লামচরি গ্রামের অবস্থান ও পরিবেশ

জেলা বরিশালের অন্তর্গত কোতয়ালী থানাধীন লামচরি একটি অখ্যাত গ্রাম। বরিশাল শহর থেকে এ গ্রামটির পূর্বাংশের দূরত্ব জলপথে প্রায় ছ’মাইল  এবং স্থলপথে রাস্তা বিশেষে ৭ ও ৮ মাইল। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এ গ্রামটিকে তিনভাগে বিভক্ত করেছে – (১) উত্তর লামচরি, (২) দক্ষিণ লামচরি ও (৩) মধ্য লামচরি। শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে গ্রামটির অবস্থান। এর মধ্যে লামচরিতে ‘আরজ মঞ্জিল’ (আমার নিবাস) এবং এখানেই আমি প্রতিষ্ঠা করেছি ক্ষুদ্র একটি গণপাঠাগার, যার নাম দিয়েছি ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী’।

এ গামটি বেশিদিনের পুরোনো নয়, ন্তুন পয়স্থি চরাঞ্চল। এ গ্রামে জনবসতি স্থাপিত হয় মাত্র ১২৭০-৮০ (বাং) সালের মধ্যে। গ্রামের প্রায় চারিদিকেই নদী, মাত্র উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে কিছু অংশ পার্শ্ববর্তী মৌজা চরবাড়িয়ার সাথে যুক্ত।

গ্রামের অধিবাসীদের ষোল আনাই কৃষক এবং অধিকাংশ মুসলমান। শিক্ষিতের সংখ্যা নগণ্য। বর্তমানে এ গ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে মাত্র ১টি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় ২টি। কিন্তু মাদ্রাসা আছে ৩টি এবং মসজিদ আছে ১১ খানা। ধার্মিকের সংখ্যা বেশি নয়, তবে ধর্মের বাতাস বয় জোরালো। কোন পীর নাই এখানে, তবে মুরীদ আছে যথেষ্ট। আমার প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটি লামচরি গ্রামের বর্তমান পরিবেশ এবং অধিবাসীদের অধিকাংশের পরিতোষের অনুকূল নয়, তা আমি বেশ ভালভাবেই অনুভব করে আসছি। বিদ্রোহী কবি নজরুল আক্ষেপ করে বলেছেন, “বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে, বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকাহ-হাদিস চষে”। এ গ্রামটির অবস্থাও তা-ই। কিন্তু তাই বলে কি আমরা নিরাশ হবো? ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে’, আমরাও এগিয়ে চলবো নিশ্চয়ই। পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই মুহূর্তে সূর্যোদয় হয় না, হয় ক্রমানুসারে। অর্থাৎ কোথাও আগে, কোথাও পরে। তদ্রুপ বর্তমান কালে বিশ্ব যে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে, তা কোন দেববিশেষে সীমাবদ্ধ থাকবে না, থাকতে পারে না, তা পৌঁছবে বাংলাদেশেও। আর সে আলো বাংলার কোন অঞ্চল বিশেষে সীমাবদ্ধ থাকবে না, পৌঁছবে বরিশাল তথা এ গণ্ডগ্রাম লামচরিতেও। আর তার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে কিছু কিছু বর্তমানে।

এ গ্রামের বাসিন্দারা সবাই ছিলেন নিরক্ষর। এখানে নিয়মিত কোনরূপ পাঠশালাই ছিল না ১৩৪১ সালের পূর্বে। সেকালে এ গ্রামের সেরা বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন একমাত্র মরহুম আ. রহিম মৃধা।

তিনি ছিলেন  উ. প্রাইমারী পাস (১৩১৬০। এ গ্রামে সর্বপ্রথম ম্যাট্টিক ও বি. এ. ডিগ্রী লাভ করে স্নেহাস্পদ প্রিয় ফজলুর রহমান মৃধা ও মো. ইয়াছিন আলী শিকদার। তারা পাশ করেছিল বরিশালের এ. কে. স্কুল ও ব্রজমোহন কলেজ থেকে, যথাক্রমে ১৯৩৭ ও ১৯৪১ সনে (বর্তমানে তারা চাকুরীজীবনে অবসরপ্রাপ্ত এবং উভয়ে আমার লাইব্রেরীর উভয় কমিটির সদস্য)। আর বর্তমানে এ গ্রামে ম্যাট্টিক পাশ ছেলের সংখ্যা ৩৪, আই. এ. পাশ ১৭ এবং বি. এ. ৪ জন। যদিও এ গ্রামের সংখ্যার অনুপাতে আলোচ্য সংখ্যাগুলি অতি নগণ্য, তথাপি আশাব্যঞ্জক এজন্য যে, এ গ্রামের অন্তত স্থবিরতা দূর হচ্ছে।

কেউ কেউ আমাকে বলেছেন যে, লামচরি গ্রামের পরিবেশ লাইব্রেরী স্থাপনের উপযুক্ত নয়। সুতরাং লাইব্রেরীর চেয়ে একখানা পাকা মসজিদ ক্রলে ভালো হতো। তাদের আমি বলে দিয়েছি যে, এ গ্রামে মসজিদ স্থাপন করা পাপের কাজ। আমি মসজিদ বানিয়ে পাপের কাজ করতে চাই না। কেননা অমনিতেই এ গ্রামে ১১ খানা মসজিদ বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে। তার কোন কোনটিতে জুম্মার দিনে জামাত পরিমাণ (অন্তত তিনজন) মুসল্লি পাওয়া যায় না। আমি পাকা মসজিদ স্থাপন করলে হয়তো পার্শ্ববর্তী মসজিদ উচ্ছন্নে যাবে। তাতে আমি গুনাহগার হবো। ন্তুবা ‘নাদানের দান’ বলে আমার প্রতিষ্ঠিত মসজিদে কেউ নামাজ পড়তেই আসবে না। আর তখন আমি হবো ‘বেহুদা খরচাকারী শয়তানের ভাই’। আজ হোক, কাল হোক, আর শত বছর পরে হোক, পরিবেশের পরিবর্তন নিশ্চয়ই হবে – এই আশায় বুক বেঁধেছি, তাই আমি লাইব্রেরীই স্থাপন করবো।

আজকাল প্রচলিত শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ডিগ্রী লাভ করা, জ্ঞান লাভ করা নয়। কেননা ডিগ্রীবিহীন বিদ্যা দ্বারা কর্মজীবন চলে না। বস্তুত বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোন ডিগ্রী নেই। জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন। সেই অসীম জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তা হচ্ছে লাইব্রেরী। তাই আম্মি লাইব্রেরীকে অধিক শ্রদ্ধার চোখে দেখি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে। আর সেই শ্রদ্ধার নিদর্শন আমার এ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা। লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠায় আমার উদ্যম ও উদ্দেশ্যের বিষয় আরও কিছু কিছু জানা যাবে – লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবের পুস্তক প্রদান অনুষ্ঠানে আমার লিখিত ভাষণ পাঠে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x