শ্লোকঃ ৭

কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ

পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসম্মুঢ়চেতাঃ।

যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রুহি তন্মে

শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম ।। ৭ ।।

কার্পণ্য- কৃপণতা; দোষ- দুর্বলতা; উপহত- প্রভাবিত হয়ে; স্বভাবঃ- স্বভাব; পৃচ্ছামি- আমি জিজ্ঞাসা করছি; ত্বাম- তোমাকে; ধর্ম- ধর্ম; সম্মুঢ়- হতবুদ্ধি; চেতাঃ- চিত্ত; যৎ- যা; শ্রেয়ঃ- শ্রেয়স্কর; স্যাৎ- হয়; নিশ্চিতম- নিশ্চিতভাবে; ব্রুহি- বল; তৎ- তা; মে- আমাকে; শিষ্যঃ- শিষ্য; তে- তোমার; অহম- আমি; শাধি- নির্দেশ দাও; মাম- আমাকে; ত্বাম- তোমার; প্রপন্নম- আত্মসমর্পিত।

গীতার গান

কার্পণ্য দোষেতে দূষী,       মোহেতে হয়েছি বশী,

স্ব স্বভাব হল অপহত।

নিজ ধর্ম ছাড়ু মূঢ়,       জিজ্ঞাসি তোমারে দৃঢ়,

কৃপা করি করহ সংযত।।

তুমি জান হিত মোর,        হয়েছি মোহেতে ভোর,

ভাল যাতে করহ বিচারে।

হইনু তোমার শিষ্য,         দেখুক সকল বিশ্ব,

শিক্ষা দাও এই প্রপন্নরে।।

অনুবাদঃ কার্পণ্যজনিত দুর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি এবং আমার কর্তব্য সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়েছি। এই অবস্থায় আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বল। এখন আমি তোমার শিষ্য এবং সর্বতোভাবে তোমার শরণাগত। দয়া করে তুমি আমাকে নির্দেশ দাও।

তাৎপর্যঃ প্রকৃতির প্রভাবে জড়-জাগতিক কর্মচক্রের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়ে সকলেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা এই কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা অনুভব করি। তাই আমাদের সত্যদ্রষ্টা সদগুরুর শরণ নিতে হয় এবং তিনি আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধন করবার পথে পরিচালিত করেন। আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত জীবনের জটিল সমস্যাগুলি থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য সদগুরুর শরণাপন্ন হবার উপদেশ সমস্ত বৈদিক সাহিত্যে দেওয়া হয়েছে। জড়-জাগতিক ক্লেশ হচ্ছে দাবানলের মতো যা আপনা থেকেই জ্বলে ওঠে, এই আগুন কেউ লাগায় না। ঠিক তেমনই, জগতের এমনই অবস্থা যে, জীবনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা আপনা থেকেই আবির্ভূত হয়, এই প্রকার বিভ্রান্তি আমরা না চাইলেও। কেউ আগুন চায় না, তবুও আগুন জ্বলতে থাকে এবং তার ফলে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। বৈদিক সাহিত্য তাই উপদেশ দিচ্ছে যে, জীবনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা সমাধানের জন্য এবং সেই সমাধানের বিজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করবার জন্য গুরু-পরম্পরার ধারায় ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছেন যে সদগুরু, তাঁর শরণাপন্ন হতে হবে। যে ব্যক্তি সদগুরু তিনি সর্ব বিষয়ে পারদর্শী। তাই, ,জড় জগতের মোহের দ্বারা আবদ্ধ না থেকে সদ্গুরুর শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এটিই হচ্ছে এই শ্লোকের তাৎপর্য।

জড় জগতের মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন কে? যে মানুষ তার সমস্যাগুলি সম্বন্ধে অবগত নয়, সেই হচ্ছে মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে (৩/৮/১০) মোহাচ্ছন্ন মানুষের বর্ণনা করে বলা হয়েছে- যো বা এতদক্ষরং গার্গবিদিত্বাস্মাল লোকাং প্রৈতি স কৃপণঃ। “যে মানুষ তার মনুষ্য জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করে না এবং আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি না করে কুকুর-বেড়ালের মতো এই জগৎ থেকে বিদায় নেয়, সেই হচ্ছে কৃপণ।“ এই মানবজন্ম হচ্ছে একটি অমূল্য সম্পদ, কারণ, জীব এই জন্মের সদ্ব্যবহার করে জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারে; তাই, যে এই অমূল্য সম্পদের সদ্ব্যবহার করে না, সে হচ্ছে কৃপণ। পক্ষান্তরে, যিনি যথার্থ বুদ্ধিমত্তা সহকারে মানব-জন্মের সদ্ব্যবহার করে জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করেন, তিনি হচ্ছেন ব্রাক্ষ্মণ। য এতদক্ষরং গার্গি বিদিত্বাস্মাল লোকাৎ প্রৈতি স ব্রাক্ষ্মণঃ।

