অতৃপ্ত বাসনা থেকেও আসে অবদমিত বিষণ্ণতা। কোন অদম্য বাসনা যখন অপূর্ণ থেকে যায়, তখন সেই বাসনার তীব্রতা প্রতিনিয়ত মস্তিষ্ককোষকে উত্তেজিত করতে থাকে; এই মস্তিষ্ক কোষগুলোর উপর অতিপীড়ন চলতে থাকার ফলে এক সময় মস্তিষ্ক কোষের ক্রিয়াকলাপে বিশৃঙ্খলা ঘটে।

অতৃপ্ত প্রেম অনেক সময়ই যে অবদমিত বিষন্নতার সৃষ্টি করে, তার থেকেও ভূতে ধরার তথাকথিত অনেক ঘটনা ঘটে থাকে।

এমনই একটি সত্যি ঘঠনা আপনাদের সামনে তুলে দিচ্ছি, শুধু পাত্র-পাত্রীদের নাম গোপন করে।

১২ জানুয়ারী ৯০-এর সন্ধ্যায় আমাদের সমিতির এক সদস্য মৈনাক খবর দিলেন- সত্য গাঙ্গুলির বাড়িতে কয়েক দিন ধরে অদ্ভুত সব ভূতুরে ব্যাপার ঘটে চলেছে। সত্য গতকাল রাতে মৈনাকের সঙ্গে দেখা করে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য আমার সাহায্য প্রার্থনা করেন।

সত্য এক বিখ্যাত মনোরোগ চিকিৎসকেরই ভাইপো, আমার সঙ্গে তেমন কোনও পূর্ব পরিচয় না থাকলেও ওই মনোরোগ চিকিৎসক আমার পরিচিত ও শ্রদ্ধেয়।

ঘটনার যে বিবরণ মৈনাকের কাছ থেকে শুনলাম তা হল এই রকম-

ঘরে কোথাও কিছু নেই হঠাৎ এসে জিনিস-পত্তর পড়ছে। হঠাৎ হঠাৎ সবার সামনে থেকে জিনিসপত্র অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির অনেকেরই পোশাক-আষাকে হঠাৎই দেখা যাচ্ছে কিছুটা অংশ খাবলা দিয়ে কাটা। ঘটনাগুলোর শুরু গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ৯ তারিখ থেকে। পরিবারের সকলেরই শিক্ষিত এবং মার্কসবাদী হিসেবে সুপরিচিত। গতকাল রাতে বাড়ির কাজের মেয়ে রেণু হঠাৎ চেতনা হারিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছিল। সত্যর বউদি দেখে দৌড়ে গিয়ে পিঠে একটা চড় মারতে মেয়েটি চেতনা ফিরে পায়। তারপরই কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সত্য ওঁদের পারিবারিক চিকিৎসককে ডেকে পাঠান। প্রতিষ্ঠিত ওই চিকিৎসকই নাকি সত্যকে বলেন ‘এটা ঠিক আমার কেস নয়, আপনি বরং প্রবীরদাকে ডাকুন।’ তারপরই সত্য আমাকে আনার জন্য মৈনাকের স্মরণাপন্ন হন।

সে রাতেই গেলাম সত্যদের বাড়িতে। সত্যরা থাকেন দোতলায়।

বাড়ির প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বললাম। বাড়িতে থাকেন সত্য, দাদা নিত্য, বউদি মালা, ভাই চিত্ত, দুই বোন রেখা ও ছন্দা, মা অলকা ও কাজের মেয়ে রেণু।

মা’র বয়েস ৬৫-র কাছাকাছি। ভূতুরে কান্ডের বিষয়ে অনেক কিছুই বললেন, স্পষ্টতই জানালেন, ‘না, কারুর দুষ্টুমি বাঁ কেউ মানসিক ভাবে নিজের অজান্তে এই সব ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে বিশ্বাস করি না।’ জানালেন, নিজের চোখে দেখেছেন ঠোঙ্গায় রেখে দেওয়া জয়নগরের মোয়ার মধ্য থেকে মুহূর্তে একটা মোয়াকে অদৃশ্য হতে। সেই মোয়াই আবার ফিরে এসেছে সকলের চোখের সামনে শুন্য থেকে। গত পরশু ওঁরা পরিবারের অনেকে টেলিভিশন দেখছিলেন, হঠাৎ ছাদ থেকে আমাদের সকলের চোখের সামনে মোয়াটা এসে পড়লো। মোয়াটার কিছুটা অংশই দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ধারাল দাঁত দিয়ে মোয়াটা কাটা হয়েছে।

