উপরের ছবিটির দিকে একবার তাকান। কেমন লাগছে? আপনার যদি মূল ঘটনা জানা না থাকে, অনেকদিন পর এসে কম্পিউটার খুলে পেপারে প্রকাশিত ছবিটি দেখেন, হয়তো ভাববেন কোন চোর ছ্যাঁচোর গুণ্ডা বদমায়েশ কিংবা কোন কুখ্যাত চোরাকারবারি বমাল সমেত ধরা পড়েছে। সীমান্তে চোরাকারবারিরা অবৈধ মাল নিয়ে ধরা পড়লে কিংবা কোন ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী শ’খানেক বোতলের চালান সহ ‘ধরা খেলে যেমন ছবি ছাপায়, টেবিলে রাখা থাকে চোরাই মালমসলা আর তার পেছনে গুণধর অপরাধীরা সব লাইন ধরে দাঁড়ানো; আর তার পাশে বীরদর্পে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আমাদের গর্বিত পুলিশ বাহিনী। অবিকল সেই ধরণের ছবি।

কিন্তু আপনি অবাক হয়ে যাবেন যদি শোনেন এরা কোন চোরাকারবারি নন। এরা কৃতবিদ্য লেখক। অনলাইন কমিউনিটিতে লেখেন, যাদের আমরা ‘ব্লগার’ বলি। আর তাদের সামনে টেবিলে যা রাখা সেটা ফেন্সিডিলের বোতলও নয়, নয় কোন মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র, কিংবা কোন চোরাই মাল। টেবিলে রাখা তাদের কম্পিউটার, আর ল্যাপটপগুলো। কি বিশাল প্রাপ্তি পুলিশের! ঘটনাক্রমে দিনটা ছিল ২০১৩ সালের পয়লা এপ্রিল। এদিন বাংলা ব্লগের পরিচিত চারজন ব্লগারকে যেভাবে পাকড়াও করা হয়েছে যে ভাবে তাঁদের চোরের মত সাজিয়ে মিডিয়াতে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ছিল ভয়াবহ রকমের দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্ন কোন ‘এপ্রিল ফুল’-এর তামাসা ছিল না, ছিল রূঢ় বাস্তবতা।

অবশ্য এমনি এমনি তাদের গ্রেফতার করা হয়নি। গ্রেফতারের একদিন আগে, বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্রে : ৮৪ ব্লগারের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যার ভাষ্য ছিল এরকমের:

১লা এপ্রিল ‘আমার দেশ পত্রিকার রিপোর্টার এম এ নোমান একটি রিপোর্ট লেখেন ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ধর্মবিদ্বেষী ৮৪ ব্লগারের নথি জমা : ব্লগারদের মুখোশ উন্মোচনকারী পত্রিকাগুলোকে ধন্যবাদ শিরোনামে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন[৬৫]:

 ‘তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামবিদ্বেষী ৮৪ ব্লগারকে চিহ্নিত করে ছবিসহ তাদের নাম-ঠিকানা ও ব্লগের বিবরণ এবং আপত্তিকর মন্তব্যগুলোর প্রিন্ট কপিও আলেমদের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরুপ কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেয়া হয়।

ঘটনাবহুল এ সময়গুলোতে, বিএনপি জামাতের মুখপত্র এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রিয় পত্রিকা ‘আমার দেশ’ মুক্তমনা সাইটের নামে নতুন করে বিষেদগার শুরু করা শুরু করে। অবশ্য আমার দেশ এটা না করলেই আমি বরং অবাক হতাম। ভাবতাম, মুক্তমনার প্রভাব তাহলে এখনো জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছয়নি। মাহমুদুর রহমানের তুর্কি নাচ দেখে বুঝলাম জায়গা মতোই আঘাত করা হয়েছে। সরকার ও দেশবাসীর প্রতি শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফীর খোলা চিঠি শিরোনামের একটি লেখা প্রকাশ করে আমার দেশ, যেখানে ভেতরের দিকে ‘অন্তরালে ইসলাম অবমাননাকারী অনলাইন চক্র’ অনুচ্ছেদ যোগ করে ধর্মান্ধদের খেপিয়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। আধাপাতার দুই প্যারাগ্রাফের প্রতিটি লাইন মুক্তমনার প্রতি নৈবদ্য আকারে খিস্তি আকারে প্রকাশ করে আমার দেশের প্রতিবেদক। যদিও ‘নির্ভীক প্রতিবেদক’ নিজের নামটি প্রকাশ করেননি সেই প্রতিবেদনে। আমরা ধরে নিতে পারি, নামহীন এই ‘গরলামৃত’ নীলকণ্ঠী মাহমুদুর রহমানেরই কণ্ঠনির্গত :

আওয়ামীলীগ সরকার কার্যত তখন ‘আমার দেশ’ নামক প্রপাগাণ্ডামূলক পত্রিকা থেকে সংক্রমিত ভাইরাসের শিকার হল। ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা না করে ‘অ্যান্টিভাইরাস’কেই ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করলো। এর ফলে গ্রেফতার হলেন মননশীল মুক্তচিন্তার ব্লগারেরা।

তবে, ‘আমার দেশ’ এই ব্লগারদের নিয়ে যত মিথ্যাচার করুক না কেন, ব্লগারেরা কোন অপরাধী ছিলেন না। তারা বরং সমাজ-সচেতন লেখক। তাদের জ্ঞানগর্ভ লেখা বরং আমার মত ছাপোষা পাঠকেরাও মন দিয়ে পড়ে, তাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে নিজেকে শানিত করে তুলে। আমি তাদের লেখালিখির মধ্যে খুঁজে পাই জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত। সুব্রত শুভ নামের যে ছেলেটিকে ধরা হয়েছে তার লেখালিখির সাথে আমি খুব ভালভাবেই পরিচিত ছিলাম। কিছুদিন আগে নিজে থেকেই মুক্তমনায় লিখবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তার প্রথম পোস্টটিই ছিল মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামা কে নিয়ে। সুব্রতের। লেখা থেকেই আমি জেনেছি কাদের মোল্লার বিচারের অন্যতম প্রধান সাক্ষী শহিদুল হক মামা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন; গেরিলা বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন সে সময়। মিরপুরে কাদের মোল্লা ও বিহারীদের নির্মম ধ্বংসলীলা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। এছাড়াও তিনি ৬৬–তে ছয় দফা, ৬৯-তে গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত ছিলেন। লেখাটা পড়ার আগে উনার কাজের সাথে পরিচয়ই ছিল না আমার। সুব্রত আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল জ্ঞানে গুনে কত ক্ষুদ্র আমি, শহিদুল হক মামার নামই আমি আগে শুনিনি। তার লেখা থেকেই জেনেছিলাম, সুইডেন নিবাসী অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে দেশে চলে এসেছিলেন। প্রথম রাযে উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় বেদনাহত কণ্ঠে বলেছিলেন– ‘বুক ভরা আশা নিয়ে সুইডেন থেকে আসছিলাম। অন্তত আমি ন্যায় বিচার পাব। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, গণহত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ন্যায় বিচার পাব আদালত থেকে। ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই। আমার অভিযোগ হচ্ছে রায়ের বিরুদ্ধে। সুব্রত শুধু শহিদুল হক মামাকে নিয়েই লিখেনি। তার আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের কথা মনে পড়ছে— ‘মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কিছু কথা’ এবং অন্যটি– ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রাম-এর ভূমিকা।’ পোস্টগুলোর শিরোনাম দেখেই নিশ্চয় পাঠকেরা অনুমান করতে পারছেন কি অপরিসীম ভালবাসা ছেলেটি বুকে ধারণ করে দেশের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য বলতে দ্বিধা নেই এদের মত দৃপ্ত তরুণদের জন্যই শাহবাগের গণজাগরণ সম্ভব হয়েছে। মানুষ পেযেছে হারানো শক্তি, উদ্যম নতুন আশায় বুক বেঁধেছে পরবর্তী রায়ের জন্য।

