঠাৎ করেই থেমে যান। এ সময় আর তারা যেন কোনো কারণ খুঁজে পান না। মহাবিশ্বের জটিলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যদি ঈশ্বর নামক একটি সার আমদানি করতেই হয়, তবে সেই ঈশ্বরকে ব্যাখ্যা করার জন্য একই যুক্তিতে আরেকটি ‘ঈশ্বর’কে কারণ হিসেবে আমদানি করা উচিত। তারপর সেই ঈশ্বরের ঈশ্বর’-এর অস্তিত্ব ব্যাখ্যার জন্য লাগবে আরেকজন ঈশ্বর। এভাবে আমদানির খেলা চলতেই থাকবে একের পর এক, যা আমাদেরকে অসীমের দিকে ঠেলে দেবে। এই ব্যাপারটি স্বাভাবিকভাবেই সকল বিশ্বাসীদের কাছে আপত্তিকর। তাই ধর্মবাদীরা নিজেরাই ‘সবকিছুর পেছনেই কারণ আছে এই স্বতঃসিদ্ধের ব্যতিক্রম হিসেবে ঈশ্বরকে কল্পনা করে থাকেন আর সোচ্চারে ঘোষণা করেন ঈশ্বরের অস্তিত্বের পেছনে কোনো কারণের প্রয়োজন নেই। সমস্যা হলো যে, এই ব্যতিক্রমটি কেন শুধু ঈশ্বরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কেন নয় এর কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন না।

দর্শন ছেড়ে এবার বিজ্ঞানের দিকে চোখ ফেরানো যাক। ‘যার শুরু আছে তার পেছনে কারণ থাকতেই হবে’-কালামের যুক্তিমালার প্রাথমিক ধাপটিকে বিজ্ঞানের জগতে অনেক আগেই খণ্ডন করা হয়েছে কারণবিহীন কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের উদাহরণ হাজির করে।

আণবিক পরিবৃত্তি, আণবিক নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয় অবক্ষয়ের মতো কোয়ান্টাম ঘটনাসমূহ ‘কারণবিহীন ঘটনা হিসেবে ইতোমধ্যেই বৈজ্ঞানিক সমাজে স্বীকৃত। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব অনুযায়ী সামান্য সময়ের জন্য শক্তি উৎপন্ন ও বিনাশ ঘটতে পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো কারণ ছাড়াই। এগুলো সবগুলোই পরীক্ষিত সত্য। কাজেই উপরের উদাহরণগুলোই কালামের যুক্তিকে খণ্ডন করার জন্য যথেষ্ট।

সম্প্রতি বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস তার লেখা A Universe from Nothing[৩৫৩] বইটিতে তথাকথিত শূন্য থেকে কীভাবে জড় কণিকা উদ্ভূত হয় তা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। বহু বিজ্ঞানীই আজ মনে করেন এক কারণবিহীন কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের (Quantum Fluctuation) মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্বের উৎপত্তি হতে পারে, যা পরবর্তীকালে সৃষ্ট মহাবিশ্বকে স্ফীতির (Inflation) দিকে ঠেলে দিয়েছে, এবং আরও পরে পদার্থ আর কাঠামো তৈরির পথ সুগম করেছে[৩৫৪]। এগুলো কোনো কল্পকাহিনি নয়। মহাবিশ্ব যে শূন্য থেকে উৎপন্ন হতে পারে প্রথম এ ধারণাটি ব্যক্ত করেছিলেন এডওয়ার্ড ট্রিয়ন ১৯৭৩ সালে ‘নেচার’ নামক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নালে[৩৫৫]। এরপর আশির দশকে স্ফীতি তত্ত্বের আবির্ভাবের পর থেকেই বহু বিজ্ঞানী প্রাথমিক কোয়ান্টাম ফ্লাকচুযেশনের ধারণাকে স্ফীতি তত্বের সাথে জুড়ে দিয়ে মডেল বা প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন। শুন্য থেকে এই মহাবিশ্ব উৎপত্তির ধারণা যদি অবৈজ্ঞানিক এবং ভ্রান্তই হতো, তবে সেগুলো প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী (Scientific Journal) গুলোতে কখনোই প্রকাশিত হতো না। মূলত স্ফীতি তত্বকে সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এবং প্রায় সবগুলোতেই এই তত্ব অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়েছে[৩৫৬]। স্ফীতি তত্ব গ্যালাক্সির ক্লাস্টারিং, এক্স রশ্মি এবং অবলোহিত তেজস্ক্রিয়তার বিন্যাস, মহাবিশ্বের প্রসারণের হার এবং এর ব্যস, মহাবিশ্ব গঠনে এর উপাদানগুলোর প্রাচুর্য সবকিছুই ব্যাখ্যা করতে পেরেছে নিখুঁত সৌন্দর্যে। এর কারিগরি দিকগুলো এখানে আলোচনা করছি না, এগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে অভিজিৎ রায় এবং মীজান রহমানের ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব বইয়ে[৩৫৭]।

