ঘর থেকে বেরিয়েই রাশেদের মনে পড়লো তার কোনো গন্তব্য নেই। কোনো প্রতীকী কথা নয়; এই মাটিতে এই জলে এই আগুনে আবার প্রতীক কী, সবই বাস্তব, সবই আগুনের মতো জ্বলছে, যা প্রতাঁকের থেকেও দুরূহ। সে যাবে কোথায়? যদিও তার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু যেখানেই যাওয়ার কথা ভাবছে, সেখানেই আর যেতে ইচ্ছে করছে না। যে-রিকশাটিতে সে উঠে বসেছে, তার চালককে মনে হচ্ছে এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি, হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক চালাতো, কিছুই মানছে না সে; মুখে দাড়ির বিস্তার দেখে বোঝা যাচ্ছে ইমানের জোরও তার প্রচণ্ড, মাঝেমাঝে নানা দোয়াও পড়ছে, দোয়া পড়ার সময় লোকটি চোখ বন্ধ করছে কিনা দেখতে পাচ্ছে না রাশেদ, কিন্তু ওই দোয়ায়। রাশেদের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আজকাল সব কিছুতেই দোয়া পড়তে হয়, দোয়া না পড়লে কিছুই ঠিক থাকে না, ঠিকমতো পাওয়া যায় না; যেমন মমতাজ অনেকগুলো দোয়া বের করে ফেলেছে, বিদ্যুৎ চলে গেলে সে বিদ্যুতের দোয়া পড়ে, পানি না। থাকলে পানির দোয়া পড়ে, টেলিভিশনের পর্দা হঠাৎ কালো হয়ে গেলে সে টেলিভিশনের দোয়া পড়ে। বিদ্যুৎ চলে গেলেই মৃদু চিৎকার করতে থাকে, আম্মু, বিদ্যুতের দোয়া পড়ো, আম্মু, বিদ্যুতের দোয়া পড়ো, এবং দোয়ায় বেশ কাজও হয়, মাঝেমাঝে দোয়া পড়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে আসে। মমতাজ হয়তো গোপনে গোপনে কোনো নেয়ামুল কোরআন সংকলন করছে, বেরোনোর সাথে সাথে বা বেস্টসেলার হবে। রাশেদ মাঝমাঝেই ভাবে মমতাজের কাছে থেকে সে কিছু জরুরি দোয়া শিখে নেবে, এখন ভাবছে মমতাজের কাছে থেকে সে যদি নিজের গন্তব্য জানার দোয়াটি শিখে নিতো, তাহলে এ-লোকটির ওপর নিজের গন্তব্যের ভার ছেড়ে দিতে হতো না। লোকটি নিশ্চয়ই স্পেন বিজয়ের সময় তারিকের দলে ছিলো, ওর নামে কোনো পাহাড়টাহাড়ের নাম আছে বলে দৃঢ় বিশ্বাস হচ্ছে রাশেদের। লোকটি কি বুঝে ফেলেছে রাশেদের। কোনো গন্তব্য নেই? নাকি সে দোয়া পড়ে রাশেদের গন্তব্য বের করে ফেলেছে, তাই রাশেদকে জিজ্ঞেস না করেই ছুটছে যেনো রাশেদ যাচ্ছে না যাচ্ছে সে-ই, আর সে-ই জানে রাশেদের কোথায় যাওয়া উচিত। একটা ট্রাককে এমনভাবে সে পাশ দিলো মনে হলো রিকশাটিকে আল্লা ট্রাকের চাকার নিচে থেকে নিজের হাতে টেনে রাস্তার পাশে সরিয়ে আনলো। নিশ্চয়ই অলৌকিক কোনো শক্তি আছে লোকটির, লোকটিকে পেছন থেকে একটা সালাম দিয়ে রাখবে কি রাশেদ? কিন্তু লোকটিকে একটা গন্তব্য তো বলা দরকার, নইলে সে কোনো পাড়ার মুখে এনে যদি বলে, ভাইসাব, আল্লার রহমতে। আইসা গ্যাছি, নামেন, তাহলে তো রাশেদ নামতে পারবে না, বলতেও পারবে না সে এখানে আসতে চায় নি। রাশেদ কয়েকবার লোকটিকে ডাকলো; লোকটি কারো ডাক শোনার জন্যে জন্ম নেয় নি, সে দোয়া পড়ে চলছে, গলায় তার শাইমুম চলছে, বালুঝড় এসে লাগছে রাশেদের চোখেমুখে। দোয়া শুনলে রাশেদের এমনিই ভয় লাগে, শরীর। শিরশির করে, ফেরেশতাদের দৌড়াদৌড়ি দেখতে পায়, ছেলেবেলায় এক ফেরেশতাকে সে জড়িয়ে ধরেই ফেলেছিলো; এমন সময় ডান রাস্তা থেকে শাইশাই করে একটা ট্রাক ছুটে এলো। রাশেদ একটা কালো ফেরেশতাকে দেখতে পেলো চোখের সামনে, এবং লাফিয়ে বাঁ দিকের ফুটপাতে নামলো, সে যে লাফ দিয়েছে এটা বুঝতে কিছুটা। সময় লাগলো তারও; যখন বুঝলো সে দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাতে তখন রাশেদ স্থির। দাঁড়িয়ে দেখতে চাইলো রিকশাটি ট্রাকের নিচে প্রজাপতির মতো পিশে গেছে; কিন্তু না, পথের সম্রাট ট্রাক বা দিকের পথটিতে প্রচণ্ড পুলক জাগিয়ে ঢুকে পড়লো, আর রিকশাটি চলে গেলো সামনের দিকে। এটাকে এক অলৌকিক ঘটনা বলেই মনে হলো রাশেদের। রিকশাঅলা পেছনে ফিরে যখন তাকাবে বা রিকশাটাকে হাল্কা লাগবে, তখন কী ভাববে তার সম্পর্কে ভাববে সে নিচে পড়ে মরে গেছে? ভেবে সে সুখ পাবে? রাশেদ সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো, সে আর রিকশা নেবে না, হেঁটেই যাবে, রিকশাটাকে পেলে পয়সা বুঝিয়ে দিয়ে হাঁটবে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখলো রিকশাঅলা ফিরে আসছে, সেও খুঁজছে রাশেদকে, একটু ভয়ে ভয়েই রিকশাঅলা তাকাচ্ছে রাস্তার দু-দিকে। তাকে দেখে একটু লজ্জাই পেলো রাশেদ, হাত তুলে ডাকলো তাকে; কিন্তু রিকশাঅলা তাকে দেখেই ভয় পেলো, রিকশা থেকে অনেকটা পড়েই যাচ্ছিলো, রিকশাটি ঘোরাতে গিয়ে উল্টেই যাচ্ছিলো, তবে উল্টে না পড়ে বাতাসের বেগে সে সামনের দিকে ছুটে গেলো। রিকশাঅলা একবারও পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলো না, যতো দ্রুত পারা যায় প্যাডেল মারছিলো; নিশ্চয়ই সে অনেকগুলো দোয়াও পড়ছিলো। রাশেদকে দেখে সে ভয় পেলো কেনো? রাশেদকে কি সে কোনো ভূত ভাবলো, না আওলিয়া ভাবলো?

