(চার)

অফিসে গিয়ে দেখি নির্দেশটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে; প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে নির্দেশের এক কপি পাঠানো হয়েছে আমার কাছেও;–একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষক দল অবিলম্বে সৌদি যাচ্ছে; আমি ওই দলের চতুর্থ সদস্য। হাসি পায় আমার; ইচ্ছে হয় ডলিকে টেলিফোন করে জানাই আজ বাসায় ফিরতে একটু দেরি হবে, সৌদি যাচ্ছি, উচ্চ পর্যবেক্ষক দলের আমি চতুর্থ সদস্য। নির্দেশের সাথে আরেকটি নির্দেশও রয়েছে; আজই দশটায় সচিবের কক্ষে পর্যবেক্ষক দলের সাথে সচিবের বৈঠক হবে, আমাকে থাকতে হবে। সচিবের ঘর থেকে বেরিয়ে আর সময় পাবো না, সরাসরি বিমানে গিয়ে উঠতে হবে; ডলিকে এখনই জাতীয় সংবাদটি জানিয়ে খুব উচ্চকণ্ঠে আমার হাসতে ইচ্ছে করে। আমি হাসি না, টেলিফোনের পর টেলিফোন আসতে থাকে-অনেকেই সংবাদ পেয়ে গেছে, সৌদিতে আট হাজার দাস পাঠানো হচ্ছে, আমি চতুর্থ সদস্য; আমি ঘড়ির দিকে তাকাই, দশটা বাজার সময় আর বেশি নেই। আমাকে সৌদি যেতে হবে? ওমরা করতে হবে? আমিও পঞ্চাশটি পাঠাতে পারবো? সচিব কটি পাঠাবেন? মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়? ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখে চুক্তির খসড়া করতে হবে? চুক্তিতে কী থাকবে? সচিবই নিশ্চয়ই আজ বলে দেবেন চুক্তিতে কী থাকবে; ঘরে ফিরে চুক্তির ভাষাটি হয়তো আমাকেই তৈরি করতে হবে।

ডলি কি বাসায় ফোন করেছে? করে থাকলে ডলির সবাই এখন আমাদের বাসায়। সারারাত তারা হয়তো ডলির আর আমার মতোই ঘুমোতে পারে নি। তারা কি রাতভর ছুটোছুটি করেছে। পুলিশের কাছে গেছে? হয়তো যায় নি। একটি রাত দেখতে চেয়েছে? আমি যে ডলিকে নিয়ে বেরিয়েছিলাম, তারা তা জানে; ডলিকে যে আমি খুন করে ফেলবো না, অন্তত খুন করে উঠতে পারবো না, এটাও তারা সম্ভবত জানে। আমি যে তাদের মেয়েটির কাছে যেতাম, তা কি তারা ঘেন্না করতো? তাদের দুঃখী মেয়েটিকে তারা কেনো আমার সাথে বেরোতে দিতো? তারা কি ভাবতো আমার সাথেই শুধু তাদের দুঃখী মেয়েটি সুখে থাকে? ডলি খুব চমৎকার মেয়ে। ডলি কী করছে এখন? ভেঙে পড়েছে? ভুল করে ফেলেছে ভেবে মায়ের বুকে মুখ রেখে নিঃশব্দে কাঁদছে? নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে অলৌকিক শক্তির খেয়ালের কাছে; মনে পড়ছে দেলোয়ারকে? তুলনা করছে, বারবার তুলনা করছে? কনডমের প্যাকেটগুলো আমি টেবিলের ওপর ফেলে রেখেছিলাম, ডলি কি ড্রয়ারে তুলে রেখেছে; কোনো দিন লাগবে না ভেবে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে? ফেলে দেয় নি হয়তো, অতো তীব্র মেয়ে নয়। ডলি; নিশ্চয়ই ড্রয়ারে বা বিছানার নিচে রেখে দিয়েছে। ওগুলো কাজে লাগবে? ওমরা করে আসার পর? ফেলে দিলে কেমন হয়? আমি কি ওগুলো পরতে পারবো? মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সাতদিনের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স করে নিতে হবে? বরং ওমরা করে আসার পর ওগুলো ফেলে দিয়ে কিছু একটা করতে পারি, তাতে একটা পবিত্র পুত্র জন্মাতে পারে।

সচিবের ঘরে ঠিক দশটায় আমি ঢুকি; সচিব আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেন।

আমি বলি, বসবো, স্যার?

তিনি বলেন, বসুন।

সচিবের কথা শুনে তিন সদস্য অবাক হন; খুশিও হন; তারা বুঝে ফেলেন সচিবের আমি প্রিয় নই; এখন থেকে আমাকে যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করা যাবে।

সচিব বলেন, আমাদের আজকের আলোচনা চূড়ান্ত গোপনীয়।

নেতা বলেন, জি স্যার, জি স্যার।

সচিব বলেন, তারা বলেছে শ্রমিক নেয়ার ও ফিরিয়ে দেয়ার বিমান ভাড়া তারা দেবে, আমাদের মনে হয় এটার দরকার নেই।

নেতা বলেন, জি স্যার, জি স্যার। নিজেরাই বিমান ভাড়া দিয়ে যাওয়া আসার জন্যে লাখ লাখ ছোঁকরা পাগল হয়ে আছে।

এক সদস্য বলেন, বিমান ভাড়া দিয়ে যেতে না পারলে আর সৌদি যাওয়ার কী দরকার স্যার, দেশেই ঘাস কাটতে পারে।

সচিব বলেন, আপনারা সেখানে গিয়ে এ-চুক্তিই করবেন।

নেতা আর সবাই বলেন, জি স্যার, জি স্যার।

সচিব বলেন, আর মাসে তিরিশ হাজার টাকা বেতনও দরকার নেই, পনেরো হাজার হ’লেই চলে।

সবাই চিৎকার করে ওঠেন, জি স্যার, আমরা নিজেরাই যেখানে কটা টাকা মাত্র পাচ্ছি; চাকরগুলো এতো বেতন কেনো পাবে?

সচিব বলেন, ভালোভাবে আপনাদের এসব চুক্তি করে আসতে হবে; আর–

সবাই বলে ওঠেন, জি স্যার?

সচিব বলেন, এতে ওদের কয়েক মিলিয়ন ডলার বাঁচবে। যা বাঁচবে, তার এইটি পার্সেন্ট আমাদের দিতে হবে, সুইস ব্যাংকে জমা দিতে হবে, দুটো অ্যাকাউন্টে।

সবাই বলেন, জি স্যার।

সচিব বলেন, আপনারা প্রত্যেকে পঞ্চাশজন করে পাঠাতে পারবেন; তবে দেখবেন আপনারা ওখানে থাকতে থাকতেই যাতে সুইস ব্যাংকে ডলার জমে; অ্যাকাউন্ট দুটোর নম্বর নিয়ে যাবেন।

সভা শেষ হয়ে আসছে; আমি বলি, স্যার, আমার একটি কথা আছে।

সচিব বিরক্ত হন, আমার দিকে তাকান; কোনো কথা বলেন না।

আমি বলি, আমার যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না, স্যার।

সচিব অবাক হন না; অন্য তিনজন অবাক হন।

সচিব বলেন, কেনো যেতে পারবেন না?

আমি বলি, আমি গতকাল বিয়ে করেছি, স্যার।

নেতা বলেন, আমাদের না জানিয়েই করে ফেললেন? কোথায় করলেন?

আমি বলি, হঠাৎ করে ফেললাম; এক বন্ধুর স্ত্রীকে।

সচিব বলেন, প্রথমবারই বন্ধুর স্ত্রীকে এর পর কাকে করবেন?

আমরা কেউ বুঝতে পারি না আমাদের হাসতে হবে, না গম্ভীর হতে হবে।

আমি সাধারণত বাসায় ফোন করি না; আজ নম্বরটি মনে করতে গিয়ে মনে করতে পারি না; তিন চারটি নম্বর আমার মনে পড়ে,-হয়তো এটি হবে, হয়তো ওটি হবে, নয়তো এটি হবে; আমি একটির পর একটি নম্বরে ফোন করতে থাকি।

একটি নম্বরে ফোন করতেই একজন বলে, হ্যালো, দেলোয়ার বলছি।

আমি বলি, দেলোয়ার, তুমি কেমন আছো?

সে বলে, আপনাকে তো চিনতে পারছি না।

আমি বলি, আমি আনিস বলছি।

সে বলে, আনিস, কোন আনিস?

আমি বলি, তোমার বন্ধু আনিস।

সে বলে, আনিস নামে আমার কোনো বন্ধু নেই, অন্তত এখন মনে পড়ছে না।

আমি বলি, আছে, তুমি মনে করতে পারছে না।

সে বলে, তাহলে বলো তোমার সাথে আমার শেষ দেখা কোথায়?

আমি বলি, ফেরিঘাটে।

সে বলে, কোনো বন্ধুকে নিয়ে আমি কখনো ফেরিঘাটে যাই নি।  

আমি বলি, ওই যে গাড়ি নিয়ে তুমি পানিতে পড়ে গেলে।

সে বলে, আমি পানিতে পড়ে গেলাম? গাড়ি নিয়ে? পাগল। ঘটরর করে সে ফোন রেখে দেয়।

আমি আবার ফোন করি, বলি, আমি আনিস বলছি।  

বেলা বলে, ভাইয়া?

আমি বলি, এটা আমাদের বাসা না কি রে?

বেলা বলে, হ্যাঁ, আমাদের বাসাই, অন্য বাসা না; খুব আনন্দ লাগছে তোমার বাসায় ফোন করার অভ্যাস হচ্ছে।

আমি বলি, ভুলে করে ফেলেছি।

বেলা বলে, আহা, বানিয়ে কথা বলার দরকার নেই; ধরো, ভাবীকে দিচ্ছি।

ডলি বলে, তোমার ফোন পেতে খুব ইচ্ছে করছিলো।

আমি বলি, আসলে কি জানো, আমি বাসায় ফোন করতে চাই নি।

শুনে ডলি স্তব্ধ হয়ে যায়। আমি ডাকি, ডলি।

ডলি বলে, তাহলে কোথায় ফোন করতে চেয়েছিলে?

আমি বলি, একটি ভুল নম্বরে ফোন করেছিলাম, লোকটি ফোন তুলেই বললো, দেলোয়ার বলছি।

ডলি আবার স্তব্ধ হয়ে যায়। আমি ডাকি, ডলি।

ডলি বলে, বলো।

আমি বলি, তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।

ডলি বলে, আমার ইচ্ছে করছে এমন কিছু করি যাতে কেউ আমাকে আর দেখতে না পায়।

আমি বলি, কিন্তু তখনো আমি তোমাকে দেখতে পাবো।

ডলি বলে, কী করে পাবে?