আসলে ইনফ্লেশন বা স্ফীতি নিয়ে আঁদ্রে লিন্ডে আর তার দলবলের সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে সত্যিকার অর্থেই সেই উত্তপ্ত বিগব্যাং যার মাধ্যমে পনেরো শ’ কোটি বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এ মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তাকে বিদায় জানানোর সময় এসে গিয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিগব্যাং দিয়ে মহাবিশ্বের শুরু নয়, বরং মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে ইনফ্লেশন দিয়ে। অর্থাৎ, বিগব্যাং-এর পরে ইনফ্লেশনের মাধ্যমে মহাবিশ্ব তৈরি (যা কিছুদিন আগেও সত্যি বলে ভাবা হতো) হয় নি, বরং ইনফ্লেশনের ফলশ্রুতিতেই কিন্তু বিগব্যাং হয়েছে, তারপর সৃষ্ট হয়েছে আমাদের মহাবিশ্ব। তার কথায়[৩৫৮]–

Inflation is not a part of big-bang theory as we thought 15 years ago. On the contrary, the big-bang is the part of inflationary model.

আরও মজার ব্যাপার হলো, ওই ইনফ্লেশনের ফলে শুধু যে একবারই বিগব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ ঘটেছে তা কিন্তু নয়, এরকম বিগব্যাং কিন্তু হাজার হাজার কোটি কোটি এমনকি অসীমসংখ্যকবার ঘটতে পারে; তৈরি হতে পারে অসংখ্য ‘পকেট মহাবিশ্ব। আমরা সম্ভবত এমনই একটি পকেট-মহাবিশ্বে অবস্থান করছি বাকিগুলোর অস্তিত্ব সম্বন্ধে জ্ঞাত না হয়ে (এ ব্যাপারটিকে বলা হয় ‘মাল্টিভার্স বা অনন্ত মহাবিশ্বের ধারণা[৩৫৯])। এই ধারণা অনুযায়ী আমাদের মহাবিশ্ব যাকে এতদিন প্রকৃতির পুরো অংশ বলে ভেবে নেওয়া হতো, আসলে হয়ত এটি এক বিশাল কোনো অমনিভার্স (Omniverse)-এর খুব ক্ষুদ্র অংশবিশেষ ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের অবস্থাটা এতদিন ছিল সেই বহুল প্রচলিত ‘অন্ধের হস্তি দর্শন গল্পের অন্ধ লোকটির মতো হাতির কান ছুঁযেই যে ভেবে নিয়েছিল ওইটাই বুঝি হাতির পুরো দেহটা! যাহোক, নিচের ছবিটি দেখলে লিন্ডের সাম্প্রতিক স্ফীতি তত্বটি (যেটির নামকরণ করা হয়েছে Chaotic inflation) কী বলতে চাইছে এ সম্বন্ধে হয়ত কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।

চিত্র : লিন্ডের সাম্প্রতিক তত্ব বলছে কেওটিক ইনফ্লেশনের ফলে উৎপত্তি হয়েছে অসংখ্য সম্প্রসারিত বুদ্বুদ এবং প্রতিটি সম্প্রসারিত বদ্বুদই আবার জন্ম দিয়েছে এক একটি ‘বিগব্যাং-এর। আর সেই এক একটি বিগব্যাং পরিশেষে জন্ম দিয়েছে এক একটি পকেট মহাবিশ্বের। আমরা এধরনেরই একটি পকেট মহাবিশ্বে বাস করছি (ছবির উৎস-সায়েন্টিফিক আমেরিকান)।

