আমাদের সমাজটা কেমন? কি তার বৈশিষ্ট্য? কতটা সে মানবিক? সমাজ নিরীক্ষণে উৎসুক এমন যে কেউ উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তরে স্বস্তিবোধ জ্ঞাপক উত্তর যে মেলে ধরবেন না, নিশ্চিত করেই তা বলা যায়। সমাজটা মানব কল্যাণমুখী নয়। জীবনের সুস্থ বিকাশের পথ দেখাতে সে অপারগ।। প্রতারণার কলাকৌশলে তার সর্বাঙ্গ সুসজ্জিত। দমনমূলক কানুনের নিগঢ়ে সে শৃঙ্খলিত। তার যাবতীয় বিধিব্যবস্থা মানুষের কল্যাণবিমুখ। সর্বহিতকর ব্যবস্থা এখানে স্থবির। সমাজের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের জন্য ভরসা জোগায় না। মানবিক বোধ বুদ্ধি বিবেক এখানে অনুপস্থিত। মানবতা এখানে লাঞ্ছিত হয়। মানবিক চেন্তা পরিচর্যা পায় না, হয় না বিকশিত। বরং প্রবলভাবে নৈতিকতাহীনতার চর্চা হয়। অকল্যাণ উপাদানগুলো বিস্তারলাভ করে। মানবীয় সুকুমার বৃত্তি কোণঠাসা বিপর্যস্ত হয়। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, মূর্খতা, মূঢ়তা, অন্ধকার মানুষকে বিপজ্জনকভাবে গ্রাস করে আছে। জ্ঞান ও সত্যানুসন্ধানের দ্বার অর্গল আঁটা। অধিকাংশ মানুষ প্রশ্নহীন, জিজ্ঞাসাবিমুখ প্রজন্ম পরম্পরায় পাওয়া মূল্যবোধ নিয়েই সন্তুষ্ট। একেই চুড়ান্ত ধন-জ্ঞান ভেবে চিন্তার ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ রাখে।

একটি সমাজের অধিকাংশ মানুষ যদি চিন্তায় স্থবির হয়, হয় জিজ্ঞাসাবিমুখ, তাহলে নিশ্চিত তার সামগ্রিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে অচলায়তনে পরিণত হওয়া। সামাজিক এই ভয়াবহতার মাঝেও অনেক থাকেন, যারা আপনার তাগিদে একাগ্রচিত্তে জ্ঞানসাধনা করেন। সত্যাসত্য নিরূপণে সচেষ্ট হন। আপনার অন্তরলোককে আলোকিত করে পুনরায় তা ছড়িয়ে দিতে মনোনিবেশ করেন। মানুষের মধ্যে বিবেক উন্মোচনে, জিজ্ঞাসু মন পরিগঠনে এগিয়ে আসেন।

এমন মানুষের একজন আরজ আলী মাতুব্বর। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বর্তমান বিভাগীয় শহর বরিশালের এক প্রত্যন্ত এলাকায় তাঁর জন্ম।

খুব অল্প বয়সে আরজের বাবা মারা যান। একমাত্র সন্তান হিসেবে আরজ মার স্নেহে সাহচর্যে অভিভাবকত্বে বড় হতে থাকেন। আর্থিক দৈন্যে জমিজমা বিক্রী হয়ে নিঃশেষ হতে হতে এক সময় ঋণের দায়ে ভিটেমাটি পর্যন্ত নিলাম হয়ে যায়। আরজের মা অন্যের বাড়ি কাজ করে সংসার চালান। ছেলের ইচ্ছা লেখাপড়া করার। অন্ততঃ বই কেনারও সামর্থ নেই যার সে আবার লেখাপড়া করে কিভাবে? গ্রামের একজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি তাকে বই কিনে দেন। ভর্তি হন স্থানীয় মক্তবে। লেখাপড়া শুরু হয়। কিন্তু এক-দেড় বছর পরই বন্ধ হয়ে যায় মক্তবটি। সে সাথে বন্ধ হয়ে যায় আরজের লেখাপড়াও। তবে বর্ণ পরিচয়, বানান ফলা ইত্যাদি আয়ত্ব। এরপর সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য কৃষিশ্রমের পাশাপাশি লেখাপড়া চলতে থাকে প্রবল উৎসাহে; অতিশয় নিষ্ঠার সাথে। পুঁথি, লোক কাহিনী, স্থানীয় ছাত্রদের বই, বরিশাল শহরের বিভিন্ন লাইব্রেরীর বই যেখানে যেমন পেয়েছেন একটানা পড়ে গেছেন। ইতিমধ্যে লেখালেখি শুরু করেছেন, শুরুটা হয়েছে কবিতা দিয়ে। মার মৃত্যুর ঘটনা তার মননে ভয়ানক আলোড়ন তোলে। তিনি হয়ে ওঠেন দ্রোহী, সামাজিক সংস্কার, যুক্তি, বুদ্ধিহীনতার বিরুদ্ধে আপনার চিন্তা-চেতনাকে সংহত করে জিজ্ঞাসা জাল বিস্তার ঘটাতে থাকেন। জিজ্ঞাসায় জর্জরিত করতে থাকেন সমাজে চলমান সনাতনী মূল্যবোধকে। আমৃত্যু এই প্রক্রিয়ায় মগ্ন থেকে মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা চর্চার এক অনন্য সাধারণ বিরল দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন আরজ আলী মাতুব্বর।