আমি বলি, পাবো, যেমন এখন আমি দেলোয়ারকে দেখতে পাচ্ছি।

ডলি চিৎকার করে, ওই নাম তুমি আর নেবে না।

আমি সচিবকে সম্বোধন করে একটি আবেদনপত্র লিখতে বসি; লিখতে আমার ইচ্ছে করে না, আমি ব্যক্তিগত সহকারীকে ডাকি। আমি যা বলি লিখতে লিখতে সহকারী হঠাৎ থেমে যান; আমি বেশ অবাক হই।

আমি বলি, লিখছেন না কেনো?

সহকারী বলেন, স্যার, সত্যিই আপনি যাবেন না?

আমি বলি, আপনার সন্দেহ হচ্ছে কেনো?

তিনি বলেন, গেলে স্যার আপনার চার-পাঁচ লক্ষ টাকা থাকতো।

আমি বলি, জানেন আমার একশো কোটি টাকা দরকার।

তিনি বলেন, জি স্যার।

আমি বলি, কিন্তু একশো কোটি টাকা কি আমি পাবো?

তিনি বলেন, জি না, স্যার।

আমি বলি, যদি একশো কোটি না পাই তাহলে চার-পাঁচ লাখ আমার দরকার নেই।

তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেনো খুঁজতে থাকেন।

আমি, মনে মনে, ডলির মুখের দিকে তাকাই; তার চিবুকের এক অংশ দেখতে পাই; চোখ স্থির হয়ে আছে, গ্রীবায় একটি তিল, নাকের নিচে লোমের সামান্য আভাস দেখতে পাই; আমি দাগগুলো আঙুল দিয়ে ঘষতে থাকি, ঘষে ভোলা ময়লা ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিই, উড়তে উড়তে সেগুলো কোথায় যায় আমি দেখতে পাই না, ঝলমল করে ওঠে ডলি; এবং ডলির জন্যে আমি কষ্ট পেতে থাকি। এমন কষ্ট আমি আগে পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। ডলি আমার স্ত্রী? স্ত্রী কাকে বলে? সারাজীবন ডলি আমার স্ত্রী থাকবে? আমি স্বামী থাকবো? আমরা একসঙ্গে ঘুমোবো, খাবো, ডলিকে শাড়ি কিনে দেবো, রিকশায় দুজন দু-দিকে তাকিয়ে থেকে বেড়াতে যাবো? ডলি মোটাগাটা হয়ে উঠতে থাকবে; ওর মুখের প্রান্তগুলো ধীরেধীরে একাকার হয়ে যাবে। ডলি মাঝেমাঝে প্রসব করবে? তারা এসে শক্ত করে তুলবে আমাদের বন্ধন; আর বিচ্ছিন্ন হতে পারবো না, যতোই আমাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইচ্ছে হোক? ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে আমার ডলির কাছে; আমি ক্ষমা চাইতে থাকি, আমি খুব অপরাধ করেছি, গতরাতে অনেক স্বপ্ন দেখানোর কথা ছিলো আমার, তুমি জেগে জেগে অনেক স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলো, আমি কোনো স্বপ্নই সৃষ্টি করতে পারি নি; গতরাতই ছিলো তোমার একমাত্র স্বপ্নহীন রাত। দেলোয়ার তোমাকে অনেক স্বপ্ন দিতো, আমি দিতে পারি নি; আমি ক্ষমা চাই, তুমি আমাকে স্বপ্ন সৃষ্টির ইন্দ্রজাল শিখিয়ে দাও, যেমন দেলোয়ারকে শিখিয়েছিলে।

বাসায় ফিরতে আমার ঘণ্টাখানেকের মতে দেরি হয়; তিনটার মধ্যেই সাধারণত আমি ফিরি, আজ চারটে বেজে যায়।

ডলি জিজ্ঞেস করে, তুমি কি চারটেয়ই ফেরো?

আমি বলি, না।

ডলি বলে, তাহলে কটায় ফেরো?

আমি বলি, তিনটেয়।

ডলি বলে, আজ যে চারটেয় ফিরলে?

আমি বলি, আজ হেঁটে এলাম।

ডলি বলে, হেঁটে? হেঁটে কেনো?

আমি বলি, মনে হলো তোমার কাছে হেঁটে আসাই উচিত।

ডলি বলে, কেনো এমন মনে হলো?

আমি বলি, মনে হলো তীর্থে যাচ্ছি; চারদিকে পাহাড়, নদী, উঁচুনিচু পথ; মন্দির অনেক ওপরে, যদিও আমি তীর্থ মন্দির পবিত্রগৃহে বিশ্বাস করি না।

ডলি বলে, আমি তীর্থ নই, তুমি আর হেঁটে এসো না।

আমি বলি, কেনো?

ডলি বলে, তীর্থে মানুষ একবার যায়, গিয়ে কাউকে পায় না।

ডলির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয় তার শরীরে কোনো দাগ নেই; কখনো দাগ ছিলো না।

ডলি বলে, আমি তীর্থ নই; আমি গৃহ, তোমার গৃহ, গৃহে থাকতে হয়, বারবার ফিরতে হয়; তীর্থ থেকেও মানুষকে গৃহে ফিরতে হয়। ডলি কথাগুলো বেশ হাল্কা করে বলছে; সে বুঝতে পারছে কথাগুলোর ওপর একটু জোর দিলেই কথাগুলোকে কোনো প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থের চরণ মনে হবে।

আমিও লঘু ভঙ্গিতে বলি, গৃহ যে আমার ভালো লাগে না।

আমার কথা শুনে ডলি একটু ভয় পায়; বলে, এতো দিন তোমার গৃহ ছিলো না, তাই তোমার গৃহ ভালো লাগতো না, এখন থেকে লাগবে।

আমি বলি, লাগছে না তো।

ডলি একটু দূরে গিয়ে চেয়ারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে সে কী দেখছে আমি জানি না; হয়তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, যদিও অনেক কিছু দেখতে চাচ্ছে, অন্তত একটি গৃহ দেখতে চাচ্ছে। আমি গিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে চুলে হাত রাখি।

আমি বলি, ডলি, তোমাকে আমি খুব সুখী করতে চাই।

ডলি আমার হাতে হাত রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে।

বাড়িতে হঠাৎ উৎসব শুরু হয়ে গেছে। ডলির আব্বাআম্মা ভাইবোনেরা শাড়ি অলঙ্কার অজস্র জিনিশপত্র নিয়ে এসেছে ডলির জন্যে, আমার জন্যেও কী সব এনেছে। আমি বিব্রত বোধ করি; আমি আমার ঘরটিতেই বসে থাকতে চাই, কিন্তু পারি না; ডলির আব্বা ড্রয়িংরুমে আমাকে ডেকেছেন। তাকে কি পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হবে? মনেই পড়ে না কখনো আমি কাউকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছি কি না। আমি ঢুকতেই তিনি দাঁড়ান; মনে করেছিলেন পায়ে হাত দেবো, আশীর্বাদ করার একটি ভঙ্গিও তিনি করে উঠছিলেন, আমি দাঁড়িয়েই থাকি দেখে তিনি এক সময় বসেন, আমাকেও বসতে বলেন।

ডলির আব্বা বলেন, তোমাকে আমরা পছন্দ করি, আনিস; তোমার সাথে যদি আমাদের আগে দেখা হতো তাহলে সব কিছু অন্য রকম হতো।

আমি বলি, আমার ভালো লাগছে আপনারা আমাকে পছন্দ করেন। তবে আগে দেখা হলে আমাকে আপনাদের পছন্দ নাও হতে পারতো।

তিনি বলেন, না, না, পছন্দ হতোই; তোমাকে পছন্দ না করার কিছু নেই।

আমি বলি, আপনারা বেশ ভালো।

তিনি বলেন, ডলি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো।

আমি বলি, আপনি বোধ হয় ভয় পাচ্ছেন।

তিনি বেশ বিব্রত হন; বলেন, কেনো ভয় পাবো, কেনো ভয় পাবো? তোমার মতো ছেলের কাছ থেকে ভয় পাবো কেনো?।

আমি বলি, আপনি ভুলতে পারছেন না ডলির আগে বিয়ে হয়েছিলো।

তিনি বলেন, তা কী করে ভুলি, বাবা? তোমার সাথেই যদি ডলির প্রথম বিয়ে হতো তাহলে প্রকৃত সুখ পেতাম।

আমি বলি, তাতে এমন কি পার্থক্য ঘটতো।

ডলির আব্বা কোনো কথা খুঁজে পান না, কিন্তু তিনি প্রচুর কথা খুঁজতে থাকেন বলে মনে হয়; তাঁর কথাগুলো হয়তো ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে ভেবে তিনি চারদিকে তাকাতে থাকেন, কিন্তু কোনো দিক থেকে কথারা সাড়া দেয় না। আমার উঠে যেতে ইচ্ছে করে, তবে উঠে যেতে পারি না; দ্রলোকের দিকে আমি নিঃশব্দে তাকাই, বারবার তাকাই; আমার মনে হয় তিনি চান আমি উঠে যাই, কিন্তু আমি উঠে যেতে পারি না।

আমার ঘরে ঢোকার আগেই সেই তীব্র সুগন্ধটি আমি পাই, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে না; আমি দরোজায় দাঁড়িয়ে সুতীব্র সুগন্ধ বেশ কয়েকবার ভেতরে টেনে নিই; ঢুকে দেখি ডলি অজস্র গোলাপের মতো লাল হয়ে আছে। ওই লালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো একটা আকস্মিক উত্তেজনা আমি বোধ করি, কিন্তু আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি না; পরমুহূর্তে আমার মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়লেই ভালো হতো, এমন লালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উত্তেজনা হয়তো আমার শরীরে দ্বিতীয়বার দেখা দেবে না। বিছানার মাঝখানে বসে আছে ডলি, বড়ো একটি ঘোমটাও দিয়েছে; তাকে লাল আর সুগন্ধি করে তুলতে সময় লেগেছে, এজন্যেই বেলা আমাকে রাত দশটা পর্যন্ত ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখেছে। আমার ঢোকার শব্দে ডলির ঘোমটা পড়ে যায়; আমার চোখ আজো প্রথমেই তার কাঁধের ওপর গিয়ে পড়ে, চিবুকের ওপর দিয়ে পড়ে। দেলোয়ারের বউকে দেখছি-এমন একটি কালো ঝিলিক আমি বোধ করি, একটু অপরাধবোধও জন্মে; পরেই আমি অনুভব করি, এ হচ্ছে ডলি, আমার বউ, যে এখন আমার দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি না আমি কী করবো। আমি কি দরোজা বন্ধ করবো? ডলি কি চাচ্ছে আমি দরোজা বন্ধ করি?

আমি বলি, ডলি, দরোজা বন্ধ করবো?

