বিজ্ঞান বিশ্বাস করে, যে ঘটনা আদৌ ঘটেনি তা কোনভাবেই দেখা সম্ভব নয়, অনুমান করা যেতে পারে মাত্র এবং সেই অনুমান যেমন ভুল হতে পারে তেমনি ঠিকও হতে পারে।

পরামনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রিকগনিশন (Precognition) শাক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতের অনেক ঘটনাকে দেখা যায়। ঠিকুজি-কোষ্ঠী, কপাল বাঁ কান থেকে মানুষের ভবিষ্যৎ গণনার সঙ্গে প্রিকগনিশন শক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতের ঘটনা দেখতে পাওয়ার মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য আছে।

জ্যোতিষীরা যে ভাবে ভবিষ্যৎ বলে, তার মধ্যে ‘গণনা’ বাঁ ‘Calculation’ না থাক, একটা ‘কমনসেন্স’ বা যুক্তিবুদ্ধি থাকে। প্রকগনিশন শক্তির অধিকারী বা ‘ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা’ কোনও কিছু গণনা বাঁ ‘Calculation’ করে বলেন না। সাধারণ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বলেন না। তাঁরা ভবিষ্যতে যে ঘটনা ঘটবে সেটা নাকি বিশেষ অনুভূতি বা ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয়ের ফলে স্পষ্টই দেখতে পান।

দেশের কোনও বিখ্যাত ব্যক্তির কবে মৃত্যু ঘটবে, কোনও লোক কবে একটা বিশেষ ধরনের বিপদে পড়বে, কোন একটা বিশেষ দিনে কোন একটা বিশেষ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে, কোন দিন নায়াগ্রা জলপ্রপাত ভেঙ্গে পড়বে, কোন দিন মেক্সিকো সিটিতে ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটবে ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনাই ‘প্রিকগনিশন’ শক্তির অধিকারীরা অনুভব করতে পারেন।

আমার প্রিয় লেখক সত্যজিৎ রায়-এর কাহিনীতে নকুড়বাবু এমনি এক চরিত্র, যার প্রিকগনিশন শক্তি রয়েছে। গল্পে লেখকের কলমের আঁচড়ে যা সম্ভব, বাস্তবে তা কিন্তু মোটেই সম্ভব নয়। বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত এই ধরনের কোনও শক্তির পরিচয় পায়নি, পরামনোবিজ্ঞানীরাও হাজির করতে পারেননি এই ধরনের কোনও শক্তিধর লোককে।

 

আব্রাহাম লিংকন না কি নিজের মৃত্যু স্বপ্নে দেখেছিলেন

আব্রাহাম লিংকন সম্বন্ধে একটি প্রচলিত কাহিনী আছে। তিনি একবার স্বপ্ন দেখলেন –একটি কফিন ঘিরে বিশাল ভিড়। কালো পোশাক পরা বহু অভিজাত পুরুষ ও নারীর ভিড়ে সাদা ফুলে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে কফিনটা। কার কফিন? কফিনের ভেতরটাও দেখতে পেলেন লিংকন। কফিনের ভেতরে শায়িত রয়েছে তাঁরই মৃতদেহ।

যেদিন লিংকন স্বপ্নটা দেখেন, তার পরদিনি আততায়ীর গুলিতে প্রাণ দিলেন লিংকন।

লিংকনের এই স্বপ্নের বিবরণ পাওয়া যায় তাঁরই ডায়েরি থেকে। এইটুকু শোনার পর অনেকেরই মনে হতে লিংকন অন্তত একবারের জন্য ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টার ক্ষমতা পেয়েছিলেন। অন্তত পরামনোবিজ্ঞানীরা তো তাই বলেন।

না ব্যাপারটার মধ্যে আদৌ সামান্যতম অলৌকিকত্ব বা অতীন্দ্রিয় কিছুই নেই, স্বপ্ন নিয়ে সামান্য দু-একটা কথা বললে বিষয়টা বুঝতে আশা করি অসুবিধে হবে না।

মানুষের স্বপ্নে অনেক সময়েই তার চিন্তা-ভাবনা প্রতিফলিত হয়। আর চিন্তা-ভাবনা সবসময়ে যে সচেতনভাবে এসে হাজির হয় তাও নয়। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন অবস্থার ছাপও এসে পড়ে মানুষের অবচেতন মনে। এই চেতন বা অবচেতন মনের ভাবই  বহুক্ষেত্রে স্বপ্নে অগভীর ঘুমের মধ্যে হানা দেয়। গভীর ঘুমে মানুষের স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা খুবই কম, প্রায় নেই বললেই চলে। গভীর ঘুমে যদিও বা স্বপ্ন দেখা দেয় তবু, সে-স্বপ্ন সাধারণত আমাদের মনে থাকে না।

শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর কোনও কোনও গল্পের প্লট পেয়েছিলেন স্বপ্নে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী কেকুলে কার্বনের গঠন-কাঠামোর রূপটি স্বপ্নেই প্রথম দেখেছিলেন। অনেক কবি স্বপ্নে কবিতা পান। কোলরিজ তো একটা পুরো কবিতাই স্বপ্নে দেখে লিখে ফেলেন। কেউ স্বপ্নে একটা জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান খুঁজে পান। আর কেউ-বা স্বপ্নে পান ঈশ্বরের দর্শন, ঈশ্বরের মন্ত্র বা ঈশ্বরের আদেশ।

লক্ষ্য করলেই দেখেবন,

একজন কবি কিন্তু কোনদিনই তাঁর অজানা এক জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে স্বপ্ন দেখবেন না। একজন কাব্যরসে বঞ্চিত লোক স্বপ্নে কোনদিনই কাব্যগুণ সম্পন্ন কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন না।

নিরীশ্বরবাদী কখন-ই ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ পান না। আব্রাহাম লিংকন যে কঠিন ও অগ্নিময় পরিস্থিতির মধ্যে দেশ শাসন করছিলেন, তাতে তাঁর খুন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সব সময়ই। আর সেটা লিংকনেরও মোটেই অজানা ছিল না। এই অবস্থায় লিংকনের নিজের মৃত্যু নিয়ে স্বপ্ন দেখা এবং সেটা বাস্তবে ঘটে যাওয়ার মধ্যে অতীন্দ্রিয়তা আসছে কোথা থেকে? এই প্রসঙ্গে এ-টুকুও জানিয়ে রাখি, নিজের মৃত্যু নিয়ে লিংকন এর আগেও বেশ কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু মরেছেন ওই একবারই।

 

ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টার রায় সত্যজিৎ রায়ের বেলায় মেলেনি

৯১৮৫-র ২৩ জুলাই, ‘আনন্দমেলা’র দপ্তরে গল্প করছিলাম আমি, শ্যামলকান্তি দাশ ও রতনতনু ঘাটী। শ্যামল বললেন- আজ ভোর রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছেন। অদ্ভুত জীবন্ত স্বপ্ন, সত্যজিৎ রায় মারা গেলেন। কলকাতার প্রতিটি পত্রিকায় বিশাল বিশাল হরফে হেড-লাইন দিয়ে অনেক ছবির সঙ্গে গোটা পত্রিকাটাই প্রায় সত্যজিৎবাবুর খবরে ঠাসা। ২০ হাজার শোকার্ত লোকের বিশাল শব-মিছিল বেরুল ‘বিশপ লেফ্রয়’ রোডের বাড়ি থেকে। কেওড়াতলায় পোড়ানো হল মরদেহ।

শ্যামল আরও জানালেন, ওঁর দেখা স্বপ্নগুলো আশ্চর্যজনকভাবে সত্যি হয়। অনেকবার অনেকের মৃত্যু নিয়ে স্বপ্ন দেখার পর লক্ষ্য করেছেন, দু’একদিনের মধ্যেই তাঁদের মৃত্যু ঘটে। আমার লেখক বন্ধুটিকে বললাম, “দেখাই যাক, তোমার এবারের স্বপ্ন সত্যি হয় কিনা!” কিন্তু, সত্যি হলেও এই এটাকে তোমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার শক্তি বলে মনে নেওয়া যাবে? সত্যজিৎবাবুর অসুস্থতার খবর কারোরই অজানা নয়। তাঁর যথেষ্ট বয়েসও হয়েছে। এই ক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে এই ধরনের স্বপ্ন দেখা তোমরা মতো একজন শিল্প-সাহিত্যের প্রেমিকের পক্ষে কোনই অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তুমি আগের কিছু স্বপ্নের ক্ষেত্রেও সে-গুলিকে সত্যি হতে দেখেছ, কিন্তু যতগুলো স্বপ্ন আজ পর্যন্ত দেখেছ, তার মধ্যে কতগুলো সত্যি হয়েছে লিখে রেখে হিসেব করে দেখেছ কি?

শ্যামলের সঙ্গে আলোচনা হলেও শ্যামল আমার যুক্তিগুলোকে সম্ভবত মেনে নিয়ে পারেননি। ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এবারের স্বপ্নটাও সত্যি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়নি। তারপরও বছর দশেক বেঁচে ছিলেন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x