আরজ আলী মাতুব্বর কলম ধরেছেন। লেখা শুরু করেছেন সমিল কবিতা দিয়ে। ত্রিশের দশকের প্রথম থেকে (১৯৩৬-৪৩) তাঁর লেখালিখির হাতেখড়ি। বেশকিছু সমিল কবিতা রচনা করেছেন এসময়। প্রাত্যহিক জীবন, উপদেশ, প্রকৃতি এগুলো ছিলো তাঁর কবিতার উপজীব্য বিষয়। জীবনের প্রতি প্রেম এবং যাপিত জীবনকে শুদ্ধ করায় প্রেরণা রয়েছে, জীবনকে সুন্দর সৎ করার তাগিদ রয়েছে। এছাড়া কবিতা রচনায় আরেকটি প্রক্রিয়া লক্ষ্যণীয়। অল্প কিছুকালের জন্য তিনি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করেছিলেন। ক্লাসে তাঁর ছাত্রদের এক একজনের নাম দিয়ে অসাধারণ অর্থবোধক কবিতা লিখেছেন। কোনো কবিতার প্রতি ছত্রের প্রথম শব্দটি জোড়া দিলে একজনের নাম হয়ে গেল। কোনটির দ্বিতীয় বা তৃতীয় শব্দ। এভাবে নাম ও কবিতা নিয়ে চমৎকার ক্রিড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। এর দু’একটি নমুনা এখানে উল্লেখ করা যায়।

বংশের মঙ্গল হেতু কড়ি কর দান

গ্রামের মঙ্গল হেতু দাও যশঃ মান

সর্বস্ব করিবে ত্যাগ দেশের কারণ

জগতের জন্য কর মৃত্যুকে বরণ।

[ত্যাগ]

অথবা,

হাতে মুখে কাজে যেন থাকে এক যোগ

সহসা না হয় যেন কটুভাষী রোগ

মন দিয়া লেখাপড়া করিও যতনে

তৎপর থাকিও মাতা-পিতার বচনে

আদরে তুমিও তব প্রিয় বন্ধু জনে

লিখিত বচনগুলি রেখ সদা মনে।

‘উপদেশ’ শিরোনামের ওপরোক্ত কবিতাটি আব্দুল হামেদ মোল্লার পুত্র তার ছাত্র হাসমত আলিকে উদ্দেশ্য করে লেখা। উল্লেখ্য কবিতার প্রতিটি চরণের প্রথম অক্ষর পাশাপাশি সাজালে হাসমত আলি নাম মিলে যায়।

জীবনের প্রাথমিক পর্বে এই সৃজনীকর্মে তাঁর মেধার পরিচয় মেলে। এরও আগে দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার বইছে তখন তিনি স্থির করলেন তাঁতশিল্প গড়ে কাপড় বুননের। করলেনও তাই। কাঠে পেরেক ঠুকে ঠুকে একজোড়া তাঁত বানিয়ে ফেললেন। তাতে কাপড় বোনাও চললো বেশ কিছুদিন।

স্থানীয় জমিদারের বন্ধু পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বড় কর্তা এক বিলেতী সাহেব। সাহেব জমিদার বাড়িতে বেড়াতে আসবেন। ঘর ও আশপাশটা সজ্জার দায়িত্ব পড়লো আরজ আলীর ওপর। কারণ লোকমুখে প্রচলিত আরজ আলী ছবি আঁকতে লিখতে এটাসেটা বানাতে পারে।

আরজ আলী ঘরের সাজসজ্জার পাশাপাশি কেরোসিন তেল চালিত একটি পাখাও বানিয়ে দিলেন। ঘরের বাইরে থাকলো সুইচ। সুইচ টিপলো দিব্যি পাখা ঘোরে। শ্বেতাঙ্গ বিলিতি সাহেব তো বিস্মিত। কি করে, কার দ্বারা এটা সম্ভব হল? আরজ আলীর পরিচয় পেয়ে সাহেব ঠিকই বুঝেছিলেন জনিয়াস, গোবরের পঙ্কে প্রস্ফুটিত এক পদ্মফুল। তিনি আরজকে কলকাতায় নিয়ে প্রযুক্তিবিদ্যা পড়াবেন ঠিক করলেন। পড়ে অবশ্য আরজের কলকাতা যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কলকাতায় রওয়ানা দেবার ঠিক আগের দিন মারা যান তাঁর মা। ফলে যাত্রা স্থগিত। প্রযুক্তিবিদ্যা রপ্ত করতে গেলে হয়তো তার জীবন প্রবাহ বইতো ভিন্ন ধারায়, ভিন্ন গতিতে।

কলের লাঙ্গল, কলের নৌকা (কেরোসিন চালিত) ইত্যাদিও তৈরি করেছিলেন তিনি। বৈজ্ঞানিক অনেক খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। যখন যা ভেবেছেন, মনে হয়েছে তা-ই বাস্তবায়নে বর্তী হয়েছেন। এমনিতর বিধিমুখী প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তার জীবনের প্রথম পর্বে। পরবর্তীতে যা সংহত হয়েছে জীবন দর্শনে। জীবনাচরণের নানাবিধ তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণাকে তিনি গোছগাছ করে তাঁর রচনাশৈলিতে স্থান দিয়েছেন। মানব মনের প্রবৃত্তিগুলোকে বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়ে জারিত করে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন। লেখক হবার বাসনায় বা তাতে খ্যাতিলাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেননি কখনো। মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তা চর্চা যা বিজ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর হবে সেই পথে গেছেন তিনি। মানুষের চিন্তার জগতকে প্রসারিত ও জিজ্ঞাসু মনোভাবকে ছড়িয়ে দেবার আয়োজন থেকেই তার লেখক হবার প্রক্রিয়া অব্যাহত থেকেছে।

দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অঙ্ক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে সুপ্রচুর লেখাপড়া করেছেন। এসব বিষয়ে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন এক সময়। পাণ্ডিত্য অর্জন বলতে যা বোঝায় তা হয়েছিল তার। কিন্তু পাণ্ডিত্য ফলাননি কখনো।