ডলি সাড়া দেয় না। আমার মনে হয় ডলি চায় আমি দরোজা বন্ধ করে দিই; বেশ শব্দ করেই আমি দরোজা বন্ধ করি। আমি চেয়েছিলাম এমনভাবে বন্ধ করবো যাতে কোনো শব্দ না হয়; এতো শব্দ হওয়াতে আমিই বিস্মিত হই; ডলিও বিস্মিত হয়ে তাকায়।

আমি বলি, এতো শব্দ যে কেনো হলো!

ডলি মধুরভাবে আমার দিকে তাকায়; তার চিবুক আবার আমার চোখে পড়ে। একটি বিশাল লাল গোলাপের মতো তার শরীর থেকে তীব্র সুগন্ধ এসে আমার রক্তের ভেতরে ঢোকে, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে না।

আমি বলি, সেই তীব্র সুগন্ধটি পাচ্ছি।

ডলি বলে, তোমার কি দম বন্ধ হয়ে আসছে?

আমি বলি, না; আরো তীব্র.সুগন্ধ পেতে ইচ্ছে করছে।

ডলি বলে, তুমি এতো দূরে থাকলে কী করে তীব্র সুগন্ধ বেরোবো।

আমি ডলির কাছে গিয়ে বসি, এবং বলি, হাতটি ধরি?

ডলি বলে, শুধু হাত ধরবে?

আমি বিব্রত বোধ করি; ডলির বাঁ হাতটি প্রায় ধরে ফেলেছিলাম, আমার হাতটি কেঁপে কেঁপে সরে আসে।

ডলি বলে, আমার সারা শরীর তুমি ধরো।

ডলির সারা শরীরটি আমি একবার মনে মনে ধরি, আমার বাহু উপচে শাদা, দুগ্ধধারার মতো ডলির শরীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরটাকে আমি ধরতে পারি না; ডলির শাড়ির ভেতরে মুখ গুঁজে একবার নিশ্বাস নিই; তারপর আবার ডলির মুখের দিকে তাকাই।

আমি বলি, দেলোয়ারকে আমার মনে পড়ছে।

ডলি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, এ-নামের কাউকে আমি চিনি না।

আমি বলি, দেলোয়ার আমার বন্ধু ছিলো।

ডলি বলে, তোমার কোনো বন্ধুর গল্প আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না।

আমি বলি, কী গল্প তোমার শুনতে ইচ্ছে করে?

ডলি ঠোঁট দুটি বাড়িয়ে দিয়ে একটি আঙুল ঠোঁটের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত টানতে টানতে বলে, এ-দুটো সম্পর্কে তুমি গল্প বলো। আমার ভালো লাগবে, রাতভর শুনতে ইচ্ছে করবে।

আমি বলি, তোমার ছটি ঠোঁট রয়েছে।

ডলি হেসে ওঠে, আমি কি রাক্ষস যে ছটি ঠোঁট থাকবে?

আমি বলি, তুমি রাক্ষস নও, রাক্ষসদের কতোগুলো ঠোঁট থাকে আমি জানি না; কিন্তু তোমার তিন জোড়া ঠোঁট আছে-লাল, রঙিন, কোমল, গোলাপপাপড়ি।

ডলি হেসে ওঠে, হাসতে থাকে, হাসতে হাসতে বলে, একটু পরই হয়তো বলবে আমার লাখ লাখ ঠোঁট আছে।

আমি বলি, তোমার এই ঠোঁট দুটিতে ময়লা লেগে ছিলো।

ডলি চমকে ওঠে, ময়লা? আমার ঠোঁটে?

আমি বলি, এখন নেই।

ডলি বলে, কখনো ছিলো না।

লাল রঙের ঠোঁটের অন্ধকার আমাকে গ্রাস করে। আমি অজস্র লাল লাল লাল লাল ঠোঁট দেখতে পাই; আমি লাখ লাখ লাল লাল দরোজা খুলে ঢুকতে থাকি, ঢুকে আরো লাল লাল অন্ধকার থেকে আরো লাল অন্ধকারের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে, যেনো অজস্র জন্ম ধরে এগোচ্ছি, আমি আর এগোতে পারি না; মহাশূন্য থেকে খসে পড়ে যাই, পিছলে পড়ে যাই; চাঁদ তারা সূর্য আর যা কিছু আছে যা কিছু নেই আমি জড়িয়ে ধরে থাকতে চাই, আমি কিছুই জড়িয়ে ধরতে পারি না, ব্যর্থ হয়ে আমি পাতালে পড়ে যেতে থাকি, পাতাল এতো নিচুতে যে সেখানেও আমার পা ঠেকে না। মহাজগতে, আমার মনে হয়, ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নেই; এর আগে ব্যর্থতাকে আমি এমনভাবে অনুভব করি নি। ডলি আমাকে জড়িয়ে ধরে; আমি ঠেলে সরিয়ে দিই। নিজেকে আমার ক্লান্ত মনে হয় না, ব্যর্থ মনে হয়; দেলোয়ারকে মনে পড়ে, দেলোয়ার কখনো ব্যর্থ হতো না, দেলোয়ার নিশ্চয়ই সফল হয়েছিলো, এমন মনে হতে থাকে; আমার দেলোয়ার হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, গাড়ি নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেও আমি ভয় পাই না। ডলি আমাকে আর জড়িয়ে ধরছে না; সে হয়তো এখন দেলোয়ারকে জড়িয়ে ধরে আছে; আমাকে আর ধরবে না। ডলিকে ছুঁতে ইচ্ছে করছে আমার, আমি ছুঁতে পারছি না; ডলিকে ছুঁতে গেলে হয়তো অন্য কারো শরীরে আমার শরীরে ঠেকবে, অন্য কোনো হাত আমাকে ঠেলে সরিয়ে দেবে; ডলির ওষ্ঠ হয়তো এখন অন্য কোনো ওষ্ঠের সাথে জড়িয়ে আছে গেঁথে আছে; আমি টানলেও ডলি ওই ওষ্ঠ থেকে নিজের ওষ্ঠকে উদ্ধার করতে পারবে না; আরো বেশি করে সমর্পণ করবে। ডলির মাংসে হয়তো ঢুকে আছে অন্য কোনো মাংস; সে-মাংস আমার নয়; ডলি সে-মাংস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইবে না হয়তো। এখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে উঠেছে, কোনো রঙ নেই; লাল রঙটি মুছে গেছে, মহাজগতে ডলি আছে কি না তাও আমি অনুভব করতে পারছি না।

আমি ডাকি, ডলি।

ডলি সাড়া দেয়, বলো।

আমি বলি, তুমি কি আমাকে ঘেন্না করছো?

ডলি বলে, ঘেন্না করবো কেনো?

আমি বলি, তুমি কি কষ্ট পাচ্ছো?

ডলি বলে, হ্যাঁ, একটা কেমন কষ্ট লাগছে।

আমি জানতে চাই, কষ্টটা কেমন?

ডলি বলে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো।

আমি বলি, আর ঘুম আসবে না মনে হচ্ছে?

ডলি বলে, হ্যাঁ।

আমি বলি, তোমার খুব ঘুম পাচ্ছিলো?

ডলি বলে, হ্যাঁ।

আমি বলি, তোমার কি মনে হচ্ছে ভুল করেছো?

ডলি বলে, কী ভুল?

আমি বলি, আমাকে বিয়ে করে?

ডলি বলে, আমি ওসব ভাবছি না।

আমি বলি, দেলোয়ার কি ব্যর্থ হয়েছিলো?

ডলি চুপ করে থাকে; আমি বলি, ডলি, দেলোয়ার কি ব্যর্থ হয়েছিলো?

ডলি বলে, না।

আমার ভেতরে অজস্র বজ্র আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়ে এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত ছুটতে থাকে; কিছুতে থামে না।

আমি বলি, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

ডলি বলে, না।

আমি বলি, কী করেছিলে?

ডলি বলে, আমাকে সে খুন করেছিলো।

আমি বলি, তুমি সুখী হয়েছিলে?

ডলি বলে, দশ পনেরো দিন আমি বসতে পারি নি, দাঁড়াতে পারি নি, ঘুমোতে পারি নি; আমার শরীরটা আমার ছিলো না।

আমি বলি, দেলোয়ার সব সময়ই সফল।

ডলি কোনো কথা বলে না।

ডলিকে ডাকতে আমার সাহস হয় না; আমরা যে পাশাপাশি শুয়ে আছি, ঠিক শুয়ে নয় ঠিক পাশাপাশি নয়-একই বিছানায় পড়ে আছি, একেও আমার অস্বাভাবিক মনে হয়; আমাদের এভাবে থাকার কথা ছিলো না। বিছানা থেকে উঠে টেবিলে গিয়ে বার ইচ্ছে হয়, অনেকগুলো সিগারেট খাওয়ার ক্ষুধা জাগে; আমি উঠতে পারি না, সিগারেট খেতে পারি না; আমার ভেতরটা মরুভূমি হয়ে ওঠে। ডলির থেকে সব কিছু আমার প্রিয় মনে হয়; সব কিছুর সাথেই আমার জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, শুধু ডলিকে ছাড়া। খুব দূরে খুব বড়ো বা খুব ছোটো কোনো গাছের নিচে বসে থাকার সাধ হয়, ডালে কোনো পাখি আছে কি না খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে; মনে হয় বছরের পর বছর ধরে আমি পাখি খুঁজতে পারি; কোনো ছোটো নদীতে একটা ছোটো নৌকোয় বসে নদী পার হ’তে আমার ভালো লাগে, ঢেউয়ের দোলাগুলো আমার রক্তে দুলতে থাকে; ট্রেন থেকে পুকুরে অনেকগুলো শিশুকে সাঁতার কাটতে দেখেছিলাম, তাদের মনে করে আমি সুখ পাই; নারায়ণগঞ্জে যে-মেয়েটি ব্লাউজ খোলে নি, তার মুখটিও মনে পড়ে, আমি সুখ পাই। সব কিছুর মুখ আমার মনে পড়ে, ডলির মুখ ছাড়া; তিন চারটি রিকশাঅলার মুখ মনে পড়ে, বাসা থেকে বেরোলেই কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাই, মুখগুলো মনে পড়ছে, ওদের মুখের দাগগুলো আর ঘাগুলোও দেখতে পাচ্ছি; ডলির মুখটি দেখতে পাচ্ছি না। একটি নদীর মুখ আমার মনে পড়ে। একবার আমি গিয়েছিলাম বনের পর বন পেরিয়ে, পাহাড় পেরিয়ে, উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে ওই নদীর পারে গিয়েছিলাম; নীল দাগের মতো পড়ে আছে নদী, ছোটো ছোটো ঢেউ, নদীতে নৌকো নেই, জাহাজ নেই; শুধু নীল হয়ে পড়ে থাকাই কাজ ওই নদীর। নদী পেরিয়ে ওপাশে কেউ যায় না, ওপাশ থেকে এপাশে কেউ আসে না; নদী শুধু নীল হয়ে পড়ে থাকে। ডলির মুখটি আমার মনে পড়ে না। আমি চোখ ভরে বালুকার স্থূপ দেখতে পাই।

