রাইফেলের নির্দেশে তুমি ফোঁটাচ্ছো
সামরিক পদ্ম, সাইরেনে কেঁপে নামাচ্ছো
বর্ষণ, নাচছো বৃষ্টিতে চাবুকের শব্দে, এক ম্যাগজিন–
ভর্তি হলদে বুলেট পাছায় ঢুকলে তুমি জন্ম দাও নক্ষত্রস্তবকের
মতো কাঁপাকাঁপা একটা ধানের শীষ। প্রকাশ্য রাস্তায় তুমি একটা লজ্জিত রিকশা ও
দুটো চন্দনা পাখির সামনে একটা রাইফেল-একজোড়া বুট-তিনটা শিরস্ত্রাণের সঙ্গে
সঙ্গম সারো;–এজন্যেই কি আমি অনেক শতাব্দী ধরে স্বপ্নবস্তুর
ভেতর দিয়ে ছুটে-ছুটে পাঁচশো দেয়াল-জ্যোৎস্না-রাত্রি–
ঝরাপাতা নিমেষে পেরিয়ে বলেছি, ‘রূপসী, তুমি,
আমাকে করো তোমার হাতের গোলাপ।’

মাঝেমাঝে কালঘুমে পায় রাশেদকে;–সে ঘুমিয়ে পড়ে যেনো মরে গেছে বা তার জন্মই হয় নি, যেনো মানুষ, সমাজ, সংঘ, বা পৃথিবীর কেউ সে নয়, যেনো সে ট্রাউজার বা পাজামা বা লুঙ্গিপরা বা নগ্ন মানুষদের, বা দেয়ালঘেরা দালান বা মানচিত্রিত রাষ্ট্রের কেউ ছিল না কখনো, ভবিষ্যতেও এদের কেউ থাকবে না; আর তখন তার চারপাশে, ঘুমভাঙা মানুষের জগতে, ঘটে যায় বড়ো কোনো ঘটনা, যাকে অনেক সময় ইতিহাস বলা হয়। তার ছেলেবেলায় প্রথম ঘটে এমন এক ঘটনা, যা আজো সে মনে করতে পারে, এবং কখনো ভুলবে না; হয়তো তারও আগে, যখন সে মায়ের বুকে তৃতীয় স্তনের মতোই লেগে থাকতো, তখনো ঘটেছে এমন ঘটনা, তবে তা সে আর মনে করতে পারে না। রাশেদ, তখন ছোটো ও একমুঠো, মসজিদের পাশের নানা রঙের কবরঘেরা ভীতিকরভাবে আকর্ষণীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে যেতে শুরু করেছে; তখন ঘটে আজকের মতোই এক ঘটনা, সেদিনও সে ঘুমিয়ে ছিলো যেনো তার জন্ম হয় নি, কখনো জন্ম হবে না। সে-রাতে আগুন লেগেছিলো পাশের বাড়িতে, চোতবোশেখে। চাষীদের বাড়িতে কুপি উল্টে বা চুলো থেকে বেড়ার খড় বেয়ে শিখা উঠে প্রায়ই যেমন আগুন লাগে। ওই আগুনে রাত দিনের মতো কড়কড়ে হয়ে উঠেছিলো, পুবপশ্চিম পাড়া থেকে মানুষ ছুটে এসেছিলো বালতি হাতে, যাদের অনেকে পানি ছিটানোর থেকে চিৎকারই করেছিলো বেশি, কেউ কেউ আগুনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো যেনো অন্ধ, সে-লকলকে অগ্নিকাণ্ডের সামান্য শব্দও তার কানে ঢোকে নি। পুবপুকুরের কাদামাটির মতো সে ঘুমিয়ে ছিলো। মা তার পাশে সারাক্ষণ বসে ছিলো, যদি আগুন তাদের বাড়ির দিকেও জিভ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে রাশেদকে কোলে করে যাতে উত্তরের পুকুরের পানি ভেঙে মাঠের দিকে যেতে পারে। মা রাশেদের ঘুম ভাঙায় নি, বরং সুখ পাচ্ছিলো একথা ভেবে যে তার শিশুপুত্র আগুনের খুব কাছাকাছি থেকেও অনেক দূরে থাকতে পারে।

আজকের চোতের রাতটিতেও ছেলেবেলার সে-রাতের মতোই ঘুমিয়ে ছিলো। রাশেদ, কিছুই টের পায় নি, তার ঘুমের ভেতরে কোনো বাস্তবতা আক্রমণ চালায় নি; যেমন একাত্তরের মার্চের বিভীষিকার রাতটিতেও সে আঠালো কাদার মতো ঘুমিয়ে। ছিলো। ঘুমকাতুরে সে নয়, ঘুমের মধ্যে কেউ তাকে ঠেলা দিলে প্রথমবারেই সে জেগে ওঠে, খুব স্বাভাবিকভাবে ঢোকে মানুষের জগতে; কিন্তু বড়ো বড়ো ঘটনার রাতে, যে-রাতে মানুষ বা প্রকৃতি বাস্তবায়িত করে কোনো চক্রান্ত, রাশেদ মানুষ ও প্রকৃতির সীমা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে জন্মের আগের অন্ধকারে। পঁচিশে মার্চের রাতে সে ঘুমোতে গিয়েছিলো সাড়ে দশটার দিকে; তার আগে সারাদিন এক বন্ধুর সাথে ঢাকা ভরে হেঁটেছে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামের অর্থ কী, তাতে রয়েছে কতোখানি ধাঁধা আর কতোখানি বস্তু, বের করার চেষ্টা করেছে; কেননা মুজিব-ইয়াহিয়ার নিরর্থক সংলাপ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে অথচ জনগণকে কিছু জানানো হয় নি, তর্ক করেছে এসব নিয়ে; সন্ধ্যের বেশ পরে বাসায় ফেরার সময় দেয়াল ভেঙে, গাছের গুঁড়ি, ইটপাটকেল জড়ো করে পাড়ার ছেলেদের পথ আটকাতে দেখেছে, মিলিটারি এলে এসব দিয়ে কততক্ষণ ঠেকানো যাবে, তা জানতে চেয়েছে দুর্দান্ত ছেলেদের কাছে, এবং রাত ভরে একটি স্বায়ত্তশাসিত বঙ্গীয় ঘুমের পর ভোরে জেগে উঠে মাকে জিজ্ঞেস করেছে, পুব দিকের আকাশে এতো ধুয়ো কেননা?

বসন্ত, অনেক দিন ধরে, এ-ধরনের একটি কবিতার পংক্তি পড়ার অনেক আগে। থেকেই, রাশেদের মনে হয়, খুব নিষ্ঠুর কাল। জংধরা পেরেকের মতো ডাল ফেড়ে যখন তলোয়ারের মতো সবুজ পাতা গজায়, লাল হলুদ হয়ে ওঠে ভিখিরির মতো গরিব গাছ, চারপাশে রাশেদ শুনতে পায় কাতর আর্তনাদ। নিষ্ঠুর বসন্ত আবার এসেছে, শেষ হয়ে এসেছে মার্চ, এবং কালঘুমে পেয়েছে রাশেদকে। গতরাতেও পাশের বাড়ির কাজের। মেয়েটির চিৎকারে সবার আগে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো, মেয়েটি দ্বিতীয় চিৎকার দেয় নি বলে সে আবার চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছিলো, কিন্তু আজ রাশেদ জ্বণে পরিণত হয়েছিলো, সকাল আটটা বাজার পরও ওঠে নি। সে চোখ খুললো যখন মৃদু তাকে ‘আব্বু’ বলে ডাকলো। চোখ খুলেই সে দেখলো মৃদু তার বিছানার পাশে জলের। ফোঁটার মতো টলমল করছে;-তার গায়ে ইস্কুলের পোশাক, কী চমৎকার পাখির ডানার মতো তার ঝুঁটি, একখনি উড়ে গিয়ে হয়তো বসবে কোনো পেয়ারা গাছে, কিন্তু সে। এমন টলমল করছে যেনো এখনি ঝরে যাবে। রাশেদের মনে হলো সে হয়তো কোনো মারাত্মক অপরাধ করে ফেলেছে মৃদুর কাছে। এভাবেই কোনো শেষ নেই তার। অপরাধের, মানুষ পাখি গাছপালা পোকামাকড় বাতাস মেঘ বিদ্যুৎ ঘাস খড়কুটো শ্যাওলা কলকজার কাছে সে এতো অপরাধ করেছে যে মৃদুর জন্মের সময়ই, ক্লিনিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে, সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো এ-অভিনব মানুষটির কাছে কখনো কোনো। অপরাধ করবে না। মৃদু গলে পড়ার আগেই রাশেদ মৃদুকে জড়িয়ে ধরে বললো, কী হয়েছে মৃদু? কে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে? মৃদু বললো, ওরা আমাকে ইস্কুলে যেতে দিলো কেনো? রাশেদ কিছুটা ভয় পেয়ে জোরে জিজ্ঞেস করলো, কারা? মৃদু বললো, মিলিটারিরা।