প্রস্রাব করে নেয়া দরকার একবার, যে-কোনো উত্তেজনার পর একবার প্রস্রাব করলে শান্তি পাওয়া যায়, উত্তেজনা তরল হয়ে বেরিয়ে যায়। দেয়ালের পাশে কোলাব্যাঙের মতো বসে একটি লোক বর্ষণ করার চেষ্টা করছে, ভালোভাবে পেরে উঠছে না, ট্রাউজার পরে বসে এ-কাজটি করার থেকে ট্রাউজার ভিজিয়ে ফেলা অনেক সুখকর। লোকটি সব কিছু করে চলছে স্বাভাবিকভাবে, যেনো নিজের বাড়িতেই বাশঝাড়ের পাশে বসে সে কাজটি করছে, দূরে কচুরিপানার ওপর দিয়ে একটা ডাহুকের দৌড়ও দেখছে, কিন্তু স্বাভাবিক হতে পারছে না ট্রাউজারের জন্যে। দুটি মেয়ে মুখ চেপে চলে গেলো, লোকটি একবার মুখ ফিরিয়ে দেখলো, কোনো অস্বস্তি বোধ করলো না, যেমন ডাহুক দেখে সে অস্বস্তি বোধ করে না। লোকটি হয়তো ট্রাউজারের নিচে কোচা দিয়ে লুঙ্গিও। পরেছে, পেছন দিকটা বেশ ফুলে আছে। লোকটি কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু লোকটি এখানেই শেষ করতে রাজি নয়, আরো আনুষ্ঠানিকতা আছে তার, রাস্তাটা তার নিজেরই বাড়ির বাঁশঝাড়,-পকেট থেকে সে একটা কী যেনো বের করলো, মাটির ঢিল হয়তো, রাশেদের মনে পড়লো মওলানা সাব একবার তাদের কুলুপ নেয়া শিখিয়েছিলেন, কীভাবে মাটির ঢিল ছিদ্রের মুখে চেপে ধরে চল্লিশ কদম হাঁটতে হয় দেখিয়ে দিয়েছিলেন, আর তারা মাওলানা সাবের শোলমাছটি দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। লোকটি তার শোলমাছের মুখে আধার চেপে ধরে উত্তরে-দক্ষিণে দক্ষিণে-উত্তরে বাঁশঝাড়ের ভেতরে হাঁটতে লাগলো। এ-দৃশ্য মওলানা সাব দেখতে পেলে খুব শান্তি পেতেন। মওলানা সাব তাকে দেখতে পাচ্ছেন না, রিকশায় বসে একটি মেয়ে তার শোলমাছ দেখে আঁৎকে উঠলো, রাস্তার পশ্চিম পাশি মিলিটারিরা প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেনো ওরা এখনি ট্রাক থেকে নেমে নিজেদের শোলমাছ ধরে মার্চ করতে শুরু করবে। রাশেদ শালমাছকে আধার। খাওয়াতে পারবে না, কোলাব্যাঙের মতো বসতে পারবে না; সে হাঁটতে থাকে, তাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাবটিতেই যেতে হবে। ক্লাবে ঢুকেই সে প্রথমে টয়লেটে গেলো, টয়লেটটা ধর্মসম্মত, দাঁড়িয়ে প্রস্রাবের জন্যে যেমন দুটি ইউরিনাল আছে তেমনি ধার্মিকদের জন্যেও ব্যবস্থা রয়েছে। কুলুপের জন্যে একপ মাটিও আছে একপাশে। টয়লেটে ঢুকেই রাশেদ দেখলো জিম্বু খুব বিপদে রয়েছে। সে জানতো না জিম্বু টয়লেটে ঢুকেছে, তাহলে রাশেদ দু-পা চেপে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতো। জিল্প, প্রাথমিক। বিদ্যালয়টির উপাশ্চার্য, উপাচার্য নয় উপাশ্চার্য শব্দই তাকে মানায়, অত্যাশ্চার্য আরো। মানানসই, চারফুট আটইঞ্চি, প্রস্রাব করতে এসে খুব বিপদে পড়ে গেছে। তার নলটি কিছুতেই নাগাল পাচ্ছে না ইউরিনালের; সে বোতাম খুলে ফেলেছে, নলও বের করে ফেলেছে, ভেতর থেকে নিশ্চয়ই প্রচণ্ড চাপ আসছে, কিন্তু সে কিছুতেই ইউরিনালের। নাগাল পাচ্ছে না, তার নল ইউরিনালের নিচে পড়ে যাচ্ছে। সে কি তাহলে এতোদিন ইউরিনালের নিচেই কাজটি করে এসেছে, সেজন্যেই কি টয়লেটের প্রান্ত ঘিরে মেঘের রুপোলি পাড়ের মতো সব সময়ই চিকচিক করে একটা সরু ধারা বয়? পাশের ইউরিনালেই দাঁড়িয়েছে রাশেদ, তাই এখন সে ইউরিনালের নিচ দিয়েও নির্ঝর ছোটাতে পারছে না, পায়ের আঙলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েও নলটিকে ইউরিনালের নাগালে আনতে পারছে না। একবার নল বের হয়ে গেলে কী জঘন্য ঘটনা ঘটে তলপেটে রাশেদ তা। জানে, জিন্ধু এখন সেই বিপদে রয়েছে, আল্লা যেনো আর কাউকে কখনো এমন বিপদে না ফেলে; একবার শিৎশিৎ করে একপশলা বেরিয়ে জিম্বুর হাত ভিজে গেলো, জিন্ধু। দু-হাতে নল চেপে ধরে ডেকে উঠলো, ইব্রাহিম, ইব্রাহিম। ইব্রাহিম ছুটে আসতেই সে চিৎকার করে উঠলো, এইখানকার ইট দুইটা গ্যালো কই? আগে দুটি ইট ছিলো ইউরিনালের নিচে, তার ওপর দাঁড়িয়ে জিম্বু নিশ্চিন্তে কাজটি করতো, আজ টয়লেট ধোয়ার সময় ঝাড়দার সে-দুটি সরিয়ে ফেলেছে, আর তাতে প্রকাশ পেয়ে গেছে জিল্লুর। মহিমা। একজোড়া ইট ছাড়া যে-জিপ্ন ইউরিনালের নাগাল পায় না, সে আকাশ ছুঁয়েছে।