অথচ মুক্তিযুদ্ধের সার্বক্ষণিক কর্মী এ ছেলেটাকে ‘নাস্তিক’ সাব্যস্ত করে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হল। গ্রেপ্তারের খবর পাবার পর মুক্তমনায় তার পোস্টগুলো আবারো পড়লাম খুঁটিয়ে দেখলাম তার একটা লেখাও নাস্তিকতার উপরে নয়। একটি লেখা আছে বটে বিখ্যাত এক নাস্তিক বিজ্ঞানীকে নিয়ে লেখাটির শিরোনাম— “রিচার্ড ডকিন্স’এর প্রতি ভালোবাসা’। হ্যাঁ রিচার্ড ডকিন্স ব্যক্তি জীবনে নাস্তিক ঠিকই, কিন্তু নাস্তিকতার চেয়েও বড় যে ব্যাপারটি সেটা হল তিনি পৃথিবীর অন্যতম সেরা জীববিজ্ঞানী। যার লেখার যাদুতে, বৈজ্ঞানিক যুক্তির স্ফুরণে বিমোহিত হননি, এমন পাঠক পাওয়া দুর্লভ। তার ‘সেলফিশ জিন’ বইটিকে আমি এ শতকের অন্যতম সেরা বইয়ের তালিকায় রাখব চোখ বন্ধ করেই। এহেন ব্যক্তির কাজের জন্য কেউ ভালবাসা প্রকাশ করতেই পারেন। আমিও করেছি বহুবারই। ডকিন্সের শেষ বই ‘ম্যাজিক অব রিয়ালিটি ছিল আমার জন্য অনাবিল এক আনন্দের উৎস। যেভাবে আমি আপ্লুত হই হুমায়ুন আজাদের সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, কিংবা ‘বাঙলাদেশের কথা আবৃত্তি করে, ঠিক তেমনই আপ্লুত হয়ে উঠি রিচার্ড ডকিন্সকে পড়তে পেরে। এই জ্ঞানের আনন্দকে কি আস্তিকতা, নাস্তিকতা দিয়ে মাপা যায়, না উচিৎ? একজন দক্ষ পিয়ানো বাদক যেমন আমাদের আপ্লুত করতে পারেন তার দক্ষ হাতের যাদুতে, একজন কবি যেমন আমাদের আপ্লুত করতে পারেন কাব্যের মূছনায়, তেমনি ডকিন্স আমাদের অভিভূত করেছেন ক্ষুরধার বৈজ্ঞানিক যুক্তি আর লেখনীর মাধ্যমে। এই আনন্দে কেবল আমি আপনি নন, আপ্লুত হতেন স্বয়ং আইনস্টাইনও। ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারনাকে পরিত্যাগ করেও তিনি মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধান করে রোমাঞ্চিত হতেন ছোট বাচ্চাদের মতোই। বলতেন, ‘আমি ব্যক্তি ঈশ্বরের কল্পনা করতে চাইনা। আমরা আমাদের অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়ের। সহায়তায় যে মহাবিশ্বের গড়ন এখন পর্যন্ত সম্যক বুঝতে পেরেছি এতেই শ্রদ্ধা-মিশ্রিত ভয়ে আমরা আপ্লুত। কী কাব্যিক একটি লাইন। এই উপমার আঘাতে উতলা হয়ে যাবে আস্তিক-নাস্তিক সবাই। কিন্তু সরকার বাহাদুর সেসময় পণ করেছিলেন জ্ঞানার্জনের এই আনন্দটা মাটি না করে ছাড়বেন না।

শুভর পাশাপাশি রাসেলের সম্বন্ধেও জেনেছিলাম সে সময়। সুলেখক আরিফ জেবতিক একটি পেপারে চমৎকার একটি লেখা লিখেছিলেন একটি পত্রিকায় একমাত্র বিকল্প ভালো মানুষদের সক্রিয়তা’ শিরোনামে। সে লেখায় রাসেল পারভেজকে নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তা পড়ে যে কারোই মনে হবে, কী দরকার ছিল আমাদের এ পোড়া দেশ নিয়ে চিন্তা করার। আরিফ জেবতিক লিখেছেন, “রাসেল পারভেজ আর তাঁর স্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তাঁরা চাইলেই বিদেশে থেকে যেতে পারতেন, নিশ্চিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর জীবনযাত্রা উপভোগ করে খুব সহজেই ফেলে আসা স্বদেশকে দুটো গালি দিয়ে আর করুণার চোখে তাকিযে তাঁরা জীবন পার করে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশ। এই দেশটা এমনভাবে তাঁদের হৃদয়ে গেঁথে ছিল যে যখন স্ত্রীর পিএইচডি শেষ হতে দেরি হচ্ছে তখন রাসেল তাঁর নিজের দুই বছরের শিশুকে নিয়ে একাই বাংলাদেশে চলে এসেছেন, স্ত্রীর লেখাপড়া শেষ করতে আরো কয়েক বছর লেগেছে, এই সময় রাসেল তাঁর শিশুপুত্রকে বাংলাদেশ দেখাবেন বলে ঘাড়ে করে নিয়ে বইমেলায় ঘুরেছেন, শহীদ মিনারে গিয়েছেন, রমনার বটমূলে গান শুনেছেন। কর্পোরেট উচ্চ বেতনের হাতছানি উপেক্ষা করে বাচ্চাদেরকে বিজ্ঞান শেখানোর ব্রত নিয়ে রাসেল পারভেজ স্কুলমাস্টার হয়েছেন। রাসেলের স্ত্রীও দেশে ফিরে এসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ, ঘাতক জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে। অনলাইন প্রচারণায় রাসেল পারভেজ সবসময়ই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। আর এ ছেলেটাকে দাগী আসামীর মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তার অপরাধ ‘নাস্তিকতা’। একইভাবে দাঁড় করানো হয়েছে মশিউর রহমান বিপ্লবকেও, যার স্ট্যাটাসগুলোতে থাকত অদম্য সাহসের ছাপা

