১০ই জ্যৈষ্ঠ। গরম তীব্র হতে তীব্রতর হচ্ছে। আকাশ মেঘশূন্য ও কয়েকদিন যাবত বায়ু একদম নিরব। কয়েক জন কৃষি-মজুর নিয়ে মাঠে পাট নিড়াচ্ছিলাম। কিন্তু কাজ আগের তুলনায় অর্ধেকও হয়নি। সন্ধ্যায় দশ মিনিট পূর্বেও বোধ হচ্ছিল যেন সূর্য হতে আগুন ঝড়ছে। ১১ই জ্যৈষ্ঠ। আকাশ আবছা মেঘে ঢাকা রইল, সমস্ত দিনে সূর্যের সাথে দেখা হল না, তবু মানুষ গরমে অতীষ্ট হয়ে উঠল, কেননা বাতাস স্তব্ধ। সরকারী পর্যায়ে আবহাওয়ার কোন পূর্বাভাস নেই, তবুও লোকে বলছে- “বন্যা হবে”।

১২ই জ্যৈষ্ঠ। সকাল হতে ঝাপসা মেঘে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হতে সামান্য পূবাল বাতাস বইতে লাগল। বিকেল হতে বৃষ্টিসহ বাতাসের বেগ বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং সন্ধ্যার পূর্বে সাইক্লোনের (বন্যার) পূর্ণ লক্ষণ দেখা দিল; রাত্র আটটা হতে শুরু হল পুরো মাত্রায় বন্যা। গাছ-পালা ভাংতে ও উপড়ে ফেলতে লাগল। আম, জাম, মাদারাদি সব গাছই কিছুনা কিছু ভাংল, অনেক গাছ উপরিয়ে পড়ল, বহু নারকেল-সুপারী গাছের হল মুন্ডুপাত এবং কলা গাছ হল একদম নিপাত। আমার বৈঠকখানা ঘরটা উড়িয়ে নিল রাত বারোটার মধ্যেই।

বন্যার বাতাস প্রথমতঃ- পূঃ দঃ হতে, পরে পূঃ উঃ হতে, তৎপর উত্তর ঘুরিয়ে শেষ রাত্রে পশ্চিম হতে বইতে লাগল। এ সময় আমার বসত ঘরের পশ্চিম হতে একটা প্রকান্ড আমগাছ উপরিয়ে পড়ে পাকের ঘরখানা ভেঙ্গে দিল এবং বসত ঘরখানা চেপে ধরল। তাই বন্যার বাতাসে আর ঘরখানা নাড়তে পারল না। ফলে বন্যায় পড়া আমগাছটাই আমার বসত ঘরখানা রক্ষা করল। কিন্তু বেড়া-জানালাদি ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল। বান-বৃষ্টির ঝাপটায় কাথা-বালিশ বা “বস্ত্র” বলতে কিছুই শুকনা থাকল না। ভিজে বস্ত্র গায়ে জড়িয়ে পরিজনসহ মরতে মরতে বেঁচে রইলাম। প্রতিবেশি ইয়াছিন আলী সিকদার নানাবিধ তত্ত্বমূলক আলাপ আলোচনার জন্য প্রায়শঃ আসত আমার কাছে, এ দিনও সন্ধ্যায় আসছিল। কিন্তু ক্রমশঃ বন্যা বৃদ্ধির ফলে আর ঘরে ফিরতে না পেরে আমাদের সাথে মরণ পথের যাত্রী হচ্ছিল সেও। ভোর রাত্রে বন্যা কমিয়ে সকাল বেশ প্রকৃতি শান্ত অবস্থা ধারণ করল। (১৩ই জ্যৈষ্ঠ)

