যুক্তি পাঁচঃ গ্রহ-নক্ষত্রের গতি ও অবস্থান ইত্যাদির দ্বারা মানবজীবনের শুভাশুভ ফল গণনাই ফলিত জ্যোতিষের উপজীব্য। গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব যে মানবজীবনে স্পষ্টতই আছে এটা বিজ্ঞানের নিয়মের সূত্র এবং সমীক্ষার সাহায্যেই প্রতিষ্ঠিত। জ্যোতিষশাস্ত্রকে অস্বীকার করার মানসিকতা নিয়ে পরিচালিত হয়ে জীবজগতে সূর্যের প্রভাবকে অস্বীকার করা বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে চূড়ান্ত মূর্খতা, মিথ্যাচারিতা। ঊষাকালের সূর্যের স্নিগ্ধতা মধ্যাহ্নের সূর্যের প্রখরতা গোধূলি বেলার সূর্যের বিষণ্ণতা মানুষের মনে যেমন প্রভাব ফেলে তেমনই প্রভাব ফেলে বিভিন্ন ঋতুর সূর্য । স্থান ভেদে সূর্যের প্রভাবও ভিন্নতর। রাজস্থান বা সাহারায় দুপুরের সূর্য মানুষের শক্তিকে যেমন নিঃস্ব করে, তেমনই শীতপ্রধান দেশগুলোতে সূর্যের উত্তাপই আনে বসন্তের আনন্দ ।

সূর্যের পরেই যে গ্রহটি মানবজীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে, সেটি হলো চন্দ্র। চন্দ্রের প্রভাবে জোয়ার ভাটা হয়, অমাবস্যা, পূর্ণিমায় বাতের ব্যথা বৃদ্ধি পায়, এই পরম সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতি চন্দ্রমাসে অর্থাৎ ২৮ দিনে নারীদেহে ঋতুকালের আবর্তন হয় । চন্দ্রমাসের সঙ্গে নারীদেহের এই ঋতু পরিবর্তন কী চন্দ্রের প্রভাবেরই ফল নয় ?

এইসব বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায মানবজীবনের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ গ্রহ-নক্ষত্রই মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সূত্রগুলো সন্দেহাতীতভাবে যুক্তিপূর্ণ এবং বিজ্ঞানসম্মত।

বিরুদ্ধ যুক্তিঃ সূর্যের প্রভাব নিশ্চয়ই মানুষের জীবনে আছে। সূর্যের উপস্থিতিতে দিন, অনুপস্থিতিতে রাত হয়। সূর্যের প্রখরতায় খরা, দুর্ভিক্ষ, অনেক কিছুই হতে পারে; আবার সূর্যের উপস্থিতি আনতে পারে বসন্তের আনন্দ। চন্দ্র থেকে নিশ্চয়ই জোয়ার-ভাটা হতে পারে পূর্ণিমার চাঁদ অনেক কবিবই কাব্যরসেব উৎস। জ্যোস্না অনেক সময়ই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মোহময় করে তোলে।’ সূর্য-চন্দ্রের প্রভাব নিশ্চয়ই বিজ্ঞান স্বীকার করে ৷ কিন্তু সেই প্রভাবে আপনার স্ত্রী মোটা হবে কী রোগা, কালো হবে কী ফরসা, অথবা আপনার স্বামী পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি হবে কী সাড়ে আট ইঞ্চি, এবার পরীক্ষায় পাশ করব কি না, এমনি সব বিষয় নির্ধারিত হয়, ভাবার মত কোনও যুক্তি বা প্রমাণ কিন্তু জ্যোতিষীরা হাজির করতে পারেন নি। নানা গ্রহ-নক্ষত্রের আকর্ষণ-বিকর্ষণ বিজ্ঞান স্বীকার করে, এর দ্বারা কখনই প্রমাণিত হয় না, আমার আজ দাড়ি কামাতে গিয়ে ছড়ে যাওয়ার পিছনে স্বাতী নক্ষত্রের হাত ছিল। গ্রহ-নক্ষত্রের আকর্ষণ-বিকর্ষণ বা কিছু কিছু গ্রহের মানবজীবনে প্রভাব স্বীকার করেও বলা যায়, এর দ্বারা কখনই প্রমাণ হয় না, মানুষের ভাগ্যকে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে গ্রহ-নক্ষত্ৰ।

