তামাম পাঠকদের অবাক করে দিয়ে ২৭ নভেম্বর ’৯০ গণশক্তি’র প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলম জুড়ে বিশাল ছবি এক এক অদ্ভুত প্রতিবেদন প্রকাশিত হল। এই বিশাল জায়গা খরচ করার পরও সপ্তম পৃষ্ঠার পাঁচ কলম জুড়ে প্রকাশিত হল শেষাংশ। পাঠকদের অবগতির জন্য খবরটি তুলে দিলাম।

প্রতিবেশীরা অবাক, গৃহস্বামী চিন্তিত

দমদমের একটি বাড়িতে আপনা থেকেই ভাঙ্গছে কাচের সামগ্রী

কলকাতা, ২৬শে নভেম্বর-  দমদম এলাকার এক বাড়িতে বাল্ব, টিউব, আয়না সহ যাবতীয় কাচের সামগ্রী আপনা থেকেই ভাঙতে শুরু করেছে। ওই তিনতলা বাড়িটির দোতলার একটি ছোট্ট ঘরে এই ঘটনা ঘটে চলেছে প্রায় দেড়মাস ধরে। এই আশ্চর্য ঘটনার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অথচ ইতিমধ্যেই সত্তরটি বাল্ব, ষোলটি টিউবলাইট, তিনটি চিমনি ও অন্যান্য কাচের জিনিসপত্র ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে। বাড়ির গৃহকর্তা নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক। তাই কেবল ঘটনাটিরই বিবরণ দেওয়া হচ্ছে।

এই অদ্ভুত ঘটনাটির সূত্রপাত গত ১৮ই অক্টোবর রাতে। সেদিন প্রথম ওই ঘরটির বাসিন্দা স্বামী-স্ত্রী ও পুত্র খেয়েদেয়ে শুয়েছেন। হঠাৎ দুম করে আওয়াজ। ঘর অন্ধকার। আর টুকরো কাচের মাটিতে পড়ার শব্দ। দেশলাই ঘষে আলো জ্বালিয়ে ভদ্রলোক অবাক। নাইট ল্যাম্পটি ভেঙ্গে টুকরো হয়ে পড়ে গেছে। শুধু হোল্ডারে বাল্বের ক্যাপ ও ফিলামেন্টটি আটকে আছে। যাই হোক এটি নানা কারণে ঘটে থাকে তাই কেউই বিশেষ আমল দেননি। পরদিন নতুন একটি বাল্ব কিনে বিস্ফোরিত হয়ে বাল্বটি ভেঙ্গে গেল। পরপর দু’দিন একই ঘটনা ঘটতে দেখে পরদিন ভদ্রলোক একজন স্থানীয় ইলেকট্রিক মিস্ত্রীকে ডাকলেন। ঘরে ডি সি বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। মিস্ত্রীর পরামর্শে সুইচ বক্স পাল্টানো হল কারণ বক্সটি নাকি আলগা হয়ে গেছে এবং সেকারণেই যত বিপত্তি। বক্স পাল্টানোর পরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতেই লাগলো। অর্থাৎ দুটো তিনটি করে ছোট বাল্ব প্রতিদিন ফেটে যায়। এভাবে দিন দশেকের মধ্যে প্রায় কুড়িটি বাল্ব ভেঙ্গে যাওয়ার পর তিনি বাল্ব লাগানোই বন্ধ করে দিলেন। এবারে আক্রমণ শুরু হল টিউব লাইটের ওপর। পর পর তিনটি টিউবলাইট ভেঙ্গে যাওয়ার পর ডি সি লাইনের একজন দক্ষ মিস্ত্রীকে ডেকে আনা হয়। তাঁর পরামর্শে টিউবের চোক বদলানো হয়। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হল না। এর মধ্যে পাড়ার কিছু লোকজন ভূতুরে বাড়ি বলে বাড়িটিকে চিহ্নিত করে ফেলতে শুরু করলেন এবং তাঁদের ও বাড়িওয়ালার চাপে ভদ্রলোক জনৈক ওঝাকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে বাধ্য হন। ওঝা প্রচুর মন্ত্র পড়ে কিছু লেবু ও লঙ্কা ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ঝুলিয়ে দিয়ে যান। কিন্তুই ঘটনা থেমে থাকলো না। বরং পরবর্তী ঘটনাগুলি বিচার করলে বলা যায় যে ওঝার মন্ত্র পড়ার পর তান্ডব আরও বৃদ্ধি পেল। এরপর একদিন লোডশেডিং চলাকালীন বাড়িতে ডিমলাইট বা কেরোসিনের বাতি জ্বলছিলো। হঠাৎ চিমনীর কাঁচটি শব্দ করে ফেটে গেল। দেওয়ালের একটি ছোট বুক-শেলফ শক্ত করে লাগানো ছিল। শেলফটিতে দুটি কাচের ঢাকনা ছিল। ঘরের মেঝেতে একটি কাচের কাপ-ডিস বোঝাই ছোট আলমারি ছিল। একদিন রাত্রিবেলা গোটা আলমারিটা আছাড় খেয়ে পড়ে গেল এবং তার ভেতরের সমস্ত কাচের জিনিসপত্র ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। কাচের উপর এই অদৃশ্য শক্তির আক্রমণ ইদানীং চরম আকার ধারণ করেছে। সেই ঘরে তিনটি বড় আলমারি আছে। দুটি কাচবিহীন। একটিতে কাচের আয়না ছিল। গোটা আলমারিই জিনিসপত্রে ঠাসা। এই ভারি আলমারিতে হঠাৎ একদিন দুপুর বেলায় দেখা গেল আলমারির কাচে, ভেতরের থেকে গোল হয়ে একটি গর্ত হয়ে গেল এবং কাচ গুঁড়ো হয়ে পড়তে শুরু করলো। এর কিছুক্ষণ পরে গোটা আলমারি মাটি থেকে উঠে উল্টে পড়ে গেল। কাচের আয়নাটির উপর দিকটি ভেঙ্গে গেলো। যাই হোক আলমারিটিকে আবার যথাস্থানে বসানো হল। এরপর দু’দিন আলমারিটি পড়ে গেছে এবং শেষবারে সমস্ত কাচের অংশটিই গুঁড়িয়ে গেছে। যদিও আলমারিটি প্রায় দশ বছর ধরে ওই জায়গাতেই রয়েছে এবং কোনভাবেই সেটিকে ভারসাম্যবিহীন অবস্থা বলা যায় না। এখন ঘরটির মধ্যে আর কোন কাচের সামগ্রী অক্ষত অবস্থায় নেই। অবশ্য চশমার কাচ এখনো ভাঙ্গেনি। প্রায় দেড় মাস ব্যাপী এই অদ্ভুত ঘটনায় সত্তরটি বাল্ব, ষোলটি টিউব, তিনটি চিমনি ও অন্যান্য কাচের জিনিসপত্র ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে। এবং প্রথম দিকের ঘটনার থেকে এখনকার ঘটনার সংখ্যা এবং জোর অনেক বেশি। যেমন প্রথমদিকে বাল্বগুলি ফুটো হয়ে যাচ্ছিল এখন ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে হঠাৎ ঘরের পাখাটি অস্বাভাবিকভাবে দুলতে শুরু করে। যদিও সে সময় কোন হাওয়া বইছিলো না এবং চলছিলো না। দুর্ঘটনা এড়াতে এবার পাখাটি খুলে রাখা হয়। এর মধ্যে অনেক দক্ষ ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার ঘরটি দেখে গেছেন। গোটা ঘরে ওয়্যারিং বা সরবরাহ লাইনের পরিবর্তন করে নতুন তার লাগানো হয়েছে। বিভিন্ন যন্ত্রের পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে বৈদ্যুতিক সংযোগে কোন আপাত-গণ্ডগোল নেই। ঘরে রেডিও বা টেপরেকর্ডারে কোন সমস্যা নেই। বাসিন্দা তিনজনের শরীরেও কোনও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া নেই। লক্ষ্যণীয় বিষয় হল একসাথে কোন জিনিস ভাঙ্গছে না। একটি একটি করে কাচের জিনিস ফেটে যাচ্ছে। বাল্ব ভাঙ্গার ক্ষেত্রে আলোর জোরটা প্রথমে বেড়ে যাচ্ছে এবং তারপরে বাল্ব ফেটে যাচ্ছে। প্রথম দিকে কাচগুলি খন্ডে খন্ডে ভাঙছিল। এখন মিহি গুঁড়ো হয়ে ভাঙছে।