যে কৃপণ সে পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি আদি জড় সম্বন্ধের প্রতি অত্যধিক আসক্ত হয়ে তার সময়ের অপচয় করে। মানুষ প্রায়ই এক ধরনের ‘চর্মরোগের’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী, পুত্র, পরিজন সমন্বিত পরিবারের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়ে পড়ে। এই রোগকে ‘চর্মরোগ’ বলা হয়, কারণ দেহের ভিত্তিতে বা চর্মের ভিত্তিতে এই আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে ওঠে এবং এই বন্ধনের ফলে জীব অত্যন্ত ক্লেশদায়ক ভবযন্ত্রণা ভোগ করে। কৃপণ মনে করে, সে তার পরিবারের তথাকথিত আত্মীয়দের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে; নয়ত সে মনে করে, তার আত্মীয়স্বজন তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে। এই ধরনের পারিবারিক বন্ধন এমন কি পশুদের মধ্যেও দেখা যায়, তারাও তাদের সন্তানদের যত্ন করে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন অর্জুন বুঝতে পেরেছিলেন, আত্মীয়-পরিজনদের প্রতি তাঁর মমতা এবং তাদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার বাসনাই ছিল তার মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার কারণ। যদিও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর যুদ্ধ করার কর্তব্য তাঁকে সম্পাদন করতে হবে, কিন্তু তবুও কৃপণতাজনিত দুর্বলতার ফলে তিনি তাঁর সেই কর্তব্য সম্পাদন করতে পারছিলেন না। তাই তিনি পরম গুরু শ্রীকৃষ্ণকে অনুনয় করছেন, তাঁর এই সমস্যার সমাধান করার উপায় প্রদর্শন করতে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তাঁর শিষ্যরূপে আত্মসমর্পণ করেন। শ্রীকৃষ্ণকে তিনি আর বন্ধুরূপে সম্ভাষণ করছেন না। গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে কথা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এখন অর্জুন তাই গভীর গুরুত্বের  সঙ্গে পরম গুরু শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পরম তত্ত্বদর্শনের আলোচনা করতে চান। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন ভগবদগীতার তত্ত্ববিজ্ঞানের আদি গুরু এবং অর্জুন হচ্ছেন গীতার তত্ত্ব-উপলব্ধিকারী প্রথম শিষ্য। অর্জুন কিভাবে ভগবদগীতার জ্ঞান উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর ব্যাখ্যা ভগবদগীতাতেই করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গর্দভসদৃশ জড় পণ্ডিতেরা গীতার ব্যাখ্যা করে বলে, শ্রীকৃষ্ণ নামক কোন পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করার কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের অন্তঃ স্থিত অপ্রকাশিত যে-তত্ত্ব, তাকে উপলব্ধি করাই হচ্ছে গীতার প্রকৃত শিক্ষা। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন অনাদির আদি পুরুষ স্বয়ং ভগবান। তাঁর অন্তর ও বাইরের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই, তিনি সর্বব্যাপ্ত, সর্বশক্তিমান। কিন্তু এই জ্ঞান যার নেই, সেই মহামূর্খের পক্ষে গীতার মর্ম উপলব্ধি করা কখনোই সম্ভব নয়।

শ্লোকঃ ৮

ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্যাদ

যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম।

অবাপ্য ভূমাবসপত্নমৃদ্ধং

রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম ।। ৮ ।।

ন- না; হি- অবশ্যই; প্রপশ্যামি- দেখছি; মম- আমার; অপনুদ্যাৎ- দূর করতে পারে; যৎ- যা; শোকম- শোক; উচ্ছোষণম- শুকিয়ে দিচ্ছে; ইন্দ্রিয়াণাম- ইন্দ্রিয়গুলিকে; অবাপ্য- প্রাপ্ত হয়ে; ভূমৌ- এই পৃথিবীতে; অসপত্নম- প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন; ঋদ্ধম- সমৃদ্ধিশালী; রাজ্যম- রাজ্য; সুরাণাম- দেবতাদের; অপি- এমন কি; চ- ও; আধিপত্যম- আধিপত্য।