রাশেদ শক্ত হয়ে উঠে বসলো। দাদার হাত ধরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রতিদিনের মতো ইস্কুলে যাচ্ছিলো মৃদু, ইস্কুলে যাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে থাকে সে যেমন রাশেদ নিজেও থাকতো, কিন্তু গলি পেরিয়ে যেই বড়ো পথে তারা পা দিয়েছে, ট্রাক থেকে মিলিটারিরা রাইফেল উঁচিয়ে চিৎকার করে ওঠে। এর আগে মৃদু এমন মানুষ দেখে নি, তারা যে মানুষ তা বুঝতে বেশ সময় লাগে মৃদুর। দাদা তাকে বলে, এরা মানুষই, তবে মিলিটারি। মৃদুর মুখের দিকে তাকিয়ে দাদার মনে হয়েছিলো মিলিটারিরা যে মানুষ তা বুঝে উঠতে পারছে না মৃদু, তাই তিনি স্পষ্ট করে কথাটি বলেন। ওই মিলিটারিরা ধমক দিয়ে তাদের বাড়ি ফিরে যেতে বলে, চিৎকার করে বলে যে এগোলে গুলি করবে, বলে রাস্তায় নামা নিষেধ। একটা মিলিটারি আরো জোরে চিৎকার করে বলে দেশে সব কিছু বন্ধ, ইস্কুলও বন্ধ। মৃদু এতে খুব ভয় পায়, তবে ভয় পাওয়ার থেকে বেশি দুঃখ পায়। মৃদুর মুখে এক বড়ো অভিজ্ঞতার ছাপ, আজ সকালে সে বাইরে থেকে ইতিহাস মুখে করে নিয়ে এসেছে; সে এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে পাঁচ বছর বয়সেই, যার। কোনো ক্ষমা নেই, যার অশ্লীল দাগ কখনো মুছবে না। মৃদু দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছে, পাঁচ বছর বয়সেই তার দেশ তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে এমন দুঃস্বপ্নের গর্তে, যেখান থেকে সে কখনো উঠে আসতে পারবে না। মৃদুর ধারণা ছিলো ইস্কুলে যেতে কেউ কখনো। নিষেধ করে না, আজ পর্যন্ত তাকে কেউ নিষেধ করে নি; তার বিশ্বাস ছিলো রাস্তায় হাঁটতে কেউ কখনো নিষেধ করে না, আজ পর্যন্ত তাকে কেউ নিষেধ করে নি; বরং তাকে ইস্কুলে যেতে দেখে খুশি হয় সবাই, মৃদুর তাই মনে হয়; চকোলেট না কিনলেও রাস্তার মুদি তাকে দেখে হেসে হাত নাড়ে, অচেনা অনেকে রাস্তার ওপার থেকে এসে তার গাল টিপে দেয়। তার ধারণা ছিলো ইস্কুল বন্ধ করতে পারেন শুধু বড়ো আপা, আর কেউ পারে না। মিলিটারিরা তো ইস্কুলে পড়ায় না, তাদের তো সে কোনোদিন ইস্কুলে দেখে নি, তারা কেনো ইস্কুল বন্ধ করবে? খুব আহত বোধ করছে মৃদু, তার সুখ কেউ কেড়ে নিয়েছে তাকে না জানিয়ে, এটা সহ্য করতে পারছে না সে। রাশেদকে জড়িয়ে ধরে সে প্রশ্ন করতে থাকে, রাস্তায় হাঁটতে পারবো না কেন? রাশেদ বললো, মিলিটারিরা এসেছে, তাই। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, ইস্কুলে যেতে পারবো না কেনো? রাশেদ বললো, মিলিটারিরা এসেছে, তাই। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, মিলিটারিরা এলে সব বন্ধ হয়ে যায়? রাশেদ বললো, হ্যাঁ। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, পাখিদের ওড়াও বন্ধ হয়ে যায়? রাশেদ বললো, যা। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, ফুল ফোঁটাও বন্ধু হয়ে যায়? রাশেদ। বললো, হ্যাঁ। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, গান গাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়? রাশেদ বললো, হ্যাঁ। মৃদু জিজ্ঞেস করলো, বৃষ্টিও কি বন্ধ হয়ে যায়? রাশেদ বললো, হ্যাঁ। মৃদু জিজ্ঞেস। করলো, স্বপ্ন দেখাও বন্ধ হয়ে যায়? রাশেদ বললো, হ্যাঁ। মৃদু চিৎকার করে উঠলো, তাহলে দেশে কেনো মিলিটারি আসে? আর দেশে কি শুধু মিলিটারিরাই থাকবে? রাশেদ উত্তর না দিয়ে মুখ দেখছে মৃদুর, মুখের ভেতর দিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে মৃদুর রক্তাক্ত হৃদপিণ্ডটি, যেখানে বহু বেয়নেটের খোঁচা লেগে আছে। মৃদুর মুখটি হয়ে উঠেছে। বাঙলাদেশ, যার ওপর অজস্র বুটের অশ্লীল দাগ দগদগ করছে। মৃদু প্রশ্ন করে চলছে : মিলিটারি আমাদের রাইফেল দিয়ে মারতে চাইলো কেনো? বড়ো আপা তো ইস্কুল বন্ধ করে নি, ইস্কুল বন্ধ হলো কেনো, আব্বু? আমাদের ইস্কুলটি কি মিলিটারিদের? মৃদুর চোখের দিকে তাকিয়ে রাশেদের ভয় হলো, ওই চোখে সংখ্যাহীন প্রশ্ন দেখতে পেলো রাশেদ, মনে হলো মৃদু হয়তো অনন্তকাল ধরে প্রশ্ন করতে থাকবে। রাশেদ মৃদুকে কোলে জড়িয়ে ধরে মৃদুর গালে অনেকক্ষণ নিজের গাল লাগিয়ে রাখলো, নাকটি নেড়ে দিলো, তারপর বললো, মৃদু, আজ থেকে বাঙলাদেশের সব রাস্তা মিলিটারিদের। তোমার বইগুলো মিলিটারিদের। ছড়াগুলো মিলিটারিদের। কাজলা দিদি আর আমাদের ছোটো নদী মিলিটারিদের। আকাশ মিলিটারিদের। বাতাস মিলিটারিদের। পাখির গান মিলিটারিদের। তোমার নাচ আর হাসি মিলিটারিদের। বৃষ্টি মিলিটারিদের। আমাদের দেশটি মিলিটারিদের। মৃদু ফুঁপিয়ে উঠলো, আব্বু, আমি ইস্কুলে যাবো।

