(৯)

হাসান যখন আধো আধো চোখ খুলে পৃথিবীটাকে ঘোলাটে দেখতে পায়, তখন বিকেল হয়েছে, কিন্তু সময় কী, সে কী দেখছে, কিছু দেখছে কি না সে বুঝতে পারে না; সে কি আছে, সে কি নেই, সে কি ছিলো এমন ভাবনারাশি এলোমেলো তার মাথায় ঢুকে তাকে অসহ্য সুখে বিবশ ক’রে দেয়, সে আবার রেশমি অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অন্ধকারে হারাতে তার ভালো লাগে, মনে হয় কোমল মসৃণ গভীর অতল ছায়ার ভেতরে ডুবে যাচ্ছে সে, তার শরীর ভ’রে ছড়িয়ে পড়ছে ছায়া, দিগন্ত থেকে দিগন্তে বিকেল আর সন্ধ্যা নামছে, রাত্রি নামছে। অন্ধকারে আরো একটি রাত কেটে যায়; ভোর হয়, ভোরের আলো ঢোকে তার ঘরে, তার ভেতরেও। আমি কী দেখছি, জিজ্ঞেস করে সে নিজেকে; আমি কি দেখছি, না কি শুনতে পাচ্ছি। আমি? কোথায় আছি আমি? আমি কি আছি? কেনো আমি ছিলাম না অজস্র বর্ষ, অনন্তকাল; এখন আমি কেনো আছি? তার মনে হয়। সে জন্ম নিচ্ছে, অপার অন্ধকার তাকে প্রসব করছে ক্ষীণ আলোর মধ্যে; সে ভেঙেচুরে যাচ্ছে আলোর আক্রমণে। অন্ধকারেই তো ভালো ছিলাম; আবার কেনো, আবার কেনো? আমি কে? আমার একটি নাম ছিলো; নামটি কি এখন নেই? নামটি আমি মনে করতে পারছি না কেনো? হাসান, হাসান, হাসান; তারপর যেনো কী? রশিদ, রশিদ, রশিদ–আমি মনে করতে পারছি। নাম, তুমি মনে পড়ছে কেনো? আমি পড়ে আছি কেনো? আমি শূন্যতা বোধ করছি কেনো? কী যেনো নেই, কী যেনো নেই, কী যেনো নেই? আমার কী যেনো নেই? আমার আমিই নেই।

বেশ আলো ঢুকছে তার চোখে, তার মগজে; সে তার ঘরটি দেখতে পায়। এটা আমার ঘর, আমি এখানে ঘুমোই, আমি এখানে ঘুমিয়ে ছিলাম, এখানে আমি ঘুমিয়ে থাকবো। আমাকে উঠতে হবে। হাসান ওঠার চেষ্টা করে, দেখে তার ডান হাতটি দুই উরুর মাঝখানে কী যেনো চেপে ধ’রে আছে। হাত, আমার হাত, তুমি কী চেপে ধ’রে আছো? তোমার মুঠোয় কী অপূর্ব সম্পদ? হাসান হাতটি সরিয়ে নেয়; দেখতে পায় সেখানে ফুটে আছে লাল টকটকে একটা রক্তগোলাপ। রক্তগোলাপ আমার দুই উরুর মাঝখানে? আমি কি গান গেয়ে গেয়ে ফুটিয়েছি। এই গোলাপ? একটু নড়তেই রক্তগোলাপী খসে পড়ে; হাসানের চোখে পড়ে শূন্যতা সে একবার হেসে উঠতে চায়। ওহ, তুমি নেই, ওহ, তুমি নেই? তোমাকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে দানবেরা? হো হো ক’রে হাসার চেষ্টা করে হাসান; কিন্তু সে হাসতে পারে না, তার কান্না পায়; গভীর গভীর থেকে বিপুল কান্না জলধারার মতো বেরিয়ে আসে তার চোখ দিয়ে। আমি কাঁদছি কেনো? জানি না। আমি কাঁদছি কেনো। অনেক বছর আমি কাঁদি নি, এখন আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছে কেনো? নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে হাসান; কান্নার থেকে আর কোনো সুখ নেই।

এখানে কী ছিলো? এখানে কে ছিলো? মনে পড়তে চায় না হাসানের, তারপরই মহাস্মৃতির মতো মনে পড়ে; যে-মহান অধীশ্বর ছিলো এখানে, যে এখন নেই, তার মুখ দেখতে পায় হাসান- তুমি নেই, আমার শিশ্ন, হে অধীশ্বর, আমার সত্তা, তুমি নিহত, তুমি শহিদ? তুমি নেই, সম্রাট, রাজাধিরাজ, মহাবীর, হে প্রতিভাবান মহাকবি, তুমি নেই; আমার গৌরব, আমার প্রেরণা, তুমি নেই, তুমি অন্যায় সমরে নিহত। দেখতে পাচ্ছি আমি তোমার রাজাধিরাজ মুখমণ্ডল: তুমি সেই ছোট্ট কুমার স্বপ্নটি ছিলে, তারপর তুমি হয়ে উঠেছিলো যে-কোনো রাজার থেকে মহিমান্বিত, তোমার মস্তকে জ্বলজ্বল করতো সূর্য, সূর্যের মুকুট প’রে তুমি আমাকে দিয়েছে সাম্রাজ্য। জয়ের আস্বাদ, তুমি নেই, সত্তা আমার। তোমার বলবান অশেষ দৃঢ়তায় কতোবার মুগ্ধ হয়েছি, তোমার সঙ্গীতে মুখর হয়েছে অরণ্য, নেচে উঠেছে অজস্র ঝরনাধারা; তোমাকে মুঠোতে নিয়ে খেলেছে আমার প্রেম, মুখগহবরে গ্রহণ ক’রে ধন্য হয়েছে আমার সাম্রাজ্য, তুমি গভীর গভীর অনন্ত আলোতে অনন্ত অন্ধকারে প্রবেশ করেছে, মধুতে প্লাবিত করেছে। বিশ্ব, আমার রাজাধিরাজ; তুমি বাজ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছো গ’লে গেছো বসন্তের বনভূমি হয়ে, তোমার স্পর্শে মুকুলিত হতো নানা তরুবর গগনে গগনে লাগতো ডালপালা। তুমি নেই, আমি কি আছি? তুমি ছিলে আমার সর্বস্বের উৎস, কবিতার জীবনের স্বপ্নের, তোমার প্রেরণায় শব্দ হয়ে উঠতো কবিতা, বেঁচে থাকা হয়ে উঠতো জীবন, জীবন হয়ে উঠতো স্বপ্ন, তোমাকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে দানবেরা, ছিঁড়ে নিয়ে গেছে আমাকেই।

রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে? কী ক’রে বন্ধ হলো? আমার শরীরে রক্ত এতো কম? সব রক্ত কেনো প্রবল বেগে বেরিয়ে শূন্য করলো না আমার হৃৎপিণ্ডকে? হৃৎপিণ্ড, তুমি আর কেনো সঞ্চালন ক’রে চলছো রক্ত? তুমি নিঃশেষ ক’রে দাও সব রক্ত, সব রক্ত ঝ’রে পভুক এই ছিন্ন শিশ্নমূল দিয়ে; ভাসিয়ে দিক নগরের পর নগর রাজধানির পর রাজধানি; প্লাবিত ক’রে দিকে গ্ৰহনক্ষত্রমণ্ডল।

হাসান ওঠার চেষ্টা করে, উঠতে কষ্ট হয়; কিন্তু ধীরেধীরে উঠে দাঁড়ায়।

আমি কী এখন? দণ্ডিত? অপুরুষ? আমি আর পুরুষ নই? আমি নারী নই? আমি কবি? হ্যাঁ, আমি কবি, আমি কবি; কবির পুরুষ হওয়ার দরকার নেই, নারী হওয়ার দরকার নেই। কবিকে হ’তে হবে অপুরুষ: আমি অপুরুষ, আমি কবি।

কে যেনো আমার অন্তরতম ছিলো? ছিলো কেউ? হ্যাঁ, ছিলো। মেঘা? মেঘা কোথায়? সে কি এখনো ফেরে নি? বাসায় গিয়েছিলো মেঘা, শিগগির ফিরবে ব’লে, এখনো ফেরে নি? কেনো ফেরে নি? না ফিরেই পারে না। তাহলে সে কই? মেঘা ফেরে নি; টেলিফোন করেছে সে? করেছিলো? করে নি?

হাসান ডাকে, মেঘা, মেঘা, মেঘা ৷

মেঘা নেই; থাকলে এমন শূন্যতা থাকতো না।

মেঘাকে কি আমি টেলিফোনে পেতে পারি? কতো নম্বর? কতো নম্বর যেনো? আমার মগজে ছিলো, সেটি মুছে গেছে মনে হচ্ছে।

হাসান ফোন করতে বসে, বলে, মগজ আমাকে সাহায্য কোরো, যা মুছে গেছে তাকে আবার সোনার অক্ষরে লেখে; মগজ, তুমি শেষবারের মতো দয়া করো।

ওই দিকে ঘণ্টা বাজছে, বাজছে, বাজছে।

এক সময় একটি মিীয়মাণ কণ্ঠ বলে, হ্যাঁলো।

হাসান বলে, হাসান বলছি, আমি মেঘাকে চাই।

ওইপাশে কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ে, মেঘাদি নেই, মেঘাদি নেই, মেঘাদি নেই।

হাসান বলে, না, মেঘা আছে।

মেঘাদি নেই, আপনি আছেন?

হাসান বলে, আছি, না থাকলেই ভালো হতো।

কণ্ঠ হাহাকার ক’রে ওঠে, মেঘাদি নেই, আপনিও নেই, কেউ নেই, কেউ নেই, কেউ নেই।

স্তব্ধতা নামে মহাজগতে; হাসানের মনে হয় এই স্তব্ধতাই চেয়েছিলো সে। এই স্তব্ধতা মেঘা নেই তার স্তব্ধতা, এই স্তব্ধতা আমি নেই তার স্তব্ধতা, এই স্তব্ধতা রাজাধিরাজ্য নেই তার স্তব্ধতা।

এই স্তব্ধতা চেয়েছিলাম। আমি?

মেঘা নেই, এতে কি সুখ পাচ্ছি। আমি?

পাচ্ছি, মনে হয় পাচ্ছি।

মেঘা থাকলেই অসুখ আমাকে আক্রমণ করতো। সুখ পাচ্ছি- মেঘা নেই।

আমরা, মেঘা আর আমি, জড়িয়ে ছিলাম। কার বাধনে? কে বেঁধে রেখেছিলো আমাদের অচ্ছেদ্য বন্ধনে? আমাদের মধুময়, অমৃতের উৎস, ঠোঁট বাঁধতে পারতো। আমাদের? ঠোঁটের এতোটা শক্তি আছে? বাঁধতে পারতো আমাদের চুল, চোখ, আঙুল? চুল, চোখ, আঙুলের এতোটা প্রতিভা আছে? বাহু দিয়ে আমরা জড়িয়ে ধরেছি নিজেদের, জড়িয়ে থাকতে চেয়েছি অনন্তকাল, কিন্তু বাহু কি বাধতে পারতো আমাদের? বাহুর সেই শক্তি কই? প্রতিভা কই? আর হৃদয়, সেই মহান কিংবদন্তি, বাঁধতে পারতো। আমাদের? যদি না থাকতো উদ্ধত অপরাজেয় অক্লান্ত রাজাধিরাজ, যদি না থাকতো প্রতিভাবান মহাকবি, তাহলে মেঘা কি এসে উঠতো এই ঘরে, তাহলে মেঘা কি ছুটে আসতো আমার ডাকে, মেঘা কি ফুটতো ফুলের মতো বইতো নদীর মতো ঝরতো। বৃষ্টির মতো গলতো এঁটেল কাদার মতো? কে আমাদের গলিত সুগন্ধি কাদার ভেতরে গড়িয়েছে সূর্যের পর সূর্য চাঁদের পর চাঁদ? কে মেঘার অলিখিত শরীরে লিখতে পারতো। অনির্বচনীয় কাব্য–শব্দের পর শব্দ, উপমার পর উপমা, রূপকের পর রূপক, চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প, বাক্যের পর বাক্য? ঠোঁট আমাদের বাঁধে নি, বাহু আমাদের বাঁধে নি, মহান কিংবদন্তির পূজনীয় হৃদয় আমাদের বাঁধে নি, তাদের সেই প্রতিভা নেই; আমাদের বেঁধেছিলো অজর রাজাধিরাজ আর বিগলিত সম্রাজ্ঞী; এখন রাজাধিরাজ নেই, তাই মেঘা নেই।

মেঘা নেই, আমি সুখ পাচ্ছি।

মেঘা নেই, আমি বেঁচে উঠছি।

মেঘা নেই, আমি দণ্ডিত, আমি অপুরুষ, আমি কবি।

কিন্তু আমার থাকার কি অর্থ আছে?