আজ সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনার যা বর্ণনা দিলেন, সে আরও আকর্ষণীয়। ঘরে টেলিভিশন দেখছিলেন অলকা, ছন্দা, চিত্ত, রেণু ও মালা। হঠাৎই রেণুর হাত থেকে লোহার বালাটা নিজে থেকে খুলে এসে পড়লো মেঝেতে। লোহার বালাটা কালই রেণুকে পরানো হয়েছিল ভূতের হাত থেকে বাঁচাতে। এই ঘটনা দেখার পর প্রত্যেকেই এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে চার মহিলাই চিত্তর পইতে ধরে বসেছিলেন এবং পইতে ধরেই চিত্ত করছিলেন গায়ত্রী জপ। আজই তিনবার রেণুর কানের দুল আপনা থেকে খুলে পড়ে গিয়েছে।

বউদি মালা জানালেন অনেক ঘটনা। তার মধ্যে আকর্ষণীয় হলো, বাথরুম বন্ধ করে স্নান করছেন, হঠাৎ মাথার উপর এসে পড়লো কিছু ব্যবহৃত চায়ের পাতা ও ডিমের খোসা। কাল সন্ধ্যায় দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ছেলেকে পড়াচ্ছিলেন, হঠাৎ একটা কিছু এসে প্রচণ্ড জোরে তাঁর পিঠে আছরে পড়লো। তাকিয়ে দেখেন শ্যাম্পুর শিশি। শিশিটা থাকে বাইরের বাড়ান্দার র‍্যাকে। সেখান থেকে কি করে বন্ধ ঘরে এটা এসে আছড়ে পড়লো, তার যুক্তিগ্রাহ্য কোন ব্যাখ্যা তিনি পাননি।

রেখার বয়স পচিশের কাছাকাছি। তিনিও অনেক ঘটনার অরত্যক্ষদর্শী বলে জানালেন। তার মধ্যে আমার কাছে যেটা আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সেটা হলো, রান্নাঘরে আটা মেখে রেখেছেন, উঠে দাঁড়িয়েছেন গ্যাসটা জ্বালিয়ে চাটুটা চাপাবেন বলে, হঠাৎ দেখলেন আটার তালটা নিজের থেকে ছিটকে এসে পড়লো রান্নাঘরের দেওয়ালে। না, সে সময় রান্নাঘরে আর কেউই ছিলেন না। রান্নাঘরের বাইরে, কিছুটা তফাতে বারান্দায় বসে কাঁচা-আনাজ কাটছিল রেণু। না, রেণুর পক্ষে কোনও ভাবেই নাকি রেখার চোখ এড়িয়ে রান্নাঘরে ঢুকে আটা ছুঁড়ে মারা সম্ভব ছিল না। এছাড়া আরও একটা ঘটনা ঘটতে দেখেছেন রেখা। সেখানে রেখা ছাড়া রেণু কেন, কারোরই উপস্থিতি ছিল না।

এবারও ঘটনাস্থল রান্নাঘর। গ্যাসের টেবিলের উপর রাখা একটা ঠোঙ্গায় রাখা ছিল কয়েকটা বিস্কুট। হঠাৎ চোখের সামনে ঠোঙ্গার মুখ খুলে গেল, একটা বিস্কুট ঠোঙ্গা থেকে বেড়িয়ে এসে শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে রান্নাঘরের জানালার শিক গলে বেড়িয়ে গেল।

ছন্দা’র বয়স বছর ষোল। ওর দেখা ঘটনাগুলোর মধ্যে যে ঘটনাটা আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল, সেটা আজই সন্ধ্যায় ঘটেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছিল হারমোনিয়াম বাজিয়ে। হারমোনিয়ামের উপর ছিল কয়েকটা স্বরবিতান। ঘরে আর কেউ নেই। হঠাৎ লোডশেডিং। সেই মুহূর্তে তার গায়ের উপর আছরে পড়লো হারমোনিয়ামের উপর রাখা স্বরবিতানগুলো। আতঙ্কে ছন্দা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘কে-রে?’ অমনি গালের উপর এসে পড়লো একটা বিশাল চড়।

রেণুর বয়স বছর ষোল। ওর কাছ থেকে শোনা ঘটনাগুলোর মধ্যে যে ঘটনাগুলো আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল সেগুলো হল, নিজের হাতের থেকে লোহার চুড়ি একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে দেখেছে, কানের দুল হঠাৎ অদৃশ্য হয়েছে- অনুভব করেছে। গত পরশু এক সময় জামা পাল্টাতে গিয়ে দেখে অন্তর্বাসের বাম স্তনবৃন্তের কাছটা গোল করে কাটা। অথচ অন্তর্বাসটা পড়ার সময়ও ছিল গোটা।