দেখা যাচ্ছে, এ তত্ত্ব অনুযায়ী কেওটিক ইনফ্লেশনের ফলে উৎপত্তি হয়েছে অসংখ্য সম্প্রসারিত বুদ্বুদ (Expanding Bubbles) এবং প্রতিটি সম্প্রসারিত বদ্বুদই আবার জন্ম দিয়েছে এক একটি ‘বিগব্যাং-এর। আর সেই এক একটি বিগব্যাং পরিশেষে জন্ম দিয়েছে এক একটি পকেট মহাবিশ্বের। আমরা এধরনেরই একটি পকেট মহাবিশ্বে বাস করছি। এ তত্ব আজ অনেকের মাঝেই তৈরি করেছে ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা’ এক সর্বজনীন দার্শনিক আবেদনের এ মহাবিশ্ব যদি কোনো দিন ধ্বংস হয়ে যায়ও, জীবনের মূল সত্ত্বা হয়ত টিকে থাকবে অন্য কোনো মহাবিশ্বে, হয়ত অন্য কোনোভাবে, অন্য কোনো পরিসরে

লিন্ডের মতে এ তত্বের সমাধানটি এতটাই সরল যে, এর আগে এটি বিজ্ঞানীদের মাথায় কেন আসে নি তা ভেবে লিন্ডে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছেন। অ্যালেন গুথ, যাকে ইনফ্লেশন তত্ত্বের জনক হিসেবে অভিহিত করা। হয়, তিনি তার ‘দ্য ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স বইয়ে মহাবিশ্বের উদ্ভবকে একটি ‘আল্টিমেট ফ্রি লাঞ্চ হিসেবে অভিহিত করে বলেন–

Most important of all, the Question of the Origin of the matter in the Universe is no longer thought to be beyond of science. … If inflation is correct, then the inflationary mechanism is responsible for creation of essentially all the matter and energy in the Universe. … After two thousand years of scientific research, it now seems likely that Lucretius (who said ‘Nothing can be created from nothing’) was wrong. Conceivably, everything can be created from nothing. And ‘everything’ might include a lot more than what we can see. In the context of inflationary cosmology, it is fair to say that Universe is the ultimate free lunch!

অনেক বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকেরাই মনে করেন, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের ধারণার সাথে সমন্বিত করা ইনফ্লেশন বা স্ফীতি তত্ব যখন একেবারে শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির একটি প্রাকৃতিক এবং যৌক্তিক সমাধান দিতে পারছে, তখন ঈশ্বর সম্ভবত একটি বাড়তি হাইপোথিসিস’ ছাড়া আর কিছু নয়।

ইনফ্লেশন বা স্ফীতি তত্ব ছাড়াও আরেকটি তত্ব মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ইদানীং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পল স্টাইনহার্ট এবং নেইল টুরকের প্রস্তাবিত এই চক্রাকার মহাবিশ্ব বা ‘সাইক্লিক মডেলে’ তারা দেখিয়েছেন আমাদের মহাবিশ্বের কোনো শুরু নেই, শেষ নেই। এ এক চলমান অনন্ত, অফুরন্ত মহাবিশ্ব (endless universe)। তাদের আঁকা এ ছবিতে ‘বিগব্যাং দিয়ে স্থান কালের (space-time) শুরু নয়, বিগব্যাং–কে তারা দেখিয়েছেন কেবল একটি ঘটনা হিসেবে যার উদ্ভব হয় স্ট্রিং তাত্বিকদের কথিত দুটো ব্রেনের সংঘর্ষের (collision of branes) ফলে। এবং কেবল একবারই এই মহাবিস্ফোরণ ঘটবে বা ঘটেছে তাও নয়, বরং এ মহাবিশ্ব প্রাকৃতিক বিবর্তনের চক্রে চির চলমান। তারা গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের যাত্রাপথের প্রতিটি চক্রে বিগব্যাং উদ্ভব ঘটায় উত্তপ্ত পদার্থ এবং শক্তির। কালের পরিক্রমায় ক্রমশ শীতল হয়ে এর থেকে তৈরি হয় গ্যালাক্সি আর তারকারাজি, যা আমরা আজ চোখ মেললেই দেখতে পাই। আজ থেকে ট্রিলিয়ন বছর পরে আবারও বিগব্যাং ঘটবে এবং তৈরি করবে নতুন চক্রের। পল স্টেইনহার্ট এবং নেইল টুরক তাদের প্রস্তাবিত মডেলকে সাধারণ পাঠকদের কাছে নিয়ে এসেছেন সম্প্রতি ‘Endless Universe’ বইয়ের মাধ্যমে[৩৬০]। নতুন এ তত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের যেহেতু কোনো শুরু’ নেই, এর পেছনে কোনো স্রষ্টা বসানোর চেষ্টা অর্থহীন। বিশ্বাসীদের অতি-প্রিয় কালামের যুক্তিমালা এ মডেলের জন্য একেবারেই প্রায়োগিক নয়।