ডলিকে খুব সুখী করতে হবে-ডলির মুখটি বারবার মনে করতে না পেরে এবং পুনরায় মনে করার চেষ্টা করতে করতে একথা আমার মনে হয়; ভয়ঙ্কর সুখী করতে হবে, অশেষ সুখী করতে হবে, এতো সুখী যা ডলি সহ্য করতে পারবে না; আমি মানুষ, মানুষের কাজ মানুষকে সুখী করা; ডলি মানুষ, ডলি আমার নিজস্বতম মানুষ; তাকে সুখী করতে হবে; কখনো যেনো সে কষ্ট না পায়, কখনো বুঝতে না পারে আমি একটা অপরাধবোধের মধ্যে রয়েছি, ডলি অনুভব করতে না পারে প্রেতের সাথে আমি যুদ্ধ করে চলছি। আমাকে কি দেলোয়ারের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হবে, যতদিন আমি বাঁচবো, ডলি বাঁচবে? বেঁচে থেকে সুখ পাবো? আমার অপরাধবোধ উত্তরাধিকারীর রক্তে সংক্রামিত করে যাবো? কোনো উত্তরাধিকারে আমি বিশ্বাস করি না, কোনো উত্তরাধিকারী চাই না; আমি কোনো অপরাধীকে রেখে যেতে চাই না। ডলি কি মেনে নেবে? একটি দুটি উত্তরাধিকারীর জন্যে ডলি পাগল হয়ে উঠবে না? তার ভেতর কি একটা মারাত্মক মা জেগে উঠবে না? আমি কোনো পুত্র চাই না, কন্যা চাই না; পুত্রকন্যাকে জড়িয়ে ধরতে চাই না। পাশের বাসায় একটি নতুন পুত্র জন্মেছে বোধ হয়, ওর চিৎকার আমার কানে লাগে; কর্কশ মনে হয়। আমি কখনো কোনো শিশু কোলে নিই নি; আমি কোনো উত্তরাধিকারী রেখে যাবো না। ডলিকে সুখী করতে হবে। কীভাবে সুখী করতে হয়? ডলি কিসে সুখী হবে? ডলি এখন কী ভাবছে? ডলি কি আমাকে সুখী করার কথা ভাবছে? আমরা কেউ কি সুখী করতে পারি কাউকে? আমি ডলিকে, ডলি আমাকে? আমি যে এতোদিন বেঁচে আছি, এটা কি সুখ? সুখ কি মানুষের জন্যে দরকার? দেলোয়ার কি সুখে ছিলো, ডলি কি দেলোয়ারকে সুখী করেছিলো? দেলোয়ার ডলিকে? আমার বাবা মা কি সুখী? ডলির বাবা মা? মানুষ কি কখনো সুখী হয়েছে। কিন্তু ডলিকে সুখী করতে হবে। ডলি সুখী না হলে মনে হবে দেলোয়ার নিশ্চয়ই সুখী করতে পারতো ডলিকে; আমি পারছি না।

ভোরবেলা ডলির দিকে আমি চায়ের পেয়ালাটি এগিয়ে দিই।

ডলি অনেকটা চিৎকার করে ওঠে, করছো কী, করছে কী? আমি তোমাকে চা করে দিচ্ছি।

আমি বলি, দেখো তো চিনি ঠিক হয়েছে কি না?

ডলি পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ঝলমল করে ওঠে, তুমি এতো চমৎকার চা বানাতে পারো।

ডলির কী যেনো মনে পড়ে; বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে এক পেয়ালা চা বানিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দেয়।

আমি বলি, আমি তো নিজেই বানাতাম।

ডলি বলে, তুমি আমাকে চা বানিয়ে দেবে, নিজে বানিয়ে খাবে; শুনলে সবাই কী বলবে?

আমি বলি, সবার কী বলার ভয়েই তুমি চা বানালে?

ডলি উত্তর দেয় না; বরং নিজেই প্রশ্ন করে, আমার জন্যে তুমি কেনো চা বানালে, বলো তো?

আমি অপরাধীর মতো বলি, তোমাকে সুখী করতে চাই।

ডলি হাসে, কেনো সুখী করতে চাও?

আমি বলি, আমার অনেক অপরাধ।

ডলি বলে, তোমার কোনো অপরাধ নেই, অপরাধ আমার।

আমি বলি, না; তুমি অপরাধ করতে পারো না।

ডলি বলে, আমি চেয়েছিলাম দেলোয়ারের গাড়িটা পানিতে পড়ে যাক।

আমি বলি, আমাকে সুখী করার জন্যে তুমি এটা বানিয়ে বললে।

ডলি বলে, দেলোয়ারের গাড়ি পানিতে পড়লে তুমি কেনো সুখী হবে? বন্ধুর গাড়ি পানিতে পড়লে কেউ সুখী হয় না।

আমি বলি, হয়তো আমি হই।

ডলি বলে, আমার তা মনে হয় না।

আমি বলি, আমাকে কি সুখী মনে হচ্ছে না?

ডলি কোনো উত্তর দেয় না, আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি বলি, চা খাও।

ডলি বলে, চা খেতে ইচ্ছে করছে না।

আমি বলি, কেনো?

ডলি বলে, জানি না।

আমি বলি, আমি বোধ হয় জানি।

ডলি চুপ করে থাকে; আমি চা খাই, সিগারেট ধরাই; চা আর সিগারেট দুটিই আমার ভালো লাগে।

আমি যে আগে খুব অনিয়মিত ছিলাম বাসায় ফেরার ব্যাপারে, এমন নয়; ঠিকঠাক সময়েই আমি বাসায় ফিরেছি এতোদিন, বেরিয়েছিও ঠিকঠাক সময়ে; কিন্তু এখন থেকে আমি আরো নিয়মিত হয়ে উঠতে থাকি। আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারি না কেনো সব কিছু আমি এতো ঠিকঠাকভাবে করছি। বেলা এ নিয়ে কয়েকবার পরিহাসও করে, আমি তাতে কান দিই না। আমিই বিস্মিত হই আমার নিখুঁত আচরণে, আমার অসম্ভব মানবিকতায়।

ডলি একদিন বলে, তুমি খুব চমৎকার।  

আমি জানতে চাই, কেনো এমন মনে হচ্ছে?

ডলি বলে, তোমাকে নিয়ে একটুও চিন্তায় থাকতে হয় না; ঠিক সময়ে তুমি ফেরো, ঠিক সময়ে বাইরে যাও।

আমি বলি, মাঝেমাঝে তো আমার দেরি হয়।

ডলি বলে, দেরি হলেও তুমি টেলিফোনে জানিয়ে দাও।

আমি বলি, এখন থেকে দেরি করে ফিরবো, দেরি হলেও জানাবো না।

ডলি বলে, না, না; দেরি কোরো না, দেরি হলে জানাবেই।

বাসায় ফেরার ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমার কাছে; আমি বুঝতে চেষ্টা করি কেনো আমি এতো নিয়মিত দেলোয়ার কি সময় মতো ফিরতো। আমি জানি না। দেলোয়ারের ব্যবসা ছিলো; যারা ব্যবসা করে, তাদের একটি বড়ো স্বাধীনতা থাকে, ঠিক সময়ে তাদের ফিরতে হয় না; ঠিক সময়ে ফিরলেই সবাই মনে করে তাদের ব্যবসা জমছে না; দেরি করে বা মাঝরাতে বা কখনো কখনো না ফিরলে সবাই মনে করে তাদের ব্যবসা এতো জমছে যে বাসায় ফেরার মতো সময়ও তারা পাচ্ছে না; যখন তারা বাসায় ফেরে সবাই তাদের মুখের দিকে তাকায় যেনো তারা বীরের মুখ দেখছে। দেলোয়ার কি দেরি করে ফিরতো? মাঝেমাঝে ফিরতো না? ডলিকে জিজ্ঞেস করে দেখবো? জিজ্ঞেস করাটা কি ঠিক হবে? আমি যা করি, তাতে দেরি করার সুযোগ খুব কম। আমার মনে হয় দেলোয়ার দেরি করে ফিরতো না; তার বাসায় ডলি ছিলো, বাসায় ডলি থাকলে দেলোয়ার দেরি করে ফিরতে পারে না। আমি কি ডলির জন্যে ঠিক সময়ে ফিরি? আমি ফিরলে ডলির মুখটি উজ্জ্বল দেখায়, ওই উজ্জ্বলতা আমার ভালো লাগে; কিন্তু আমি উজ্জ্বলতার জন্যে ফিরি না, ফিরি দেলোয়ারের জন্যে; দেলোয়ারের আগে আমাকে অবশ্যই বাসায় ফিরতে হবে। দেলোয়ার একশো মাইল বেগে গাড়ি চালাচ্ছে, একটার পর একটা গাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে; রিকশা এড়িয়ে, ট্রাক–বাস বেবির জট পেরিয়ে, লালবাতির নিষেধ না মেনে ছুটে চলছে ডলির দিকে; আমাকে তারও আগে ডলির কাছে পৌঁছোত হবে। আমি কি ডলির জন্যে প্রবল আবেগ বোধ করি? ভাবতেও আমি ভয় পাই। যদি দেখতে পাই ডলির জন্যে আমি আবেগ বোধ করি না, আমি তা সহ্য করে উঠতে পারবো না হয়তো; দেলোয়ার নিশ্চয়ই প্রবল আবেগ বোধ করতো। আমার আবেগ দেলোয়ারের আবেগের থেকে কম হলে আমি খুব অপরাধ বোধ করতে থাকবো। আমি তাই আবেগের কথা ভাবি না, ডলির কথা ভাবি; ডলি আছে, তাই আমার ভেতরে নিশ্চয়ই আবেগ আছে ডলির জন্যে, আমি এমন ভাবতে চেষ্টা করি। একবার মনে হয় ডলির জন্যে সম্ভবত আমি কোনো আবেগ বোধ করি না; ডলিকে যদি আর কোনোদিন নাও দেখতে পাই তাহলেও আমার ভেতরে তার জন্যে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হবে না। মনে হবে না আমি কিছু হারিয়ে ফেলেছি। ডলি কখনো কখনো খুব আবেগকাতর হয়ে জড়িয়ে ধরতে পারে, তখন তার শরীর ঝরনার মতো বইতে থাকে; আমি ওই মুহূর্তে খুব আবেগ বোধ করার চেষ্টা করি, ডলির মতোই প্রবাহিত হতে চাই; কিন্তু পারি না। ডলি তা বুঝতে পারে না; পারে না বলে আমার ভালো লাগে; তারপরই আমার মনে একটা অপরাধবোধ জেগে ওঠে, আমার খারাপ লাগে যে ডলির জন্যে আমি আবেগ বোধ করছি না।

ডলি কখনো কখনো বলে, তুমি কিছু ভাবছো?

