(দুই)

আমরা সাধারণ জনগণ, গরিব মূর্খ অসহায় মানুষ, সারাক্ষণ খুন হওয়ার ভয়ে আছি, এই ইতিহারে বাকিটা কি আর বলতে পারি? আমাদের কি সেই সাহস আছে? একাত্তর সালে সাহস ছিলো, তখন আমাদের মরার ভয় ছিলো, কিন্তু সাহসও ছিলো, ওই সময়টা আমাদের ছিলো; এখন আমাদের মরার ভয় আরো বেশি, কিন্তু সেই সাহস নেই, এই সময়টা আমাদের না। একাত্তরে ভিস্তি সাহেবরাও আমাদের ভয় পেতেন, আজ শুধু আমরাই তাদের ভয় পাই; তারা আমাদের ভয় পান না। হায়, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় গেলো? তারা সবাই মরে গেছে? তখন যারা যুদ্ধ করেছিলো আর এখনো বেঁচে আছে, তারা তো আর মুক্তিযোদ্ধা না। বাকিটা বললে ভিস্তি সাহেবরা আমাদের টুকরা টুকরা করে ফেলবেন না? তবে মুখে যখন ইতিহাসটা এসেই গেছে, চোখ বুজে একবার বলেই ফেলি; তাতে আমাদের শিরার ভেতরের রক্ত একটু ঠাণ্ডা হবে, একটু সাহস পাবো।

সালেহা চিৎ হতে চায় না, তবু চিৎ হতে হয়; এবং সে চিৎকার করে বলে, হুজুর, এইডা আপনে কী করতাছেন, আল্লায় দ্যাখতাছে। আপনে গুনার কাম করতাছেন, হুজুর, আমারে ছাইড়া দ্যান।

ভিস্তি সাহেব তাকে ছাড়েন না; কিন্তু মেয়েটির শরীরে জোর আছে, সে ভিস্তি সাহেবের অণ্ডকোষে চাপ দেয়। ভিস্তি সাহেব ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন।

সালেহা উঠে দাঁড়ায়, ঘোমটা দিতে দিতে বলে, এমুন করলে হুজুর, আমি। খালাম্মারে কইয়া দিমু, আল্লায় আপনেরে দোজগে দিব। আপনে মাইষের বাচ্চা না, আপনে একটা জানোয়ারের পয়দা।

ভিস্তি সাহেবের বলতে ইচ্ছে হয়, তুই আমারে ঠিক চিনছস, সালেহা, আমি কতো বড়ো জানোয়ার তা তরে না, সারা দেশরে দেখাইয়া দিমু।

তবে তিনি তা বলেন না, তিনি সালেহার পা ধরে বলেন, তুই কইছ না, সালেহা, আমারে তুই মাপ কইর‍্যা দে। তরে আমি মহব্বত করি, তরে আমি বিয়া করুম। আইজ রাইতে তর লগে আমি থাকুম।

সালেহা বলে, বিয়ার আমার কাম নাই, এমুন জাউরার লগে আমি বিয়া বহুম না, গ্যারামে আমারে কতজনে বিয়া করতে চায়।

মেয়েটির পেটে একটা ছুরি ঢুকিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় ভিস্তি সাহেবের; কিন্তু মেয়েটির শরীরে এতো গোস্ত, আর ওই গোস্তে এতো মশলা, তা ভালো করে খাওয়ার আগে ছুরি ঢাকোনো ঠিক হবে না বলেই তার মনে হয়। নিজের বিবির শরীরে তিনি গোস্ত খুঁজে পান না, শিনার দিকেও কোনো চর্বি আর গোস্ত পান না, তাই তাকে ভেঙেচুরে তিনি কিছু একটা করেন; কিন্তু সালেহাকে তার মনে হয় কোরবানির চর্বিঅলা গাভীর মতো, যার দেহভরা চর্বি আর ওলানভরা জমাট দুধ। সালেহাকে তিনি এরপর আরো কয়েকবার চিৎ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু পেরে ওঠেন না; মেয়েটি যেমন চালাক, তেমনি শক্তিমান। তিনি শুভদিনের অপেক্ষায় থাকেন, নিশ্চয়ই দিন আসবে, যেদিন তিনি সালেহার গোস্ত খাবেন।

রাজাকারদের সিপাহসালার হয়ে যে-রাতে তিনি বাসায় ফেরেন, ফিরতে ফিরতে ঠিক করেন তাঁর পাকিস্থানে বিশ্বাসটা তিনি প্রথম পরীক্ষা করবেন সালেহার ওপরই। ওই মাইয়াটা দেখতেশুনতে এই দেশটার মতোই, ওর শরিলে একটা জয়বাংলা জয়বাংলা গন্ধ আছে; অর শরিলের জয়বাংলা ছাড়াইয়া দিতে হবে, ওইখানে পাকিস্থান জিন্দাবাদ ঢুকাইয়া দিতে হইবে। পাকিস্থানে যার ইমান আছে, তাকে কোনো কিছুই আটকাতে পারে না, তার সামনে কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সালেহা দরোজা খুলে দেয়ার পরই তিনি তাকে জোরে জড়িয়ে ধরে রান্না ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করেন। সালেহার একটি নখ তার গালে বিধে যায় (ওই দাগটা এখনো আছে), সালেহার চিঙ্কারে তাঁর বিবি কাঁপতে কাঁপতে রান্না ঘরে এসে দেখে ভিস্তি সাহেব সালেহার গলা চেপে কাজ করে চলছেন।

বিবি চিৎকার করে ওঠে, হুজুর, আপনে এইটা কী করতাছেন? আপনের গুনা হইতাছে। আল্লারসুলের কথা মনে আনেন।

ভিস্তি সাহেব উঠে দাঁড়ান, এবং স্ত্রীকে একটা চড় মারেন। স্ত্রী ঘুরে পড়ে যায়, তবু উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আপনে জিনা করতাছেন, আমার ভাগ অন্য মাইয়ালোকরে  দিতাছেন, আপনে দোজগে যাইবেন।

ভিস্তি সাহেব বলেন, বিবি, তুমি ভাইবো না, বান্দির লগে সহবত করলে জিনা হয়, গুনা হয় না। বান্দি মনিবের মাল।

বিবি কাঁদতে কাঁদতে বলে, এই কথা আমি মানি না, আপনে জিনা করছেন, অন্য মাইয়ালোকের ইজ্জত নষ্ট করছেন। আল্লা আপনের লিগা দোজগ লেইখ্যা রাখছে, আপনে হাবিয়ায় যাইবেন।

ভিস্তি সাহেব বলেন, বিবি, চুপ থাকো; আরেকটু টু শব্দও শুনতে চাই না।

বিবি বলে, আমি চুপ থাকুম না।

ভিস্তি সাহেব বিবিকে একটা চড় মারেন, বিবি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়; তিনি আবার সালেহাকে ধর্ষণ করেন।

এখন তার সাথে পলিটিক্স করছেন শক্তির উৎসবাদী বংশের নেতা অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, এবং তিনি পলিটিক্সে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন পন্টুকে। আমরা জনগণরা দেখেছি এককালে তারা অনেক বছর এক সাথে ছিলেন, দেখে আমাদের ভালো লাগতো, খুশি হতাম আমরা, দুই রাজবংশের মধ্যে শাদিই হয়ে গিয়েছিলো বলে আমরা ভাবতাম, তারপর আবার তালাক হয়ে যায়। রাজবংশগুলোর শাদি আর তালাকে আমরা অবাক। হই না, বিবাহ হলে তো তালাক হতেই পারে, এটাকে আমরা রাজনীতি মনে করি।

অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, আস্সালামুআলাইকুম, মওলানা রহমত আলি। ভিস্তি সাহেব, আমার সেলাম নেন। অনেক দিন পর কথা বলছি, গলাটা চিনতে পারছেন কি না জানি না।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, ওআলাইকুমসাল্লাম ওআ রহমতুল্লাহে বরকত হু, আপনে কে কথা বলতাছেন, ভাইজান? আপনের গলাটা চিনা চিনা লাগছে।

রুস্তম আলি বলেন, আমি অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলতেছি। চিনতে পারতেছেন ভাইজান?

