চন্দননগর বা এর ধারে-কাছের কোন জায়গা থেকে কৌশিক মুখোপাধ্যায় নামে একজন পরিবর্তনের লেখাটির পরিপ্রেক্ষিতে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ছে, তিনি লিখেছিলেন, বেশ কিছু বছর আগে (সালটা আমার ঠিক মনে নেই) বারাণসীতে এক সন্ন্যাসীকে সামান্য একটা লাঠির ওপর হাতকে বিশ্রাম দিয়ে তাঁর শরীরকে শূন্যে তুলে রাখতে দেখেছিলেন। কৌশিকবাবু কিছুটা ঝাঁজ মিশিয়ে লিখেছিলেন, প্রবীরবাবুর আন্তরিক সত্যনিষ্ঠা থাকলে যেন কিছুটা কষ্ট করে ওই স্থানে গিয়ে এই বিষয়ে অনুসন্ধান করেন, তা হলেই আমার কথার সত্যতা যাচাই করতে পারবেন।

কৌশিকবাবু সত্যিই যে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছেন সেই বিষয়ে আমার

কোনও সন্দেহ নেই। তাই অনুসন্ধানেরও প্রয়োজন  নেই।

কাঠের লাঠিতে হাতকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য এলিয়ে রেখে সাধুবাবার শূন্যে ভেসে থাকা কৌশিকবাবু ঠিকই দেখেছেন। কিন্তু ঘটনাটার পেছনে যে লৌকিক বা বিজ্ঞান্নসম্মত কারণ রয়েছে, সেই কারণটি জানা না থাকায় তিনি অলৌকিক বলেই ঘটনাটাকে মেনে নিয়েছেন।

বগলে ডান্ডা গুঁজে শূন্যে ভাসার কৌশল

পাঠক-পাঠিকাদের প্রায় সকলেই বোধহয় ম্যাজিক দেখেছেন। আর অনেকেই দেখেছেন সেই জাদুর খেলা, যেখানে জাদুকর একটি মেয়েকে সম্মোহিত করে (আসল ব্যাপারটা অবশ্য পুরোপুরি অভিনয়) তিনটে সরু লোহার বর্শার ওপর শুইয়ে দেন; তারপর বর্শা দুটো সরিয়ে নেওয়ার পর মেয়েটি একটি মাত্র বর্শার

লাঠিতে ভর দিয়ে শূন্যে ভাসার কৌশল

ওপর ঘাড় পেতে বাঁকি দেহ শূন্যে ভাসিয়ে শুয়ে থাকে। অথবা দেখেছেন, জুনিয়র পি.সি. সরকারের ম্যাজিক, যাতে তিনি একটি খোঁড়া মেয়ের বগলে একটা কাঠের ডান্ডা গুঁজে দিয়ে তাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখেন।

সাধুবাবাজিরাও সেই একই নিয়মে একটি কাঠের দন্ডের সাহায্য নিয়ে নিজের শরীরকে শূন্যে তুলে রাখেন।

জাদুকর যে মেয়েটিকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে চান, তার পোশাকের তলায় থাকে একটা ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি চওড়া ফুট দেড়েকের মতো লম্বা শক্ত ধাতুর পাত। পাতটি প্রয়োজন অনুসারে ⊂⊃ বা ⊂.⊃ এই ধরনের একটু বাঁকানো হতে পারে। চামড়ার বা ক্যানভাসের তিন-চারটে বেল্ট দিয়ে ধাতুর পাতটি শরীরের সঙ্গে বাঁধা থাকে। পাতটিতে প্রয়োজনমতো এক বা একাধিক ফুটো থাকে। যে ডান্ডার ওপর নির্ভর করে মেয়েটি শূন্যে ঝুলে থাকে, সেই ডান্ডার মাথাটা হয় একটি বিশেষ মাপের। দেখতে হবে ডান্ডার মাথাটা যেন মেয়েটির পোশাক সমেত ওই ধাতুর পাতের ফুটোয় শক্ত ও আঁটোসাঁটোভাবে ঢোকে। মেয়েটির যা করণীয়, তা হল সম্মোহিত হওয়ার অভিনয় ও সরু পাতের ওপর ব্যালান্স রেখে শোয়া।

