শ্লোকঃ ৪৭

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচান।

মা কর্মফলহেতুর্ভুর্মা তে সঙ্গোহস্তকর্মণি ।। ৪৭ ।।

কর্মণি- নির্ধারিত কর্মে; এব- কেবলমাত্র; অধিকারঃ- অধিকার; তে- তোমার; মা- না; ফলেষু- কর্মফলে; কদাচান- কখনো; মা- না; কর্মফল- কর্মফলের; হেতুঃ- কারণ; ভূঃ- হয়ো; মা- না; তে- তোমার; সঙ্গঃ- আসক্তি; হস্তু- হোক; অকর্মণি- স্বধর্ম অনুষ্ঠান না করায়।

গীতার গান

নিজ অধিকার মাত্র কর্ম করে যাও।

কর্মফল নাহি চাও আসক্তি ঘুচাও।।

কর্মফল হেতু সদা না হইবে তুমি।

অনুকূল কর্ম যেই সেই কর্ম ভূমি।।

অনুবাদঃ স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কখনো নিজেকে কর্মফলের হেতু বলে মনে করো না, এবং কখনো স্বধর্ম আচরণ না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।

তাৎপর্যঃ এখানে আমাদের তিনটি জিনিস সম্বন্ধে বিবেচনা করতে হবে- (১) কর্তব্যকর্ম, (২) খেয়ালখুশি মতো কর্ম এবং (৩) নৈষ্কর্ম। কর্তব্যকর্ম হচ্ছে প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা বদ্ধ অবস্থায় জাগতিক কর্ম। খেয়ালখুশি মতো কর্ম হচ্ছে শাস্ত্র অথবা গুরুদেবের অনুমোদন ব্যতীত কর্ম এবং কর্তব্যকর্ম সম্পাদন না করাকে বলা হয় নৈষ্কর্ম। ভগবান অর্জুনকে নিষ্কর্মা না হতে উপদেশ দিয়েছেন। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, কর্মফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে তাঁর কর্তব্যকর্ম করে যেতে। কারণ, মানুষ যখন তার কর্মফলের প্রত্যাশা করে, তখন সে কার্য-কারণে জড়িত হয়ে জড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবেই সে কর্মফলের ফলস্বরূপ সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করে।

কর্তব্যকর্মকে আবার তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- বিধিবদ্ধ কর্ম, সঙ্কটকালীণ কর্ম ও আকাঙ্ক্ষিত কর্ম। কোন রকম ফলের প্রত্যাশা না করে শাস্ত্রের অনুশাসন অনুসারে বিধিবদ্ধ কর্তব্যকর্ম হচ্ছে স্বত্বগুণের কর্ম। ফলের প্রত্যাশা করে যে কর্ম করা হয়, তা সত্ত্ব, রজ অথবা তম, যে গুণের প্রভাবেই করা হোক না কেন, তা অশুভ। কারণ, ফলের প্রত্যাশা করা মানেই কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কর্তব্যকর্ম সকলকেই করতে হয়, কিন্তু কোন রকম ফলের প্রত্যাশা না করে নিরাসক্তভাবে সেই কর্ম করতে হয়, এই প্রকার ফলের আশাহীন কর্তব্যকর্ম নিঃসন্দেহে মুক্তির পথে চালিত করে।

ভগবান তাই অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ফলাফল না ভেবে নিরাসক্ত ভাবে যুদ্ধ করে তাঁর কর্তব্যকর্ম করে যেতে। তাঁর যুদ্ধে যোগ না দেওয়াও ছিল অন্য এক প্রকারের আসক্তি। এই প্রকার আসক্তি কাউকে মুক্তির পথে চালিত করে না। হ্যাঁ ব্যাচক অথবা না বাচক, যে কোন প্রকার আসক্তিই বন্ধনের কারণ। কর্তব্যকর্ম থেকে নিষ্কর্মার মতো বিরত থাকা পাপ, তাই কর্তব্যবোধে যুদ্ধ করাই ছিল অর্জুনের পক্ষে মুক্তির একমাত্র শুভ পথ।

শ্লোকঃ ৪৮

যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্তা ধনঞ্জয়।

সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ।। ৪৮ ।।

যোগস্থঃ- যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে; কুরু- কর; কর্মাণি- তোমার কর্তব্যকর্ম; সঙ্গম- আসক্তি; ত্যক্তা- পরিত্যাগ করে; ধনঞ্জয়- হে অর্জুন; সিদ্ধি-অসিদ্ধ্যোঃ- সাফল্য ও ব্যর্থতায়; সমঃ- সমভাবে; ভূত্বা- হয়ে; সমত্বম- সমতা; যোগঃ- যোগ; উচ্যতে- বলা হয়।

গীতার গান

যোগী হয়ে কর কর্ম আসক্তি রহিত।

আসক্তি রহিত কর্ম ভগবানে প্রীত।।

ধনঞ্জয়! সঙ্গ ত্যজি কর্ম করে যাও।

সিদ্ধি বা অসিদ্ধি সম বৈষম্য ঘুচাও।।

এই সমভাব হয় যোগসিদ্ধি নাম।

সেই সিদ্ধিলাভে পূর্ণ সর্ব মনস্কাম।।

অনুবাদঃ হে অর্জুন! ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তিযোগস্থ হয়ে স্বধর্ম-বিহিত কর্ম আচরণ কর। কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয়।