চিত্র : পল স্টেইনহার্ট এবং নেইল টুরক তাদের প্রস্তাবিত এই চক্রাকার মহাবিশ্ব বা ‘সাইক্লিক মডেলে’ দেখিয়েছেন আমাদের মহাবিশ্বের কোনো শুরু নেই, শেষ নেই, এবং পদার্থ এবং শক্তির উদ্ভব হয় দুটো ব্রেনের সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতে, এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে অনন্তকাল।

মহাবিশ্বের সত্যিকার প্রকৃতি বোঝার জন্য হয়ত আমাদের ভবিষ্যতের কারিগরি জ্ঞানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, তবে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইনফ্লেশনারি কিংবা সাইক্লিক যে মহাবিশ্বই ভবিষ্যতে সঠিক প্রমাণিত হোক না কেন, এ দুটি তত্বের কোনো তই তাদের তত্ত্বকে সার্থকতা দেওয়ার জন্য কোনো অলৌকিক সত্বর উপর নির্ভর করছে না, মডেলগুলো নির্মাণ করা হয়েছে আমাদের জানা শোনা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম নীতি অনুসরণ করেই।

আরেকটি কথা বলা প্রাসঙ্গিক হবে এ ব্যাপারে। বিজ্ঞান কিন্তু কোনো বিষয় সম্পর্কে পরম বা নিখুঁত জ্ঞান দিতে পারে না। আজকে আণবিক স্থানান্তর, নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মতো ঘটনার কারণ পাওয়া যাচ্ছে না, ভবিষ্যতে পাওয়া যেতেই পারে। কেউই সে সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছে না। ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনের ‘আদি’ কারণও। কিন্তু সেই কারণটি যে ঈশ্বরের মতো মহাপরাক্রমশালী ‘সত্ত্বা’ই হতে হবে, এটি ভেবে নেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই, বরং কারণটি হতে পারে সম্পূর্ণভাবেই ‘প্রাকৃতিক। ওযেস মরিসন তার ‘Must the Beginning of the Universe Have a Personal Cause? A Critical Examination of the Kalam’s Cosmological Argument’-এ বলেন–

সৃষ্টির সবকিছুর পেছনেই কারণ আছে এ ব্যাপারটি ধ্রুব সত্য নয়। আর যদিও বা ইতিহাসের পরিক্রমায় কখনও বের হয়ে আসে যে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে একটি ‘আদি’ কারণ রয়েছেই, তবুও একথা ভেবে নেওয়ার কারণ নেই। যে, সেই আদি কারণটি ঈশ্বরের মতো একটি ব্যক্তি সম্বাই হতে হবে।

পদার্থবিদ ড. ভিক্টর স্টেঙ্গরও একই ধরনের মত ব্যক্ত করে বলেন–

ধরে নিলাম কালামের কথা অনুযায়ী মহাবিশ্বের একটি কারণ রয়েছেই, তো সেই একটা কারণ কেন স্রেফ প্রাকৃতিক কারণ হতে পারবে না? কাজেই দেখা যাচ্ছে কালামের যুক্তিমালা প্রায়োগিক এবং তাত্বিক দুদিক থেকেই ব্যর্থ হচ্ছে।