ডান্ডার ওপর হাত রেখে সাধুরা যেসব পদ্ধতিতে নিজেদের দেহকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখেন, তার কয়েকটি ছবি এখানে দিলাম। শূন্যে ভেসে থাকা বিষয়ে আগেই বিস্তৃত আলোচনা করে নেওয়ায় ছবিগুলো দেখলে আপনারা নিজেরাই বুঝতে পারবেন সাধুদের ভেসে থাকার কৌশলগুলো।

আলেকজান্ডার হাইমবুর্গার নামে এক বিখ্যাত জাদুকর আমেরিকায় ১৮৪৫-৪৬ সাল নাগাদ একটা অদ্ভুত খেলা দেখিয়ে আলোড়নের ঝড় তুলেছিলেন। খেলাটা ছিল জাদুকরের এক সঙ্গী, একটি খাড়া ডান্ডার মাথায় শুধুমাত্র একটা হাতের কনুই ঠেকিয়ে শূন্যে ভেসে থাকত।

আলেকজান্ডারের লেখা থেকেই জানা যায়, তিনি এই খেলা দেখানো শুরু করেন ভারত থেকে প্রকাশিত একটি বার্ষিকী পত্রিকায়  এক ফকিরের অলৌকিক খেলার  বর্ণনা পড়বার পর। ফকিরটি একটি বাঁশের লাঠি মাটিতে খাড়া রেখে লাঠির উপর হাত ঠেকিয়ে তার এক সঙ্গীকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখত।

অসাধারণ জাদুকর হ্যারি হুডিনি এক জাদু আলোচনায় বলেন, তিনি এই লাঠিতে ভর দিয়ে শূন্যে ভেসে থাকার খেলাটির কথা প্রথম জানতে পারেন টমাস ফ্রস্ট (Thomas Frost) নামের এক ইংরেজ লেখকের লেখা বই পড়ে। লেখক ১৮৩২ সালে মাদ্রাজের এক ব্রাক্ষ্মণকে শূন্যে বসে থাকতে দেখেন। ঘটনাটা ঘটেছিল এই ভাবে, একটি তক্তা জাতীয় কাঠের টুকরোতে চারটে পায়া লাগানো ছিল। তক্তায় ছিল একটা ফুটো। ফুটোটা ছিল এই মাপের, যাতে একটা লাঠি ঢোকালে লাঠিটা শক্ত হয়ে তক্তার সঙ্গে আটকে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে। খাড়া দাঁড়িয়ে থাকার লাঠির সঙ্গে লাগানো থাকত আর একটি ছোট্ট ডান্ডা। এটা থাকত মাটির সঙ্গে সমান্তরালভাবে। ছোট ডান্ডাটায় বাহু রেখে শূন্যে ভেসে থাকতেন ব্রাক্ষ্মণ।

১৮৪৮ সাল নাগাদ আধুনিক জাদুর জনক রবেয়ার উদ্যাও তাঁর দু’বছরের ছেলে ইউজেনকে এই পদ্ধতিতে শূন্যে ভাসিয়ে রেখে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে প্রচন্ড বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিলেন। একটা খাড়া লাঠিতে কনুইটুকুর ভর দিয়ে শূন্যে ভেসে থাকত ইউজেন।

প্রায় একই সময়ে লন্ডনে একইভাবে শূন্যে ভাসিয়ে রাখার খেলাটি দেখিয়েছিলেন দু’জন জাদুকর। এরা হলেন কমপার্স হারম্যান ও হেনরি অন্ডারসন,

শূন্যে ভাসিয়ে রাখার খেলাকে আর এক ধাপ উন্নত করলেন জাদুকর জন নেভিল ম্যাসকেলিন (John Nevil Maskelyne)। ১৮৬৭ সালে তিনি লন্ডনের এক জাদুপ্রদর্শনীতে তাঁর স্ত্রীকে সম্মোহিত করে (অভিনয়) একটা টেবিলের উপর শুইয়ে দেন। তারপর, দর্শকরা সবিস্ময়ে দেখলেন, শ্রীমতি ম্যাসকেলিনের দেহটা ধীরে ধীরে শূন্যে উঠে গেল। এই খেলাকে জাদুর ভাষায় বলা হয় ‘আগা’ (A. G. A.)। A. G. A. র পুরো কথাটা হল Anti Gravity Animation।