শেষমার্চের সকালবেলা মৃদুর চোখমুখে বুটের দাগ দেখতে পেয়ে রাশেদ বুঝেছে দেশে আবার ত্রাণকর্তারা এসেছে। সে মৃদুর কাছে অপরাধী বোধ করলে নিজেকে; মনে হলো যেনো সে-ই রাস্তায় রাস্তায় ট্রাকে ট্রাকে বসে আছে, সে-ই জলপাইরঙ পরে ট্রাক থেকে লাফিয়ে নেমে রাইফেল উঁচিয়ে ধরে ভয় দেখিয়েছে মৃদুকে, সে-ই জোর করে বন্ধ করে দিয়েছে মৃদুর ইস্কুল, সে-ই মৃদুকে লাথি মেরে দুঃস্বপ্নের খোড়লে ফেলে। দিয়েছে। সে বুঝলো জলপাইরঙের ত্রাণকর্তারা, কয়েক মাস ধরেই যারা আসি আসি করছিলো, এসেছে; সে উপলব্ধি করলো দেশে এক মহাপুরুষ, মহান ত্রাতা, জাতির। উদ্ধারকর্তা, গণতন্ত্ররক্ষাকারীর আবির্ভাব ঘটেছে আবার। রাশেদ, ছেলেবেলা থেকে, বেশ কয়েকটি মহাপুরুষের আবির্ভাব দেখেছে; তাদের নানা ছন্দের গোঁফ, বুকে বিচিত্র তারকা, আর প্যাঁচানো দড়ি দেখেছে। মৃদুকে জড়িয়ে ধরে রাশেদ আরেকটি মহাপুরুষের মুখ কল্পনা করতে লাগলো;–ওই ভাঁড়টিই কি এসেছে, রাশেদ নিজেকে প্রশ্ন করলো, যেটা কয়েক মাস ধরে খুব ছটফট করছিলো, ক্ষমতায় অংশ চাইছিলো? নানান রঙের প্রতিশ্রুতি শুনতে লাগলো রাশেদ, একের পর এক উৎকট ঘোষণা আর কুচকাওয়াজে তার কান ঘরঘর করতে লাগলো। আবার প্রচুর গণতন্ত্র পাওয়া যাবে, ভাবলো রাশেদ; বেতার-টেলিভিশনের বাক্সগুলো খুললেই গলগল করে আবার গড়িয়ে পড়বে গ্যালন গ্যালন গণতন্ত্র, দেশের রোগা পাছায় লাথি মেরে মেরে আবার তাকে ফুলিয়ে তোলা হবে। বাঙলাদেশ, তোমাকে অভিনন্দন, বললো রাশেদ, তুমি এতো মহাপুরুষ জরায়ু থেকে উগড়ে দিয়েছো! খুব প্রস্রাব পেলো রাশেদের। ভোরে জেগে যেমন প্রতিদিন তলপেটে চাপ বোধ করে আজকের চাপটা তার চেয়ে অনেক বেশি; সম্ভবত তার তলপেটে এরই মাঝে হাজার গ্যালন গণতন্ত্র, আর শান্তিশৃঙ্খলাউন্নতি ঢুকে গেছে। রাশেদ মৃদুর আম্মাকে ডাকলো, যে সকাল থেকেই পাশের ঘরে বসে বেতারে জলপাইরঙের ঘোষণা আর গোলাপি গোলাপি প্রতিশ্রুতি প্রাণভরে খাচ্ছিলো আর পান করছিলো, একা একা খেতে খেতে আর পান করতে করতে বমি বমি বোধ করছিলো। মমতাজ, মৃদুর আম্মা, একটি ছোটো রেডিও হাতে এসে বললো, জানো, সামরিক আইন জারি হয়েছে। আজ তাকে অফিসে যেতে হবে না বলে কণ্ঠে একটা ঢিলেঢিলে ভাব। এসেছে, তবে মুখে বমির ভাবটা বেশ স্পষ্ট। সে যদি একটা চমৎকার বমি করতে পারতো, বমিটা উগড়ে দিতে পারতো ওই সমস্ত ঘোষণার মুণ্ডুর ওপর, তাহলে স্বাভাবিক হয়ে উঠতো। রাশেদের বলতে ইচ্ছে হলো, তুমি একবার বমি করে এসো। প্রস্রাবটা খুব চেপে ধরেছে রাশেদকে, সে ওই চাপে প্রায় কথা বলতে পারছিলো না; শুধু বললো, প্রথম ওটা যাবে বালের ওপর দিয়ে।

মমতাজ বেশ শক্ত সংস্কৃতির মানুষ, জলপাইরঙের ঘোষণা মুখে বমি বমি ভাব এনে দিলেও তার সুরুচিকে নষ্ট করতে পারে নি; সে রুচিসম্পন্নভাবে রেগে উঠলো। বললো, তুমি ঘুম থেকে উঠেই অশ্লীলতা শুরু করলে। এমন শব্দ তোমাকে মানায় না। রাশেদ বললো, কোথায় অশ্লীলতা করলাম? মমতাজ বললো, ওই যে কীসের ওপর দিয়ে যাবে। বললে। রাশেদ বললো, আমার শব্দটি কি ওই ঘোষণাগুলোর থেকেও অশ্লীল? রাশেদের। অবশ্য খুবই অশ্লীলতা করতে ইচ্ছে করছিলো; বাঙালিরা বেশি রেগে গেলে প্রতিপক্ষের পেছনের দিকে কী একটা করার কথা বলে, পেছনটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে চায়, রাশেদেরও ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীর সমস্ত উর্দি খুলে পেছনের দিকে ক্রিয়া সম্পন্ন করার; কিন্তু তা না পেরে সে শুধু ওই শব্দটি উচ্চারণ করেছে। বাবার মুখে রাশেদ শব্দটি ছেলেবেলায় বারবার শুনেছে, বাবা রাগলেই চিৎকার করে ওই শব্দটি বলতেন; রাশেদ সাধারণত বাবার মতো চিৎকার করে শব্দটি বলতে পারে না, কিন্তু রেগে গেলেই মনে মনে চিৎকার করে ওঠে, বাল। প্রথম সে শব্দটির অর্থ বুঝতো না, বোঝার আগেই এটি তার রক্তে ঢুকে যায়। তাদের গ্রামের সবাই সবচেয়ে তুচ্ছ জিনিশ বোঝাতে ঘেন্নার সাথে উচ্চারণ করতো শব্দটি, সেও উচ্চারণ করতে চায়, কিন্তু পারে না বলে অসুস্থ বোধ করে। রাশেদ বললো, আমি চুলের কথা বলেছি। মমতাজ বললো, আমি জানি তুমি কীসের কথা বলেছে। আমাকে তুমি ভাষাবিজ্ঞান শেখাতে যেয়ো না। রাশেদ বললো, ছা-ম-রি-ক-ছা-স-ন! উর্দিপরা ভাঁড়! ওই যে ট্রাক ভরে বেরিয়ে পড়েছে, হাতে অস্ত্র, কিন্তু ওরা চুল ছাটার চেয়ে বড়ো কোনো কাজ করতে পারে না; ওদের। জেনারেলরাও পারে না। দেখবে ওরা রাস্তায় ছেলেদের লম্বা চুলের ওপর দিয়ে বিপ্লব করছে।

ওরা বিপ্লব নিয়ে আসে। ভাবতেই আবার প্রস্রাবের চাপটা প্রচণ্ড হয়ে উঠলো রাশেদের। ওরা রাতে আসে, আসার দিনটার নাম দেয় বিপ্লব দিবস; এসেই ওরা রাস্তায় ছেলেদের চুল ছাঁটে, মেয়েদের ঘোমটা পরায়। রাশেদ দেখতে পেলো ট্রাক থেকে লাফিয়ে নেমে কয়েকটি জলপাইরঙ একটি লম্বাচুলের ছেলেকে মাটিতে শুইয়ে ফেলেছে, দুটি জলপাইরঙ কাঁচি বের করে এদিকে সেদিকে হেঁটে ফেলছে ছেলেটির চুলগুলো। চুলই রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা রাশেদ দেখে আসছে ছেলেবেলা থেকে। চুলের ওপর ওরা এতো খাপ্পা কেনো? চুল কি বিদ্রোহের মুক্তির প্রতীক? নাকি ওরা চুল ছাঁটার থেকে। গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুর যোগ্য নয়? রাশেদের প্রস্রাবটা এখন আরো তীব্র; মৃদুকে মায়ের কোলে দিয়ে রাশেদ বাথরুমে ঢুকলো। সে মনে করেছিলো একটা বিশাল হ্রদ ঘুরপাক খাচ্ছে তার ভেতরে, কাসপিয়ান হ্রদের কথাই মনে পড়লো তার, ভেবেছিলো একটা জলপ্রপাত গমগম করে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু অন্যদিনের থেকে কোনো পার্থক্য ঘটলো না। অন্যান্য দিনের মতো মিনিটখানেক ঝমঝম করে সেটা বন্ধ হয়ে গেলো, তলপেটটি ভারী হয়ে রইলো; প্রপাতটি ভেতরে ভেতরে গর্জন করছে, আবার চেষ্টা করতে গিয়ে ভেতরটাকে মরুভূমির মতো শুষ্ক ঠেকলো। অনেকক্ষণ ধরে সে শিশি-শি আওয়াজ করলো, ছেলেবেলায় মা নিশ্চয়ই এ-মন্ত্রের সাহায্যে কাজটি সম্পন্ন করাতো, আজ যদি ওই মন্ত্রে কাজ হয় তাহলে সে রক্ষা পায়। কিন্তু সে দেখলো তার প্রত্যঙ্গটি স্মৃতিহীন, বাল্যকালকে একেবারেই মনে করতে পারছে না। রাশেদ তলপেটে একটা গর্জনশীল রুদ্ধ জলপ্রপাত নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। বেরিয়েই সে ড্রয়িংরুমে ঢুকে। টেলিভিশনে নতুন মহাপুরুষের মুখ দেখে বললো, বাহ, বেশ তো নিধিরাম সর্দার! দেশে একটা বেশ ছিঁচকে মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে। মহাপুরুষটি ত্রাতাত্রাতা মহান মহান ভাব করার চেষ্টা করছে, সম্ভবত মাস ছয়েক সে মহান মহান ত্রাতা ত্রাতা ভাবের রিহার্সেল দিয়েছে টয়লেটে বসে, বুকে তারাও শেলাই করেছে গণ্ডাখানেক, বাহু ঘিরে। দড়িও বেশ পেঁচিয়েছে, দু-কাঁধে তলোয়ারও ঝুলিয়েছে, কিন্তু ওকে একটা ভাঁড় বলেই মনে হচ্ছে। সুন্দর পলিমাটির দেশ বঙ্গ, ভড়ও মহাপুরুষরুপে দেখা দেয় এখানে, ভেবে হাসি পেলো রাশেদের। ওর পাশে দুটি ছোটো মহাপুরুষও রয়েছে, তারাও গাল ফুলিয়ে। খুব মহৎ ভাব করার চেষ্টা করছে, বুক ভরে চাকতি ঝুলিয়েছে; এমন ভাব করছে যেনো ওরা পাটখেত বা কচুরিপানার ভেতর থেকে আসে নি, ইলিশ বা পুঁটি ওরা কখনো দেখে নি, যেনো আকাশ থেকে দয়া করে নেমেছে। খুব হাসি পেলো রাশেদের। রাশেদ চোখ বড়ো বড়ো করে পর্দার খুব কাছে গিয়ে বড়ো মহাপুরুষ আর ছোটো মহাপুরুষ দুটিকে দেখতে চেষ্টা করলো। মমতাজ জানতে চাইলে সে অতো কাছে গিয়ে কী দেখছে; রাশেদ কোনো উত্তর দিলো না, আরো কাছাকাছি গিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। অনেকক্ষণ দেখে বললো, আমি ওদের উর্দিগুলো খুলে দেখার চেষ্টা করছি, ওরা বাঙালি কিনা, বাঙালি হলে মানুষ কিনা? এতো পোশাক আর দড়িতে ওদের ভালো করে দেখতে। পাচ্ছি না। ওদের আন্ডারওঅ্যারও খুলে দেখতে চাই। মমতাজ আবার আপত্তি জানালো, বললো, তুমি বড়ো অশ্লীল হয়ে উঠছে। কিন্তু রাশেদ যতোটা অশ্লীলতা করতে চায়, তা সে করতে পারছে না বলে তার সারাদেহ টনটন করতে লাগলো। অশ্লীলতা ছাড়া অশ্লীলতা থেকে মুক্তি নেই।