এর পরদিন ধরা হল আসিফ মহিউদ্দীনকে। ২০১৩ সালটা যেন আসিফের জন্য ছিল বিভীষিকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে ব্লগ লিখে সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। করা হয়েছে নানা ধরনের হেনস্থা। এ অবস্থা পার হতে না হতেই কিছুদিন পরে হয়েছেন মৌলবাদীদের আক্রোশের শিকার। ফিরে এসে লেখালিখি শুরু করতে না করতেই তার ব্লগ বিটিআরসির চিঠির মাধ্যমে চাপ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হল। আর তারপর করা হল ইসলামবিদ্বেষী লেখালিখির দায়ে গ্রেপ্তার। এ ছেলেটাকে যত দেখেছি তত অবাক হয়েছি। শেষ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্র শক্তির বিপক্ষে যুদ্ধ করে গেছে শিরদাঁড়া সোজা করে। এমনকি গ্রেপ্তারের আগের দিনও তিনজন ব্লগারকে হেনস্থা করা নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন এভাবে ‘সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের উইচ হান্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সে সময়ে খ্রিষ্টান ধর্মীয় মৌলবাদ এবং রাষ্ট্র সমার্থক ছিল; যে সকল নারী সমাজের পুরুষদের চাইতে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, দর্শনে এগিয়ে যেত, তাদেরকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে জীবন্ত পুড়িযে মারতো ধর্মরক্ষক সরকার এবং খ্রিষ্টান মৌলবাদীরা মৌলবাদের জন্য নারী শিক্ষা এবং নারী প্রগতি সর্বদাই বিপদজনক, তাই সরকার এবং চার্চ মিলে মিশেই প্রগতিশীল নারীদের জীবন্ত জ্বালিয়ে চারপাশে দাঁড়িযে আনন্দ করত। ঠিক একই অবস্থা আজ এই স্বাধীন বাংলাদেশে! যে সমস্ত তরুণ জ্ঞানে বিজ্ঞানে দর্শনে প্রগতি চিন্তায় এগিয়ে, যারা প্রচলিত প্রথা এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে স্বাধীন মত প্রকাশ করছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতা-সাম্যবাদ-বাক স্বাধীনতার পক্ষে লিখে যাচ্ছিলেন, তাদের এবার উইচ হান্টের মতই পুড়িয়ে মারা হবে। বহুদিন ধরেই সরকারের এই ছদ্মপ্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে কথা বলে সরকার সমর্থক ব্লগারের গালি খেয়েছি আমি। আজকে তারা কে কোথায় তা খুব জানতে ইচ্ছা করছে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সরকারের এহেন ধর্মের রক্ষকের ভূমিকায়, জামাতে ইসলামি এবং হেফাজতে ইসলামির সাথে ধর্মপ্রেমের প্রতিযোগিতায় নামায কতটা আনন্দিত, তা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।

আসিফ মাথা উঁচু করেই জেলে গেছেন, আর করে গেছেন নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্র আর তার সুবিধালেহনকারীদের গালে সজোরে চপেটাঘাত।

আমি একটা লেখা লিখেছিলাম বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এ ‘ব্লগারদের বাকস্বাধীনতায় চাই না হস্তক্ষেপ’ শিরোনামে[৬৬]। ২০১৩ সালের ২৩ শে মার্চ অন লাইন পত্রিকায় প্রকাশিত সেই লেখাটিতে বলেছিলাম,

‘ফেসবুকে এখনো বাঁশের কেল্লা আর নিউ বাঁশের কেল্লার মতো সাইট উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের এই সাম্প্রদায়িক উস্কানির বলি হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন শত শত সংখ্যালঘু পরিবার। ধর্ষিতা হয়েছেন, গুম খুন হয়েছেন। রেল লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, হয়েছে হাজার হাজার বৃক্ষ কর্তন। চাঁদে সাইদীর মিথ্যা ছবি প্রচার করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করার প্রচেষ্টা করেছে। তাদের সাইট বন্ধ হয়নি, বন্ধ করা যায়নি তাদের কর্মকাণ্ড। আর বাঁশের কেল্লাই বা বলি কেন? বাঁশের কেল্লার চেযেও উগ্র সাইট বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছে। মাহমুদুর রহমানের আমার দেশ এবং নয়া দিগন্তের মত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে মিথ্যার কুৎসিত বেসাতি দিনের পর দিন। একে তাকে নাস্তিক আখ্যা দেয়া হয়েছে, মৃত ব্লগারের ব্যক্তিজীবন নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করা হয়েছে। অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মোল্লা যাদের ব্লগ সম্বন্ধে কোন ধারনা নেই, তাদের দিয়ে উস্কানি দেয়া হয়েছে, চট্টগ্রামের মহাসমাবেশ পণ্ড করে দেয়া হয়েছে। সরকার সে সব বন্ধ করেনি। করতে পারেননি হিযবুত তাহরীরের মত উগ্রবাদী দলগুলোর প্রচারণাও। এই যে হিযবুত তাহরীরের সাইডকিক— ‘আনসারউল্লাহ বাংলা টিম’ নামের উগ্রপন্থী গ্রুপ যাদের কয়েকজন সদস্য রাজীব হত্যায় জড়িত ছিল, তাদের সাইটে গেলে যে কেউ দেখবে, বাংলা ভাষায় কিভাবে বোমা বানানোর নির্দেশিকা দেওয়া আছে, আছে নানা ধরণের উস্কানিমূলক বার্তা। রান্নাঘরে বসেই কিভাবে বোমা বানানো যায়— এ ধরণের শিরোনামে নির্দেশিকা আছে; আছে নারীদের আত্মঘাতী হামলায় উদ্বুদ্ধ করার মতো পোস্ট—’ইমানদার বোনেদের দায়িত্ব কর্তব্য’ শিরোনামে। রাজীবের হত্যাকারীদের ‘বীর’ হিসেবে উপাধি দেয়া হয়েছে এগুলো সাইটে। ভিডিও ছাড়া হয়েছে— চেরি পিকিং’ করে ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স কিংবা ধর্মপ্রচারকদের কর্মকাণ্ড দিযেও রাজীব হত্যাকে বৈধতা দিতে চেয়েছেন এই সব উগ্র ধর্মান্ধরা। অথচ মাননীয় সরকারের চোখে এগুলো পড়ছে না তারা খড়গ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রগতিশীল কিছু ব্লগারদের যারা কাউকে চাপাতি দিয়ে কোপাননি, কাউকে উস্কানি দেননি, আক্রমণ করেননি; বরং আক্রান্ত হয়েছেন, যারা কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা আর ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। যেখানে সাধারণ মানুষ ছাব্বিশে মার্চের মধ্যে জামাত শিবিরকে নিষিদ্ধ দল হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, তাদের নিষিদ্ধ না করে নিষিদ্ধ করছেন ধর্মের প্রভাবমুক্ত প্রগতিশীল ব্লগারদের, যারা মূলত জামাত শিবির সহ সব মৌলবাদী দলগুলোর বিরুদ্ধেই সোচ্চার। ‘সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ’!

