এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার বিচিত্র আমার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন শ্রীসত্যসাঁইবাবার চরণাশ্রিত ‘শিক্ষা আশ্রম ইন্টারন্যাশনাল’ –এর ভাইসচান্সেলারের সেক্রেটারি অগ্নিকা বসাক। প্যাডের কোনায় লেখা Ref. No. 710/88. 10th April 1988. চিঠিটি এখানে তুলে দিলামঃ

মহাশয়,

৩০শে মার্চ ৫ই এপ্রিল ১৯৮৮ –এর সংখ্যায় ‘পরিবর্তন’ –এ আপনার (অ) লৌকিক অভিজ্ঞতার কথা পড়ে আমাদেরও অভিজ্ঞতা হল।

আমাদের আশ্রমের উপাচার্য শ্রী বিভাস বসাকের নির্দেশক্রমে এক (অ) সত্য ঘটনা আপনাকে জানানো যাইতেছে, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা করা আপনার ইচ্ছাধীন।

উনার কাছে শ্রীসত্যসাঁইবাবার সৃষ্টি করা কিছু বিভূতি (ছাই) আছে, যে কেউ রবিবার সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আসতে পারে পরীক্ষা করার জন্য। সম্পূর্ণ খালি পেটে আসতে হবে- সঙ্গে একজন মাত্র দর্শক বা সাক্ষী থাকতে পারে।

বিভূতি জলে গুলে খাইয়ে দেয়া হবে। সন্দেহ নিবারণের জন্য গোলা বিভূতির খানিকটা অংশ উনি নিজেই খেয়ে নেবেন। খাবার তিন দিন পরে কম করে ৬টি, বেশি ১১টি স্বর্ণমুদ্রা পাকস্থলী বা অন্ননালীর কোনও অংশে নিজেই সৃষ্টি হবে। চতুর্থ দিনে কোন সুযোগ্য Surgen-কে দিয়ে oparetion করে বের করা যাবে, বা প্রত্যেকদিন পায়খানা পরীক্ষা করতে হবে ৩০ দিন পর্যন্ত। ঐ সময়ের মধ্যেই ২৫ নঃ পঃ আকৃতিতে স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যাবে।

দক্ষিণা- ৫০০। পশ্চিমবঙ্গ মুখ্যমন্ত্রীর তহবিলে স্বেচ্ছাদান করে রশিদ সঙ্গে আনতে হবে। বিভূতি খাওয়ানো উপাচার্যের ইচ্ছাধীন। পত্রে আলাপ করে পরীক্ষার দিন ধার্য করতে পারেন। আপনি নিজে পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হলেই প্রচার করবেন, নতুবা নয়।‘

চিঠিটা আমাদের সমিতির অনেকেই পড়ে সাঁইবাবার নামের সঙ্গে জড়িত এমন একটা প্রতিষ্ঠানকে কোণঠাসা করার সুযোগ পেয়ে উত্তেজিত হলেন। তাঁরা চাইলেন, আমি বিভূতি খেয়ে ওঁদের বুজরুকির ভান্ডাফোর করি। কিন্তু আমার মনে হল- আপাতদৃষ্টিতে উপাচার্যের চ্যালেঞ্জটা যতটা বোকাসোকা ও নিরীহ মনে হচ্ছে, বাস্তব চিত্র ঠিক তার বিপরীত। এই নিরীহ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর রকমের বিপদজনক হয়ে ওঠার সমস্তরকম সম্ভাবনা।

‘শিক্ষা আশ্রম ইন্টারন্যাশনাল’ –এর উপাচার্যকে আগস্টের শেষ সপ্তাহে চিঠি পাঠিয়ে জানালাম-

আপনি যে অলৌকিক একটি বিষয় নিয়ে আমাকে সত্যানুসন্ধানের সুযোগ দিচ্ছেন তা জন্য ধন্যবাদ। এই অলৌকিক ঘটনা প্রমানিত হলে সাঁইবাবার অলৌকিক ক্ষমতাও প্রমাণিত হবে। কিন্তু পাশাপাশি এও সত্যি- আপনি ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার দায় বর্তাবে কেবলমাত্র আপনার উপর। আপনি কৃতকার্য হলে সাফল্যের ক্রিমটুকু খাবেন সাঁইবাবা। এই ব্যাপারটা আমাদের পছন্দ নয়। আপনার ব্যর্থতার দায় সাঁইবাবা নেবেন কি না, জানতে উৎসুক হয়ে রইলাম। সাঁইবাবার নির্দেশমত বা জ্ঞাতসারেই এই চ্যালেঞ্জ আপনি করেছেন –এটা ধরে নিতেই পারি। কারণ তাঁকে না জানিয়ে তাঁর সম্মান নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস নিশ্চয়ই আপনার হত না। এমন অবস্থায় পরবর্তী পর্বে লিখিতভাবে জানিয়ে দেবেন, এই চ্যালেঞ্জ সাঁইবাবার নির্দেশ অনুসারে/জ্ঞাতসারে হচ্ছে কিনা?