আমি বলি, না তো।

ডলি বলে, আমার মনে হচ্ছে ভাবছো।

আমি বলি, কী ভাবছি সেটাও তুমি বলো।

ডলি বলে, অতোটা পারবো না।

আমি বলি, তোমার কি সব সময় আমার মনের কথা জানতে ইচ্ছে করে?

ডলি বলে, আমার মনের কথা জানতে তোমার ইচ্ছে করে না?

আমি বলি, না তো।

ডলি বলে, অ।

আমি বলি, যদি বলতাম ‘হ্যাঁ’ তাহলে কি তুমি সুখী হতে?

ডলি বলে, মিথ্যে শুনে কেউ সুখী হয় না।

আমি বলি, আমি যতো সুখ পেয়েছি তার অধিকাংশই মিথ্যে থেকে।

ডলি বলে, তুমি কি এখন সুখ পাচ্ছো না? আমার জড়িয়ে ধরা, আমার ভালোবাসা কি মিথ্যে?

আমি বলি, সুখ পাচ্ছি কি না বুঝতে পারছি না।

ডলি বলে, তার মানে তুমি সুখ পাচ্ছো না।

আমি বলি, পাচ্ছি কি না বুঝতে পারছি না।

ডলি বলে, কেনো বুঝতে পারছো না? তোমার শরীর নেই, মন নেই?

আমি বলি, তুমি কি সুখ পাচ্ছো?

ডলি বলে, হ্যাঁ, পাচ্ছি।

আমি বলি, যদি বলি আমি তোমাকে মিথ্যে জড়িয়ে ধরে আছি?

ডলি কোনো কথা বলে না।

একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম আমরা-ডলি আর আমি। ডলিই প্রস্তাব দিয়েছিলো; আমার যদিও বেড়ানোর কোনোই আগ্রহ নেই, সিন্ধু বা শিশিরবিন্দু দেখার কোনোই ব্যাকুলতা কখনোই আমি বোধ করি নি–এজন্যেও আমার একটা গোপন অপরাধবোধ রয়েছে,–আমি রাজি হয়েছিলাম। ডলি সমুদ্র দেখতে চেয়েছিলো, আমিও তার সাথে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম। আমার কাছে সমুদ্র দেখাটা দায়িত্ব বলে মনে হয়েছিলো ডলি কি আগে সমুদ্র দেখেছিলো? আমি জানতে চাই নি; মনে হয়েছিলো ডলি সমুদ্র দেখেছে, আর আমি যদি তাকে অন্তত একবার সমুদ্র না দেখাই, সে চিরকাল একটা দীর্ঘশ্বাস পুষবে। ডলির কাছে আমি কৃতজ্ঞ, ডলি আমাকে সমুদ্র দেখিয়েছিলো, নইলে আমার সমুদ্র দেখা হতো না। সমুদ্র দেখে, আমি মনে করেছিলাম, আমি খুব বিচলিত চঞ্চল হয়ে উঠবো, কিন্তু আমি ততোখানি চঞ্চল বিচলিত হচ্ছিলাম না; আমাদের চারপাশে যারা খুব চঞ্চল হয়ে পড়ছিলো, যতোটা চঞ্চল হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব তার চেয়ে বেশি চঞ্চল হওয়ার চেষ্টা করছিলো, তারা সদ্ৰপারের নুড়ি আর কাকড়া হ’তে চাচ্ছিলো; আমার মনে হচ্ছিলো নুড়ি আর কাকড়া তারা কখনো হতে পারবে না। ডলি আমাকে জড়িয়ে ধরে নোনাজলে গড়িয়ে পড়ছিলো, ডলির চঞ্চলতায় বিব্রত বোধ করছিলাম আমি। ডলির মতো গড়িয়ে পড়তে পারছিলাম না বলে ডলি আমাকে ভীতু মনে করছিলো; ভীতু মনে করে সুখ পাচ্ছিলো।

ডলি বলছিলো, তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেনো?

আমি বলছিলাম, একটুও ভয় পাচ্ছি না।

ডলি বলছিলো, চলো আরো সমুদ্রের দিকে যাই।

আমি বলছিলাম, কতো দূরে তুমি যেতে চাও?

ডলি বলছিলো, যতো দূরে তুমি আমাকে নিতে চাও।

আমি বলছিলাম, আমি এখানেই থাকতে চাই।

ডলি বলছিলো, কেনো?

আমি বলছিলাম, ভয়ঙ্কর কোনো ঢেউ আসতে পারে।

ডলি বলছিলো, আসুক।

আমি বলছিলাম, দেলোয়ারকে জড়িয়ে ধরে তুমি কি আরো সমুদ্রের দিকে গিয়েছিলে?

ডলি বলছিলো, আহ্, আবার দেলোয়ার।

আমি বলছিলাম, তুমি কি কিছু মনে রাখো না?

 ডলি বলে, রাখি, যা মনে রাখার।

ডলি আমাকে জড়িয়ে ধরে নোনাজলে গড়িয়ে পড়ে, নিজেকে আমার দেলোয়ার মনে হয়। কোনো দিন কি আমি ডলির বদলে অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরে এই নোনাজলে গড়িয়ে পড়বো? তখন আমার কী মনে পড়বে? আমার ভয় হতে থাকে একটা মারাত্মক ঢেউ এসে আমাকে গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যাবে, আমি ডলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। ডলি খুব সুখী হয়ে ওঠে।

ডলি বলে, সমুদ্রের পানিতে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে কী যে সুখ লাগছে।

আমি বলি, শয্যার থেকেও বেশি? ডলি বলে, কী যে বলো।

ডলি খুব উল্লসিত, সে সমুদ্রের নুড়ি আর লাল কাকড়ায় পরিণত হয়ে গেছে তার উল্লাস দেখে আমার সুখ লাগছে, এবং মনে হচ্ছে ডলি একটু বেশি সুখী বোধ করার চেষ্টা করছে।

আমি বলি, ডলি, তুমি একটু বেশি সুখী বোধ করছো।

ডলি বলে, আমি তো বেশি সুখীই।

আমি বলি, আমার তা মনে হয় না।

ডলি বলে, তোমার কী মনে হয়?

আমি বলি, সমুদ্রের জলে তুমি কিছু একটা ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছো।

ডলি বলে, তুমি আমাকে গভীর সমুদ্রে ঠেলে ফেলে দাও।

আমি বলি, আমি কি এত নিষ্ঠুর?

ডলি বলে, তুমি যা বলছে তার চেয়ে সমুদ্রে ঠেলে ফেলে দিলেও আমি কম কষ্ট পাব।

এমন সময় একটি ঢেউ আসে। ঢেউয়ের জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না, আর প্রস্তুত থাকার জন্যে ডলি সমুদ্রে আসে নি; তার হয়তো ধারণা সমুদ্র সৃষ্টি হয়েছে তারই জন্যে, তারই গড়িয়ে পড়ার জন্যে; এমন কোনো ঢেউ আসতে পারে না, যা তাকে গভীর সমুদ্রে টেনে নিতে পারে। নোনাজলের আকস্মিক আক্রমণে আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি, কিন্তু পা দুটি আমি মাটিতে অলৌকিকভাবে ঢুকিয়ে দিই, এবং ডলিও আমার ওপরে এসে পড়ে। ডলি আমাকে ধরার চেষ্টা করে, ধরে উঠতে পারে না; আমিই তার একটি হাত ধরে ফেলি। ডলির হাতটি আমি ছেড়ে দিতে পারতাম, ডলির হাত খসে যেতে পারতো আমার হাত থেকে তার কোনোটিই হয় নি। ঢেউটি আমাদের দুজনকেই প্লাবিত করে দেয়, এবং অল্পপরেই সমুদ্রের দিকে টানতে থাকে। আমি তখন আমার পা দুটি আরো শক্তভাবে মাটিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি, ডলিরও হাত দুটি শক্তভাবে ধরেছি। ডলি আমাকে ধরেছে বলে মনে হয় না; হয়তো তার ধরার কথাই মনে হয় নি ঢেউটি টান দেয়, আমার ইচ্ছে হয় ডলিকে ছেড়ে দিই, কিন্তু তখনই আমার ভেতরে অপরাধবোধটা জেগে ওঠে, আমার সাথে সেদিন বেবিতে না উঠলে ডলি আজ সমুদ্রে ভেসে যেতো না, সে শহরে থাকতো, আমি তার হাত দুটি শক্তভাবে ধরে রাখি; এমন শক্তভাবে কখনো কিছু আমার ধরতে হয় নি। ডলি কি সাঁতার জানে? নিশ্চয়ই জানে না। ডলির এখন কী মনে হচ্ছে তার কি সমুদ্রে ভেসে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে? ডলি আমার হাত ধরে নেই, আমিই ধরে আছি ডলির হাত; মনে হচ্ছে সমুদ্রে ভেসে যেতে তার ভালোই লাগবে। কিন্তু আমি তাকে ভেসে যেতে দিতে পারি না। আমি সমুদ্রে একটি নারীকে নিয়ে নেমেছিলাম; জোয়ার আসার কথাও আমি জানতাম; সবাই তাদের নারীদের নিয়ে ওপরে উঠে গেছে, শুধু আমিই আমার নারীকে ঢেউয়ের হাতে তুলে দিয়ে উঠে আসবো? আমার খুব নিঃসঙ্গ লাগবে। আমি ডলির হাত ধরে থাকি। আমার পা বালুর ভেতর থেকে উঠে আসে; সাঁতার দিয়ে সমুদ্রকে আমি প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে থাকি। ডলি আমাকে ধরে নেই, ধরার কথাও হয়তো তার মনে নেই; তাকে ধরে রাখার দায়িত্ব আমার, সে হয়তো তাই মনে করছে, আমি তাকে ধরে রাখছি। ডলি, তোমাকে আমি ধরে আছি, যদি তুমি ছুটে যাও, মনে কোরো না আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি, আমি তোমাকে ছেড়ে দিই নি, আমার মনে হতে থাকে, পারলে তোমাকে আমি জড়িয়ে ধরে রাখতাম, চুমো খেতাম, সঙ্গম করতাম, আমার মনে হতে থাকে, তুমি সমুদ্রের না আমার জানি না, সমুদ্র তোমাকে নিয়ে গেলেও তুমি মনে কোরো না আমি তোমাকে সমুদ্রের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। ঢেউটি কেটে যায়, আমি ডলিকে জড়িয়ে ধরে পারে এসে এলিয়ে পড়ি।

