‘সমাজ’ মানুষ জাতির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। মনুষ্যেতর জীবের মধ্যেও সামাজিকতা দৃষ্ট হয়। সমাজজীবনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে – সহ-অবস্থান, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি। এ সমস্ত গুণ পশু, পাখি, মৎস্য ইত্যাদি কোন কোন ইতর জীবের মধ্যেও দেখা যায় এবং কোনো কোনো কীট-পতঙ্গের মধ্যেও বিরল নয়। পিপীলিকা, ,মধুমক্ষিকাও সমাজজীবন যাপন করে থাকে। এমনকি অনেক জাতের জীবানুও সমাজজীবন যাপন করে। পাঁচড়া, ফোঁড়া, বসন্ত ইত্যাদি স্ফোটক জাতীয় অনেক রোগের কারণ হচ্ছে জীব দেহের কোন স্থানে বিশেষ বিশেষ জাতের জীবানুদের  সঙ্ঘবদ্ধ সহ-অবস্থান। আর ‘সঙ্ঘবদ্ধ ও সহ-অবস্থান’ যদি মানুষের গুণ হয়, তবে ওটাও ওদের গুণ। কেননা ওরা তো আর জানে না বা বোঝে না যে, ওরা কোথায় বাস করছে, কারো ক্ষতি করছে, এমনকি কি কারো জীবনান্ত ঘটাচ্ছে। যা হোক, বলা যায় যে, মনুষ্যেতর জীবের মধ্যে সামাজিকতা আছে। কিন্তু ওদের সংস্কৃতি নেই। ওদের সে সামাজিকতা একই ধারায় প্রবাহিত হয়ে আসছে আদিম কাল থেকে আজ পর্যন্ত। আসল পার্থক্য হল- মানুষ সংস্কৃতিবান, ইতর প্রাণী তা নয়।

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ

‘অসভ্য’ বিশেষণটা বজায় থাকলেও মানুষ যখন ‘পশু’ আখ্যাটা দূর করে ‘মানুষ’ আখ্যা পেয়েছিলো- আহার, বিহার ইত্যাদি অনেক বিষয়ে তখনো তারা ছিল কতকটা পশুর মতোই। অতঃপর ধাপে ধাপে মানুষের সমাজ ও সভ্যতা হয়ে চলেছে ঊর্ধ্বগামী। সে ঊর্ধ্বগামীতার প্রধান প্রধান ধাপ গুলোর মধ্যে কতিপয় ধাপের উল্লেখ করছি।

আদিম ও মধ্যযুগীয় সভ্যতা

১. আগুন আবিষ্কার – আদিম কালের মানুষরা অন্ধকারেই বাস করতো।  এমনকি কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দেখতে পেতো না রাতে এবং মাছ-মাংশ খেতে হতো কাঁচা। শীত নিবারণ করা, মাছ-মাংশ সিদ্ধ করে খাওয়া ইত্যাদি অভিনব কাজ মানুষের আয়ত্বে এলো আগুন আবিষ্কারের পরে।

২. কৃষি ও পশুপালন – পূর্বে মানুষের আহারের ব্যবস্থা ছিলো পশু-পাখিদের মতোই। লড়ে-ঝাঁপিয়ে ও কুড়িয়ে যা পাওয়া যেতো, তা দিয়েই খেয়ে-না-খেয়ে দিন কাটাতে হতো। খাদ্যের ব্যাপারে মানুষ স্বাবলম্বী হতে পেরেছে কৃষি ও পশুপালন প্রথা প্রবর্তনের পরে।

৩. ধাতু ও গৃহ – আদিম মানবরা পর্বতের গুহায় বা বৃক্ষকোটরে বাস করতো এবং মাছ-মাংশ খেতো থেতিয়ে বা ছিঁড়ে। কেননা ‘হাতিয়ার’ বলতে তাদের কিছুই ছিল না হাতের বা দাঁতের জোর এবং পাথর ছাড়া। মানুষ পশুত্বের সীমানা পার হয়েছে- ধাতু ও গৃহ আবিষ্কারের পরে। বিশেষত লৌহ আবিষ্কারের ফলে।

৪. তাঁত – আদিম মানুষরা উলঙ্গই থাকতো এবং গাছের ছাল ও পাতা বা পশুর চামড়া পরিধান করতো। বসনে-ভূষণে মানুষ সজ্জিত হয়েছে তাঁত আবিষ্কারের পরে।