পর্দা জুড়ে এবার মহাপুরুষটিকে দেখানো হলো, খুব স্মিতগম্ভীর একটা ভাব করে আছে সে, যেনো গ্রাম্য বাঙালি কোনোদিন মহাপুরুষ দেখে নি, বাঙালিকে সে মহাপুরুষ দেখাচ্ছে। টেলিভিশনের পর্দা জুড়ে একটা ভড় দেখে রাশেদ জোরে জোরে হেসে। উঠলো, মৃদু হেসে উঠলো। মৃদু রাশেদের কাছে জানতে চাইলো লোকটাকে দেখে তো তার খুব হাসি পাচ্ছে, লোকটা নিশ্চয়ই খুব হাসাতে পারে, ওকে আগে টেলিভিশনে কেনো দেখানো হয় নি, দেখালে তো বেশ মজা হতো। রাশেদ মৃদুকে জানালো। এ-লোকটাই তার ইস্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। মৃদুর হাসি থেমে গেলো, তার মুখের ওপর। ফিরে এলো আগের দুঃস্বপ্ন; ঘেন্নায় বাকা হয়ে উঠলো মুখ যেনো সে লোকটার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিচ্ছে। রাশেদের তলপেটে তখন কাসপিয়ান ভারী হয়ে আছে, সে জানে না এ-ভার কবে নামবে। ছত্রিশ বছরের জীবনে সে অনেক বিপ্লব দেখেছে, দেশে দেশে সে বিপ্লবে ধ্বংস হয়েছে, আবার জেগে উঠেছে ধ্বংসস্তূপ থেকে; আজ দয়া করে আরেকটি বিপ্লব এসে তার তলপেট ভারী করে তুলেছে। বিপ্লব, রাশেদ উচ্চারণ করলো, লেফরাইট লেফরাইট বিল্পব! শব্দটির যুক্তবর্ণ দুটিকে একটু উল্টেপাল্টে বললো, বিল্পব, বিল্পব! রাশেদ ভাবতে চেষ্টা করলো বিপ্লব শব্দের অর্থ কী, তার মনে আবর্জনা উপচে উঠতে লাগলো; একবার অভিধান দেখবে কিনা ভাবতেই ভয় পেলো হয়তো শব্দটি সেখানে নেই। নিজেকে সে প্রশ্ন করলো, রাশেদ, বলো তো শেষরাতে বিপ্লব করতে। দরকার পড়ে কটা দস্যু? রাশেদের মতো ঘুমিয়ে ছিলো বাঙলাদেশও, জেগে উঠে ভোরে দেখতে পেয়েছে সে দস্যুদের অধিকারে। তার বন, নদী, ধানখেত, কুয়াশা, শিশির, দোয়েল, শাপলা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, সিলেট, মেঠোপথ, আল, মেঘ, রাড়িখাল, কোলাপাড়া, কামারগাঁও দস্যুদের বুটের নিচে। ওরা কি জন্মেছে বাঙলাদেশের জরায়ু থেকে, ওদের কি বুক থেকে মধুদুধ দিয়েছিলো বাঙলাদেশ, ওরা কি তার জলে সাঁতার কেটেছে, ভিজেছে তার বৃষ্টিতে? তার নিমের ছায়া কি কখনো পড়ে নি ওদের শরীরের ওপর, মাটির গন্ধ ঢোকে নি ওদের নাসারন্ধ্রে?

বুটের শব্দ শুনতে লাগলো রাশেদ, মনে পড়লো ছেলেবেলায় দেখা জীবনের প্রথম। বিপ্লবকে। দেখার মতো একটা মহাপুরুষ এসেছিলো সেবার, বিপ্লব সে জলবায়ু কাঁপিয়ে তুলেছিলো, রাশেদের সে-বছরই প্রথম পরিচয় হয় বিপ্লব শব্দটির সাথে। ওটি কোনো বইতে তখনো সে পায় নি, পাকিস্থানের সাবধান বইগুলো শব্দটিকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলো; কিন্তু ওই মহাপুরুষ বিপ্লবকে বন্য শুয়োরের মতো ঢুকিয়ে দিয়েছিলো তাদের গ্রামেও। রেডিও ছিলো না গ্রামে, সংবাদপত্রও যেতো না, কিন্তু অক্টোবর মাসে। সেখানে মহাসমারোহে গোঁ গোঁ করতে করতে হাজির হলো বিপ্লব। মহাপুরুষদের ছবি দেখা প্রিয় অভ্যাস ছিলো রাশেদের, বিদ্যাসাগর নামের মহাপুরুষটির প্রতি তার খুব। আবেগ জেগে উঠছিলো; তাঁর অনেক ছবি–একই ছবির অনেক কপি নানা বইপত্র থেকে কেটে সে সংগ্রহ করেছিলো, রাশেদ দেখলো পাকিস্থানের মহাপুরুষ তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন; মহাপুরুষ সম্পর্কে ধারণাই বদলে গেলো রাশেদের। তার মনে হলো এটি মহাপুরুষ হলে বিদ্যাসাগর পুরুষও নন, আর বিদ্যাসাগর যদি মহাপুরুষ হন, তাহলে এটা দস্যু। এমন ভাবতে তার ভয় হচ্ছিলো, সে বুঝতে পারছিলো এমন ভাবা বড়ো অপরাধ, কেউ জানতে পারলে তার শাস্তি হয়ে যাবে, তবে কয়েক দিনের মধ্যে ইস্কুল ও বাজারের দেয়ালে দেয়ালে দস্যুটির এতো ছবি দেখতে পেলো যে রাশেদের বিশ্বাস জন্মালো এই প্রথম সে একটি খাঁটি মহাপুরুষ দেখলো। মহাপুরুষদের বিশাল বিশাল ছবি আর গোঁফ দেখে রাশেদ মুগ্ধ হলো যখন সে দেখলো যে সবাই তার আগেই মুগ্ধ হয়ে গেছে। রাশেদ একদিন বাজারে যখন মুগ্ধ হয়ে পাকিস্থানের ওই মহাপুরুষদের ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলো, একটি কুকুর তাড়া খেয়ে এসে ছবিটি দেখে খুব মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কুকুরটি হয়তো ক্লান্ত হয়েই দাঁড়িয়ে পড়েছিলো, এমনও হতে পারে কুকুরটি নিজের সামনে একটি অদ্ভুত জন্তু দেখে ভয় পেয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছিলো, তবে রাশেদের মনে হয় যে মহাপুরুষ চিনতে কুকুরও ভুল করে না। বাজারের পুবধারের। চায়ের দোকানের বেড়ার গায়ে ঝোলানো ছিলো পাকিস্থানের ওই মহামানবের বিশাল ছবি। বাজারে গেলেই রাশেদ ওই ছবিটা দেখতো; মহাপুরুষের গোঁফ, বুকভরা তারা, কাঁধের ওপর থেকে সামনের দিকে বাঁধা দড়ি দেখে সে মুগ্ধ হতো, আবার ভয়ও পেতো। তখন এক বুড়ো, যাকে রাশেদ সব সময় চায়ের দোকানেই বসে থাকতে দেখতো, বলেছিলো, কী দ্যাখছো ভাইস্তা, খানের ব্যাডা বাঙ্গালিগো এইবার পাদাইয়া ছাড়বো। লোকটিকে খুব সন্তুষ্টই মনে হয়েছিলো, পারলে সে নিজেই পাদাতো বাঙালিদের, কিন্তু, পারছে না; তার হয়ে পাদাবে ওই মহাপুরুষ।