রেখার এক বান্ধবী গীতা থাকেন, মধ্যমগ্রামে। রেখাদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিবারের একজনের মতই। মাসের অর্ধেক দিনই কাটে রেখাদের বাড়িতে। গীতা’র সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। তিনি গত পরশুর একটা ঘটনা বললেন। একটা ‘দেশ’ সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়েছিল মেঝেতে। হঠাৎ দেশ পত্রিকা মেঝেতে চলতে শুরু করলো। থামল অন্তত হাত চারেক গিয়ে। না, হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। শীতের সন্ধ্যা। ঘরের প্রতিটি জানালা বন্ধ, বাইরের প্রকৃতি স্তব্ধ। ঘরে ফ্যানও চলছিল না। গত কালকের ঘটনাও কম রোমাঞ্চকর নয়। কাল সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকে আলো জ্বালতেই দেখতে পেলেন একটা ধোঁয়ার কুন্ডলী ঘরের মেঝেতে তৈরি হতে শুরু করলো। আতঙ্কিত চোখে দেখলেন কুন্ডলীটা একটা বেড়াল হয়ে গিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ভূতের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল কাপড় কাটা, বাড়ির প্রায় সকলেরই পোশাক, গরম-পোশাক ভূতের কোপে পড়ে কাটা পড়েছে। আমি গোটা চল্লিশেক পোশাক পরীক্ষা করেছি। প্রত্যেকটাই প্রায় এক স্কয়ার ইঞ্চির মত জায়গা নিয়ে ধারালো কিছু দিয়ে গোল বাঁ ডিম্বাকৃতিতে কাটা। কাটাগুলোরও একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলাম। ব্লাউজ, ক্লোক, টপ মেয়েদের কামিজের স্তনবৃন্তের কাছে কাটা। চিত্তের পাজামার লিঙ্গস্থানের কাছে কাটা, তবে এই কাটাটা একটু বড়- চার স্কয়ার ইঞ্চির মত জায়গা জুড়ে।

ওঁদের সঙ্গেই কথা বলে জানতে পারলাম গীতা গতকাল সকালে সত্য ও রেখাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর গুরুদেবের কাছে, গুরুদেব জানিয়েছেন- বাড়িওয়ালা এক তান্ত্রিকের সাহায্যে ওঁদের পিছনে ভুত লেলিয়ে দিয়েছে। ভূত তাড়ানো যাবে। তবে যাগযজ্ঞের খরচ খুব একটা কম হবে না। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য মা ও বড়দাকে নিয়ে আগামী শনিবার যেতে বলেছেন। বাড়িওয়ালা এ বাড়িতে থাকেন না। থাকেন বৃহত্তর কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে। আর এ বাড়িটা বৃহত্তর কলকাতার উত্তর প্রান্তে, দমদমে।

বাড়ির তিন ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তাঁরা প্রত্যকেই অনেক ভুতূরে ঘটনার সাক্ষী। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো ঘটার সময় তাঁরা ছাড়াও বাড়ির কেউ না কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল বা ছিলেন।

পুরো বিষয়টা নিয়ে ভালোমত আবার নাড়াচাড়া করলে দেখতে পাচ্ছি, পাঁচ জন মহিলা স্পষ্টতই দাবি করছেন, তাঁরা এক বা একাধিক ভূতুরে ব্যাপার ঘটতে দেখেছেন, যেখানে তাঁরা প্রত্যেকেই একাই উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাগুলো ঘটার সময় আর কেউই সেখানে ছিলেন না। অর্থাৎ কি না, বাস্তবিকই ভূতুড়ে ঘটনা।

এবার এঁদের কথাগুলোর ভিত্তিতে আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম। এঁদের মধ্যে সম্ভবত একজন ইচ্ছে করে অথবা নিজের অজান্তে ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেন। বাঁকি চারজন আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করে নিয়েছেন- এ বাড়িতে ভূতের আবির্ভাব ঘটেছে। এই একান্ত বিশ্বাস থেকে তাঁরা হয়তো ধোঁয়ার কুন্ডলী জাতীয় কিছু দেখেছেন, ‘দেশ’ সাপ্তাহিক যেন নড়ছে বলে মনে করছেন, কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই নিজেকেই ভূতুরে ঘটনার একক প্রত্যক্ষদর্শী বলে জাহির করার লোভে কাল্পনিক গপ্পো ফেঁদেছেন। সাধারণভাবে মানুষের কোনও বিশেষ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে জাহির করার মধ্য দিয়ে লোকেদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার একটা লোভ থাকে। এক্ষেত্রে সম্ভবত তেমনই কিছু ঘটেছে।