৫. মাল বহনে পশু ও চাকা আবিষ্কার – পূর্বে মাল বহনের কাজে মানুষ ব্যবহার করতো হাত, মাথা, ঘাড় ও পিঠ। যানবাহনের দ্রুত উন্নতি ঘটে মাল বহনে পশু ও চাকা ব্যবহারের পরে।

৬. নৌকা ও পাল – সাগর বা নদী পারাপার তো দূরের কথা, পয়ঃপ্রণালীও পার হতে পারতো না মানুষ সাঁতার কাটা ছাড়া। নৌকা ও পাল আবিষ্কার মানুষকে দান করেছে জলের উপর রাজত্ব।

(৭) লিপি ও কাগজ – একের মনোভাব অন্যকে জানাতে হলে মৌখিক আলাপ-আলোচনা বা অঙ্গভঙ্গি ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না আদিম মানবদের। চিত্রলিপি আবিষ্কৃত হলে লেখার পাতা হয় গুহাপ্রাচীর, পর্বতগাত্র ইত্যাদি এবং অক্ষর আবিষ্কারের পর ব্যবহৃত হয় মৃৎচাক্তি, শিলাখন্ড, পশুচর্ম, ধাতুপাত, বৃক্ষপত্র ইত্যাদি। এ দেশে তাল, কদলি, ভূর্জ ইত্যাদি বৃক্ষপত্রে লিখন প্রচলিত ছিলো কিছুদিন আগেও। আমিও আমার শৈশবে লিখেছি – স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ তালপাতায় এবং বানান-ফলা কলাপাতায়। মানব সভ্যতার সীমাহীন বিস্তৃতির মূলে রয়েছে লিপি ও কাগজ আবিষ্কার।

আদিম যুগের সভ্যতা ও অর্ধসভ্য মানুষ উপরোক্ত ধাপগুলো পেরিয়ে যখন অসভ্যজগত থেকে সভ্যজগতের সীমানায় পা দিয়েছিলো, তখন শুরু হয় মানুষের ন্যায় ও অন্যায় কাজের বিচার-বিশ্লেষণ। অর্থাৎ সৎ ও অসৎ কাজের ভাগাভাগি। এর ফলে উদ্ভব হয় মানুষের ধর্ম ও রাষ্ট্রের।

(৮) রাষ্ট্র –  এ কথাটি প্রথমেই স্বীকার্য যে, মানব-সভ্যতা বা সমাজ-উন্নয়নের একটি মস্তবড় ধাপ হচ্ছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এর পূর্বে মানব সমাজে ন্যায়-নীতি ছিলো না, তা নয়। তবে তা ছিলো ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা স্বেচ্ছাধীন। সৎ ও অসৎ কাজের ব্যাপক ও পাকাপোক্ত ভাগাভাগি সুদৃঢ় হয় ধর্ম ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে। আদিম যুগের সেই পুরোহিততন্ত্রের আমল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে ধর্ম ও রাষ্ট্রের কঠিন শাসন। এবং মানুষ এখন পৌঁছে গেছে সভ্যতা ও সমাজ-উন্নয়নের চরম শিখরে। কিন্তু বিশ্ব-মানবসমাজে আজও কি পরিপূর্ণ ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এ বিষয় পরে আলোচিত হবে।

আধুনিক সভ্যতা

(৯) বাষ্পীয় শক্তি – প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সভ্যতার উৎস হচ্ছে বাষ্পীয় শক্তির আবিষ্কার। এ শক্তিটি আবিষ্কারের পূর্বে যে সকল মামুলি ধরণের যন্ত্র বানানো হতো, মতা চালানো হতো মানুষ বা পশুশক্তিতে এবং তাতে কাজ পাওয়া যেতো সামান্য। তখনো কোন কোন দেশে রেল বসানো রাস্তা ছিল, কিন্তু তাতে মালগাড়ি চলতো গাধার সাহায্যে এবং ঘোড়ার সাহায্যে চলতো ডাকগাড়ী। ফলত মানুষের মানুষের সমাজ জীবনের মানোন্নয়নের একটি প্রধান ধাপ হচ্ছে বাষ্পীয় শক্তির আবিষ্কার।

