যুক্তি আঠারোঃ অজ্ঞতা ও অন্ধতা থেকে যারা জ্যোতিষশাস্ত্রের অযথা নিন্দা করার সাহস পায়, তাদের যদি রবীন্দ্রনাথ পড়া থাকত তাহলে অন্যায় দোষারোপ করার আগে মনে পড়ত রবীন্দ্রনাথের কথা- “পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই? কতটুকু জানো? জানাটা এতটুকু, না জানাটাই অসীম। সেই এতটুকুর উপর নির্ভর করে চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া চলে না। আর তাছাড়া এত লোক দল বেঁধে ক্রমাগত মিছে কথা বলবে, এ আমি মনে করতে পারিনে। তবে অনেক গোলমাল হয় বই কি?”

এক জ্যোতিষসম্রাটের লেখা একটি বহু বিজ্ঞাপিত বই থেকে এই অংশটা তুলে দিলাম ।

বিরুদ্ধ যুক্তিঃ যুক্তিটা এই রকম— “যারা জ্যোতিষশাস্ত্রের নিন্দা করে তারা না জেনেই করে, অজ্ঞতা থেকেই করে। আর, অজ্ঞতা সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে এমন কোনও মানুষ নেই যে সর্ব বিষয়ে বিজ্ঞ। না জানা বিষয়ে মুখ ঘুরিযে থাকাটা উচিত নয়। না জানা বিষয়কে আস্বীকার করা উচিত নয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের অস্তিত্বকে মুহূর্তে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক নয়।”

এই ধরনের যুক্তিব সাহায্যে যে কোনও অস্তিত্বহীনের অস্তিত্বই কিন্তু প্রমাণ করা সম্ভব । যেমন ধরুন আমি যদি বলি যে, আকাশ থেকে মাঝে মাঝে এক ধরনের ডিম বৃষ্টি হয় কোথাও কোথাও। ডিমগুলো মাটিতে পড়ার আগেই সেগুলো ফুটে বের হয় চব্বিশ ক্যারেট সোনার দুশো গ্রাম ওজনের একটা করে জীবন্ত পাখির বাচ্চা। ওগুলো মাটিতে পড়ার আগেই উড়তে উড়তে চলে যায় কাছাকাছি কোনও সমুদ্রের দিকে। তারপর ওরা দল বেঁধে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। আপনি কোনও ভাবেই আমার এই বক্তব্যের বিরোধীতা করতে পারছেন না। কারণ বিরোধীতা করতে গেলেই বলব, “পৃথিবীর কতটুকু আপনি জানেন ? এই ধরনের পাখির অস্তিত্ব বিষয়ে আপনার জানা নেই বলে এর অস্তিত্বকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না।”

এখানে আমি আপনার কাছে যে যুক্তি হাজির করেছি তার মধ্যে রযেছে প্রতারণামূলক যুক্তি বা fallacy । আসুন আমরা একটু দেখি এই প্রতারণামূলক যুক্তির প্রতারণার অংশটুকু কোথায় লুকোন রয়েছে। বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিসঙ্গত সিন্ধান্ত আসে পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি অনুসন্ধানের পথ ধরে। সিদ্ধান্তে পৌঁছবার জন্যে আমরা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কখন শুধু করি? যখন কোনও ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে আমরা কিছু অনুমান বা সন্দেহ করতে শুরু করি এবং অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংগৃহীত তথ্য থেকে একটি আনুমানিক সিদ্ধান্ত খাড়া করি। পরিপূর্ণ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের আগের এই অনুমাননির্ভর পর্যায়কে ন্যায়শাস্ত্রে বলে প্রকল্প বা hypothesis। সোজা বাংলায় এ হলো—“কাকে আপনার কান নিয়ে গেল” শুনে সে কথায় বিশ্বাস করে কাকের পেছনে না ছুটে নিজের কানে আগে হাত বুলিয়ে দেখা— যেহেতু আপনার দুটি হাত আছে এবং সেই হাত দুটিকে ব্যবহার করার সুযোগ আপনার আছে।

জ্যোতিষশাস্ত্র-বিজ্ঞান কি বিজ্ঞান নয়, সত্য, না গাঁজা-গপ্পো; সত্য হলে শতকরা কত ভাগ সত্য; ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপকতর গবেষণায় লিপ্ত হওয়ার আগে আমরা logic বা ন্যায়শাস্ত্রের প্রকল্প অনুসারে জ্যোতিষীদের কিছু আগাম ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দেখে নিলেই গোল মিটে যায়। ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দেখার সুযোগও যখন আছে তখন সে সুযোগ গ্রহণ না করেই জ্যোতিষশাস্ত্রের যাথার্থতা নিয়ে কূট-কচকচানিতে নামা কানে হাত না দিয়েই কাকের পেছনে দৌড়নরই নামান্তর, অথবা বলতে পারা যায়, এটা হলো অন্ধকার একটা ঘরে একটা কালো বেড়ালকে খুঁজে বেড়ান, যেটা ঘরেই নেই ।

আর বিজ্ঞানের কাছে সংখ্যাধিক্যের কোনও গুরুত্ব নেই, এ-নিয়ে আগেই বিস্তৃত আলোচনায় আমরা এসেছি।