শ্লোকঃ ৫৩

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।

সামধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি ।। ৫৩ ।।

শ্রুতি- বৈদিক জ্ঞান; বিপ্রতিপন্না- বেদের কর্মকান্ডের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে; তে- তোমার; যদা- যখন; স্থাস্যতি- থাকবে; নিশ্চলা- অবিচলিত; সমাধৌ- চিন্ময় চেতনায় বা কৃষ্ণভাবনাময়; অচলা- স্থির; বুদ্ধিঃ- বুধি; তদা- তখন; যোগম- আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান; অবাপ্স্যসি- লাভ করবে।

গীতার গান

শ্রুতির গৃহীত জ্ঞান যখন নিশ্চলা।

কর্ম জ্ঞান যোগ আদি তখনি সফলা।।

সমাধি তখন হয় কর্মযোগে স্থিতি।

স্থিতপ্রজ্ঞ তার নাম যোগারূঢ় গতি।।

অনুবাদঃ তোমার বুদ্ধি যখন বেদের বিচিত্র ভাষার দ্বারা বিচলিত হবে না এবং আত্ম-উপলব্ধির সমাধিতে স্থির হবে, তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে।

তাৎপর্যঃ জীব যখন সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদন করে, তখন তার সেই অবস্থাকে বলা হয় সমাধি; যিনি পূর্ণ সমাধিমগ্ন হয়েছেন, তিনি ব্রক্ষ্ম-উপলব্ধি ও পরমাত্মা উপলব্ধির স্তর অতিক্রম করে সর্ব কারণের কারণ পরমেশ্বর ভগবানকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। অধ্যাত্ম-জ্ঞানের চরম পূর্ণতা হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে জীবের নিত্য দাসত্ব সম্পর্কের উপলব্ধি করা, তাই ভক্তিসহকারে ভগবানের সেবা করাই হচ্ছে জীবের একমাত্র কর্তব্য। সেই জন্য, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্ত বেদের সুন্দর বর্ণনার দ্বারা মোহিত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ করার জন্য যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন না। ভক্তিযোগে ভগবানের সেবা করলে ভগবানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং তার ফলে ভগবানের প্রতিটি উপদেশের মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করা যায়। শ্রীকৃষ্ণ অথবা তার প্রতিনিধি শ্রীগুরুদেবের আদেশে ভগবানের সেবা করলে, অচিরেই তার ফল পাওয়া যায় এবং ভগবদ্ভক্তির মাধুর্য আস্বাদন করা যায়।

শ্লোকঃ ৫৪

অর্জুন উবাচ

স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব।

স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম ।। ৫৪ ।।

অর্জুন উবাচ- অর্জুন বললেন; স্থিতপ্রজ্ঞস্য- অচলা বুদ্ধিবিশিষ্ট ব্যক্তির; কা- কি; ভাষা- লক্ষণ; সমাধিস্থস্য- সমাধিস্থ ব্যক্তির; কেশব- হে কৃষ্ণ; স্থিতধীঃ- কৃষ্ণভাবনাময় স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি; কিম- কি; প্রভাষেত- বলেন; কিম- কিভাবে; আসীত- অবস্থান করেন; ব্রজেত- বিচরণ করেন; কিম- কিভাবে।

গীতার গান

অর্জুন কহিলেনঃ

কি লক্ষণ স্থিতপ্রজ্ঞ কিবা তাঁর ভাষা।

কে কেশব! কহ মোরে সমাধিস্থ আশা।।

স্থিতধী কি বলে কিংবা উঠাবসা করে।

কিভাবে গমন করে কহত বিস্তারে।।

অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন?