(১০) বৈদ্যুতিক শক্তি – বিদ্যুৎ দ্বারা বর্তমান দুনিয়ার বহু অসাধ্য কাজ সাধন করা হচ্ছে। বিশেষত বিদ্যুৎভিত্তিক আবিষ্কারগুলোই অতিশয় আশ্চর্যজনক, বলা যায় অলৌকিক। বিদ্যুৎ শক্তি মানুষকে পৌঁছে দিয়েছে এক যাদুর রাজ্যে।

(১১) পারমানবিক শক্তি – মানুষ আজ পর্যন্ত প্রকৃতির গর্ভে যত রকম শক্তির সন্ধান পেয়েছে, তন্মধ্যে পারমানবিক শক্তি অতুলনীয়। এ শক্তিটি মানব-কল্যাণের অসংখ্য সম্ভাবনায় ভরপুর। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে বহুবিধ জনহিতকর কাজে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু নাগাসাকি ও হিরোশিমার বিষাদময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটাবার নিশ্চয়তা বিধান এখনো হয়নি। শান্তিবাদীরা যেমন একে সৃজনাত্মক হাজে ব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে চেষ্টা চালাচ্ছেন, তেমন সম্রাজ্যবাদীরা এর ধ্বংসত্মক শক্তির উৎকর্ষ সাধনের জন্য চেষ্টা চালচ্ছেন গোপনে।

পরম সুখের বিষয় এই যে, বর্তমানে প্রায় সকল রাষ্ট্রই পারমানবিক শক্তিকে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে এবং বিজ্ঞানীগণ কৃষি, চিকিৎসা নানা ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহারের গবেষণা চালাচ্ছেন। বিজ্ঞানীদের কাছে এখন আর ‘অসম্ভব’ বলে বেশি কিছুই নেই।  এ পারমানবিক মহাশক্তির দ্বারা হয়তো সম্ভব হবে মেরূ অঞ্চলকে উত্তপ্ত এবং মরু অঞ্চলকে শীতল ও উর্বরা কে উভয়ত প্রাণীবাসের সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা, জীবকোষের স্বাভাবিক ক্ষয় রোধ বা পূরণ করে জীবকে অমর বা দীর্ঘায়ু করা এবং হয়তোবা সম্ভব হবে প্রাণ সৃষ্টি করাও।

এযাবৎ মানব সভ্যতার ক্রমোন্নতির প্রধান প্রধান যে ক’টি ধাপের উল্লেখ করা হল, তার মধ্যে প্রায় সবগুলো ধাপই হচ্ছে আন্তর্জাতিক, অর্থাৎ বিশ্বমানবের সম্পদ; শুধুমাত্র ধর্ম ও রাষ্ট্র ছাড়া। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে পারমানবিক শক্তি আবিষ্কার পর্যন্ত অন্য কোন আবিষ্কারেই আঞ্চলিকতা নেই, কিন্তু ধর্ম ও রাষ্ট্র হচ্ছে আঞ্চলিকতায় ভরপুর।

মানুষ সমাজী জীব এবং তারা সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে আসছে আদিম কাল থেকেই। তবে সেকালের সেই সমাজ ছিলো একান্তই ঘরোয়া সমাজ। এককালে এক একটি বংশের ছিল এক একটি সমাজ। তাকে বা হয় বংশগত সমাজ বা ক্লান। আবার কয়েকটি বংশগত সমাজ বা ক্লান একত্র হয়ে একটি মাঝারি ধরনের সমাজ গড়ে উঠতো, যাকে বলা হয় আঞ্চলিক সমাজ বা ট্রাইব। ক্লান বা ট্রাইবের সকল সদস্যরা মিলেমিশে উপার্জন ও ভোগ করতো। ‘ব্যক্তিগত’ সম্পদ বলে কারো কিছু তখন ছিলো না। এরূপ সমাজকে বলা হয় বাদিম সাম্যবাদী সমাজ। কোনো কোনো সময় কতিপয় ট্রাইব একত্র হয়ে একটি বড় সমাজ গঠিত হতো, যাকে বলা হয় কনফেডারেসি অব ট্রাইবস বা রাষ্ট্র।