মানবজীবনে প্রভাব সৃষ্টি করাই যদি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করার অকাট্য প্রমাণ হয়, তবে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, গ্রহ-নক্ষত্র ছাড়া অনেক কিছুই আমাদের ভাগ্যকে পূর্বনির্ধারিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে লোডশেডিং, খরা, বন্যা, বায়ু, আগুন, জল, চাল, ডাল, তেল, আটা, বেবিফুড, ইত্যাদি অনেক কিছুই। জল, বায়ু, খাদ্য বিনা জীবন ধারণ অসম্ভব। সুতরাং মানবজীবনে এদের প্রভাব অস্বীকার করা নেহাতই বাতুলতা ও যুক্তিহীনতা। জলের আর এক নাম জীবন। জল ছাড়া যেমন প্রাণীর প্রাণ বাঁচে না, তেমনই দুষিত জল প্রাণেও মারে। বন্যার জল প্রতি বছব বহু মানুষকে গৃহহীন করে, শষ্যহানি ঘটায়, গৃহপালিত পশু ও মানুষদের প্রাণহানী ঘটায়। সুতরাং জ্যোতিষশাস্ত্রের যুক্তিকে মেনে নিলে আমরা অবশ্যই ধরে নিতেই পারি, মানুষের জীবনে জলের প্রভাব যেহেতু অনস্বীকার্য, তাই জল মানুষের ভাগ্যকে পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছে। জলই ঠিক করে দেবে এবারের পরীক্ষায় জাতক পাশ করবে কিনা, পার্কের জমিটা লিজ নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে কিনা, আগামী বছর প্রমোশনটা পাবে কিনা, আগামী বছর অ্যাডফিল্মের মত চেহারার একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবে কি না।

মানবজীবনে লোডশেডি-এর প্রভাব কম নয়। লোডশেডিং-এর ওপর ভিত্তি করে জেনারেটর, ইনভারটার, পাওয়ার প্যাকের শিল্প ও ব্যবসা গড়ে উঠেছে। লোডশেডিং-এর চোটে অনেক ব্যবসা উঠেও গেছে। লোডশেডিং-এ হাঁটতে গিয়ে রাস্তায় গাড্ডায় পড়ে পা ভাঙে। লোডশেডিং-এ ছেনতাইবাজদের ব্যবসা বাড়ে। ফ্রান্সের মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী করে নিয়ে এলেন কলকাতায়। বাড়িতে লোডশেডিং-এ পাখা চলার ব্যবস্থা না থাকায় জীবনসঙ্গিনী জীবন থেকে বিদায় নিতেই পারেন। গরমকালের রাত, লোডশেডিং— সামনে পরীক্ষা সারারাত হাওয়ার অভাবে হাঁসফাঁস করে জেগে কাটিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে অবস্থাটা তেমন সুখকর না হওযারই সম্ভবনা। সুতরাং মানবজীবনে লোডশেডিং-এর প্রভাব স্বীকার করতেই হয়। আর জ্যোতিষ ফমুর্লা লোডশেডিং নির্ধারিত কবে দেবে আমাদের জীবনের অনেক কিছুই, এই যেমন এখনি যে সাদা কলমটা দিয়ে এই কথাগুলো লিখছি তা হয়তো লোডশেডিং দ্বারাই নির্ধারিত ছিল।

ভেজাল তেলে পঙ্গু, বেশি তেলে ক্লোরোস্টোল বৃদ্ধি, তেলের অভাবে চুল ও শরীরে রুক্ষতা, তেল নিখোঁজ হলে লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট, সবই যখন হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি, তখন মানবজীবনে তেলের প্রভাবকে অস্বীকার করি কী করে ? সুতরাং তেলও নিশ্চয়ই একই যুক্তিতে গ্রহ-নক্ষত্রের মতই ভাগ্যনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। কিন্তু এর পরও অনেকে প্রশ্ন তুলবেন, তাই বলে জন্মকালীন ছকে শুধুমাত্র ‘তেল’-এর তৎকালীন অবস্থান বারোটা ঘরের একটা ঘরে বসিয়ে দিলে বিচার যথেষ্ট ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। কারণ তেল বহু প্রকার। ভোজ্যতেল যেমনভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, ডিজেল কি পেট্রল তেমনভাবে প্রভাবিত করে না ? তার প্রভাব অবশ্য অন্য ধরনের।

এমনভাবে বহু বস্তুর নামই টেনে আনা যায়, যারা আমাদের প্রভাবিত করে। সুতরাং জ্যোতিষীদের যুক্তি মেনে নিলে জন্ম পত্রিকার ১২টি ঘরে এ-সবেরও জন্মকালীন অবস্থান একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু এই একান্ত প্রযোজনীয় সংযোজনটির অভাবেই যে জ্যোতিষশাস্ত্র মিথ্যে হয়ে যায় (জ্যোতিষশাস্ত্রের যুক্তিতেই) এটা তো জ্যোতিষীদের অস্বীকার করার কোনও উপায়ই নেই ।

