আমাদের  মানসিক জিন বৈশিষ্ট্য কিন্তু পুরোপুরি জিন বা বংশগতি প্রভাবিত নয়। পরিবেশও আমাদের মানসিক বৃত্তির ওপর বিপুলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

আমরা যে দু’পায়ে
ভর দিয়ে দাঁড়াই, হাঁটি, পানীয়
পশুর মত জিব দিয়ে চেটে গ্রহণ না করে
পান করি, কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ
করি, এ-সবের কোনোটাই
জন্মগত নয়।

এইসব অতি সাধারণ মানব-ধর্মগুলোও আমরা শিখেছি, অনুশীলন দ্বারা অর্জন করেছি। শিখিয়েছে আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোই, অর্থাৎ আমাদের সামাজিক পরিবেশ।

মানবশিশু প্রজাতিসুলভ জিনের প্রভাবে মানবধর্ম বিকশিত হবার পরিপূর্ণ সম্ভাবনা (Protentialities) নিয়ে অবশ্যই জন্মায়। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয় মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-বন্ধু, শিক্ষক, অধ্যাপক, সহপাঠী, খেলার সঙ্গী, পরিচিত ও আশেপাশের মানুষরা অর্থাৎ সামাজিক পরিবেশ। এই মানব শিশুই কোন কারনে মানুষের পরিবর্তে পশু সমাজের পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকলে তার আচরণে সেই পশু সমাজের প্রভাবই প্রতিফলিত হবে। আমার সমবয়স্ক বা তার চেয়ে প্রাচীন সংবাদ পাঠকদের অনেকেরই জানা নেকড়েদের দ্বারা প্রতিপালিত হওয়া ‘রামু’ ও ‘কমলার’ ঘটনা। নেকড়েদের ডেরা থেকে বালক-বালিকা দু’টিকে উদ্ধার করার পর তাঁদের এই নামকরণ করা হয়েছিল। ওরা দু’জনেই হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতো, জিব দিয়ে চেটে জল পান করতো, রান্না করা খাবার খেত না। কথাও বলতে জানতো না, পরিবর্তে নেকড়ের মতই আওয়াজ করতো। এরা মানুষের সমাজের সঙ্গে মানিয়ে না নিতে পেরে বেশি দিন বাঁচেনি।

আমার আপনার পরিবারের কোন শিশু সভ্যতার আলো না দেখা আন্দামানের আদিবাসী জাড়োয়াদের মধ্যে বেড়ে উঠলে তার আচার আচারণে, মেধায় জাড়োয়াদেরই গড় প্রতিফলন দেখতে পাব। আবার একটি জারোয়া শিশুকে শিশুকাল থেকে আপনি-আমি আমাদের সামাজিক পরিবেশে মানুষ করলে দেখতে পাব শিশুটি বড় হয়ে আমাদের সমাজের আর দশটি ছেলে-মেয়ের গড় বিদ্যে, বুদ্ধি, মেধার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু একটি মানুষের পরিবর্তে একটি বনমানুষকে বা শিম্পাঞ্জিকে শিশুকাল থেকে আমাদের সামাজিক পরিবেশে মানুষ করলেও এবং আমাদের পরিবারের শিশুর মতই তাকেও পড়াশোনা শেখাবার সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেও তাকে আমাদের সমাজের স্বাভাবিক শিশুদের বিদ্যে, বুদ্ধি, মেধার অধিকারী  করতে পারবো না; কারণ ওই বনমানুষ বা শিম্পাঞ্জির ভিতর বংশগতির ধারায় বংশানুক্রমিক মানবিক গুণ না থাকায় তা অনুকূল পরিবেশ পেলেও বিকশিত হওয়া কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। অর্থাৎ মানব গুণ বিকাশে জিন ও পরিবেশ দুয়েরই প্রভাব বিদ্যমান।

আমাদের মধ্যে বংশানুক্রমিক
মানবিক গুণের বিকাশ ঘটে অনুকূল
সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশে। জিনগত
কারণে বা বংশানুক্রমিক কারণে পশুদের মধ্যে
মানবিক গুণ বা বৈশিষ্ট্য বিকশিত হওয়ার
সম্ভাবনা না থাকায় অনুকূল পরিবেশের
সাহায্যে পশুদের মানবিক গুণের
অধিকারী করা সম্ভব নয়।

এই তত্ত্ব আজ সমস্ত মনোবিজ্ঞানীদের স্বীকৃতি পেয়েছে।