ঘরটি দোতলায় অবস্থিত। এর নিচে ও উপরে দুটি একই আয়তনের ঘর রয়েছে। ঘরটির দুপাশেও ঘর রয়েছে। এই সমস্ত ঘরগুলিতে এই ধরনের কোন অসুবিধা নেই। ঘরটির সুইচ বোর্ড থেকে লাইন টেনে বারান্দায় আলো জ্বালানো হচ্ছে, সে আলো একবারও ভেঙ্গে যায়নি। এমনকি ঘরের দরজায় পরীক্ষামূলক ভাবে একটি বাল্ব জ্বালানো হয়েছিল সেটিও এখন পর্যন্ত অক্ষত। প্রকৃতপক্ষে এই আলোটিই বাসিন্দাদের রাত্রিবেলায় একমাত্র সহায়। এযাবত এই ধরনের কোন ঘটনাই শুধু সে বাড়ি কেন গোটা অঞ্চলের কোন বাড়িতেই দেখা যায়নি। ঘটনাটি প্রত্যক্ষভাবে দেখার জন্য একটি বাল্ব এবং একখণ্ড কাচ সে ঘরে রাখা হয় এবং দেড়ঘণ্টার মধ্যে সেগুলি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। এই অদ্ভুত রহস্যের খবর ইতিমধ্যে বিজ্ঞানী মহলেই কিছু পরিমাণে পৌঁছেছে এবং সকলেই এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে বিভিন্ন পরীক্ষাও শুরু করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের তৎপরতায় এই ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু এই দেড়মাস ধরে ঘরটির তিন বাসিন্দা এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও মানসিক অশান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পাড়া প্রতিবেশীর মধ্যে কিছু ব্যক্তি ঘটনাটিকে ভূতুরে বলে চিহ্নিত করে তাঁদের উপর নানা রকম চাপ সৃষ্টি করছেন। কিন্তু তাঁরা এক মুহূর্তের জন্যেও মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ করেননি এবং তাঁরা স্থিরনিশ্চিত যে, ঘটনাটির সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই বের হবে।”

‘গণশক্তি’র সংবাদ সূত্র ধরে পরের দিনই দমদমের ভূতুরে বাড়ির বড়সড় এক খবর ছাপল ‘দি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা। এতে দু চারটি নতুন তথ্য পরিবেশিত হল। অমিয়সংকর রায় একজন সক্রিয় সি পি আই (এম) সদস্য। থাকেন দক্ষিণ দমদমের একটি ত্রিতল বাড়ির এক ঘরের ফ্ল্যাটে। গত ১৮ অক্টোবর ঘটনার শুরু। অমিয়বাবু গিয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলাকে সম্বর্ধনা জানাতে। সে রাতে বাল্ব ফাটা দিয়ে কাচ ভাঙ্গার শুরু।

ইতিমধ্যে ২৮, ২৯ এবং ৩০ তারিখেও গণশক্তি পত্রিকায় এই ঘটনা ছবিসহ যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হল। ডঃ এস. পি. গণচৌধুরী, ডঃ দিলীপ বসু, ডঃ মধুসূদন ভট্টাচার্য, ডঃ তারাশংকর ব্যানার্জির মত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ভূতুরে কান্ডকারখানার রহস্য ভেদ করতে কাচ-হন্তা ঘরটিতে পরীক্ষা চালিয়েছেন বলে প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে কখনো প্রকাশিত হল- তাঁরা কারণ খুঁজে বের করতে পারেননি, কখনো প্রকাশিত হল- ঘরে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছেন।

ইতিমধ্যে স্থানীয় কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতা রহস্য উন্মোচনে আমার সাহায্য চাইলেন। ২৭ নভেম্বর আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে ঘরটি দেখতে যাবো জানাই। সেদিন সন্ধ্যায় ঘরটি ও তার আশেপাশের পরিবেশের উপর পরীক্ষা চালাই।

কাচ ভাঙ্গে কিসে? অবধারিতভাবে এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কাচ ভাঙতে পারে অনেক কারণে। কারণগুলো একটু দেখা যাকঃ (১) উচ্চ শব্দ-তরঙ্গের আঘাতে। (২) বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ কাচে লাগিয়ে রাখলে। (৩) কাচের তাপমাত্রার হঠাৎ প্রচণ্ড রকম পরিবর্তন ঘটলে। (৪) আঘাত করলে। (৫) কোয়ার্জ (কাচ-কাটা পাথর) দিয়ে আঁচড় কাটলে।

কাচের বাল্ব ভাঙতে পারে কি কি কারণে, একটু দেখা যাকঃ (১) কোন কারণে যদি বৈদ্যুতিক লাইনে বেশি ভোল্টেজ প্রবাহিত হতে থাকে তবে অনেক সময় বাল্ব ফেটে যায়। (২) জ্বলন্ত গরম বাল্বে ঠান্ডা জলের ছিটে দিলে বাল্ব ফাটবে। (৩) আঘাত করে বাল্ব ফাটানো সম্ভব। তবে ওভার-ভোল্টেজে বা অনেক্ষণ ধরে জ্বলে থাকা নিয়নে ঠান্ডা জল ছিটোলে নিয়ন ফাটবে না।

কাচগুলো কেমনভাবে ভাঙছে, এটা বোঝার জন্য কাচের টুকরোগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কাচ ভেঙ্গে যাওয়ার আগে-পরে কাচগুলো যারা দেখেছেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলাও একই ভাবে প্রয়োজনীয়।

অমিয়শঙ্করবাবু দমদম স্টেশনের লাগোয়া কালীকৃষ্ণ শেঠ লেনের ৯১/৬ নম্বর বাড়ির দোতলার একটি ঘর নিয়ে থাকেন। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম দরজার ওপরে তথাকথিত ‘লাকি নাম্বার’ ৭৮৬ লেখা। আনুমানিক ১০ ফুট বাই ৮ ফুট ঘরের মধ্যেই অমিয়বাবুর পুরো সংসার।

