সবার সামনে ভূত শাড়ি করে ফালা

গত বছর ১ বৈশাখ। এক তরুণ এলেন। সমস্যা, স্ত্রীকে ভূতে পেয়েছে, পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজনে ধরে নিলাম মেয়েটির নাম টিংকু, ছেলেটির নাম চন্দন। ভূতের কান্ডকারখানাগুলো বড়ই অদ্ভুত রকমের। শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া নিজে থেকে ফরফর করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে আঁচড়ের দাগ। চুলগুলো নিজের থেকেই ছিঁড়ে যাচ্ছে। যখন তখন ঘরের মধ্যে ঢিল এসে পড়ছে। খাবার খেতে গেলেই খাবারে এসে পড়ছে চুল, ইটের টুকরো ইত্যাদি। এমনকি জল খেতে গেলেও পরিষ্কার গ্লাসে রহস্যময়ভাবে হাজির হচ্ছে চুল।

ভূতুরে উপদ্রবের শুরু ৮৭-র জানুয়ারীতে। ইতিমধ্যে জ্যোতিষী, তান্ত্রিক অনেকের কাছেই টিংকুকে নিয়ে গেছেন চন্দন। কোনও ফল হয়নি।

কদমতলার ঠাকুর বাড়িতে টিংকুকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঠাকুর বাড়ি থেকে জানান হয়- একটি ছেলের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারই আত্মা টিংকুকে ধরেছে। কারও সাধ্য নেই টিংকুকে সেই আত্মার হাত থেকে রক্ষা করে।

কদমতলা থেকে ফিরে আসার দিন থেকে শুরু হয় এক নতুন উপসর্গ। সেইদিনই হাত থেকে চুড়ি, আংটি অলৌকিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর থেকে বাড়ির বহু জিনিসই এমনি হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবশ্য টিংকুর ভিতর থেকে ভূতটি বলে দিত কোথায় সে জিনিসগুলো ফেলেছে।

চন্দনের সমস্যা সমাধানের জন্য তার পরের রবিবার সকালেই গেলাম তাঁদের বাড়ি। না বাড়ি নয়, রেল লাইনের পাশে জবর-দখল করা জায়গায় সারি সারি ছাপড়ার বেড়ার কুঁড়ে। তারই একটায় চন্দনরা থাকেন। চন্দনরা বলতে- চন্দন, টিংকু, মা, বাবা, তিন বোন, দাদা ও দুই ভাই নিয়ে দশজন।

সেদিন আমার সঙ্গী ছিল আমার ছেলে পিনাকী ও আমাদের সমিতির সদস্য মানিক মৈত্র। চন্দনের কুঁড়ের কাছে এক ঝাঁক তরুণ অপেক্ষা করছিলেন। প্রত্যেকেই চন্দনের বন্ধু বাঁ পরিচিত। আমাকে দেখে প্রত্যেকেই এক সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নাকি টিংকুর অদ্ভুত সব কর্মকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। ওদের সকলের সামনেই নাকি টিংকুর শাড়ি আপনা থেকেই সশব্দে ছিঁড়ে গেছে। গায়ের গহনা অদৃশ্য হয়েছে।

কুঁড়ের সামনে একটা সজনে গাছ। তার উপর একটা কাক এসে বসতেই কয়েক জন তরুণ গভীরতর সন্দেহ প্রকাশ করলেন- এটা আদৌ কাক নয়। কাকের রূপ ধরে টিংকুর উপর ভর করা অতৃপ্ত আত্মা। আমি কেন এসেছি, এটা অতৃপ্ত সর্বত্রগামী আত্মার অজানা নয়। তাই কৌতূহল মেটাতে আমাকে দেখতেই টিংকুকে ছেড়ে বর্তমানে কাকরূপে আবির্ভূত হয়েছে।

ঘরে ঢুকলাম। টিংকু ও চন্দনের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বললাম। জানলাম কিছু কথা। চার বছর আগে নিজেদের আলাপেই দুজনের বিয়ে। চন্দন সে সময় এ-পাড়ায়, ও-পাড়া আবৃত্তি করতেন। টিংকু ওঁর আবৃত্তি ও সুন্দর কথাবার্তায় আকর্ষিত হয়েছিলেন।

টিংকুর বাড়ির অবস্থা বেশ ভাল। বাবা ব্যবসায়ী। ব্যবসার কল্যাণে গাড়ি-বাড়ি সবই আছে। দু’মেয়ের মধ্যে টিংকুই ছোট। বড় বোনের এখনও বিয়ে হয়নি। টিংকু লেখা পড়ায় কোনও দিনই উৎসাহ বোধ করে না। তাই স্কুলের গণ্ডিটা পার হওয়ার আগেই গোটা আঠারো বসন্ত বিদায় নিয়েছে। বাড়ির তীব্র অমতে বিয়ে, তবু বাবা গয়না, খাট ও কিছু নগদ অর্থ দিয়েছিলেন।

চন্দন বেশিদূর পড়াশুনো করেননি। হাওড়ার একটি কারখানায় কাজ করেন। বছর খানেক হল কারাখানা বন্ধ। কারখানায় তালা ঝুলবার পর থেকে প্রতিদিনই আর্থিক সমস্যা তীব্রতর আকার ধারণ করছে। নগদ টাকার পুঁজি শেষ। স্ত্রীর গয়নায় হাত দিয়ে হয়েছে। ইতিমধ্যে ভূতের সমস্যা। ভূত তাড়াতে তান্ত্রিকদের পিছনেই এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে হাজার সাতেক। বর্তমানে জমি-বাড়ি বিক্রির দালালী করার চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক ছাপ না থাকায় এ লাইনেও তেমন সুবিধে হচ্ছে না।

