বরিশাল সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পঠিত ভাষণ

মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে বলবার মতো বহু কথা থাকলেও সময়ের অভাবে তা বলতে পারছি না। কেননা এখান থেকে আমাকে যেতে হবে প্রায় ৭ মাইল দূরে, এক বৈঠার নৌকায় অথবা হাঁটা পথে। তাই শুধুমাত্র আমার পরিচয় জ্ঞাপক দু-একটি কথা বলতে চাই, কেননা অনেকের কাছে আমি অপরিচিত।

আজকের এ অনুষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে – ‘বরিশাল সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে গুণী সংবর্ধনা’। কবি- সাহিত্যিকগণের একটি বিশেষ্য গুণ হল সময় সময় কিছু ভুল করা। এবং সেরকম একটি ভুল করেছেন বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সুধী সদস্যবৃন্দ আজও। আর সে ভুল করতেও তাঁদের বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, ব্যয় হচ্ছে শক্তি, সময়, অর্থ এবং করতে হচ্ছে অনেক চিন্তা-ভাবনা-কল্পনা।

আগের দিনের কবি-সাহিত্যিকগণ (তৎসঙ্গে জনসাধারণও) চাদেরত রূপ-গুণের কীর্তন করে এসেছেন শতমুখে অজস্রধারায় দূর থেকে দেখে, কাছে গিয়ে দেখতে পাননি ঐ চাঁদের আসল রূপটি কি। কারো মুখের সৌন্দর্য বর্ণনায় বলা হতো চাঁদের কিরণ অতি মধুর ইত্যাদি। কিন্তু আজকাল মানুষ দূর থেকে চাঁদের কাছে গিয়েছে, পদস্পর্শ করেছে চাঁদের গায়ে এবং দেখছে এখন চাঁদের আসল রূপটি কি। এখন দেখা গেছে যে, চাঁদের দেহটি মোটেই সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। তা হচ্ছে এবড়োথেবড়ো খানাখন্দ, আগ্নেয়গিরির পোড়াপাথর আর জলশূন্য স্মুদ্দুরের খাদে ভরা। চাঁদ আসলে সুন্দর মোটেই নয়।

মানুষ এখন চাঁদকে হাতে পেয়েছে। কিন্তু তাতে কোন দুর্লভ বস্তু এখনো পায় নি। পায়নি মণি-মাণিক্য, হীরা-জহরত, সোনা-রূপা-লোহা বা কয়লার খনিও। আর ‘চাঁদের কিরণ অতি মধুর’ তো দূরের কথা, এখন দেখা গেছে যে, আসলে চাঁদের কোন কিরণই নেই; চাঁদ ছড়াচ্ছে শুধু সূর্যেরই আলো, যা সমস্তই তার ধার করা।

ঐরূপ আগের দিনের কবি-সাহিত্যিক এবং জনগণের মতোই আজ ভুল করেছেন বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সদস্যবৃন্দ, চাঁদের মতো দূর থেকে দেখে আমাকে গুণীগণের সমপর্যায়ভুক্ত করে। আমার নিকটবর্তী হলে তাঁরা দেখতে পাবেন যে, আসলে আমার রূপটি চাঁদের মতোই।

আদিকবি বাল্মীকির কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিলো নাকি কামক্রীড়ারত এক ক্রৌঞ্চের (বক জাতীয় পাখি) মৃত্যুতে শোকে অভিভূত হয়ে। সে প্রসঙ্গটি আমি অনেক সময় বলেছি এবং তা কতিপয় পত্র-পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছে। এখানেও হয়তো কেউ কেউ সে ঘটনাটি জেনে বা শুনে থাকতে পারেন। তবুও সে বিষয়ে দু’একটি কথা আবার এখানে বলছি।

আমি পল্লীবাসী একজন গরীব কৃষকের ছেলে। আমার চার বছর বয়সে বাবা মারা যান। দারিদ্র নিবন্ধন শৈশবে কোনো শিক্ষালাভের সুযোগ আমার ঘটেনি, বর্ণবোধ ছাড়া।