এই খেলাটিকেই আরও নাটকীয় আরও সুন্দর করে দেখালেন হ্যারি কেলার (Harry Keller)। স্থান আমেরিকা। খেলাটির নাম দিলেন ‘Levitation of Princess Kamac’।

শূন্যে ভেসে থাকার খেলাকে আর এক এগিয়ে নিয়ে গেলেন বেলজিয়ামের প্রখ্যাত জাদুকর সার্ভেস লে-রয় (Servais Le Roy)। আমি যতদূর জানি, এটাই

সাধুসন্তদের শূন্যে ভাসা

শূন্যে ভাসিয়ে রাখার সর্বশেষ উন্নততর পদ্ধতি। লে-রয় তাঁর দলের একটি মেয়েকে সম্মোহন করে (পুরোটাই অভিনয়) একটি উঁচু বেদিতে শুইয়ে দিতেন। মেয়েটিকে ঢেকে দেওয়া হতো একটি রেশমি কাপড় দিয়ে। এক সময় মেয়েটির কাপড়ে ঢাকা শরীরটা ধীরে ধীরে শূন্যে উঠতে থাকত। তারপর, হঠাৎ দেখা যেত জাদুকরের হাতের টানে চাদরটা জাদুকরের হাতে চলে এসেছে। কিন্তু মেয়েটি কোথায়? বেমালুম অদৃশ্য। বর্তমানে অনেক জাদুকর-ই এই খেলাটি খুব আকর্ষণীয়ভাবে দেখিয়ে থাকেন।

লে- রয়ের এই খেলা যদি অসৎ কোন ব্যক্তি লোক-ঠকানোর জন্য দেখায়, তবে অনেকেই তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করতে পারেন।

লে রয় আসলে যা করতেনঃ জাদুকর তাঁর সহকারী মেয়েটিকে সম্মোহন করার অভিনয় করতো। মেয়েটিও সম্মোহিত হওয়ার অভিনয় করতো। সম্মোহিত মেয়েটিকে সহকারীদের সাহায্যে একটা টেবিল বা বেঞ্চের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। দু’জন সহকারী রেশমের কাপড় দিয়ে যখন মেয়েটির শরীর ঢেকে দেয়, তখন সামান্য সময়ের জন্য কাপড়টা এমনভাবে মেলে ধরে যাতে শুয়ে থাকা মেয়েটির দেহ কিছুক্ষণের জন্য দর্শকদের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। এই অবসরে মেয়েটি পিছনের পর্দার আড়ালে সরে যায়। পাতলা রবারে হাওয়া ঢোকান একটি নকল মেয়েকে টেবিলের বা বেঞ্চের ওপর তুলে নেওয়া হয়। সহকারী দুজন ঐ বেলুনের তৈরি মেয়েটিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। বেলুন-মেয়েটির গলায় ও পায়ে বাঁধা থাকে খুব সরু স্টীলের তার বা সিন্থেটিক সুতো। তারের বা সুতোর মাথা দুটি ঢেকে দেওয়া কাপড় ভেদ করে তার দুটি উপরে উঠে থাকে, ঢেকে দেওয়ার পর জাদুকর সরু তার ধরে বিভিন্ন কায়দায় মেয়েটিকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখেন। কখনো জাদুকরের ইশারায় মেয়েটি উঁচুতে উঠে যায়, কখনো নীচে নেমে আসে। মঞ্চে গাঢ় নীল বা বেগুনী আলো ফেলা হয়। ফলে, তিন-চার ফুট দূরের দর্শকদের পক্ষেও তারের অস্তিত্ব বোঝা সম্ভব হয় না।

এরপর আসা যাক দেহটা অদৃশ্য করা প্রসঙ্গ। অদৃশ্য করার সময় জাদুকর বেলুনে পিন ফুটিয়ে দেন। বেলুন যায় ফেটে। সঙ্গে-সঙ্গে বেলুন মেয়েও হয়ে যায় অদৃশ্য। আর বেলুন ফাটার আওয়াজ ঢাকতে জাদুকরের বাজনাদারেরাই যথেষ্ট।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x