তার লেখা রচনাগুলো দেখলে লক্ষ্য করা যাবে অধিকাংশ বিষয় অনেকটা বিতর্কের আকারে উত্থাপন করেছেন। বিভিন্ন তত্ত্ব ও মত বিশ্লেষণ করেছেন। যা থেকে সঠিক যুক্তিগ্রাহ্য বিজ্ঞানভিত্তিক মতটি আহরণ করতে পাঠকের কোনো বেগ পেতে হয় না। ভাষা সরল ও প্রাঞ্জল। কারিকুরি নেই কোনো। দেশের গরিষ্ঠভাগ অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মানুষ অনুধাবনে সক্ষম এমন সাদামাটা বৈঠকি কথ্য উপাদানে রচনাশৈলি নির্মিত। ভাষা বা ভাষাশৈলিতে সুনিপুণভাবে তার দখলদারিত্ব অর্জন হয়েছিল কিনা তা মারা জানি না, জানার প্রয়োজনও নেই। তবে না হলে তা অধিকার যে খুব কষ্টসাধ্য হতো না নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু দেশের অধিক সংখ্যক মানুষ যারা সংস্কারে, অন্ধ আবেগে, অজ্ঞানতা লালন করে জীবন নির্বাহ করে তাদের জন্য সরল কথনে তিনি লেখনি চালিয়ে গেছেন।

আরজ আলী মাতুব্বর ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের লৌকিক বিশ্বাস এবং যুক্তিবর্জিত উপাদান সম্পর্কে বিস্তর প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছেন মানবতাহীন আবেগপ্রসূত, আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব ধর্মীয় বিধিবিধানকে। আবদ্ধ চিন্তার অনেকেই এতে সংশয় প্রকাশ করেছেন, আরজ আলী কি ধর্মীয় উপলব্ধিতে আঘাত হানতে চেয়েছেন? তিনি কি মানুষের ধর্মবোধ দুর্বল করার প্রয়াস পেয়েছেন? তিনি কি ধর্মের কোমল অনুভূতিকে হেয় করতে সচেষ্ট হয়েছেন? ধর্ম যদি মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়, মূল উপাদান যদি মানবতা সম্মত হয় তবে তাকে তিনি উচ্চকিতই করতে চেয়েছেন। এই মূলের পরিপার্শ্বে জমে ওঠা বাহুল্যকে সর্বতোভাবেই নাকচ করেছেন। মানবতার ধর্মকে তিনি সমুজ্জ্বল করতে চেয়েছেন। যুক্তি ও মননের আলোকে এবং মানবতার দৃষ্টিভঙ্গিতে যাবতীয় মতামত গ্রহণ ও বর্জনে পক্ষপাতিত্ব করেছেন।

সৎ ও সহজ জীবনাচরণের আধিকারী আরজ আলী মাতুব্বর সাদামাটা আটপৌরে জীবনযাপন করতেন। জীবনের কোনো ক্ষেত্রে বাহুল্যের কণামাত্র ছিল না। সততার ঘাটতি ছিল না একবিন্দুও জীবনের কোনো পর্যায়ে। তার মতের সাথে দ্বিমত পোষণকারী ব্যক্তিও তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়েছেন। তার সত্যবাদিতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আমিন পেশায় নিয়জিত থাকাকালে তাঁর দর্শনের ঘোরতর বিরুদ্ধবাদি চরমোনাই-এর সাহেব তাকে ডেকে নিয়েছিলেন। পীর সাহেবের জমিজিরেত সূক্ষ্মভাবে মাপার জন্য আরজ আলীকেই উপযুক্ত লোক মনে করেছিলেন। আর একটি ঘটনা। তাঁর বাড়ী থেকে বরিশাল শহর প্রায় ১১ কিলোমিটারের মত পথ। যাতায়াত করতেন নৌকায় চেপে। সপ্তাহের অধিকাংশ দিন শহরে যেতেন লাইব্রেরীতে পড়াশোনা বা সমমনা লোকজনের সাথে আলাপ আলোচনার জন্য। সচরাচর পার্শ্ববর্তী গ্রামের একজন মাঝি আমজাদ আলীর নৌকায় আসা যাওয়া চলতো। একারণে মাঝি তার যাবার বা ফেরার সময়ে কিছুটা সময় দেখে নিত তিনি আসেন কিনা। একদিন মাঝিটি তার নৌকা যাত্রী ভেবে গেলেও অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিনি এলেন হন্তদন্ত হয়ে। নৌকায় চড়ে বললেন, আজ পকেটে কিন্তু একটিও পয়সা নেই। বাকিতে নিয়ে যাবে? মাঝি সাগ্রহে সম্মতি দিলে উঠে বসলেন তিনি। বাড়ি ফিরে পড়াশোনায় মগ্ন হন। রাত দুটোর দিকে মনে পড়ে তার মাঝির পাওনার কথা। হ্যারিকেন জ্বেলে নাতিকে (ফরিদ) ঘুম থেকে উঠিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেলেন ৩ কিলোমিটার দূরবর্তী মাঝির বাড়ী। ভুলে গেছিলেন বলে বারবার ক্ষমা চাইলেন। মাঝি তো বিস্ময়ে হতবাক। ব্যক্তিগত সততার এমন বহু ঘটনার কথা জানা যায় তার সম্পর্কে। আদর্শের সাথে, চিন্তার সাথে জীবনযাপনের এমন সম্মিলন অনন্য সাধারণ। আরজ আলী সেই জিবন আয়ত্ব করেছিলেন।