ক্লাবে ইউরিনালের থেকে আকর্ষণীয় উস্কৃষ্ট সম্পদ আর কী আছে? সেটা ব্যবহার করা হয়ে গেলে রাশেদ বেরিয়ে পড়ে। বেরোতেই গেইটের পাশে বিড়ি টানছিলো। যে-রিকশাঅলাটি, সে বুঝে ফেলে রাশেদের কোনো গন্তব্য বা ভেতরে কোনো চাপ নেই; রাশেদ তার সাথে যে-কোনো জাহান্নামে যেতে পারে। সে ডাকতেই রাশেদ তার রিকশায় উঠে বসে। সে কোথায় যাবে? যে-কোনো নামই সে বলতে পারে, তবে কোনো নামই বলতে ইচ্ছে করছে না, হঠাৎ মুখ থেকে গুলিস্থান শব্দটি বেরিয়ে পড়ে। ওইখানে। রাশেদ অনেক বছর যায় নি, কলেজে পড়ার সময় বারবার গেছে, তাই এখনো রিকশায় উঠলেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চায় গুলিস্থান, এখনো সেভাবেই বেরিয়ে গেছে শব্দটি। গুলিস্থানে তার কোনো কাজ নেই, কোথাও তার কোনো কাজ নেই, কাজহীনতাই তার মুখে গুলিস্থান রূপে ধ্বনিত হয়ে ওঠে। রাশেদ ভেবেছিলো রিকশাটি উড়তে শুরু করবে, কিন্তু খোঁড়াতে শুরু করে; মনে হয় রিকশাঅলা তার থেকেও গন্তব্যহীন, কোথাও যাওয়ার কোনো সাধ তার ভেতরে নেই, কোনোদিন ছিলো না। তবু ভালো সে কোনো দোয়া পড়ে রাশেদকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে না। বাঁ পা দিয়ে প্যাডেল করার সময় তার মাজা একবার বায়ে হেলে পড়ছে, হেলতে বেশ সময় নিচ্ছে, আবার ডান পা দিয়ে প্যাডেল করার সময় তার মাজা ডান দিকে হেলে পড়ছে, হেলতে বেশ সময় নিচ্ছে; তার মাজাটি এখনি খসে পড়ে রিকশার শেকলের সাথে জড়িয়ে যাবে মনে হচ্ছে। প্যাডেল করার সময় সে তার লিঙ্গটি আস্তে আস্তে একবার বাঁ দিকে আরেকবার ডান দিকে ঘষছে আসনটির সাথে? তাই কি সে মাঝেমাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে? লোকটি কি বিয়ে করেছে, করে থাকলে সে স্ত্রীর সঙ্গে কী করে, এমন প্রশ্ন। জাগলো রাশেদের মনে, যেমন যে-কোনো নির্বোধকেই দেখলেই রাশেদের মনে প্রশ্নটি লাফিয়ে ওঠে। রাশেদ দেখেছে নির্বোধগুলো সেই কাজে বেশ অগ্রসর; একটা নির্বোধকে সে মাঝেমাঝে কিছু টাইপ করতে দেয়, ওটা একই ভুল করে বছরের পর বছর; একবার রাশেদ রেগে জিজ্ঞেস করেছিলো সে বিয়ে করেছে কিনা? নির্বোধটি জানায় সে পাঁচটি সন্তান এরই মাঝে স্ত্রীকে দিয়ে প্রসব করিয়েছে, রাশেদ চিৎকার করে উঠতে চেয়েছিলো সে জন্ম দেয়ার রাস্তাটি কী করে খুঁজে পায়? রাশেদ রিকশাঅলার কাছে জানতে চায় সে কটি বিয়ে করেছে। রিকশাঅলার কান দুটি খুব সজাগ, একবারেই রাশেদের কথা শুনে ফেলে; খ্যাখ্যা করে হাসতে থাকে, কিছুটা লজ্জাও পায়, এবং জানায় যে তিনখান বিয়ে করেছে এ-পর্যন্ত। রাশেদ এমনই অনুমান করেছিলো, ওর মাজার অবস্থা দেখেই বোঝা যায় বউগুলো ওর মাজাটাকে শেষ করে ফেলেছে। একটাকে বশে রাখার মতোও। মাজার জোর ওর নেই; রিকশাটি যদি ওর বউ হতো, তাহলে অনেক আগেই লাথি মেরে ওকে দশ হাত দূরে ছুঁড়ে ফেলে ছালার ওপর কাত হয়ে শুয়ে ওর বাপদাদার। আটাশ পুরুষ উদ্ধার করতো, আর এখনো ওকে চড়তে দিতো না। কিন্তু তিনখানা বউ দিয়ে ও কী করে? যা ইচ্ছে করুক, এখন মাজাটিকে একটু স্থির করুক, রিকশায় একটু গতি আনুক, রাশেদের মনে একটা গন্তব্যের বোধ জাগিয়ে দিক। রিকশাঅলা তুমি স্থির হও গন্তব্যে, আমাকেও গন্তব্য দাও, এমন প্রার্থনা করতে ইচ্ছে হলো তার। রাশেদের পাশ দিয়ে যারা চলে যাচ্ছে তাদের খুব হিংসা করছে রাশেদ, তাদের নিশ্চয়ই অনিবার্য গন্তব্য রয়েছে, তাই ছুটছে পাগলের মতো, না ছুটলে সর্বনাশ হয়ে যাবে, হয়তো আর। গন্তব্য খুঁজে পাবে না। কিন্তু রাশেদ ও তার রিকশাঅলার কোনো গন্তব্য নেই।

গন্তব্যের অভিমুখে প্রচণ্ডভাবে ছুটে আসছিলো তারা তিনজন; তাদের মোটর সাইকেলের চেহারা আর শব্দ জানিয়ে দিচ্ছিলো আর কারো গন্তব্য নেই, আছে শুধু। তাদের। বিপরীত দিক থেকে তারা আসছিলো, হয়তো গুলিস্থানে গন্তব্য সম্পন্ন করেই আসছিলো; তারা পাড়ার সম্রাট রাস্তার রাজা, যে-দিক ইচ্ছে সে-দিক দিয়ে ছুটতে পারে, ছুটছিলোও তাই; ছুটতে ছুটতে এসে রাশেদের রিকশাটাকে প্রায় ধাক্কাই দিচ্ছিলো। ধাক্কা অবশ্য লাগে নি, কিন্তু লাগার যে-উপক্রম হয়েছিলো তাতেই রিকশাঅলার মাজাখানি চৌচির হয়ে পড়ে যাচ্ছিলো; তবে তার মাজা নড়বড়ে হতে পারে, বুকটি নড়বড়ে নয়, সেটা সাহসের প্রকাণ্ড খনি। মোটর সাইকেলের সম্রাটরা যখন কিছুটা দূরে চলে গেছে, রিকশাঅলা পেছনের দিকে তাকিয়ে বীরের মতো বলে উঠলো, মস্তানি দ্যাহানের জায়গা পায় না। প্রকৃতি এক জায়গার ঘাটতি আরেক জায়গায় এভাবেই মিটিয়ে দেয়, মাজায় জোর না দিলে বুকে জোর দেয়। দেখা গেলো কথাটি বলার পর রিকশাঅলার মাজাটিও বেশ শক্ত হয়ে উঠেছে, প্যাডেলও মারছে স্থিরভাবে; বুকে সাহস জাগলে অন্যান্য জায়গায়ও শক্তি দেখা দেয়। ভালোই লাগছিলো রাশেদের। সাধারণ। মানুষের ভেতরে সাহস সুপ্ত হয়ে আছে, ওই সাহস মাঝেমাঝে প্রকাশ পেয়ে তাদের সুন্দর করে তোলে, এমন একটা বিশ্বাস