কিন্তু সব ক্ষেত্রেই যে একাধিক ট্রাইব সমাজের সদস্যরা মিলেমিশে রাষ্ট্রীয় সমাজ গঠন করতো, তা নয়।  কোনো কোনো সময় নিজ ট্রাইবের সদস্যদের জীবন ধারণোপযোগী আহার্যের অভাব হলে, তখন তারা পার্শ্ববর্তী ট্রাইবের উপর চড়াও হতো এবং জোরপূর্বক তাদের অঞ্চল দখল করতো। এভাবেও একাধিক ট্রাইব যুক্ত হয়ে জন্ম নিতো কোনো কোনো কনফেডারেসি অব ট্রাইবস বা রাষ্ট্র। এরূপ অভিযানে বা রাষ্ট্র গঠনের কাজে নেতৃত্ব করার মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা যে ব্যক্তির থাকতো, সে-ই হতো নবীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বা রাজা। অর্থাৎ শুরু হল ‘জোর যার মুল্লুক তার’।

শেষোক্ত যে সমস্ত রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিলো, সেসব ক্ষেত্রে নবীন রাষ্ট্রের বিজিতরা পরিণত হয়েছিল বিজয়ীদের বিশেষত রাজার আজ্ঞাবহ দাসে। বিজিতরা দাসরূপে শ্রম দ্বারা যা উৎপন্ন করতো, তা ভোগের মালিক তারা ছিলো না, ভোগ করতো বিজয়ী প্রভুরা। এভাবে কনফেডারেসি অব ট্রাইবস বা রষ্ট্র গঠনের প্রাক্কাল থেকেই আদিম সাম্যবাদী সমাজ দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। যথা- রাজা ও প্রজা, দাস ও প্রভু, শাসক ও শোষিত, ধনী ও ভিখারী ইত্যাদি বহুরূপে। বিশেষত এ সময় থেকেই উদ্ভব হয়েছিলো সম্পদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা স্বত্বের। হাজার হাজার বছর পূর্বে আদিম যুগের রাষ্ট্র গঠনের প্রথম পর্যায়ে রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, ধনতন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র ইত্যাদি যে সমস্ত মানবতাবিরোধী তন্ত্র প্রবর্তিত হয়েছিলো, আজও তা বিজয়গর্ভে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন দেশে।

উপরোক্ত তন্ত্র সমূহ ছাড়া আধুনিক যুগে আরও দুইটি নতুন তন্ত্র প্রবর্তিত হচ্ছে বা হতে চলেছে। তা হল- গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। কিন্তু বিশ্বের দরবারে এ দুটি তন্ত্র এখনো ব্যাপক ও অনড় আসন পেতে বসতে পারেনি পূর্বপ্রচলিত তন্ত্রসমূহের মতো।

‘জোর যার, মুল্লুক তার’ – এ নীতির উপর যে সমস্ত তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত, সেসব তন্ত্র তন্ত্রীদের সংখ্যা কোথায়ও বেশি নয়। কেননা, ওর কোনো তন্ত্রই বিশ্বমানবের বা সংখ্যাধিক্যের কল্যাণে নিয়োজিত নয়। তাই ওগুলোকে ‘মানবতন্ত্র’ বলা যায় না। কিন্তু গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রকে ‘মানবতন্ত্র’ বলা যায়। কারণ, এ দুটো তন্ত্রই হচ্ছে বিশ্বমানবের পক্ষে  কল্যাণকর।

বর্তমান যুগটি হচ্ছে গণতন্ত্রের যুগ। কেননা, বর্তমানে রাজতন্ত্র, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি স্বৈরতন্ত্র কোথায়ও প্রচলিত নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে ওগুলোর যাবতীয় কাজই চলে আসছে ধনতন্ত্রীদল বা বুর্জোয়াদলের কারসাজিতে। গণতন্ত্রের নামে দেশে স্বৈরতন্ত্রই চলছে এখন – ছলে, বলে বা কৌশলে।

‘বিশ্ব মানব সমাজ’ নামে কোনো একক সমাজ নেই। সমাজ বহু শ্রেণী-উপশ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে আছে বহুরূপে। ধর্ম, রাষ্ট্র, বৃত্তি বা পেশা ইত্যাদি ভেদে অসংখ্য সমাজ রয়েছে এখন দেশে দেশে। ধর্মভেদে সেসব ভিন্ন ভিন্ন সমাজ গঠিত হয়ে থাকে, সেসব সমাজের সদস্যদের রীতি, নীতি ও আচার-আচরণে যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। কিন্তু বর্তমান যুগে তা ততোটা দ্বন্দ্বমূলক হয় না। কেননা, তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ আর্থিক সম্পর্ক থাকে না। যেমন- হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খৃস্টান ইত্যাদি বিভিন্ন সমাজভুক্ত মানুষ এদেশে সহঅবস্থান করে আসছে শত শত বছর যাবত নির্ঝঞ্ঝাটে। যদিও ক্বচিৎ এসব সমাজের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তবে তা ঘটেছে স্বার্থবাদী কোনো ব্যক্তি বা দলবিশেষের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ও তাদের প্ররোচনায়। কিন্তু বৃত্তিভিত্তিক সমাজে থাকে আর্থিক সম্পর্ক। তাই তাদের মধ্যে চলতে থাকে স্বার্থের লড়াই। আর এরূপ লড়াই-ই চলছে বর্তমান জগতে – কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারা ও ধনতন্ত্রী সমাজের মধ্যে।