আর তার চেয়েও বিচিত্র এবং নজিরবিহীন ব্যাপারটি হল– মিডিয়ার সামনে তিনজন ব্লগারকে যেভাবে দাগি আসামীর মত উপস্থাপন করা হল তার অভিনব পরিবেশনা। এর আগে কখনোই এটি দেখা যায়নি। কতটা নির্বোধ এবং নির্লজ্জ হলে এই কাজটি কেউ করাতে পারে, তা বোধগম্য হয় না। যেখানে সরকারের মধ্যেই থাকে। শামীম ওসমানের মত ফুলেল চরিত্র, যেখানে সাগর রুনীদের হত্যাকারীদের, ত্বকীর হত্যাকারীদের খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হতে হয়ে যায় পুলিশ আর দেশের পুঁদে গোযেন্দারা, সেই তারাই আবার ক্যামেরার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারী লেখক এবং ব্লগারদের হাতকড়া পরাবার মতো ছবি তুলে বিধ্বংসী পোজ নিয়ে। সহ ব্লগার নিঝুম মজুমদার পরদিন তার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন,

 “অপরাধীদের ধরলে যেমন অস্ত্র, গোলাবারুদ এগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে ডিবি ছবি তোলে, ঠিক তেমনি এই তিন ব্লগারকেও কিছু কম্পিউটারের সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন কযেকজন মানুষ কম্পিউটার চুরি করে বাংলাদেশের দুর্দান্ত নব্য রক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা খেয়েছে। একজন ব্লগার হিসেবে আমি সিম্পলি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছি এই ছবি দেখে”।

আমি নিশ্চিত এই লজ্জা নিঝুমের কেবল একা লাগেনি, লজ্জা আমাদের সবার। লেখালিখির সাথে জড়িত সকল ব্লগারেরই। সেই লজ্জা আর অপমান থেকে সেসময় ব্ল্যাক আউটে চলে গিয়েছিল আমার ব্লগ, সচলায়তন, মুক্তাঙ্গন, মুক্তমনা, নাগরিক ব্লগ, আমরা বন্ধু, চতুর্মাত্রিক, ক্যাডেট কলেজ ব্লগ, ইস্টিশন ব্লগ এবং সরব ব্লগ। সরকারের মৌলবাদ তোষণ এবং ব্লগার গ্রেফতারের প্রতিবাদ প্রতিরোধে শুরু হয়েছিল এ ব্ল্যাক আউট। কিন্তু লজ্জাটা যাদের লাগার কথা ছিল তারা শেষ পর্যন্ত বেহায়া আর নির্লজ্জই থেকে গেল। পরিতাপের বিষয় সেটিই।

আমাকে বিজ্ঞান লেখক হিসেবেই সবাই চেনেন, অন্তত যারা আমার লেখালিখির সাথে পরিচিত। কিন্তু ব্লগারদের গ্রেফতারের পর থেকে সে সময় অন্তত দুই মাস আমি একটাও বিজ্ঞানের লেখা লিখতে পারিনি, পারিনি অন্য কোন বিষয়ে মনঃসংযোগ করতে। যারা সে সময় আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখেছেন তারা জানেন সে সমস্ত স্ট্যাটাসে আমি একঘেয়ে ভাবে কেবল ব্লগারদের মুক্তির দাবীর কথাই বলে গিয়েছিলাম। আমার সব কিছু যেন হঠাৎ করেই কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, সময় গিয়েছিল থমকে দাঁড়িযে। ব্লগারদের মুক্তি না হলে আমি এই আঁধার থেকে বেরুতে পারতাম না।

সেসময় ভাবতাম, বাংলাদেশের অর্ধ-গোলার্ধ দূরে বসে আমি হতাশ্বাস ছাড়া কিই বা ফেলতে পারি। তারপরেই উঠে দাঁড়িযে নিজেকেই বলতাম– বসে বসে হতাশ্বাস ফেলার চেযে যতটুকু পারি তো করার চেষ্টা তো করি। মনে পড়ে যায় হেলেন কেলারের বিখ্যাত উক্তিটা—

‘I am only one, but still I am one. I cannot do everything, but still I can do something; and because I cannot do everything, I will not refuse to do something that I can do’.

[‘আমি একা, সর্বক্ষণই একা। আমি সব কিছু একা করতে পারি না। কিন্তু কিছু তো করতে পারি। আমি কখনোই সব কিছু করতে পারব না, কিন্তু তার মানে এই না। যে, যা অল্প কিছু আমি করতে পারি, তা করা থেকেও আমি বিরত থাকব’]।

বাংলাদেশের এই চারজন ব্লগারকে আন্তর্জাতিকভাবে কেউ চিনত না। আমি উদ্যোগী হয়ে তাদেরকে পরিচিত করার চেষ্টা করলাম। আন্তর্জাতিকভাবে কাউকে পরিচিত করাতে হলে তা ইংরেজিতেই করতে হবে। বাংলা লেখায় আমি যতটা স্বতঃস্ফূর্ত, ইংরেজিতে তা নই। তারপরেও আমি বুঝেছিলাম, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে হলে এই মুহূর্তে ইংরেজিতে লেখা ছাড়া গতি নেই। আমি নিজে লিখা শুরু করলাম। অন্যান্যদেরও বললাম। বিশেষ করে জার্মানিতে বসবাসরত মুক্তচিন্তক দম্পতি ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা এবং ওমর ফারুক লুক্স ফেসবুকে এবং অন্যত্র জোরালো ভাষায় যেভাবে লেখালিখি শুরু। করলেন, এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করলেন, তা এক কথায় ছিল অনন্য। মুক্তমনা ব্লগার (অধুনা প্রয়াত) ড. জাফর উল্লাহ একটা চমৎকার লেখা লিখেছিলেন সে সময় ‘Muzzling the voice of freethinking bloggers: An alarming development in Bangladesh’ শিরোনামে’[৬৭]। মুক্তমনা থেকেও আমরা একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম– “Bangladesh government squishing freedom of speech’ বলে[৬৮]। আমাদের স্টেটমেন্ট এবং প্রথমদিককার লেখাগুলোই ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য প্রাথমিক সূত্র। সেগুলো টুইটারে এবং ফেসবুকে অসংখ্যবার শেয়ার করা হয়েছিল। মুক্তমনায় আমরা ব্লগারদের মুক্তি চেয়ে ব্যানার করেছিলাম। খুব কম সময়ের মধ্যে চমৎকার কিছু ব্যানার তৈরি করে দিয়েছিলেন আসমা সুলতানা মিতা এবং কাজী মাহবুব হাসান।