বের হলাম গ্রামের অবস্থা দেখবার জন্য। ঘুরে দেখলাম- গ্রামের প্রায় চৌদ্দ আনা ঘরই পুরো বা আংশিকভাবে নষ্ট হয়েছে। গাছ-পালার ক্ষতির সংখ্যা নেই। প্রত্যেক গেরস্তের বাড়ির উঠানে কাঁচা আম ও ডাব নারিকেলের স্তুপ, নারিকেল পড়েছে কাধি – সহ ছিঁড়ে। কোথায়ও মানুষ মরবার খবর পেলাম না, তবে গরুর খবর- পেলাম গোটা চারেক। কাক, শকুন, চিল ইত্যাদি – মৃত ও অর্ধমৃত দেখলাম অনেক। দুর্গত-পাখীদের মধ্যে ঘুঘুর সংখ্যাই বেশি। মাঠে-ফসল “নাই” বললেই চলে। সুখনা/জ্বালানী কাষ্ঠ কারো ঘরে নেই। পাকের অভাবে অনাহারে থাকতে হবে অনেককেই।

বেলা দশটায় বাড়িতে এসে প্রথমতঃ- ঘরের উপর ও পথে পড়ে থাকা গাছ-পালা কেটে সরাতে-লাগলাম। ৭-৮ দিন সময় লাগল বাড়ি-বাগান পরিষ্কার করতে। গাছ পালা ভাঙ্গার মধ্যে বড় রকমের একটা ক্ষতি হল আমার একটা ‘ফজলি’ আমের গাছ ভেঙ্গে; মূল্যের জন্য নয়, দুষ্প্রাপ্য বলে। গাছটিতে আম ফলত প্রচুর এবং প্রতিটি আমের ওজন হ’ত দেড় সেরের ওপর।

এ বন্যায় সমগ্র দেশের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল সে ধারণা আমার নেই। তবে সরকারী নির্দেশ ক্রমে ইউনিয়ন বোর্ডের তরফ থেকে লামচরি মৌজার ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষের নিকট আমি একটা রিপোর্ট প্রদান করছিলাম। কিন্তু তার ক্ষতির অঙ্কটা এখন ঠিক স্মরণ নেই। তবে আমার নিজের ক্ষতির একটা ফিরিস্তি আছে। তা এই।

(১) বৈঠক খানা ঘর          ৫০০.০০

(২) পাকের ঘর                ১০০.০০

(৩) বসত ঘর (আংশিক ক্ষতি) ১০০.০০

(৪) গাছ পালা ফল  ২০০.০০

(৫) ফসল ১০০০.০০

(৬) বই-পুথি (৯৬৬ খানা) ৩০০০.০০

(৭) জল ঘড়ী (১টি) ১০০.০০

(৮) ফটো এক খানা (মৃত মায়ের) ৫০.০০

মোট = ৫০৫০.০০

এ বন্যায় কম বেশি ক্ষতি এ অঞ্চলের সকলেরই হয়েছে, আমারও হয়েছে। তবে ওর অনেক ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু আমার (বই পুথি [৯৬৬ খানা], জল ঘড়ী, ফটো এক খানা মৃত মায়ের) তিনটা ক্ষতি অপূরণীয়। কেননা কায়িক শ্রম বা অর্থের বিনিময়ে উহা পূরণ করা সম্ভব নয়। যৌবনের যে উদ্দাম উৎসাহে পুস্তকাদি সংগ্রহ ও জল ঘড়ী নির্মাণ করেছিলাম, সে অধিকন্তু বই-পুথি গুলোর মধ্যে এমন কতগুলো গ্রন্থ ছিল যা এখন দুষ্প্রাপ্য। যেমন- সন্দ্বীপের ইতিহাস, শরলভূমি পরিমাণ, সহিদ নামা (পুথি) ইত্যাদি। বিশেষতঃ আমার সর্বস্বত্যাগ করেও পাব না মৃত মায়ের “ফটো” খানা।

বই-পত্র গুলো ছিল আমার অতিশয় প্রিয়, যাকে বলা যায় “প্রাণ-প্রিয়”। মাতৃ-তিরোধানে আমার রোদন আসে নি। কিন্তু বই গুলোর তিরোধানে আমি রোদনকে ফেরাতে পারিনি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x