তাৎপর্যঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যোগে যুক্ত হয়ে কর্ম করার নির্দেশ দিচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যোগ বলতে কি বোঝায়? যোগের অর্থ হচ্ছে, সদা চিত্তচাঞ্চল্যকারী ইন্দ্রিয়াদি সংযম করে একাগ্রচিত্তে পরমেশ্বরের ধ্যান করা। পরমেশ্বর কে? সর্ব কারণের কারণ পরমেশ্বর হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। এখানে যেহেতু তিনি নিজেই অর্জুনকে যুদ্ধ করতে আদেশ করছেন, সুতরাং সেই যুদ্ধের ফলাফলের প্রতি তাঁর আসক্ত হওয়া উচিত নয়। আর তার লাভ অথবা জয় নির্ভর করছে শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার উপর। অর্জুনের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে যুদ্ধ করা। ভগবানের আদেশ পালন করাই হচ্ছে প্রকৃত যোগ এবং কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে এই যোগের অনুশীলন করা হয়। ভগবদ্ভক্তির প্রভাবেই কেবল অহংকারমুক্ত হওয়া সম্ভব। ভগবানের দাসত্ব বা ভগবানের দাসের দাসত্ব বরণ করার ফলে অন্তরে ভগবদ্ভক্তির বিকাশ হয় এবং তখন বিজিতেন্দ্রিয় হয়ে যোগের সাধন করা সম্ভব হয়।

অর্জুন ছিলেন ক্ষত্রিয় এবং সেই হেতু শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে তিনি বর্ণাশ্রম-ধর্মের আচরণ করতেন। বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, বর্ণাশ্রম-ধর্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুকে তুষ্ট করা। জড় জগতের নীতি হচ্ছে যে, কারোই নিজেকে সন্তুষ্ট করা উচিত নয়, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করা উচিত। তাই কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট না করে, তবে সে বর্ণাশ্রম-ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। এভাবে ভগবান অর্জুনকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তাঁর নির্দেশ অনুসারে কর্ম করাই হচ্ছে তাঁর একমাত্র কর্তব্য।

শ্লোকঃ ৪৯

দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ধনঞ্জয়।

বুদ্ধৌ শরণমম্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ।। ৪৯ ।।

দূরেণ- দূরে পরিত্যাগ করে; হি- যেহেতু; অবরম- নিকৃষ্ট; কর্ম- কর্ম; বুদ্ধি-যোগাৎ- ভগবদ্ভক্তির বলে; ধনঞ্জয়- হে ধনঞ্জয়; বুদ্ধৌ- সেই প্রকার চেতনায়; শরণম- পূর্ণ শরণাগতি; অম্বিচ্ছ- চেষ্টা কর; কৃপণাঃ- কৃপণেরা; ফলহেতবঃ- ফলাকাংখী ব্যক্তিগণ।

গীতার গান

বুদ্ধিযোগ দ্বারা ছাড়া কর্ম অবরাদি।

কাম কৃষ্ণ কর্মার্পণে না হও বিষাদী।।

অনুক্ষণ সেই বুদ্ধে শরণাগতি যার।

কৃপণের ফল হেতু ইচ্ছা নহে তার।

অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! বুদ্ধিযোগ দ্বারা ভক্তির অনুশীলন করে সকাম কর্ম থেকে দূরে থাক এবং সেই চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের শরণাগত হও। যারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করতে চায়, তারা কৃপণ।

তাৎপর্যঃ যে মানুষ বুঝতে পেরেছেন, তিনি ভগবানের নিত্যদাস, তিনি তখন তাঁর সমস্ত  কর্ম ত্যাগ করে ভক্তি সহকারে ভগবৎ-সেবায় ব্রতী হন। পূর্বে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, বুদ্ধিযোগ হচ্ছে ভগবানের অপ্রাকৃত সেবা। এই সেবাই হচ্ছে সমস্ত জীবের যথার্থ কর্তব্যকর্ম। একমাত্র কৃপণেরাই তাদের স্বকর্মফল ভোগের বাসনা করে, ফলে তারা পুনরায় জাগতিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভক্তিযুক্ত কর্ম ছাড়া আর আর সমস্ত কাজকর্মই ঘৃণ্য, কারণ সেই সমস্ত কাজকর্ম মানুষকে নিরন্তর জন্ম ও মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত করে। তাই কখনোই কর্মফলের প্রত্যাশা করা উচিত নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তুষ্ট করার জন্য কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হয়ে সমস্ত প্রকার কাজকর্ম করা উচিত। বহু কষ্ট স্বীকার করে অথবা অসীম সৌভাগ্যের ফলে অর্জিত সম্পদ কিভাবে তার ব্যয় করতে হয়, কৃপণ তা জানে না। সকলেরই উচিত, কৃষ্ণভাবনাময় কাজকর্মে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করা। তাতেই জীবনের সার্থকতা আসবে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত হতভাগ্য মানুষেরা এই অমূল্য সম্পদ পাওয়া স্বত্বেও ভগবানের সেবায় ব্রতী না হয়ে, কৃপণের মতো এই অমূল্য সম্পদের অপচয় করে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x