রহমত আলি ভিস্তির দিলটি প্রথম একটু বেজার হয়, পরমুহূর্তেই শান্ত হয়ে ওঠে; এবং বলেন, ভাইজান, আপনেরে চিনবো না ক্যান? আপনে দেশের বড় ন্যাতা, অনেক বছর সামনা সামনি দেখা নাই, তয় ভোলনের কথাই ওঠে না।

অধ্যক্ষ রুস্তম আলি বলেন, ভাইজান, এক সোম ত আমরা এক লগেই আছিলাম, আবার এক লগেই থাকতে হইব, আপনের লগে আমি একটু বসতে চাই, মহাদেশনেত্রীও বসতে চান আপনার লগে। আমাগো মহাদেশনেত্রী আপনের কথা মাঝেমাঝেই বলেন আইজকাল।

মওলানা রহমত আলি ভিস্তি বলেন, বসন ত লাগবোই, ভাইজান; খালি রাস্তায় ত পলিটিক্স হয় না, না বসলে আসল পলিটিক্স হয় না। আপনেগো মহাদেশনেত্রীর কথাও আমরা সব সময় কই।

রুস্তম আলি বলেন, রাস্তার পলিটিক্স ত লোকদ্যাখাইন্যা পলিটিক্স, আসল পলিটিক্স হইছে একখানে বইস্যা পলিটিক্স।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, বলেন ভাইজান, আপনের কথা বলেন।

রুস্তম আলি বলেন, দ্যাশটা হারামজাদা ইন্ডিয়ার দালালগো হাতে চইল্যা যাইবো আবার এইটা ত আপনেরাও চান না, আমরাও চাই না। অগো হাতে গেলেই দ্যাশটা তিনদিনেই বেইচ্যা দিব, দ্যাশে একটাও মুসলমান থাকবো না। আমরা ইসলামের জইন্যে বড়োই চিন্তিত।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, না, ভাইজান; এইটা মুসলমানের দ্যাশ, মুসলমানের হাতেই থাকতে হইবো, নাইলে দ্যাশটা কাফের হইয়া যাইবো।

রুস্তম আলি বলেন, ভাইজান, আমরা আইজ আছি কাইল নাই, আমাগো থাকন না থাকন কথা না, কথা হইলো ইসলাম থাকতে হইবো। ইসলাম থাকলেই আমরা থাকুম। ইসলামের জন্যেইতো আমাগো মহান ন্যাতা আপনেগো জ্যাল থিকা বাইর করে আনছিলেন, দলরে দাঁড়াইতে দিছিলেন।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, হ, ভাইজান, পলিটিক্স ত করি ইসলামের লিগা, নিজের লিগা করি না; আর আপনেগো মহান ন্যাতা আমাগোও মহান ন্যাতা।

রুস্তম আলি বলেন, ভাইজান, তাইলে আইজ বৈকালে আসেন আমরা বসি।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, ভাইজান, আপনের কথা ফ্যালন যায় না, তয় বৈকালে দলের মজলিশ আছে, আর বসনের সময় আরো পাইবো।

রুস্তম আলি বলেন, ভাইজান, মনে হয় আমাগো উপর আপনে বেজার হইয়া আছেন। বেজার হইয়েন না, আমরা মাফ চাই, ভাইজান।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, ভাইজান, আমি বেজার না, তয় আমাগো আমির সাহেবের সাথে কথা না কইয়া বসতে পারি না, বোঝতেই পারছেন।

রুস্তম আলি পন্টু বলেন, আইজ রাইতেই আবার ফোন করুম, ভাইজান।

রুস্তম আলি পন্টু রাখার সাথে সাথেই আবার সেলুলার বেজে ওঠে মওলানা রহমত আলি ভিস্তির। এ-ফোনটির জন্যেই মনে মনে অপেক্ষা করছিলেন ভিস্তি সাহেব, পেয়ে তিনি শান্তি পান।

এখন সেলুলার চলছে জনগণমন গণতান্ত্রিক রাজবংশের অন্যতম চাচা মোহাম্মদ রজ্জব আলির সাথে।

মোহাম্মদ রজ্জব আলি বলেন, মওলানা সাহেব, আমাদের মইধ্যে আগে থিকাই ত কথা হয়ে আছে, এখন আমাদের একবার বসন লাগবো। শোনতাছি শক্তিয়ালারা নানা রকম কন্সপিরেছি করতাছে। আমাগো এক লগে থাকতে হইব, আন্দোলনে আমরা যেমুন একলগে আছিলাম।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, ভাইজান, আপনেগো মহাজননেত্রীর লগে কি সেই সম্পর্কে কথা হইছে, অই যে আমরা ষাইটটা সিট চাইছিলাম? অই কটা সিট আমাগো লাগবো, ভাইজান।

রজ্জব আলি বলেন, তা হইছে মওলানা সাহেব, তবে একসঙ্গে বইস্যা সব ঠিক করুম, সিট ত স্র্যাটেজির ব্যাপার, দ্যাখতে হইব তাতে আপনাগো কী লাব আর আমাগো কী লাব। খালি বেশি সিট লইলেই ত কাম হইব না।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, অইবার অরা আমাগো পঞ্চাশটা সিট দিছিলো, এইবার আরো বেশি দিতে চায়।

রজ্জব আলি বলেন, মওলানা সাহেব, এইবার আপনাগো নিজেগো অবস্থা অ্যামনেই ভাল, তবু একটা মিলমিশ করন যাইব। আর মওলানা সাহেব, আপনে ত পলিটিশিয়ান, তিন বচ্ছর আমাগো লগে থাইক্যা আপনাগো কতো উপকার হইছে ভাইব্যা দেখেন।

এখন আমরা আর আপনেগো রাজাকার কই না।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, হ, ইনশাল্লা, আমাদের অবস্থা আগের হইতে অনেক ভাল, এইবার আমরা নিজেরাই পঞ্চাশটা সিট পামু; আমাগো ছাড়া কারো চলবো না। দ্যাশে ইসলামের অবস্থা আগের থিকা অনেক ভাল।

রজ্জব আলি বলেন, এই জন্যেই তো আপনেগো এই বচ্ছর এভো দাম, আমরা ক্ষমতায় যাইতে পারলে আপনেগো অবস্থা আরো ভাল কইরা দিমু। আর ভাই, ইসলামের লিগা আমরাও জান দিয়া দিতেছি।

তারা ঠিক করেন পরের দিন তারা বসবেন।

রাজনীতিবিদরা, আমাদের রাজাবাদশারা, মহান মানুষ, তারা আমাদের প্রভু; তাঁরা যা বোঝেন তা তো আমরা বুঝি না; তারা যেখানে দরকার সেখানে বসতে পারেন, তাদের গায়ে ময়লা লাগে না; সব কিছু মনে রাখলে তাদের চলে না। আমরা জনগণরা মূর্খ মানুষ, আমাদের মাথায় ঘিলু কম, হয়তোবা একেবারেই নেই, তাই আমরাও অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না; কিন্তু অনেক কিছু আমাদের মনে থাকে, আবার মনে থাকলেও আমরা তা ভুলে থাকি। মনে থাকলে কী হবে? আমাদের করার কী আছে? যেমন সালেহার কথা আমরা ভুলে গেছি, আবার সালেহার কথা আমাদের মনেও আছে। এখন তার কথা মনে পড়ছে, যখন আমাদের রাজারা একে অন্যের সাথে মিলেমিশে বসছেন, সালেহাকে ভুলে গেছেন–দেশে সালেহা নামের কেউ ছিলো না।

ভোরে রহমত আলি ভিস্তি সাহেব যখন নামাজ পড়ছিলেন, তখন সালেহা একটি বঠি নিয়ে তার পেছনে এসে দাঁড়ায়; এবং যখন কোপ দিতে উদ্যত হয়, ভিস্তি সাহেবের বিবি অই সালেহা কী করতাছছ, অই সালেহা কী করতাছছ বলে চিৎকার করে সালেহাকে জড়িয়ে ধরে।

সালেহা কেঁদে ওঠে, আমি এই জানোয়ারডারে জব করুম, আমি এই জানোয়ারডারে জব করুম। জানোয়ারডা রাইত ভইর‍্যা আমার দ্যাহডারে আস্ত রাখে নাই।

ভিস্তি লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান; এবং চড় দিয়ে সালেহাকে মেঝেতে ফেলে দেন।

তার বিবি বলে, হুজুর, মাইয়াডারে আইজই বাইড়তে পাঠাইয়া দেন।

ভিস্তি সাহেব বলেন, হ, আইজ রাইতেই পাঠামু।

সন্ধ্যার পর ভিস্তি সাহেবের বাড়ির সামনে একটি আর্মির জিপ এসে থামে। জিপের পেছন থেকে নেমে আসেন ভিস্তি সাহেব ও পবিত্র পাকিস্থান আর্মির কয়েকজন খাঁটি জওয়ান।

তারা সালেহাকে চেপে ধরে জিপে উঠোয়, সালেহা নড়তে ও চিৎকার করতে পারে না। পাকিস্থান জিন্দাবাদ বলে তারা গলি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে যায়।

ভিস্তি সাহেবের বিবি জিজ্ঞেস করে, হুজুর, সালেহারে কই পাঠাইলেন?