 

নাস্তিকতাও একটি ধর্ম (বিশ্বাস) হলে…

আমরা দেখেছি অনেকেই বুঝে হোক, না বুঝে হোক, এই ব্যাপারটি মাঝে মধ্যে এভাবেই আউড়ে দেন যে, আস্তিক্যবাদের মতো নাস্তিক্যবাদও এক ধরনের বিশ্বাস। আস্তিকরা যেমন ঈশ্বর আছে এই মতবাদে বিশ্বাস করে, তেমন নাস্তিকরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর নেই’-এই মতবাদে। দুটোই নাকি বিশ্বাস। যেমন, একবার মুক্তমনা ব্লগে এক ভদ্রলোক তর্ক করতে গিয়ে বলে বসলেন–

নাস্তিক মানেই বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর নেই। কিন্তু ঈশ্বর নেই’ এটি প্রমাণিত সত্য নয়। শুধু যুক্তি দিয়েই বোঝানো সম্ভব ঈশ্বর নেই’ বিবৃতিটি আসলে ফাঁকিবাজি।

নাস্তিক মানেই বিশ্বাসী, কিংবা নাস্তিকতাবাদও একটি বিশ্বাস এগুলো ঢালাওভাবে আউড়ে দিয়ে নাস্তিকতাবাদকেও এক ধরনের ‘ধর্ম হিসেবে হাজির করার চেষ্টাটি আমরা বহু মহলেই দেখেছি। নাস্তিকদের এভাবে সংজ্ঞায়ন সঠিক কি ভুল, তা বুঝবার আগে ‘নাস্তিক’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থটি আমাদের জানা প্রয়োজন। নাস্তিক’ শব্দটি ভাঙলে দাঁড়ায়, নাস্তি + কন বা নাস্তিক। নাস্তি’ শব্দের অর্থ হলো নাই, অবিদ্যমান। ‘নাস্তি’ শব্দটি মূল সংস্কৃত হতে বাংলায় এসে ‘ক’ বা ‘কন’ প্রত্যয় যোগে নাস্তিক হয়েছে যা তৎসম শব্দ হিসেবে গৃহীত। ন আস্তিক = নাস্তিক যা নঞ তৎপুরুষ সমাসে সিদ্ধ এবং আস্তিকের বিপরীত শব্দ। আরও সহজ বাংলায় বললে বলা যায়, না + আস্তিক = নাস্তিক। খুবই পরিষ্কার যে, সঙ্গত কারণেই আস্তিকের আগে ‘না’ প্রত্যয় যোগ করে নাস্তিক শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। আস্তিকরা যে ঈশ্বর/আল্লাহ/খোদা ইত্যাদি পরম সত্ত্বায় বিশ্বাস করে এ তো সবারই জানা। কাজেই নাস্তিক হচ্ছে তারাই, যারা এই ধরনের বিশ্বাস হতে মুক্ত। তাই সংজ্ঞানু্যায়ী নাস্তিকতা কোনো বিশ্বাস নয়, বরং বিশ্বাস হতে মুক্তি বা বিশ্বাসহীনতা। ইংরেজিতে নাস্তিকতার প্রতিশব্দ হচ্ছে। ‘Atheist?l সেখানেও আমরা দেখছি theist শব্দটির আগে ‘a প্রিফিক্সটি জুড়ে দিয়ে Atheist শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। নাস্তিকতা এবং মুক্তচিন্তার উপর বহুল প্রচারিত গবেষণাধর্মী একটি ওযেবসাইটে শব্দটির সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে–

Atheism is characterized by an absence of belief in the existence of gods. This absence of belief generally comes about either through deliberate choice, or from an inherent inability to believe religious teachings which seem literally incredible. It is not a lack of belief born out of simple ignorance of religious teachings.