আবর্জনার বাক্স থেকে উপচে পড়ছে আবর্জনা। রাশেদ শুনতে পেলো : যেহেতু দেশে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যাতে অর্থনৈতিক জীবনে নেমে এসেছে অচলাবস্থা, বেসামরিক প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারছে না, সকল স্তরে যথেচ্ছ দুর্নীতি। জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, ফলে জনগণ অসহনীয় দুর্দশায় পড়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিপজ্জনক অবনতি ঘটেছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, যেহেতু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে কষ্টার্জিত দেশকে সামরিক আইনের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে, অতএব আমি সর্বশক্তিমান আল্লার সাহায্য ও করুণায় এবং আমাদের মহান দেশপ্রেমিক জনগণের দোয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাঙলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিশেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাঙলাদেশ সরকারের সকল ও পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহন করছি এবং ঘোষণা করছি যে গোটা। বাঙলাদেশ অবিলম্বে সামরিক আইনের আওতায় আসবে। রাশেদ ঘোষণা শুনতে শুনতে অনুভব করলো যে ওগুলো ক্রমশ তার প্রস্রাবে পরিণত হয়ে তলপেটে জমা হচ্ছে। একেবারে পুরোনো ছকবাঁধা আবর্জনা, কোনো অভিনবত্ব নেই; সুই পুরোনো অর্থনীতি, আর শান্তিশৃঙ্খলা, জাতীয় স্বার্থ আর নিরাপত্তা, দেশপ্রেম আর আল্লা! বদমাশরা যদি বলতো যে দেশটাকে আমরা পাদিয়ে দিতে চাই, তাই ক্ষমতা দখল করছি, তাহলেও বোঝা যেতো ভেতরে কিছু আছে, কিন্তু ভাঁড়গুলো এসেছে, রাশেদ ভাবলো, শুধুই ক্ষমতার জন্যে। পর্দায় অনেকগুলো তারকাখচিত দড়িপাচানো উদরপ্রলম্বিত জেনারেল দেখা গেলো; পেটের অবস্থা দেখেই রাশেদ বুঝলো দেশ দখল করা ছাড়া করার মতো ওদের কোনো কাজ নেই। কাজ থাকলে পেট এমন ফুলে উঠতে পারে না, অনেক দিন ধরে হয়তো তারা ওই পেটের জন্যে কামও করতে পারে নি।

সেই পরিচিত ভাঁড়টিই ক্ষমতা দখল করেছে, এখন সে দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তার সঙ্গে আরো দুটি ছোটো ভাঁড়ও রয়েছে। সে এখন বাঙলার সম্রাট সুলতান শাহানশাহ, তার ক্ষমতার শেষ নেই; সে সংবিধান স্থগিত করেছে, বাতিল করেছে সংসদ ও সরকার, এবং পুরোনো প্রেসিডেন্টটিকে না মেরে আলুর বস্তার মতো বাড়িতে ফেলে দিয়ে এসেছে। ওই বুড়োটা হয়তো এরই মধ্যে ক্ষমতা হারানোর শোকে মারা গেছে। মরুক সেটা, রাশেদের কিছু যায় আসে না, দেশের কারোই কিছু যায়। আসে না, অনেক আগে মরলেই ভালো হতো; তবে সেটাকে এখনো যদি ডেকে এনে ওরা আধটুকরো গোশত দেয়, তাহলে সে ওদের ‘স্যার, স্যার’ করবে; কিন্তু ভাঁড়টা এখন ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের আল্লাতাল্লা। রাশেদ ঘোষণা শুনতে পেলো : আমি যে কোনো ব্যক্তিকে দেশের প্রেসিডেন্ট মনোনীত করতে পারি, যিনি বাঙলাদেশের প্রধান। বিচারপতি অথবা আমার মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের যে কোনো বিচারপতির কাছে শপথ গ্রহণ করে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। আমি সময়ে সময়ে এমন মনোনয়ন বাতিল বা। রদ করতে পারি এবং আরেক ব্যক্তিকে বাঙলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনোনীত করতে পারি। আমার মনোনীত প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপ্রধান হবেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকরূপে। আমার উপদেশ অনুসারে কাজ করবেন এবং আমি তাকে যে-সব দায়িত্ব দেবো, তা পালন করবেন। রাশেদ একটা চাকর নিয়োগের ঘোষণা শুনলো, সে জানে বাঙলায়। এখন ওই চাকরের পদটির জন্যে অনেকের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে; কোনো একটা বিচারপতিকে হয়তো সে এর মাঝেই নিজের চাকর হিশেবে পেয়ে গেছে। দু-এক দিনের মধ্যেই দেখা যাবে একটি ঝুঁটিপরা বিচারপতি আরেকটিকে শপথ করাচ্ছে। চাকরের পদে। শপথটি হবে আমি ভড়ের চাকর হিশেবে শপথ করছি যে মহাভাঁড় আমাকে যে-আদেশ দেবেন, তাই আমি পালন করবো; যদি তার বুট চাটতে বলেন, আমি আনন্দের সাথে চাটবো; যদি তার আন্ডারওঅ্যার ধুতে বলেন, আমি ধুয়ে দেবো; যদি পা মর্দন করতে বলেন, তাহলে তার পবিত্র পদযুগল মর্দন করে ধন্য হবো; যদি ট্রাউজার খুলে…

দেশটিকে এখন ভাগাভাগি করা হচ্ছে, কুমড়োর ফালির মতো চাক চাক করা হচ্ছে, রাশেদ তার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। রাশেদ শুনতে পেলো বড়ো ভাঁড়টির নিচে নিয়োগ করা হয়ে গেছে দুটি উপপ্রধান ভাঁড়, সে-দুটির বুকফোলানো ছবিও দেখানো হলো, তারা এমনভাবে বুক ফোলানোর চেষ্টা করলো যে টেলিভিশনের পর্দাটি একবার কেঁপে উঠলো, চড়চড় আওয়াজ হলো। একটি ঘোষক ব্যাঙের ফুর্তিতে গলা ফুলিয়ে ঘোষণা করলো সারা দেশকে পাঁচটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে; ক অঞ্চলে জেনারেল করমালি, খ অঞ্চলে জেনারেল খরমালি, গ অঞ্চলে জেনারেল গরমালি ইত্যাদি শুনতে পাচ্ছে রাশেদ। জেনারেল জেনারেল জেনারেল, জেনারেল জেনারেল জেনারেল, জেনারেল জেনারেল জেনারেল, জেনারেল জেনারেল জেনারেল, লেফটেনেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল, লেফটেনেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল, লেফটেনেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল, শুনতে শুনতে তার খুব অদ্ভুত অনুভূতি হলো। তার তলপেটে একটি নিম্নমুখি চাপ আর বুকের দিকে একটি ঊর্ধ্বমুখি বমির চাপ তাকে একসাথে আক্রমণ করলো, দুটি বিপরীতমুখি চাপে তার এমন অনুভূতি হলো, যার সে নাম দিলো জেনারেলস্রাব। অভিনন্দন বাঙলাদেশ, রাশেদ বললো, জেনারেলজননী, জেনারেলগর্ভা বঙ্গ, অভিনন্দন। তোমার রূপের সত্যিই সীমা নেই, তোমার এতোটুকু জরায়ুতে এতো জায়গা, মাতা? রাশেদ একটি দৃশ্য দেখতে পেলো, মাতা বাঙলাদেশ রাস্তার পারে কাতরাচ্ছে। প্রসববেদনায়, আর তার জননাঙ্গ ট্যাংক দিয়ে ঠেলে ছিঁড়েফেঁড়ে বেরোচ্ছে একের পর এক সানগ্লাসপরা জেনারেল, আর জেনারেল, আর জেনারেল।

