উত্তরোত্তর কর্ষণযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কিছুটা উন্নত ধরনের কৃষি কাজের প্রচেষ্টার দরুন এখন আর আমার এক জোড়া বলদের দ্বারা কৃষি কাজ চলে না। অনেক দিন হতে ভাবতে ছিলাম যে, হয়ত দুজোড়া বলদ অথবা এক জোড়া ভাল মোষ কেনা দরকার। ভেবে-চিনতে স্থির করলাম যে, মোষই কেনব। মোষ কেনার জন্য – সালুকা, বদিউল্লা, পাতার হাট ইত্যাদি অনেক স্থানে খোঁজ করলাম। কিন্তু কোথায়ও পছন্দ মত মোষ পেলাম না। শোনতে পেলাম যে, যশোরের একটি হাটে (হাটটির নাম এখন স্মরণ নাই) ভাল মোষ পাওয়া যায় স্থির করলাম মোষ কেনার জন্যে যশোরে যাব। আমার সাথে যাবে স্থানীয় আদম আলী গোলদার ও আঃ মজিদ মাতব্বর গরু কেনার জন্যে এবং আমার রাখাল রূপে নাজমে আলী খান।

১৩৫৪ সালের ৩রা মাঘ আমরা যাত্রা করলাম যশোরে। আমি সঙ্গে নিলাম-নগদ ছ-শ টাকা, পাঁচ সের চিড়া, একখানা কাথা একটি কম্বল, একটি গরম কোট, দু গোছা রশি এবং ঘটি-বাটি-থালা ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় জিনিষ-পত্র। আর নিলাম- “আশি দিনে ভূপ্রদক্ষিণ” ও “রবিনসন ক্রুশো” নামক দুখানা বই রেল ও স্টীমারে বসে পড়বার জন্য। বেলা দুটোয় বাড়ি থেকে যাত্রা করে চারটায় বরিশাল গিয়ে খুলনাগামী জাহাজে চড়ে বসলাম।

জাহাজে বসে আলাপ হ’ল ভোলা নিবাসী কফিলদ্দি বেপারীর সাথে। তাঁরা একদল লোক আট জন। তাঁরাও চলছে যশোরে মোষ কেনার জন্যে। একই জিলার অধিবাসী ও একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছি বলে আমার উভয় দলের লোকদের মধ্যে একটা মৈত্রীভাব এসে গেল; দুদলে প্রায় একদল হয়ে গেলাম। বেশ আরামেই সময় কাটতে লাগল জাহাজে।

৪ঠা মাঘ। ভোরে আমরা খুলনা পৌঁছলাম এবং ট্রেন যোগে যশোরে গিয়ে একটি হোটেলে খেয়ে নিলাম। কিন্তু সেখানে জানতে পেলাম যে, আমরা যে হাটটিতে মোষ-গরু কেনার উদ্দেশ্যে গিয়েছি, বর্তমানে সে হাটটি মেলে  না। শুনে আমরা একটা মস্ত সমস্যায় পড়ে গেলাম।

কফিলদ্দি বেপারী বহু বছর যাবত উত্তরাঞ্চল হতে গরু-মোষ কিনে এনে নিজাঞ্চলে বিক্রি করেন এবং তাঁরা উত্তর অঞ্চলে যাতায়াত করেন বছরে সাত-আট বার। ব্যবসায়ের ক্ষেত্র তাঁদের- যশোর, ফরিদপুর, মুর্শিদাবাদ, দারভাঙ্গা, মুজাফফর পুর, কটিহার, হরিহর ছত্র ইত্যাদি স্থান সমূহ। তাঁরা স্থির করলেন- লাল গোলা যাবেন। “লাল গোলা” স্থানটি মুর্শিদাবাদ জিলার অন্তর্গত- নবাব সিরাজদ্দৌলার নিধন ক্ষেত্র কুখ্যাত ভগবান গোলার ১৩-১৪ মাইল উত্তরে অবস্থিত। এস্থানটা যদিও এ ভারত রাষ্ট্রের- অন্তর্ভুক্ত তবুও যাতায়াতে এখনো পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না।