গীতার গান

দেখি না আমি যে অন্ধ,      তাতে বুদ্ধি অতি মন্দ,

শোকানল নিভিবে কিভাবে।

যে শোক জ্বালায় মোরে,     ইন্দ্রিয়াদি সব পোড়ে,

ভবরোগ কিরূপে ঘুচাবে।।

যদি পাই ত্রিভুবন,      রাজ্যলক্ষ্মী সুলোভন,

অসপত্ন রাজ্যের বিকাশ।

দেবলোকে আধিপত্য,    তোমাকে কহিনু সত্য,

নাহি হবে এ শোক বিনাশ।।

অনুবাদঃ আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে যে শোক, তা দূর করবার কোন উপায় আমি খুঁজে পাচ্ছি না। এমন কি স্বর্গের দেবতাদের মতো আধিপত্য নিয়ে সমৃদ্ধিশালী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন রাজ্য এই পৃথিবীতে লাভ করলেও আমার এই শোকের বিনাশ হবে না।

তাৎপর্যঃ অর্জুন যদিও তাঁর মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াসে ধর্মগত ও নীতিগত যুক্তির অবতারণা করছিলেন, কিন্তু তবুও যেন তিনি তাঁর শ্রীকৃষ্ণের সাহায্য ছাড়া তাঁর প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারছিলেন না। তিনি বুঝতে পারছিলেন, যে সমস্যা তাঁর সমস্ত সত্তাকে দগ্ধ করছিল, তাঁর তথাকথিত জ্ঞানের সাহায্যে তিনি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। তাই তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে গুরুরূপে বরণ করে তাঁর শরণাপন্ন হলেন। কেতাবী বিদ্যা, পান্ডিত্য, উচ্চপদ আদি জীবনের প্রকৃত সমস্যার সমাধান কখনোই করতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণের মতো গুরুর কৃপার ফলেই কেবল সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়। তাই, সিদ্ধান্ত হচ্ছে, যে গুরু সর্বতোভাবে কৃষ্ণচেতনার অমৃত আস্বাদন করেছেন, তিনিই হচ্ছেন সদগুরু, কেন না তিনিই কেবল পারেন মানব-জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, যদিনি কৃষ্ণ-তত্ত্ববেত্তা, তিনি ব্রাক্ষ্মণই হন বা শুদ্রই হন, তিনিই কেবল পারেন গুরু হতে।

কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয়।

যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয়।।

(চৈঃ চঃ মধ্য ৮/১২৮)

সুতরাং তত্ত্বজ্ঞানী না হলে সদগুরু হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। বৈদিক শাস্ত্রেও বলা হয়েছে-

ষটকর্মনিপুণো বিপ্রো মন্ত্রতন্ত্রবিশারদঃ।

অবৈষ্ণবো গুরুর্ন স্যাদ্বৈষ্ণবঃ শ্বপচো গুরুঃ।।

“সমস্ত বৈদিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্রাক্ষ্মণ যদি বৈষ্ণব না হন, অথবা যদি তিনি কৃষ্ণ-তত্ত্ববেত্তা না হন, তবে তিনি গুরু হবার যোগ্য না নন। কিন্তু যদি নীচকুলোদ্ভুত চন্ডাল কৃষ্ণ-তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন বৈষ্ণব হন, তবে তিনি গুরু হতে পারেন।“ (পদ্ম পুরাণ)

জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি- এই চতুর্বিধ সমস্যা জড় অস্তিত্বকে সর্বদাই জর্জরিত করছে এবং ধনৈশ্চর্যের সঞ্চয় অথবা অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে কখনোই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ সব রকমের জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ। সেই সমস্ত দেশ চরম অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করে ধনৈশ্চর্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে জড় জীবনের যে সমস্ত সমস্যা তা কোন অংশেই লাঘব হয়নি। নানাভাবে তারা শান্তি পাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের সেই সমস্ত প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ শান্তি লাভ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ গ্রহণ করা, অর্থাৎ ভগবদগীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতের উপদেশ গ্রহণ করা, অথবা শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ প্রতিনিধি সদগুরুর শরণ গ্রহণ করা।