টেলিভিশন থেকে গলগল করে পড়ছে গণতন্ত্র, ঝরঝর করে ঝরছে শান্তিশৃঙখলা, তরতর করে চড়ছে অর্থনীতি;–পড়ার, ঝরার, চড়ার নানা রকম শব্দে তার অস্তিত্ব। পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগলো। দেশ জুড়ে এখন সান্ধ্য আইন; বারো কোটি বাঙালির। মতো রাশেদ বন্দী হয়ে আছে স্কুপ স্থূপ মিথ্যার মধ্যে, টেলিভিশনের নোংরা যন্ত্রটি কোনো কুৎসিত প্রাণীর মলত্যাগের মতো মিথ্যাত্যাগ করে ঢেকে ফেলছে তাকে, সারা দেশ মিথ্যার মলে ঢেকে যাচ্ছে। চারপাশে এখন আর কোনো সত্য নেই, দেশে কোনো সত্য আর উচ্চারিত হবে না, মিথ্যাই আধিপত্য করবে সত্যের মুখোশ পরে। রাশেদের ছেলেবেলায় প্রথম পুরব বাঙলার শ্যামলিমায় পঞ্চনদীর তীরে অরুণিমায় দেখা দিয়েছিলো এমন মিথ্যা, আবির্ভূত হয়েছিলো খানের পর খান, পাকিস্থান হয়ে উঠেছিলো খানস্থান; খানের পর খান ভাগ করে নিয়েছিলো জন্মদ্বিখণ্ডিত অদ্ভুত দেশটিকে। আইউব, আজম, ওমরাও প্রভৃতি রোমহর্ষক খানে ভ’রে গিয়েছিলো পাকিস্থান। পূরব বাঙলায় অর্থাৎ রাশেদের ছেলেবেলার জগতের দিকে দিকে সাড়া পড়ে গিয়েছিলো; তারা কেউ তখনো মিলিটারি দেখে নি, বাজারের উত্তর কোণে পান বেচতো যে-লোকটি, পুবপাড়ার যে-বারেক গ্রাম ছেড়ে কখনো শহরে যায় নি, পাকিস্থান বলতে যে বুঝতো তার গরুগুলোকেই, বা তার গরুগুলোর গোবর যার কাছে অনেক বেশি সত্য আর পবিত্র ছিলো পাকিস্থানের থেকে, তাদের ভূগোলের স্যার বা ইস্কুলের ঘণ্টা বাজাতো। যে-দপ্তরি, তারা কেউ মিলিটারি বা আইউব খানকে দেখে নি, কিন্তু তাদের মনে যে সাড়া পড়ে গিয়েছিলো, রাশেদ তা বুঝতে পেরেছিলো। তাদের চাকরটিও খুশি হয়ে। বলেছিলো, দাদা, আইউব খার চ্যাহারা দেহার মতন। এক মাঝির খুশির চিৎকার আজো তার কানে বাজে : দ্যাশে মার্শাল ল আইন আইছে। মেষপাল যখন দূরে নেকড়ের গলার আওয়াজ শুনতে পায়, তখন এমনই খুশি হয়।

রাশেদ তখন প্রায়ই উঁকি দিতো ইস্কুলে স্যারদের বসার ঘরে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে শুনতো স্যারদের কথা, মনে হতো স্যাররা খুব খুশি হয়েছেন খানরা আসায়। প্রায় সব স্যারই বলতেন, পাকিস্থান বাচলো; শুধু সহকারী হেডমাষ্টার স্যার, যিনি পড়াতেন সবচেয়ে ভালো এবং হিন্দু ছিলেন, তিনিই শুধু বলতেন, পাকিস্থান এবার মরলো। রাশেদ বুঝে উঠতে না দেশটিকে কী রোগে ধরেছিলো, কিন্তু বাঁচামরার কথা। শুনে শুনে সে বুঝেছিলো পাকিস্থানকে এমন রোগে ধরেছে, যার পরিণতি বাঁচা বা মরা; তবে মরার সম্ভাবনাই বেশি। খুব ভয় লাগতো তার, কেননা তার ছেলেবেলায় মৃত্যুই ছিলো স্বাভাবিক ঘটনা; কলেরা ও বসন্তে সে ঘনঘন মৃত্যুর কথা শুনেছে, একটা। দেশকেও কলেরা বা বসন্ত বা যক্ষ্মা রোগে ধরতে পারে বলে মনে হতো তার। অনেক দিন, পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার পর থেকেই সে একটি ভয়ের মধ্যে রয়েছে, যা সে কারো কাছে প্রকাশ করে নি, কিন্তু সে একটি মানচিত্রে দেখেছিলো পাকিস্থানের এ-দিকটা এই দিকে ওই দিকটা ওই দিকে, পাকিস্থানের দুটি টুকরো আছে, কোনো শরীর নেই। তাহলে পাকিস্থান কি একটা ভূত, এমন প্রশ্ন জেগেছিলো তার মনে, সে শুনেছে ভূতদেরই শরীর থাকে না। কিন্তু সব স্যারই তো, শুধু এক স্যার ছাড়া, বলছেন পাকিস্থান বাচলো; তাতে সে একটু স্বস্তি পেয়েছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বস্তি থাকে নি, কেননা তার বিশ্বাস ছিলো সহকারী হেডস্যার যেহেতু সবচেয়ে ভালো পড়ান, অঙ্ক করতে কখনো ভুল করেন না, তাই তাঁর কথাই শেষে ঠিক হবে। স্যারদের ঘরে একটি কালিমাখা পত্রিকা আসতো, যার অনেক কিছু পড়াই যেতো না, রাশেদ দেখেছিলো বড়ো বড়ো অক্ষরে প্রতিদিন ছাপা হতো আইউব খানের নাম, আর ছবি। এভোবড়ো ছবি আর কারো ছাপা হতো না পত্রিকাটিতে; এবং তার ছবির নিচে লেখা হতো জাতির রক্ষাকর্তা, মহান ত্রাণকর্তা, আরো অনেক কিছু।

বাঙালি এমন জাতি, যে নিজেকে ঘৃণা করে; আর বাঙালি মুসলমান এমন জাতি, যে পশ্চিম থেকে কোনো বড়ো দেহের জন্তু এলেও তাকে খুব শ্রদ্ধা করে, নিজেকে তো ঘৃণা করেই। রাশেদের মনে আছে তার শিক্ষকেরা, গ্রাম ও বাজারের বুড়োরা বড়ো বড়ো খানদের দেহ আর নামের প্রশংসায় পাগল হয়ে উঠেছিলো। এক স্যার আইউব খানের ছবি দেখিয়ে তাদের বলেছিলেন, চেহারাটা দ্যাখছস, পাঠানের বাচ্চা। এরা না অইলে। পাকিস্থান রাখবো কি বাঙ্গালিরা? নিজেকে খুব অসহায় বলে মনে হয়েছিলো রাশেদের; এবং কয়েকদিন পর তাদের থানার বাজারে দলে দলে খাকিপরা মিলিটারি আছে। মিলিটারি এসেই বাজারের বড়ো বড়ো দোকানদারদের ধরে, তাদের কী অপরাধ তারা জিজ্ঞেস করারও সময় পায় না; মিলিটারিরা তাদের একেকজনের কাঁধে দু-তিনমণি বোঝা তুলে দেয়। বোঝা কাঁধে নিয়ে তাদের দৌড়োতে বলে, কিন্তু ওই বোঝা নিয়ে দাঁড়ানোই ছিলো অসম্ভব; দোকানদাররা বোঝার নিচে চাপা পড়ে, আর পাকিস্থান। রক্ষাকারীরা তাদের ওপর চাবুক চালায়। দূর থেকে পাকিস্থান রক্ষার এ-দৃশ্য দেখে অনেকে পাকিস্থান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে ওঠে। তারপর তারা ধরে আনে সে-সব শয়তানদের, যারা রাজনীতি করে, যারা পাকিস্থানকে ডুবিয়ে দিচ্ছে; ধরে এনে। চৌরাস্তায় ন্যাংটো করে চাবুক মারে। পাকিস্থান বাঁচানোর প্রক্রিয়া দেখে চারপাশের সবাই এতো মুগ্ধ হয় যে বাজারের মৌলানা সাহেবের ইমামতিতে এক বড়ো। মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