তাৎপর্যঃ বিশেষ অবস্থা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষেরই যেমন কোন কোন লক্ষণ থাকে, কৃষ্ণভাবনায় মানুষেরও সেই রকম চলা, বলা, চিন্তাভাবনায় কতকগুলি প্রকৃতগত লক্ষণ থাকে। একজন ধনীর কতকগুলি লক্ষণ দেখে বোঝা যায় সে ধনী, একজন রোগীর কতকগুলি লক্ষণ দেখে যেমন বোঝা যায় সে রোগী, একজন জ্ঞানীর লক্ষণ দেখে যেমন বোঝা যায় সে জ্ঞানী, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত ভাবনায় মগ্ন কোন ভগবদ্ভক্তের কথা বলবার ধরন, চলার ভঙ্গি, চিন্তাধারা, মনোবৃত্তি আদি দেখে বোঝা যায়, তিনি হচ্ছেন ভগবদ্ভক্ত। ভগবদ্ভক্তের এই সমস্ত লক্ষণের বর্ণনা ভগবদগীতাতে পাওয়া যায়। এই লক্ষণগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তিনি কিভাবে কথা বলেন’ কারণ, কথার মধ্য দিয়েই সবচেয়ে গভীর ভাবে মানুষের অন্তরের ভাবের প্রকাশ হয়। প্রবাদ আছে, মূর্খ যতক্ষন পর্যন্ত তার মুখ না খুলছে, ততক্ষণ তার মূর্খতা প্রকাশ পায় না। বিশেষ করে ভালো পোশাকে সজ্জিত মূর্খ যতক্ষন তার মুখ না খুলছে, তাকে চেনার উপায় নেই, কিন্তু যখনই সে মুখ খোলে, তখনই তার পরিচয় প্রকাশ পায়। কৃষ্ণভাবনাময় মানুষের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে, তিনি শ্রীকৃষ্ণ অথবা শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় বিষয় ছাড়া আর কোন কথাই বলেন না। অন্যান্য লক্ষণ তখন অস্বাভাবিকভাবে তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয় এবং তা নিচে বর্ণিত হয়েছে।

শ্লোকঃ ৫৫

শ্রীভগবানুবাচ

প্রজহাতি যদা কামান সর্বান পার্থ মনোগতান।

আত্মন্যেবাত্মানা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ।। ৫২ ।।

শ্রীভগবান উবাচ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন; প্রজহাতি- ত্যাগ করেন; যদা- যখন; কামান- কামানসমূহ; সর্বান- সর্ব প্রকার; পার্থ- হে পৃথাপুত্র; মনোগতান- মনের জল্পনা-কল্পনা; আত্মনি- আত্মার নির্মল অবস্থায়; এব- অবশ্যই; আত্মনা- বিশুদ্ধ চেতনার দ্বারা; তুষ্টঃ- সন্তুষ্ট; স্থিতপ্রজ্ঞঃ- চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত; তদা- তখন; উচ্যতে- বলা হয়।

গীতার গান

শ্রীভগবান কহিলেনঃ

নিজের ইন্দ্রিয় সুখে যত কাম আছে।

বদ্ধ জীব মনোধর্মে ধায় পাছে পাছে।।

সে সব কামনা ত্যজি আত্ম-ভগবানে।

সম্বন্ধ জানিয়া ক্রমে হয় আগুয়ানে।।

তখন জানিবে তুষ্ট স্থিতপ্রজ্ঞ সুখী।

এ ছাড়া আর যে লোক সকলেই দুঃখী।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।

তাৎপর্যঃ শ্রীমদ্ভাগবতে দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ কৃষ্ণভাবনাময় মানুষ অর্থাৎ ভগবদ্ভক্তের মধ্যে মহৎ মুনি-ঋষিদের সমস্ত গুণাবলী পরিলক্ষিত হয়; আর যারা ভগবদ্ভক্ত নয়, তাদের  মধ্যে কোন গুণই দেখা যায় না। কারণ, তারা তাদের সীমিত মনের জল্পনা-কল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে থাকে। সুতরাং এখানে যথার্থই বলা হয়েছে যে, জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে সৃষ্ট ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের সব রকমের ইচ্ছা পরিত্যাগ হবে। কৃত্রিমভাবে এই ইচ্ছাকে কখনোই সংবরণ করা যায় না। কিন্তু মানুষ যখন কৃষ্ণভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত করে, তখন কোন রকম বাহ্যিক প্রচেষ্টা ছাড়া আপনা থেকেই এই সমস্ত ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বাসনা প্রশমিত হয়। তাই মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য হচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে ভক্তিযোগের পথ অবলম্বন করা, কেন না এই পথ অবলম্বন করার ফলে সে অচিরেই অপ্রাকৃত চেতনায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। যিনি মহাত্মা তিনি জানেন। তিনি হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যাকালের দাস এবং এই সত্য উপলব্ধির ফলে তিনি নিত্যানন্দ অনুভব করেন। জড় জগৎকে ভোগ করার তুচ্ছ কোন বাসনাই তখন আর তাঁর থাকে না। তিনি তাঁর প্রকৃত স্বরূপে পরমেশ্বরের নিত্য সেবায় মগ্ন থেকে সদাই সুখে থাকেন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x