১৯৮৮-র শুরুতেই ডাব বাবার মাহাত্ম্য লোকের মুখে মুখে হু-হু করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আদি ডাব বাবা

মে-জুনে ডাব-বাবা পত্র-পত্রিকার শিরোনামে এলেন। প্রতিদিন লাখো লাখো রোগী দূর-দূরান্ত থেকে এসে হাজির হতে থাকে ডাব-বাবার কৃপায় রোগমুক্তির আশায়।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছোট স্টেশন গোবিন্দপুর। সেখান থেকে তিন কিলোমিটারের মতো পথ বড়গাছিয়া। এখানে বিদ্যুতের খুঁটি চোখে পড়ে না। এমনই এক ছোট্ট গ্রামে গাছের ছায়ায় চাটাইবেড়া ঘিরে মাথায় টালির চাল নিয়ে গড়ে উঠেছিল বনবিবির মন্দির। জানুয়ারীর শুরুতে সুরথ মণ্ডল নাকি বনবিবির কাছ থেকে স্বপ্নে ওষুধ পায়। সুরথ ধর্মে রোমান ক্যাথলিক। তবু বাংলার হাওয়ায় হিন্দু হিন্দু পরিবেশে থাকতে থাকতে সুরথদের পরিবারের মেয়েদের কপালে ও সিঁথিতে উঠেছে সিঁদুর। সুরথের কর্মস্থল কলকাতার বসুমতী পত্রিকা। পত্রিকায় ছাপাখানায় কাজের পাশাপাশি গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারও। সুরথ ভক্তদের ডাবের জলে বনবিবির চরণামৃত মিশিয়ে দিতেন। সেই ডাবের জল খেয়েই নাকি রোগীরা সব রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

নতুন ডাব বাবা

বনবিবির প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই পূজোপ চলছিল। আর চরণামৃতও ভক্তরাও পান করেছিলেন। এতদিন কেন বনবিবির চরণামৃতে রোগ সারছিল না? নিশ্চয়ই এটা হক কথার এক কথা। কিন্তু এরও উত্তর আছে- এতদিন ঠিকমত চরণামৃত শুদ্ধ মনে বিশেষ প্রণালীতে তৈরি হচ্ছিল না। অর্থাৎ চরণামৃত তৈরির আসল ফর্মুলাটা ছিল মানুষের অজানা। বনবিবি একদিন স্বপ্নে ফর্মুলাটা সুরথবাবুকে জানানোতে মুশকিল আসান হল। সুরথবাবু ফর্মুলা মাফিক চরণামৃত বানান, ভক্তদের দেন, আর টপাটপ অসুখ সারে।

আশ্চর্য ডাবের জলের কথা দ্রুত ছড়াতে লাগল। লোক মুখে মুখে সুরথ হয়ে গেলেন ‘ডাব-বাবা’। যে ভিড় শুরু হয়েছিল ৩/৪ জন দিয়ে মার্চের শেষে সেই ভিড়ই দাঁড়াল ৩/৪ হাজারে। শনি-মঙ্গল বাদে হপ্তার অন্য দিনগুলো ডাব-বাবা কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে ভক্তদের ডাবের জলে স্বপ্নে দেখা নির্দেশমতো তৈরি বনবিবির চরণামৃত মিশিয়ে দিচ্ছিলেন। টাকাটা-সিকেটা প্রণামীও পড়ছিল। দিনের শেষে দু-তিন হাজার হয়ে যাচ্ছিল। রোগীরা নাকি আশ্চর্য ফল পাচ্ছিলেন। দু-মাসের মধ্যেই মন্দিরের দেওয়াল পাকা হয়েছে। গ্রামের জনা দশেক উদ্যোগী মানুষ নিয়ে একটা মন্দির কমিটি হয়েছে। কিন্তু কোথা দিয়ে কি হল, মন্দির কমিটির সঙ্গে সুরথের প্রণামী নিয়ে একটা গোলমাল লেগে গেল। সুরথ উধাও হলেন।