আমাদের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছুতে দেরী হল না। ‘ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট এন্ড এথিকাল ইউনিয়ন (IHEU) আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তচিন্তক এবং মানবতাবাদীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হিসেবে পরিচিত। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনটি যুক্তিবাদী, সংশয়বাদী, অজ্ঞেয়বাদী, নাস্তিক, মানবতাবাদী এবং মুক্তমনাদের জন্য একধরণের ‘আম্ব্রেলা অর্গানাইজেশন’ হিসেবে কাজ করে তারা গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের জন্য সাহায্যে এগিয়ে এলো। এপ্রিলের চার তারিখে দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে তারা খুব কঠোরভাবে বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করলেন[৬৯]। দীর্ঘ বিবৃতিতে তারা সুস্পষ্টভাবে বলেছে বর্তমান সরকার ‘নাস্তিক ব্লগারদের গ্রেপ্তার করে মৌলবাদীদের পাতা ফাঁদে হাঁটছে। আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে সেটা তাদের সেই বিবৃতিতে প্রকাশ করেছিল এভাবে :

“Avijit Roy is a Bangladeshi freethinker, founder of Mukto-Mona, an online platform for freethinkers, rationalists, skeptics, atheists, and humanists of mainly Bengali and South Asian descent. The group includes authors, scientists, philosophers, and human rights activists from around the world, as well as at least two of the bloggers arrested in recent days. Roy told IHEU:

“In February and March this year Bangladesh saw a popular movement known as the Shahbag Movement or Protest. This was organized by bloggers and on social networks, demanding justice over crimes against humanity committed during the 1971 Bangladeesh Liberation War, in which Jamaat-e-Islam and its leaders were strongly implicated. A section of Islamists including Jamaat-e-Islam and Hifazat-e-Islam have since waged a disinformation campaign to brand the bloggers ‘atheists’ and ‘blasphemers’ and stir up anger and legal proceedings against them on that basis. With these arrests, the government is now trying to appease these Islamists.

“The government has made a list of bloggers and online forum participants who they labeled atheists and defamers of Islam. In an interview given to popular press, a spokesperson for the government has announced that the government will arrest and prosecute these “errant” bloggers. Although there is no law against atheism in Bangladesh, the government is persecuting these bloggers on charges of offending Islam and its Prophet.

Government thinks that if they put several freethinking bloggers in jail, it will keep the fundamentalists happy for time being. The government has taken this easy route to appease a handful of mullahs whose support they need to win the upcoming election”.

মৌলবাদীদের বানানো ৮৪ জন ব্লগারের তালিকা সরকারীভাবে গ্রহণ এবং পত্রিকায় প্রকাশেরও সমালোচনা করল তারা। আই. এইচ.ই.ইউর প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় উল্লেখ করেছেন, “এই নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে সরকারী ধরপাকড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আই.এইচ.ই.ইউ দ্বিতীয় আরেকটি স্টেটমেন্ট প্রদান করে এপ্রিল মাসের নয় তারিখে। ‘Call to action: Defend the bloggers of Bangladesh’ শিরোনামের এ বিবৃতিতে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তকদের উপর আগ্রাসন প্রতিরোধ করার আহবান জানিয়েছে সংগঠনের সদস্যদের।

এর পরে বহু বড় ঘটনাই ঘটেছে। এর মধ্যে সেন্টার ফর ইনকোয়েরি (CFI) এর পক্ষ থেকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে চিঠি লেখা হয়েছে। চিঠি লেখা হয়েছে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতকেও। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট (IFJ) ব্লগারদের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এথিস্ট অ্যালায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল’ (AAI) ব্লগারদের তাৎক্ষণিক মুক্তি দাবী করেছে। এথিস্ট অ্যালায়েন্স-এর প্রেসিডেন্ট কার্লোস ডিজ স্বাক্ষরিত বক্তব্যে তারা ব্লগারদের মুক্তির ব্যাপারে যে কোন সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তীব্র প্রতিবাদ এসেছে গ্লোবাল ভয়েস এডভোকেসি গ্রুপ থেকেও প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী এবং অ্যাক্টিভিস্ট পি জে মায়ার্স তার ব্লগে বাংলাদেশী মুক্তচিন্তকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। ব্লগে বিবৃতি দিয়েছেন বিখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, মরিয়ম নামাজী প্রমুখ। সিএনএন, বিবিসি, হাফিংটনপোস্ট, স্লেট সহ বহু মিডিয়ায় মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সরকারের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ এবং পোস্ট এসেছে। ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে পিটিশনও হয়েছে বেশ কিছু ব্যক্তি এবং সংঘের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে আমেরিকান হিউম্যানিস্ট আমেরিকার অ্যাম্বাসেডরকে পদক্ষেপ চেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তাদের পিটিশনে। প্রতিবাদ এবং কর্মসূচী এসেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকেও। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর অবদানের কথা উল্লেখ করে আমি ইংরেজি এবং বাংলায় বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখি।

এ সময় মাইকেল শারমার তার পত্রিকায় বাংলাদেশের ব্লগারদের নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। যারা বিজ্ঞানমনষ্কতা, সংশয়বাদ, যুক্তিবাদ নিয়ে কাজ করেন তারা সবাই মাইকেল শারমারকে এক নামে চেনেন। এই ভদ্রলোক আজ যুক্তি এবং শিক্ষার প্রসারে সারা বিশ্বের ‘আইকন’। ‘বিলিভিং ব্রেন’, ‘হোয়াই ডারউইন ম্যাটারস’, ‘দ্য সাযেন্স অব গুড এন্ড ইভিল সহ একগাদা ভাল বই আছে তার, আর পাশাপাশি তিনি প্রকাশ করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন ‘স্কেপ্টিক’ (Skeptic) নামে। এ ম্যাগাজিনটি অলৌকিকতা, কুসংস্কার এবং অপবিশ্বাসের বিপরীতে সোচ্চার কণ্ঠ। সেই স্কেপ্টিক ম্যাগাজিনের অনলাইন ভার্শন ইস্কেপ্টিকে আমার ‘The Struggle of Bangladeshi Bloggers’ প্রবন্ধটি শারমার ‘ফিচার আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশ করেন[৭০]। স্কেপ্টিকের মত সাইটে ফিচার আর্টিকেল হিসেবে লেখা প্রকাশিত হওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং গর্বের। কিন্তু তখনো আমার সহব্লগারেরা অন্যায়ভাবে জেলখানায় আটকে ছিল, তাই আমার মনে ছিল না কোন গর্ব, ছিল না কোন আনন্দ।

বিডিনিউজ পত্রিকায় সে সময় একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘মুক্তমতের প্রকাশ ও মুক্তবিশ্বের ভাবনা’ শিরোনামে, যেখানে আভাস দিয়েছিলাম[৭১]।—

‘ধর্মদ্রোহিতার অজুহাতে আটক চারজন ব্লগারের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য মৌলবাদী দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সুব্রত অধিকারী শুভ, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ ও আসিফ মহিউদ্দীনকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে মতপ্রকাশের উপর আঘাত হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার সংস্থা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বিভিন্ন সংগঠন। …বহির্বিশ্বের মিডিয়া এবং সংবাদপত্রগুলোতেও বাংলাদেশের ব্যাপারে নেতিবাচক সংবাদ এসেছে ব্লগারদের উপর ধরপাকড় চালানোর পর। সিএনএন, বিবিসি, হাফিংটন পোস্ট, স্লেটসহ বহু মিডিয়ায় মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সরকারের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ এবং পোস্ট এসেছে। ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে পিটিশনও হয়েছে বেশ কিছু ব্যক্তি এবং সংঘের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে আমেরিকান হিউম্যানিস্ট আমেরিকার অ্যাম্বেসেডরকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তাদের পিটিশনে। বোঝাই যাচ্ছে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।