অমিয়বাবু সকালেই খবর পেয়েছিলেন সন্ধ্যায় যাবো। পরিচয় দিতেই আপ্যায়িত

করলেন। অমিয়বাবু দক্ষিণ দমদম পুরসভার হিসেবরক্ষকের চাকরি করেন। স্ত্রী তৃপ্তি রায় দমদমের প্রাচ্য বাণীমন্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ান। ছেলে সৌম্য দমদমের কে.কে. হিন্দু আকাডেমীর ছাত্র, এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। অমিয়বাবু সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। সি পি আই (এম)-এর স্থানীয় কমিটির সদস্য। তৃপ্তি দেবীর হাতে গ্রহরত্নের আংটি। দেখলেই বোঝা যায় দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করছেন। ছেলে সৌম্য বাড়ি ছিল না। শুনলাম, পড়াশুনোর অসুবিধে হচ্ছিল বলে তাকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাখা হয়েছে কাল বিকেল থেকে।

অমিয়বাবুর বাড়ির বাবুর বাড়ির অবস্থান দেখে নিশিচিত ছিলাম- কাচ ভাঙ্গার ক্ষেত্রে শব্দতরঙ্গের কোন ভূমিকা নেই। অনেক সময় বিমানবন্দরের খুব কাছের বাড়ির কাচের শার্সি বা জিনিস-পত্তর  ভাঙ্গে বিমানের তীব্র শব্দ-তরঙ্গের আঘাতে। অমিয়শঙ্করবাবুর এই ঘরটি বিমান বন্দরের কাছে নয়। বিমানের শব্দ এখানে বাসের শব্দের চেয়েও মৃদু। কাছেই রেললাইন। কিন্তু ট্রেনের শব্দে ঘর কাঁপে না, কাঁপেনা সূক্ষ্ণ ভারসাম্যের উপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া পাতলা কাচের শিশি- পরীক্ষা করে দেখেছি। বাড়ির ধারে-কাছে কোনও কারখানা নেই, যেখান থেকে তীব্র শব্দতরঙ্গ তৈরি হতে পারে। অতএব শব্দতরঙ্গকে ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বাদ দিতেই হয়।

রাসায়নিক পদার্থ যেমন হাইড্রোক্লোরিক এসিড কাচে দিলে কিছু সময় পরে কাচ ফাটতে পারে। এ-ক্ষেত্রে অ্যাসিড প্রয়োগের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি মানুষের উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

অমিয়সঙ্কর বাবুর ঘরের বাল্বের কাচ ওভার-ভোল্টেজের দরুন ভাঙতে পারে। কিন্তু ৭১ বার ওভার ভোল্টেজে ভাঙ্গা সম্ভব নয়। কারণ ইতিমধ্যে ভোল্টেজ বহুবার মাপা হয়েছে। বহু বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী, সংস্থা ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ভোল্টেজের বিষয়ে পরীক্ষা করেছেন। লাইন-লিকেজ কি না, সে বিষয়েও পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ভোল্টেজে কোন অস্বাভাবিকতা বা লিকেজ পাওয়া যায়নি। গোটা ঘরের ওয়্যারিং করা হয়েছে নতুন করে। ভোল্টেজ পরীক্ষা করে দেখেছি, ১৭৫। অতএব অমিয়বাবুর ঘরের ওয়্যারিং নতুন করার পরও কাচের বাল্ব ফাটার জন্য বাড়তি ভোল্টেজকে আদৌ দায়ী করা চলে না। কিন্তু অমীয় বাবুর দাবী মত নতুন ওয়্যারিং করার পরও বাল্ব ফেটেছে। আরও একটা তথ্য অমিয়বাবু জানালেন, এই ঘরের লাইন থেকে তার টেনে বাইরের বারান্দায় বাল্ব জ্বালালে তা ভাঙছে না। বৈদ্যুতিক লাইনের ত্রুটিতে বাল্ব ফাটলে  সেই ত্রুটিপূর্ণ লাইন থেকে টানা স্বত্বেও ঘরের বাল্ব ফাটছে, বাইরের বাল্ব নয়, এমনটা হতে পারে বাল্ব ফাটানোর পিছনে মানুষের হাত থাকলে। ঘর স্যাঁত-স্যাঁতে বা দূষিত গ্যাসে পূর্ণ নয়। যথেষ্ট খোলামেলা।

বিদ্যুতের গোলমালে বাল্বব ফাটতে পারে, কিন্তু বুক-কেস, আলমারির কাচ বিদ্যুতের গোলমালে ফাটার কোন সম্ভাবনা নেই। চিমনি, আয়না এবং অন্যান্য কাচের জিনিস ফাটার ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের ত্রুটিকে কোনভাবেই দায়ী করা যায় না। কাঠের আলমারি নাকি আপনা থেকেই চারবার পড়ে গেছে। সিলিং ফ্যান আপনা থেকে দুলেছে। ঘরে তখন কোনও জোড়ালো হাওয়া ছিল না। ফ্যানও ঘুরছিল না। বিদ্যুতের গোলমালে এমন কিছু ঘটা সম্ভব ছিল না। কাঠের আলমারিতে ভারসাম্যের কোনও অভাব ছিল না। পরীক্ষা করে দেখেছি। আরও লক্ষ্যণীয়, ঘরে একটি বড় স্টিলের আলমারি ছিল। স্টিলের আলমারি কিন্তু একবারও পড়েনি। কারণ একজনের পক্ষে স্টীলের আলমারি ঠেলে ফেলে দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। ছোট কাঠের আলমারি যথেষ্ট সহজসাধ্য। ফ্যান দোলাতে, আলমারি ফেলতে একান্তভাবে প্রয়োজন মানুষের। যে ফ্যান দোলাবে, আলমারি ফেলে দেবে।

আলমারির কাচ ভেঙ্গেছে অদ্ভুতভাবে। একদিনের পাল্লা কাঠের। অন্য দিকের পাল্লার ওপরে-নীচে দুটি কাচ। হঠাৎ একদিন বাড়ির লোকদের চোখে পড়লো, ওপরের কাচে একটা বৃত্তাকার দাগ। দাগের আশেপাশে কয়েকটা আঁচর। দিন দুয়েক পরেও তলার কাচেও গোল দাগ দেখা গেল।। দাগের আশে পাশে কিছু আঁচর। তারপর হঠাৎ একদিন দেখা গেল ওপরের কাচটা ভেঙ্গে পড়েছে। দু-একদিন পরেই ভাংলো নীচের কাচটা। এ-কথাগুলো অমিয়বাবু ও তৃপ্তি দেবীর কাছ থেকেই শোনা।