যদি অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য মানুষকে পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক প্রমত্ততা জনিত শোক থেকে উদ্ধার করতে পারত, তবে অর্জুন বলতেন না যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন পৃথিবীর সাম্রাজ্য অথবা স্বর্গলোকের আধিপত্য লাভ করলেও তিনি শোকমুক্ত হতে পারবেন না। তাই তিনি কৃষ্ণভাবনার আশ্রয় অবলম্বন করেছিলেন এবং সুখ ও শান্তি লাভের সেটিই হচ্ছে পন্থা। অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জড় জগতের উপর আধিপত্য প্রকৃতির অঙ্গুলিহেলনে মুহূর্তের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। মানুষের গ্রহান্তরে যাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা, যেমন চাঁদে যাবার জন্য অনুসন্ধান করছে, তাও প্রকৃতির এক ঘাতে সর্বতোভাবে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। ভগবদগীতায় তা প্রতিপন্ন হয়েছে- ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশান্তি। “সমস্ত পুণ্যকর্মের ফল শেষ হয়ে গেলে, চরম সুখ ও সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবন থেকে নিতান্তই নিম্নস্তরের জীবনে পতিত হতে হয়।“ অনেক রাজনীতিবিদ এভাবেই অধঃপতিত হয়েছে এবং এই ধরনের অধঃপতন কেবল দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তাই, আমরা যদি আমাদের মঙ্গলের জন্য সর্ববিধ শোকের নিরসন করতে চাই, তবে আমাদের অর্জুনের মতো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হতে হবে। সুতরাং অর্জুন যেমন শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে অনুরোধ করেছিলেন, প্রতিটি মানুষেরই উচিত সেভাবে ভগবানের শরণাগত হওয়া। সেটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা।

শ্লোকঃ ৯

সঞ্জয় উবাচ

এবমুক্তা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তুপঃ।

ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্তা তূষ্ণীং বভূব হ ।। ৯ ।।

সঞ্জয়ঃ উবাচ- সঞ্জয় বললেন; এবম- এভাবে; উক্তা- বলে; হৃষীকেশম- ইন্দ্রিয়ের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণকে; গুড়াকেশঃ- নিদ্রাজয়ী অর্জুন; পরন্তুপঃ- শত্রু দমনকারী; ন যোৎস্যে- আমি যুদ্ধ করব না; ইতি- এভাবে; গোবিন্দম- ইন্দ্রিয়সমূহের আনন্দদাতা শ্রীকৃষ্ণকে; উক্তা- বলে; তূষ্ণীম- নীরব; বভূব- হলেন; হ- নিশ্চিতভাবে।

গীতার গান

সঞ্জয় কহিলঃ

সে কথা বলিয়া গুড়াকেশ পরতাপী।

হৃষীকেশে নিবেদিল যদিও প্রতাপী।।

হে গোবিন্দ। মোর দ্বারা যুদ্ধ নাহি হবে।

যুদ্ধ ছাড়ি সেই বীর রহিল নীরবে।।

অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন- এভাবে মনোভাব ব্যক্ত করে গুড়াকেশ অর্জুন তখন হৃষীকেশকে বললেন, “হে গোবিন্দ! আমি যুদ্ধ করব না”, এই বলে তিনি মৌন হলেন।

তাৎপর্যঃ ধৃতরাষ্ট্র যখন শুনলেন, অর্জুন যুদ্ধ না করে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করবেন, তখন তিনি মনে মনে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে নিরাশ করার মান্সে সঞ্জয় তাঁকে জানিয়ে দিলেন, অর্জুন হচ্ছেন পরন্তুপঃ অর্থাৎ শত্রুর বিনাশকারী। যদিও অর্জুন পারিবারিক বন্ধনের মোহের বশবর্তী হয়ে সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তার পরই তিনি পরম গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মনিবেদন করে তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেছিলেন। এর থেকে বোঝা যায়, অর্জুন শীঘ্রই পারিবারিক বন্ধনের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মজ্ঞান বা কৃষ্ণভাবনামৃত লাভ করবেন এবং ভগবানের নির্দেশে সেই যুদ্ধে রত হয়ে নির্মমভাবে শত্রু সংহার করবেন। এভাবে ক্ষণস্থায়ী যে আশার আনন্দে ধৃতরাষ্ট্রের বুক ভরে উঠেছিল, তা অচিরেই অন্তর্হিত হল।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x