ডাব-বাবা স্বয়ং নিরুদ্দেশ। স্বপ্ন দখার মালিকটি নিখোঁজ। স্বপ্নাদ্য চরণামৃত তৈরির ফর্মুলা আর কারও জানা না থাকলেও মন্দির কমিটি স্বপ্নাদ্য ওষুধ দেওয়া বন্ধ করলেন না। ফির হপ্তায় রোগীর ভিড় বেড়েই চলল। মে-জুনে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা দৈনিক লাখ ছাড়াতে লাগল। লাখো লাখো রোগী জানতেও পারল না ওষুধ দাতা ডাব-বাবা স্বয়ং নিরুদ্দেশ। আগের দিন রাত থেকেই লাইন পড়তে লাগল। এলো লাইন ম্যানেজ করার ভলেন্টিয়ার, জেনারেটার, মাইক। গজিয়ে উঠল পান, বিড়ি, সিগারেট, চা ও খাবারের দোকান। রিকশার সংখ্যা বাড়ল কুড়ি গুণ। এলো ট্যাক্সি, এলো অটো। ডাবের দাম চড়ল। ডাব কাটার ফিস হল দশ পয়সা। ধারাল দা চালিয়ে ধাঁ করে ডাবের মুন্ডু কেটে ফিস নেবার অধিকার পেল শুধু সওয়া-শ’ ভলেন্টিয়ার। ওঁদের চেহারা ও হাবভাব দেখে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক, নিজেদের স্বার্থরক্ষায় দা-গুলো ডাব ছেড়ে মানুষের মুন্ডুতে নামার জন্যেও তৈরি।

খবরটা কিছুদিন ধরেই কানে আসছিল। জুনের শুরুতেই হাজির হলাম ‘বসুমতী’ পত্রিকা দপ্তরে। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে দেখা পেলাম সুরথ মণ্ডলের। সুরথবাবুর কথায় বুঝতে অসুবিধা হয় না, বনবিবি মন্দিরের কমিটির ভয়ে পত্রিকা অফিসের বাইরে পা রাখতেও ভরসা পান না। ভয় খুন হওয়ার। বেশ কিছু পত্রিকা প্রতিনিধি সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। কারও সঙ্গেই দেখা করেননি। একটাই ভয়, বেফাঁস কিছু বললে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশিত হলে নকল ডাব-বাবারা জানে মারতে পারে। আর তেমন পরিস্থিতি এলে রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে ওই সাংবাদিকরা এগিয়ে আসবেন, এমন ভরসা করেন না সুরথ। আমার কাছে সুরথ প্রথমেই যে অভিযোগ করলেন, তা হল, “যারা এখন ডাববাবা সেজে স্বপ্নাদ্য ওষুধ দিচ্ছে তারা সব ঠগ, ডাকাত। স্রেফ লোক ঠকাচ্ছো। স্বপ্ন দেখলাম আমি। আমি না জানানো সত্ত্বেও ওরা ওষুধ তৈরি করছে কি করে? থানায় খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, ওদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ আছে। পয়সা রোজগারের ধান্দায় ওরা প্রচার করছে বনবিবির চরণামৃত মেশানো ডাবের জল খেলে কান-কটকট থেকে ক্যানসার সবই নাকি সারে। অথচ আমাকে মা স্বপ্নে দেখা দিয়ে জানিয়েছিলেন, চরণামৃতসহ ডাবজল পানে দুটি মাত্র অসুখ সারবে। হাঁপানি ও পেটের অসুখ।“

বুঝলাম, বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কি কি অসুখ সারানো যায়, সে বিষয়ে সুরথবাবু কিঞ্চিৎ ওয়াকিবহাল।

