১৯৮০ সালের বৃত্তিপ্রদান করা হয় ২০শে বৈশাখ ১৩৮৮ মোতাবেক ৩-৫-১৩৮১ (ইং) তারিখে। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মি. অরবিন্দ কর, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) এবং তৎসঙ্গে আতিথ্য গ্রহণ করেন-

(১) শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির, বরিশাল।

(২) বাবু সুধীর সেন, মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও সাংবাদিক, বরিশাল।

(৩) বাবু অরূপ তালুকদার, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, বরিশাল।

১৯৭৯ সালের বৃত্তি প্রদান করা হয়েছিলো দ’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং এবারের (১৯৮০) বৃত্তি প্রদান করা হল তিনটিতে। অতিরিক্ত বিদ্যালয়টি হচ্ছে চরমোনাই (মাদ্রাসা) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাননীয় সভাপতি সাহেব স্বহস্তে ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তিপ্রদান করেন।

সাংবাদিক বাবু অরূপ তালুকদারের লিখিত একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে ২৭, ২, ৮৮ (বাং) তারিখে ‘সংবাদ’ পত্রিকায়। খবরটি এখানে উদ্ধৃত করা হল।

 

সংবাদ পত্রিকার খবর

২৭-২-৮৮

বেশি কিছুদিন থেকেই অনেকের মুখে শুনেছি এই মানুষটির কথা। আর যতবারই তাঁর কথা শুনেছি ততবারই আশ্চর্য সব কাজ-কারবার আর ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। বারবার ভেবেছি এই আশ্চর্য মানুষটির সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হওয়া দরকার।

না, বেশীদিন অপেক্ষা করতে হল না। একদিন অকস্মাৎ তিনি নিজেই এসে উপস্থিত হলেন আমার কাছে, কি কাজে।

সকালের দিকে আমি যখন আমার কর্মস্থলে আসি, ঠিক সেই সময়টাতেই তিনি এলেন। তাঁকে দেখেই মনে হল, কেই মানুষটি আমার চেনা, আগে যেন কোথায় দেখেছি। পরিচয় দেওয়ার আর দরকার হল না। বললাম, বসুন। তিনি বসলেন। বেশ দীর্ঘ দেহারা। মুখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায় বয়েস হয়েছে। শরীরেও তার ছাপ পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। অথচ চোখ দু’টো বেশ উজ্জ্বল। অতি আস্তে আস্তে কথা বলেন। কোন ব্যাপারেই উত্তেজিত হন না।

এই আরজ আলী মাতুব্বর। সাং লামচরি। বলার মত শিক্ষা-দীক্ষা নেই। তিনি নিজেই বলেছেন, স্কুলে পড়ার তেমন সৌভাগ্য আমার হয়নি। ক্ষেতের কাজ করেই জীবনের অধিকাংশ সময় পার হয়ে গিয়েছে।

বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর অভিজ্ঞতা আছে মাতুব্বর সাহেবের জীবনে। অন্তরের জ্ঞান-পিপাসা বারবার তাঁকে বহু মানুষের দ্বারে নিয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, যার কাছেই গিয়েছেন তিনি কেউ তাঁকে বিমুখ করেন নি। নিজের সীমিত শিক্ষা দিয়ে যতটা সম্ভব বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে তিনি দিনের পর দিন পড়াশুনা চালিয়েছেন। সবার চোখের আড়ালে নিজেকে তিনি তৈরি করেছেন। নিজেকে প্রস্তুত করে গড়ে তুলেছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণের ক্ষেত্রে কিছু করার জন্য। সেদিন তাঁরই আমন্ত্রণে ক’জন গিয়েছিলাম বরিশাল শহরের অদূরে তাঁর আবাসভূমি লামচরি গ্রামে ‘আরজ মঞ্জিল’- এ। স্পষ্ট বলা ভালো, জনাব মাতুব্বরের বহু কষ্টে বহু সাধনায় গড়ে তোলা আরজ মঞ্জিলে আমাদের মতো শহুরে মানুষের দেখার মতো তেমন কিছু নেই। কিন্তু একটু লক্ষ্য করে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, যতটুকু হোক, যত সাধারণই হোক না কেন – একটি সাধারণ মানুষের মানুষ-কল্যাণমুখী অসাধারণ মনের ছাপ ফুটে রয়েছে সর্বত্র। এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই। সেদিন মাতুব্বর সাহেব প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কয়েকটি বৃত্তিপ্রদানের অনুষ্ঠানে ডেকেছিলেন আমাদেরকে। স্থানীয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) শ্রী অরবিন্দ কর, শ্রী সুধীর সেন, অধ্যাপক গোলাম কাদির আর আমি – এই চারজন সেদিন মাতুব্বর সাহেবের আতিথেয়তায় একেবারে মুগ্ধ হয়ে ফিরেছিলাম শহরে। মাতুব্বর সাহেবের সাধ অনেক, কিন্তু সাধ্য সীমিত। তাই বলে তিনি থেমে থাকার মানুষ নন। ‘আরজ মঞ্জিলে’ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি সাধারণ পাঠাগার, গ্রামের সাধারণ মানুষ এখানে এসে পড়াশুনা করবে। আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন, তাঁর এই পাঠাগারটি হবে আলোকস্তম্ভ – এর আলো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। কোন দেশকালের ভেদ তিনি মানেন না। মানুষ মানুষ হিসাবেই স্বীকৃতি পাবে। মানুষকে মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার, মানুষ হিসাবে সেবা করার মানসিকতা আসবে জ্ঞানের মধ্য দিয়েই। শুধু অন্তহীন জ্ঞানই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে চরম অজ্ঞানতা থেকে। মাতুব্বর সাহেবের জীবনে ছোট ছোট অনেক ঘটনা রয়েছে, তাঁর এই পর্যন্ত আসার মাঝে রয়েছে অসাধারণ হয়ে ওঠেন, তাঁকে অনেক বড়-ঝাপটা সহ্য করতে হয়।