ডলিকে আজ আমি বাঁচিয়েছি, বলতে পারি, যেমন অনেকেই বলছে। লোকজন ভিড় করে প্রশংসা করছে, আমি কে জানতে চাচ্ছে; কেউ কেউ ডলির দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, বুঝতে পারছি তারা এমন একটি নারীকে বাঁচাতে পারলে ধন্য বোধ করতে। আমি কি ধন্য বোধ করছি? ডলির সুন্দর শরীরের দিকে তাকিয়ে তাদের চোখ ঝলমল করছে, আমাকে হয়তো ঈর্ষাও করছে। আমি ধন্য বোধ করছি না, অর্থাৎ ধন্য বোধ করার মতো কিছু বোধ করছি না; ডলি সমুদ্রে ভেসে গেলেও আমি কষ্ট বোধ করতাম না–এটা নিশ্চিতভাবে আমি বলতে পারছি না, আমার এখন এমনই মনে হচ্ছে। কেনো বাঁচালাম তাহলে? ডলি তো  বাঁচার জন্যে আমার কাছে প্রার্থনা করে নি। আমি কি তখন দেলোয়ারকে দেখতে পাচ্ছিলাম? আমার কি মনে হচ্ছিলো দেলোয়ার ডলিকে সমুদ্রে ভেসে যেতে দিতো না? দেলোয়ার নিজে ভেসে যেতে, ডলিকে ভেসে যেতে দিতো না? সমুদ্রকে আমার দেলোয়ার মনে হচ্ছিলো? দেলোয়ার সদ্র হয়ে ডলিকে কেড়ে নিচ্ছে আমার থেকে; আমি যে ডলির সাথে আছি, ডলি যে আমার সাথে আছে, ডলি যে আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমরা যে মিলিত হই, দেলোয়ার তা সহ্য করতে পারছে না, এটা কি আমার মনে হচ্ছিলো? না কি আমি ভয় পাচ্ছিলাম সবাই আমাকে অপরাধী মনে করবে? মনে করবে আমি ইচ্ছে করেই ডলিকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছি। অপরাধীর মতো আমি ঢাকা ফিরে যেতে পারবো না? ডলিকে কি আমি  বাঁচিয়েছি নিজেকে। বাঁচানোর জন্যে? ডলি সমুদ্রের দিকে ভেসে গেলে আমাকেও সাথে সাথে ভেসে যেতে হতো? আমার একা ফিরে আসা কেউ পছন্দ করতো না। আমি বাঁচতে চেয়েছি বলেই বাঁচিয়েছি ডলিকে? আমি সভ্য মানুষ, আমার দায়িত্ব প্রথম নারীকে বাঁচানো; সবার শেষে নিজেকে বাঁচানো, নিজেকে না বাঁচালেও চলে। আজ যদি আমি নিজে না বেঁচে ডলিকে  বাঁচাতাম, তাহলে সভ্যতার পুস্তকে একটি নতুন অধ্যায় সংযোজিত হতো। সভ্যতার কথা আমার মনে ছিলো না, কেনো আমি তাহলে সমুদ্রের থাবা থেকে ডলিকে ফিরিয়ে আনলাম।

হোটেলে ফিরে ডলি বলে, আজ বুঝেছি তুমি আমাকে কতো ভালোবাসো।

আমি কোনো কথা বলি না।

ডলি বলে, আব্বাও হয়তো আমাকে এভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করতো না।

আমি বলি,  বাঁচানো আর ভালোবাসার মধ্যে সম্পর্ক নেই।

ডলি বলে, অবশ্যই আছে; তুমিও আমার সাথে সমুদ্রে ভেসে যেতে পারতে।

আমি বলি, হ্যাঁ, পারতাম।

ডলি বলে, ভালো না বাসলে উদ্ধার করলে কেনো?

আমি বলি, উদ্ধারকারীরা ভালোবাসে বলে উদ্ধার করে না।

ডলি বলে, তুমি কি শুধুই আমার উদ্ধারকারী?

আমি কোনো কথা বলি না, ডলিও চুপ করে থাকে; আমার শরীর থেকে তার হাত দুটি খসে পড়ে। ডলির হাত দুটি আমার ধরতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ধরতে পারি না।

বছর দুয়েক কেটে গেছে; আমার মনেই পড়ে নি বেঁচে থাকা ছাড়া আর কিছু করার আছে। বেশ তো ভালোই বেঁচে আছি; ডলি দিন দিন আরো সুন্দর আর মাংসল হচ্ছে; সে পিল খাচ্ছে, আমি রাবার পরছি; আমি চেষ্টা করে চলছি যাতে ডলি কষ্ট না পায়, ডলি চেষ্টা করে চলছে যাতে আমি সুখ পাই। ডলির আশ্চর্য প্রতিভা আছে কষ্ট না পাওয়ার।

ডলি একদিন বলে, একটি কথা বলবো?

আমি বলি, বলো।

ডলি বলে, আমাদের কি একটিও ছেলেমেয়ে লাগবে না?

আমি বলি, ছেলেমেয়ের কথা আমার মনেই পড়ে নি।

ডলি বলে, মনে পড়ে নি তা ঠিক নয়।

আমি বলি, মানে?

ডলি বলে, তোমার খুবই মনে পড়ে।

আমি অবাক হই, বলি, আমার মনে পড়ে অথচ আমিই জানি না?

ডলি বলে, আমি বুঝি তোমার খুবই মনে পড়ে।

আমি বলি, কী করে বোঝো?

ডলি বলে, না-হওয়ার জন্যে তুমি যে-যত্ন নাও, তাতেই বুঝতে পারি।

আমি বলি, আমি কি না-হওয়ার জন্যে বেশি যত্ন নিই?

ডলি বলে, হ্যাঁ।

আমি বলি, তোমার ভালো লাগে না?

ডলি বলে, মাঝেমাঝে আমি কল্পনা করি তোমার রাবার ছিঁড়েফেড়ে গেছে, আমার পেটে একটা বাচ্চা এসেছে।

আমি বলি, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে।

ডলি বলে, তাতে আমাদের কী? তারা আমার পেটের নয়।

আমি বলি, তোমার পেটে তো ও-রকম মানুষই হবে।

ডলি বলে, আমি আমার পেটের মানুষ চাই।

আমি বলি, ইচ্ছে করলে তুমি পেটে মানুষ নিতে পারো, দুটি, তিনটি, চারটি, পাঁচটি…।

ডলি চিৎকার করে ওঠে, তুমি কি আমাকে এমন ভেবেছো? অন্যের বাচ্চা আমি পেটে নেবো?

আমি বলি, অন্যের কেনো? তোমার।

ডলি বলে, আমি শুধু আমার বাচ্চা পেটে নিতে চাই না, তোমার বাচ্চা পেটে নিতে চাই।

আমি বলি, আমার বাচ্চা নেয়ার মধ্যে বিশেষ কোনো মহিমা নেই।

ডলি বলে, আমি তোমরা বউ, তোমার বাচ্চাই তো আমি পেটে নেবো।

আমি বলি, হতে পারে জন্ম দেয়ার শক্তি আমার নেই।

ডলি বলে, খুবই আছে, তুমি ওই রাবারগুলো বিদেয় করো।

আমি বলি, আমি কোনো বাচ্চা চাই না।

ডলি বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে ওঠে, তুমি মানুষ নও।

হয়তো আমি মানুষ নই; মানুষ হলে মানুষ জন্ম দিতে হয়; কিন্তু সত্যিই আমি বুঝে উঠতে পারি না মানুষ জন্ম দিয়ে কী সুখ? ধরা যাক আমি রাবারগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, ডলি পিলগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলো–অনেক আগেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, তারপর ডলিকে অনেক মাস প্যাড পরতে হলো না; মানুষ আসবে বলে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। ডলিকে আমি সপ্তাহে সপ্তাহে গাইনির কাছে নিয়ে যেতে থাকলাম, গাইনিটা তাকে দেখতে থাকলো, কী দেখলো আমি জানি না, ডলির জন্যে নানা ধরনের টেবলেট কিনলাম, পরীক্ষার পর পরীক্ষা করালাম; তাতে সুখ কোথায়? মানুষ জন্ম দিচ্ছি ভেবে আমি সুখ পেতে থাকবো? ডলি খুব ভয়ঙ্কর কল্পনা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে; সে কল্পনা করছে রাবার ছিঁড়েফেড়ে যাচ্ছে; ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে আমার, সূর্যটা হঠাৎ ছুটে আসতে থাকলে যেমন লাগবে; আমাকে সাবধান হতে হবে, সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। সাবধান হতে হবে, লোহার থেকে শক্ত রাবার পরতে হবে। নারায়ণগঞ্জে তো আমি রাবার পরি নি, সেখানে কি আমি কোনো মানুষ সৃষ্টি করে এসেছিলাম? যদি সৃষ্টি করে এসে থাকি? সে-মানুষটা আমার নয়? সেটা এখন কোনো ড্রেনের পাশে ভিক্ষে করছে? যদি মেয়ে হয়? তার মায়ের পেশা শিখছে? না, ডলির পেটে আমি কোনো মানুষ সৃষ্টি করতে চাই না। কারো পেটেই আমি মানুষ সৃষ্টি করতে চাই না। মানুষকে আমি কি ঘেন্না করি? কখনো ভেবে দেখি নি। মানুষ প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব আছে আমার রক্তে আমি তেমন কোনো সংকেত পাই নি। ডলি হয়তো পাচ্ছে। প্রকৃতি আর সভ্যতা হয়তো তার রক্তে বেজে চলছে; তাকে নির্দেশ দিয়ে চলছে মানুষ বানানোর। তার ভেতরে মানুষ তৈরি হচ্ছে না বলে সে নিজেকে ব্যর্থ মনে করছে? সে সফল হতে পারে ভেতরে একটির পর একটি মানুষ সৃষ্টি করে? সভ্যতাকে দেখিয়ে দিতে পারে সে পাথর নয়, মরুভূমি নয়, নারী; তার ভেতরে উর্বর পলি রয়েছে; বীজ বুনলেই সেখানে সোনালি ধানের উৎসব শুরু হয়? পলিমাটিতে বীজ বুনবো আমি? আমার ইচ্ছে করে না। মানুষ তৈরি করার কথা ভেবে আমি কোনো সুখ পাই না।