বিভূতিতে বিষ নেই- নিশ্চিত করতে খানিকটা বিভূতি খাবেন জানিয়েছেন। সন্দেহ নিরসনের জন্য আপনারা এই সৎ চেষ্টাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। কিন্তু তারপরও যুক্তির খাতিরে বলতেই হচ্ছে- এতে সন্দেহ নিরসন হয় না। কারণ প্রায় সমস্ত বিষয়েরই প্রতিষেধক বিজ্ঞানের জানা। যুক্তির খাতিরে আমরা যদি ধরে নেই, আপনি বিভূতিতে বিষ মেশাবেন, তবে বিষয়টির প্রতিষেধক আপনার ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। আমি অজানা বিষ খেয়ে ফেললে মৃত্যুই অনিবার্য হয়ে উঠবে। তিন দিনের মধ্যে আমি মারা গেলে পেটে সোনার টাকা তৈরি হওয়ার প্রশ্নই থাকবে না।

এই মৃত্যুর জন্য আপনাকে দায়ী বলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ আমি যে বিভূতি খেয়েই মারা গেছি- তার প্রমাণ কি? আমি যে মৃত্যুর আগে অন্য কিছু খাওয়ার সময় বিষ গ্রহণ করিনি, তার প্রমাণ কি? খাবারে বিষ মিশে যেতে পারে, কেউ শত্রুতা করে বিষ খাওয়াতে পারে, এমনকি নিজেই কোনও কারণে বিষ খেতে পারি।

এই অবস্থায় আপনার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখছি-

(১)  যে কোন প্রাণীকে বিভূতি খাইয়েই যদি তিনদিন পরে পেটে সোনার টাকা তৈরি করে অলৌকিকত্ব প্রমাণ করা যায়, তবে আমাকে নিয়ে আর টানাটানি কেন? পরীক্ষার জন্য ছাগল-টাগল কিছুকে বেছে নেওয়া যেতে পারে।

(২) ছাগলটিকে আগের রাতেই আপনার আশ্রমে নিয়ে আসবো আমরা। উদ্দেশ্য বিভূতি খাওয়ার আগে পর্যন্ত ছাগলটি যে সম্পূর্ণ খালি পেতে আছে, সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত করা।

(৩) সঙ্গে নিয়ে আসবো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া ৫০০ টাকার রশিদ।

(৪) ছাগলটিকে বিভূতি খাওয়াবার পর ছাগলটি আমাদের, আপনাদের ও ইচ্ছুক সাংবাদিকদের পাহারায় থাকবে। উদ্দেশ্য- আপনারা যাতে কোনও ভাবে ছাগলটিকে স্বর্ণমুদ্রা খাওয়াতে না পারেন।

(৫) ছাগলটিকে বটপাতা, কাঁঠালপাতা জাতীয় খাবার খাওয়ানো হবে। খাবারের যোগান দেবেন আপনারা। উদ্দেশ্য যাতে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মারা গেলে আপনাদেরকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

(৬)  তিনদিন পর ছাগলটির পেটে এক্স-রে দেখা হবে সোনার টাকা তৈরি হয়েছে কি না। (তখন ‘চ্যালেঞ্জ মানি’ ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা।)

(৭) টাকা তৈরি হলে সাঁইবিভূতির অলৌকিক ক্ষমতা প্রমাণিত হবে। আমি পরাজয় মেনে নিয়ে আপনার হাতে প্রণামী হিসেবে তুলে দেব পঞ্চাশ হাজার টাকা।

(৮) ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এই অলৌকিকত্ব দেখার পর সঙ্গত কারণেই আর অলৌকিকত্বের বিরোধীতা না করে সত্য-প্রচার করবে এবং আমাদের সমিতির সদস্যরা প্রত্যেকে সাঁইবাবার কাছে দীক্ষা নেবে।