মার মৃত্যু পরবর্তী ঘটনা আরজ আলী মাতুব্বরের মননে প্রবল নাড়া দেয়। সজোরে ঘা দেয় চৈতন্যে। এই ঘটনার পরই তিনি স্থির সঙ্কল্প হন সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার গোড়ামী দূর করতে আজীবন লড়াই করে যাবেন। নাম সে লড়াই হাতিয়ার নিয়ে নয়। বিবেক, বুদ্ধি দিয়ে যুক্তির তোড়ে অন্ধ আবেগকে আঁধারের কালিমাকে ম্লান করে সত্যের আলোর উদ্ভাবন ঘটাবেন। বিভিন্নমুখী প্রচুর পড়াশোনা ও সে সাথে লেখনী হাতে নিলেন। রচনা করলেন বেশ কিছু প্রশ্ন সম্বলিত প্রথম পাণ্ডুলিপি ‘সত্যের সন্ধান’। এটি নিয়ে কোর্টকাচারি হয়ে শেষ পর্যন্ত কোর্টের রায় মেনে নিয়ে প্রায় দেড় দশক কাল নিষ্ক্রিয় থাকতে হয় তাকে। পড়াশোনা, তথ্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতি নিতে থাকেন এ সময়। দেশ স্বাধীন হবার পর আরপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবার পর পুনরায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। এবার একটানা লিখেই যেতে থাকেন। আমৃত্যু এই অন্যতম সাধনায় নিয়োজিত থেকে বেশ ক’খানা পাণ্ডুলিপি রচনা করেছেন। দর্শন, প্রধানত ধর্ম দর্শন সম্পর্কেই অধিকাংশ রচনা, বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপি।

আমরা ইতিমধ্যে প্রায়-দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপিগুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে রচনাবলি আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিই। একজন ব্যক্তি পুরুষকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করতে তাঁর সমগ্র রচনা পাঠের প্রয়োজন সর্বাগ্রে। আরজ আলী মাতুব্বরের মানস ও দর্শন উপলব্ধির জন্য তাঁর রচনা সমগ্রের সাথে পরিচিত হওয়াটা জরুরী। আমরা এই উপলব্ধি থেকে তিন খন্ডে তাঁর রচনাসমূহকে বিভাজন করে আরজ নালী মাতুব্বর রচনা সমগ্র প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র-এর প্রথম খন্ডে কয়েকটি খন্ডে কয়েকটি প্রকাশিত ও কয়েকখানি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে পাণ্ডুলিপি সংখ্যা ৮। প্রকাশিত পান্ডুলিপিগুলোর মধ্যে রয়েছে সত্যের সন্ধান, অনুমান ও স্মরণিকা এবং অপ্রকাশিতের মধ্যে বেদ-এর অবদান, না-বুঝের প্রশ্ন, ভাবি প্রশ্ন, টুকিটাকি ও আমার জীবন দর্শন। উল্লিখিত পাণ্ডুলিপিগুলোর পাশাপাশি থাকছে আরজ আলী মাতুব্বরের ডায়েরীর কয়েকটি পাতা, হস্তলিপি এবং কিছু আলোকচিত্র। প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি থেকে মুদ্রিত। বর্তমান খন্ডে – পূর্বমুদ্রিত দুটো বই-এ ব্যবহৃত লেখকের স্বঅঙ্কিত প্রচ্ছদ ডিজাইন বইয়ের শুরুতে রাখা হয়েছে। না-বুঝের প্রশ্ন ও ভাবি প্রশ্ন এ দুটো রচনা লেখকের প্রাথমিক পর্যায়ে উত্থাপিত কেবল কতিপয় প্রশ্নের সন্নিবেশ। ধারণা হয়, পরবর্তীতে এগুলো বিস্তৃতাকারে সঙ্কলিত করে সত্যের সন্ধান, সৃষ্টি রহস্য ইত্যাদি গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। আমার জীবন দর্শন শীর্ষক রচনাটি সম্ভবত তিনি পরিপূর্ণ করে যেতে পারেন নি, পাঁচটি বিষয়ে রচনাটি সম্পূর্ণ করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু লিখতে পেরেছেন তিনটি বিষয়ে। আমরা অসম্পূর্ণতা মেনে তিনটি লেখাই রাখছি।

রহস্য সমগ্র’র দ্বিতীয় খন্ডে থাকবে – সৃষ্টি-রহস্য, ম্যাকগ্লেসান চুলা, সীজের ফুল, কৃষকের ভাগ্য গ্রহ ও ১৪টি ভাষণ প্রভৃতি পাণ্ডুলিপি। তৃতীয় ও শেষ খন্ডে থাকবে ভিখারীর আত্মকাহিনী, অধ্যয়ন সার, জীবন বাণী, সরল ক্ষেত্রফল ও কয়েকটি সাক্ষাৎকার।