আলমারির কাচের কয়েকটা টুকরো হাতে নিয়ে সামান্য নজর দিতেই বুঝলাম আলমারির কাচ সরাসরি আঘাত করে ভাঙ্গা নয়। প্রথমে কোয়ার্জ (কাচ কাটা পাথর) দিয়ে গোল দাগ ফেলা হয়েছে এবং আঁচড় কাটা হয়েছে। তারপর এক সময় সুযোগ বুঝে সামান্য আঘাত করা হয়েছে। ফলে কাচ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। টুকরোগুলোর ভাঙ্গা অংশের কিছুটায় কোয়ার্জে কাটার চিহ্ন স্পষ্ট। বাঁকি অংশ আঘাত করে ভাঙ্গার ফলে চলটা উঠে গেছে।

ওপরে দেওয়ালে টাঙ্গানো ছোট্ট বুক-কেসটার পাশাপাশি দুটো কাচ লাগানো ছিল। কাচগুলো দু’দিকে সরানো যায়। ওগুলোর ভাঙ্গা টুকরো দেখিনি। শুনেছি প্রথমে এক পাশের কাচ ভেঙ্গে পড়েছিল। তারপর অন্য পাশের। দেখিনি, তাই বোঝা সম্ভব ছিল না ওই কাচ ভাঙ্গার ক্ষেত্রেও ‘কাচ-কাটা পাথর’ ব্যবহার করা হয়েছিল অথবা সরাসরি আঘাত করা হয়েছিল অথবা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল।

অমিয়বাবু ও তৃপ্তি দেবীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি ১৮ অক্টোবর রাতে প্রথম বাল্বটা ফাটার ক্ষেত্রেই শুধু তাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী। ঘরে ঢোকার মুহূর্তে বাল্বটা বিরাট শব্দ করে ফেটে গিয়েছিল। আর কোনও একটি দুর্ঘটনারও তাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী নন। সিলিং ফ্যান দুলেছে- অমিয়বাবু ও তৃপ্তি দেবী দেখেছেন। কিন্তু ছেলের চিৎকারে ঘরে ঢুকে দেখেছেন। আলমারি পড়তে তাঁরা দু’জনের কেউই দেখেননি। দেখেছেন পড়ার পর। ঘরে তখন ছিল ছেলে সৌম্য।

দু’জনে ঘটনাগুলো নিজের চোখে ঘটতে দেখেছেন বললেও অবশ্য তাঁদের কথাকে অভ্রান্ত সত্যি ধরে নিয়ে বিচার করতে বসতাম না। কারণ মানুষের বাড়িয়ে বলার প্রবণতা, প্রত্যক্ষদর্শী বলে জাহির করার প্রবণতা থেকে মিথ্যে বলার বিষয়ে যথেষ্ট অবগত। আমি জেরা করার মত করে প্রশ্নের ঝড় তুলিনি। নানা কথার ফাঁকে ফাঁকে আমার প্রয়োজনীয় উত্তরগুলো বের করে নিচ্ছিলাম। সম্ভবত অমিয়বাবু ও তৃপ্তি দেবী সচেতন ছিলেন না, আমি ঠিক কি জানতে চাইছি।

ঘরে বর্তমানে কোনও কাচের জিনিস নেই বাল্ব ছাড়া। পরীক্ষা করতে কোনও কাচের জিনিস নিয়ে যাইনি। শুনলাম, কাচের জিনিস রাখতে নাকি আঘ ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ভেঙ্গে যায়। একটি বাল্ব অবশ্য গতকাল বিকেল থেকে অক্ষত অবস্থায় ঘরে বিরাজ করছে। বাল্বটি নাকি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে। এও শুনলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বেই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিজ্ঞানী কাচ ভাঙ্গার রহস্য অনুসন্ধানে নেমেছেন। কিন্তু এ কথার মধ্য দিয়েও একটি প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ পেল- কাল সন্ধ্যে থেকে সৌম্য বাড়ি নেই, কাল সন্ধ্যে থেকে আজ রাত পর্যন্ত বাল্বটি ভাঙ্গেনি।

অমিয়বাবু ও তৃপ্তি দেবীকে ভরসা দিলাম, কোনও চিন্তা নেই। ভাঙ্গার কারণ ধরতে পেরেছি বলে আশা করছি। আপনারা যদি সহযোগিতা করেন, তাহলে আগামী রবিবার থেকেই কাচ ভাঙ্গা বন্ধ করতে পারবো।

পরিপূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস পেলাম। বললাম, রবিবার সকাল দশটায় আসবো। আলমারি ও বুক-শেলফের সমস্ত কাচ সেদিন আবার লাগাবার ব্যবস্থা করুন। ঘণ্টা ছয়েক থাকবো। নিশ্চিন্তে থাকুন, সে-সময়ের মধ্যে কিছুই ভাঙবে না।

কেন ভাঙছে? দু’জনের প্রশ্নের উত্তরেই জানালাম, সে-দিনই ছ-ঘণ্টা পার করে দিয়ে তারপর জানাবো।

অমিয়বাবু জানালেন, শনিবারই সব কাচ লাগিয়ে রাখবেন। বললাম, তেমনটি করবেন না। শনিবার কাচ ভাঙতেই পারে। এমনকি সব কাচই। কাচের মিস্ত্রীকে এনে মাপ দিয়ে কাটিয়ে রাখুন। রবিবার আমার সামনে লাগান হবে। মিস্ত্রীকে বলবেন দশটায় আসতে।

ঘর থেকে নেরোতেই উপস্থিত সাংবাদিকেরা ঘিরে ধরলেন। জানতে চাইলেন, ভাঙ্গার কারণ ধরতে পেরেছি কি না। জানালাম, আগামী রবিবার সকাল দশটায় আমাদের সমিতির তরফ থেকে কয়েকজন আসছি। আমাদের সামনে আবার নতুন করে ভেঙ্গে যাওয়া সব কাচ লাগানো হবে। ছ’ঘণ্টা থাকবো। এতদিন পর্যন্ত ঘরের কাচ আধ ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ভাঙছিল। কিন্তু আশা করছি সে-দিন ওই দীর্ঘ ছ’ঘণ্টার মধ্যেও কোনও কাচই ভাঙবে না। বিকেল চারটের সময় জানাব কেন ভাঙছিল। এর আগে আর কিছু জানাচ্ছি না। সাংবাদিকরা এ প্রশ্নও করছেন, রবিবার কেন? কেন এই চারদিন সময় চেয়ে নিচ্ছেন? কেন কালই বন্ধ করতে আসবেন না?