গত বছর টিংকুর গর্ভস্থ প্রথম সন্তান আকস্মিকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। টিংকু আবার গর্ভবতী। চার মাস চলছে। ভূতের উপদ্রবও শুরু হয়েছে টিংকুর দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হওয়ার পর।

এই দারিদ্রতার মধ্যেও টিংকুর চেহারার ভিতর যথেষ্ট চটক রয়েছে। ঘরে শুধু আমি আর টিংকু। এরই মধ্যে ফ্যা-স করে শাড়ি ছেঁড়ার আওয়াজ পেলাম। শাড়ির ছেঁড়া জায়গাটা দেখালেন টিংকু। কিন্তু টিংকুর হাতগুলো পুরো সময় আমার সামনে ছিল না। তাই টিংকুর হাত যে তাঁর জ্ঞাত বাঁ অজ্ঞাতসারে শাড়ি ছেঁড়েনি, অলৌকিক ভাবে ছিঁড়েছে- এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এরপর অনেকটা সময় টিংকুর হাত দুটো আমার দৃষ্টির সামনে ছড়িয়ে রেখে বসলাম। শাড়ি আর ছিঁড়লো না। আর শাড়ি না ছেঁড়ায় টিংকু অস্বস্তি পাচ্ছিলেন। বললেন, ‘আমাদের ননদকে খাবার জল আনতে বলুন। আমি জল খেতে গেলেই দেখবেন জলে চুল পড়ে আমাকে জল খেতেও দেবে না।’

আমার কৌতূহল হল। বললাম, ‘বেশ তো, আপনার ননদকে খাবার জল আনতে বলুন।’

টিংকু ননদকে ডাকতেই পাশের ঘর থেকে উঁকি দিল একটি কিশোরী। এক গ্লাস খাবার জল চাইতে স্টিলের গ্লাসে জল নিয়ে এলো। আমি গ্লাসের জলটা পরীক্ষা করে এগিয়ে দিলাম টিংকুর হাতে। জলে চুমুক দিতে গিয়েই ‘থু-থু’ করে উঠলেন টিংকু। গ্লাসের জল থেকে গোটা দু-চার চুল তুলে ধরলেন ডান হাতের দু-আঙ্গুলে।

‘এই দেখুন চুল’। টিংকু আমার দিকে রহস্যময় হাসলেন।

আবার কিশোরীটিকে দিয়ে জল আনালাম। জল পরীক্ষা করলাম। টিংকুর হাতে তুলে দিলাম। টিংকু খেতে গিয়ে একই ভাবে ‘থু-থু’ করে দু-আঙ্গুলে তুলে ধরলেন চুল।

একইভাবে বার বার কিশোরীটিকে দিয়ে জল আনাচ্ছিলাম আর তুলে দিচ্ছিলাম টিংকুর হাতে। মোট দশ দফা জল তুলে দিয়েছিলাম টিংকুর হাতে সাত বারই জলে পাওয়া গিয়েছিল চুল। তিনবার পাওয়া যায়নি। সাতবার কিশোরীটির হাত থেকে জল নেওয়ার সময় টিংকুর দিকে পিছন ফিরতে হয়েছিল। ওই সময়টুকুর টিংকুর সুযোগ ছিল নিজের চুল ছিঁড়ে আঙ্গুলের ফাঁকে রাখার। তিনবার আমি জলের গ্লাস নিয়েছিলাম টিংকুর দিকে পিছন না ফিরে। এই তিনবার টিংকুর পক্ষে আমার চোখ এড়িয়ে চুল ছেঁড়া সম্ভব ছিল না। এবং ওই তিনবারই জলে চুল পড়েনি।

ভূতের রহস্যটা পরিষ্কার হলো। মানসিক রোগটাও নির্ণয় করা গেল- ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ বাঁ অবদমিত বিষণ্ণতা। টিংকু অতি গরীব পরিবার থেকে বিবাহ সূত্রে এই পরিবারে এলে বর্তমান দারিদ্রে নিশ্চয়ই তাঁকে অবদমিত বিষণ্ণতার স্বীকার হতে হতো না। টিংকু বিয়ের আগ পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে থেকেও বিয়ের পরে ভালবাসার মানুষটির জন্য নিম্ন আয়ের পরিবারের সকলের সঙ্গেই মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর বন্ধ কারখানা কবে খুলবে সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা, আগত সন্তানের আর্থিক দায়িত্বের চিন্তা এবং প্রতিদিনের খাওয়া পরা জোটানোর তীব্র সমস্যা একসঙ্গে মিলে-মিশে টিংকুর চিন্তাকে অহরহ জর্জরিত করছিল। পরিণামে অবদমিত বিষণ্ণতার রোগী হয়ে নিজের অজান্তে অদ্ভুত সব আচরণ করে প্রতিদিনের সমস্যা ও চিন্তা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছে।

শাড়ি-ব্লাউজ ছিঁড়ে ফেলা, গায়ে আঁচর দেওয়া, খাবারে চুল ফেলা সব কিছু নিজেই করেছে নিজের অজ্ঞাতে। এ এক অদ্ভুত অবস্থা।

জীবন-ধারণের নূন্যতম প্রয়োজন না মেটার ব্যর্থতাই যেখানে রোগের আসল কারণ, সেখানে শুধুমাত্র মানসিক চিকিৎসার মাধ্যমে বাঞ্ছিত ফল পাওয়া অসম্ভব। আমাদের সমিতির এক সভ্যের সহৃদয় সাহায্যে মেয়েটির স্বামীকে একটা কাজে লাগাবার পর মেয়েটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম সামান্য চেষ্টাতেই।

অবদমিত বিষণ্ণতা নানা কারণে একটু একটু করে গড়ে ওঠে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্বচ্ছতা পাবে আশা করি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x