মানুষ আজ অনেক এগিয়েছে, এগিয়েছে বিজ্ঞান। বহু আবিষ্কার মানব জাতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বহু তত্ত্ব ও তথ্য অজানা অনেক কিছুকে জানতে সাহায্য করেছে। আমরা আপাত অদৃশ্য-অণু-পরমাণুর অবয়ব নির্ণয় করতে পেরেছি। পেরেছি মহাকাশ গবেষণার মাধ্যমে বহু অজানাকে জানতে, অধরাকে ধরতে। অথচ আমাদের মস্তিক্ষের স্নায়ুকোষের বিষয়ে আমরা শতকরা দশভাগ খবরও জানতে পেরেছি কি না সন্দেহ। এ সন্দেহ আমার নয়, বিজ্ঞানীদের। এই মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষ থেকেই চিন্তা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞার উৎপত্তি। উনিশ শতকে হার্বাট স্পেনসর, কার্ল পিয়ারসন, ফ্রান্সিস গ্যালটন প্রমুখ বিশিষ্ট বিজ্ঞানী দার্শনিকরা বুদ্ধির বিকাশ, বংশগতি, বংশগত ভিত্তি, বুদ্ধির পরিমাপ ইত্যাদি নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন।

ইংলন্ডের প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ চার্লস পিয়ারম্যান প্রথম বুদ্ধি সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারণাকে রূপ দেন এক সুনির্দিষ্ট গাণিতিক তত্ত্বে। স্পিয়ারম্যানের ওই মতবাদ সমসাময়িক মনোবিজ্ঞানীদের কেউই প্রায় মেনে নেননি। যদিও পরবর্তীকালে তাঁর তত্ত্ব অনেকেই মেনে নিয়েছিলেন। স্পিয়ারম্যান মনে করতেন, একটি মানুষের সার্বিক বোধশক্তি জন্মগত।

এলেন ফরাসি মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড বিনেট। সে সময় ফ্রান্সে ছাত্রদের নিয়ে এক অভুতপূর্ব সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিশাল সংখ্যক স্কুল ছাত্ররা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হতে থাকে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার সম্ভাবনা কোন কোন ছাত্রদের বেশি, তাদের সনাক্তকরণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিনেটকে। উদ্দেশ্য ওই সব চিহ্নিত ছাত্রদের বিশেষ প্রশিক্ষণের সাহায্যে পরীক্ষায় কৃতকার্য করা যায়। বিনেতের দায়িত্ব পাওয়ার সময় ১৯০৪-০৫ সাল। সনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে বিনেট যে অভীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করেন, তা সবই ছিল ছাত্রদের বিভিন্ন ক্লাসের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। স্কুলের পরীক্ষায় সাফল্য ও ব্যর্থতা বুদ্ধি ও মেধার তারতম্যের ফল, এই ধারণা থেকেই এই অভীক্ষা প্রশ্নকে ‘বুদ্ধি অভিক্ষা’ নামে বা আই কিউ (Intelligence Quotient সংক্ষেপে I. Q.) নামে অভিহিত করা হতে থাকে।

‘আই কিউ’তে যে নম্বর দেওয়া হতো, তার হিসেব করা হতো এইভাবেঃ প্রশ্নাবলীর বিন্যাস হতো বয়স অনুপাতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। উত্তরদাতা যে বয়সের, সেই বয়সের জন্য নির্ধারিত সঠিক উত্তর দিলে উত্তরদাতার মানসিক বয়স (mental age) ও প্রকৃত বয়স (chronological age) সমান বলে ধরে নিয়ে তাকে দেওয়া হতো ১০০ নম্বর। অর্থাৎ দশ বছরের কোনও বালক দশ বছরের জন্য নির্দিষ্ট সমস্ত প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিতে পারলে তাকে দেওয়া হবে ১০০। এর অর্থ দশ বছর বয়সে সাধারণ মানের ছেলেমেয়দের যে ধরনের বুদ্ধি থাকা উচিৎ, তা আছে। ১০ বছরের বালকটি ২০ বছর বয়সের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নের সবগুলোর ঠিক উত্তর দিতে পারলে তার প্রাপ্য বুদ্ধি পরিমাপক সংখ্যাটি বার করতে হলে যে বয়সের উপযোগী প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, সেই মানসিক বয়সের সংখ্যাটিকে উত্তরদাতার প্রকৃত বয়সের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে ১০০ দিয়ে গুণ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে বালকটির যদি কেবল মাত্র ৫ বছরের একটি শিশুর বয়সের উপযোগী প্রশ্নগুচ্ছের উত্তর দিতে সক্ষম হয়, তবে তার মানসিক বয়স ধরা হবে ৫। অতএব বালকটির বুদ্ধি পরিমাপক সংখ্যাটি হবে ৫/১০X১০০=৫০। মানসিক বয়স ÷ প্রকৃত বয়স X ১০০ গুণ করলে বেরিয়ে আসবে বুদ্ধি পরিমাপক সংখ্যাটি।

বিশ শতকের প্রথম দশকে আলফ্রেড বিনেট যে বুদ্ধি পরিমাপক প্রশ্নাবলী তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধনের নামে বিকৃতকরণের পর আমরা পেলাম বর্তমান আই কিউ-এর রূপ। ব্রিটেন ও আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষীরা আই-কিউকে সামাজিক শ্রেণী ও জাতি গোষ্ঠির ক্ষেত্রে প্রয়োগ শুরু করলো। অর্থাৎ, যে আই কিউ বিনেট প্রয়োগ করা শুরু করেছিলেন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, তাই প্রযুক্ত হতে লাগলো সমষ্টির ক্ষেত্রে। বিকৃতকারীরা এই প্রয়োগের দ্বারা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইলো, সাদা চামড়াদের মেধা ও বুদ্ধি কালো চামড়াদের তুলনায় অনেক উন্নত।

আই কিউ-এর প্রয়োগ সামাজিক শ্রেণী, বর্ণ বা জাতি গোষ্ঠীর উপর প্রয়োগ না করে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেই আই কিউ অভীক্ষার প্রশ্নাবলী নির্ভরযোগ্যতা পাবে, এমনটা ভাবারও কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই। কারণ প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত অনুশীলনে আই কিউ বাড়ানো সম্ভব, এমনকি স্মৃতিকেও বাড়ানো সম্ভব। প্রতিভা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস, যা আই কিউ-এর সাহায্যে জিনিয়াস দূরে থাক, বুদ্ধি বৃত্তিরও কোনও হদিশ মেলে না। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সংখ্যার ‘নিউ সাইনটিস্ট’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। লেখক একজেটার (Exeter) বিশ্ববিদ্যালয়ের Human cognition বিভাগের অধ্যাপক এম হাও (M. Howe) সত্তর জন বিরল সঙ্গীত প্রতিভার জীবন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন-

জিনিয়াস তৈরি হয়, জন্মায় না (Genious
May be made rather
Than born)

আমরা পরীক্ষার সাফল্য নিয়ে বিচারে বস্লে আইনস্টাইন, ডারউইন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সমরেশ বসু প্রমুখ বহু প্রতিভাধরদের ক্ষেত্রেই একেবারে বোকা বনে যেতাম।