রয়েছে রাশেদের; রিকশাঅলাকে ওই বিশ্বাসের প্রতিমূর্তিরূপে চোখের সামনে দেখে যখন হর্ষ বোধ করছিলো রাশেদ, তখনি মোটর। সাইকেলটি গোঁ গোঁ ক’রে রিকশাটির সামনে এসে দাঁড়ায়। তাহলে তারা রিকশাঅলার কথাটা শুনতে পেয়েছে। তারা বেয়াদবি সহ্য করে না। মোটর সাইকেল থেকে দুজন নামলো, নেমেই একজন রিকশাঅলার গালে একটা চড় মারলো। রিকশাঅলা ছিটকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়লো, অনেকক্ষণ নড়তে পারলো না, একবার উঠতে গিয়ে পড়ে গেলো। তখন আরেকজন তাকে বাঁ হাত দিয়ে টেনে তুলে আরেকটি চড় মারলো, রিকশাঅলা ঘুরতে ঘুরতে আবার কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়লো। এবার আর ওঠার। চেষ্টা করলো না। রাশেদ রিকশায় বসে বসে দেখছে। একটা ভিড়ও জমে উঠেছে, রাক্ষসদের পাশে ওই ভিড়কে পোকার ভিড় মনে হচ্ছে। অত্যন্ত নিরীহ নিষ্পাপ তাদের

চোখমুখ, তাতে কোনো অভিযোগ নেই, তবে চোখেমুখে রয়েছে পিষ্ট হওয়ার ভয়। রিকশাঅলা গোঙাচ্ছে, কেউ তাকে ধরে তুলছে না; তবে আবার টেনে তুললো প্রথম মাস্তানটি, তুলেই আরেকটি চড় মারলো। রিকশাঅলা নিচে চিৎ হয়ে পড়ে রইলো। ভিড়টা আরো বেড়েছে, চারদিকে পোকাগুলো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রাশেদও রিকশায় বসে আছে পোকার মতো; গোলের ভেতরে তিনটি সিংহ, তাদের পায়ের নিচে একটা আধমরা মেষ। সিংহরা এখন চলে যাবে, তাদের শিকার সম্পন্ন হয়ে গেছে। কেউ কিছু বলছে না, রাশেদও না। ভিড়ের ভেতর থেকে একটি লোক রাশেদকে সালাম। দিলো, সালামটি আশ্চর্যভাবে কাজ করলো রাশেদের ভেতরে; সে নিজেও পোকা হয়ে। বসে ছিলো, সিংহদের দেখছিলো, সালামটি তাকে পোকা থেকে মানুষে পরিণত করলো। লোকটি চিৎকার করে রাশেদের পরিচয়টা বারবার জানাতে লাগলো, আর। রাশেদও পোকা থেকে মানুষ আর মানুষ থেকে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হতে লাগলো। ভিড়টা আরো বড়ো হয়ে উঠেছে, আরো জমাট বেঁধেছে, এবং রাশেদের পরিচয়টা জেনে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সিংহরা এবার চলে যাবে সিংহরা, তারা মোটর সাইকেলে উঠতে যাচ্ছে। রাশেদ তাদের ডাক দিলো, শুনুন। শুধু তারা তিনজনই নয়, পুরো ভিড়টাই চমকে উঠলো রাশেদের গলা শুনে, যেনো একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে গেছে। যে-দু মস্তান রিকশাঅলাকে চড় মেরেছে, ডাক শুনে তারা থমকে দাঁড়ালো। রাশেদ বললো, আপনারা কি বুঝতে পারছেন যে আপনারা অপরাধ করেছেন? ভিড়ের কয়েকজন চিৎকার করে উঠলো, হ্যাঁ, এরা অপরাধ করেছে। পুরো ভিড়টাই এবার চিৎকার করে উঠলো, হ্যাঁ, এরা অপরাধ করেছে। মাস্তান দুটি কিছু বলছে না, রাশেদ আবার বললো, আপনারা কি বুঝতে পারছেন আপনারা অপরাধ করেছেন? তারা চারিদিকে তাকিয়ে। স্বীকার করলো যে তারা অপরাধ করেছে। রাশেদ বললো, এর জন্যে আপনাদের শাস্তি প্রাপ্য। ভিড় থেকে চিৎকার উঠলো, এদের শাস্তি দেন। রাশেদ বললো, আপনাদের শাস্তি হচ্ছে রিকশাঅলা আপনাদের গালে দুটি করে চড় মারবে। শুনে কেঁপে উঠলো সবাই, সিংহরাও কেঁপে উঠলো। ভিড়ের চোখগুলো চিকচিক করছে, রিকশাঅলা মাস্তানদের চড় মারছে, এটা তারা দেখতে চায়; কিন্তু দেখার সাহস নেই ওই চোখে, রিকশাঅলা সত্যিই যদি চড় মারে তাহলে তারা চোখ বুজে ফেলবে। এমন অলৌকিক দৃশ্য তারা। সহ্য করতে পারবে না। রাশেদ বললো, তবে এ-শাস্তি আপনাদের দিচ্ছি না। আপনারা রিকশাঅলাকে তুলে তার কাছে মাফ চান। শাস্তিটা জানতে পেরে ভিড়ের চোখমুখগুলো স্বস্তি পেলো। সিংহ দুটি এবার টেনে তুলোে রিকশাঅলাকে, দু-হাত ধরে মাফ চাইলো তার কাছে। সিংহরা পোকা হয়ে গেছে, রিকশাঅলার হাতের নিচে দুটি পোকার মতো ঝুলছে তারা। তারপর পোকার মতো তারা বেরিয়ে গেলো ভিড়ের ভেতর থেকে, মোটর সাইকেলটিকেও একটা পোকার মতো দেখাতে লাগলো।

রাশেদকে তো গুলিস্থানে যেতে হবে, একটি গন্তব্য সে পেয়েছিলো, সে-গন্তব্য যতোই নিরর্থক হোক তবুও সেটাকেও কি সে হারিয়ে ফেলবে? রিকশাঅলা এবার বেশ চালাচ্ছে, তার মাজা কাঁপছে না, হেলছে না, রিকশাটাকেও বেশ সুখী মনে হচ্ছে। রাশেদ গুলিস্থানের দক্ষিণে একটি চৌরাস্তায় নামলো। নামতেই রিকশাঅলা তার পা জড়িয়ে ধরলো। রিকশাঅলা যদি জড়িয়ে ধরে তাকে চুমো খেতো, তাহলেও এতো অস্বস্তি লাগতো না, সেও না হয় একটা চুমো খেতো রিকশাঅলার গালে; তাতে অন্যরা অস্বস্তি বোধ করতে হয়তো, কিন্তু রাশেদের এতোটা অস্বস্তি লাগতো না। রিকশাঅলা এখনো ঘোরের মধ্যে রয়েছে, মাস্তানরা যে তার কাছে