আছে, আমি দণ্ডিত, আমি অপুরুষ, আমি কবি।

ফোন বেজে ওঠে, হাসান বলে, হ্যালো।

তার সহকারীটি বলে, স্যার, আজ কি আপনি অফিসে আসবেন?

হাসান বলে, না।

সহকারীটি বলে, স্যার, গতকালও ফোন করেছিলাম, ধরেন কি বলে মনে করেছিলাম আপনি ঢাকায় নেই।

হাসান বলে, হ্যাঁ, সম্ভবত ছিলাম না।

সহকারীটি বিস্মিত হয়, স্যার, সম্ভবত কেনো?

হাসান বলে, হ্যাঁ, সম্ভবত।

সহকারী বলে, আগামীকাল আসবেন?

হাসান বলে, আমি একটু বাইরে যাবো, কয়েক দিন আসবো না।

হাসান টেলিফোন বিচ্ছিন্ন ক’রে রাখে।

মেঝেতে ব’সে হাসান দুই উরু ফাঁক করে তার ছিন্ন শিশ্নমূলের দিকে তাকায়। শূন্যতা, তুমি মহাজাগতিক শূন্যতা; আমার দুই উরুর মাঝখানে শূন্য মহাজগত। শূন্য মহাশূন্যতাকে আমি ধ’রে আছি। দুই উরুর মধ্যস্থলে, হাসি পায় হাসানের, আমার কি এরপরও জাগবে কাম? জাগবে? এখন কী করবো আমি? আর কাম নয়, আর প্রেম নয়; আর শরীর নয়। তাহলে কী? আধ্যাত্মিকতা? প্ৰভু, প্ৰভু? আমার মাথা নত ক’রে দাও? হো হো হেসে ওঠে হাসান। আমার অপুরুষতা কি ঢেকে রাখতে হবে আলখাল্লায়? হো হো হো হো। আচ্ছা, ওই লোকটি এতো বড়ো একটি আলখাল্লায় কেনো ঢেকেছিলেন নিজেকে? অপুরুষতা লুকিয়ে রাখার জন্যে? তাঁকেও ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিলো দানবেরা? হো হো হো হো। এর পর কী? কী এর পর? এই মহাধ্বংসের পর কী? শূন্যতা? শূন্যতা? শূন্যতা? শূন্যতা? শূন্যতা? এরপর শুধুই কবিতা। কবি আমি, দণ্ডিত, আমি অপুরুষ; কবির কোনো লিঙ্গ নেই, কবিতার লিঙ্গ নেই; কবিতা অপুরুষ, লিঙ্গহীন, অনারী, অক্লাব। হাসান ছিন্ন শিশ্নমূলের দিকে তাকিয়ে থাকে–শূন্যতা। একবার মনে হয় কে যেনো জেগে উঠছে শূন্যতার ভেতর থেকে, রাজাধিরাজ, প্রতিভাবান কবি, তার শীর্ষে জ্বলজ্বল করছে মুকুট, সিংহাসনে বসছে সে, অলিখিত অপূর্ব গ্রন্থে লিখছে কবিতা; পরমুহূর্তেই শূন্যতা। আমাকে নিয়ে এখন আমি কী করবো? কিছুই করার নেই; আমার জন্যে আর সাফল্য নেই, ব্যর্থতা নেই; আমার জন্যে কামনা নেই, নিষ্কামনা নেই। আমি কবি, অপুরুষ, আমি আছি সত্য শুধু এটুকু।

কয়েক দিন পর যখন হাসান পৃথিবীতে বেরোয় আলোর আক্রমণে সে ধর্ষিতা বালিকার মতো লজ্জা বোধ করে; তার মনে হয়। পথের প্রতিটি মানুষ, ওই পেঁপেঅলা, কুষ্ঠরোগীটা, মুদিগুলো, রিকশাটঅলাগুলো, হোমিওপ্যাথ ডাক্তারটা, এবং সবাই জানে তার শিশ্ন নেই; তাদের সবার আছে, এমনকি কুষ্ঠরোগীটোরও একটি শিশ্ন আছে, ওর বউ ঠেলছ ওর কাঠের গাড়িটা, ওর শিশ্ন আছে ব’লেই ঠেলছে, কিন্তু তার নেই। তারা যদি সবাই খলখল ক’রে হেসে ওঠে? যদি মসজিদের মাইক্রোফোনে জানিয়ে দেয়া হয় যে আমাদের পাড়ার কবি হাসান রশিদের শিশ্ন নেই, শিশ্ন ছাড়া কাউকে আমরা আমাদের পাড়ায় থাকতে দেবো না? একটি মেয়ে কলেজে যাচ্ছে হয়তো, হাসানকে দেখে একটু হাসে; হাসানের মনে হয় মেয়েটি জানে তার শিশ্ন নেই, কুষ্ঠরোগীটার শিশ্ন আছে, তাই কুষ্ঠরোগীটার গাড়িও সে একদিন ঠেলতে পারে, কিন্তু হাসানের সাথে চাও খেতে সে রাজি নয়। হাসান দুই উরুর মাঝখানে একটা প্ৰচণ্ড যন্ত্রণা বোধ করে, শিশ্নমূল চেপে তার বসে পড়তে ইচ্ছে হয়; তার মনে হয় রক্তের প্রবল স্রোত বেরিয়ে আসছে তার শিশ্নমূল দিয়ে; কিন্তু সে ব’সে পড়ে না; সে একটি ইস্কুটার ডাকে।

অফিসে গিয়ে শূন্যতার মধ্যে পড়ে হাসান, তার মনে হয় অফিস হচ্ছে শূন্যতা; এই সমস্ত অ্যাড, রঙিন আবেদন, চমকপ্ৰদ বাক্য, উদ্দীপ্ত প্রতিযোগিতা, সবই শূন্যতা। কেউ কেউ দেখা করতে পরামর্শ করতে আসে, তার মনে হয় একেকটি শূন্যতা দেখা করছে তার সাথে, শূন্যতার সাথে দেখা করছে শূন্যতা।