সত্যের সন্ধান তাঁর প্রথম প্রকাশিত পুস্তক। পুস্তকটির মূল খসড়া করেছিলেন ১৩৫৯ সালে। তখন কেবল প্রশ্নাকারে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছিলেন, স্ববিস্তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তৈরি করেননি, এ ব্যাপারে কোর্ট কাচারী মামলা ইত্যাদি যা হয়েছিলো অনেক স্থানেই তার উল্লেখ পাওয়া যাবে। এখানে আর তার উল্লেখ প্রয়োজন মনে করছিনা। এই প্রশ্নগুলোতেই পরবর্তীতে ব্যাখ্যা তর্ক সংযোজন করে সত্যের সন্ধান পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। সত্যের সন্ধান প্রচুর পুস্তকে প্রচুর প্রশ্ন আছে। মূলত সেগুলো ধর্মভিত্তিক, বর্তমানকালে প্রচলিত সবগুলো ধর্মের বয়স কমপক্ষে সহস্রাধিক বছর। দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় বেয়ে আসা প্রতিটি ধর্মের সাথে অধর্মীয় উপাদান সংযোজিত হয়েছে। বস্তুত যা সংস্কারের পর্যায়ভুক্ত। প্রায় প্রতিটি ধর্মই যেহেতু অন্ধ আনুগত্য শেখায় তাই মূলানুগ বর্জিত উপাদানগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথা ভাবেন খুব কম লোক। লেখেন আরো কম। আরজ আলী মাতুব্বর যা ভেবেছেন, যা মনে এসেছে তা-ই অত্যন্ত সাবলীল যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছেন এ পুস্তকে অবাস্তব অলীক কার্যকারণহীন কাহিনীগুলোকে যুক্তির আলোকে বিশ্লেষণ করে গেছেন। তবে সচেতনভাবেই কোনো সিদ্ধান্ত টানেননি। তা সত্ত্বেও যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার যে কোন পাঠক অতি সহজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমর্থ হতে পারবেন। গ্রহণ-বর্জন নির্ণয় করতে পারবেন। বিশ্লেষিত বিষয়গুলো যথাক্রমে আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, ধর্ম ইত্যাদি। ধর্মের বাইরে প্রকৃতি বিষয়ক একটি অধ্যায়ও রয়েছে এ বইতে। যা সরাসরি ধর্ম সম্বন্ধীয় না হলেও বিষয়গুলো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ওতোপ্রোত সম্পর্কিত। অর্থাৎ ধর্মের আলোকে প্রকৃতির নানা ঘটনার যে মত প্রচলিত তা নিয়ে আলোচনা।

হিন্দু ও ইসলাম ধর্মীয় ৬টি বিষয়কে ঘিরে রচিত গ্রন্থ অনুমান। এগুলো যথাক্রমে রাবণের প্রতিভা, ফেরাউনের কীর্তি, ভগবানের মৃত্যু, আধুনিক দেবতত্ব, মেয়ারাজ ও শয়তানের জবানবন্দি। প্রচুর হাস্যরসের যোগান দিয়ে বিষয়গুলোর অবতারণা করা হয়েছে কাহিনী আকারে। লেখক বলেছেন, “পৌরানিক কতকগুলি কাহিনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বহুক্ষেত্রে অবাস্তব কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন কাহিনীকারগণ তাদের দলীয় স্বার্থের কারণেই। যে সমস্ত কাহিনীর বাস্তবরূপ অনুধাবন করার একমাত্র উপায় অনুমান। আর তারই সামান্য চেষ্টা করা হয়েছে এ পুস্তিকাখানার মাধ্যমেই।“ অনুমানভুক্ত কাহিনীগুলো পড়তে কৌতুক অনুভুত হয়, রস সঞ্চারের আয়োজনের জন্য উপভোগ করা যায়। কিন্তু এক পর্যায়ে মননে নাড়া লাগে, বাস্তব তথ্যটি বলা হয় যহ্ন সুকৌশলে।

আরজ আলী মাতুব্বর প্রতিষ্ঠিত যে লাইব্রেরীটি, এর উদ্বোধন বা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতা, লাইব্রেরীর সম্পদ লাইব্রেরী পরিচালনা বিধি, বৃত্তি ও পুরস্কার প্রদানের নিয়ম-নীতি ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের সঙ্কলন স্মরণিকা পুস্তক। আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী কেন, কোন উদ্দেশ্যগুলোকে সামনে রেখে, লাইব্রেরী তৈরীর তাড়না অনুভব করলেন ইত্যাদি বিষয় বিবৃত করেছেন এ সঙ্কলন পুস্তকে। ব্যক্তিগত ব্যবহার্য ও সংগৃহীত জিনিসপত্র যা তিনি লাইব্রেরীর সম্পদ বলে বিবেচনা করেছেন, সেগুলোর খুঁটিনাটি তালিকা ছাড়াও দানপত্র, ঋণপত্র, অছিয়তনামা ইত্যাদি মুদ্রিত হয়েছে স্মরণিকায়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা রয়েছে সঙ্কলনের শেষভাগে। আরজ আলী মাতুব্বর জীবদ্দশায় উইল করে তাঁর চক্ষুদ্বয় এবং কল্যাণকামী সকল মানুষের ভাববার অবকাশ রয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ বেদ। অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে জানা যায়, একক পুরুষ বা মহাপুরুষ অথবা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক তা রচিত। কিন্তু একমাত্র বেদ যার রচনা শুরু হয় আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এবং সর্বমোট ২১৪ জন মুনিঋষি এর রচয়িতা। ঋষিদের ব্যক্তিগত ধ্যান ধারণা অভিজ্ঞতা এবং কল্পনায় রচিত শ্লোকের সমষ্টি বেদ। অন্য সবগুলো ধর্মগ্রন্থের চেয়ে বেদ সবচেয়ে পুরনো। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এই গ্রন্থে শ্লোকের সমষ্টি বেদ। অন্য সবগুলো ধর্মগ্রন্থের চেয়ে বেদ সবচেয়ে পুরনো। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এই গ্রন্থে শ্লোকের আকারে লিপিবদ্ধ বাণীসমূহ মানব জীবনের জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচিত। আরজ আলী মাতুব্বর ‘বেদ-এর অবদান’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ বিষয়টি দেখতে সচেষ্ট হয়েছেন। পাশাপাশি গ্রন্থটি (বেদ) যে ভগবান সৃষ্ট নয়, মনুষ্য সমাজের জন্য মানুষই এর রচয়িতা তা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।