মোষ-গরু কেনার অত দূরাঞ্চলে যাবার ইচ্ছা আমাদের কারো ছিল না। তবুও “ইচ্ছা” ও “অনিচ্ছা” এ দুলিতে দুলিতে ওঁদের সাথে ট্রেনে ওঠলাম। যশোর হতে রানাঘাট গিয়ে ট্রেন বদল হ’ল এবং ট্রেনে বসে বসেই রাত কাটালাম।

৫ই মাঘ ভোরে আমরা লালগোলা পৌঁছলাম গরু, ঘোড়া, মোষ ইত্যাদি পশু বিক্রয়ের একটি প্রসিদ্ধ কেন্দ্র লালগোলা হাট। হাটের আসে পাশে বহু দালালের বাড়ি। দালালেরা অনেকেই ওখানের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি আগন্তুক বেপারীরা ওদের কোন না কোনও দালালের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তারা বেপারীদের কেনা-বেচায় সহযোগিতা, পানাহার ও থাকার ব্যবস্থা এবং বিপদে-আপদে সাহায্য করে। অবশ্য এ জন্য তারা ব্যাপারীদের নিকট থেকে নির্দিষ্ট হারে একটা ভাতা আদায় করে। ওখানের বিশিষ্ট দালাল আলহাজ্ব কলিমুদ্দিন সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। পরের দিন হাট বসবে।

আহার ও বিশ্রামান্তে বিকালে আমরা কিছু সময় লালগোলা বন্দরটি ঘোরাফেরা করলাম। দেখার মত বস্তু বিশেষ কিছু ওখানে নাই। ওখানের স্মৃতি চিহ্ন স্বরূপ আমি একটি এনামেলের কেতলি কিনলাম, দাম দশ আনা। ওটি আমার ঘরে আজো আছে (১৩৮২)।

লালগোলার যে সব ছবি আমার স্মৃতি পটে আজো অম্লান আছে, তার মধ্যে প্রধান হ’ল দালাল বাড়ির ভাত-ডাল ও কাথা-বালিশ। ভাত পাক করা হয় মাড় সহ এবং চাল ফুটানো হয় বেশি। ফলে “ভাত”, এই নামটি ঠিক থাকলেও উহা আসলে হয় আটা বা কাই। তবে একটা সুবিধা ছিল এই যে, উহা দাঁতে চিবুতে হয় না, হাতে ধরে মুখে দিলে স্বেচ্ছায় পেটের মধ্যে চলে যায়।

দালাল বাড়ি সব শুদ্ধ পাঁচ বেলা আহার করছিলাম। সব বেলাতেই পাক করা হ’ল কাঁচা মাসকলাই (ডাইল) উপকরণ- জল, লবণ ও কাঁচা মরিচ; উহা বাটা নয়, কাটা। স্বাদে-গন্ধে উহা “খাদ্য” বলে মনে হত না। তবু নিরোপায় হয়ে সবাই উহাই খেত। কিন্তু আমি উহা খেতে পারতাম না, খেতাম চিড়া। তবে ওয়াক্ত (মিল) হিসাবে খাবারের পুরো দামটাই দালালকে দিতে হচ্ছে।

বেপারীদের থাকার ঘরখানা বেশ বড়, ২৫-৩০ জন লোক শুতে বসতে পারে। তবে খাট নাই এক খানাও, মেঝেই বিছানা পেতে শুতে হয়। কাথা-বালিশের চেহারা অত্যাধিক মলীন, কয়েক বছরের অসিদ্ধ। সাধারণতঃ- মোষ গরুর বেপারীরা কেহই জুতা নিয়ে চলে না। কেননা ওসব পশু সাথে নিয়ে চলতে হ’লে ওদের পথে ওদের মতই চলতে হয়, ডাঙ্গা-ডোবা ও জল-কাদার বিচার করা চলে না। পক্ষান্তরে- সমস্ত বেপারীদের খরচ জোগানোও দালালদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে দালাল বাড়ির বিছানায় অধিকাংশ বেপারীই অধৌত পদে শয্যাশায়ী হইয়া থাকে। কাজেই কাথা ও মাটি হয় একাকার।