আমি একটি স্বপ্ন দেখি, অনেকটা দুঃস্বপ্নই; তবে দেখে চিৎকার করে ডলিকে আমি জড়িয়ে ধরি নি। কে যেনো আমার হাতে একটি লাল বেলুন এনে দিয়েছে, সেটি ফোলাচ্ছি আমি, খুব আনন্দ পাচ্ছি; ফুঁ দিচ্ছি, আমার মুখ থেকে বাতাসের থেকে লালা বেশি ঢুকছে বেলুনে, আমি যতোই বাতাস ঢোকাতে চাচ্ছি ততোই লালায় ভরে উঠছে বেলুন; ফুলতে ফুলতে একটা কুমড়োর মতো হয়ে উঠছে, খুব ভারী হয়ে উঠছে। আমি ফুঁ দিতেই থাকি, বেলুনটি লালায় ভরে উঠতে থাকে, আমি উড়োতে চাই, বেলুনটি ওড়ে না; এলিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। বেলুনটি একটা উড়োজাহাজের সমান হয়ে উঠেছে, লালাভর্তি উড়োজাহাজ; শক্ত রশি দিয়ে আমি বেলুনটির গলা বেঁধে ফেলি। বেঁধে ফেলার পরই আমি লাখ লাখ কণ্ঠের চিৎকার শুনতে পাই। খুব সরু আর মসৃণ চিৎকার; উল্লাসের না আতঙ্কের প্রথমে আমি বুঝতে পারি না। একেকবার আমার কাছে উল্লাস মনে হয়, একেকবার মনে হয় আর্তনাদ। ওই চিল্কারে আমার কান ভরে ওঠে, খোঁচা দিয়ে আমি বেলুন ফাটিয়ে দিই; আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারপরও আমি উল্লাস আর আতঙ্কের কোলাহল শুনতে পাই; মনে হয় লালার স্রোতের নিচে আমি তলিয়ে যাচ্ছি, আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু আমি চিৎকার করে উঠি নি, ডলি বুঝতেও পারে নি যে আমি একটি স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি।

কয়েক দিন পর ডলি তার একরাশ স্বপ্নের কথা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমি আমার পুরোনো-হয়ে-যাওয়া দুঃস্বপ্নটি বলি; শুনে ডলি খুশি হয়।

ডলি বলে, ওগুলো হচ্ছে আমাদের শিশুদের চিৎকার।

আমি বলি, তুমি স্বপ্ন ব্যাখ্যা করতে পারো?

ডলি বলে, এটা খুব সহজ স্বপ্ন–তোমার রাবারে আটকে পড়ে আমাদের শিশুরা চিৎকার করছে; তুমি রাবারগুলো ফেলে দাও।

আমি বলি, তারপর কী করব?

ডলি বলে, আমাকে শিশু দাও।

আমি বলি, ভাবতেও আমার ভালো লাগে না।

ডলি বলে, তুমি বুঝতে পারছে না তোমার মন তোমাকে বলছে শিশুদের মেরো না?

আমি বলি, লাখ লাখ শিশু তুমি পেটে নিতে পারবে?

ডলি বলে, লাখ লাখ কেনো? একটি দুটো।

আমি বলি, আমি তো লাখ লাখ শিশুর চিৎকার শুনেছি।

ডলি বলে, আমি একটি দুটো শিশু চাই।

আমি বলি, চলো, কাল কোনো অনাথ আশ্রমে যাই।

ডলি বলে, অনাথ আশ্রমে কেনো?

আমি বলি, একটি শিশু আমরা অ্যাডোপ্ট করবো।

ডলি চিৎকার করে, না, না, না।

আমি বলি, তুমি তো শিশু ভালোবাসো, ওরাও শিশু।

ডলি বলে, আমি আমার শিশু চাই, আমার শিশুকে ভালোবাসতে চাই।

আমি বলি, মনে করো তুমি বন্ধ্যা।

ডলি ভয় পায়, চিৎকার করে, না, না, আমি বন্ধ্যা নই।

আমি বলি, মনে করো আমি বন্ধ্যা।

ডলি চমকে ওঠে, আমার দিকে কঠোরভাবে তাকায়, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ডলিকে কি আমি গর্ভবতী করবো? অন্তত একবার উদ্যোগ নেবো? ফেলে দেবো। প্রতিরোধকগুলো মানুষের বিরুদ্ধে আমি কাজ করে চলছি? অমানবিক আমি? আমার দায়িত্ব কিছু মানুষ জন্ম দিয়ে যাওয়া? পিতা-পিতামহদের মতো মানবিক হওয়া? গর্ভবতী করবো ডলিকে। কিন্তু গর্ভবতী নারী দেখতে আমার ভালো লাগে না, কখনো ভালো লাগে নি; মাকে গর্ভবতী দেখেই আমার ভালো লাগে নি। সিক্সে পড়ার সময় শুনতে পাই মার বাচ্চা হবে, শুনেই আমার ঘেন্না লাগে। কেউ আমাকে সংবাদটি দেয় নি, তবে সকলের মুখ থেকে আমি সংবাদটি পেয়ে যাই; একদিন আমার ইস্কুল থেকে ফিরতে ইচ্ছে হয় না, মনে হয় ইস্কুলের কোনো ঘরে লুকিয়ে থাকি। লুকোনোর জন্যে একটি ঘরে গিয়ে ঢুকি আমি, বুড়ো দপ্তরি আমাকে দেখে মনে করে আমি হয়তো কিছু হারিয়ে ফেলেছি। সে আমার কাছে এসে জানতে চায় আমি কী হারিয়েছি, কী খুঁজছি; আমি তাকে কিছু বলি না, বেঞ্চের নিচে সে আমার পেন্সিল বা কলম বা অন্য কিছু খুঁজতে শুরু করে। তার খোঁজা দেখে আমার কষ্ট হয়, কিন্তু আমি বলতে পারি না। আমার কিছু হারায় নি, আমি লুকিয়ে থাকার জন্যে এ-ঘরে ঢুকেছিলাম। আমি কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি, দপ্তরি বলতে থাকে পেলে সে পরদিন আমাকে জিনিশটি ক্লাশে গিয়ে দিয়ে আসবে। আমি মনে মনে বলি, দপ্তরি, আমার হারানো জিনিশ তুমি কোনোদিন খুঁজে পাবে না। আমি কী হারিয়েছিলাম? মাকে অপবিত্র মনে হচ্ছিলো। আমার আমি হারিয়ে ছেলেছিলাম মার পবিত্রতা? কিছুদিন পর দেখতে পাই মা আর ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না; কলসি থেকে পানিও ঢেলে খেতে পারছে না। মার সামনের নিচের দিকটি খুব ফুলে উঠেছে, চোখ দুটি ব’সে গেছে; হাঁটার সময় মা এমনভাবে চলছে যেনো গড়িয়ে গড়িয়ে হাঁটছে। আমি দূর থেকে মার পা ফেলা দেখে মার জন্যে দুঃখ পেতাম; মা যেনো একবার তার সম্পূর্ণ একটি পা তুলে বিশ্রাম নিচ্ছে, তারপর পা ফেলছে; আবার বিশ্রাম নিয়ে আরেকটি সম্পূর্ণ পা তুলছে, তুলে বিশ্রাম নিচ্ছে, তারপর পাটি ফেলছে। বাবাকে তখন বাড়িতে দেখতেই পেতাম না; তাঁর কাজ অনেক বেড়ে গিয়েছিলো তখন, অনেক রাতে তিনি বাড়ি ফিরতেন। বাড়িতে থাকতাম আমি আর মা। মাকে আমি দূর থেকে সারাক্ষণ দেখতাম। মা কলসি থেকে পানি ঢেলেও খেতে পারতো না; তাই আমাকে ডাকতো। পানি ঢেলে দিতে আমার ইচ্ছে করতো না, কিন্তু দৌড়ে গিয়ে আমি পানি ঢেলে দিতাম; মা আমার দৌড়ে আসা দেখে খুব সুখ পেতা; আমার বলতে ইচ্ছে করতো, পানি ঢেলে দিতে আসতে আমার ইচ্ছে করে না; তবে আমি বলতে পারতাম না। মা খুব শব্দ করে পানি খেতো, শব্দ শুনে আমার ঘেন্না লাগতো–আগে তো মা শব্দ করে পানি খেতো না; আবার আরেক গেলাশ পানি চাইতো, তার পানি খাওয়ার ঢকঢক শব্দ শুনে আমার শরীরে পিচ্ছিল শ্যাওলা ঘন হয়ে উঠতো।

মা একবার পিছলে পড়ে যাচ্ছিলো–দূর থেকে আমি দেখতে পাই; আমার মনে হয় পড়ে যাক, আমি ধরতে পারবো না; কিন্তু আমি দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলি, মা পুরোপুরি পা পিছলে পড়ে না; আস্তে আস্তে বসে পড়ে। আমার অতো শক্তি ছিলো না যে মাকে উঁচু করে কাঁধে তুলে ধরি, বা ধরে আমার বুকের সাথে আটকে রাখি। ধরতে গিয়ে আমিই নিচে পড়ে গিয়েছিলাম, ব্যথাও পেয়েছিলাম; তবে আমি ব্যথা পেয়েছিলাম কি না মা জানতে চায় নি, তাতে আমার খুব ব্যথা লেগেছিলো। মার শরীরের গন্ধ আমার খুব খারাপ লেগেছিলো।

মা বলেছিলো, তুই না থাকলে আজ আমি মারা যেতাম।

আমি বলেছিলাম, তুমি খুব ব্যথা পেয়েছে।

মা বলেছিলো, মেয়েমানুষের ব্যথা পেতেই হয়, আরো কতো ব্যথা পাবো।

আমি বলেছিলাম, তোমাকে দেখতে আজকাল ভালো লাগে না।

মা বলেছিলো, কেনো রে?

আমি বলেছিলাম, তুমি কুৎসিত হয়ে গেছে।

মা বলেছিলো, আমাকে দেখতে কি খুব কুৎসিত লাগে?

আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ; তুমি কি সুন্দর ছিলে, এখন তোমাকে ভালো লাগে না; এমন কুৎসিত মা ভালো লাগে না।

মা চমকে উঠেছিলো, কষ্টে ভরে-যাওয়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, এইজন্যই কি তুই আমার কাছে আসতে চাস না?

আমি কোনো কথা বলি নি, বলার মতো কথাই পাই নি, বলার ইচ্ছে হয় নি। তারপর থেকে মাকে খুব বিব্রত মনে হতে থাকে; আমি নই, মা-ই, আমার মনে হয়, দূরে থাকতে চায় আমার থেকে। কলসি থেকে পানি ঢালার সময় আমাকে ডাকতে গিয়ে মা থেমে যায়, নিজেই ঢালার চেষ্টা করে। আমি দূর থেকে দেখতে পাই মা বসতে পারছে না, কলসি কাৎ করতে পারছে না, তার হাত থেকে গেলাশ পড়ে যাচ্ছে; আমার ইচ্ছে করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই, কিন্তু দৌড়ে গিয়ে আমি গেলাশ নিয়ে পানি ঢেলে মাকে দিই। মার মুখে আমি একটি সুন্দর হাসি দেখি, দেখে আমার বুক ভরে যায়, মাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে; কিন্তু জড়িয়ে ধরি না। মারও তখন আমাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করেছিলো, কিন্তু আমাকে জড়িয়ে ধরতে মা ভয় পায়, মার চোখ দেখে আমি বুঝতে পারি। মা কেনো কোনো পাখির কাছে থেকে কোনো পরীর কাছে থেকে আমার একটি ভাই বা বোন আনলো না, কেনো মা তার পেটের মধ্যে ভাই বা বোন আনলো? এমন কুৎসিত হয়ে উঠলো?