মধ্যযুগের ন্যায় এ যুগের মানুষের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ নেই। এর কারণ হচ্ছে এই যে, মরণান্তে পরকালে স্বর্গে গিয়ে অনন্তকাল রত্মময় প্রাসাদে বসে সুস্বাদু ফল খাবে, না নরকে গিয়ে অগ্নিকুন্ডে বসে পুঁজ-রক্ত খাবে, এ যুগের মানুষ তা নিয়ে কেউ হৈচৈ করে না বা ওসবের ভাগবাটারা নিয়ে কেউ কারো সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মাথা ফাটাফাটি বা খুনাখুনি করে না। এ যুগের মানুষের গরিষ্ঠসংখ্যকের হৈ-চৈ এর কারণ হচ্ছে এই যে, পরজীবনে যাই ঘটুক না কেন, ইহজীবনে সমাজের কাছে তারা ন্যায়বিচার পায় না। কেউ নিয়মিত পঞ্চামৃত (দুধ, দধি, ঘৃত, মধু ও চিনি) আহার করে, আর কেউ পান্তাভাতে শুধু লবণ ও লঙ্কাপোড়া পায় না। কেউ সুরম্য হর্ম্যে বাস করে সাততলায়, কেউ বাস করে গাছতলায়।

মানব সমাজ এখন উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। মানুষ এখন আকাশ জয় করেছে, পরমাণু ভেঙ্গে তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে লাগাছে, হাজার হাজার রকম যানবাহন ও অসংখ্য রকমের যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ বর্ধনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সর্বহারাদের ভাত-কাপড় ও গৃহনির্মাণের জন্য একটি যন্ত্রও আবিষ্কৃত হয়নি আজ পর্যন্ত। তবে আনন্দের বিষয় এই যে, সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন এবং তা প্রতিষ্ঠিতও হয়েছে গুটিকতক দেশে। কিন্তু তাকে ‘যন্ত্র’ বলা হয় না, বলা হয় ‘তন্ত্র’ অর্থাৎ ‘সমাজতন্ত্র’। আজ বিশ্বমানবের গরিষ্ঠসংখ্যকের কামনা – তন্ত্রটি পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হোক।

১২. সমাজতন্ত্র – মানব সভ্যতা ও সমাজ উন্নয়নের প্রধান প্রধান ধাপগুলোর মধ্যে সমাজতন্ত্রকে বলা যায় চরম ধাপ। সাম্যবাদী সমাজ গঠনের প্রাথমিক পর্যায় হচ্ছে সমাজতন্ত্র। এর মূলনীতি হচ্ছে- প্রত্যেকে নিজের ‘সাধ্য’ অনুসারে সমাজকে দেবে এবং নিজের ‘প্রয়োজন’ অনুসারে নেবে। এ সমাজে কারো কাজের অনিশ্চয়তা থাকবে না, ধনী ও দরিদ্রের প্রভেদ থাকবে না, মেহনতী মানুষকে শোষণ করার মতো মালিক ও মুনাফাশিকারীর দল থাকবে না, থাকবে না শ্রেণীগত-বৈষম্যের বিশাল প্রাচীর।

সমাজতন্ত্রবিরোধী কেউ কেউ বলে থাকেন যে, মার্কসের স্বপ্ন বাস্তবরূপ নিয়ে অনেক ক’টা রাষ্ট্রে নতুন সমাজের পত্তন ঘটেছে, কিন্তু তাই বলে কি সেখানে মানুষের সামাজিক পার্থক্য ঘুচে গেছে? সমাজের সবাই কি একইভাবে পরিচিত হচ্ছে? সামাজিক মর্যাদা কি সকলের সমান হয়েছে? তা হয়নি। সামাজিক মর্যাদার ভিন্নতা রয়ে গেছে আর সামাজিক ভূমিকার ভিন্নতাও রয়ে গেছে।