বালিশের অবস্থা আরো শোচনীয়। দালাল বাড়ির ডাল-সালুনে তেল পড়ে না। তাই দালালকে জব্দ করার মানসিকতা নিয়েই বেপারীরা গায়-মাথায়ে তেল মাখায়ে তেল মাখায় বেশি। কিন্তু উহার অধিকাংশ তেলই শোষিত হয় কাথায়ে বিশেষভাবে বালিশে। তদুপরি- বরিশাল, ফরিদপুর, নোয়াখালী, চিটাগাং, ইত্যাদি জিলাবাসী মানুষের গায়ের পাঁচ মিশালী গন্ধে কাথা-বালিশ সিক্ত। কোন কোন বেপারী উহা ব্যবহার করতে পারে না, তাঁদের থাকতে হয়- মাঘ মাসের শীতেও নিজস্ব সামান্য কাথা-কম্বল গায় জড়ায়ে, আমাকেও থাকতে হ’ল তাই।

৬ই মাঘ। আমাদের দালাল বাড়ির নিকটেই লালগোলা হাট। আমরা কিছু খেয়ে দেয়ে হাটে গেলাম। শত শত গরু, ঘোড়া, ছাগ ইত্যাদি আমদানী হ’ল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বশতঃ মোষ আমদানী বেশি হ’ল না। যে কটি আমদানী হ’ল- কয়েক জন বেপারী- তা বাতান (পাল) সহ কিনে ফেললো। মোষ কিনতে না পেরে আমাদের ভোলাবাসী সঙ্গীরা স্থির করলেন যে, মোষ কেনার জন্য তারা বিহারের শোনপুর যাবেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হচ্ছিল যে, মোষ-গরু কিনে আমরা উভয় দলে একখানা নৌকো ভাড়া করে একত্রে দেশে ফিরব এবং উহারা আড়িয়াল খাঁ নদী দিয়ে যাবার পথে নদীর দক্ষিণ তীরে আমাদেরকে শায়েস্তাবাদ নামিয়ে দিয়ে পাতার হাট হয়ে ভোলা যাবেন। কিন্তু সে চুক্তি নষ্ট হওয়ায় আমরা সমূহ বিপদে পড়লাম। আমরা সঙ্গীরা বলতে লাগলেন যে, তারা শোনপুর যাবেন না। হয়ত গরু কিনে, নয়ত খালি মানুষই ওখান থেকে দেশে ফিরবেন। এখন আমার সমস্যা হ’ল দুটি। হয়ত মোষ কেনার জন্য সঙ্গীদের ছেড়ে ভোলাবাসীদের সাথে শোনপুর যেতে হবে নচেৎ মোষ কেনা ছেড়ে ওখানে সঙ্গীদের সাথে দেশে আসতে হবে। ভাবনা-চিন্তা ও আলোচনা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ইত্যাবসরে- বরিশালের কালাইয়া নিবাসী এক জন বেপারির নৌকোর দেশে আসবার আশ্বাস পেয়ে আমার সঙ্গীদ্বয় গরু কিনে ফেলেছেন। অগত্যা আমিও মোষ কেনার নেশা ভেঙ্গে সন্ধ্যার পরে চারশ টাকা মূল্যে দুটো গরু কিনলাম এবং দালাল বাড়ি এসে গরু পাহারা দিয়ে রাত কাটালাম।