না-বুঝের প্রশ্ন এবং ভাবী প্রশ্ন নামীয় দুটি পাণ্ডুলিপি আমরা এ খন্ডে অন্তর্ভুক্ত করেছি। বস্তুত এ দুটি প্রশ্নের সঙ্কলন সত্যের সন্ধান গ্রন্থটি রচনার প্রাথমিক প্রস্তুতি বলে অনুমান করা যায়। বিভিন্ন সময় তাঁর ভেতরে উত্থিত বিভিন্ন প্রশ্নগুলোকে লিপিবদ্ধ করে পরবর্তীতে তা না-বুঝের প্রশ্ন ও ভাবী প্রশ্ন শিরোনামযুক্ত করেছেন। আরো পরে এই প্রশ্নগুলোকে বিন্যস্ত করে এবং তার সাথে আপনার ব্যাখ্যা যুক্ত করে সত্যের সন্ধান এর রচনা সমাপ্ত করেন।

বাজী, বোমা, কার্তুজ, পটকা ইত্যাদি তৈরির ফর্মুলা সম্বলিত একটি লেখার নাম ‘টুকিটাকি’। ১৪ প্রকার বিস্ফোরণ তৈরির উপকরণ ও পরিমাণ যার কয়েকটি একজন চীনা আতসকরের নিকট হতে এবং অবশিষ্টগুলো একটি পুরনো দৈনিক হতে সংগ্রহ করেছিলেন লেখক। কি ভেবে তিনি এই লেখাটি তৈরি করেছিলেন তা আমরা জানি না। আমরা তাঁর রচনার এটি একটি অংশ বলে বাদ দিই নি এ লেখাটি। যতদুর জানা যায়, আরজ আলী মাতুব্বর শেষ জীবনে ‘আমার জীবন দর্শন’ একটি বিস্তৃত পরিসরের রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন নিজেকে। জীবন ও সমাজ এবং এ দুইয়ের সম্পর্কিত ৫টি বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা বোধ সঞ্জাত রচনার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ বিষয়গুলো জীবন, সমাজ, দর্শন ও ধর্ম। কিন্তু শেষাবধি তিনি ৩টি বিষয়ে, অর্থাৎ জগত, জীবন ও সমাজ সম্পর্কে নিজ অভিমত লিপিবদ্ধ করে যেতে পেরেছেন। অর্থাৎ জগত সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা, জীবন সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা এবং সমাজ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা এই তিনটি লেখার সমন্বয়ে অসম্পূর্ণ আমার জীবন দর্শন পাণ্ডুলিপি শেষ হয়েছে। বাকী দুটো বিষয়ে লেখা সমাপ্ত করতে পারলে নিঃসন্দেহে একটা মূল্যবান সংযোজন হতো। কিন্তু জীবন আয়ু তাতে অন্তরায় হয়েছে। এই অতৃপ্ত পাঠককে পীড়া দেবে নিশ্চয়ই।

একজন মৌলিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হিসবে আরজ আলী মাতুব্বর যে স্বীকৃতি, সম্মান ও মর্যাদা পাবার কথা বলাবাহুল্য তা পাননি। সমাজ তাকে পীড়ন করেছে, দিয়েছে কেবল যন্ত্রণা। একদল তাকে দেখেছে সন্দেহের চোখে। আরজ আলী মাতুব্বর নামের আড়ালে ভিন্ন কেউ তার বক্তব্য প্রকাশ করছেন কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। হয়তো ছদ্মনামধারী কেউ সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টি-রহস্য বই দু’খানি লিখেছেন। তৎকালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা তো আরজ আলীকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে রীতিমত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন। এ ঘটনা সম্পর্কে মাতুব্বর এক স্থানে লিখেছেন, রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই বই দুখানা আমার বলে স্বীকার করতে চাননি। তাঁরা অনেকেই বলেছেন যে পল্লীবাসী কৃষকরা নিরক্ষর হলেও সাধারণত ভালোমানুষ এবং বেশিরভাগই ঈমান ধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ি লোক ও তার এ সমস্ত দান থাকা অসম্ভব। এ বই নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিজীবীর লেখা। হয়তো তিনি ধুরন্ধরী করে নাম দিয়েছেন একজন কৃষকের। বই দুখানা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব কি-না তা যাচাই করবার জন্য প্রাক্তন ডি, পি, আই জনাব ফেরদাউস খান তো তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে রীতিমত পরীক্ষাই নিলেন ৩.১.৭৬ তারিখে। পরীক্ষাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জনাব আ. ন. ম এনামুল হক এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম সাহেব।