বললাম, আগামীকাল রবিবার হলে আগামী কালই আসতাম। ছুটির দিন আমার এবং আমাদের সমিতির অনেকের পক্ষেই দীর্ঘ ছ-আট ঘণ্টা সময় বের করা খুবই অসুবিধেজনক।

পরের দিন গণশক্তির প্রথম পৃষ্ঠাতেই আমাদের সমিতির পক্ষে আমার ‘কাচ ভাঙ্গা রহস্যময় বাড়িতে যাওয়ার কথা’ এবং ‘কয়েক দিনের মধ্যেই রহস্য উন্মোচিত হবে’ বলে আশা প্রকাশ করার কথা প্রকাশিত হল।

ইতিমধ্যে আমাদের সমিতির কিছু সদস্য আওমিয়বাবুর প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলল। কথা বলল সৌম্যের স্কুলের কিছু ছাত্রের সঙ্গে। গণশক্তির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- প্রতিবেশীদের চাপেই অমিয়বাবু ওঝা ডেকেছিলেন। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, এমন চাপ তাঁদের দিক থেকে কখনোই দেওয়া হয়নি। সৌম্যের বিষয়েও প্রতিবেশী বা ছাত্রদের ধারণা মোটেই ভাল নয়।

শনিবার সন্ধ্যায় অমিয়বাবুর বাড়ি হাজির হলাম, কাচ লাগাবার ব্যবস্থা হয়েছে কি না জানতে। বাড়িতে ছিলেন শুধু তৃপ্তি দেবী। জানালেন, মিস্ত্রী মাপ নিয়ে গেছে। কাল দশটার মধ্যে ওরা চলে আসবে। আপনার সামনেই কাচ লাগানো হবে। আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এবং রবিবার আসবেন শুনে সৌম্য আপনাকে দেখবে বলে দারূণ বায়না ধরেছে। আসলে আপনার কথা তো অনেক পড়েছে, তাই আপনাকে দেখতে চায়। আপনি কিভাবে কাচ ভাঙ্গা বন্ধ করেন, সেটা নিজের চোখে দেখার লোভ সামলাতে পারছে নাস। বললাম, বেশ তো, ওকে নিয়েই আসুন।

তৃপ্তি দেবী জানালেন, দূরদর্শন থেকে একজন এসেছিলেন। রবিবার কিছু ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁকে জানিয়েছি, সে-দিন প্রবীর বাবু সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ-বাড়িতে একটা পরীক্ষা চালাবেন। অতএব প্রবীর বাবুর সঙ্গে কথা না বলে, তাঁর অসুবিধে হবে কিনা না জেনে ঐদিন আপনাদের ছবি তোলার অনুমতি দিতে পারছি না।

১ ডিসেম্বর শনিবার বসুমতী পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠাতেই খবর পরিবেশিত হয় ২ ডিসেম্বর কাচভাঙ্গা ঘরে কাচের জিনিসপত্র রাখা হবে এবং সেই সঙ্গে আলমারির ভেঙ্গে যাওয়া কাচও নতুনভাবে লাগান হবে। সমিতির প্রতিনিধিরা ঐদিন ঘরে ৬ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করবেন, ইত্যাদি।

২ ডিসেম্বর রবিবার সকালে The Telegraph পত্রিকার প্রায় আধ পৃষ্ঠা ধরে প্রকাশিত হল একটি সচিত্র প্রতিবেদন “BOLTERGEIST”। প্রতিবেদক প্রণয় শর্মা প্রতিবেদনটিতে জানালেন, “ইতিমধ্যে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত সংস্থার তরফ থেকে বিজ্ঞানীরা খবরটি দেখতে গিয়েছিল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। কিন্তু এ-পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি।

“কিন্তু গত কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি নাটকীয় ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সাইন্স অ্যান্ড র‍্যাশানালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রবীর ঘোষের দৃশ্যপটে আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে। এই যুক্তিবাদী ওই পরিবারের সদস্যদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ২ ডিসেম্বরের মধ্যে রহস্যভেদ করবেন। তিনি শ্রীরায়কে বাল্ব টিউবলাইটসহ সমস্ত কাচের সামগ্রী তাঁর উপস্থিতির দিন লাগাতে বলেছেন।”

২ ডিসেম্বর রবিবার সকাল দশটায় অমিয়বাবুর ফ্ল্যাটে হাজির হলাম আমি ও আমাদের সমিতির কিছু সদস্য। আজই প্রথম দিনের আলোয় ঘরটি দেখলাম। অমিয়বাবুর ঘরের দরজার পাশেই কালো কালি দিয়ে কাঁচা হাতের কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা। বেশ কয়েক জন সাংসাবিদের উপস্থিতিতে আলমারি ও বুক-কেসের সব কাচ লাগান হল। তবে কাচ লাগাবার আগে প্রতিটি কাচ ভালোমত স্পিরিট দিয়ে মুছে নিয়েছিলাম। ঘরের বাল্ব ও টিউবলাইট জ্বেলে দেওয়া হল। ঘরের বাল্বের হোল্ডার থেকে দড়ি দিয়ে একটা আয়না ঝুলিয়ে রাখা হয়। যে আলমারি উল্টে পড়েছে বলে দাবী করা হয়েছে, সেই আলমারির মাথায় রাখা হয় কেরোসিন ল্যাম্পের একটি চিমনি। তারপর চলে অপেক্ষা। ঘরে সাংবাদিকরা, অমিয়বাবু ও সৌম্য ছাড়া মাঝে-মধ্যে ছিলেন তৃপ্তি দেবী ও অমিয়বাবুর পরিচিত কেউ কেউ। ভি ডি ও-তে ছবি তোলা হয়েছে ‘আজকাল’ পত্রিকার তরফ থেকে। সৌম্যের ডান বাহুতে একগাদা তাগা-তাবিজ ঝোলান। শেকড় ঝোলান ছিল ছিল বারবার উল্টে পরা কাঠের আলমারিতে। অমিয়বাবু আন্তরিক আতিথেয়তা দেখিয়ে আমাদের দফায় দফায় চা, সিগারেট ও রসগোল্লা খাইয়েছেন। ঘরে আমাদের সমিতির পক্ষে ছিলেন জ্যোতি মুখার্জি, কমল বিশ্বাস, আশিস বিশ্বাস, দেবু হালদার ও জাদুকর শুভেন্দু পালিত। ওদের ওপর দায়িত্ব ছিল প্রতিটি কাচের জিনিসের ওপর লক্ষ্য রাখা। সমিতির সভ্য ছাড়া যারাই ঘরে উপস্থিত থাকবেন তাঁদের কারো ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত ধাক্কায় বা আঘাতে যেন কোনও কাচের জিনিস ভাঙ্গে না যায় অথবা কোনও আসবাব উল্টে না পড়ে, এ-দিকে নজর রাখার দায়িত্বও ছিল ওদের ওপর। যারা ঘরে ছড়িয়ে রাখা কাচের সামগ্রীর কোনও একটিকে ঠাসা ভিড়ের সুযোগে স্রেফ আঘাত হেনে ভেঙ্গে ফেলা বা কোনও জিনিস উল্টে ফেলে দেওয়া এমন কোন কঠিন কাজ নয়। বরং তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন নজর রাখা। এই ঘটনার পিছনে মানুষের হাত থাকলে, সেই হাতের মালিক কে হতে পারেন, এবিষয়ে যুক্তিগুলো সাজালেই অনুমান করা যায়, এটা যেমন সত্য, তেমনই সত্য অনুমানের হদিস পেয়ে ঘটনার নায়ককে বাঁচাতে আমাদের ধোঁকা দিতে আজ অন্য কেউ কাচ ভঙ্গকারীর ভূমিকা নিতে পারে। আর এটা মাথায় রেখেই দু’দিন আগে নজরদারির দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের নিয়ে ক্লাস করেছি। ব্ল্যাক-বোর্ডে রহস্যময় ঘরটির কোথায় কি আছে এবং কোথায় কোথায় কাচ লাগান হবে, কাচের সামগ্রী রাখা হবে তার ছবি এঁকে কে কেমনভাবে নজর রাখবেন, তা বুঝিয়েছি। নজরদারদের কেউ কিছু সময়ের জন্য বাইরে গেলে পরিবর্ত হিসেবে দায়িত্ব নেবার জন্য কয়েকজনকে ‘রিজার্ভ’ রেখেছি। বাইরে দর্শকদের  মধ্যে মিশে থাকা সমিতির সদস্যের পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শশাংক মণ্ডলকে। নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে সমিতির পক্ষ থেকে কাচ ভাঙ্গার রহস্যের আবরণ সরালাম। বললাম কাচ ভাঙ্গে কি কি কারণে। জানালাম, এ ঘরের কাচ শব্দ-তরঙ্গে ভাঙছিল না। এমন সিদ্ধান্তে আসার পক্ষে যুক্তিগুলো হাজির করলাম। ওভার-ভোল্টেজে ঘরের যে কোনও কাচের জিনিস ভাঙ্গা, আলমারি বার বার উল্টে দেওয়া, চালু না হওয়া সিলিং ফ্যান দোল খাওয়ানো অসম্ভব। ওভার-ভোল্টের দরুন কাচের বাল্ব প্রথম দু-এক বার ভাঙ্গলেও ভাঙতে পারে। কিন্তু প্রতিটি বাল্ব ও টিউবলাইট যে ওভার-ভোল্টেজে ভাঙছিল না, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভোল্টেজ পরীক্ষা করা হয়েছে, লাইন পাল্টান হয়েছে। অথচ লাইন পাল্টানোর পরও বাল্ব ও নিয়ন কেটেছে। অথচ লক্ষ্য করুন, এই একই লাইন থেকে তার টেনে বাল্ব বাইরে সবার চোখের সামনে রাখলে ও জ্বালালে ফাটছে না। বিদ্যুৎ লাইনে গোলামাল থাকলে, এক্ষেত্রে বাইরের বাল্বও ফাটতো।