৭ই মাঘ, ভোর হতে সানন্দে বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু সে আনন্দ বেশি সময় থাকল না। শোনলাম যে, কালাইয়া বাসী বেপারীদের নৌকোয় আমাদের স্থান হবে না। কেননা তাদের নৌকো পুরো বোঝাই হয়ে গেছে। লালগোলা থেকে পায়ে হেঁটে বরিশালে আসবার সাধ্য নাই, রেল-স্টিমারের সুব্যবস্থা নাই; উপায় এক মাত্র নৌকো। তাও আবার ৩০টি গরু-মোষ না হলে কোন নৌকো পাওয়া যায় না। আমাদের গরু সবে মাত্র ৬টি। কাজেই আমাদের পক্ষে স্বতন্ত্র নৌকো ভাড়া করা সম্ভব নয়। পার্শ্ববর্তী বহু দালাল বাড়ি খোঁজ করে কোথায়ও বরিশালগামী কোন নৌকো পাওয়া গেল না। তবে অপেক্ষাকৃত নিকটের এক খানা নৌকো পাওয়া গেল, নামতে হবে ফরিদপুরের হাজীগঞ্জে। উপায়ান্তর না দেখে স্থির করলাম- উপোসের চেয়ে চিড়া ভাল।

হাজীগঞ্জের বেপারীদের প্রধান হলেন এন্তাজ আলী খাঁ এবং তার সহগামী হচ্ছেন- আপছারদ্দিন বেপারী প্রমুখ আরো এগারো জন। গরুর সংখ্যা- ওঁদের ৭২ এবং আমাদের ৬টি সহ মোট ৭৮টি। …(অস্পষ্ট) … দিতে হবে ৮০ গরুর সং চারশ টাকা। কেননা… (অস্পষ্ট) …মালবহন ক্ষমতা ও ভাড়া নির্ধারিত হয় … (অস্পষ্ট) … দ্বারা। যেমন- ৫০ গরুর নৌকো, ৬০, ৭০ বা ৮০ গরুর নৌকো …(অস্পষ্ট) …এবং ভাড়াও নিরুপিত হয় ঐ অনুপাতে। ৬টি গরু বোঝাই করে আমরা এক খানা (সবচেয়ে ছোট) ৩০ গরুর নৌকো ভাড়া করে আনতে পারতাম। কিন্তু তার ভাড়া দিতে হ’ত ৩০ গরুর।

লালগোলা হতে হাজীগঞ্জ পৌঁছতে সময় লাগবার কথা ৪দিন। নির্ধারিত ভাড়ার টাকার মধ্যে থাকবে- গন্তব্য স্থানে না পৌঁছান পর্যন্ত মাঝিদের নিজ ব্যয়ে বেপারীদের পাক করে খাওয়ানো, গরুর খোরাকী জোগানো, প্রত্যহ সন্ধ্যায় নৌকো যেখানেই রাখা হোক না কেন, সেখানে গরু নামানো ও নাড়া-কুটা খাওয়ানো এবং তার পরের দিন ভোরে নৌকোয় উঠানো ইত্যাদি। বেপারীরা শুধু নৌকোয় উঠে বসবে ও গন্তব্য স্থানে নেমে যাবে। আর এর মধ্যেকার সময়ে তারা- গান, গল্প, তাস খেলা ও নিদ্রা, এসব কাজের যার যেটা ইচ্ছা, সে তা করবে।

৭৮টি গরু ও তার চার দিনের খাবার বিচালী, মাঝি-মাল্লাও বেপারীদের সহ একুশ জন মানুষের খাবার মালামাল ও কাঠ-কুটা ইত্যাদি নৌকোয় বোঝাই করতে বেলা ১০টা বেজে গেল। অনুকূল বাতাসে মাঝিরা নৌকোয় পাল তুলে দিল। বোধ হয়- জীবনের শেষ দেখা দেখে আমরা লালগোলা ত্যাগ করলাম এবং সানন্দে পদ্মা নদীর ও তার উভয় তীরের দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম।

