হুমায়ুন আজাদের মহাগ্রন্থ নারী প্রথম বেরোয় ১৯৯২-এ, তারপর বেরোয় তিনটি সংস্করণ ও বহু পুনর্মুদ্রণ; এবং ১৯ নভেম্বর ১৯৮৫-এ সরকার নিষিদ্ধ করে নারী। সাড়ে চার বছর পর উচ্চবিচারালয় রায় দেয় যে নারীর নিষিদ্ধজকরণ আদেশ অবৈধ। এ-রায়ের ফলে বাংলাদেশে প্রথম স্বীকৃতি পেলো চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা। নারী বাংলা ভাষায় প্রথম নারী বিষয়ক গ্রন্থ, যাতে নারীবাদী কাঠামোতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতায় নারীর অবস্থা ও অবস্থান। কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, পুরুষতন্ত্র ক্রমশ একটি মানুষকে ক’রে তোলে নারী। পুরুষ সৃষ্টি করে নারী ধারণা, তৈরি করেছে তার সংজ্ঞা, নির্দেশ করেছে নারীর অবস্থান, তৈরি করে নৃশংস বিধিমালা, ক’রে তুলেছে তাকে কামসঙ্গী ও পরিচারিকা। ইহুদী খ্রিস্টান মুসলমানের চোখে নারী এক অবাধ্য বক্র হাড়, যে স্বর্গে সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা; হিন্দুর চোখে সে আরো নিকৃষ্ট। পুরুষের চোখে নারী অসম্পূর্ণ মানুষ, এক ‘আপেক্ষিক প্রাণী’। হুমায়ুন আজাদ বর্ণনা করেছেন নারী পুরুষের লৈঙ্গিক রূপ, রুশো রাসকিন ফ্রয়েড রবীন্দ্রনাথের নারী বিরোধীতার এবং মিল রামমোহন বিদ্যাসাগরের নারী মুক্তির তাত্ত্বিক ও বাস্তব কর্মরাশি। দিয়েছেন ওলস্টোনক্র্যাফট ও রোকেয়ার গভীর ব্যাখ্যা; বর্ণনা করেছেন নারীর লিঙ্গ ও শরীর, বালিকা কিশোরী তরুণীর বেড়ে ওঠা, ও নারীর স্বপ্ন সমস্যা প্রেম কাম সংসার। তিনি পরিচয় দিয়েছেনব নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের, বিশ্লেষন করেছেন বঙ্গীয় ভদ্রমহিলাম উৎপত্তি, এবং বাংলার নারী ঔপন্যাসিকদের ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিতে, যা আগে কখনো হয়নি। হুমায়ুন আজাদ রূপ রেখা তৈরি করেছেন নারীপুরুষের সাম্য ভিত্তিক এক নতুন সভ্যতার। সাড়ে চার বছর ধরে নিষিদ্ধ থাকার পর বেরোলো এ-মহাগ্রন্থ, যার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন পাঠকেরা।

উৎসর্গ

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট

বেগম রোকেয়া