অবশ্য এমনটাও অসম্ভব নয়, শুরুতে একজন মস্তিষ্ক কোষের বিশৃঙ্খলা দরুন নিজের অজান্তে ভূতুরে সব কান্ড-কারখানা ঘটিয়ে বেড়াচ্ছিলেন এবং এই মানসিক রোগই সংক্রমিত হয়েছে আরও এক বা একাধিক মহিলার মধ্যে।

উপায় একটা আছে, তবে সময়সাপেক্ষ। যে পাঁচজন মহিলা এককভাবে ভূতুরে কান্ডের দর্শক ছিলেন বলে দাবী করছে ও করছেন তাদের প্রত্যেককে দিয়ে সত্যি বলান।

নিত্য ও সত্যকে বললাম, “আপনারা সহযোগিতা করলে আজ থেকেই কাজ শুরু করতে পারি। তবে আজই ভূতের অত্যাচার বন্ধ হবে, এমন কথা বলছি না। মালা, রেখা, ছন্দা, রেণু ও গীতাকে সম্মোহন করে বাস্তবিকই ভূতুরে ব্যাপারগুলো কিভাবে ঘটছে সেটা জেনে নিতে চাই। আশা রাখি, অবশ্যই আসল সত্যটুকু ওঁদের কাছ থেকেই জেনে নিতে পারব। কি করে ঘটছে জানতে পারলে, ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হবে না। আজ আমি একজনকে সম্মোহন করবো। এমন হতে পারে বাঁকি চারজনকে সম্মোহন করতে আরও চারটে দিন আমাকে আসতে হবে।”

প্রথম যাকে সম্মোহন করার জন্য বেছে নিলাম, সে রেণু। রেণুর গায়ের রং মাজা, মোটামুটি দেখতে, সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী, রেণুকে সম্মোহন করতে রেণুর সহযোগিতাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। রেণুর অনুমতি নিয়েই ঘরে রাখলাম আমাদের সমিতির সদস্য মৈনাক, রঘু ও পিনাকীকে। উদ্দেশ্য, ওদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি।

রেণুকে একটা বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সাজেশন দিতে লাগলাম বা ওর চিন্তায় ধারণা সঞ্চার করতে লাগলাম। শুরু করেছিলাম এই বলে, “তোমার ঘুম আসছে। একটু একটু করে চোখের পাতাগুলো ভারি হয়ে আসছে। ঘুম আসছে।” সম্মোহন প্রসঙ্গে ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ বইয়ের প্রথম খন্ডে বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে। তাই এখানে সম্মোহন বিষয়ে আবার বিস্তৃত আলোচনায় গেলাম না। এক সময় রেণুর বন্ধ চোখের পাতার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ও এখন সম্মোহিত। চোখের পাতার নিচে মণি দুটো এখন স্থির।

টেপ-রেকর্ডারটা চালু করে দিলাম। শুরু করলাম প্রশ্ন। উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল রেণু/ আমি- তোমাকে বাড়ির সকলে ভালবাসে? নাকি কেউ কেউ তোমাকে মোটেই পছন্দ করে না?

রেণু- বাড়ির সকলেই ভালবাসে।

আমি- আমি তোমাকে একটা করে নাম বলছি, তুমি বলে যাবে তাঁরা ভালবাসে কি না? দিদা?

রেণু- ভালবাসে।

আমি- নিত্যদা?

রেণু- ভালবাসে।

আমি- বউদি?

রেণু উত্তর না দিয়ে চুপ রইল। আবার জিজ্ঞেস করলাম- বউদি?

রেণু- হ্যাঁ, ভালইবাসে।

বুঝলাম, রেণু বউদিকে তেমন পছন্দ করে না।

আমি রেখাদি?

রেণু- ভালবাসে।

আমি- ছন্দা?

রেণু- ভালবাসে।

আমি- সত্যদা?

রেণু- ভালবাসে।

আমি- চিত্তদা?

রেণু- চিত্তদা, চিত্তদা সুজাতাকে ভালবাসে।

আমি- তুমি চিত্তদাকে ভালবাস?

রেণু- হ্যাঁ।

আমি- তুমি চিত্তদাকে খুব ভালবাস?