অনেকেই ধারণা করছেন সরকার যদি এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করেন, যদি ব্লগারদের বাকস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে তাদের মুক্তি না দেন, তবে তা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তির জন্য শুভ ফলাফল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশ থেকেও আমরা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সমর্থন পাচ্ছিলাম, বিশেষতঃ সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকে। যেমন, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের ৫ তারিখে ‘মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ না করার আহবান জানিয়েছিলেন দেশের ২০ বিশিষ্ট নাগরিক। তার মধ্যে আছেন, ড. সালাউদ্দিন আহমেদ, ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ড. আকবর আলি খান, অজয় রায়, কাইয়ূম চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, ডা. সারওয়ার আলী, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, খুশী কবীর, সুপ্রিয় চক্রবর্তী, তারেক আলী, ড. মুহাম্মদ। জাফর ইকবাল, এম এম আকাশ, ড. ইয়াসমিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম ও রোবায়েত ফেরদৌস। তারা বলেছেন, আপনারা সর্বজনের ধর্মানুভূতি রক্ষা করুন, তবে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করবেন না। এর ফলে দেশে বিদেশে ভুল বার্তা। পৌঁছুবে। দেশের স্বনামখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা গ্রেফতারকৃত চার ব্লগারদের মুক্তি দাবী করেছিলেন সেসময়।

পরদিন (এপ্রিল ৭, ২০১৩) আরো বলিষ্ঠ ভাবে ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংহতি সমাবেশে অভিমত দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ। ‘মুক্তচিন্তার প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে সরকার শিরোনামের সংবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উঠে এসেছিল—

 ‘ধর্মান্ধ মৌলবাদী হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু যারা ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। এর মাধ্যমে সরকার মুক্তচিন্তার প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুব্রত অধিকারী শুভসহ গ্রেপ্তার করা ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংহতি সমাবেশে এসব কথা বলেন বক্তারা।

আজ রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান বলেন, যারা ব্লগ সম্পর্কে জানে না, তারা ব্লগ নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখে না। গ্রেপ্তারকৃতদের ব্লগার বলতে চাই না, তাঁদের লেখক বলতে চাই। প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে এদেরকে মুক্তি দিন।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাবেরী গাযেন বলেছিলেন, “ব্যক্তিগত ব্লগ নিয়ে নিয়ে যারা গণমাধ্যমে প্রচার করে সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিল, তাদের গ্রেপ্তার করা হলো না। গ্রেপ্তার করা হলো মুক্তচিন্তার মানুষকে। যারা হাজার হাজার মন্দির ভাঙছে, সহিংসতা চালাচ্ছে, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, তারা কি অন্য মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে না? রাষ্ট্র আসলে কার ধর্মানুভূতি রক্ষা করতে চায়?

রাষ্ট্র আসলে কার ধর্মানুভূতি রক্ষা করতে চায়— এ প্রশ্নটা তো ছিল আমারো। এ ধরণের প্রশ্ন অনেক আগেই করেছেন হুমায়ুন আজাদ তাঁর বিখ্যাত ‘ধর্মানুভূতির উপকথা শীর্ষক প্রবন্ধে। তিনি বলেছিলেন, “আমার অজস্র অনুভূতি দিনরাত আহত হয়; পত্রপত্রিকায় গ্রন্থে গ্রন্থে নিকৃষ্ট শিল্পকলাহীন কবিতার মতো ছোটো বড়ো পঙক্তির প্রাচুর্য দেখে আহত হয় আমার কাব্যানুভূতি, নিকৃষ্ট লঘু অপন্যাসের লোকপ্রিয়তা দেখে আঘাত পায় আমার উপন্যাসানুভূতি; রাজনীতিবিদদের অসততা ভণ্ডামোতে আহত হয় আমার রাজনীতিকানুভূতি; এবং আমার এমন অজস্র অনুভূতি নিরন্তর আহত রক্তাক্ত হয়, আমি ওগুলোর কোনো চিকিৎসা জানি না, ওগুলো নিয়ে আমি কোন জঙ্গলে কোন রাস্তায় চিৎকার করবো, তাও জানি না। রাষ্ট্র এগুলোকে অনাহত রাখার কোনো ব্যবস্থা করে নি, রাষ্ট্রের মনেই পড়ে নি এগুলোর কথা। রাষ্ট্রের কি দাযিত্ব নয় আমার এসব অমূল্য অনুভূতিকে অনাহত রাখার সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেয়া? সবাই বলবে এটা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে তাকে খুলতে হবে একটি বিকট ‘অনুভূতি মন্ত্রণালয়, যার কাজ হবে কোটি কোটি মানুষের কোটি কোটি অনুভূতির হিশেব নেয়া, সেগুলোর আহত হওয়ার সূত্র বের করা, এবং সেগুলোকে সব ধরনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। আমার শিল্পানুভূতি, সৌন্দর্যানুভূত রাজনীতিকানুভূতি, কাব্যানুভূতি প্রভৃতি পাহারা দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়; কিন্তু এখন রাষ্ট্র এক উদ্ভট দায়িত্ব নিয়েছে, মনে করছে ধর্মানুভূতি পাহারা দেয়া তার কাজ। তাই রাষ্ট্র দেখে চলছে কোথায় আহত হচ্ছে কার ধর্মানুভূতি।’

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা যখন ‘ধর্মানুভূতি’ রক্ষায় ব্যস্ত, এ সময় সেন্টার ফর ইনকোয়েরির পাবলিক পলিসি বিভাগের ডিরেক্টর মাইকেল ডি ডোরা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে আসলেন আমার কাছে। তারা সারা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করতে চান। আর এই প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেবেন সিএফ আই, আইএইচইউ, অ্যাথিস্ট অ্যালায়েন্স, আমেরিকান এথিস্ট, আমেরিকান হিউম্যানিস্ট সহ সারা বিশ্বের বড় বড় মুক্তচিন্তার সংগঠনগুলো।

এই সব মুক্তচিন্তক সংগঠনের সবারই আলাদা আলাদা এজেন্ডা আর আদর্শ থাকলেও বাংলাদেশের ব্লগারদের মুক্তির ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদের একটা কর্মসূচী হাতে নিলেন তারা। শুরু হল ‘Worldwide Protests for Free Expression in Bangladesh ক্যাম্পেইন[৭২]।