ভিস্তি সাহেব বলেন, ছেমরিরে চিরকালের লিগা বাড়িতে পাঠাইলাম।

ভিস্তি সাহেবের বিবি কেঁদে ওঠে, হুজুর, আমারেও পাঠাইয়া দেন।

এসব কথা আমরা ভুলি কী করে, আর মনে করে রাখিই কী করে? সকালে উঠে আমাদের ক্ষেতে যেতে হয়, দুপুরেও বাড়িতে ফিরতে পারি না, ক্ষেতের আলে বসেই শানকিতে করে দুটা ভাত খাই; আমাদের মুদিদোকানটা খুলে বসতে হয়, খরিদ্দারের আশায় বসেই থাকি; কলে কাজ করতে গিয়ে আমাদের গেটেই বসে থাকতে হয়, সারাদিন আর সময় পাই না; সারা রাত আমরা নদীতে মাছ খুঁজি, পাই না; আর অফিসে গিয়ে অফিস পালিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গামছাটা লুঙ্গিটা বেচতে হয়; আর কাজকাম না পেয়ে আমাদের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়, গাড়ির নিচে পড়তে ইচ্ছে হয়। আমাদের রক্ত জ্বলতে জ্বলতে ঘোলা হয়ে গেছে। এসব কথা আমাদের মনে রাখার মতো ম

রাজাকার রাজবংশে, আমরা জনগণরা শুনতে পাই, চলছে দারুণ উত্তেজনা; এবং আমরা মনে মনে ভয় পেতে থাকি।

দাড়ি আর চুলে রাজাকার রাজপুরুষেরা নতুন কলপ লাগিয়েছেন, কাঁচাপাকা দাড়ি হয়ে উঠেছে ঝলমলে কালো আর মেহেদি রঙের, সুরমা দিয়েছেন চোখে, নতুন পাজামা আস্কান টুপি আর চোস্ত পাজামায় সেজেছেন, শরীর থেকে আতরের খুশবু ঝরঝর ঝরছে। মনে হচ্ছে তিন আর চার নম্বর বিবিকে ঘরে তুলতে যাচ্ছেন, শাদিমোবারকের আবহাওয়া তাদের চারদিকে। ওই রাজপুরুষদের চোখ সব সময়ই ছুরির মতো ঝকঝক করে, মনে হয় চোখের ভেতর কয়েকটা জল্লাদ বসে ছুরি শানাচ্ছে, নতুন সুরমায় আরো ঝকঝক করছে, এখনি কারো বুকে ঢুকে লাল হয়ে উঠতে পারলে আরো ঝকঝক করতো। ধর্মে তারা দেশ ভরে ফেলেছেন, এতো ইসলাম দেশে আগে কখনো ছিলো না, এটা তাদের সাফল্য; দেশে আর কয়েকটা কাফের আর মুরতাদ মাত্র বাকি, ওইগুলোকে দমিয়ে দিতে খুন করে ফেলতে পারলে আসবে তাদের রাজত্ব। তাঁদের সাফল্য অশেষ, এক সময়ের কুখ্যাত ঘৃণিত রাজাকার থেকে তারা হয়ে উঠেছেন। মূল্যবান শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ, সবই আল্লার দান; এখন ওই মুক্তিযোদ্ধাগুলো তাঁদের পায়ের নিচে বসতে পারলে ধন্য হয়। ভুল বলা হয়ে গেলো, দেশে আর মুক্তিযোদ্ধা কই?

তাদের বড়ো বড়ো আমিরওমরাহরা, আলখাল্লা নেতারা, অধ্যাপক, মওলানারা আর মৌলভিরা পাজেরো হাঁকিয়ে আসেন, ওই যানবাহনটি কাফেররা তৈরি করেছে, তবে ওইটিকে তারা ধর্মে দীক্ষিত করে নিয়েছেন। তাঁদের হাতে সেলুলার; আস্কানের নিচে কী আছে তা আমরা জনগণ বুঝতে পারছি না। নিশ্চয়ই যা থাকার তা-ই আছে।

মাগরেবের পর রাজাকার রাজবংশের মজলিশে শুরা বসে। এই রাজবংশের রাজপুরুষেরা সব সময়ই সাবধান, সশস্ত্র প্রহরী ছাড়া তারা চলেন না, কার্যালয়ের চারদিকে পাহারায় রাখেন সশস্ত্র ধার্মিক প্রহরীদের, মোমেনিন সালেহিনদের, যারা হাত আর পায়ের রগ কাটতে পারে চোখের পলকে, গলা কাটতে সময় নেয় আধ মিনিট। প্রহরীরা আজ আরো সাবধান।

রাজাকার রাজবংশের আমির প্রথম আল্লা ও রসুলকে ধন্যবাদ জানান।

আমির সাহেব বলেন, বিসমিল্লাহের রহমানের রাহিম, আল্লার রহমতে আমাদের অবস্থা বছরের পর পর উত্তম হইতেছে, আমাদের নেতা আবু আলা মওদুদি সাহেবের নির্দেশিত পথে আমরা অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছি; অরা আমার নাগরিকত্ব কাড়িয়া নিয়াছিলো, আল্লায় তা আমাকে ফিরাইয়া দিয়াছেন। কাফেররা এইভাবেই মমিন মোসলমানের উপর অত্যাচার করে, কিন্তু আল্লার রহমতে মমিনের জয় হইবেই, অদের উপর গজব নাজিল হইবে।

সবাই বলেন, আলহামদুলিল্লা।

আমির সাহেব বলেন, আল্লার ইসলামে ড্যামোক্র্যাসি নাই ইলেকশন নাই ভোটার নাই এসেম্বলি নাই পার্লামেন্ট নাই, এইগুলি সব ইহুদি আর খ্রিস্টান কাফেররা তৈরি করেছে, আমরাও ড্যামোক্র্যাসি আর ইলেকশনে বিশ্বাস করি না, আল্লা তা নিষেধ করে দিয়াছেন, ইসলামে আছেন এক আল্লা, আল্লার আইন, আর আল্লার শাসন। আল্লার শাসনই সর্বশ্রেষ্ঠ।

সবাই গভীর স্বরে বলে ওঠেন, আলহামদুলিল্লা।

আমির সাহেব বলেন, আল্লার রহমতে আমরা একদিন অবশ্যই কায়েম করব আল্লার শাসন; তবে এখনও তা দূরে আছে, তাই আমরা কাফেরদের ড্যামোক্র্যাসি আর ইলেকশন মানিয়া আল্লার পথে কাজ করিতেছি।

তারা সবাই বলেন, আল্লার নিশ্চয়ই আমাদের মাফ করিবেন।

আমির সাহেব বলেন, আল্লার শাসন যখন হইব তখন দ্যাশে আর পলিটিকেল পার্টি থাকব না, পলিটিক্স থাকব না, ড্যামোক্র্যাসি আর ইলেকশন থাকব না, আল্লার বই। ছাড়া আর কোনো বই থাকব না, তখন কাফেরদের স্কুল কলেজ ইনভারসিটি থাকব না, দ্বীনের শিক্ষা ছাড়া আর কোনো শিক্ষা থাকব না।

সবাই বলে ওঠেন, আলহামদুলিল্লা।

আমির সাহেব বলেন, কিন্তু এইবারও আমাদের ইলেকশনে যাইতে হবে, আল্লার শাসনের পথ তৈরি করিতে হবে। দ্যাশে এখন আমাদের অবস্থা আগের হইতে ভাল, আমাদের তারা আর রাজাকার বলে না। আপনাদের একটা কথা আমি জানাইতে চাই আমারে মুরুব্বিরা কয়টা ইঙ্গিত দিয়াছেন।

সবাই বলে, ইঙ্গিতের কথা আপনে আমাদের বলেন, হুজুর।

আমির সাহেব বলেন, আমাদের মুরুব্বিরা ইলেকশনের জইন্যে আমাদের দশলাখ ডলার দান করিবেন। তাঁরা ইঙ্গিত দিয়াছেন তারা দেশে এইবার ক্ষমতার বদল চান, আমাদের সেইভাবে কাজ করিতে হইবে। এইবার আমাদের নায়েবে আমির মওলানা রহমত আলি ভিস্তি সাহেব আপনাদের সব বলিবেন।

রহমত আলি ভিস্তি সাহেব প্রথম আল্লা ও রসুলকে ধন্যবাদ দেন।

তিনি বলেন, মাননীয় মজলিশ, আমাদের সকলের ইমানের বলে ইনশাল্লা আমরা আল্লা, রসুল, আর আমাদের পথপ্রদর্শক আবু আলা মওদুদির নির্দেশিত পথে ঠিক মত আগাইতেছি। কিন্তু দ্যাশ এখনো কাফেরদের হাতে, তাই আমাদের কাফেরদের ড্যামক্র্যাসি মানতে হয়, ইলেকশন করতে হয়। ইসলামি বিপ্লবের সময় আইজও আসে নাই, ইলেকশন করতে করতে একদিন আমরা ইসলামি বিপ্লব ঘটাইব। তারপর আর ইলেকশন থাকব না, ড্যামক্র্যাসি থাকব না; থাকব আল্লার শাসন।

সবাই বলে, আলহামদুলিল্লা।

মওলানা রহমত আলি ভিস্তি বলতে থাকেন, সারা দেশে আমাদের মুত্তাফিক ভাইরা রেডি হইতেছে, আর দেরি নাই, রোকন ভাইরা রেডি হইতেছে, মোমেনিন সালেহিন ভাইরা রেডি হইতেছে, বিপ্লব ঘটিবেই ঘটিবে। তখন আর আমাদের কাফেরদের ইলেকশন করতে হবে না। দেশে চলবে আল্লার শাসন, চলবে আমাদের রাজবংশের শাসন।

সবাই বলে, আলহামদুলিল্লা।

ভিস্তি সাহেব বলতে থাকেন, আমাদের পথপ্রদর্শক পরম শ্রদ্ধেয় আমিরে আমির আপনাদের জানাইয়াছেন যে আমাদের মুরুব্বিরা এইবার নতুন ইশারা দিয়াছেন, আমাদেরও সেই ইশারা ধরে বিপ্লবের পথে আগাইয়া যাইতে হবে। অইবার আমরা শক্তির উৎসবাদী রাজবংশের সঙ্গে আছিলাম, তারপর আমরা তাহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি, অন্দোলনে আমরা ছিলাম জনগণমন রাজবংশের সঙ্গে; তাগো সঙ্গে থাকিবার ফলে আমাদের অনেক লাভ হইয়াছে। এখন আর তাহারা আমাদের রাজাকার বলিয়া নিন্দা করে না। তাহারাই আমাদের বড় বিপদ, তাহারা আমাদের সঙ্গে থাকিলে আমাদের কোনো বিপদ নাই।

মওলানা এস এম কোরবান জানতে চান, তাহাদের অই হিন্দু বুদ্ধিজীবী কুত্তাগুলি ত আমাদের পাছে লাগিয়াই আছে, তাহার কী হইবে?