সহজেই অনুমেয় যে, ‘absence of belief’ শব্দমালা চয়ন করা হয়েছে ‘বিশ্বাসহীনতা’কে তুলে ধরতেই, উল্টোটি বোঝাতে নয়। Gordon Stein তার বিখ্যাত ‘An Anthology of Atheism and Rationalism’ বইয়ে নাস্তিকতার (Atheism) সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেন–

When we examine the components of the word ‘atheism,’ we can see this distinction more clearly. The word is made up of ‘a-’ and—theism.’ Theism, we will all agree, is a belief in a God or gods. The prefix ‘a-’ can mean ‘not’ (or ‘no’) or ‘without. If it means ‘not,’ then we have as an atheist someone who is not a theist (i.e., someone who does not have a belief in a God or gods). If it means ‘without,’ then an atheist is someone without theism, or without a belief in God. (Atheism and Rationalism, p. 3. Prometheus, 1980)

আমরা যদি atheist শব্দটির আরও গভীরে যাই তবে দেখব যে, এটি আসলে উদ্ভূত হয়েছে গ্রিক শব্দ ‘a’ এবং ‘theos’ হতে। গ্রিক ভাষায় ‘theos’ বলতে বোঝায় ঈশ্বরকে, আর ‘a’ বলতে বোঝায় অবিশ্বাস বা বিশ্বাসহীনতাকে। সেজন্যই Michael Martin তার ‘Atheism : A Philosophical Justification বইয়ে বলেন–

According to its Greek roots, then, atheism is a negative view, characterized by the absence of belief in God. (Atheism : A Philosophical Justification’, p. 463.,Temple University Press, 1990)

আসলে নাস্তিকদের বিশ্বাসী দলভুক্ত করার ব্যাপারটি খুবই অবিবেচনাপ্রসূত। ব্যাপারটাকে আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক, এক মুক্তমনা যুক্তিবাদী ব্যক্তি ভূতে বিশ্বাস করেন না। তবে কি সেজন্য তিনি ‘না-ভূতে বিশ্বাসী হয়ে গেলেন? উনাদের যুক্তি অনুযায়ী তাই হওয়ার কথা। এভাবে দেখলে, প্রতিটি অপ-বিশ্বাস বিরোধিতাই তাহলে উল্টোভাবে ‘বিশ্বাস বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, তা সে ভূতই হোক, পঙ্খিরাজ ঘোড়াই হোক, অথবা ঘোড়ার ডিমই হোক। যিনি পঙ্খিরাজ ঘোড়া বা চাঁদের চরকা-বুড়ির অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না, তিনি আসলে তার সংশয় এবং অবিশ্বাস থেকেই তা করেন না, তার ‘না-বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে নয়। যদি ওই ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন ওগুলোতে তিনি বিশ্বাস করেন না, তিনি হয়ত জবাবে বলবেন, ওগুলোতে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি বলে। কিংবা হয়ত বলতে পারেন, এখন পর্যন্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ওগুলো সত্ত্বার বাস্তব অস্তিত্ব কেউ প্রমাণ। করতে পারেন নি, তাই ওসবে বিশ্বাস করার প্রশ্ন ওঠে না। এটি পরিষ্কার যে, এই বক্তব্য থেকে তার মনের সংশয় আর অবিশ্বাসের ছবিটিই আমাদের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে, বিশ্বাসপ্রবণতাটি নয়। ঈশ্বরে অবিশ্বাসের ব্যাপারটিও কিন্তু তেমনই। নাস্তিকেরা তাদের সংশয় আর অবিশ্বাস থেকেই নাস্তিক হন, ‘না-ঈশ্বরে বিশ্বাস থেকে নয়। সে জন্যই মুক্তমনা Dan Barker তার বিখ্যাত ‘Losing Faith in Faith: From Preacher to Atheist’ গ্রন্থে পরিষ্কার করেই বলেছেন ‘Basic atheism is not a belief. It is the lack of belief.’ (পৃ. ৯৯)। আসলে সত্যি বলতে কী, ‘বিশ্বাস ব্যাপারটিই দাঁড়িয়ে আছে একটি ‘অপ-বিশ্বাসমূলক প্রক্রিয়ার উপর। ড. হুমায়ুন আজাদের একটি উক্তিও এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,