প্রথমে ২৫শে এপ্রিল প্রতিবাদ কর্মসূচীর তারিখ ধার্য হয়, কিন্তু কর্মসূচীর একদিন আগে সাভারে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। সহস্রাধিক মানুষ এ দুর্ঘটনায় নিহত হয়, আহত হয় দুই হাজারের বেশি মানুষ। এই মর্মান্তিক সাভার দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে সেটা পিছিয়ে ২রা মে তে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু সংগঠন পূর্বনির্ধারিত ২৫শে এপ্রিলেই প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অন্যরা ২রা মে।

এ নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করার তাগিদ অনুভব করছি। সাড়া বিশ্বে অনেক মুক্তচিন্তক এবং মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠান প্রতিবাদের ডাক দিলেও, ২রা মে বাংলাদেশের কাউকেই এ নিয়ে উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছিল না। যে দিনটিতে বাংলাদেশের ব্লগারদের মুক্তির জন্য সাড়া বিশ্বের মুক্তচিন্তার মানুষগুলো সমাবেশ করার উদ্যোগ নিয়েছিল, সেখানে খোদ বাংলাদেশে সে দিনটিতে কোন কর্মসূচী না থাকাটা পীড়াদায়ক ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু শেষ সময় সবার সাথে যোগাযোগ রলি এবং মানববন্ধন করার মত অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তুললেন ফারজানা কবীর খান সিদ্ধা। স্নিগ্ধার আহবানে সাড়া দিয়ে ইশরাথ রথী, সৈয়দ ইমরান আলী, মিরাজি মিরাজ, মিয়া সাজু, আশরাফুল পিস, পারভেজ আলম, বাকী বিল্লাহ, আকতারুজ্জামান আজাদ, অনন্য আজাদ, ওয়াহিদা হোসেন প্রিয়া, ওয়াশিকুর বাবু, জুযেল মাহমুদ, সাদাত নিলয়, এবং সাদমান সৌমিক, ইয়াসির জুয়েল সহ আরো অনেক অনলাইন এক্টিভিষ্ট এবং ব্লগাররা মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সকল বাধা, ভয় ভীতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সভা ও মানব বন্ধনে দাড়িয়ে গেলেন তারা।

চিত্রঃ ২০১৩ সালের ২রা মে ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশের প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন।

সিলেটেও আমাদের মুক্তমনা এবং যুক্তিবাদী বন্ধুরা মিছিল করেছিল ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে।

চিত্রঃ সিলেটে ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভ

আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম যে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে ক্রমশ। দেশে বিদেশে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে সরকারকে রীতিমত হিমসিম খেতে হবে। আমার অনুমান মিথ্যে হয়নি। একটা সময় পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আটককৃত ব্লগার সুব্রত শুভ এবং রাসেল পারভেজকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। এর পর ব্লগার বিপ্লব এবং সবশেষে আসিফ মহিউদ্দীন মুক্তি পান জুন মাসে।

আসিফের মুক্তির পরপরই আমি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম—

‘গাধা সবসময়ই পানি খায়, কিন্তু একটু ঘোলা করে।

আসিফ মহিউদ্দীনের জামিনের খবরটা শুনে এটাই মনে পড়ল প্রথমে। গত পয়লা এপ্রিল জামাতি আর হেফাজতি মোল্লাদের তোষামোদ করতে গিয়ে যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রগতিশীল ব্লগারদের হাতকড়া পরিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এর পর থেকেই আমরা চেষ্টা করেছি ব্লগারদের মুক্ত করতে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। আমাদের সে আহবানে সাড়া দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তচিন্তক আর মানবতাবাদীরা রাস্তায় নেমেছেন প্ল্যাকার্ড হাতে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিএফআই, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সহ বহু সংগঠনই বিবৃতি দিয়েছিল সরকারের বাক স্বাধীনতার উপর এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে আমি নিজেও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আর বাংলাদেশে ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টরা তো কয়েক দফা করে পথে নেমেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই সবাইকে যারা আসিফের এই কঠিন সময়গুলোতে পাশে ছিলেন, আশার খোরাক যুগিয়েছিলেন।

তবে বিপরীত দৃশ্যও যে দেখিনি তা নয়। অনেকে আবার চেয়েছিলেন সাড়া জীবনই আসিফ জেলে থাকুন। রাস্তায় ফেলে আরেক দফা কোপালে কিংবা ফাঁসি দিয়ে দিলে তো আরো ভাল। কেবল ‘কাঁঠাল পাতা চিবানো ছাগুরা নয়, ছাগু ভাড়ানো’ সেলেব্রিটি ব্লগার, আম্বালিগার, পর্নস্টার সবাই ছিলেন আসিফের এই কল্লা ফেলার মিশনে অগ্রণী শরিক। ছাগুবাহিনী আর মুজিব বাহিনী গ্যাং-ব্যাং গ্রুপ করে মিশনে নেমেছিলেন; আসিফের মুক্তি চেযে কেউ স্ট্যাটাস দিলেই মুছে দিতে শুরু করেছিল তারা। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম— এরাই নাকি শাহবাগ আন্দোলনের পুরোধা, এরাই নাকি দেবে জাতিকে মুক্তি!

আমি অনেক দিন ধরেই দাঁতে দাঁত চেপে আজকের এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম, এক মাঘে শীত যায় না। আসিফ একদিন মুক্তি পাবেন, লেখালিখি শুরু করবেন, শুধু জামিন নয়, সামগ্রিকভাবে মামলা থেকেও মুক্তি পাবেন তিনি। তিনি এখন স্বনামেই পরিচিত দেশে, বহির্বিশ্বে– হয়তো দেশের বাইরেও চলে আসতে পারবেন, চাইলেই, কিন্তু কারাগারে বন্দি অবস্থায় যে বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ তিনি পেয়েছেন সেলেব্রিটি নামধারী কিছু সহব্লগারদের কাছ থেকে সেটা ইতিহাসে লেখা থাকবে।

অভিনন্দন আসিফ মহিউদ্দীন। অভিনন্দন মুক্তচিন্তার বিজযে। আমরা পাশে আছি।’

এই সময় ব্লগারদের মুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে আমি একটা লেখা লিখি ফ্রি ইনকোয়েরি (Free Inquiry) নামে আমেরিকার বিখ্যাত একটি ম্যাগাজিনে ‘ফাদার অব সেকুলারিজম’ হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত দার্শনিক পল কার্ড ছিলেন এই ম্যাগাজিনটির প্রতিষ্ঠাতা। ক্রিস্টোফার হিচেন্স, রিচার্ড ডকিন্স, স্যাম হ্যারিস, পিজি মায়ার্স এর মত বিদগ্ধ লেখক এবং চিন্তাবিদেরা এই ম্যাগাজিনটির সাথে জড়িত। বাংলাদেশে ব্লগারদের উপর আগ্রাসনের পর থেকেই তারা এ ব্যাপারে একটি লেখা প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিলেন। আমি আমার বিশ্লেষণ হাজির করেছিলাম অক্টোবর/নভেম্বর সংখ্যায় Freethought Under Attack in Bangladesh নামে[৭৩]।