১৩৩৯ সালে আমার মা মারা গেলে আমি মৃত  মায়ের ফটো তুলেছিলাম। মা’র সৎকারের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত আলেম ও  মুস্ললিরা এসেছিলেন, “ফটো তোলা হারাম’ – বলে তাঁরা জানাজা পড়া ও দাফন করা ত্যাগ করে লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা আমার মাকে জানাজা ছাড়াই কতিপয় অমুস্ললি নিয়ে সৃষ্টিকর্তার হাতে সমর্পণ করতে হল কবরে।

আমার মা ছিলেন অতিশয় নামাযী-কালামী ধার্মিকা রমণী। তবু তিনি মুস্ললিদের হাতের মাটি বা আলেমদের পড়া জানাজা পেলেন না আমার কৃতকর্মের ফলে। এ অনুতাপে আমি দগ্ধ হতে লাগলাম।

সেদিন আমি শোকে, দুঃখে, ক্ষোভে উন্মাদ হয়ে মা’র মৃতদেহ সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, মা আমার আমরণ  ধর্মের সাধনা করেও লাঞ্ছিতা হলে ধর্মের ধ্বজাধারীদের যে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ফলে, আমি অভিযান চালাবো সে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যতোদিন বাঁচি। মা,র বিদেহী আত্মাকে সম্বোধন করে বললাম – 

               “তুমি আশীর্বাদ করো মোরে মা,

আমি বাজাতে পারি যে      সে অভিযানের দামামা।”

তৎপরবর্তী জীবনে আমার যাবতীয় কাজ ও পড়া-লেখা সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষার প্রয়াস মাত্র। আমার প্রণীত পুস্তক ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘মুক্ত মন’, ‘অনুমান’, এবং সদ্য প্রকাশিত  স্মরণিকা’ পর্যন্ত সবই উক্ত দামামার মূর্ত প্রকাশ এবং আমার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরীটিও সেই দামামার প্রতিরূপ, আর কতিপয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি প্রদান ইত্যাদিও সে দামামার রূপান্তরমাত্র। আমি সাহিত্যিক নই, আমি একজন পঙ্গু সৈনিক বাদ্যকর।

মাননীয় সভাপতি ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! যারা ভালোভাবে আমার পরিচয় জানতে চান, তাঁরা যেন আমার প্রণীত কোন পুস্তক পাঠ করেন এবং জনরবে বিশ্বাস না করেন। কেননা বন্ধুরা আমাকে উচ্চে তোলেন, শত্রুরা নামায় নিচুতে, আমার মূল ঠিকানা মেলে না ওর কিছুতে।

বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সুধী সদস্যবৃন্দ! আপনারা এ মহতী অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে সংবর্ধনা জানিয়ে আপনাদের নিজেদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছেন এবং আমাকে করেছেন ভাগ্যবান। সমাজে যারা এরূপ জনকল্যাণে আত্মাহুতি দিতে পারেন, তাঁরা মহৎ আখ্যা পাবার দাবিদার এবং সে দাবিদার আপনারাও। তাই আমি সে দাবীটির স্বীকৃতি ও সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দকে মোবারকবাদ জানিয়ে শেষ করছি।

ধন্যবাদ, শুভ হোক।

১৬-৮-১৯৮২

১. মানুষের পক্ষে

২. নিবেদন

৩. সৃষ্টি রহস্য

৪. ম্যাকগ্লেসান চুলা

অপ্রকাশিত

৫. কৃষকের ভাগ্য গ্রহ

৬. সীজের ফুল

৭. সংক্ষিপ্ত জীবন বাণী

৮. ভাষণ সংকলন

৮.১ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ভাষণ

৮.২ বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড সেমিনারে ভাষণ

৮.৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৪ নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৫ গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৬ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৭ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.৮ মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা সেমিনারে ভাষণ

৮.৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ভাষণ

৮.১০ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ

৮.১১ বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১২ বাংলাদেশ কুটির শিল্প সংস্থায় ভাষণ

৮.১৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.১৪ বাংলাদেশ দর্শন সমিতিতে ভাষণ

৮.১৫ বার্ষিক বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১৬ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীতে ভাষণ

৮.১৭ বাংলা একাডেমীর সংবর্ধনা ভাষণ

৮.১৮ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ

৯. নির্ঘণ্ট

১০. বিভিন্ন আলোকচিত্র

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x