রাশেদ ও তার বন্ধুরা ভয় পেতে লাগলো হয়তো মিলিটারি একদিন তাদের ক্লাশে এসে তাদের কাঁধেও বোঝা তুলে দেবে, হয়তো বড়ো বড়ো-বেঞ্চ তুলে দেবে, তারা না পারলে চাবুক মারবে; তবে তারা আসে নি, আসে তাদের আইন। হেডমাষ্টার একদিন জানান সামরিক নির্দেশ এসেছে তাদের সকলকে একেবারে বাটিছাটা করে চুল ঘেঁটে আসতে হবে। তারা সবাই চুল হেঁটে মাথা প্রায় চুলশূন্য করে তোলে, তাদের ক্লাশগুলো অদ্ভুত দেখাতে থাকে; এ-অবস্থা দেখে সহকারী হেডমাষ্টার স্যার বলেন, মাথাকে যে তোরা একেবারে পাকিস্থান বানিয়ে ফেলেছিস! তাদের চুলের ওপর দিয়ে সামরিক আইন চলে গেছে ভেবে যখন রাশেদ ও তার বন্ধুরা কিছুটা নিশ্চিন্ত হচ্ছিলো, তখন, চুল ছাঁটার একদিন পরেই, হেডমাষ্টার জানান সামরিক নির্দেশ এসেছে যে প্রত্যেককে বাড়ির চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করে ঘরবাড়ি ঝকঝকে করে ফেলতে হবে। পাকিস্থানে কোনো জঙ্গল থাকবে না; পাকিস্থানকে উর্দির মতো ইস্ত্রি করতে হবে, গোঁফের মতো ছাঁটতে হবে, বুটের মতো পালিশ করে ফেলতে হবে। গ্রামে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো দেশে সামরিক আইন জারি হয়েছে, জেনারেল মোহাম্মদ আইউব খান পাকিস্থান রক্ষা করেছেন, সামরিক আইনের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা চলবে না, যে-আদেশ দেয়া হয় তা মেনে চলতে হবে, এবং বাড়ির ময়লা আর জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ঘোষণায় বারবার চাবুক মারার কথা বলা হলো, প্রতিটি অপরাধের জন্যে চাবুকের। সংখ্যাও জানিয়ে দেয়া হলো। রাশেদ বুঝলো পাকিস্থানে আছে দুটি জিনিশ, একটি অপরাধ আরেকটি চাবুক; পাকিস্থানি মাত্রই অপরাধী, ও তার প্রাপ্য চাবুক। পাকিস্থানকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি পাকিস্থানিকে আচ্ছা করে চাবুক মারতে হবে, গায়ের ছাল তুলে। ফেলত হবে, গলা দিয়ে রক্ত বমি করাতে হবে, পেছন দিয়ে মল বের করতে হবে, তবেই পবিত্র পাকিস্থান বাঁচবে। তাদের গ্রামের দাগু জোলা থানার হাটে কাপড় বেচতে গিয়ে রাস্তায় থুতু ফেলেছিলো, তার পিতামহ থেকে সে ও সবাই চিরকাল নিশ্চিন্তে থুতু ফেলে এসেছে, মনে করেছে থুতু ফেলা তাদের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত, সে জানতো না যে থুতু ফেলা সামরিক আইনের ধারাভুক্ত হয়ে গেছে। দাগু রাস্তায় থুতু ফেলার অপরাধে পঁচিশ ঘা চাবুক খেয়ে সাত দিন ধরে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকে, অন্যরা পাকিস্থানকে সুস্থ রাখার জন্যে থুতু গিলে ফেলার অভ্যাস করতে থাকে।

মিলিটারি দেখতে সবার আগে যারা থানায় গিয়েছিলো, যারা পাকিস্থান রক্ষার প্রক্রিয়া চোখে দেখে ধন্য হতে চেয়েছিলো, তাদের অন্যতম ছিলো কবুতরখোলার সবচেয়ে নামজাদা পাগলটি, সামরিক আইন জারির আগে যে ওই এলাকায় আইউব খানের থেকেও বিখ্যাত ছিলো, যার মাথায় ছিলো ঝোঁপের মতো চুল, যার জন্যে সে। বিশেষ মর্যাদা পেতো, এবং অন্যান্য পাগলেরা সমীহ করতো। সে শ্রীনগর গিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিলিটারিদের সামনে দাঁড়ায়, এবং তার স্বভাবসুলভ বিখ্যাত সালামটি দেয়। সে। যখন খাঁটি মুসলমান সেপাইদের কাছ থেকে অলাইকুমের আশায় দাঁড়িয়ে ছিলো, তখন দুটি মিলিটারি দু-দিক থেকে তাকে রাইফেলের গুতো মেরে মাটিতে ফেলে দেয়, এবং ন্যাংটো করে এক এক করে দশটি চাবুক মারে। সে তিন দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে। থাকে, শ্রীনগরে লোক যাওয়াআসা বন্ধ হয়ে যায়, এবং সারা এলাকার লোকজন তাদের প্রিয় পাগলের অবস্থার কথা শুনে অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মিলিটারিরা দোকানদারদের কাঁধে বোঝা চাপানোয় যারা খুশি হয়েছিলো, ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে চাবুক মারাতেও যারা ক্ষুব্ধ হয় নি, বরং খুশিই হয়েছিলো, পারলে অনেক আগে তারা। নিজেরাই চাবুক মেরে তার পিঠ ছুলে ফেলতো, কিন্তু তাদের প্রসিদ্ধতম পাগলকে চাবুক মারায় তারা মনে মনে ক্ষুব্ধ বোধ করতে থাকে। তবে তাদের করার কিছু ছিলো না, তারা যা করতে পারতো তাই করে, তারা শ্রীনগরে যাওয়া যথাসম্ভব কমিয়ে দেয়; এবং পাকিস্থান কীভাবে রক্ষা পাচ্ছে তাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। পাকিস্থানের থেকে গায়ের চামড়াকে তারা অনেক বেশি ভালোবাসতে শুরু করে।