আরজ আলী মাতুব্বর সম্প্রতি একটি উইল করে তাঁর যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি যা আছে সব সাধারণ মানুষের কল্যাণার্থে দান করে গেছেন। এমনকি তাঁর শরীরটি ও চোখ দুটো মৃত্যুর পরে দান করা হবে বরিশালের শেষে-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে। মাতুব্বর সাহেব এ পর্যন্ত দু’খানা বই লিখেছেন, প্রথমটি ‘সত্যের সন্ধান’, দ্বিতীয়টি ‘সৃষ্টি-রহস্য’। এই দু’টি বইয়েই আশ্চর্য আশ্চর্য সব প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। ‘সৃষ্টি-রহস্য’ পড়ে ড. আহমদ শরীফ মন্তব্য করেছেন, ,”তাঁর এই সদিচ্ছা, দ্রোহ, জিজ্ঞাসা ও সন্ধিৎসাই আমাকে বিমুগ্ধ করেছে। তাঁকে করেছে অনন্য। সমাজে এমন কল্যাণমুখী মুক্তবুদ্ধির মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে আমাদের মানসিক, জাগতিক ও বৈষয়িক জীবনের অনেক সমস্যার ও যন্ত্রণার অবসান ত্বরান্বিত হবে। জয়তু আরজ আলী মাতুব্বর … ।“ মাতুব্বর সাহেব সম্প্রতি আরেকটি বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। নাম রেখেছেন ‘মুক্তমন’। আশা করছি তাঁর ‘মুক্তমন’ প্রকাশিত হলে আরো কিছু নতুন তথ্য পাওয়া যাবে – প্রসারিত হবে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত। সত্যের জন্য, জ্ঞানের দিগন্তকে আরো প্রসারিত করতে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আরজ আলী মাতুব্বর এখনো আবার নতুন করে যুদ্ধে নামতে চান। কিন্তু তাঁর ভাষায়, “বয়সের ভারে এখন অবনত। তত শক্তি পাই না, কিন্তু মনের শক্তি তো ফুরোয় না।“ এই মনের শক্তির জোরেই তিনি চলেছেন। চলছেন। ‘সত্যের সন্ধান’ বই লেখার পেছনে একটি ছোট ঘটনা আছে। যে ঘটনার মধ্যে থেকেই তাঁর মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্মলাভ ঘটেছে।

তিনি বলেছেন, ১৩৩৯ সালে যখন আমার মা মারা যান, তখন আমি বরিশাল থেকে ফটগ্রাফার আনিয়ে আমার মৃত মায়ের ছবি তুলি। এই ছবি তোলার কথা শুনে মায়ের জানাজা দিতে যারা এসেছিলেন তারা লাশ ফেলে রেখে চলে যান। তাদের বক্তব্য, ,ছবি তোলা হারাম। এই ঘটনা আমার মনের মধ্যে ভীষণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, সেই সঙ্গে জন্ম দেয় অনেকগুলি প্রশ্নের। মায়ের জানাজা দেয়া কেন হল না? আমার মায়ের দোষ কি? ছবি তোলা যদি হারাম হয়, তবে তার দায়ভাগী তো আমি, মা কি দোষ করেছে? বলা বাহুল্য, এমনি ধরণের অনেকগুলি প্রশ্নের ভিড় এসে মাতুব্বর সাহেবকে উতলা করে তোলে। যার ফলশ্রুতিতে তিনি কলম ধরেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি ‘সত্যের সন্ধান’ আর ‘সৃষ্টি-রহস্য’। আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে কোন তত্ত্বকথায় যেতে চাইনা, শুধু এইটুকু বলতে চাই, আমাদের এই সমাজে এখন আরজ আলী মাতুব্বরের মতো মানুষের বড় প্রয়োজন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x