তীব্র শব্দের প্রভাবে কাচ ভাঙ্গার প্রভাব এখানে শূন্য। আশে-পাশে কল-কারখানা রেল ও বিমানের এমন কোনও তীব্র শব্দ সৃষ্টি হয় না, যার দরুন কাচ ভাঙতে পারে। রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে কাচ ভাঙ্গা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু আপনারা ভাঙ্গা কাচের টুকরোগুলো একটু লক্ষ্য করুন।

‘বর্তমান’ পত্রিকার বার্তা-সম্পাদক রূপকুমার বসুর হাত থেকে তাঁর সংগৃহীত দু’টুকরো কাচ নিয়ে সাংবাদিকদের দেখালাম। কাচগুলো দেখলেই বোঝা যায় এই কাচগুলো ভাঙ্গার আগে কিছু দিয়ে অনেকটা কেটে রাখা হয়েছিল। বাঁকিটা ভেঙ্গেছে আঘাতে, চলটা ওঠা দেখলেন বোঝা যায়। এই যে টুকরোগুলো দেখালাম, এগুলো কাঠের আলমারি ভাঙ্গা কাচের টুকরো। আলমারির কাচ ভেঙ্গেছে একটু অদ্ভুত ভাবে। আলমারির এক দিকের পাল্লায় ওপরে-নীচে কাচ লাগান দেখতে পাচ্ছেন। হঠাৎ একদিন দেখা গেল ওপরের কাচে একটা স্পষ্ট গোল দাগ কাটা, তার আশে-পাশে কয়েকটা আঁচড়। তারপর একদিন তলার কাচেও একই ধরনের দাগ দেখা গেল। একদিন দেখা গেল ওপরের গোল দাগের অংশটা ভেঙ্গে পড়েছে। তলার কাচটাও একদিন ওভাবেই ভাঙলো- কাচের মাঝখানে একটি বড় গোল ফুটো। কাচের উপর কি দিয়ে দাগ কাটা যায়? কোয়ার্জ (কাচকাটা পাথর) পাথর দিয়ে কাটা যায়। এই শহরে অনেক জায়গাতেই কাচকাটা পাথর বিক্রি করেন কিছু ভিন প্রদেশী মহিলারা। এক টাকা থেকে দু-টাকা দাম। এমনকি দমদম স্টেশন চত্বরেই ওই পাথর বিক্রি হয়। ফটোর দোকানে কাচ কাটার জন্য ছোট এক টুকরো কাঠের আগায় হীরে লাগান থাকে। অমন একটা কাচ-কাটার যন্ত্র যোগাড় করা এমন কিছুই কঠিন নয়। কোয়ার্জ জাতীয় কোনও কিছু দিয়ে কাচে গোল করে দাগ কেটে রাখলে কাচের অকেটাই কেটে যাবে। তারপর সুযোগ বুঝে বৃত্তের মাঝে একটি আঘাত করলেই কাচ ভেঙ্গে যাবে বৃহত্তর আকারে। আলমারির কাচ ভাঙ্গার ক্ষেত্রে কোয়ার্জ জাতীয় পাথরই ব্যবহৃত হয়েছিল।

কথার মাঝখানে প্রতিবাদ করলেন উত্তেজিত অমিয়বাবু, আপনি এভাবে কাচ কেটে দেখাতে পারবেন?

বললাম, নিশ্চয়ই পারবো। আপনি অনুমতি দিলে করে দেখাতে পারি।

না, অনুমতি দেননি অমিয়বাবু। বরং বললেন, বুক কেসের কাচ তো গোল হয়ে ভাঙছিল না। ওটার কি ব্যাখ্যা দেবেন?

বলেছিলাম, ভাঙ্গা কাচগুলোর একটা অংশ গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে গেছে। জোরালো আঘাত করলে আঘাতস্থলের কাচ গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটেছে।

অমিয়বাবুর আত্মীয় বলে পরিচিত এক ভদ্রলোক জোরালোভাবে আমার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানালেন। বললেন, কাচগুলো কেউ আঘাত দিয়ে ভাঙ্গার সময় তার পক্ষে আদৌ কি এমন ক্যালকুলেশন করে আঘাত করা সম্ভব যার দরুন গুঁড়ো হয়ে যাবে? আপনার এই থিয়োরি আদৌ মানতে পারছি না।

অমিয়বাবু মুখ খুললেন, আপনি এই রকম গুঁড়ো করে ভেঙ্গে দেখাতে পারবেন?

বললাম, আমি আপনাদের দু’জনের কথারই উত্তর দেব। অমিয়বাবুর আত্মীয়কে বললাম, আঘাতে কাচটা সাত টুকরো হয়ে ভাঙ্গলে আপনি প্রশ্ন করতেন, কাচটা ঠিক সাত টুকরো হয়ে ভাঙলো কেন? কেন দু’টুকরো বা পাঁচ টুকরো নয়? এ-ভাবে ক্যালকুলেশন করে কি ভাঙ্গা সম্ভব? ভাঙ্গার সময় কেউ ক্যালকুলেশন করে ভাঙ্গে না, এক্ষেত্রেও ক্যালকুলেশন করে ভাঙ্গেনি। মেরেছে এবং ভেঙ্গেছে। আর অমিয়বাবুর উত্তরে জানাচ্ছি, উনি অনুমতি দিলে ওই গুঁড়ো গুঁড়ো করেই ভেঙ্গে দেখিয়ে দিতে পারি।

অমিয়বাবু আর এগোলেন না। তবে ক্ষুব্ধ কন্ঠে প্রশ্ন করলেন, আর আলমারিটা পড়ল কি করে?

ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তাই পড়েছে।

একজনের পক্ষে ঠেলে ফেলে দেওয়া আদৌ সম্ভব? আপনি ফেলতে পারবেন?

বললাম, আমি তো পারবোই, এখানে উপস্থিত আমাদের সমিতির যাকে সবচেয়ে দুর্বল বলে আপনাদের মনে হয়, তাকেই ডেকে নিন, দেখবেন সেও ফেলে দেবে।

আর বাল্বগুলো ফাটছিল কি করে? অমিয়বাবু প্রশ্ন করলেন।

এখানেও মানুষের হাত ছিল। ফাটান হচ্ছিল বলেই ফাটছিল।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অমিয়বাবু জানালেন তাঁর ধারণা বাল্ব থেকে কোন একটা অজ্ঞাত রশ্মি বেড়িয়ে এসে আলমারি উল্টে দিয়েছে, কাচগুলো ভেঙ্গেছে। সৌম্যেরও বক্তব্য ছিল ওই ধরনের। সৌম্যের কথা মত ও দেখেছে বাল্ব থেকে একটা হলদে রশ্মি বেরিয়ে এসে আলমারিতে আঘাত করেছে।

ফ্যান দোলার ব্যাখ্যাও চেয়েছিল অমিয়বাবুর ঘনিষ্ঠ একজন। জানিয়েছি ফ্যান দোলালেই দোলে। কেউ দুলিয়ে দিয়েছিল।

কে এমনটা করেছে? আমাদের এ ঘরে থাকি মাত্র তিনজন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমরাই। সুতরাং আপনার কথা মেনে নিলে এটাই দাঁড়ায় আমার স্ত্রী বা ছেলে কেউ এ-সব করেছে। আমার স্ত্রী কি পাগল যে ধুম-ধাম করে জিনিস-পত্তর ভাঙবে। আমার ছেলেও যদি ভেঙ্গে থাকে, তবে একবারও কি আমরা দেখতাম না। অমিয়বাবু বললেন।

বললাম, গত বুধবার প্রথম সাক্ষাৎকারে আপনি কিন্তু আমাকে বলেছিলেন ম্যাণ্ডেলাকে সম্বর্ধনা দেবার দিন সন্ধ্যায় ঘরে ঢোকার সময় বাল্বটা দুম করে ফেটে যেতে দেখেছিলেন, তারপর আর একটি ঘটনাও আপনি নিজের সামনে ঘটতে দেখেননি। দেখেছেন ঘটে যাওয়ার পর। আপনার স্ত্রীর সঙ্গেও আলাদা করে কথা বলেছি। উনিও কোন ঘটনা নিজের চোখে ঘটতে দেখেননি, দেখেছেন ঘটে যাওয়ার পর। ঘটনাগুলো ঘটার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী কিন্তু আপনার ছেলে। আজও সাংবাদিকদের সামনে বহুবার বলেছেন কাচের জিনিস ঘরে রাখলে আধ-ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙ্গে যাচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যেয় এসে বউদির (তৃপ্তি-দেবী) কাছ থেকে জানতে পারি, কোনও এক জ্যোতিষী না বাবাজী কি একটা জিনিস দিয়ে বলেছেন, সৌম্যের ওপর কার একটা কোপদৃষ্টি পড়েছে। তাইতেই এইসব অঘটন। কিছুটা ওঁর কথা মতই এ-বাড়ি থেকে সৌম্যকে দূরে রাখতে গত মঙ্গলবারে বিকেলে সাতগাছি এক আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। তৃপ্তি দেবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সৌম্যকে পাঠাবার পর আর কোনও কাচের জিনিস কি ভেঙ্গেছিল? তিনি জানিয়েছিলেন, ঘরে বর্তমানে ভাঙ্গার মত কোন কাচের জিনিস নেই, তাই ভাঙ্গারও প্রশ্ন নেই। কাচের জিনিস রাখলে ভাঙবে, এতদিন ধরে যা ঘটেছে, তাতে এটা ধরে নেওয়াই যায়। আবার সত্যি এমনও হতে পারে, এই জ্যোতিষী যা বলেছেন, তাই সত্যি। সৌম্য এ-ঘরে উপস্থিত হলে ওর শরীর থেকে কোনও রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে আবার অঘটন ঘটতে থাকবে। তৃপ্তি দেবীরও ইচ্ছে ছিল, আমাদের এই ছ-ঘণ্টা পরীক্ষা চালাবার সময় সৌম্য উপস্থিত থাকুক। সৌম্যকে আনতে বলেছিলেন। ও এই ছ’ঘণ্টা ছিল, কিন্তু তবু কাচ ভাঙ্গেনি।

আসলে কাচগুলো মানুষই ভাঙছিল। আজ সে ভাঙ্গার সুযোগ পায়নি। ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে যুক্তি এ-কথাই বলে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন অমিয়বাবুর পরিবারেরই কেউ। প্রশ্ন উঠেছে, কেন ভাঙবে? আপনাদের দুটি তথাকথিত ভূতুরে ঘটনা বলছি। শুনলে ভাঙ্গার কারণেই কিছুটা হদিশ পাবেন।

‘জল-ভূত’ ও ‘পোশাককাটা-ভূত’ -এর ঘটনা দুটির উল্লেখ করে বললাম, জলভূতের সৃষ্টি করে বালকটি তার মায়ের কড়া শাসনের প্রতিশোধ তুলতে চেয়েছিল, শাস্তি দিতে চেয়েছিল। আর পোশাককাটা ভূতের সৃষ্টি হয়েছিল বাড়ির কাজের কিশোরী মেয়েটির হতাশা থেকে। কিশোরীটির কথা মত বাড়ির ছোট ছেলেকে সে ভালবাসে। ছোটছেলে তাকে আদর-টাদর করে বটে, কিন্তু ভালোবাসে অন্য একটি মেয়েকে। কিশোরীটির ইচ্ছে হয়, ছোটছেলের মুখোশ খুলে দেয় তার প্রেমিকার কাছে। কিশোরীটি বিশ্বাস করে, মুখোশ খুলতে গেলে লাভ হবে না কিছুই। বড়জোর ছোট ছেলের সঙ্গে তাঁর প্রেমিকার বিচ্ছেদ হবে। কিন্তু তাতে ছোট ছেলে তাকে আদৌ বিয়ে করবে না। বরং ঘটনাটা জানাজানি হলে যে কোনও একটা অপদাদ দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিশোরীটি মেয়েদের পোশাক আর ছোটছেলের পাজামার ওপর আক্রোশ মিটিয়েছে তার অবদমিত যৌন আবেগ, ক্রোধ, ঈর্ষা ও হতাশা থেকে। অনেক সময়ই কিশোর-কিশোরীদের ক্ষোভ হতাশা, অবদমিত আবেগই রূপ পেতে পারে এই ধরনের নানা কান্ড-কারখানা ঘটিয়ে বড়দের উত্যক্ত করার মধ্যে।