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, অইগুলি পলিটিক্স বোঝে না, অইগুলি আছে চিল্লানের লিগা, ঘেউওঘউ করনের জইন্যে, কিছু খাওনের লিগা, অইগুলির চিল্লানের জইন্যেই আমরা উপরে উঠিতেছি, ইসলামের প্রসার হইতেছে, আমাদের প্রসার হইতেছে। ওইগুলিও আমাদের ডরে এখন ভিতরে ভিতরে মুসলমান হইতেছে, ওইগুলিরে ভয় পাইবার কিছু নাই।

রহমত আলি ভিস্তি দু-তিন গেলাশ পানি পান করেন।

তারপর তিনি বলতে থাকেন, এইবার আমাদের অবস্থা অনেক ভাল, এইবার সত্তর আশিটা সিট আমরা নিজেরাই পাইব, আর আমাদের গোপনে অ্যালাইয়েন্সে আসতে হইবে জনগণমন রাজবংশের সহিত। মনে হইতেছে তাহারাই এইবার ম্যাজরিটি হইবে, তাহাদের সঙ্গে থাকিলেই ভাল; আমাদের মুরুব্বিরাও সেই ইশারাই দিয়াছেন।

সবাই বলেন, আলহামদুলিল্লা, ইশারা মতোই আমাদের চলিতে হবে, তাহা হলেই আমরা আল্লার শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, আমরা নিজেরা এইবার ক্ষমতায় যাইতে পারব না, কিন্তু কারা ক্ষমতায় যাইবে তাহা নির্ভর করিবে আমাদের উপর, আমরা তাহাদের আমাদের পথে চালাইব। আমাদের দেখতে হবে কিসে আমাদের লাভ বেশি।

মওলানা সলিমুল্লা জিজ্ঞেস করেন, আমাদের শিবিরের ভাইরা, সালেহিন ভাইরা কী ভূমিকা পালন করিবে? ইলেকশনে তাহাদের কীভাবে কাজে লাগাইব।

রহমত আলি ভিস্তি বলেন, তাহারা আমাদের সিপাহি, আল্লার নামে তাহাদের আমরা যা করিতে বলিব, তাহারা তাহাই করিবে।

তাঁদের মজলিশে সিদ্ধান্ত হয় আমির ও নায়েবে আমির রাজবংশের মঙ্গলের জন্যে যা ভালো মনে করবেন, তা করবেন, যাদের সাথে বসার তাদের সাথে বসবেন, যাদের সাথে দাঁড়ানোর তাদের সাথে দাঁড়াবেন; আর তারা যা আদেশ করবেন, তা সবাই আল্লার নামে পালন করবে।

আমরা জনগণরা এখন খুবই ক্লান্ত; দু-তিন বছর রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে, গলা চুরমার করে শ্লোগান দিয়ে, বাসে আর ট্রাকে আর গাড়িতে দাউদাউ আগুন জ্বালিয়ে, পুলিশের টিয়ার গ্যাস আর গুলি আর লাঠির বাড়ি খেয়ে, আমরা এখন খুবই শ্রান্ত; আমাদের খেলা শেষ হয়েছে, আমাদের দিয়ে তারা যা খেলাতে চেয়েছেন তা খেলে আমরা এখন আধাঘুমন্ত; এখন আর আমাদের খেলার নেই। আমাদের কাজ এখন খেলা দেখা, আমাদের কাজ এখন আমাদের রাজারা কেমন খেলেন, সেই মজা উপভোগ করা। কোনো টিকেট কিনতে হচ্ছে না, স্টেডিয়ামে যেতে হচ্ছে না; আমরা রাজাদের খেলা দেখছি আর হাততালি দিয়ে মজা পাচ্ছি। খেলুন, আমাদের রাজারা খেলুন; আমরা দেখি।

কিন্তু আমরা, মূর্খ জনগণরা, গরিব মানুষ, আমাদের অতো মজা দেখার সময় কোথায়? অতো আমোদপ্রমোদ হাডুডু কুকুৎ রঙতামাসা উপভোগের উপায় কই আমাদের? আমরা ব্যস্ত আমাদের সবচেয়ে বড়ো কাজে, মরমর দেহটাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে; বাঁচাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো কাজ। আমাদের আমরা না বাঁচালে কে বাঁচাবে, আমাদের কে আছে? দেহটার ভেতর মধু আছে, তাই ওটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আমরা দিনরাত বিষ খাই; আর এই আকাশ বাতাস মেঘ নদী রোদ ধান আর রাতের বেলা একটু আধটু সুখ ছেড়ে কার সেই পারে চলে যেতে ইচ্ছে করে? আমরা আছি আমাদের দুঃখকষ্টে, আমাদের দুঃখকষ্টই আমাদের জীবনের রঙতামাসা, তাতেই আমরা মজে আছি, রাজারা আছেন তাদের সুখেসম্পদে। তারা আরো ক্ষমতা না পেলে দুঃখ না পান, তাঁদের শরীর জ্বালা করতে থাকে, একশো বছর সিংহাসনে না থাকতে পারলে কষ্ট পান, আরো সম্পদ না পেলে দুঃখ পান, তাঁদের দেহে আগুন জ্বলতে থাকে; তাদের দুঃখ আর আমাদের দুঃখ ভিন্ন। তাদের দুঃখ সোনা দিয়ে তৈরি, আমাদের কষ্ট পচা খড়কুটোয়। রাজারা চিরকাল রাজা থাকবেন আমরা চিরকাল আমরা থাকবো, এটা কে না জানে, রাজারা ও আমরা কোনো দিন এক হবে না।

আমাদের কয়েকটি ছেলের কথা মনে পড়ছে; যদিও ওদের কথা মনে না পড়াই ভালো; আর আমরা মনে করতেও চাই না।

আমাদের ওই ছেলেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, আমরা তাই ভাবতাম, আমাদের ছেলেরা তো নষ্ট হবেই, ওদের আমরা জন্মই দিই নষ্ট হওয়ার জন্যে, আমাদের ধাতু আর জরায়ুতেই দোষ আছে, পচন লেগেছে ওই দুই জিনিশে; ওরা ইস্কুল থেকেই পাশ করে বেরোতে পারে নি; আর আমাদের, অর্থাৎ ওদের বাবাদের বড়ো দোষ হচ্ছে তাদের এতো টাকা কই যে ওদের নিউইয়র্ক বা দিল্লি পাঠিয়ে দেবে সভ্য শিক্ষিত হতে, বা কিনে দেবে সাগর ১, ২, ৩, মহাসাগর ৪, ৫, ৬, উপসাগর ৭, ৮, ৯, ১০ নামের পাঁচ দশটা তেতলা লঞ্চ, যেগুলো চলবে ঢাকা থেকে ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপের পথে, বা দোকান নিয়ে দেবে ঢাকার সুপারমার্কেটে, পাজেরো কিনে দেবে; আর এতো শক্তি কই যে ব্যাংক লুঠ করে এনে দেবে পঞ্চাশ কোটি টাকা। হতো ওরা রাজাদের ছেলে, ওরা নষ্ট হতো না, রাজা হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হতো। ওদের তখন কিছুই করার ছিলো না, তাই ওরা একটি কাজই করতে পারতো, নষ্ট হতে পারতো। নষ্টই বলি কী করে? ওই এলাকার এলাকার নামও কি বলতে হবে?–বলার দরকার নেই, যে-কোনো এলাকার নাম নিলেই চলবে, এমপি সাহেব যেভাবে এমপি হয়েছেন, ওরা সেই কাজ শুরু করে, টিকে থাকলে ওরাও একদিন এমপি হতো; ওরা প্রথম এমপি সাহেবের রাজবংশে যোগ দেয়। মাননীয় এমপি সাহেবের এমপি হওয়ার জন্যে ওদের খুব দরকার ছিলো।

এমপি সাহেব তখন, আরো অনেক মাননীয় এমপি সাহেবের মতো, এক রাজবংশ থেকে আরেক রাজবংশে এসেছেন; তিনি রাজাদের রাজবংশেই থাকতে পছন্দ করেন। যে-রাজবংশ সিংহাসনে নেই, তিনি সেই রাজবংশে থাকেন না; তাতে পাপ হয়, তাঁর। বিশ্বাস রাজার বিরুদ্ধে থাকা আর আল্লার বিরুদ্ধে থাকা একই কথা। তিনি ইমান নষ্ট করতে চান না; তিনি সব সময় রাজা আর আল্লার পক্ষে থাকতে চান।

এতে তাঁর মঙ্গল হয় এটা আমরা সব সময়ই দেখতে পাই। রাজা আর আল্লা দুই হাতে ঢেলে তাকে সব কিছুই দেন।