মাফ চাইতে পারে এটা সে বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না, আবার অবিশ্বাসও করছে না; তাই রাশেদের পায়ের ধুলো তার দরকার। সে কিছুতেই ভাড়া নেবে না। তার জীবন ভরে উঠেছে, জীবনে সে এতোটা মর্যাদা কখনো পায় নি, সে এখন সব কিছু বিলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু রাশেদ এ-কোথায় এসে পড়েছে? রিকশাঅলাকে বিদায় দিয়ে সে একটা লম্বা দ্বীপের ওপর দাঁড়ালো। কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছে না, কেউ তার দিকে ছুরি লাঠি বন্দুক নিয়ে ছুটে আসছে না, কিন্তু সে ভয়ে আঁৎকে উঠলো, বন্য পশুর পাল নয়, মানুষ রাশেদকে ভীত। করে তুলোে। রাশেদ না মানুষ ভালোবাসতে? উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম থেকে ময়লার স্রোতের মতো গড়িয়ে আসছে মানুষ, হামাগুড়ি দিয়ে আসছে মানুষ, ভেসে আসছে। মানুষ, উবু হয়ে আসছে মানুষ, বাঁকা হয়ে আসছে মানুষ, কাৎ হয়ে আসছে মানুষ, রিকশায় চেপে আসছে মানুষ, বাসে গুঁজে আসছে মানুষ, ট্রাকের নিচে মাথা গলিয়ে আসছে মানুষ, ছাইমাখা মাছের মতো কাতরাতে কাতরাতে আসছে মানুষ, পশুর মতো আসছে মানুষ, শুধু মানুষের মতো আসছে না মানুষ। রাশেদ কি আগে মানুষ দেখে নি, এই প্রথম দেখলো মানুষ, এবং মানুষ দেখে ভয় পেয়ে গেলো? আসছে রঙচটা মানুষ, ফাটলধরা মানুষ, শ্যাওলাপড়া মানুষ, মচকানো মানুষ, পোকারা মানুষ, ভাঙা মানুষ, প’চে-যাওয়া মানুষ, ঝুললাগা মানুষ, চল্টাওঠা মানুষ, তালিমারা মানুষ, রোঁয়াওঠা মানুষ, ছাতাপড়া, জংধরা মানুষ, ঘুনেখাওয়া মানুষ, উইলাগা মানুষ। রাশেদের কি ঘেন্না ধরে যাচ্ছে মানুষে? ঘেন্না ধরলে চলবে না, এটা ঘেন্নার দেশ নয়, ভালোবাসার দেশ, রাশেদকে ভালোবাসতে হবে। এখানে সবাই মানবপ্রেমিক, রাশেদকেও মানবপ্রেমিক হতে হবে। এজন্যেই রাজনীতিকদের রাশেদ এতো শ্রদ্ধা করে, যাদের একবার দেখেই রাশেদের ভয় আর গোপনে ঘেন্না লাগছে, তাদের জন্যে ভালোবাসায় ঘুম হয় না দরদী। রাজনীতিকদের, তবে এখন একটু ঘুমোনোর সুযোগ পেয়েছে, মুক্তি পেয়েছে। ভালোবাসার দায় থেকেও; ওই ভার কাঁধে তুলে নিয়েছে ভাঁড়টি, সে এখন প্রচণ্ডভাবে মানুষ ভালোবেসে চলছে, ভালোবাসার তোড়ে ঘুমোতেও পারছে না। কোন কারখানায় এরা উৎপন্ন হয়? সব কুটিরশিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে বা ধ্বংসের মুখে বলে অনেক বছর ধরে শুনে আসছে রাশেদ, শুধু একটি কুটিরশিল্পই চলছে দিনরাত; রাশেদ তাঁতের। খটখট শব্দ শুনতে শুরু করে, খটখট করে তাঁত চলছে, চলছে তাঁত, খটখট খটাখট, মেয়েমানুষের ওপর পুরুষমানুষ, খটাখট খটখট, পুরুষমানুষের নিচে মেয়েমানুষ, খটাখট খটাখট, মেয়েমানুষের ওপর পুরুষমানুষ, উৎপন্ন হচ্ছে বাঙালি, বাঙলাদেশি, বাঙালি। মুসলমান, মুসলমান বাঙালি, হিন্দু, বাঙালি হিন্দু, হিন্দু বাঙালি, বাঙলাদেশি হিন্দু। ভালোবাসতে হবে মানুষকে, ভালোবাসার ওপরে কিছু নেই।

এরা সবাই সঙ্গমের ফলে উৎপন্ন হয়েছে? এদের প্রত্যেককে আজ দুপুরে গুলিস্থানের চৌরাস্থায় আসার জন্যে সঙ্গম করতে হয়েছে একটি মেয়েমানুষ ও একটি পুরুষমানুষকে, পুরুষমানুষটি আর মেয়েমানুষটি চিৎ আর উপুড় না হলে তারা এখানে আজ আসতো না? সঙ্গম ছাড়া এদের কেউ উৎপন্ন হয় নি?-এমন প্রশ্ন ভয়ঙ্কর প্রত্যাদেশের মতো রাশেদের মনে জাগতেই সে শুধু ভয়ই পেলো না, তার শরীর এবং ভেতরে কী একটা যেনো আছে, যেটাকে মনই বলতে চায় সে, দুটিই আঠালো আদিম তরল পদার্থের প্লবনে চটচট করতে লাগলো। কোটি কোটি সঙ্গমের দৃশ্য তার চোখের সামনে; চটের ওপর, মেঝের ওপর, খাটের ওপর, গলির অন্ধকারে, একতলায়, বস্তির ভেতরে, কুঁড়েঘরে, দোতলায়, দালানে, তেতলায়, শনের ঘরে, ঘেঁড়া পলিথিনের নিচে, ইস্টিশনে, ইটের পাঁজার ভেতরে শুধু নিরন্তর নগ্ন নোংরা সঙ্গম। মেয়েমানুষ পা ফাঁক করে দিয়েছে, ফাঁক করতে চাইছে না, তবু ফাঁক করছে, পুরুষমানুষ প্রলম্বিত একটি প্রত্যঙ্গ ভেতরে ঢুকোতে চেষ্টা করছে, ঢুকোতে পারছে না, পিছলে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে, ঢুকোচ্ছে বের করে আনছে, পারছে না, পারছে, শিথিল হয়ে পড়ে যাচ্ছে। খুব ঘিনঘিনে লাগছে রাশেদের, বারবার তরল পদার্থ ছরকে পড়ে পাঁচতলা দালান ভাঙা বাস রিকশা। দোকান প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অভিনেত্রীদের বক্ষদেশ প্লাবিত করে ফেলছে, সব কিছু চটচট করছে। কী সুখ পেয়েছিলো তারা? গড়িয়ে গড়িয়ে, রাশেদের সামনে, ভিক্ষে করছে। পাঁচটি