জন্ডিস বা ন্যাবা রোগে মন্ত্রঃপূত মালা পড়ার প্রচলন শুধু যে আদিবাসী সমাজ বা গঞ্জেই ব্যাপকতা পেয়েছে, তা নয়। বিভিন্ন শহরে এমনকি কলকাতাতেও মন্ত্রপূত জন্ডিসের মালার প্রতি জন্ডিস রোগীদের আগ্রহ ও বিশ্বাস লক্ষ্য করার মত।

কলকাতার দর্জিপাড়ার মিত্তির বাড়ির থেকে জন্ডিসের মালা দেওয়া হয় প্রতি শনিবার। তিন-চার পুরুষ ধরেই তাঁরা এই মালা দিয়ে চলেছেন। সংগ্রহকারীদের ভিড়ও দেখার মত।

জন্ডিসেরর  মালার কি হয়। জন্ডিস রোগী এই মালা পড়ে সাধারণত প্রাপ্ত নির্দেশ মত দুদিন স্নান করেন না। তেল, ঘি, মাখন খাওয়া বারণ। নিতে হয় পূর্ণ বিশ্রাম। মন্ত্রঃপূত মালা জন্ডিসের রোগ যতই শুষে নিতে থাকে ততই মালা বাড়তে থাকে। বুক ছাড়িয়ে পেটের দিকে নামতে থাকে। আর পাঁচটা স্বাভাবিক মালার মত এ মালা একই আয়তন নিয়ে থাকে না। মালার অদ্ভুত ব্যবহারে ব্যবহারকারীর বিশ্বাস বাড়ে। এবং সাধারণত দেখা যায় রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

সমগ্র বিষয়টার মধ্যে একটা অলৌকিকের ছোঁয়া ছড়িয়ে আছে। কোনও মালা কি এমনি কি বাড়ে? বাড়ে বইকি, মালাটা যদি বিশেষ ভাবে তৈরি হয় ফুলের বদলে বামনহাটি, ভৃঙ্গরাজ অথবা আপাং গাছের ডাল দিয়ে। এইসব গাছের ডাল ফাঁপা দ্রুত শুকিয়ে কৃশ থেকে কৃশতর হতে থাকে।

এই জাতীয় গাছের ডাল ছোট ছোট করে কেটে তৈরি করা হয় মালা। ডালের টুকরোগুলোকে গেঁথে মালা তৈরি করলে সে মালা কিন্তু বাড়বে না। মালা বাড়াতে গেলে সুতো বাড়াতে হবে। ছুঁচে গাঁথা মালার বাড়তি সুতো পাওয়া সম্ভব নয় বলেই সে মালা বাড়ে না। জন্ডিসের মালা তৈরি হল বিনা ছুঁচে। বলা চলে জন্ডিসের মালা বোনা হয়। এই বোনার কৌশলেই বাড়তি সুতো মালা বাড়ায়। এবার আসা যাক মালা বানাবার পদ্ধতিতে।

বামনহাটি, ভৃঙ্গরাজ বা আপাং অথবা ফাঁপা অথচ দ্রুত শুকোয় এমন কোনও গাছের ডাল কেটে বানান হয় ছোট ছোট কাঠি, এক একটা কাঠি আড়াআড়িভাবে ধরে আঙ্গুলের সাহায্যে ফাঁস দিয়ে গাঁ ঘেঁষে ঘেঁষে বাঁধা হতে থাকে কাঠিগুলো। এই বিশেষ পদ্ধতির ফাঁস বা গিঁটের নাম শিফার্স নট (shiffer’s knot) বা সেলারস নট (sailor’s knot)।

গাঁ ঘেঁষে ঘেঁষে জড়ান কাঠিগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যতোই শুকোতে থাকে ততই সুতোর ফাঁক ঢিলে হয়, দু’কাঠির মধ্যে ফাঁক বাড়ে। মালা বাড়তে থাকে।

এই মালা বাড়ার পিছনে যেমন মন্ত্রশক্তি কাজ করে না, তেমনই জন্ডিস রোগ শুষে নেওয়াও এই বাড়ার কারণ নয়। এই একই পদ্ধতিতে মন্ত্র ছাড়া আপনি নিজে হাতে মালা বানিয়ে একটা পেরেকে ঝুলিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন। মন্ত্র নেই, জন্ডিস নেই তবুও মালা বাড়ছে।

জন্ডিস হয় বিলিরুবিন নামে হলুদ রঙ্গের একটি রঞ্জক পদার্থের জন্য। স্বাভাবিকভাবে মানুষ ও অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীর পিত্তে বিলিরুবিনের অবস্থান। রক্তে এর স্বাভাবিক উপস্থিতি প্রতি ১০০ সি.সি.-তে ০.১ থেকে ১ মিলিগ্রাম। উপস্থিতির পরিমাণ বাড়লে প্রথমে প্রস্রাব হলুদ হয়। তারপর চোখের সাদা অংশ ও শরীর হলুদ হতে থাকে। রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। প্রধানত হয় ভাইরাসজনিত কারণে। ‘স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে, বিশ্রাম নইলে, চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করলে রোগী কিছুদিনের মধ্যেই আরোগ্যলাভ করেন।

এছাড়াও অবশ্য জন্ডিস হতে পারে। পিত্তনালীতে পাথর, টিউমার, ক্যান্সার হওয়ার জন্য অথবা অন্য কোন অংশে টিউমার হওয়ার জন্য পিত্তনালী বন্ধ হলে পিত্ত গন্তব্যস্থল ক্ষুদ্রান্তে যেতে পারে না, ফলে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং জন্ডিস হয়।

আবার কোন  কারণে রক্তে লোহিত কণিকা অতিরিক্ত মাত্রায় ভাঙতে থাকলে হিমোগ্লোবিনের তুলনায় বেশি পরিমাণে বিলিরুবিন তৈরি হবে এবং জন্ডিস হবে।

ভাইরাসজনিত কারণে জন্ডিস না হয়ে অন্য কোনও কারনে জন্ডিস হলে চিকিৎসার সাহায্যে মূল কারণটিকে ঠিক না করতে পারলে জন্ডিস-মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্য না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্রাম ও খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন মেনে জন্ডিস থেকে মুক্ত হওয়া যায় বটে (তা সে জন্ডিসের মালা পরুন, অথবা নাই পরুন), কিন্তু জন্ডিসের মালার ভরসায় থাকলে ভাইরাসজনিত কারণে হওয়া জন্ডিস থেকে মৃত্যুও হতে পারে। যকৃৎ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে চিরকালের জন্য যেমন ভুগতে হতে পারে। তেমনই বিলিরুবিনের মস্তিষ্কে উপস্থিতি স্থায়ী স্নায়ুরোগ এমনকি মৃত্যুও হানতে পারে।

জন্ডিস হলে চিকিৎসকের সাহায্য নিয়ে জানা প্রয়োজন জন্ডিসের কারণ। পরবর্তী ধাপ হবে প্রতিকারের চেষ্টা।