আমাদের নৌকো খানা রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে চলছিল। মাঝিরা আস্তে আস্তে পাল নামিয়ে দিল এবং সাহেদ আলী নামক একজন মাল্লা শহরে উঠল বাজার করার জন্যে। শহর দেখবার লোভ সামলাতে না পেরে আমরাও কয়েক জন …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …পূর্ব দিকে নৌকো রাখবার জন্যে একটা …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …কিন্তু সে এতই দ্রুত গতিতে চলতে লাগল যে, গাড়ির … (পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … লোকের ভীড় ঠেলে ওর প্রতি দৃষ্টি রেখে এদিক ওদিক তাকানো … (পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … না মোটেই। শহর দেখার চেয়ে সাহেদকে দেখাই হল আমাদের …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … কেননা সাহেদকে হারালে- নৌকো হারাবো, সঙ্গীদের , হারাবো মালামাল এবং গরু গুলোও। তার পর কি হবে? অত ভাববার সময় পেলাম না, ত্রস্তপদে চললাম।

শহর দেখবার একটি ফুসরত পেলাম- সাহেদ যখন বাজারে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেইজ- রোশন ও তেল-লবণ কিনল তখন। কিন্তু দেখতে পেলাম শুধু আশে-পাশের বাকালী ও মুদী দোকানগুলো সে দৃশ্যটা আজো আমার মনে পড়ে এবং অন্ধের হাতী দেখার মত আমারও মনে হয়- রাজশাহী শহরটা বুঝি একটা বাজার মাত্র।

মাঝিরা পূর্বনির্ধারিত স্থানে নৌকো থামিয়ে রেখেছিল। আমরা নৌকোয় আসলে ওরা পুনঃ পাল তুলে দিল। সন্ধ্যা হলে পদ্মা গাঙ্গের দক্ষিণ তীরে একটা চরে নৌকো বেঁধে- মাঝিরা গরু গুলো চরে উঠিয়ে সারি করে বাঁধল, বিচালী খেতে দিল এবং পালাক্রমে সমস্ত রাত পাহারা দিল।

৮ই মাঘ। খুব ভোরে মাঝিরা গরু গুলো নৌকোয় তুলে পাল টানিয়ে দিল। মাঝিরা আমাদের বলল- “আজ আপনারা দেখতে পাবেন সারার পোল”, সানন্দে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম।

চলছি আমরা পদ্মা নদীর বুকের উপর দিয়ে। এ নদীটি বিহার প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে এবং বাংলাদেশকে করেছে দুভাগে বিভক্ত। এর উত্তর তীরে রয়েছে …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … ঢাকা ও কুমিল্লা জিলা এবং দক্ষিণ … (পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … কুষ্টিয়া ফরিদপুর ও বরিশাল জিলা। …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … উভয় বাংলার স্থল পথের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম সারার পোল বা হার্ডিঞ্জ ব্রীজ।

অনেক দূর হতে পোলটি দেখা যাচ্ছিল। আমাদের নৌকো পোলটি অতিক্রম করল বেলা ৩টায়। এক সারি স্তম্ভের উপর পোলটি নির্মিত। স্তম্ভগুলো গুনছিলাম, কিন্তু সে সংখ্যাটি এখন স্মরণ নাই স্থাপত্য বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের একটি নিদর্শন এ পোলটি। এর নির্মাণ কৌশল ও বিপুলতা দেখে তাক লেগে যায়। ইচ্ছা হ’ল যে, উপরে উঠে পোলটির- দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা মেপে ও নির্মাণ কৌশল পর্যবেক্ষণ করে দেখি। কিন্তু মাঝিরা তাদের সময় নষ্ট করতে রাজি হ’ল না। যতক্ষণ দেখা গেল, পোলটি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। রাত ৯টায় একটা চরে মাঝিরা নৌকো বাঁধল।

প্রত্যহ ভোরে যাত্রা ও রাতে বিশ্রাম। বেশ আরামেই সময় কাটছিল। কোনরূপ বিপদের সম্মুখীন হতে হ’ল না। বেপারীরা সময় কাটাতে লাগলেন- নানারূপ গান-গল্প, তাস খেলা ও নিদ্রায়। আমি বাড়ি হতে আশা অবধি মাত্র ও কয়টা দিনই বই পড়তে সুযোগ পেলাম।