না, ওরা কেউ শূন্যতা নয়; আমিই শূন্যতা; ওদের শিশ্ন আছে, কারো কারোটি হয়তো উত্তেজিত।

আমি শূন্যতা; গভীর নিরর্থকতা; অপার অশেষ তাৎপর্যহীনতা।

কারো কথা শুনতে ইচ্ছে করে না হাসানের; ভাষা যে এতো নিরর্থক ধ্বনির সমষ্টি, আগে তার মনে হয় নি, এখন মনে হচ্ছে ভাষা তারই মতো শূন্যতা।

আর এই শূন্যতাকে নিয়ে খেলা ক’রে যেতে হবে আরেক শূন্যতাকে।

শূন্যতাই সঙ্গ দেবে যতো দিন বেঁচে আছো,

শূন্যতাই পূর্ণ ক’রে রাখবে তোমাকে;

অরণ্যে সবুজ হয়ে বেড়ে উঠবে শূন্যতা, শূন্যতার

অরণ্যে তুমি ঘুরবে একাকী : প্রত্যেক নিশ্বাস

ফুসফুস ভরে দেবে শূন্যতায়; শূন্যতাই পড়বে তুমি

গ্রন্থে গ্রন্থে, যা কিছু লিখবে তার প্রতিটি অক্ষরে

লেখা হবে শূন্যতা।

এর থেকে উৎকৃষ্ট নয় কি আত্মহত্যা?

আলাউদ্দিন রেহমান ফোন করে, দোস্ত, তোমারে খুব খুঁজতে আছিলাম, শোনলাম তুমি বাইরে গেছো।

হাসান বলে, হ্যাঁ।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, তুমি আছো মজায়, ডবকা প্রেমিকারে লইয়া জঙ্গলে জঙ্গলে ব্যারাইতে আছো, আমি আছি দোজখে।

হাসান জিজ্ঞেস করে, দোজখে কেনো?

আলাউদ্দিন বলে, গার্মেন্টসের একটা মাইয়ারে লইয়া শুইতাম, তুমি দ্যাখছো, মাল ভাল, এখন গোলমালে পইর‍্যা গেছি।

হাসান জিজ্ঞেস করে, গোলমাল কেনো?

আলাউদ্দিন বলে, প্যাট হইয়া গ্যাছে, এখন কইতাছে বিয়া করতে হইবো।

হাসান বলে, করো।

আলাউদ্দিন বলে, করুম ক্যামনে, একটা বউ আছে না?

হাসান বলে, ডিভোর্স করো।

আলাউদ্দিন বলে, না, না, ডিভোর্স করতে আমি পারুম না, পোলাপান আছে। বউটার লগে শুই না, তয় ডিভোর্সও করতে পারুম না।

হাসান বলে, আলাউদ্দিন, আমি চাকুরিটা ছেড়ে দিতে চাই।

আলাউদ্দিন বলে, না, দোস্ত, এইটা করবা না; তোমার লিগাই অ্যাডটা ভাল চলতাছে। তোমার ব্যাতন বারাই দিমু, পায়ে ধরাতাছি। তুমি আমারে ছারবা না।

হাসান বলে, আর অ্যাড ভালো লাগে না।

আলাউদ্দিন বলে, তাইলে করবা কি? হাসান বলে, কবিতা লিখবো, কবিতা লিখেই জীবনটা কাটিয়ে দেবো। আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, কবিতা লেইখ্যা কি হুইস্কি খাইতে পারবা, গাড়ি চরতে পারবা, আর ওই পদ্মফুলের মতন সুন্দরীটারে পালতে পারবা?

হাসান বলে, এর কিছুই আমার লাগবে না।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, মনে হইতাছে তুমি আমার থিকাও গোলমালে আছো, চাকরি ছারার তোমার দরকার নাই।

হাসান বলে, ভেবে দেখি।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, অফিসে থাইক্যো, সন্ধ্যার পর আসন্তাছি। অনেক দিন এক লগে ড্রিংক করি নাই।

সন্ধ্যার পর আলাউদ্দিন আসে; তাকে দেখেই চিৎকার ক’রে ওঠে, দোস্ত, হইছে। কি তোমার, শুখাই গ্যাছো।

হাসান বলে, বেশ তো আছি।

আলাউদ্দিন প্রচুর খাচ্ছে আর পান করছে, আর কথা বলছে; হাসানের সবই নিরর্থক মনে হয়। প্যাট, বউ, পোলাপান, ডিভোর্স, সমাজ, এমআর মানসম্মান, শোয়া প্রভৃতি শব্দ, যা আলাউদ্দিন উচ্চারণ ক’রে চলছে। অনবরত, এবং সেগুলোকে জড়িয়ে দিচ্ছে যে-সব শব্দের সাথে, তার কোনোটিকেই অর্থপূর্ণ মনে হয় না হাসানের; সে শুধু মনে মনে বলতে থাকে- নিরর্থক, সবই তাৎপর্যহীন, এসব আমার কাছে কোনো অর্থ প্রকাশ করে না। নিরর্থকতা মানুষ কতোক্ষণ সহ্য করতে পারে? যে-মেয়েটি ওই দিকে দাঁড়িয়ে আছে, সে নিরর্থক; যে-পানপত্র ঝলমল করছে তার সামনে, সেটি নিরর্থক; ওইদিকে সারিসারি খাবার, নিরর্থক। কতোক্ষণ আমি সহ্য করতে পারি এই নিরর্থকতা? নিরর্থকতা আমাকে আক্রমণ ক’রে চলছে চারদিক থেকে, এই পানিপাত্র আক্রমণ করছে আমাকে, খাদ্য রাশি আক্রমণ করছে আমাকে, এইসব মানুষেরা আক্রমণ করছে আমাকে; আমাকে মুক্তি পেতে হবে এর থেকে। হাসান টয়লেটে যাবে ব’লে বেরোয়, বেরিয়ে বারান্দার দিকে যায়; একটি লিফটু ওপরে উঠবে ব’লে হা ক’রে অপেক্ষা করছে, হাসান লিফটে উঠে পড়ে। উচ্চতম তলায় এসে লিফটু থেকে সে নামে; বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ছাদে ওঠার সিঁড়িটি দেখতে পায়, ধীরে ধীরে সে ছাদে ওঠে। ছাদে উঠে চারদিকে আলোকিত নিরর্থকতা দেখে সে অনুপ্রাণিত বোধ করে;–এটাই শ্ৰেষ্ঠ সময়, আমি নিরর্থকতা থেকে মুক্তি পেতে পারি শুধু ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। মেঘা, মেঘা, আমার আত্মা; শিশ্ন, শিশ্ন, আমার সম্রাট।