প্রচুর কথা বলিয়ে, এক সময় জানতে পারলাম চরণামৃত তৈরি করতেন গরম জল, ডাবের জল, দুধ, সন্দেশ, বাতাসা ও কর্পূর মিশিয়ে।

এর কয়েকদিন পর গিয়েছিলাম বনবিবির থানে। দেখে এটুকু বুঝেছিলাম, এখন আসল ডাব-বাবা স্বয়ং ফিরে এসে –‘সব ঝুট হ্যায়’, বলে চ্যাচালেও বিশ্বাসে আচ্ছন্ন মানুষগুলো তাতে কান দেবে না।

ডাবে চরণামৃত মিশিয়ে দিচ্ছিলেন বিজয় মণ্ডলের নেতৃত্বে কিছু তরুণ। কথা হল বিজয় মণ্ডল, মন্দির কমিটির সম্পাদক হারাণ নস্কর ও কিছু খালি গা তেজী তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে।

জিজ্ঞেস করলাম, “বনবিবি স্বপ্নে ওষুধ বাতলে দিয়েছিলেন সুরথ মণ্ডলকে। তিনি তো আপনাদেরই ভয়েই নাকি উধাও। আপনারা তো স্বপ্ন দেখেননি। তা হলে ওষুধ দিচ্ছেন কি করে?”

হারাণ নস্কর জবাব দিলেন, “সুরথ মণ্ডল আমাদের ভয়ে গাঁ ছাড়া, এসব দুষ্ট লোকেদের মিথ্যে প্রচার। আসলে ঈর্ষা করা মানুষের সংখ্যাতো কম নয়, তারাই ওসব রটাচ্ছে। সুরথ একটু ভিতু আর নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। এত ভিড়, এত মানুষজন সামলে সকাল থেকে রাত মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার মতো মন কি সবার আছে? সুরথেরও ছিল না। সুরথ পালাল। তবে লোকটা ভাল ছিল। যাওয়ার আগে বিজয় মণ্ডলকে শিখিয়ে দিয়েছিল বনবিবির চরণামৃত তৈরির পদ্ধতি।

বললাম, “সুরথবাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। উনি অবশ্য অন্য কথা বললেন। উনি নাকি কাউকেই স্বপ্নাদ্য ওষুধ তৈরির পদ্ধতি বলে জানি।“

বিজয় মণ্ডল একটু উত্তেজিত হলেন। চড়া গলায় বললেন, “ও সব বাজে কথা।“

হারাণ নস্কর পোড় খাওয়া মানুষ। এক গাল হেঁসে বললেন, “সুরথ না বললেই বা কি হয়েছে? বনবিবি তো সুরথের একার সম্পত্তি নয়। বনবিবি এখন আমাদের অনেকেই স্বপ্ন দিচ্ছেন।“

ডাব-বাবার দাবি মতো রোগীরা সত্যিই রোগমুক্ত হচ্ছেন কি না, জানার জন্য ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটি যোউথ উদ্যোগে একটি তথ্য সংগ্রহ অভিযান চালান। আমরা ৫০ জন রোগীর ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে ছিলাম। ৬ জন জানিয়েছিলেন ৩ বার জল খেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। ১১ জন জানালেন –অনেকটা ভাল আছেন। ৩৩ জন জানালেন –ফল পাইনি।

যে ৬ জন পুরোপুরি ও ১১ জন আংশিকভাবে রোগমুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন, সেই ১৭ (৬ + ১১) জনের মধ্যে ১৪ জন সেই সব অসুখে ভুগছিলেন, যেসব অসুখ বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সারানো সম্ভব। একজন জানিয়েছিলেন তাঁর ক্যানসার হয়েছিল। বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ। আমাদের তরফ থেকে প্রশ্ন ছিল –আপনার যে ক্যানসারই হয়েছিল তা জানালেন কি করে? কত দিন আগে ক্যানসার ধরা পড়ে?