রাশেদ, ও তাদের কাজের ছেলেটি, তখন ব্যস্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নির্দেশ বাস্তবায়নে, যা অবিলম্বে বাস্তবায়িত না হলে পাকিস্থান বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। ইস্কুল থেকে পাকিস্থানের মহান ত্রাতার যে-ছবিটি সে পেয়েছিলো, সেটি সে লাগায় উত্তরের ঘরের বেড়ার গায়ে; ছবিটি দেখলেই মনে হতো পাকিস্থানের উদ্ধার হয়ে গেছে, বাকি। শুধু তাদের বাড়ির উত্তর দিকে যে-জঙ্গল গজিয়েছে, গোয়াল থেকে গোবর উছলে পড়ে পাকিস্থানকে যেটুকু নোংরা করেছে, তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফেলা। ওইটুকু পরিচ্ছন্ন করতে পারলে পাকিস্থানের কোনো চিন্তা নেই, হাজার বছর তো টিকবেই, তারও বেশি টিকতে পারে, কিন্তু কথা হচ্ছে টিকবে তো? তাদের বাড়ির উত্তরপশ্চিম দিকে ছিলো। গোয়ালঘর, তার পুবে একটি বরইগাছ, তার পুবে কচু-ছিটকি-তেলাকুচের জঙ্গল, খুব বেশি নয়, পাকিস্থানকে বিপন্ন করার মতো নয়, তবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কেননা শুরু থেকেই পাকিস্থান বিপন্ন। পাকিস্থানে সব কিছুই সন্দেহজনক, সব কিছুই ষড়যন্ত্র করে চলছে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে; তাই ওই জঙ্গল আর তার ভেতরের পোকামাকড়ও ছিলো অত্যন্ত সন্দেহজনক, কে জানে প্রতিটি পোকা আর প্রতিটি মাকড় কী ষড়যন্ত্র করে চলছে। রাশেদ আর তাদের কাজের ছেলেটি জঙ্গল পরিষ্কার করতে শুরু করে। রাশেদের প্রথম মনে হয় হয়তো সত্যিই ছিটকি-কচু-তেলাকুচের জঙ্গলে মারাত্মক কিছু লুকিয়ে আছে, যা পাকিস্থানকে ঘায়েল করে ফেলতে পারে, কিন্তু সে ওই জঙ্গলে কিছুই দেখতে পায় না। কাজের ছেলেটি শুধু দুঃখ করতে থাকে, দাদা, ছিটকি। সব কাইট্টা ফেললে মেছেক করুম কি দিয়া? সে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে পছন্দ করে না, প্রতিদিন ভোরে একটি করে ছিটাকর ডাল ভেঙে ব্রাশ তৈরি করে, দাঁত মাজে আর ফেলে দেয়। সামরিক আইনে তার ব্রাশের বন বিপন্ন দেখে চাকরটি আর্তনাদ করে। ওঠে। রাশেদ তাকে বলে যে তার আর্তনাদ যদি শুনতে পায় মিলিটারিরা, যারা এখন পাকিস্থানকে রক্ষা করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে, তাহলে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। শুনে ছেলেটি সত্যিই ভয় পেয়ে যায়, তবু সে বলে, দাদা, অহন থিকা কান্দনও কি দোষ? কানলেও কি পাকিস্থান মরবো? ছিটকি কাটতে গিয়ে রাশেদ একটি শালিককে ভয় পেয়ে উড়ে যেতে দেখে শালিকটির কাছে লজ্জিত বোধ করে এ ভেবে যে শালিকটি হয়তো তাকে মিলিটারি ভাবছে, কিন্তু সে যে। মিলিটারি নয় এবং কোনোদিন হবে না, একথা শালিকটিকে জানাতে না পেরে খুব কষ্ট বোধ করে। শালিকটি একটি বাসা বেঁধেছিলো, সেটি খ’সে নিচে পড়ে গেলো; রাশেদ সেটির দিকে তাকিয়ে অনুভব করলো যে শালিকের বাসার থেকে পাকিস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্থানকে টিকিয়ে রাখার জন্যে দরকার হলে শালিকের সব বাসা ভেঙে দেয়া হবে, দরকার হলে এক ডিভিশন মিলিটারি লাগিয়ে দেয়া হবে একটি বাসা ভাঙতে। একটু দূরেই তাদের গোয়ালঘর; রাশেদ দেখতে পেলো তারা যখন কচুগাছ কাটছে, তখন তাদের গোয়ালঘরের বেড়ায় কয়েকটি গুবরেপোকা খুব উত্তেজিত হয়ে ওড়াউড়ি করছে। ওড়ার ভঙ্গিটা খুবই আপত্তিকর, অনেকাংশেই রাজনীতিক, যা সামরিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। গোয়ালঘরের বেড়ায় গুবরেপোকাগুলো বাসা তৈরি করে বাস করছিলো হয়তো বংশানুক্রমিকভাবে, কিন্তু পাকিস্থান রক্ষার জন্যে তাদের উৎখাত না। করে উপায় নেই। গুবরেপোকারাও পাকিস্থানের অধিবাসী, তাদেরও মেনে চলতে হবে সামরিক আইন। কিন্তু শ্রীনগরে তখন একটি মারাত্মক রাষ্ট্রদ্রোহিতার ঘটনা ঘটে যায়।

পাগলটিকে চাবুক মারার পর সারা এলাকায় চাপা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে; ইউনিয়ন। বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও দোকানদারদের চাবুক মারায় লোকজনের মুখে যে-খুশির ঝিলিক দেখা গিয়েছিলো, তা মিলিয়ে যায়, এবং তারা পরস্পরের সাথে দেখা হলেই এ-বিষয়ে গোপনে আলাপ করতে থাকে। তাদের প্রিয় পাগলকে যারা চাবুক মেরে রাস্তায় ফেলে রাখতে পারে, নির্দ্বিধায় কেটে ফেলতে পারে তার জট, তাদের সম্বন্ধে বেশ ঘন একটা সন্দেহ দেখা দেয়। রাশেদদের বাড়িতে যে-বুড়ীটি দুপুরের আগে ভিক্ষা করতে আসে, সেও এসেই ভিক্ষা চাওয়া ও বাড়ির ছেলেমেয়েদের দোয়া করার আগে পাগলটির কথা বলে, এবং ভবিষ্যদ্বাণী করে যে এমন ভালো পাগলটিকে যারা এমনভাবে মারতে পারে, তাদের কপালে অনেক দুঃখ লেখা আছে। রাশেদ পাকিস্থানের কপালটির কথা ভাবতে চেষ্টা করে, সেখানে ফেরেশতার নিজ হাতে টানা ভবিষ্যৎ দুঃখের দাগগুলোও দেখার। চেষ্টা করে। বাবা খাওয়ার সময় বলেন যারা পাগলকেও এমনভাবে চাবুক মারতে পারে, তাদের সম্বন্ধে সাবধান থাকা দরকার। যখন সবাই নিঃশব্দে ক্ষুব্ধ জীবন যাপন করছিলো, তখন শ্রীনগরে একটি দ্রোহিতার ঘটনা ঘটে। বাজারের পাগলিটি, যে পাগলটির জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষার চোখেই দেখতো সব সময়, মনে করতো যে-জনপ্রিয়তা তার ভাগে পড়ার কথা ছিলো তা ওই পাগলা তার থেকে অবৈধভাবে কেড়ে নিয়েছে, সে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। কয়েক দিন ধরেই তাকে কখনো বিমর্ষ কখনো উল্লসিত দেখাচ্ছিলো। এক দুপুরে যখন পাকিস্থান রক্ষাকারীদের একটি দল তার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো, তখন সে দলের নেতার মুখ লক্ষ্য করে একটি কালো পাতিল ছুঁড়ে মারে। পাতিলটি মেজরের মুখে গিয়ে গোলাবারুদের মতো বিস্ফোরিত হয়, মেজরের নাকের ভেতর একটি চাড়া ঢুকে যায়, কপাল ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে; মিলিটারিরা পাগলিকে লক্ষ্য করে অনবরত মেশিনগান চালায়। তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়, এবং মেজরের মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত হলেও পাকিস্থান অক্ষতভাবে রক্ষা পায়। এ-ঘটনার পর বাজার। থেকে সবাই পালিয়ে যায়, বিশেষভাবে পালায় বাজারের গৌরব পাগলপাগলিরা, তারা আর শ্রীনগরে ফেরে না। কারো মুখে কালো পাতিল মারা চরম অপমানের ব্যাপার, ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি শয়তান রয়েছে, যাদের অনেকেই ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর বা প্রেসিডেন্ট, যাদের মুখে একাধিকবার কোনো-না-কোনো নারী কালো পাতিল মেরেছে; কিন্তু পাকিস্থানের মুখে কালো পাতিল মারার ঘটনা এই প্রথম।

রাশেদ আর কাজের ছেলেটি বাড়ি পরিষ্কার করে চলেছে। রাশেদকে বিশেষ চিন্তিত করে গুবরেপোকাঁদের আবাসিক সমস্যাটি; তারা যতোই জঙ্গল পরিষ্কার করতে থাকে, রাশেদ দেখতে পায়, পোকাগুলো আবাস বদল করতে থাকে। পুব দিকের বেড়ার গা। থেকে সরে গিয়ে উত্তর দিকের বেড়ার গায়ে বাসা বাধে, কিন্তু আগের মতো নিশ্চিন্তে তারা ঘুমোতে পারে না, তাদের ওড়ার মধ্যে উদ্বেগের ছাপ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। রাশেদকে বাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার করতেই হবে; সে পাকিস্থান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ মনে মনে গুনগুন করে উত্তরের ঘরের বেড়ার গায়ে লৌহমানবের ছবিটা দেখতে দেখতে জঙ্গল পরিষ্কার করে, এবং পাকিস্থানে গুবরেপোকার জীবনের পরিণতি সম্পর্কে একটা ধারণা করে নেয়। গোয়ালঘরের ভেতরটাও পরিষ্কার করে তারা; শুকনো গোবর ও গুবরেপোকার একটি চমৎকার গন্ধ ঢোকে তার নাকে, এবং তাদের আক্রমণে গুবরেপোকাগুলো অস্থির হয়ে গোয়ালঘর থেকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বাইরের দিকে বেরোয়, অধিকাংশই তাদের অভিযানে প্রাণ হারায়। তাদের যে-দিন জঙ্গল কাটা শেষ হয়, গোয়ালের চারদিক যে-দিন তারা পরিষ্কার করে, পাকিস্থান সে-দিন নির্বিঘ্ন হয়; এবং রাশেদ দেখে গুবরেপোকাগুলো পিছু সরতে সরতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।