লাফ দিতে গিয়ে হাসান নিজেকে টেনে ধরে।

আমি কবি, আমি দণ্ডিত, আমি অপুরুষ। লাফ দেয়া কোনো সমাধান নয়।

আমাকে বইতে হবে মানুষের সমস্ত দুর্ভাগ্য।

হাসান বলে, মেঘা, আমি নামছি।

টেবিলে গিয়ে দেখে আলাউদ্দিন কাৎ হয়ে আছে, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। আলাউদ্দিনও হয়তো আক্রান্ত হয়েছে কোনো নিরর্থকতা দিয়ে।

মধ্যরাতে হাসান নিজের ঘরে ফিরে মেঘার দেয়া ডায়রির প্রথম পাতায় লিখতে থাকে একচল্লিশ, অপুরুষ, দণ্ডিত, কবি; কবিতা ছাড়া আর কিছু নেই; যা কিছু লিখেছি আর আমি কখনো খুলে দেখবো না, সেগুলো নিশ্চয়ই তুচ্ছ, জরাগ্রস্ত, যতো দিন আছি লিখতে চেষ্টা করবো অজর কবিতা, হয়তো দশটি কি বিশটির বেশি লিখতে পারবো না, অজস্র জরাগ্রস্ত কবিতা নয় দশটি কি বিশটি অজর কবিতা। কবিতা ছাড়া আর কারো সাথে সম্পর্ক নয়; অপুরুষের একটিই সম্পর্ক সকলের সাথে— সম্পর্কহীনতা; থাকতে হবে সম্পর্কহীনতার সম্পর্কে, কামনাহীন কামনায়, বিমানবিক মানবিকতায়; দেয়াল থাকবে চারদিকে, দেয়াল ভেদ ক’রে ঢুকবে না কোনো কোনো কাতরতা কোনো মানুষ। লিখতে লিখতে, আশ্চর্য, একরাশ পংক্তি, একরাশ চিত্রকল্প জড়ো হ’তে থাকে তার মাথার ভেতরে, জমাট হয় রক্তের মতো; পংক্তিগুলোকে চিত্রগুলোকে হাসান ছন্দে দুলিয়ে দেয়, একটি কবিতা তার সামনে পুকুরে রক্তপদ্মের মতো স্থির হয়ে ভাসতে থাকে।

চারটি বছর কেটে যায় : কবিতায়, নিঃসঙ্গতায়, সম্পর্কহীনতায়।

এই যে আমি আছি একলা, সাড়া দিচ্ছি না। কারো ডাকে, ডাকাছি না কাউকে, ফিরিয়ে দিচ্ছি। সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে, বই দিয়ে ঘিরে ফেলছি আমাকে-একেই কি বলে ধ্যান? হো হো হো হো হাসে হাসান। ধ্যান কাকে বলে? এটা ধ্যান নয়, এটা হচ্ছে বিশ্বকে নিজের ভেতরে ছোট্ট সোনার বলের মতো সংহত করা; কবিতায় আমি তাই করছি, করতে চাই। আমি গৃহীত হচ্ছি? আমার কবিতা আকৃষ্ট করছে অনুরাগীদের? পুরস্কার পুরস্কার পাচ্ছি? সবই তুচ্ছ, নিরর্থক; কিছুই মূল্যবান নয়।

কিছু কিছু তরুণ কবি মাঝেমাঝে দেখা করতে আসে।

বলে, আপনাকে দেখতে এলাম।

হাসান বলে, কেনো?

তারা বলে, আপনি আমাদের প্রিয় কবি, আপনার কবিতা অন্য রকম, আমাদের নাড়া দিচ্ছে, আপনাকে দেখতে ইচ্ছে হলো, তাই এলাম।

হাসান বলে, প্রিয় কবিকে যারা দেখতে আসে, তারা কখনো কবি হবে না।

তারা বলে, আমরা কবি হবো না?

হাসান বলে, না।

তারা বলে, কামর আবদিন ভাইয়ের কাছে গেলে তিনি খুব খুশি হন, আমাদের চাবিস্কুট খাওয়ান, বলেন, আপনারা আবার আসবেন।

হাসান বলে, আমি ভাই নই।

তারা বলে, কামারভাই তো ভাই বললে খুশি হন, তিনি বয়সে আপনার থেকেও বড়ো।

হাসান বলে, তার নামে আপনারা জয়ধ্বনি দিয়ে ধন্য হ’তে থাকুন।

তারা বলে, তিনি তাঁর কবিতার বই উপহার দেন আমাদের, তাঁর কবিতা সম্পর্কে লিখতে বলেন; কি চমৎকার মানুষ তিনি।

হাসান বলে, গৌণ কবিদের এসব করতেই হয়; আর চমৎকার কেনো, আমি তো মানুষই নই।

তারা বলে, আপনি বিস্ময়কর।

তরুণরা আর আসে না। কষ্ট লাগে হাসানের তরুণদের ও নিজের জন্যে; একটি গভীর চিৎকার সে অশ্রুর মতো বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখে। তরুণদের তবু সহ্য হয়, ঘেন্না হয় ওই বুড়োগুলোকে। তারা আসে না, ফোন করে; হাসান ফোন রেখে দেয়, তারা আর ফোন করে না; হাসান সুখী বোধ করে।

আর আসে নারীরা, তরুণীরা।

এক নারী, ঘন নিবিড়, তার সাথে দেখা করতে আসে, বলে, আপনাকে দেখতে চ’লে এলাম, আপনার কবিতা এতো ভালো লাগে, আমার প্রিয় কবি আপনি।

হাসান তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অ্যাড সংশোধন করতে থাকে।

নারী বলে, আমার দিকে আপনার তাকাতে ইচ্ছে করছে না?