এখানে কে নিশ্চিতভাবে ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা বলার মত কোনও অকাট্য প্রমাণ আমাদের হাতে নেই বটে, কিন্তু যুক্তিগুলো পরপর সাজালে মনে হয় ঘটনাগুলো ঘটানোর সম্ভাবনা কিশোরটিরই সবচেয়ে বেশি। কিশোর বয়সে বা যৌবন সন্ধিক্ষণে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বিচ্ছিন্নতার সমস্যা, একাকীত্বের সমস্যাও এর মধ্যে অন্যতম। কিশোরটি সেই সমস্যাতে পীড়িত হতেই পারে। তারই হয়তো বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বড়দের পীড়িত করার চেষ্টায়। এ-ক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনাও রয়েছে। অমিয়বাবু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মা তাঁর স্কুল নিয়ে। বাবা মা’র স্নেহ থেকে তাঁদের কাছে পাওয়া থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। যখন বাবা ঘরে থাকেন, তখনও তাঁকে ঘিরে থাকে অন্য মানুষেরাই। ব্যস্ত রাজনীতিবিদদের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক জীবন, এ-কথা যেমন সত্যি, তেমনই সত্যি এক ঘরের ছোট্ট ফ্ল্যাটে মা-বাবার অনুপস্থিতির একাকীত্ব যেমন  সৌম্যকে হতাশাগ্রস্থ করে তুলতে পারে, তেমনই বহু জনের ভিড়ে বড় বেশি একা করেই বার বার নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে সৌম্য। ঘরে পড়াশুনোর মতো পরিবেশের অভাব তাকে একটু একটু করে পড়ালেখার জগত থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। অনুষঙ্গ হিসেবে পাল্টাতে পারে বন্ধুজগতের পরিবেশ। ওর ক্ষোভ, হতাশা থেকে বড়দের উত্যক্ত করার জন্য ও এমনটা করতেই পারে।

অমিয়বাবু সরাসরি প্রায় চ্যালেঞ্জ জানালেন, স্বীকার করছি কাচ আধ ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ভাঙতে। আজ ছ’ঘণ্টা পর্যন্ত ভাঙ্গেনি। কিন্তু আপনারা চলে যাবার পর আবারও ভাঙতে পারে। আমার ছেলেকে ঘরে রাখবো না। অন্য কোথায় পাঠিয়ে

আলমারির কাচ পরীক্ষা করছেন লেখক, খাটে বসে অমিয়শঙ্কর রায়

দেবো। কিন্তু তারপরও যে ভাঙবে না, সে গ্যারান্টি আপনি দিতে পারবেন?

বললাম, আপনার চ্যালেঞ্জ আমাদের সমিতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু ঘরে কেউই থাকবে না। ঘর ‘সিল’ করে দেবো। ছ’দিন, ছ’সপ্তাহ, ছ’মাস- যতদিন সিল থাকবে কিছু ভাঙবে না, উল্টোবে না। আপনি কি এই শর্তে রাজী হবেন?

না, রাজি উনি হননি।

পরের দিন ‘The Telegraph’, ‘আজকাল’, ‘বর্তমান’, ‘বসুমতী’ পত্রিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে আমাদের সমিতি কর্তৃক কাচ ভাঙ্গা রহস্যভেদের খবর প্রকাশিত হয়।

খবরটা কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। ৫ ডিসেম্বরের গণশক্তিতে আবার একটি খবর প্রকাশিত হয়। তাতে জানানো হয় অমিয়শঙ্কর রায় জানিয়েছেন “রবিবার প্রায় জোর করেই প্রবীর ঘোষ নামে এক ব্যক্তি এ সম্পর্কে পরীক্ষা করতে ঘরে ঢোকেন। সঙ্গে কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রিতিনিধিদেরও ডেকে নিয়ে আসেন। পরের দিন সংবাদপত্রে তাঁর ভাষ্য পড়ে বিস্মিত।”

অর্থাৎ আমি কিছু সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রায় জোর করে তাঁর ঘরে ঢুকে দীর্ঘ ছ-সাত ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা চালিয়েছিলাম। এবং সাংবাদিকদের কি বলেছি, তিনি জানতেন না। পরের দিন সংবাদপত্র পাঠে প্রথম জানলেন এবং বিস্মিত হলেন। এত মিথ্যা ভাষণের আগে অমিয়বাবুর খেয়াল করা উচিৎ ছিল, ওইদিন ‘আজকাল’ পত্রিকা ভিডিও তে যতটা সময় ধরে রেখেছে, তা অমিয়বাবুর মিথ্যাচারিতার মুখোশ খোলার পক্ষে যথেষ্টতার চেয়ে বেশি। এটা অবশ্য অমিয়বাবুর বোধহয় জানা ছিল না, তাঁদের সঙ্গে একাধিক দিন আমার যে সব কথাবার্তা হয়েছে, তাঁর অনেকটাই ক্যাসেটবন্দী করে রেখেছি। জানা থাকলে এমন আদ্যন্ত মিথ্যাভাষণ থেকে নিশ্চয়ই সংযত হতেন- মুখোশ খুলে পড়ার ভয়ে।

জানি না, অমিয়বাবুর এই ধরনের মিথ্যাচারিতার সঙ্গে সৌম্য পরিচিত কি না? দীর্ঘ বছর কাছাকাছি থেকে বাবাকে দেখার দরুন বাবার এই দুর্বলতার কথা সৌম্যের অজানা না থাকতেই পারে। দেখা দিতে পারে বাবার প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা, ক্ষুব্ধতা ইত্যাদি। পাশাপাশি বাবার এই ধরনের মিথ্যাচারিতা ছেলেকে অন্যভাবেও প্রভাবিত করতে পারে।

হতাশা, ঈর্ষা, অবদমিত
আবেগ, ক্রোধ, শ্রদ্ধাহীনতা
ইত্যাদি থেকে এই ধরনের হল্লাবাজ ভূত
সৃষ্টির বহু ঘটনা মনোরোগ চিকিৎসকদের
অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে। এমন অবস্থায় মা-বাবার
উচিৎ ভালবাসা ও সহানুভূতি নিয়ে সন্তানের পাশে
দাঁড়ানো। ঠুনকো সম্মানবোধের দ্বারা
পরিচালিত হয়ে কেউ সন্তানের ভ্রান্তিকে,
অন্যায়ভাবে আড়াল করতে চাইলে সে তৈরি
হয়ে উঠতে পারে আর এক
‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’।

এটা বললে অপ্রাসঙ্গিক হবে না, ৯ ডিসেম্বর ৯০ ‘আজকাল’ পত্রিকায় ‘রবিবাসর’ -এর দুটি রঙ্গিন পৃষ্ঠা ছিল ‘মানুষ ভুত’ নিয়ে। আমিয়বাবুর মিথ্যাচারিতার মুখোশ খোলার পক্ষে পৃষ্ঠা দুটির ভূমিকা ছিল যথেষ্টর চেয়েও বেশি।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x