কিন্তু ইমানদার লোকেরও শক্রর অভাব হয় না, অন্য রাজবংশে যোগ দেয়ার পর তারও শত্রু বাড়ে; এবং তিনি আমাদের ওই সাতজন ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নেন। নেবেন না কেনো, তিনি ওদের দুঃখ বোঝেন; তিরিশ বছর আগে তাঁর দুঃখ বুঝে সেই কালের এমপি সাহেবও তাকে বুকে টেনে নিয়ে একখানি জিনিশ ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ওই জিনিশটা তাকে এতো দূর নিয়ে এসেছে। তিনি ওদের সবখানেই নিয়ে যেতেন, তার সাথে ওরা পাজেরোতে চলতো, তিনি গাড়ি থেকে নেমে কোলাকোলি আর দু-হাত মেলানোর সময় ওরা তাকে ঘিরে থাকতো, আমরা দেখতাম ওদের জামা উঁচু হয়ে আছে, পকেট ফুলে আছে, মাঝেমাঝে ওরা কালো জিনিশটি নিয়ে নিজেরাই একলা একলা খেলতো, দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম। এমপি সাহেব ওদের আদর করতেন, সবখানেই পরিচয় করিয়ে দিতেন ওরা আমার ছেলে।

এমপি সাহেব মহান পিতা; নিজের দুই পুত্রকে তিনি আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়ে বুকে খুব শূন্যতা অনুভব করতেন, ওরা তার সেই শূন্য বুক ভরে রাখতো। ফ্রি টেলিফোনে তিনি নিজের পুত্রদের সাথে সব সময়ই কথা বলতেন, পুত্ররা লেখাপড়া শিখে মানুষ হচ্ছে শুনে বুক তার ভরে উঠতো; কিন্তু টেলিফোনের কথায় কি পিতৃস্নেহ মেটে, পিতার বুক ভরে? তাই তো তিনি আমাদের ওই সাতটি ছেলেকে নিজের ছেলে করে নিয়েছিলেন।

এমপি সাহেবের ছোটো ছেলে বলতো, আব্বা, আমি দেশে আসতে চাই।

এমপি সাহেব কাতর হয়ে উঠে চিৎকার করতেন, না, বাবা, এখন দ্যাশে আসবা না, এইটা কি দ্যাশ নাকি, এইখানে আসলে তোমার শরিল টিকবো না। আমেরিকারে বাপমায়ের দ্যাশ ভাইব্যা সেইখানেই থাকো।

ছেলেটি বলতো, আব্বা, বিদেশে আমার মন টিকছে না; এখানে আমি একটা থার্ডক্লাশ সিটিজেন হয়ে আছি, এখানে আমি নিগ্রোর থেকেও খারাপ আছি।

এমপি সাহেব বলতেন, বাবা, বোঝ না আমেরিকায় থাডক্লাশ সিটিজেন থাকনও ভাল, নিগ্রোর থাইকা খারাপ থাকনও ভাল। এই বাংলাদ্যাশ একটা দ্যাশ না, এইখানে আইজ আসলে কাইল তুমি খুন হইয়া যাইবা, নাইলে অ্যাকসিডেন্টে মইরা যাইবা, দ্যাশে আসনের কাজ নাই।

ছেলেটি বলতো, কেনো, আব্বা, দেশে অনেক মানুষ তো বেঁচে আছে।

এমপি সাহেব বলতেন, সবগুলি ত একলগে মরতে পারে না, তাই বাইচ্যা আছে, কিন্তু কোনটা কোন সময় মরবো কেউ জানে না। তুমি দ্যাশে আসবা না, বাবা। মন চাইলে তুমি ফ্রান্সে আর অস্ট্রেলিয়ায় মাসখানেক ব্যাড়াইয়া আসো, তোমার নামে দশ হাজার ডলার পাঠাইতেছি।

এমপি সাহেবের বড়ো ছেলে সম্পূর্ণ বিপরীত; তাকে টেলিফোন করতে মনে মনে ভয় পান এমপি সাহেবও। ছেলেটি চিঠি তো লেখেই না, কখনো ফোনও করে না; আর এমপি সাহেব ফোন করলে সে বিরক্ত হয়।

ওই ছেলে বলতো, আব্বা, কাজে অকাজে ফোন করে তুমি পয়সা নষ্ট কোরো না, এদেশে কেউ এভাবে পয়সা নষ্ট করে না।

এমপি সাহেব বলতেন, বাবা, পয়সা আমি নষ্ট করি না, এইটা আমার ফ্রি ফোন, এমপি হিশাবে পাইছি, কোনোদিন বিল দিতে হইবো না। দ্যাশবিদাশে বিজনেস আমি এই ফোনেই করি।

ছেলেটি বলতো, এভাবে তো তুমি ট্যাক্স পেইআরস মানির অপচয় করছো, এখানকার ওরা তা করে না।

এমপি সাহেব হা হা করে উঠতেন, হা হা হা হা, বাবা, অইটা হইলো আমেরিকা, আর এইটা হইলো বাংলাদ্যাশ, এইখানে কেউ ট্যাক্সো দ্যায় না, আর আমরা ট্যাক্স পেয়ারগো মানি নষ্ট করি না, দ্যাশটা চলে লোনের টাকায়।

ছেলেটি বলতো, ওই লোনের টাকা তুমি এভাবে অপচয় করতে পারো না।

এমপি সাহেব ছেলের কথায় হো হো করে হাসতেন, বলতেন, বাবা, তুমি একটা গ্রেট ম্যান হইতেছে, তোমারে লইয়া আমি প্রাউড ফিল করি, আমি আমার এমপি ভাইগো তোমার কথা কই, তারা কয় তুমি জর্জ ওয়াশিংটন আর ইব্রাহিম লিংকনের মতন গ্রেট ম্যান হইবা, আমেরিকা আছো বইল্যাই এইটা হইতে পারতেছো, বাবা; আমাগো দেশে তোমার মতন গ্রেট ম্যান দরকার, গ্রেট লিডার দরকার; তুমি দ্যাশে আসবা, দ্যাশটা উদ্ধার করবা, বড় ন্যাতা হইবা।

এমপি সাহেব কথাগুলো বলে সুখ পান, নিজেকে তার ওয়াশিংটন লিংকনের বাপজান মনে হয়; তার আরো ভালো ভালো কথা বলতে ইচ্ছে হয়, এবং তিনি বলতে থাকেন, বাবা, আমরা সব এমপি ভাইরা, পলিটিশিয়ানরা, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টরা আমাগো পোলামাইয়াগো আমেরিকা, ইংল্যান্ড, দিল্লি, দার্জিলিং পাঠাই দিছি তারা সেইখানে থাইক্যা লেখাপড়া শিখ্যা গ্রেট ম্যান হইয়া দ্যাশে ফিরবো, একদিন দ্যাশের ভার লইবো, তুমিও দ্যাশের ভার লইবা, বাবা।

ছেলেটি বলতো, আব্বা, আমি দেশে কখনো আসবো না, তোমাদের কাজ দেখে দেখে আমার ঘেন্না ধরে গেছে; আই হেইট দোজ করাপ্ট ইলিজিটিমেট এমপিজ অ্যান্ড রাসকল পলিটিশিয়ান্স।

এমপি সাহেব ভয় পেয়ে বলতেন, এইটা তুমি কী বলতেছো, বাবা; তুমি দ্যাশে না আসলে আমি এই মিলকারখানা বাড়িগাড়ি কাগো লিগা করলাম, আর আমি তোমার এমপি হওনের পথও তৈরি কইর‍্যা রাখছি। তুমি এমপি হইবা, মন্ত্রী হইবা, পারলে প্রধান মন্ত্রী হইবা, বাবা।

প্রধান মন্ত্রী কথাটি নিজের কানে শুনেই তিনি ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার মতো ভয় পান, তাকিয়ে দেখেন কেউ আছে কি না, কেউ শুনলে ভাবতে পারে তিনি ষড়যন্ত্র করছেন। সিআইএ, র, বা অন্য কারো সাথে। আমাদের অসাধারণ দেশগুলোতে প্রধান মন্ত্রী কি যে সে হতে পারে? একটি মরা বাপ দাদা নানা স্বামী শ্বশুর থাকতে হবে না? একটা বড়ো মাজার থাকতে হবে না? তিনি কে? তার কী আছে? তার বাপটার লাশ তো জংলা গোরস্থানে কুত্তায় খেয়েছে। হ্যাঁ, তিনি মরে গেলে তার নাম ভাঙিয়ে ছেলেমেয়েরা এমপি হতে পারবে, সে পথ তিনি পরিষ্কার করেছেন। এটাই ক-জন পারে?

ছেলেটি বলতো, এমপি আর মন্ত্রী হওয়ার থেকে আমি কুকুর হওয়াও বেশি পছন্দ করি, আব্বা।

এমপি সাহেব হায় হায় করে ওঠেন, এ কি কথা তুমি বলতেছো, বাবা, আমার বুক ভাইঙা যাইতেছে।

ছেলেটি একদিন বলে, আব্বা, আম্মা ফোন করেছিলো কালকে।

এমপি সাহেব কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করেন, তোমার আম্মায় আবার কী জইন্যো ফোন করলো? আমারে কইলেই ত পারতো।

ছেলেটি বলে, শি কমপ্লেইনড অ্যাগেইনস্ট ইউ, আব্বা।

ভয়ে ভয়ে এমপি সাহেব জিজ্ঞেস করেন, কী কমপ্লেন করলো, বাবা?