হাসান বলে, না।

নারী বলে, আমি কি এতোই অসুন্দর?

হাসান বলে, আসার কোনো দরকার ছিলো না।

নারী স্তম্ভিত হয়ে বলে, শুনেছি কবিরা অনুরাগিণী পছন্দ করেন, রবীন্দ্রনাথ করতেন।

হাসান বলে, আমি করি না।

নারী বলে, আপনি বেশ অভদ্ৰ মনে হচ্ছে।

হাসান বলে, বেশ নয়, অতিশয়; আমার কবিতাও অভদ্র।

নারী বলে, আমি আপনার কবিতায় মুগ্ধ, আপনার অনুরাগিণী; আপনার কবিতা আপনার মতো অভদ্র নয়।

হাসান বলে, আপনি সম্ভবত কামঅতৃপ্ত।

নারী চমকে ওঠে, বলে, আপনি কী ক’রে বুঝলেন?

হাসান বলে, অনুরাগ জন্মে কামঅতৃপ্তি থেকে।

নারী বলে, হ্যাঁ, আমি অতৃপ্ত।

হাসান বলে, আমি পরিতৃপ্ত করতে পারবো না, দয়া ক’রে আপনি যান।

নারী বলে, আপনাকে দেহ দিতে আমি প্রস্তুত হয়ে এসেছিলাম, কিন্তু এখন আমি শুয়োরকেও দেহ দিতে পারি, আপনাকে না।

হাসান বলে, আমি শুয়োরেরও অধম।

ঘরে ফিরে এসে হাসান সারারাত ক্ষমা চাইতে থাকে ঘন নিবিড় নারীর কাছে; তার প্রতিটি অঙ্গের কাছে। আমাকে ক্ষমা ক’রে দাও নারী, ক্ষমা চাই আমি; তোমার যে স্তন আছে, ঠোঁট আছে, আছে এক অবর্ণনীয় স্বর্ণখনি, তাই ক্রুদ্ধ করেছে আমাকে; ওসব অপূর্ব হীরকখণ্ড আমার জন্যে নয়। স্তন, আমাকে ক্ষমা কোরো; ঠোঁট, আমাকে ক্ষমা কোরো; সোনার খনি, ক্ষমা কোরো আমাকে। কিন্তু এখনো নারী আছে কেনো? আমি চাই নারী না থাকুক পৃথিবীতে। আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো, নারী, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই;– শুয়োরও তোমাকে সুখী করতে পারে; আমি, কবি, পারি না।

দু-তিনটি পুরস্কার পেয়েছে এর মাঝে হাসান, পথে পথে আজকাল পুরস্কার ছড়িয়ে পড়ছে, না চাইলেও পাখির মলের মতো মাথায় জামায় এসে পড়ে। না, না, না, ক’রে ক্লান্ত হয়ে শেষে সে একটি নিতে সম্মত হয়, এবং পুরস্কার নিতে যায়।

তার ভাষণে সে বলে, এসব পুরস্কার নিরর্থক, গৌণ কবিদেরই পুরস্কার প্রাপ্য, তাদের পুরস্কার দরকার, এসব পুরস্কার সারাক্ষণ বলে তুমি যে কবিতা লিখতে ব্যর্থ হয়েছে তার সান্ত্বনা হিশেবে পাচ্ছো পুরস্কার। তোমার কবিতা হয় নি, পুরস্কারও যদি না পাও, তাহলে তুমি বাঁচবে কী নিয়ে? আজ পুরস্কার নিয়ে বুঝতে পারছি আজো আমি গৌণ কবিই রয়ে গেছি।

চারদিকে একটা হাহাকার ওঠে, সে শুনতে পায়।

প্রশ্নোত্তরপর্বে একজন জিজ্ঞেস করে, আপনি কবি কামর আবদিনের মতো জনগণের কথা বলেন না কেনো?

হাসান বলে, ভেতরে কবিতা না থাকলে জনগণের কথাই বেশি বলতে হয়, জনগণ সাধারণত নির্বোধ, রাজনীতিবিদেরা তাদের প্রতারণা করে, এ-কবিরাও প্রতারণা করে তাদের; জনগণের কথা বলা কবিতা নয়, কবিতা হচ্ছে কবিতা।

আরেকজন প্রশ্ন করে, আপনি কি মানুষকে ভালোবাসেন?

হাসান দ্বিধাহীনভাবে বলে, না।

সে জিজ্ঞেস করে, ঘৃণা করেন?

হাসান দ্বিধাহীনভাবে বলে, হ্যাঁ।

আরেকজন জিজ্ঞেস করে, আপনি নারী ভালোবাসেন?

হাসান দ্বিধাহীনভাবে বলে, না।

একজন প্রশ্ন করে, তাহলে আপনি কবিতা লেখেন কেনো?

হাসান বলে, নিরর্থকতাকে তাৎপর্যপূর্ণ করার এটা আমার ব্যর্থ চেষ্টা।

একজন প্রশ্ন করে, মনে হচ্ছে আপনি রেগে আছেন, কিন্তু আপনার কবিতা তো এমন রাগের কবিতা নয়, তা তো গভীর যন্ত্রণার।

হাসান চুপ ক’রে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে–দীর্ঘ সময় ধ’রে, নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে চারদিক, তার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত প্ৰান্ত থেকে মাটির ভেতর দিয়ে প্রবল রোদনের স্রোত বয়ে আসছে, ঢুকছে তার ভেতরে; তার চিৎকার ক’রে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে।

সে শুধু বলে, আমি আর কথা বলতে চাই না, আমার কোনো কথা নেই।

হাসান মাইক্রোফোন থেকে আর তার আসনে ফিরে যায় না।

সে মঞ্চ থেকে নামে, চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ঘিরে অনুরাগীরা দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, স্বাক্ষরের জন্যে খাতা বাড়িয়ে ধরে; সে এই সব পেরিয়ে রাস্তায় এসে পৌঁছে, অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে থাকে।