“২৮ দিনে চান্দ্রমাস এবং ২৮ দিনে নারীদেহের ঋতুকাল আবর্তিত হয়। অতএব নারীদেহের এই ঋতুকাল চন্দ্রের প্রভাবেরই ফল।” যে সব জ্যোতিষী এই দাবি করেন তাঁদের অদ্ভুত যুক্তিকে মেনে নিলে আরও এমন অনেক আকাট যুক্তিকেই মেনে নিতে হয়; যেমন – “সূর্য এক, মানুষের মাথাও এক, অতএব সূর্যের প্রভাবে মানুষের একটি মাত্র মাথা । ভাগ্যগণনার ক্ষেত্রে দুটি প্রধাণ গ্রহ রবি ও চন্দ্র; নারীদেহের প্রধান আকর্ষণক্ষেত্র দুটি বুক । অতএব নারীবক্ষ চন্দ্র ও সূর্যের প্রভাবেরই ফল। মানুষের প্রধান অঙ্গ চারটি মাথা, হাত, পা ও উদর। বেদও চারটি। মানুষের চারটি প্রধান অঙ্গ কী তবে চার বেদের প্রভাবেরই ফল নয় ?

এর বাইরে আরও একটি বিরুদ্ধযুক্তি রয়েছে। একটা বিশেষ বয়সের আগে ও বিশেষ বয়সের পরে নারীদেহে ঋতুকাল দেখা যায় না। এটা শরীরেরই ধর্ম। শরীরের এই ধর্মকে অস্বীকার করে যে স্ব-ঘোষিত জ্যোতিষসম্রাটরা চাঁদের সঙ্গে নারীর ঋতুকালের যোগসূত্র খুঁজতে চেয়েছিলেন, তাঁরা কি জবাব দেবেন, কেন চন্দ্রের অস্তিত্ব থাকা সত্বেও কিছু কিছু নারী ঋতুমতি হয় না ?

চন্দ্রের প্রভাবে জোয়ার-ভাটা হয়, অমবস্যা-পূর্ণিমায় বাতের ব্যাথা বাড়ে, অতএব চাঁদই ঠিক করবে আমি আজ অফিসে লেট হবো কিনা, আগামীকাল রমেনের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলায় জিতব কিনা, আজ সিনেমার টিকিট পাব না ব্ল্যাকে কিনতে হবে, আমার ছেলেটা আজ স্কুলে কানমলা খাবে কিনা— এমনটা মেনে নিতে যুক্তির দিক থেকে যথেষ্ট অসুবিধে আছে। আর এমন সম্পর্কহীন ঘটনাকে যুক্তি হিসেবে মেনে নিতে হলে এ-কথা মানতেই অসুবিধে কোথায়-গ্রহ-নক্ষত্রই যেহেতু মানুষের ভাগ্যের পুরোপুরি নিয়ন্তা, অতএব ঈশ্বর নামক বস্তুটি কোনওভাবেই মানুষের জীবনকে সামান্যতম প্রভাবিত করে না। আবার ঈশ্বর নামক কেউ মানুষের জীবনকে সামন্যতম প্রভাবিত করলেই কিন্তু ‘পূর্ব থেকে নির্ধারিত’ জীবনের ঘটনা ভারসাম্য হারাবে। অর্থাৎ জ্যোতিষবিশ্বাসই ঈশ্বর-বিশ্বাসের চূড়ান্ত বিরোধী, এবং ঈশ্বর বিশ্বাসও একইভাবে পুরোপুরি জ্যোতিষবিরোধী। মজাটা হলো এই— ঈশ্বর-বিশ্বাস এবং জ্যোতিষবিশ্বাস স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী হওয়া সত্যেও প্রায় প্রতিটি জ্যোতিষই ঘোর বিশ্বাসী বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে। আসলে এই সব জ্যোতিষ-ব্যবসায়ীরা জ্যোতিষশাস্ত্র ও ঈশ্বর— দুটিরই অস্তিত্বে সামান্যতম বিশ্বাস রাখেনা। জ্যোতিষশাস্ত্র বা ঈশ্বরের বিশ্বাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চেয়ে মানুষদের বিশ্বস্ততা অর্জন ব্যবসার খাতির অনেকে বেশি প্রয়োজনীয় বিবেচনায় ‘যখন যেমন, তখন তেমন’ অভিনয় করে।