১০ই মাঘ। বেলা ৪টায় আমাদের গন্তব্য-স্থানে নৌকো পৌঁছল- ফরিদপুর জিলার উত্তর সীমান্ত হাজীগঞ্জে। সবাই মিলে নৌকো ভাড়ার টাকা চুকিয়ে দিয়ে তটে উঠে গরু নিয়ে যার যে দিকে বাড়ি, সে দিকে যে যেতে লাগলেন। কিন্তু আমরা যাব কোন দিকে, তা আদৌ জানি না। তবে এই মাত্র জানি যে, মাদারীপুর হয়ে আমাদের দেশে আসতে হবে। ওখান হতে মাদারীপুরের দিকে আসবার যাত্রী মাত্র এক জন, আমরা তাঁর অনুগামী হলাম। রাত … (পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) … শৌলডুবী গ্রামে আপছারদ্দিন বেপারীর বাড়ি …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …মনে হল যে, তিনি নেহায়েত গরীব মানুষ। তার ঘাড়ে পড়া মেহমান আমরা। তা-ও আবার সংখ্যা …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …টের পেলাম যে, তাঁর গৃহিণী চটে আগুন হয়েছে। আমাদের দুরবস্থা ও গৃহিণীর অবস্থা, দুদিক সামলাতে বেপারী বিব্রত। তিনি কখন বাড়িতে আসবেন, তার নিশ্চয়তা না থাকায় তাঁর জন্যে ভাতের জোগান ছিল না। তবে ছেলে-পুলের জন্যে কিছু ভাত ছিল। বোধ হয় যে, তাতে বেপারী সাবের একার চলত। তিনি উহাই আমাদেরকে এনে দিলেন এবং কিছু বাসী তরকারী। আমাদের শিকি পেটা হলেও কতকটা শান্তি পেলাম। কিন্তু শোবার জায়গা নেই। কম্বল মুড়ি দিয়ে গরুর রশি ধরে শুয়ে থাকলাম একটা নাড়ার কুড়ের কাছে।

১১ই মাঘ। রাত শেষ না হতেই বেপারী সাব এসে আমাদের ডাকিয়ে তোলেন এবং পথ দেখিয়ে ও কিছুদূর এগিয়ে দিলেন এবং সমস্ত দিনের পথের ইঙ্গিত দিয়ে বিদায় হলেন। আমরা পথ চলতে লাগলাম।

সমস্ত দিন অবিশ্রাম চললাম আর হাটতে হাটতে খেলাম শুকনো চিড়া ও ডোবার জল। সন্ধ্যা হল, কিন্তু রাত কাটাবার মত জায়গা পেলাম না। লোকে বলল- কালীর বাজার ভিন্ন নিরাপদ জায়গা নাই। তা এখনো প্রায় চার মাইল দূরে। সে দিন ছিল কালীর বাজারের হাটবার। সন্ধ্যার অনেক পরেও পথে লোকের যাতায়াত ছিল যথেষ্ট। কালীর বাজার পর্যন্ত যেতে বিশেষ কোন অসুবিধা হল না। …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …লোক গুলো নেহায়েত সৎ। আমরা সেখানে …(পাঠোদ্ধার করা যায় নাই) …”ইউনিয়ন বোর্ডের একটা খালি ঘর। প্রেসিডেন্ট অনুমতি দিলে আপনারা ওখানে থাকতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের বাড়ি বাজারের নিকটেই। ছোকরাটি আমাকে নিয়ে সে বাড়িতে গেল এবং সাহেবলে আমাদের আগমন-কাহিনী জানাল। শুনে সাহেব আমাদের সেখানে থাকার অনুমতি দিলেন এবং ছেলেটিকে আরো বলে দিলেন যে, বাজারের সবাই যেন আমাদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখে এবং যত্ন নেয়, যাতে আমাদের কোন রূপ অসুবিধা না হয়। সাহেবের অমায়িক ব্যবহার ও সাদর সম্ভাষণে প্রীত হয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানাইয়ে বাজারে এলাম।