ছেলেটি বলে, তা বলতে আমার ঘেন্না হচ্ছে।

এমপি সাহেবের মনে হয় লাইনটা যদি এখন কাট হয়ে যেতো, তাহলে ভালো হতো; এই ঢাকার কলো লাইনই যখনতখন কাট হয়ে যায়, তারপর পাঁচ ঘণ্টা ঘোরালেও আর পাওয়া যায় না, কিন্তু এটা কাট হচ্ছে না, আমেরিকার সঙ্গে লাইন তো, তাই কাট হচ্ছে না। ঘেমে ওঠেন এমপি সাহেব।

ছেলেটি বলে, বাট আই মাস্ট টেল ইউ, আম্মা বলেছেন তুমি মেইড সার্ভেন্টগুলোর সাথেও থাকো, আবার হোস্টেলে অ্যাক্ট্রেস কলগার্লও ওঠাও।

এমপি সাহেব বলেন, তোমার আম্মা বুড়া হইতেছে, আর পাগল হইতেছে, আর আমার নামে যা তা বলতেছে, তার ভাল হইবো না, তারে আমি আইজই বুঝাই দিতেছি।

ছেলেটি বলে, তবে তোমার ওই কাজে আমি বিশেষ হার্ট হই নি, তোমরা পলিটিশিয়ানরা অল অ্যারাউন্ড দি গ্লোব এ-কাজই করছো, পিপলের টাকা চুরি করছো, ব্যাংক লুট করছো, কলগার্লের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছো, পরের বউ ভাগাচ্ছো, তিন চারটা মিস্ট্রেস রাখছো, মাফিয়া পুষছে, আর মুখে বড়ো বড়ো কথা বলছো, সব কিছু করাপ্ট করাই তোমাদের কাজ, তা তোমরা করবেই, বাট নেভার ট্রাই টু হিট মাই মাদার অ্যান্ড নেভার থিংক অফ লিভিং হার, তাহলে বিপদে পড়বে, ইউ উইল বি ইন ডিপ ট্রাবল।

তার ছেলে টেলিফোন রেখে দেয়।

এমপি সাহেব হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেন; আর মনে মনে বলেন, মাইয়ালোকটার সব কিছু যতই ঢিলা হইয়া যাইতেছে, তার মুখটাও ততই ঢিলা হইয়া যাইতেছ, পোলার কাছেও এইসব কয়।

বুকভরা এমন গভীর অসীম শূন্যতা নিয়ে এমপি সাহেব সেই সাতটি ছেলেকে নিজের করে নিয়েছিলেন; তারা তার সাতটি লম্বা শক্ত হাত, যে-হাত দিয়ে তিনি মাঝেমাঝে মগজ ও রক্ত খেতে পছন্দ করেন। একদিন তিনি তাদের একটি কাজ দেন; কাজটি খুবই জরুরি, পথ পরিষ্কারের কাজ; নিজের পথে কাঁটা থাকা তার ভালো লাগে না, তাই তিনি তাদের কাজ দেন দুটি কাটাকে–আপ্তাজদ্দিন ও তার ছেলেকে, তুলে ফেলার। কাঁটা দুটি খুব বেড়ে উঠেছে, পায়ে লাগছে। সেই ছেলেরা একরাতে পরিষ্কারভাবে দুনিয়া আর রাজনীতি থেকে তুলে ফেলে ওই দুজনকে; আমরা তা জানতে পেরে অল্প অল্প শিউরে উঠি, কিন্তু কোনো কথা বলি না। আপ্তাজদ্দিন ও তার ছেলে গেছে, তাতে আমাদের কী? সেও কি এমনভাবেই তুলে ফেলে নি শেখ আনসারুদ্দিনকে; আর পারলে সে কি তুলে ফেলতে না এমপি সাহেবকে? কাঁটা তুলে ফেললে পথে হাঁটা যায় কী করে? পুলিশ কয়েক দিন খুবই ঘোরাফেরা করলো গ্রামে, এমপি সাহেবের পেছনে পেছনে আমরা তাদের পোষা প্রভুভক্তগুলোর মতো হাঁটতে দেখলাম, ইস্কুলের দুটি ছেলে আর মাঠের তিনটি রাখালকে তারা ধরে নিয়ে গেলো, এমপি সাহেব কয়েক বার গিয়ে আপ্তাজদ্দিনের দুই বউকে ধরে কাদলেন, এবং সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলো।

আমাদের সেই ছেলেরা, এমপি সাহেবের সাত পুত্র, তার লম্বা শক্ত হাতেরা কোথায় গেলো?

আমরা দূরের মানুষ, আমরা কী করে জানবো? আমরা শুধু দেখতে পাই সেই সাত ছেলের বাপেরা আর ভাইয়েরা শুধু ঢাকা যাচ্ছে আর ফিরে আসছে, কারো সাথে বেশি কথা বলছে না, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছে পাঁচ সাতবার, মুখ খুব ভার। কয়েক দিন পর দেখতে পেলাম মুখ থেকে ভারটা নেমে গেছে, কিন্তু হাত পা কাঁপছে। কিন্তু আমরা কিছু জানতে পারি না, জানতেও চাই না। সেই ছেলেদের সংবাদটা আমরা পাই অনেক পরে।

শুনতে পাই এমপি সাহেব তাদের নিজের কারখানার গুদামে লুকিয়ে রাখেন; এবং চার দিনের দিন বলেন, পোলারা, ভাবছিলাম তোমাগো  বাঁচাইতে পারুম, এখন। দ্যাখতেছি সেইটা সম্ভব হইবো না।

ছেলেরা জানতে চায়, আমাগো কী অইবো, ছার? আপনে আমাগো  বাঁচান; আপনের লিগাই তো আমরা ওই কাম করলাম।

এমপি সাহেব বলেন, কামটা তোমরা ভালই করছে, তবে সেই কথা কোনো দিন কারে বইলো না; কিন্তু দ্যাশে থাকলে তোমাগো  বাঁচান যাইবো না।

ছেলেরা জিজ্ঞেস করে, আমরা তয় কই যামু? যামু কেমনে?

এমপি সাহেব বলেন, আমি তোমাগো কোরিয়া পাঠাই দিতেছি, আমার ম্যান পাওয়ার কম্পানিই তোমাগো পাঠানের ব্যবস্থা করবো, কেউ জানবো না।

তারা বলে, দ্যান, ছার, আমাগো পাঠাই দ্যান।

এমপি সাহেব বলেন, হ, তোমাগো কোরিয়া পাঠাই দিমু, আমার লোকরা তোমাগো এয়ারপোর্ট পার কইর‍্যা ছাইড়া দিব, তারপর তোমরা নিজেরাই কাজকাম খুইজ্যা লইতে পারবা। কোরিয়ায় কামের আইজকাইল অভাব নাই, জাপানরে হারাই দিতেছে, মালিকরা রাস্তাঘাটে বাংলাদেশি লেবারার খোঁজে।

তারা বলে, হ, পাঠাই দ্যান, ছার, কাম আমরা পামু। কাম করতে আমাগো কষ্ট অইবো না, দিনরাইত খাটুম।

এমপি সাহেব বলেন, এই গুদাম থেইক্যাই দুই তিন দিনের মইধ্যে তোমাগো রাইতে গিয়া প্লেনে উটতে হইবো, বাপমা ভাইবোনের লগে দেখা করতে পারবা না। তয় যাওনের আগে এয়ারপোর্টে একবার দ্যাখা করনের ব্যবস্থা কইরা দিমু। দূর থিকা তাগো দ্যাখতে পাইবা, তোমাগোও তারা দ্যাখতে পাইবো। কোরিয়ায় গিয়া তোমরা লাখ লাখ টাকা কামাই করবা, কোটিপতি হইয়া দশ পোনর বছর পর দ্যাশে ফিরবা।

ছেলেরা খুব কৃতজ্ঞ বোধ করে, এমপি সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, মনে হয় তিনিই তাদের বাবা।

এমপি সাহেব সাত ছেলের বাপভাইদের নিয়ে গোপনে বসেন।

এমপি সাহেব বলেন, দ্যাশে রাখলে অগো  বাঁচান যাইবো না, তাই ভাবতেছি অগো কোরিয়া পাঠাই দিমু।

তারা বলে, দ্যান, ছার, অরা অইখানে গিয়া বাচুক।

তারা খুব কৃতজ্ঞ বোধ করে, এমপি সাহেব মহৎ মানুষ।

এমপি সাহেব বলেন, সব খরচ আমিই দিমু, কোরিয়ায় অগো কামের ব্যবস্থাও কইরা দিমু, তয় প্লেন ফেয়ারটা আপনেগো দিতে হইবো।

তারা সবাই চমকে ওঠে।

এমপি সাহেব বলেন, বেশি লাগবো না, সাতজনের আড়াই লাক তিন লাক হইলেই হইবো।

তারা বলে, এতো টাকা ত আমাগো হাতে নাই, ছার, এত ট্যাকা কই পামু?