মার্কসবাদবিরোধী সমাজতত্ত্ববিদদের উপরোক্ত বক্তব্যটি সমাজতন্ত্র ব্যাখ্যার পক্ষে হাস্যকর। শোষণহীন ও শ্রেণীহীন এক কথা নয়। সমাজতন্ত্র চায় শোষণহীন সমাজ গঠন করতে, শ্রেণীহীন সমাজ নয়।

সমাজকে মানবদেহের সাথে তুলনা করা চলে। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা ও হস্ত, পদ, মস্তক ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে যেমন মানবদেহ গঠিত এবং তার প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুষ্ঠু বিকাশ ও কার্যকারিতার উপর যেমন মানবদেহের শ্রীবৃদ্ধি নির্ভরশীল, তেমনি বহু শ্রেণী-উপশ্রেণীভুক্ত মানুষের সমন্বয়ে সমাজদেহ গঠিত এবং তাদের সুষ্ঠু বিকাশ ও কার্যকারিতার উপর সমাজদেহের পুষ্টি ও ক্রমোন্নতি নির্ভরশীল। অঙ্গ প্রত্যঙ্গহীন মানবদেহ থাকা যেমন অসম্ভব, তেমন শ্রেণীহীন সমাজ গঠনও কল্পনার অতীত।

মানবদেহ সুস্থ, কর্মক্ষম ও ক্রমবর্ধমান থাকে ততোক্ষণই। যতক্ষন পর্যন্ত তার শক্তির উপাদান ‘রক্ত’ বা প্রাণরস দেহের সর্বত্র নিয়মিত প্রবাহিত হয়। কিন্তু তা না হয়ে যদি কখনো দেহের কোন অঙ্গবিশেষে রক্ত পুঞ্জীভূত হয়ে পড়ে, তখনই স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে, দেখা দেয় রোগ। আর সেই রোগ যদি কখনো চরমে পৌঁছে, তবে তখন দেখা দেয় দেহের অস্তিত্ব বিলুপ্তির সম্ভাবনা। আবার দেহের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিকতা ছাড়িয়ে যদি অতিবৃদ্ধি ঘটে, তবে তাতেও ডেকে আনে পঙ্গুতা। সমাজদেহের স্থিতি, বৃদ্ধি, অবক্ষয়ও এর থেকে ভিন্নরূপ নয়।

বেশ কিছুদিন পূর্বে বরিশাল শহরের চকের পোলের উপর বসে একটি লোককে ভিক্ষা করতে দেখেছিলাম। লোকটির বাম পা ছিলো স্বাভাবিক আকারের। অর্থাৎ প্রায় আড়াই ফুট। কিন্তু তার ডান পা লম্বায় ছিলো সাড়ে চার ফুট। অনুরূপ আর একজন ভিখারীকে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ভিক্ষা করতে দেখেছিলাম, তার ডান হাতখানা ছিল আকারে স্বাভাবিক, কিন্তু বাঁ হাতখানা লম্বায় ছিলো মাত্র ছয় ইঞ্চি। উক্ত লোক দুটির দেহের অঙ্গবিশেষের স্বাভাবিকতা বজায় না থাকায় ওদের একজন হয়েছে পঙ্গু এবং অপরজন অকর্মণ্য। এরূপ সমাজদেহের অঙ্গবিশেষের অর্থাৎ শ্রেণীবিশেষের অতিমাত্রার উত্থান ও পতন ডেকে আনে সমাজদেহের পঙ্গুতা ও অকর্মণ্যতা। আর বর্তমান দুনিয়ায় অধিকাংশ দেশের সমাজ ব্যবস্থা এরূপ যে, সমাজের ডান ও বামপন্থী (ধনী ও দরিদ্র)-দের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য রোধ ও সমতা আনয়নের কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ‘সমাজতন্ত্র’। তাই ‘সমাজতন্ত্র’ তথা ‘সাম্যবাদ’ হচ্ছে বিশ্বমানবের মঙ্গল বিধানের একমাত্র মাধ্যম। এছাড়া শুধুমাত্র রকেট-রোবট ব্যবহার ও স্বর্গ-নরকের স্বপ্ন দর্শনের দ্বারা সমাজ উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা, তা ভেল্কি বই আর কিছু নয়।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x