রাতে ঘরে ফিরে এসে হাসান মেঝের ওপর স্তব্ধ হয়ে বসে। হাসান, নিজের সাথে কথা বলতে থাকে সে, তুমি কেনো এতো ঘৃণা করছে নিজেকে, এবং ঘৃণায় ঢেকে ফেলছো। গাছপালা মেঘ সমুদ্র মাটি শিশির পাখি পুষ্প মানুষ? শুধু সম্পর্ক পাতাতে পারছো না ব’লে, শুধু তোমার শরীরটিকে ব্যবহার ক’রে সুখ সৃষ্টি করতে পারছে না ব’লে? হ্যাঁ, তাই, হ্যাঁ, তাই; মানুষ আমাকে ছিন্ন করেছে, প্রকৃতি যদি অন্ধ বধির ; বিকলাঙ্গ বৃক্কহীন ভগ্নহৃৎপিণ্ড অপুরুষ করতো আমাকে মেনে নিতাম; কিন্তু মানুষ, হিংস্র৷ মানুষ আমাকে ছিন্ন করেছে, ভয়াবহ মানুষ ছিন্ন করেছে আমাকে মানুষের সাথে সম্পর্ক থেকেই, তাকে ঘৃণা ক’রে যেতে হবে। ঘৃণা ক’রে যেতে হবে। প্রেমে নয়, ঘৃণায়ই বেঁচে থাকতে হবে; সুখে নয়। বাঁচতে হবে অনন্ত যন্ত্রণায়। শিল্পকলা আর সুখ নয়। আমার জন্যে, শিল্পকলা এক অপার যন্ত্রণা, কিন্তু তাকে নিয়ে আমি বঁচবো। শিল্পকলা যার দয়িতা, সে কবে সুখ পেয়েছে? আমিও পাবো না; কিন্তু থাকতে হবে সৃষ্টিশীল। হাসান তার ছিন্ন শিশ্নমূলের দিকে তাকায়, হো হো হাসে, বলে, আমি ভেবেছিলাম তুমিই শিল্পের সম্রাট, তোমার থেকেই উৎসারিত হয় কবিতা; কিন্তু তোমাকে ছাড়াও আমি লিখছি কবিতা। হো হো হো, প্রিয়, তোমাকে ছাড়াই যদি পারি, তাহলে কেনো পারবো না ওই হিংস্র মানুষ ছাড়া?

কয়েক সপ্তাহ ধ’রে খুবই যন্ত্রণা দিচ্ছে বালিকাটি।

প্রথম দিনই হাসান বালিকাটিকে বলেছে, তুমি আর এসো না।

আঠারো বছরের ওই তীব্র সৌন্দর্য বলেছে, আমি আসবো।

হাসান বলেছে, জানো, আমার বয়স পঁয়তাল্লিশ? তোমার পিতার সমান।

বালিকা বলেছে, কবিদের কোনো বয়স নেই।

হাসান বলেছে, আমি কবিগুরু নই যে আমার বয়স নেই, আমার বয়স আছে। তুমি আসবে না, তোমাকে আমি পছন্দ করি না।

সৌন্দর্য বলেছে, আমি আসবো, আপনাকে আমি পছন্দ করি।

বালিকা আসছে, দিনের পর দিন, হাসান তাকে তাড়িয়ে দিতে পারছে না। আমি কি সত্যিই চাই বালিকা না আসুক? তাহলে আমি ওকে বাসার টেলিফোন নম্বরটিও কেনো দিলাম? যদি সত্যিই ওকে এড়াতে চাই, ও এলে ধমক দিয়ে কেনো বিদায় করি না, এটা তো আমি পারি, অভদ্র তো আমি হ’তে পারি অবলীলায়, কিন্তু কেনো পারি না; আর বাসায় ফিরে কেনো টেলিফোনের অসহ্য অমৃত ঝংকারের জন্যে ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত নিশ্বাসার্ত হয়ে থাকি? ওকে দেখলে কি ভেতরে কোনো গভীর স্মৃতি যন্ত্রণা হয়ে দেখা দেয়, ওর মুখে কি দেখতে পাই আমি অন্য কোনো মুখ? ওরা ওই বস্ত্রের ভেতরে কি আছে আমার চেনা এক অনির্বচনীয় অবিনশ্বর শরীর? কিন্তু না, ওকে বিদায় ক’রে দিতেই হবে; ওকে দেখে আমি সুখ পেতে চাই না।

বিকেলে অফিসে আসে ইয়াসমিন; দিগদিগন্তে, পশুকবলিত বাঙলার আকাশে আকাশে রঙ আলো সোনালি মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।

হাসান শুরুতেই বলে, তোমাকে বলেছি তুমি আসবে না।

ইয়াসমিন বলে, সে তো পুরোনো কথা, নতুন কিছু বলুন।

হাসান বলে, তুমি জানো না কি ভয়ঙ্কর বিপদ তোমার জন্যে অপেক্ষা ক’রে আছে, তুমি জানো না বালিকা।

ইয়াসমিন বলে, আত্মহত্যা করতে হবে আমাকে?

হাসান বলে, তার থেকেও ভয়াবহ।

ইয়াসমিন বলে, সেটা হবে খুব সুন্দর।

হাসান বলে, সুন্দর দেখে দেখে তুমি অসুন্দর কাকে বলে জানো না।

ইয়াসমিন বলে, আপনার সাথে আমার কোনো নদীর পারে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে।

হাসান বলে, আমি নদী চিনি না।

ইয়াসমিন বলে, তাহলে চলুন আমি চিনিয়ে দেবো।

হাসান বলে, নদী আমি চিনতে চাই না।

ইয়াসমিন তার একগুচ্ছ সোনার আঙুল হাসানের দিকে বাড়িয়ে বলে, এগুলো একবার ছুঁয়ে দেখবেন? দেখুন তো এগুলো নদী কি না?

সোনার আঙুল ছোঁয়ার সুখ তার জন্যে নয়, তার জন্যে তীব্ৰ বিষ; হাসান উঠে টয়লেটে গিয়ে বসে থাকে, কমোডের ভেতরে তার লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

বেরিয়ে বলে, তুমি যাও, তুমি আর আসবে না।

ইয়াসমিন আবার সোনার ঝিলিকগুলো তার দিকে ছড়িয়ে দেয়, বলে, ছুঁয়ে দেখুন, নদী ছুঁইয়ে দেখুন।

হাসান বলে, নদী আমার জন্যে নয়। তুমি যাও।

কিন্তু ইয়াসমিন আসে, এবং টেলিফোন করে; হাসান সুখ পায়, এবং গভীরতম নিঠুরতম যন্ত্রণা বোধ করে; না এলে বোধ করে অতল শূন্যতা, এলে তার ভেতর দাঁত বসায় যন্ত্রণা; টেলিফোন করলে নেকড়ে তার হৃৎপিণ্ড কামড়ে ছিঁড়ে নেয়, না করলে শূন্যতার শীতল তুষারপাতে সে লুপ্ত হয়ে যায়।

কিন্তু না; বিদায় ক’রে দিতে হবে ইয়াসমিনকে।

সেদিন সে বাসায় ফেরে। অনেক রাতে; ফিরেই শোনে টেলিফোন বাজছে। না, না, ধরবো না, হাসান কিছুক্ষণ ব’সে থাকে; তারপর ধরে।

ইয়াসমিন বলে, পৃথিবীর সব কাজ শেষ ক’রে অবশেষে ফিরলেন?