অন্ধ, রাশেদ ভেবেছিলো তাদের ছেঁড়া চাদরটার ওপর একটা টাকা ছুঁড়ে দেবে, এখন আর দিতে ইচ্ছে করছে না; যদি সঙ্গমের ফলে উৎপন্ন না হতো ওরা, তাহলে। টাকাটা দিতো, পকেটে যা আছে সব দিয়ে দিতো। রাশেদ একটি মানুষ চায় যে সঙ্গমের ফলে উৎপন্ন হয় নি। এক মওলানা সাব, হয়তো নামের শুরুতে তার হজরত মওলানা শাহ সুফি রয়েছে, আতর কিনছেন, চোখে সুরমা পরেছেন, কালামকেতাব ছাড়া কিছু। জানেন না মনে হচ্ছে, আকাশ থেকে উৎপন্ন হলেই তাঁকে বেশি মানাতো, তিনিও ওই সঙ্গমের ফলেই উৎপন্ন, এবং তিনিও সঙ্গমযোগে উৎপাদন করেন? এমন এক পুণ্যবান ব্যক্তিকে উৎপাদন করার জন্যে ক-মিনিট সময় নিয়েছিলেন পিতা? দেড় মিনিটের বেশি নেন নি; তার মাতাকে ছালার ওপর ফেলে কয়েকবার জাতা দিয়েই হয়তো পয়দা। করেছিলেন, একটি পুণ্যবানকে, যার ফলে এখন গুলিস্থানের চৌরাস্তায় সুরমাপরে তিনি আতর কিনছেন। এই আতর গর্দানে মেখে মাগরেবের পর তিনি হয়তো একবার। সোহবত করবেন। তিনটা বাস দুটি ট্রাক খোটা চারেক ঠেলাগাড়ি ঢুকে গেছে একটা আরেকটার ভেতরে, কুকুরকুকুরির মতো, খুলতে সময় লাগবে; নীল আর লাল রঙের ট্রাক দুটির ড্রাইভার দুটির মুখের ওপর তাদের জনকজননীর ধস্তাধস্তির ছাপটা স্পষ্ট লেগে আছে। রাশেদের ঘেন্না লাগছে, সে জানে ঘেন্না লাগলে চলবে না; কেউ ঘেন্না। করে না এখানে, ঘেন্না করা পাপ, সবাই এখানে ভালোবাসে, রাশেদকেও ভালোবাসতে হবে। কিন্তু মানুষকে যে আর মানুষ মনে হচ্ছে না রাশেদের, মনে হচ্ছে অশ্লীল সঙ্গম, তার শরীর ঘিনঘিন করতে থাকে; দৌড়োতে ইচ্ছে হচ্ছে তার, সে এমন কোথাও যেতে চায় যেখানে সঙ্গম নেই, কিন্তু সে দৌড়োতে পারছে না, তাকে হাঁটতে হচ্ছে। সে উত্তর। দিকে হাঁটতে থাকে, আর দিকদিগন্ত থেকে উজ্জ্বিত লালা এসে পড়তে থাকে তার শরীরে।

আমি কি মানুষ ভালোবাসি না তাহলে, ঘৃণা করি মানুষ, রাশেদ জিজ্ঞেস করে। নিজেকে, অন্যরা কী করে এতো ভালোবাসে মানুষ, যেমন ভালোবাসে রহমত আলি, যে মানুষকে ভালোবাসার ধর্মে দীক্ষা নিয়ে দল থেকে দলে যাচ্ছে, দল বদলাচ্ছে, ওপর থেকে ওপরে উঠে যাচ্ছে, এবং নিরন্তর মানুষ ভালোবেসে চলছে? যখন সে আওয়ামিতে ছিলো, তখন মানুষ ভালোবাসতো সে প্রচণ্ডভাবে, মানুষ বলতে তখন সে বুঝতে বাঙালি, আর কিছু বুঝেতো না; পঁচাত্তরের পর সে দেখে আওয়ামিতে থেকে আর মানুষ ভালোবাসা সম্ভব হচ্ছে না, মানুষ ভালোবাসার জন্যে দল বদল দরকার, তখন সে দেখে জাতীয়তাবাদীতে থেকেই শুধু অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসা সম্ভব মানুষ, যে-মানুষ ক্ষমতার উৎস, মানুষ বলতে তখন সে বোঝে শুধু বাঙলাদেশি, বাঙালি আর তার কাছে মানুষ নয়, বাঙালি বলে কোনো মানুষ নেই; এখন অবশ্য সে কিছুদিনের জন্যে বিশ্রাম নিচ্ছে মানুষ ভালোবাসা থেকে, বাধ্য হয়েই সে বিশ্রাম নিচ্ছে, ক্লান্তিতে নয়; কিন্তু ভালোবাসা। তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না, বিশ্রাম নিতে পারছে না সে, মানুষকে ভালোবাসবে বলে। এরইমাঝে সে সেনাপতিদের সাথে যোগাযোগ সম্পন্ন করেছে। প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসা কখনো বিফলে যায় না, শতধারায় তা ফিরে আসে নিজের উৎসমুখে; রহমত আলির। বাড়িতে তা বারবার ফিরে এসেছে সহস্রধারায়, ওর বনানীর বাড়িটা দেখলে তা কিছুটা আঁচ করা যায়। মাত্র একটি রহমত আলিই যে মানুষ ভালোবাসছে, তা নয়; কয়েক। হাজার রহমত আলি আছে দেশে, যারা মানুষ ভালোবাসছে বলে মানুষ আজো আসতে পারছে গুলিস্থানের চৌরাস্তায়, ঢুকে যেতে পারছে একে অন্যের ভেতরে। কিন্তু রাশেদ মানুষ ভালোবাসতে পারছে না, রহমত আলির মতো জড়িয়ে ধরতে পারছে না মানুষ। রহমত আলি যদি আজ এখানে আসতো, তাহলে সে নিশ্চয়ই জড়িয়ে ধরতে ওই ভিখিরিগুলোকে, অন্ধ ভিখিরি ছেলেটাকে হয়তো কাঁধে তুলে আইস্ক্রিমই কিনে দিতো; কিন্তু রহমত আলি এখানে আসার সময় পায় না, আগে ভালোবাসার বক্তৃতা দিতে আসতো। কী করে আসবে, এখন তাদের প্রেম ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। জলপাইরঙপরা লোকগুলো, যাদের বুকে জেগেছে তীব্র ভালোবাসা, তারাও মানুষ। ভালোবাসতে চায়, এবং তারা মানুষের জন্যে একটি নতুন নাম খুঁজছে, বাঙালি বা বাঙলাদেশির মতো নষ্ট নামে তারা মানুষকে ভালোবাসতে চায় না, একটি অনাঘ্রাত নাম তারা শিগগিরই বের করে ফেলবে। রাশেদের নিজের প্রতিই মায়া হয়, সে যদি জড়িয়ে ধরতে পারতো ওই ট্রাকড্রাইভারটিকে, গাল ঘষতে পারতো ভিখিরিটার গালে, কোলে তুলে নিতে পারতো রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা অন্ধ শিশুটিকে, সেও সুখী হতে পারতো রহমত আলির মতো; তা সে পারছে না, নিজেকে তার ঘেন্না করা উচিত বলে মনে। হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে রাশেদ পবিত্ৰগৃহটির কাছাকাছি এসে যায়, তার শরীর কয়েকবার শিউরে ওঠে। ছেলেবেলা থেকেই পবিত্ৰগৃহের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার শরীর শিরশির ছমছম করে; দূর থেকে পবিত্ৰগৃত দেখলেই সে অনেকটা পথ ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু পেরে ওঠে না। পবিত্ৰগৃহটির দিকে তাকালে রাশেদের দু-রকম অনুভূতি হয়, মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকালে তার ভয় লাগে, আর মাথা নিচু করে। সামনের দিকে তাকালে খুব আনন্দ হয়। রাশেদ দেখতে পায় চারদিকে হাজার হাজার। মানুষ আনন্দে রয়েছে, তারাও মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাচ্ছে না, হয়তো ভয় পাবে বলে; তাই তারা সামনের দিকে তাকিয়ে খুব আনন্দে রয়েছে।

পবিত্রগৃহটির চারপাশে যারা আছে, তাদের মুখে পবিত্রতা দেখার খুব সাধ হচ্ছে রাশেদের। সে পবিত্র কিছু দেখতে চায়, অনেক দিন পবিত্র কিছু দেখে নি সে, কিছুক্ষণ আগে ট্রাকড্রাইভারদের মুখে, অভিনেত্রীদের স্তনের খাজে এতো অপবিত্রতা দেখে এসেছে যে পবিত্র কিছু না দেখলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তার নিজের মুখটিকেও কি খুব পবিত্র দেখাচ্ছে? হয়তো দেখাচ্ছে না, সে অনেক পাপ করেছে, কিছুক্ষণ আগেই। পবিত্র মানুষকে ঘৃণা করে সে বুক অপবিত্র করে ফেলেছে, তাই তার মুখ পবিত্র দেখাবে না; কিন্তু অন্যদের মুখ পবিত্র দেখাবে না কেনো? রাশেদ যার মুখের দিকেই তাকাচ্ছে, তার মুখই খুব অপবিত্র মনে হচ্ছে, পাপের দাগ লেগে আছে মুখে মুখে, যদিও রাশেদ ঠিক করতে পারছে না কার মুখে লেগে আছে কোন পাপের দাগ। ওই দাগ কি মোছা যায় না? নাকি অনেক মোছার পরও এটুকু রয়ে গেছে? খুব বেচাকেনা চলছে, এ-কাজটিই সবাই করছে পবিত্রভাবে; রাশেদ হাঁটতে পারছে না, প্রত্যেক ঘর থেকে ডাক আসছে, রাশেদ সাড়া দিতে পারছে না বলে নিজেকে অপরাধী বোধ করছে। রাশেদকে নিশ্চয়ই খুব বোকা দেখাচ্ছে, প্রত্যেক দোকানিই ভাবছে সে কিছু কিনবে, যদিও তার কিছু কেনার নেই; পারলে সে আজ সব দোকানের সব কিছু কিনে কোনো ভাগাড়ে সেগুলো জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দিতো। ওই আগুনের ভেতর থেকে হয়তো পবিত্রতা বেরিয়ে আসতো। রাশেদ যা কিছুর দিকে তাকাচ্ছে, তাই মনে হচ্ছে অবৈধ, প্রতিটি পণ্যকে মনে হচ্ছে পাপ। পাপ পণ্য হয়ে দোকানে দোকানে জ্বলছে। ওপরেই পবিত্রগৃহ, রাশেদ দাঁড়িয়ে আছে পবিত্ৰগৃহের তলদেশে, পবিত্রগৃহের তলদেশে এসব কী? একটা টেলিভিশন-ভিসিআরের দোকানের সামনে দাঁড়ালো রাশেদ, দাঁড়াতে বাধ্য হলো, রঙ আর সুরের উন্মাদনা তাকে ঘা মেরে থামিয়ে দিয়েছে; ওপরেই পবিত্ৰগৃহ, একটি বোম্বায়ি নায়িকা পর্দায় মাংসের রঙিন উৎসব শুরু করে দিয়েছে, ওপরেই পবিত্ৰগৃহ, তার শত শত স্তন দুলছে, শত শত উরু দুলছে, শত শত নিতম্ব দুলছে, বাহু দুলছে, কাম। দুলছে, বিশ্ব দুলছে, পবিত্ৰগৃহ দুলছে। রাশেদ আর দাঁড়াতে পারছে না, সে পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলো, বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে, কাম থেকে, ক্ষুধা থেকে, পণ্য থেকে, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে। সে বেরোবে উত্তরের পথটিতে; উত্তরের পথের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলো পথটি বন্ধ। রাশেদ ভয় পেয়ে গেলো। রাস্তার পুব। দিকে মঞ্চ, সেখান থেকে ওয়াজ করে চলছে একজন, হাজার হাজার টুপি আর পাঞ্জাবি আর মাথায় শাদা চাদর জড়ানো মানুষ তা শুনছে, চিৎকার করে উঠছে। ধার্মিকদের মাঝে রাশেদকে মানাচ্ছে না, তার মাথায় চাদর নেই টুপি নেই। ধার্মিকদের অনেকের হাতে লাঠি। দেশ থেকে সামরিক আইন উঠে গেছে হয়তো। না, এটা রাজনীতিক সভা নয়, এটা ইসলামি জলসা; কিন্তু যে-ওয়াজ করে চলছে, সে ধর্ম আর রাজনীতির সীমা মানছে না, ধর্মের সীমার বাইরে আর রাজনীতির সীমার মধ্যেই থাকতে পছন্দ করছে। দেশ থেকে কাফেরদের বিনাশ করে ফেলতে হবে, সে বলছে, মুরতাদদের গলা কাটতে হবে, সে ঘোষণা করে চলছে। সবাই আল্লাহু আকবর, নারায়ে তকবির বলে শ্লোগান। দিচ্ছে। সে বলছে, বাঙলাদেশ আমরা মানি না, একাত্তরে আমরা ভুল করি