যে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই, যার কোনো অস্তিত্ব নেই যা প্রমাণ করা যায় না, তাতে মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়। মানুষ ভূতে বিশ্বাস করে, পরীতে বিশ্বাস করে বা ভগবানে, ঈশ্বরে বা আল্লায় বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাস সত্য নয়, এগুলোর কোনো বাস্তবরূপ নেই। মানুষ বলে না, আমি গ্লাসে বিশ্বাস করি বা পানিতে বিশ্বাস করি, মেঘে বিশ্বাস করি। যেগুলো নেই সেগুলোই মানুষ বিশ্বাস করে। বিশ্বাস একটি অপবিশ্বাসমূলক ক্রিয়া। যা সত্য, তাতে বিশ্বাস করতে হয় না; যা মিথ্যে তাতে বিশ্বাস করতে হয়। তাই মানুষের সব বিশ্বাস ভুল বা ভ্রান্ত, তা অপবিশ্বাস।

নাস্তিকেরা সঙ্গত কারণেই এই সমস্ত প্রথাগত অপবিশ্বাসের বাইরে। ঈশ্বর নেই’ বিবৃতিটি যদি ‘পলিটিকালি কারেক্ট সংশ্যবাদীদের কাছে ‘ফাঁকিবাজি’ হয়, তবে অশ্বত্থামা, ট্যাঁশ গরু, বকচ্ছপ, থর জিউস, জলপরী, ফ্লাইং স্পেগেটি মনস্টার এগুলো নেই বলাও এক ধরনের ফাঁকিবাজি’।

ধর্মকারী নামে একটি সাইট আছে আন্তর্জালে। সাইটটির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে-’যুক্তিমনস্কদের নির্মল বিনোদনের ব্লগ। এই ব্লগে ধর্মের যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করা হবে, ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে, অপদস্থ করা হবে, ব্যঙ্গ করা হবে। যেমন করা হয়ে থাকে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা বা অন্যান্য যাবতীয় বিষয়কে। সেখানকার একটি পোস্ট থেকে কিছু অমৃতবচন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। নাস্তিক্যবাদকে ধর্মের সঙ্গে যারা তুলনা করে থাকে, তাদের বলতে ইচ্ছে করে–

১. নাস্তিক্যবাদ ধর্ম হলে ‘অফ বাটনকে টিভি চ্যানেল বলতে হয়।

২. নাস্তিক্যবাদ ধর্ম হলে টাককে বলতে হয়। চুলের রঙ।

৩. নাস্তিক্যবাদ ধর্ম হলে স্ট্যাম্প না জমানোকে হবি বলতে হ্যাঁ।

৪. নাস্তিক্যবাদ ধর্ম হলে বাগান না করাও একটি শখ, ক্রিকেট না খেলাও একটি ক্রীড়া, কোকেইন সেবন না করাও একটি নেশা।

এই চমৎকার উপমাগুলোর পাশাপাশি মুক্তমনা ব্লগে অনুরূপ কয়েকটি বাক্য উল্লেখ করে তালিকার শ্রীবৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছিলাম, সেগুলো হয়ত পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে–

‘নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস হলে বোবা লোককে ‘ভাষাবিদ হিসেবে ডাকতে হয়।

 নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস হলে দন্তহীন ব্যক্তিকে ‘দাঁতাল’ আখ্যা দিতে হয়।

নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস হলে উপোস থাকাকেও এক ধরনের ‘খাদ্যগ্রহণ’ বলতে হয়।

 নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস কিংবা ধর্ম হলে চাকরি না করাটাও একটি পেশা।

 নাস্তিকতা একটি ধর্ম হলে বই না পড়াকেও বলতে হয় পাঠাভ্যাস।

 নাস্তিকতা বিশ্বাস হলে পোশাক খুলে ফেলাটাও এক ধরনের পোশাক পরিধান।

নাস্তিকতা ধর্ম হলে চশমা না পরাটাও এক ধরনের সানগ্লাসের ফ্যাশন।

নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস হলে চিরকৌমার্যও বিবেচিত হওয়া উচিত এক ধরনের ‘বিবাহ’ হিসেবে।

 নাস্তিকতা একটি বিশ্বাস হলে নির্লোভ থাকার চেষ্টাকেও এক ধরনের ‘লোভ’ বলতে হয়।

 নাস্তিকতা একটি ধর্ম হলে নিরোগ স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়াটাও তাহলে এক ধরনের রোগ!