হাসান বলে, ফেরার ইচ্ছে ছিলো না।

ইয়াসমিন বলে, জানতেন আমি ফোন করবো, তবু দেরিতে ফিরলেন কেনো?

হাসান বলে, আমি কোনো শেকলে বাঁধা নই।

ইয়াসমিন বলে, আপনি এক গভীর অন্ধকার গর্তে প’ড়ে আছেন।

হাসান বলে, হ্যাঁ।

ইয়াসমিন বলে, আপনাকে আমি উদ্ধার করবো।

হাসান ব’লে ফেলে, কী দিয়ে?

ইয়াসমিন বলে, আমার হৃদয়, আমার প্রেম।

হাসান বলে, না, না, না।

হাসান টেলিফোন রেখে দেয়, টেলিফোন বাজতে থাকে অনন্ত যন্ত্রণার মতো।

হাসানের আর ঘরে থাকতে ইচ্ছে করে না, সে বেরিয়ে পড়ে। রাতটা কাটিয়ে দেবো আমি অন্ধ আতুর কুষ্ঠরোগী চোর পকেটমার বেশ্যা হিজড়ে সমস্ত দণ্ডিতদের সাথে, আমিও দণ্ডিত, আমিও তো হিজড়ে, কুষ্ঠরোগীদের থেকেও ঘূণ্য, অন্ধের থেকেও পতিত; হাসান হাঁটতে থাকে। পথের পাশে একবার বসে সে, ওই দিকে জটলা করছে অন্ধ আতুররা, তাদের পাশে গিয়ে বসবো, ঘুমিয়ে পড়বো? আমি তো কবি, অপুরুষ, সকলের সঙ্গী; ওদের সাথেই আমার সম্পর্ক, ওরাই আমার আত্মীয়, এই নরকবাসীরাই আমার বান্ধব। একবার সে ইটওঠা ময়লালাগা ফুটপাতে শুয়ে পড়ে; তার কষ্ট হয়, সে উঠে হাঁটতে থাকে, সারারাত হাঁটে। ভোরে তার ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হয়; ফিরেই শোনে বানবান ক’রে বাজছে ইয়াসমিন।

ইয়াসমিন বলে, আজ উঠেই আপনাকে শুনতে ইচ্ছে হলো।

হাসান বলে, আমাকে শোনার কিছু নেই।

ইয়াসমিন বলে, আপনার স্বর থেকে মধু ঝরে, আমি পান করি।

হাসান বলে, তুমি বিষকে মধু মনে করো।

ইয়াসমিন বলে, বিষই আমার কাছে মধু।

হাসান বলে, তুমি আর ফোন করবে না।

ইয়াসমিন বলে, আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে, এখনি, এই ভোরবেলা।

হাসান বলে, তুমি বিকেলে আমার বাসায় এসো।

ইয়াসমিন উল্লাসে ফেটে পড়ে, বাসায় আসবো আমি? কখন? ঠিকানা কি?

হাসান ঠিকানা দেয়; কীভাবে আসতে হবে, কোন দোকানের উল্টো দিকে নামতে হবে, কী-তলায় উঠতে হবে, সব বর্ণনা করে বিস্তৃতভাবে।

বিকেলে চারপাশের সমস্ত আবর্জনাকে সোনায় পরিণত ক’রে ইয়াসমিন আসে।

ঘরে ঢুকেই ইয়াসমিন বলে, কী যে সুন্দর ঘর!

হাসান বলে, এ-ঘরটা আসলে ওই দূরের আবর্জনাস্তূপের থেকেও নোংরা; এ-নোংরায় তুমি আর কোনোদিন পা ফেলতে চাইবে না।

ইয়াসমিন বলে, চিরকাল আমি এই ঘরে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে পারবো।

হাসান বলে, ইয়াসমিন, তোমার মুখ দেখে আমার কষ্ট হয়, তুমি যাও।

ইয়াসমিন বলে, আমি যাবো না, আমি থাকবো।

হাসান বলে, তুমি জানো না তুমি কোন নরকে এসেছে, ইয়াসমিন।

ইয়াসমিন বলে, আমি আপনাকে ভালোবাসি।

হাসান বলে, আমি ভালোবাসা চাই না।

ইয়াসমিন বলে, আমি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি, আপনি আমার হাত ধরুন। আপনাকে আমি ভালোবাসি।

হাসান বলে, আমি কারো হাত ধরতে পারি না।

ইয়াসমিন বলে, আমার ঠোঁট দেখুন, সুন্দর, আপনি আমাকে চুমো খান। আপনাকে আমি ভালোবাসি।

হাসান বলে, আমি কাউকে চুমো খেতে পারি না।

ইয়াসমিন দাঁড়িয়ে বলে, আমার শরীরটি দেখুন, সুন্দর, আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরুন। আপনাকে আমি ভালোবাসি।

হাসান বলে, আমি কাউকে জড়িয়ে ধরতে পারি না।

ইয়াসমিন চিৎকার ক’রে ওঠে, কেনো নয়, কেনো নয়?

হাসান দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে জিন্সের বেল্ট খোলে, বোতাম খোলে, জিপার খোলে, এবং জিন্সটি খুলে দূরে ছুড়ে ফেলে বলে, দ্যাখো।

ইয়াসমিন হাসানের দুই উরুর মধ্যস্থলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার ক’রে ওঠে, না, না, না, না, এমন হ’তে পারে না, এমন হ’তে পারে না।

সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

হাসান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেনো চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে।

 

(সমাপ্ত)

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x