সংশয়াচ্ছন্ন এই বুদ্ধিজীবীদের আশ্বস্ত করার জন্য বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে থেকেই এগিয়ে এসেছেন কেউ কেউ। ধরেছেন তারা কলম। লিখেছেন প্রবন্ধ। আরজ আলীর পক্ষে। না, কেউ নাম ভাঙ্গিয়ে নয়, আরজ আলী মাতুব্বরই স্বনামে লিখেছেন। রাজধানীর বাইরে বসে আপন জীবনে অর্জিত বোধ ও উপলব্ধির উপাদানগুলো নিভৃতে বুনে চলেছেন ক্রমাগত সাধনায়। এঁদের একজন বিশিষ্ট প্রগতিশীল প্রাবন্ধিক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ বিষয়ে প্রথম লিখলেন একটি দৈনিকে ‘কল্পিত নাম নয়, ছদ্মনাম নয় কারো। আরজ মাতুব্বরের নিবাস বরিশাল। তাঁর বইতে যে বই তিনি লিখেছেন অনেক যত্নে ছাপিয়েছেন বিস্তর পরিশ্রমে। বস্তুত আরজ আলীর জ্ঞান ও বোধের উচ্চতা নির্ণয় করতে পারেননি অনেকে। বুঝতে পারেননি তাঁর পরিবারের লোকজনও। তাঁর উচ্চতা ও বিস্তার এতটাই ব্যাপক যে তা আমাদের নাগালের অনেক দূরে। যতদূর জানা যায় তার জবানীতে ব্যক্ত হয়েছে যে, তার খুব নিকট জনদের দু একজন তাকে বুঝতে, উচ্চতা মাপতে সমর্থ হয়েছিলেন। এঁদেরই তিনি বন্ধু বলে মনে করতেন। জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর চারখানি বই। এ বইগুলোতে তাঁর যে মৌলিক চিন্তা ও দর্শন প্রতিফলিত তাতে বিপুল মানুষের মনোযোগ কাড়ার দাবী রাখে। আরজ আলীর ক্ষেত্রে তা হয়নি। মনোযোগ কাড়েনি দর্শন ও অন্যান্য বিভাগের একাডেমিক পণ্ডিতদের। তাঁরা তথাকথিত অশিক্ষিত, চলনে-বলনে পারিপাটাহীন একজন গ্রামীণ মানুষকে গ্রহণ করতে পারেন নি। মাতুব্বর এঁদের অনেকের নিকটই গেছেন। কথা বলতে চেয়েছেন। নিজের বই পড়তে দিয়েছেন। কিন্তু মাতুব্বরের ব্যাপারে এঁরা বরাবর নিঃস্পৃহ নিরাসক্ত থেকেছেন। বাংলা একাডেমীও এর বাইরে নয়। একাডেমীকে পাণ্ডুলিপি দিয়েছিলেন তিনি প্রকাশের জন্য। কিন্তু দা দীর্ঘদিন পড়ে থেকে অবশেষে সম্ভবত তা ফেরত দেয়া হয়েছে। পত্র-পত্রিকা বা প্রকাশকরা আগ্রহ দেখাবার কারণ খুঁজে পায় নি। গুটিকয় পত্রিকায় লেখা হয়েছে তাকে নিয়ে তাও খুব সামান্যই। আর একজন মাত্র প্রকাশক, এক সময়ের নামী প্রকাশনা সংস্থা বর্ণমিছিলের কর্ণধার তাজুল এসলাম সাহেব সৎসাহসে তাঁর একখানা পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করেছেন, সৃষ্টি-রহস্য জীবদ্দশায় ৩খানি এবং পরে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এগুলোর প্রকাশক তিনি নিজে। নিজের অর্থব্যয়ে, পরিশ্রমে প্রকাশিত হয়েছে এ বইগুলো। যার যথাযথ বিতরণও সম্ভব হয় নি। এখনো সেগুলোর বেশকিছু কপি জরাজীর্ণ অবস্থায় বান্ডিল বাঁধা অস্পর্শিত অবস্থায় রয়ে গেছে। অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলোর অবস্থাও একই রকম। অরক্ষিত কীটদংশিত অবস্থায় আমরা এগুলো উদ্ধার করেছি। সংরক্ষণের কোনো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দু একটি পাণ্ডুলিপি অনেক খোঁজাখুজি করে কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় সন্ধান মিলেছে। লেখক মাতুব্বর অবশ্য বড় যত্নে ও মমতায় পাণ্ডুলিপিগুলো বাঁধাই করে ভিন্ন ভিন্ন ফাইলে তুলে রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর যত্ন আত্তি পায়নি। এমন কি নেড়ে চেড়ে ধরে দেখাও নি; এক একটি পাণ্ডুলিপির তিনি স্বহস্তে একাধিক কপি করে রেখেছিলেন বলে রক্ষা। নতুবা অনেক পাণ্ডুলিপিরই অনেক স্থানে পাঠোদ্ধার করা বেশ শক্ত ছিল। হদিশ মেলাও কঠিন ছিল অনেক পাণ্ডুলিপির। আরজ আলী মাতুব্বরের প্রায় সারা জীবনের স্বপ্ন ও সাধনার সম্পদ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী। লাইব্রেরীতে সংগৃহীত পুস্তকের সংখ্যা ১২০০। এগুলো সবই তিনি জীবদ্দশায় সংগ্রহ করেছিলেন। রচিত সকল পাণ্ডুলিপি ও যাবতীয় কাগজপত্র তিনি লাইব্রেরীতে বইগুলোর পাশে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছিলেন। অবহেলিত পাণ্ডুলিপিগুলো যেমন বইগুলোও একই দশা প্রাপ্ত হয়েছে। বইগুলোতে স্পর্শ পড়ে না। লাইব্রেরীর সংস্কার হয় না। পাঠকের পা পড়ে না। ধূলিমলিন লাইব্রেরীখানি হাহা করে কেবলি।