লেখাটিতে বলেছিলাম, “হ্যাঁ ব্লগারদের মুক্তি নিঃসন্দেহে মুক্তচিন্তার বিজয়। তবে, একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে। দেশ এবং দেশের বাইরে মুক্তমনাদের সম্মিলিত চাপের কাছে সরকার নতি স্বীকার করলেও তাদের পরিপূর্ণভাবে মুক্তি দেওয়া হয়নি, মুক্তি দেয়া হয়েছে জামিনে। রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা মাঝে মধ্যে মুক্তবুদ্ধিকে জামিন দেয়, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে মুক্তি দিতে পারেনা। মুক্তবুদ্ধি এবং মুক্তান্বেষণের পরিপূর্ণ মুক্তি রাষ্ট্রের শাসক এবং ভাইরাস-আক্রান্ত মননের প্রজাদের জন্য বিপদজনক।’

আমার অনুমান যে ভুল ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেল কিছুদিনের মধ্যেই। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) অধ্যাদেশে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা, যেখানে ৫৭ ধারা নামে একটি ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এই ধারায় আছে, ‘রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কার্য হবে একটি অপরাধ।

এই আইন আজ পরিচিতি পেয়েছে ‘নতুন কালাকানুন’ হিসেবে[৭৪]। ইতোমধ্যেই এই কালাকানুনের শিকার হয়ে কারাবরণ করেছেন মুক্তচিন্তার দুই তরুণ মাহমুদর রহমান রায়হান (রায়হান রাহী) এবং উল্লাস দাশ। ফেসবুকে ধর্মবিরোধী মন্তব্য করার অজুহাতে এই দুই কিশোরকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তুলে দেয়া হয় পুলিশের হাতে। আর পুরো ঘটনাটিতে উস্কানি দিয়েছিল রাজীব হায়দার শোভনের জানাজার ইমামকে হত্যার ফতোয়া দো উগ্র-জিহাদি তরুণ শাফিউর রহমান ফারাবী[৭৫]। ‘মানুষিকতা’ গ্রন্থের লেখক রায়হান আবীর বিডিনিউজ পত্রিকায় ঘটনাটির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন[৭৬]—

‘ঘটনার সূত্রপাত ৩০ মার্চ, ২০১৪। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহের জন্য রাহী ও উল্লাস যখন কলেজে যাচ্ছিল বেলা এগারোটার দিকে, তখন স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংঘ ইসলামী ছাত্র শিবিরের পঞ্চাশ থেকে ষাটজন ক্যাডার তাদের উপর হামলা চালায়। অবশ্যই ধর্মানুভূতির জুজু পুঁজি করে।

হামলাকারীরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, প্রস্তুত ছিল তাদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সম্বলিত উস্কানিমূলক পাঁচ পাতার ছাপানো লিফলেট। প্রথমে রাহী ও উল্লাসকে স্থানীয় মসজিদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং পরে রাস্তায় নামিয়ে লিফলেট দেখিয়ে ও অন্য অনেকভাবে আশেপাশের মানুষদের উত্তেজিত করে নির্মম গণধোলাইযের আযোজন করা হয়।

ব্লগ ও পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি, জনতার ধর্মীয় জেশ উজ্জীবিত করতে কৈশোর-অতিক্রান্ত ছেলে দুটোকে ‘নারায়ে তাকবির শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে পিটিয়ে মুমূর্ষ করা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের পর থেকে আমরা দেখেছি, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা মানুষের জ্যের প্রতিহত করতে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে তাদের সরকারও যেন একাট্টা।

রাহী-উল্লাসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উত্তেজিত জনতা যখন শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে এই ছেলেগুলোকে হত্যাচেষ্টায় মগ্ন, সে সময় আগমন ঘটে স্থানীয় চকবাজার থানার পুলিশের। জনতার হাত থেকে ছাড়িয়ে এবার তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যারা রাহী ও উল্লাসকে হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার পরিবর্তে, তাদেরই চাপে পড়ে পুলিশ উল্টো ছেলে দুটোর নামে মামলা করে।

বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী কালাকানুন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩)–এর ৫৭ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আটক রাখা হয়। … মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে==

‘..দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাইয়া দেখিতে পাই যে, দুই জন লোককে ৫০/৬০ জন উত্তেজিত জনতা মারধর করিতেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ধৃত আসামীদ্বয়কে উত্তেজিত জনতার কবল হইতে উদ্ধার করিয়া উপস্থিত জনসাধারণকে জিজ্ঞেস করিয়া জানিতে পারি যে, উক্ত আসামিদ্বয় ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কে বিভিন্ন অবমাননাকর ও মানহানিকর ধর্মীয় উস্কানিমূলক বক্তব্য পোস্ট করিয়াছে। এই সময় ঘটনার বিষয়ে ধৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করিলে তাহারা উপস্থিত লোকজনের সামনে নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে ফেসবুকে প্রকাশিত কটুক্তির বিষয় স্বীকার করে।

পাঠক লক্ষ্য করুন, এজাহারে কেমন করে নির্দোষ ছেলে দুটোকে আসামি এবং যারা হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত তাদের উপস্থিত জনসাধারণ তকমা প্রদান করে সাধু সাব্যস্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা নাকি ফারাবী শফিউর রহমান নামে একজনের ফেসবুক দেওয়ালে গিয়ে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করা বক্তব্য দিয়েছেন। ঠিক একই ধরনের অভিযোগ উল্লাসের বিরুদ্ধেও।

প্রতিদিন একজন করে মানুষকে নাস্তিক’ প্রমাণ শেষে তাকে হত্যা করার আহবান জানিয়ে ফারাবী আজ ইন্টারনেটের পরিচিত মুখ। অপরাজ্যে সংঘ’ নামক জামায়াত মনস্ক এক সন্ত্রাসী সংগঠনের আড়ালে থেকে ফারাবী গংই রাহী ও উল্লাসের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে।’

বোঝা যাচ্ছে ৫৭ ধারা তৈরি এবং এটি প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে তথাকথিত ‘ধর্মানুভূতি’ রক্ষার নাজুক প্রক্রিয়া হিসেবেই। আর এই কালাকানুন নির্দ্বিধায় প্রযুক্ত হবে যখন রাষ্ট্র মনে করবে কোন লেখক ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ করছে। এই আইনের অপপ্রয়োগের ফলে সবচে’ বেশী ক্ষতি হবে অনলাইনের মুক্তমনা এবং প্রথাবিরোধী লেখকেরা। কারণ, কিছু লিখতে গেলেই ‘অনুভূতির বাণিজ্য’ টেনে এনে লেখককে গারদে পোরার বন্দোবস্ত করা হবে। এমনকি লেখকের নিজেকে দোষী কিংবা নির্দোষ প্রমাণের আগেই জেলে থাকতে হবে দিনের পর দিন, যেটা মানবিক এবং নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বোঝাই যাচ্ছে, ‘বিশ্বাসের ভাইরাস থেকে মুক্তি এত সহজ নয়!

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x