এমপি সাহেব বলেন, অরা ত আর সাতরাইয়া যাইতে পারবো না, যাইতে হইবো প্লেনে চইর্যাই, আর তার জইন্যে ভারাও লাগবো। থাকলে আমিই দিতাম, আমার হাতে আইজকাইল ট্যাকা নাই।

তারা কিছু বুঝতে না পেরে এমপি সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এমপি সাহেব বলেন, বাঁচতে চাইলে অগো দ্যাশ ছারনই লাগবো। দরকার হইলে জমিজমা কিছু বেইচ্যা দেন, ট্যাকা উশিল হইয়া যাইবো। কোরিয়ায় গিয়া অরা লাক লাক ট্যাকা কামাই করবো।

কিন্তু জমিজমা যা আছে, তা বেচলে তারা খাবে কী, থাকবে কোথায়; আর এতো তাড়াতাড়ি বেচবেই কার কাছে? তাদের মনে হয় তারা খুন হয়ে গেছে তাদের ছেলেদের হাতে; কিন্তু তাদের ছেলেরা খুন হয়ে যাক ফাঁসিতে ঝুলুক এটা তারা চাইতে পারছে না।

একজন বলে, ছার, যা জমিজমা আছে, তা বেচলে নিজেগো খাঅনই চলবো না, থাকনেরও জায়গা থাকবো না।

এমপি সাহেব বলেন, আল্লায় না খাওয়াই রাখবো না, আল্লায় থাকন খাঅনের একটা ব্যবস্থা কইর‍্যাই দিবো।

এক পিতা বলে, তাও না বেইচ্যাই দিলাম, তয় এত তরাতরি কিনবো কে, কার কাছে বেচুম?

এমপি সাহেব বলেন, হ, সেইটা একটা কথা; আর জানাজানি হইয়া গেলেও বিপদ আছে, লোকে জানতে চাইবো জমিজমা ব্যাচতেছেন কেন?

তারা কিছুক্ষণ ধরে উদ্ধারহীন সংকটে পড়ে, এবং তাদের উদ্ধার করেন এমপি সাহেবই।

এমপি সাহেব বলেন, আমি আপনেগো জইন্যে এইটা করতে পারি চাইলে আপনেরা আমার ছেলেদের কাছে বেচতে পারেন, তাগো নামে রেজিস্ট্রি কইর‍্যা দেন, তাগো ট্যাকা থিকা আমি আপনেগো ট্যাকাটা দিয়া দেই। অই ট্যাকা দিয়া টিকেট কিইন্যা দেই।

এমপি সাহেব মহৎ মানুষ; দু-তিন দিনের মধ্যেই তিনি সেই সাত ছেলেকে কোরিয়া পাঠিয়ে দেন, তার ম্যান পাওয়ার কোম্পানির লোকেরা সেই ছেলেদের এয়ারপোর্ট পার করে রাজধানির পথে ছেড়ে দেয়; বিমান ওঠার আগে দূর থেকে সেই ছেলেরা একবার দেখতে পায় তাদের পিতামাতাদের, আর পিতামাতারা দূর থেকে দেখতে পায় সেই ছেলেদের। তাদের বুক এই দেখায় ভরে আছে। আমাদের সেই ছেলেরা খুন করতে পারতো; তারা কি কাজ করতে পারতো না? দেশে কাজ নেই, তাই তারা কাজ করবে কোথায়, আর করবেই বা কী কাজ? দেশে খুন করা আছে, কাঁটা তুলে ফেলা আছে, পথ পরিষ্কার করা আছে, তাই তারা খুন করতো, কাঁটা তুলে ফেলতো, পথ পরিষ্কার করতো। কোরিয়ায় কাজ আছে, পলাতকের জন্যেও আছে; সেখানে তারা দিনরাত কাজ করে, লুকিয়ে থেকে কাজ করে, সেখানকার চুং চাং দুং দিং মনিবেরাও জানে কীভাবে ঠকাতে হয়, তারা তাদের ঠকায়, কারখানার জেলের মধ্যে অনেকটা আটকেই রাখে; কিন্তু আমাদের সেই ছেলেরা সেখানে কাজ করে। তাদের হাতে এক সময় পিস্তল ছিলো, সে-কথা তারা ভুলে যায়। দাস হিশেবে তারা ভালো।

চার বছর পর ওই মনিবের কারখানা থেকে তারা বেরিয়ে পড়ে। তাদের সবার চোখে একটি করে স্বপ্ন আছে, সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন, টাকার স্বপ্ন। তারা বেশ কিছু টাকা করেছে, বুদ্ধি করে দেশেও টাকা পাঠিয়েছে, এমপি সাহেবের মাধ্যমে পাঠায় নি–মনে হয় তারা কী যেনো বুঝতে পেরেছে; আরো বুঝতে পারে দাস হয়ে থাকলে টাকা হয়, আর দাস হয়েই যদি থাকতে হয়, তাহলে কোরিয়ায় কেননা, তার চেয়ে ভালো জাপান। বাঙলাদেশে ফিরতে তাদের ইচ্ছে করে না, মাঝেমাঝে শুধু স্বপ্নে দেশে ফেরে, মাবাবাকে, ভাইবোনকে দেখে, এবং হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তাই দেশকে তারা স্বপ্নেও দেখতে চায় না। জাপান হয়ে ওঠে তাদের স্বপ্ন, দাসদের স্বপ্নের দেশ জাপান। তাদের চেনা কয়েকজন এর মাঝে জাপান চলে গেছে, মাসে লাখ টাকা রুজি করছে; তারা আর কোরিয়ায় চল্লিশ হাজার রুজি করতে চায় না। তাদের গলাকাটা পাসপোর্ট আছে, তাদের মতো দাস স্বপ্নের দেশে যাওয়ার অনুমতি পেতে পারে না। কোরিয়াই কি তাদের অনুমতি দিয়েছিলো, তারা অনুমতি চেয়েছিলো? তবু কি তারা কোরিয়ায় আসে নি, মাসে মাসে চল্লিশ হাজার রুজি করে নি; সুন্দর সুন্দর রঙিন ছবি তোলে নি; দুই চার পাইন্ট বিয়ার খায় নি? অনুমতি চাইলে আর সীমা মানলে এখন তারা কোথায় থাকতো? কেউ তাদের অনুমতি দেবে না, তারাও অনুমতি নেবে না, শুধু তারা সীমা পেরিয়ে যাবে–স্বাধীন হওয়ার জন্যে নয়, বিশ্ব আবিষ্কার করার জন্যে নয়, শুধু দাস হওয়ার জন্যে।

সেই ছেলেরা জানতে পারে জাপানে যাওয়ার উপায় আছে, মানুষ হিশেবে নয়, মাল, হয়ে তারা জাপান যেতে পারে। তাদের চেনা কয়েকজন বাঙালি বাঙলাদেশি মাসখানেক আগে মাল হয়েই জাপানে পৌঁছে গেছে, কোনো অসুবিধা হয় নি, ফোন করে তারা জানিয়েছে, তারা ইয়ামাগুচির জেলেদের কারখানায় মাছ প্যাক করছে, মাসে লাখখানেক থাকবে। মাস তিনেকেই জাপানে আসার খরচটা উঠে যাবে, তারপর শুধু জমবে। স্বর্গ ভরেই টাকা ছড়ানো, দিনে আঠারো ঘণ্টা ধরে কুড়োতে হবে, চাইলে আরো বেশি সময় ধরেও কুড়োতে পারে। তারাও জাপান যাবে, মাল হয়েই যাবে; দাস তো মানুষ না, মালই, মালের থেকেও খারাপ; মালের দামই আজকাল বেশি, মাল ছাড়া অন্য কিছুরই দাম নেই, তাই মাল হ’তে তাদের কোনো কষ্ট নেই, শুধু বেহেস্তে গিয়ে পৌঁছতে পারলেই হয়, লাখখানেক থাকলেই হয়। পুসানের সাগর পার থেকে উঠতে হবে ট্রলারে, যাত্রী হিশেবে নয়, মাল হিশেবে, তারপর তিনশো কিলোমিটারের মতো সাগর, ইয়ামাগুচির সাগর পারে গিয়ে ট্রলার ভিড়তে লাগবে সাত আট ঘণ্টা; আর ওই সময়টা, ট্রলার ছাড়ার ঘণ্টাখানেক আগে থেকে ট্রলার ভেড়ার ঘণ্টাখানেক পর পর্যন্ত, দশ ঘণ্টার মতো সময় তাদের থাকতে হবে মাছের বিশাল কন্টেইনারের ভেতর ভ’রে কন্টেইনার আটকে দেয়া হবে, মাছের মতো থাকবে তারা, তবে ব্যবস্থাটা বেশ আধুনিক, কোরিয়া জাপানের মতো উন্নত দেশেই সম্ভব, স্মাগলারাও এখানে বিজ্ঞান জানে কন্টেইনারের ভেতর দশ বারোঘণ্টার জন্যে অক্সিজেনেরও ব্যবস্থা করা হবে, বাতাসের থেকেও ভালো, কোনোই অসুবিধা হবে না। একটু অন্ধকার লাগবে, প্রচুর মাছের গন্ধের স্বাদ পাবে, ইচ্ছে করলে ঘুমিয়েও পড়তে পারে তারা, কোনো বাধা নেই; ঠিক সময়ে দেখতে পাবে কন্টেইনার খুলে বের করা হচ্ছে তাদের, ছেড়ে দেয়া হচ্ছে সাগর পারের নির্জন জঙ্গলে।

সে-রাতে ট্রলার পোঁছতে দেরি হয়ে যায়, মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে কয়েক ঘণ্টা দেরি হয়; ইয়ামাগুচিতে যখন কন্টেইনার খুলে আমাদের সেই ছেলেদের বের করা হয়, তখন তারা মাছের মতোই মৃত। অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়েছিলো।