ভরসার কথা, সাম্প্রতিককালে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগ্রহ প্রদর্শিত হচ্ছে আরজ আলীর ব্যাপারে। কৌতূহলী মানুষ খোঁজখবর করছেন, জানার চেষ্টা করছেন তাঁর দর্শন, তাঁর বিজ্ঞান জিজ্ঞাসাসমূহ। বাংলা একাডেমী প্রকাশিত এই সম্পাদক লিখিত জীবনী গ্রন্থ এবং বিশিষ্ট কথাশিল্পী  হাসনাত আব্দুল হাই লিখিত জীবনীভিত্তিক সুখপাঠ্য উপন্যাস এবং পূর্বোক্ত জীবনী গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠানের পর মানুষের কৌতূহল বেড়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকায় আরজ অনুসারীদের উদ্যোগে আরজ স্মৃতি পরিষদ গঠিত হয়েছে। পরিষদ আরজ-দর্শন বিস্তারের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে। আমরা যখন একটা পশ্চাদপদ মূল্যবোধের দ্বারা আক্রান্ত, সংস্কার- গোঁড়ামীর দ্বারা বিপন্ন, মানুষকে লড়াই করতে হচ্ছে এর বিরুদ্ধে এমন একটি অশুভ সময়ে আরজ আলী মাতুব্বরের প্রতি মানুষের মনোযোগ যতটাই নিবদ্ধ হবে ততটাই আমাদের সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। অন্ধদের আস্ফালন প্রতিরোধ করতে, আঁধারের কুটিল দুর্বৃত্তদের পরাস্ত করতে আরজের দর্শন আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করবে। বিজ্ঞানসিদ্ধ মুক্তচিন্তায় সাবলিল হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে অনুবর্তী হতে আমাদের সমর্পিত হতেই হবে আরজের নিকট। এ সময় তাই আরজের প্রয়োজন বড় বেশী। আরজ আলী মাতুব্বরের চর্চা হওয়া প্রয়োজন মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায়। অন্ধ আবিলতা দূর করে আলোকোজ্জল পথের যাত্রী হতে শত সহস্র গুণ মনোযোগ করে পড়ুক আরজ আলীর প্রতি – এ আমাদের কামনা।

রচনাবলি সঙ্কলনে ক্রমাগত সহায়তা ও অনুপ্রেরণা দান করেছেন যারা, পরম শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করি। এঁদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক মুসা আনসারী, সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হাসনাত আব্দুল হাই, আজিজ মেহের, অধ্যাপক মুহম্মদ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী নূর, আব্দুল খানেক মাতুব্বর, সোহরাব হোসেন সহ অনেকেই। নিরুৎসাহিত বা নিবৃত করারও চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। তারা কিন্তু একদা আরজ আলীর কাছাকাছি থাকতেন। আমার আত্মজন শাহনাজ হোসেন রচনা সঙ্কলন ও নকল নবিশিতে সহায়তা করে কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। ক্রমাগত তাগিদ দিয়ে নবীন প্রকাশক পাঠক সমাবেশে এর সাহিদুল ইসলাম বিজু পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও সঙ্কলন ত্বরান্বিত করেছেন। ব্যবসায়ী ও বই ব্যবসায়ী তিনি। তদুপরি এমন অব্যবসায়িক এই বই প্রকাশের উদ্যোগ নেহায়েত তার দুর্বলতা ও রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে। আমরা এঁদের সকলের নিকট কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতা আরজ অনুরাগী অসংখ্য পাঠকদের নিকটও। যারা নিরন্তর আগ্রহ দেখিয়েছেন, খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আরজ আলী রচনাবলি পাঠে পাঠকের চেত্না কিছুমাত্রও আলোকিত হলে অগ্রগামী হলে মনে করবো। আমাদের এ উদ্যোগ সাফল্য দেখলো।

আইয়ুব হোসেন

লালমাটিয়া

ঢাকা।

“আরজ আলী মাতুব্বর” বই সম্পর্কিত আপনার মন্তব্যঃ

⇒অভিযোগ বা মন্তব্য⇐

♦ কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

♦ নিবেদন

অধ্যায়ঃ সত্যের সন্ধান

♦ দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

♦ প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

♦ মূলকথাঃ প্রশ্নের কারন

♦ প্রথম প্রস্তাবঃ আত্মা বিষয়ক

♦ দ্বিতীয় প্রস্তাবঃ ঈশ্বর বিষয়ক

♦ তৃতীয় প্রস্তাবঃ পরকাল বিষয়ক

♦ চতুর্থ প্রস্তাবঃ ধর্ম বিষয়ক

♦ পঞ্চম প্রস্তাবঃ প্রকৃতি বিষয়ক

♦ ষষ্ঠ প্রস্তাবঃ বিবিধ

♦ উপসংহার

♦ টীকা

অধ্যায়ঃ অনুমান

♦ ভূমিকা

♦ রাবনের প্রতিভা

♦ ফেরাউনের কীর্তি

♦ ভগবানের মৃত্যু

♦ আধুনিক দেবতত্ত্ব

♦ মে’রাজ

♦ শয়তানের জবানবন্দি

♦ সমাপ্তি

অধ্যায়ঃ স্মরণিকা

♦ লামচরি গ্রামের অবস্থান ও পরিবেশ

♦ লাইব্রেরী ও সমাধি নির্মাণ

♦ লাইব্রেরী উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ৭৯ সালের বৃত্তি দান

♦ উদ্বোধনী ভাষণ

♦ মানব কল্যাণের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

♦ ১৯৮০ সালের বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠান

♦ পুস্তক প্রদান অনুষ্ঠান

♦ পুস্তক প্রদান অনুষ্ঠানের ভাষণ

♦ অবহেলিত একটি প্রতিভার স্বীকৃতি বাকেরগঞ্জ জিলা পরিষদ কর্তৃক বিশেষ পুরস্কার দান

♦ বার্ষিক অধিবেশন ও ৮১ সালের বৃত্তিপ্রদান

♦ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর দানপত্র সংক্রান্ত দলিলসমূহের অনুলিপি

♦ স্মৃতিমালা

♦ কেন আমার মৃতদেহ মেডিক্যালে দান করছি

♦ বেদ-এর অবদান

♦ অসমাপ্ত পান্ডুলিপি

♦ ভাবি প্রশ্ন

♦ না বুঝের প্রশ্ন

♦ টুকুটাকি

অধ্যায়ঃ আমার জীবনদর্শন

♦ প্রস্তাবনা

♦ জগত সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা

♦ জীবন সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা

♦ সমাজ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণা

♦ বিভিন্ন আলোকচিত্র

♦ হস্তাক্ষরে লেখা চিঠি

♦ নির্ঘণ্ট

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x