নাই, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা যারা বলব তাগ গলা কাটতে হইব। সমাজতন্ত্রের কথা যারা বলব, তাগ গলা কাটতে হইব। গণতন্ত্রের কথা যারা বলব, তাগ গলা কাটতে হইব। আমরা চাই ইসলামি শাসন। নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর। মঞ্চে তার মতো আরো জনদশেক বসে আছে, তারা হয়তো একই ঘোষণা দিয়েছে এবং দেবে, তাদের কারো। মুখেও কোনো পবিত্রতা নেই। কোনোদিন সম্ভব ছিলো না। একটু আগে দোকানে দোকানে যাদের দেখে এসেছে রাশেদ, এখন তাদের মুখগুলোকে অনেক পবিত্র মনে। হতে লাগলো তার; এ-মুখগুলোতে দেখতে পেলো রক্তের দাগ। ঠোঁটে রক্ত জিভে রক্ত দাতে রক্ত হাতে রক্ত। আরেকজন ওয়াজ করছে এখন; সে বলছে, সামরিক আইনকে। আমরা মোবারকবাদ জানাই। ইসলামের স্যাবা করলে আমরা তাদের সাথে সব সময়ই থাকব। দ্যাশে আমরা কোনো কাফের আর মুরতাদ রাখব না। যতোই শুনছে রাশেদ ততোই ভয় পাচ্ছে; একাত্তরে সে একসাথে এতো রাজাকার দেখে নি, রাজাকারদের এতো সাহসের সাথে ওয়াজ করতে দেখে নি। সামরিক আইনের সাথে চুক্তি করেই ওরা নিশ্চয়ই জলসা করছে, পয়সাটা সেখান থেকেই এসেছে হয়তো, তবে পয়সার। অভাব ওদের নেই, মরুভূমি থেকে পাইপের ভেতর দিয়ে গলগল করে ওদের দিকে পয়সা আসছে। একদিন ওরা দেশ দখল করবে। দেশে তখন মানুষ থাকবে না। দেশে তখন লাশের ওপর লাশ থাকবে। রাশেদ থাকবে না, রাশেদের লাশ থাকবে।

রাশেদ ভয় পাচ্ছে, হয়তো এখন তাকেই মুরতাদ ঘোষণা করে বসবে মঞ্চের মোষের মতো লোকটি, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না; তার হাত পা ছিঁড়েফেড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে ওরা। পশ্চিমেও যাওয়ার উপায় নেই, রাশেদ দক্ষিণে পা বাড়াতেই বোমা ফাটার শব্দ শুনতে পেলো। রাশেদ দৌড়ে একটি দোকানে ঢুকলো, দোকানদার তাকে ঢুকতে দিলো বলে কৃতজ্ঞ বোধ করলো রাশেদ। ঢুকলো আরো অনেকে। দোকানের দরোজা বন্ধ করে দেয়া হলো, ঝপঝপ করে দরোজা বন্ধ করার আওয়াজ উঠতে লাগলো। একের পর এক বোমা ফাটছে, আল্লাহু আকবর নারায়ে তকবির উঠছে, অসংখ্য লাঠির শব্দ উঠছে। একটি মুরতাদকে তারা ধরে ফেলেছে, চিৎকার শোনা যাচ্ছে মুরতাদ মুরতাদ, আল্লাহু আকবর বলে তারা মুরতাদের চোখ। তুলে ফেলছে, হাত টেনে ছিঁড়ে ফেলছে, পা ছিঁড়ে ফেলছে; মঞ্চ থেকে ঘোষণা হচ্ছে। মুরতাদদের অফিসে আগুন লাগান। রাশেদ দেখতে পাচ্ছে না, হাজার হাজার পায়ের। শব্দ শুনতে পাচ্ছে, বোমার শব্দ শুনতে পাচ্ছে, এরই মাঝে হয়তো মুরতাদদের পার্টির। অফিস দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে। হাজার হাজার বন্য পশুর পায়ের শব্দে আর হুঙ্কারে কেঁপে উঠছে চারদিক; ওই পশুদের চোখ নেই, ওই পশুদের পূর্বপুরুষদের চোখ ছিলো ওই পশুদের উত্তরপুরুষদেরও চোখ থাকবে না, ওরা মানুষ ছিঁড়েফেড়ে খাবে। যখন হুঙ্কার কমে গেছে, মুরতাদ মুরতাদ আর আল্লাহু আকবর শোনা যাচ্ছে না, তখন শোনা গেলো কয়েকটি গুলির শব্দ, রাশেদ বুঝতে পারলো ওদের কাজ শেষ হয়ে গেছে, পুলিশ এসেছে। এখন দোকান খোলা ঠিক হবে না, দোকানি জানালো, পুলিশ এখন দায়িত্ব পালন করবে; কিছু লোককে পেটাবে, দোকান খোলা দেখলে দোকানে ঢুকে পেটাবে, জিনিশপত্র ভাঙবে, কয়েকজনকে ধরবে। আধঘণ্টা পর দোকান খুললে রাশেদ বেরোলো, আবার সে উত্তর দিকেই এগোলো, সে দেখে যেতে চায় পশুরা কীভাবে কাজ করে। দোকানের পর দোকান ভাঙা, ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে দিকে দিকে, যেনো বর্বররা কিছুক্ষণ আগে এ-পথ দিয়ে চলে গেছে, রাস্তার একপাশে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত কালো হয়ে আছে। কারো ভেঁড়া হাত কি পড়ে আছে, পড়ে কি আছে কারো ছেঁড়া পা, মুণ্ডু? ওসব নেই, হয়তো ঘরে নিয়ে গেছে তারা। রাস্তার উত্তর পাশে কাফেরদের অফিসটির দক্ষিণ দিকটা ঝলসে গেছে, ভেতরে পুড়ছে কাগজপত্র চেয়ারটেবিল, ধুয়ো উঠছে, দেয়াল ভেঙে পড়ে আছে। রাশেদ পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলো। ওই দিকে পুলিশের ট্রাক, দূরে জলপাইরঙের ট্রাক, পথে এলোমেলো মানুষ। হঠাৎ একটু বাতাস এলো, বাতাস জানে না আধঘণ্টা আগের খবর, বাতাস খেলতে শুরু করলো পোড়া আর ছেঁড়া কাগজ নিয়ে। রাশেদ হাঁটছে, হেঁটে হেঁটে অনেক দূর যেতে হবে তাকে, আর তার আগে আগে উড়ে উড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে এক টুকরো পোড়া কাগজ, কাস্তেহাতুড়ির ছেঁড়াফাড়া একটি পোস্টার।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x