আপনার তরফ থেকে পেটে টাকা তৈরির বিষয়ে অন্য কোনও গভীর পরিকল্পনা না থাকলে, এবং বাস্তবিকই বিভূতির অলৌকিক ক্ষ্মতায় আপনি প্রত্যয়ী হলে আমার এই প্রস্তাবগুলো নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন। প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর আমরা ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি ‘প্রেস কনফারেন্স’ করে বিষয়টা সাংবাদিকদের জানাব। তারপর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আমরা পরীক্ষার দিন ধার্য করে সাংবাদিকদেরও এই সত্যানুসন্ধানে অংশ নিতে আহ্বান জানাব।

এই পরীক্ষায় আপনি কৃতকার্য হলে তা আমার পরাজয় হবে না; হবে সত্যকে খুঁজে পাওয়া।

আপনার ইতিবাচক চিঠির প্রত্যাশায় রইলাম।

উত্তর পেলাম সেপ্টেম্বরে। অগ্নিকা উপাচার্যের পক্ষে আমাকে জানালেন- আপনি নিজে প্রাণভয়ে ভীত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন অবলা, নিরীহ একটি প্রাণীকে। একটি ছাগল বা মুরগির প্রাণ কি প্রাণ নয়? তাদের প্রাণ কি মানুষের প্রাণের চেয়ে কম মূল্যবান? আপনার ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা আমাদের ব্যথিত করেছে।

অলৌকিকতার প্রমাণ চাইতে হলে এর আপনাকেই বিভূতি খেতে হবে। আপনার কোনও পরিবর্তন চলবে না। আপনি এতে রাজি থাকলে প্রেস কনফারেন্স হাজির থাকতে আমরা রাজি।

১১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ রবিবার প্রেস কনফারেন্স করব ঠিক হল। প্রেস কনফারেন্স প্রেস ক্লাবে না করে ময়দান টেন্টে করব ঠিক করলাম। ময়দান টেন্টটা ডাঃ অরুণকুমার শীলের।

৯ ডিসেম্বর ‘আজকাল’-এ এবং ১০ ডিসেম্বর ‘গণশক্তি’ –তে প্রকাশিত হল ১১ ডিসেম্বর ময়দানে হতে যাওয়া লড়াইয়ের খবর।

এসে গেল ১১ ডিসেম্বর। The Telegrapsh পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তলায় চার কলম জুড়ে (পত্রিকার পরিভাষায় একে বলে anchor story, যা অতি গুরুত্বপূর্ণ) আমার ছবি ও প্রেস কনফারেন্সের খবরটি ছাপা হল। খবরটি শিরোনাম ছিল ‘Calcuttan to take on Satya Sai Baba’

১২ ডিসেম্বর The Telegraph পত্রিকায় আবার ৪ কলম জুড়ে খবর। চ্যালেঞ্জে কেউ এল না। সব পত্রিকায় সেদিন খবরটি বেরিয়ে ছিল ছবি সমেত।

১১ ডিসেম্বর এসে গেল। সকাল হওয়ার আগেই তাঁবুতে জায়গা নিয়েছি। দুপুর থেকে তাঁবুর লনে পড়েছে কয়েকশ চেয়ার। বিকেলে প্রেস কনফারেন্স শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি পত্র-পত্রিকা ও প্রচার-মাধ্যমের প্রতিনিধিরা টেন্ট ভরিয়েছেন। খবর শুনে এসেছেন দিল্লি, বম্বে, মাদ্রাজের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাংবাদিক। চারটেতে প্রেস কনফারেন্স শুরু করার কথা। তাই শুরু হল। তবে তখনও উপাচার্য, তাঁর সচিব বা কোনও প্রতিনিধির দেখা নেই। মাইকে বার কয়েক আহ্বান জানানো হল, তাঁরা থাকলে যেন এগিয়ে আসেন। এগিয়ে এলেন না। সাঁইবাবার বিভূতি লীলার মতোই এও এক লীলা। নিজের বিভূতির গপ্পো প্রচার, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া এবং চ্যালেঞ্জ গৃহীত হওয়ার পর আপন খেয়ালে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। পুরাণের কূর্ম অবতার চরিত্রটি সাঁইবাবার সম্ভবত সবচেয়ে পছন্দসই। তাই সাঁই অবতারের মধ্যেও বিপদে খোলসে মুখ লুকোবার প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

বিস্তৃত জানতে পড়তে পারেন ‘যুক্তিবাদীর চ্যালেঞ্জাররা’ ১ম খন্ড।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x