আমাদের থাকার চিন্তা দূর হল, এখন খাবার। সারাদিন শুকনো চিড়া চিবিয়ে চিবিয়ে মুখটা থেতো হয়ে গেছে। পাক-পাত্র আমাদের সাথে কিছুই নাই। তাই ভেবেছিলাম যে,যদি কিছু গুড় ও দু-একটি মেটে বাসুন পাই, তা হলে ভিজিয়ে চিড়া খাব। আমাদের অভিপ্রায় শুনে বাজারের বাসিন্দারা এক বাক্যে সবাই বললেন তা হবে না। এখানে বসে আপনাদের চিড়া খেতে দেব না। পাক করতে হবে। “আমাদের কিছুই নাই পাক করার উপকরণ”। সবাই বললেন- “আপনাদের না থাকুক, আমাদের ত আছে।“

সে সময়টাতে বাংলাদেশ কেরোসিন তেলের একান্ত অভাব। প্রথমেই তাঁরা কেরোসিন ভরে একটা বাতি এনে দিলেন। তার পর কেহ চাল, কেহ ডাল, কেহ লবণ এবং হলদি-মরিচ, পেইজ-রোসনাদি পাকের দ্রব্য সবই এনে দিলেন। হাটের কাছেই কুমার বাড়ি ছিল। সেখান হতে পাতিল এনে দিলেন এবং কেহ নিজ বাড়ি হতে এনে দিলেন কাষ্ঠ। আমরা পাক করার কাজ শুরু করলাম। কিন্তু পারলাম না, পাক করলেন প্রায় তাঁরাই। ভোজনান্তে গরুর রশি কোমরে বেঁধে শুয়ে থাকলাম বোর্ড ঘরে।

১২ই মাঘ। সকালে স্থানীয় লোকদের ডেকে বিদায় সম্ভাষণ জানালাম। উহারা আমাদের মাদারীপুরের যাবার পথের একটা পরিচয় দিয়ে দিলেন। আমি উহা অনুসরণ করে যাত্রা করলাম। বেলা ১০টায় মাদারীপুর এসে কিছুটা বিশ্রাম করে পূনঃ চলতে লাগলাম। সমস্ত দিন হেঁটে ২টায় এসে পৌঁছলাম শীকারপুর।

রাত ছিল জ্যোৎস্না। তাই পথ চলতে রাতেও কোন অসুবিধা হচ্ছিল না, কষ্ট হচ্ছিল শুধু ভাতে ও শীতে। তবুও ইচ্ছা ছিল যে, একটানা হেঁটে আসব বাড়ি পর্যন্ত, আর কোথায়ও বিশ্রাম নেব না। কিন্তু খেওয়া বন্ধ বলে শীকারপুরেই বিশ্রাম নিতে হল। নদের ধারে একটা গাছের তলায় আমরা আস্তানা করলাম। মাঘ মাসের শীতেরত মধ্যে শিশিরে ভেজা জামা-কাপড় নিয়ে গাছ তলায় মাটিতেই কম্বল বিছিয়ে শুতে হ’ল। এতদিন বালিশের কাজটা সেরেছিলাম চিড়ার ব্যাগটি শিয়রে দিয়ে। কিন্তু আজ আর চিড়া ভর্তি ব্যাগ নাই। তাই বালিশের অভাব দেখা দিল। কাছেই একটা কাষ্ঠের দোকান ছিল। দোকানীকে ডেকে তার অনুমতি নিয়ে এক আটি (ব্যান্ডেল) কাষ্ঠ আনলাম এবং গরুর রশি কোমরে বেঁধে কাষ্ঠের আটি শিয়রে দিয়ে শুয়ে থাকলাম।

১৩ই মাঘ। ভোরে কাষ্ঠের আটিটা দোকানীকে ফেরত দিয়ে, খেওয়া পার হয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। অনাহারে অবিশ্রাম চলে সন্ধ্যার অল্প আগে এসে পৌঁছলাম বাড়িতে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x