উত্তর ছিল –ডাক্তার বলেছিলেন, মাস ছয়েক আগে।

প্রশ্ন –কোন ডাক্তার, না কি? ঠিকানা কি?

উত্তর –কোন ডাক্তার অত মনে নেই।

প্রশ্ন –সে কি? এত বড় রোগ হল, ডাক্তার দেখিয়েছিলেন নিশ্চয়ই অনেক বার। আর ডাক্তারের নামটাই ভুলে গেলেন? ডাক্তারবাবু কি কোনও জায়গায় আপনাকে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন –এই যেমন চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতাল বা ঠাকুরপুকুর ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার?

উত্তর –ঠাকুরপুকুর পাঠিয়েছিলেন।

প্রশ্ন –সেখানকার কোনও প্রেসক্রিপশন আছে কি?

উত্তর –না সে সব কোথায় হারিয়ে-টারিয়ে গেছে।

প্রশ্ন –এই মাস দুয়েকের মধ্যেই সব হারিয়ে ফেললেন? কি করে জানালেন আপনার ক্যানসার সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেছে।

উত্তর –ডাক্তারবাবু দেখে বললেন।

প্রশ্ন –এই যে বললেন কোন ডাক্তার অত মনে নেই।

উত্তর –না, না। ডাক্তারবাবু মানে ঠাকুরপুকুরের ডাক্তারবাবু।

এই রোগীর ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনা আছে। প্রথম ও জোরালো সম্ভাবনা হল, রোগীটি একজন প্রতারক ও ডাব-বাবার প্রচারক। দ্বিতীয়টি হল, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্যেই ক্যানসার মুক্ত হয়েছে, ডাবের জলে নয়। ক্যানসার প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়লে বহুক্ষেত্রেই আরোগ্য সম্ভব।

একজন জানিয়েছিলেন তাঁর গলব্লাডারে স্টোন হয়েছিল। ডাব-বাবার কৃপায় এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনিও তাঁর অসুখের সমর্থনে কোনও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখাতে সক্ষম হননি। অতএব এর’ও ডাববাবার একজন বেতনভুক্ত প্রচারক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

একজন জানিয়েছিলেন তাঁর বোবা ভাই দুদিন ডাবের জল খেয়েই এখন কষ্ট করে হলেও কিছু কিছু কথা বলতে পারছে। ভাইয়ের জন্যেই আজ শেষবারের জন্য ডাবের জল নিতে এসেছেন। তিনি তাঁর ভাইয়ের জীবনের এই অলৌকিক ঘটনার কথা অনেককেই বলছিলেন। শ্রোতারা অবাক বিস্ময়ে কথাগুলো শুনছিলেন। আমরা ভদ্রলোকের ঠিকানা নিলাম। এবং পরবর্তীকালে ঠিকানাটার খোঁজ করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম –ও একটি আসত ছোটলোক। কারণ ঠিকানাটাই ছিল মিথ্যে।

ডাব-বাবার বিশাল প্রচার ও জন-আবেগকে প্রতিহত করতে দুটি কাজ করেছিলাম। (এক) ওই অঞ্চল ও তার আশে-পাশে আরও কয়েকজন ডাব-বাবা খাড়া করে দিয়েছিলাম। ফলে সব ডাব-বাবার প্রতিই বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল ভক্তদের। (দুই) ডাব-বাবার বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার। একাধিক ডাব-বাবা বাজারে এসে পড়ায় প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ‘চোর-জোচ্চোর’ বলে গাল পাড়ছিল এবং ওদের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণসংগঠন এগিয়ে আসার ফলে ডাব-বাবার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছিল। ফলে ডাব-বাবা বা তাঁর অসুর চেলাদের পিছু হটতে হয়েছিল। কারবার গোটাতে হয়েছিল। অন্য ডাব-বাবারা ছিল আমাদেরই সৃষ্টি। কাজ ফুরোতেই তারও ভ্যানিশ।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x