সাঁইবাবার বিভূতি

সাঁইবাবার নামের সঙ্গে ‘বিভূতি’র ব্যাপারটা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, সাঁইবাবা বললেই তাঁর অলৌকিক বিভূতির কথাই আগে মনে পড়ে। সাঁইবাবা অলৌকিক প্রভাবে তাঁর শূন্য হাতে সুগন্ধি পবিত্র ছাই বা বিভূতির সৃষ্টি করে ভক্তদের বিতরণ করেন। বছরের পর বছর মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভক্তেরা দেখে আসছেন সাঁইবাবার বিভূতি সৃষ্টির অলৌকিকের লীলা।

১৯৮৪’র ১ মার্চ, ২ এপ্রিল, ২ মে ও ১ জুন সাঁইবাবাকে চারটে চিঠি দিই। কিন্তু আর পর্যন্ত একটি চিঠিরও উত্তর পাইনি। আমার ইংরেজিতে লেখা প্রথম চিঠিটির বাংলা অনুবাদ এখানে দিলাম।

ভগবান শ্রী সত্যসাঁইবাবা

প্রশান্তিনিলায়ম                       ২৮৭ দমদম পার্ক

পুট্টাপাটি                                 কলকাতা- ৫৫

জেলা- অনন্তপুর                    পিন-৭০০ ০৫৫

অন্ধপ্রদেশ                              ১.৩.১৯৮৪

বিভূতি আনার কৌশল

প্রিয় সত্যসাঁইবাবা,

ভক্ত ও শিষ্য সংখ্যার বিচারে আপনিই সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয়তম ধর্মগুরু। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আপনারা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার সম্বন্ধে অনেক কিছু পড়েছি এবং আপনার কিছু ভক্তের কাছে আপনার সম্বন্ধে অনেক কিছু শুনেছি। আপনার অলৌকিক খ্যাতি প্রধানত ‘বিভূতি’ সৃষ্টির জন্য। পড়েছি এবং শুনেছি যে, আপনি অলৌকিক ক্ষমতাবলে শূন্যে হাত নেরে ‘পবিত্র ছাই’ বা ‘বিভূতি’ সৃষ্টি করেন এবং কৃপা করে কিছু কিছু ভাগ্যবান ভক্তদের তা দেন।

আমি অলৌকিক ক্ষমতার বিষয়ে জানতে অত্যন্ত আগ্রহী। অলৌকিক কোনো ঘটনা বা অলৌকিক ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তির বিষয় শুনলে আমি আমার যথাসাধ্য অনুসন্ধান করে প্রকৃত সত্যকে জানার চেষ্টা করি। দীর্ঘদিন  ধরে বহু অনুসন্ধান চালিয়েও আজ পর্যন্ত একটিও অলৌকিক ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা ঘটনার সন্ধান পাইনি। আমার এই ধরনের সত্য জানার প্রয়াসকে প্রতিটি সৎ মানুষের মতোই আশা করি আপনিও স্বাগত জানাবেন; সেইসঙ্গে এ-ও আশা করি যে, আপনার অলৌকিক ক্ষমতার বিষয়ে অনুসন্ধানে আপনি আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। আপনার পোশাক ও শরীর পরীক্ষা করার পর আপনি আমাকে শূন্যে হাত নেড়ে, ‘পবিত্র ছাই’ বা ‘বিভূতি’ সৃষ্টি করে দেখালে আমি অবশ্যই মেনে  নেব যে, আপনার অলৌকিক ক্ষমতা আছে এবং অলৌকিক বলে বাস্তবিকই কোনও কিছুর অস্তিত্ব আছে।

আপনি যদি আমার চিঠির উত্তর না দেন, অথবা যদি আপনার বিষয়ে অনুসন্ধানের কাজে আমার সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, তবে অবশ্যই ধরে  নেব যে, আপনার সম্বন্ধে প্রচলিত প্রতিটি অলৌকিক কাহিনীই মিথ্যে এবং আপনি ‘পবিত্র ছাই’ বা ‘বিভূতি’ সৃষ্টি করেন কৌশলের দ্বারা, অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা নয়।