তাদের লাশ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় কোরীয় উপসাগরে। তারা তাদের স্বপ্নের দেশ জাপানে পৌঁচেছিলো; তাদের আর দুঃস্বপ্নের দেশে ফিরতে হয় নি।

আমরা খোয়বের দেশের মানুষ; রোজ দুই তিন বেলা আমরা ভাত খাই, অনেকে একবেলাও খেতে পাই না, কিন্তু দশ বিশ বেলা আমরা খোয়াব দেখি, তার থেকে বেশিও দেখি হাতে কোনো কাজ না থাকলে, অনেকে সারাজীবনটাই খোয়াবের মধ্যে কাটিয়ে দিই। আমাদের পথেঘাটে বিরাট বিরাট খোয়াবির দেখা মেলে; ওই খোয়াবিদের মহৎ জীবনকাহিনী আমরা দুই হাতে লিখে ছেলেমেয়েদের বইতে পাঠ্য করে দিই। খোয়াব আমাদের দুই রকম, জাগনাখোয়ব আর ঘুমনাখোয়াব; দুই খোয়াবে দু-রকম জিনিশ দেখি আমরা; আর জেগে দেখা স্বপ্ন ও ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের গোলমালে আমাদের রক্ত শহরের বস্তির ড্রেনের পানির মতো ময়লা হয়ে যেতে থাকে।

গাদিঘাটের আলালদ্দির খোয়াবের কথাই প্রথম মনে আসছে।

কয়েক দিন আগে আলালদ্দি বাড়ির পুবপাশের জামগাছটির নিচে বসে ছিলো, ছেঁড়া লুঙ্গির ভেতর থেকে বেরিয়ে ঢলঢল করছিলো তার হোল দুটি, কেনো সে বসে ছিলো। সে জানতো না; শুকনো পুকুরটির দিকে তাকিয়ে তার কেমন লাগছিলো, তা সে বুঝতে পারছিলো না; এমন সময় সে খোয়াব দেখে সে বিলের দিকে যাচ্ছে, আর তার সামনে হালটের ওপর লাফিয়ে ওঠে দুটি লাল রুইমাছ। দু-পাশেই পানি টলমল করছে কচুরিপানা আর দলঘাসের ভেতর, মাঝখানে সরু হাটের ওপর লাফাচ্ছে দুটি রুইমাছ; আলালদ্দি দুটির ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে, একটি ধরতে গেলে আরেকটি পিছলে যায়, হাতে একটি দুটি আঁশ আর সারা শরীরে অপূর্ব গন্ধ লেগে থাকে, আর দু-একটি লাফ দিতে পারলেই মাছ দুটি পানিতে গিয়ে পড়বে, আলালদ্দি মাছ দুটির ওপর বারবার লাফিয়ে পড়তে থাকে, কিছুতেই একটিকেও আর পানিতে ফিরে যেতে দেবে না, সে দেয় না, দুটি মাছেরই কানসার ভেতর দিয়ে সে হাত ঢুকিয়ে দেয়, হাত ঢুকোতে গিয়ে হাত তার কেটে যায়, কিন্তু সে মাছ দুটিকে ছাড়ে না, মাছ দুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আনন্দে সে তার ছেলের নাম ধরে চিৎকার করে ডেকে ওঠে।

তার আনন্দ চিৎকার তার স্ত্রী পারলির কানে গিয়ে আর্তনাদের মতো ঢোকে।

তার স্ত্রী ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে, তুমি এত চিল্লাইতে আছ ক্যান, ছুরইত্তার মতন তুমিও পাগল অইয়া গ্যালা নি?

আলালদ্দি লজ্জা পেয়ে বলে, খোয়াব দেকছি, রুই মাছের খোয়াব।

পারলি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, তোমার বাপেও রুইত মাছ দ্যাহে নাই, তোমার মতন মরদ দ্যাহে রুইত মাছ।

আলালদ্দি বলে, আসল রুইত মাছ না, খোয়াব দেকছি।

পারলি বলে, খোয়াবেও তোমার মিরকা মাছই দ্যাহনের কতা, তুমি মিরকা মাছের পুরুষপোলা।

আলালদ্দি খোয়াবে আচ্ছন্ন বলে রাগতে পারে না, নইলে সে পারলির বাপের নাম ভুলিয়ে দিতো, যেমন সে মাঝেমাঝেই ভুলিয়ে দেয়। পারলি তখন নিজের বাপের নাম ভুলে আলালদ্দির নাম ডাকতে থাকে।

আলালদ্দি বলে, বড়ো সুখ লাগতাছে, রুইত মাছ দেকছি।

পারলি বলে, খোয়াব লইয়াই থাক, রান্ধনের লিগা বইচা মাছও নাই।

ওই আলালদ্দিই রাতের বেলা ঘুমনাখোয়াব দেখে হুহু করে কেঁদে ওঠে।

খোয়াবে সে তার কুমড়ো ক্ষেতটি দেখতে পায়।

আলালদ্দি দেখতে পায় তার ক্ষেত ভ’রে বড়ো বড়ো কুমড়ো হয়েছে, একেকটি একমণ দু-মণ হবে, এতো বড়ো কুমড়ো তার ক্ষেতে আগে কখনো হয় নি, হওয়ার কথাও সে কখনো ভাবে নি। কুমড়োগুলো শুধু বড়োই নয়, খুবই কচকচে, নলামাছ দিয়ে খেলেও মধুর মতো লাগবে, ইলিশ মাছের সাথে লাগবে রসগোল্লার মতো কুমড়োগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয় আলালদ্দির। ছোঁয়ার সময় তার মনে হয় সে পারলির দেহটা ছুঁচ্ছে; আজকের পারলির নয়, যে-রাতে সে পারলিকে মাফায় করে কান্দিপাড়া থেকে নিয়ে এসেছিলো, সে-রাতের পারলির দেহের মতো। কিন্তু ছুতে গিয়েই ভয় পেতে থাকে আলালদ্দি; প্রথম কুমড়োটি ছুঁতেই তার আঙুল কুমড়োর ভেতরে ঢুকে যায়, তারপর পুরো হাতটিই ঢুকে যায় কুমড়োটির ভেতর, বিরাট কুমড়োর ভেতর থেকে ভজভজ করে বেরোতে থাকে মলমূত্র, কুমড়োটি তাকে টেনে ঢুকিয়ে ফেলতে চায় খোলের ভেতরে। আলালদ্দি কোনো রকমে হাত টেনে সরিয়ে আনে, এবং ছোঁয় আরেকটি কুমড়ো; ছোঁয়ার সাথে সাথে কুমড়োর ভেতর থেকে গলগল করে উপচে পড়ে মলমূত্র, আলালদ্দি মলমূত্রের নিচে তলিয়ে যেতে থাকে, আর কুমড়োটি তাকে চুমুক দিয়ে নিজের খোলর ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে। আলালদ্দি চিৎকার করতে চায়, পারে না; সে আবর্জনার ভেতর লুপ্ত হয়ে যেতে থাকে; শুধু হুহু শব্দ উঠতে থাকে।

পারলি তাকে ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, অ, রহমানের বাপ, এমন কইর‍্যা গোঙ্গাইতে আছ ক্যান?

আলালদ্দি কাঁপতে কাঁপতে বলে, আমারে ধরিছ না, আমার শরিলে গু-মুত; কুমরাখ্যাত গু-মুতে ভইরা গ্যাছে, আমি গু-মুতে ডুইব্যা গ্যাছি।

পারলি বলে, তুমি কী যে কও, গু-মুত আইব কোন হান থিকা। তুমি আইজকাল ছুরইত্তার মতন পাগল অইয়া যাইতাছ।

আলালদ্দি বলে, কুমরার ভিতর গু-মুত; আমারে ঢাইক্যা ফ্যালছে, আমি বাইর অইতে পারতাছি না।

তারপর আলালদ্দি আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালবেলা পারলি জানতে চায়, তুমি রাইতে কিয়ের গু-মুতের খোয়ব দ্যাকলা, কুমাখ্যাতে গু-মুতের কতা কইলা?

আলালদ্দি তার খোয়ব মনে করতে পারে না।

এমন অজস্র খোয়ব আমরা দিনরাত দেখছি; আমাদের খোয়াবের কথা দেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, আমরা সেগুলো নিয়ে খুবই ব্যস্ত রয়েছি।

জনদরদী সমাজসেবক বিশিষ্ট শিল্পপতি বান্দিরগোলা পাড়াকমিটি ও আল মদিনা মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান পশ্চিম ধনেরপাড়া ডিগ্রি কলেজ কমিটির সভাপতি আলমিনার তিনতারা হোটেলের এমডি বিসমিল্লা ব্যাংকের চেয়ারম্যান (এবং ঋণখেলাপি) সুলতানপুর এতিমখানা ফোরকানিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অ্যাপোলো ম্যান পাওয়ার অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সির চেয়ারম্যান আমেরিকান গার্মেন্টস-এর এমডি ভূতপূর্ব ওয়ার্ড কমিশনার ছলছলাতির পীর সাহেবের মুরিদ ইত্যাদি ইত্যাদি আলহজ্জ মোহাম্মদ হামিদ আলি বিন শমশের সাহেবের ষোড়শী কন্যা মোসাম্মৎ বেনজির হাফসানা রুবাইয়াত বিউটির খোয়াবগুলো আমাদের খুব আশান্বিত করছে এবং ভাবিয়ে তুলেছে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x