 

যাদের কাছে ঋণী

প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে ব্যবহৃত মনীষীদের বেশ কয়েকটি উদ্ধৃতি সংগ্রহ এবং অনুবাদ করেছেন ধর্মকারী ওযেবসাইটের (www.dhormockery.com) সঞ্চালক। বিজ্ঞান লেখক বন্যা আহমেদ এ বইয়ের বিবর্তন অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাঠ করে মতামত দিয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞান অংশে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী তানভীরুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত আকণ্ঠ ঋণী করেছে আমাদের। বইয়ের অংশবিশেষ মুক্তমনা এবং ক্যাডেট কলেজ ব্লগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় বহু পাঠক তাদের সুচিন্তিত মতামত দিয়েছিলেন। সেই মতামত এবং পরামর্শগুলো গ্রন্থের মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ঋণী আমরা তাদের কাছেও। ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র মন্ত্রে উজ্জীবিত বাংলা ব্লগগুলোর মুক্তমনা লেখকরা, যারা ধর্ম এবং ঈশ্বর-সংক্রান্ত প্রান্তিক প্রশ্নগুলো নিয়ে সাহসী লেখা লিখে চলছেন নিয়মিত, কখনো সেসব করতে গিয়ে হয়েছেন মৌলবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার, তাদের প্রতিও রইলো কৃতজ্ঞতা। চমৎকার এবং চিন্তা-জাগানিয়া একটি প্রচ্ছদ করে আমাদের অভিভূত করে দিয়েছেন সামিয়া হোসেন।

শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল বইটির প্রথম দুটো সংস্করণ প্রকাশ করে আমাদেরকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। কিন্তু পাশাপাশি পাঠক মহলে বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বইটিকে দীর্ঘদিন ‘আউট অফ প্রিন্ট’ হিসেবে রেখে দেওয়ায় আমাদেরকে বেদনার্তও করেছেন। পুরোমাত্রায়। এই ক্রান্তি লগ্নে বইটির গুরুত্ব সম্যক উপলব্ধি করে জাগৃতি প্রকাশনীর তরুণ প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন বইটির সমস্ত ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বইটি অতি দ্রুত প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছেন। এ কৃতিত্বটুকু তরুণ, উদ্যমী এবং সাহসী এ প্রকাশকের অবশ্যই প্রাপ্য। আমাদের যুক্তিবাদী আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং যুক্তি পত্রিকার সম্পাদক অনন্ত বিজয় দাশ সময় নিয়ে বইটির প্রথম সংস্করণের প্রুফ রিডিং করেছিলেন। স্বল্প সময়ের মাঝে প্রথম সংস্করণের কাজ শেষ করায় বইটিতে থেকে গিযেছিল বেশ কিছু অনিচ্ছাকত ত্রুটি। সে সময় বেশ কিছু বানানপ্রমাদ চিহ্নিত করেছিলেন শাহরিয়ার মামুন রনি। তবে একটি পরিমার্জিত এবং সংশোধিত দ্বিতীয় সংস্করণ সে সময় এসেছিল তরুণ লেখক এবং গবেষক অঞ্জন আচার্যের বদান্যতায়। আর, বইটির শেষ সংস্করণ প্রকাশের পর বইটি নিয়ে ব্লগে এবং ম্যাগাজিনে দুটো চমৎকার গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন ব্লগার শফিউল জয় এবং ড. প্রদীপ দেব। পাশাপাশি কিছু ত্রুটি বিচ্যুতিরও উল্লেখ করেছিলেন তারা। অজানা অচেনা অনেক পাঠকদের কাছ থেকেও টুকিটাকি কিছু সংশোধনী এসেছে। আমরা আনন্দিত যে, সে সব ভুল ত্রুটি সংশোধন করে তৃতীয় সংস্করণ অবশেষে আলোর মুখ দেখছে। বইটির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা জড়িত ছিলেন সবার প্রতি রইলো আমাদের কৃতজ্ঞতা।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x