রেণু- হ্যাঁ।

আমি- তুমি চিত্তদার পাজামাটার ওই রকম জায়গাটা কাটলে কেন?

রেণু- বেশ করেছি।

আমি- বেশ মজাই হয়েছে। চিত্তদার উপর একচোট শোধ তুলে নিয়েছে। তুমি কি দিয়ে ওদের সব জামা-কাপড়গুলো কেটেছো? ব্লেড দিয়ে?

রেণু- না, কাঁচি দিয়ে।

আমি- ওঁরা কেউ তোমাকে সন্দেহ করেনি?

রেণু- না।

আমি- তুমি আজ সন্ধ্যায় লোডশেডিং-এর সময় ছন্দাকে চড় মেরেছিলে?

রেণু- হ্যাঁ।

আমি- তুমিই মোয়া সরিয়ে পরে খাওয়া মোয়াটা ফেলেছিলে?

হ্যাঁ, মাখা আটা রান্না ঘরের দেওয়ালে কে ছুঁড়েছিল?

রেণু- আমি।

আমি- বাথরুমে বউদির মাথায় চায়ের পাতা ছুঁড়ে মেরেছিলে?

রেণু- না।

আমি- তবে, কি করে বন্ধ বাথরুমে বউদির মাথায় চায়ের পাতা পড়লো?

রেণু- আমার মনে হয় বউদি নিজেই করেছে। ও খুব মিথ্যেবাদী।

আমি- আর বউদিকে শ্যাম্পুর কৌটো ছুঁড়ে মারা?

রেণু- ওটা আমিই করেছিলাম।

আমি- বউদি বলছিলেন ঘর বন্ধ ছিল।

রেণু- মিথ্যে কথা।

আমি- তোমার হাত থেকে লোহার চুড়ি একটু একটু করে নিজে থেকেই বেরিয়ে আসছিল, অনেকে নাকি দেখেছেন? ব্যাপারটা কি বলতো।

রেণু- আমিই চুড়িটা খুলে মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলেছিলাম- আরে আরে চুড়িটা নিজে থেকেই হাত থেকে খুলে বেড়িয়ে এলো। ওরা সকলেই টিভি দেখছিল। আমার কথায় মেঝের দিকে তাকায়। চুড়ি পড়ে থাকতে দেখে সক্কলেই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

আমি- ওদের ভয় দেখাতে তোমার ভালো লেগেছে?

রেণু- মজা লেগেছে।

রেণুর সঙ্গে অনেক কথাই হয়েছিল। বুঝতে অসুবিধে হয়নি চিত্তকে ওর ভালো লাগে। চিত্তকে ঘিরে ও অনেক কথাই বলেছিল, যার কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে সেটা শুধু চিত্ত ও রেণুই জানে। তবে এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয়নি রেণুর অতৃপ্ত প্রেম, তার অবদমিত যৌন আবেগ মস্তিষ্ককোষের মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, তারই পরিণতিতে বিভিন্নজনের এবং নিজের পোশাকের যৌনস্থান ঢাকা পড়ার জায়গাগুলোয় কাঁচি চালিয়েছিল।

এটুকু জানান বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না, রেণুকে সামাল দিতেই ভূতুরে ব্যাপার-স্যাপার বন্ধ হয়ে যায়। এই একই সঙ্গে আরও জানাই, ওই পরিবারের যারা এককভাবে ভূতদর্শী ছিলেন, তাঁরা ও পরবর্তী পর্যায়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আগের ভূত দেখার দাবিগুলোকে হয় এড়িয়ে যেতে সচেষ্ট হয়েছেন, নয় স্বীকার করেছেন বলার সময় কিছু রং চড়িয়ে ফেলেছিলেন।

বহু ভূতুরে ঘটনার
অনুসন্ধান করেছি। বহু
ক্ষেত্রেই দেখেছি, অনেকের মিথ্যা
ভাষণে, অতি সাধারণ ব্যাপার পল্লবিত
হয়ে বিশাল ভূতুরে ঘটনার রূপ নিয়েছে। এই
জাতীয় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি, প্রত্যক্ষদর্শীর
দাবিদারেরা হয় অন্যের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে
গুরুত্ব পাওয়ার মানসিকতায় মিথ্যে বলেছে,
নতুবা নিজেদের বিশ্বাসকে অন্যের
কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে
মিথ্যে বলেছে। আজ পর্যন্ত
পাওয়া কয়েক শো ভূতুড়ে
ঘটনার প্রতিটি সমাধান
করেই এ কথা বলছি।
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x