শুভেচ্ছান্তে,

প্রবীর ঘোষ

সাঁইবাবাকে লেখা পরের চিঠিগুলোর বয়ান একই ছিল। কোনও চিঠিরই উত্তর পাইনি।

শূন্যে হাত নেড়ে ছাই বের করাটা ঠিকমতো পরিবেশ তেমনভাবে দেখাতে পারলে অলৌকিক বলে মনে হতে পারে।

১৬.৪.৭৮ তারিখের ‘সানডে’ সাপ্তাহিক জাদুকর পি.সি. সরকার জুনিয়র জানান তিনি সাঁইবাবার সামনে শূন্যে হাত ঘুরিয়ে একটা রসগোল্লা নিয়ে আসেন। সাঁইবাবা এই ধরনের ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন।

এর কতটা সত্যি, বা একটুও সত্যি আছে কি না- সন্দেহ আছে। কারণ, সাঁইবাবার আশ্রমের যা পরিকাঠামো দেখেছি, তাতে এভাবে সাঁইবাবাকে তাঁরই আশ্রমে বে-আব্রু করা একেবারেই অসম্ভব।

শূন্যে হাত ঘুরিয়ে রসগোল্লা নিয়ে আসা, এটা জাদুর ভাষায় ‘পামিং’। পামিং হল কিছু কৌশলে, যেগুলোর সাহায্যে ছোটখাটো কোনও জিনিসকে হাতের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়। আমার ধারণা সাঁইবাবা তাঁর ‘পবিত্র ছাই’ পাম করে লুকিয়ে রাখেন না, কারণ প্রচুর ছাই ‘পাম’ করে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সাঁইবাবা যে পদ্ধতিতে ভক্তদের ‘পবিত্র ছাই’ বিতরণ করেন বলে আমার ধারণা আমি সেই একই পদ্ধতিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের সামনে ছাই সৃষ্টি করেছি। প্রতিটি অত্যাশ্চর্য জাদুর মতোই এই খেলাটির কৌশল অতি সাধারণ।

যে অবতার শূন্যে ডান হাতে নেড়ে পবিত্র ছাই বের করতে চান তাঁর ডান বগলে বাঁধা থাকে রবারের বা নরম প্লাস্টিক জাতীয় জিনিসের ছোটখাটো ব্লাডার। ব্লাডার ভর্তি করা থাকে সুগন্ধি ছাই। ব্লাডারের মুখ থেকে একটা সরু-নল হাত বেয়ে সোজা নেমে আসে হাতের কব্জির কাছ বরাবর। পোশাকের তলায় ঢাকা পড়ে যায় ব্লাডার ও নল। এবার ছাই সৃষ্টি করার সময় ডান হাত দিয়ে বগলের তলায় বাঁধা ব্লাডারটায় প্রয়োজনীয় চাপ দিলেই নল বেয়ে হাতের মুঠোয় চলে আসবে পবিত্র ছাই। বাঁ হাত দিয়েও ছাই বের করতে চান? বাঁ বগলেও একটা ছাই-ভর্তি ব্লাডার ঝুলিয়ে নিন। দেখলেন তো, অবতার হওয়া কত সোজা!

বোঝাবার সুবিধের জন্য ছবি দেখুন।

এই পদ্ধতি ছাড়াও বিভূতি সৃষ্টি সম্ভব। ছাইয়ের পাউডারে ভাতের পড় মিশিয়ে লাড্ডু বানিয়ে আলখাল্লার ভিতরের দিকে ‘জাদু চিমটে’র সাহায্যে ঝুলিয়ে রাখা যেতে পারে। জাদুর পরিভাষায় এঁকে বলে ‘লেড’ নেওয়া। তারপর আলখাল্লার তলায় হাত ঢুকিয়ে হাতে লাড্ডু এনে গুঁড়ো করে বিলি করলেই হল। লাড্ডুতে সেন্ট মেশালে ‘সোনায় সোহাগা’।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x