আমি একদিন জিজ্ঞেস করি, মা, তোমার পেটে কী?

মা একটু বিব্রত হয়; পেটটিকে আঁচল দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে বলে, তোর ভাই, নইলে তোর বোন।

আমি বলি, তুমি কেনো পাখি আর পরীর কাছে থেকে ভাইবোন আনলে না?

মা হেসে ওঠে; বলে, পরী আর পাখি কি ভাইবোন দিতে পারে?

আমি বলি, তুমি বলেছিলে পাখি আর পরীর কাছ থেকে আমাকে পেয়েছে।

মা বলে, ছোটোদের তাই বলতে হয়।

আমি বলি, আমাকে পাখি আর পরীর কাছে থেকে পাও নি?

মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, না রে না।

আমি বলি, তাহলে কোথায় পেয়েছিলে?

মা বলে, আমার পেটে, তুইও আমার পেটেই হয়েছিলি।

আমি অন্ধকার দেখতে পাই, কোনো কথা বলতে পারি না; শুধু মায়ের বাহু থেকে বেরোনোর চেষ্টা করি। মা আমাকে আদর করতে চায়, আমাকে বশ করতে চায়।

মা বলে, তুই আমার পেটে খুব লাথি মারতি, তোর লাথি আমার ভালো লাগতো।

আমি বলি, তখনও তুমি এমন কুৎসিত হয়েছিলে?

মা বলে, সবাই বলত আমি সুন্দর হয়েছিলাম।

আমার একটু ভালো লাগে; আমি বলি, তোমার পেটে আমি কীভাবে এসেছিলাম?

মা বলে, তোর বাবা জানে।

বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারবো না, আমি তখনই বুঝতে পারি; বাবা আমাকে কখনো কোনো গল্প বলেন নি। কোনো পাখি আর পরী আনে নি আমাকে? আমি মার পেটে হয়েছিলাম? আমার খুব সুখ লেগেছিলো যখন মা বলেছিলো একটি পাখি আর পরী জ্যোৎস্নারাতে মার কোলে রেখে গিয়েছিলো আমাকে;–মা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলো একটি ফুলের, লাল রঙের ফুল, তার অনেক সুগন্ধ; আর জেগে দেখে মার কোলে আমি ফুটে আছি। মা খুশিতে ভরে গিয়েছিলো, আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়েছিলো। আমার মনে হয়েছিলো আমি পাখি আর পরীর উপহার, আমি আকাশে উড়তে পারবো; আকাশ থেকে আকাশে উড়ে যেতে পারবো, আমার শরীরে সব সময় জ্যোৎস্না থাকবে, আমি মেঘের ওপর দিয়ে ঝড়ের ভেতর দিয়ে উড়ে যেতে পারবো। অনেক দিন আমি পাখি আর পরীর সাথে আকাশে আর মেঘে উড়েছি, ঝড়ে ছুটে চলেছি, জ্যোৎস্নায় ভেসে গেছি। কিন্তু মার নতুন কথা শুনে আমি অন্ধকার দেখতে থাকি; আমি পাখি আর পরীর কেউ নই, আমি অন্ধকারের মার পেটে কোনো আলো আর আকাশ আর ঝড় থাকতে পারে না, সেখানে অন্ধকার আছে বলেই মনে হয় আমার; ওই অন্ধকার থেকে আমি এসেছি। আমার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে। আমার মনে হয় সব কিছু অন্ধকারে গঠিত।

মা এক বিকেলে আমাকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চায়; আমার ইচ্ছে করে না। আমি মাকে বলি বিকেলে বেড়াতে যেতে আমার ভালো লাগে না, আমার খেলতে ইচ্ছে করে, খেলতে আমার ভালো লাগে। মা একলাই বেড়াতে যায়, আমি মাকে দূর থেকে দেখি; মা রিকশায় বসতে পারছে না, পড়ে যাবে বলে আমার মনে হয়। ইচ্ছে হয় ছুটে গিয়ে আমি মাকে ধরি, যাতে মা পড়ে না যায়, কিন্তু আমি ছুটে যেতে পারি না। ওই বিকেলে আমার আর মাঠে যেতে ইচ্ছে করে না, আমি একা বারান্দায় বসে থাকি, বিকেলটা অন্ধকারের মতো আমার ওপর নামতে থাকে। আমার দুটি বন্ধু আমাকে খুঁজতে আসে, ওরা দরোজায় অনেকক্ষণ নাম ধরে ডাকে, আমি সাড়া দিই না। মা, তুমি ঠিকমতো রিকশায় বসতে পারছো তো, আমি মনে মনে বলি; তোমার সাথে বেড়াতে যেতে আমার ইচ্ছে করে না; কিন্তু আমি খেলতে যেতেও পারছি না, খেলতে গেলে সুখে, আমার বুক ভরে উঠবে, সেই সুখ আমার ভালো লাগবে না; তোমাকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু তোমাকে আমার কুৎসিত লাগে, তাই তোমার সাথে আমি যাই নি; নইলে খেলার থেকে তোমার সাথে বেড়াতে যেতেই আমার ভালো লাগে। মার ফিরে আসা পর্যন্ত আমি বারান্দায় বসে থাকি, সন্ধ্যে হয়ে গেলেও পড়ার টেবিলে যাই না, একটা রিকশার ছায়া দেখার জন্যে আমি সন্ত্রস্ত হয়ে থাকি; আর রিকশার ছায়া দেখার সাথে সাথেই পড়ার টেবিলে গিয়ে বসি।

একদিন আমি মাকে জিজ্ঞেস করি, বাবা আজকাল এতো দেরি করেন কেনো?

মা বলে, তার কাজ বেড়ে গেছে।

আমি বলি, কেনো কাজ বেড়ে গেছে?

মা বলে, তুই বুঝবি না।

তখন আমাকে বড়োরা মাঝেমাঝেই বলতো, তুই বুঝবি না, শুনে আমার সুখ লাগতো না; অনেক দুরূহ উত্তর পাওয়া খুব জরুরি মনে হতো, আমি জানতে চাইতাম, তারা বলতো, তুই বুঝবি না; শুনে আমি চুপ করে যেতাম, কিন্তু মার কাছে চুপ করে থাকতে আমার ইচ্ছে করে না। আমার মনে হয় মা যা বুঝতে পারে আমিও তা পারবো। আমার তো মনে হতো মা-ই অনেক কিছু বুঝতে পারে না; তার বুঝতে সময় লাগে, কিন্তু আমি তার আগে বুঝে ফেলি।

আমি বলি, তুমি আমাকে বলল, দেখো আমি বুঝবো; আমি সব বুঝতে পারি।

মা একটু চুপ করে থেকে বলে, আসলে কাজ বাড়ে নি, কাজ আর কী বাড়বে; ঘরে ফিরতে তার ভালো লাগে না।

আমি বলি, কেনো ভালো লাগে না?

মা কোনো কথা বলে না। মাকে নিয়ে বেশ অসুবিধা হচ্ছে আজকাল; সহজে উত্তর দেয় না, চুপ করে থাকে।

আমি আবার জানতে চাই, কেনো ভালো লাগে না?

আমার ভয় হতে থাকে মা আবার বলবে, তুই বুঝবি না; মা তা বলে না; তবে এমন কথা বলে যে আমি ভয় পাই।

মা বলে, তোর বাবা তো তোর মতোই। আমি কুৎসিত হয়ে গেছি, আমাকে দেখতে যেমন তোর ভালো লাগে না, তোর বাবারও ভালো লাগে না। তাই দেরি করে ফিরে।

মার কথা শুনে আমি কেঁপে উঠি, একটা কষ্ট আমার মাথার ভেতর দিয়ে ঢুকে পা পর্যন্ত এসে গমগম করে ওঠে; আমার পায়ের নিচের মাটি আর মাথার ওপরের আকাশ ভেঙেচুরে যেতে থাকে। আমি মনে মনে বলতে থাকি-মা, তোমাকে আর কুৎসিত বলবো না, তোমাকে দেখতে আমার আর কুৎসিত লাগবে না, আমার সুন্দর লাগবে, সবচেয়ে সুন্দর; এবং আমি উঠে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসি, বই খুলে আমি কিছু পড়তে পারি না; আমার মনে, আমি শুনতে পাই, কে যেনো ব’লে চলছে-মা, তোমাকে আমি সুন্দর দেখতে চাই, তোমার সাথে আমি বেড়াতে যেতে চাই, তোমাকে দেখে আমি খুব খুশি হতে চাই। তখনই দেখি মা আমার জন্যে কোরানো নারকেল আর মুড়ি নিয়ে আসছে, মা হাঁটতে পাড়ছে না, তার পা দুটি দু-দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, আর পেটটি মার থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে পড়ে যাচ্ছে; এবং তখনই আমার ঘেন্না লাগে। একবার মনে হয় দৌড়ে গিয়ে মার হাত থেকে বাটি দুটি আমি নিয়ে আসি, মার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার কষ্ট হয়, আমি মার মুখের দিকে তাকাই; মা আমার টেবিলের ওপর বাটি দুটি রাখে। মুখ ঘুরিয়ে মার মুখে আমি একটা ভয়ের ছায়া দেখতে পাই।

মা বলে, তোর জন্যে কুরিয়ে আনলাম।

আমি বলি, আমার তো খাওয়ার ইচ্ছে নেই।

মা বলে, আমার মনে হলো তোর খিধে পেয়েছে।

আমি বলি, না, আমার খিধে পায় নি।

মা বলে, তবু পড়তে পড়তে খা।

আমি বলি, আচ্ছা।

মা চলে যায়, আমার খেতে ইচ্ছে করে না; আমার মনে হয় অন্য যে কেউ এনে দিলে আমার খেতে ইচ্ছে করতো, কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে না। জানালা দিয়ে ওগুলো ফেলে দিতে ইচ্ছে করে, আর তখনই আমি কষ্ট পাই। ওগুলো আমি ফেলে দিই না, একপাশে সরিয়ে রাখি; অনেকক্ষণ পর মা আবার এসে আমার পাশে দাঁড়ায়।

মা বলে, তুই এখনো খাস নি?

আমি বলি, খাওয়ার কথা মনে ছিলো না।

মা বলে, এখন আমি মনে করিয়ে দিলাম, এখন খা।

মা আমার মুখে নারকেল আর মুড়ি তুলে দিতে থাকে, মার জন্যে আমার কষ্ট হয়, আমি খেতে শুরু করি।

মা বলে, খেতে কেমন লাগছে?

আমি বলি, ভালো।

মা বলে, তই অন্য রকম হয়ে যাচ্ছিস।

আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, তুমি এমন হয়ে গেলে কেনো?

ডলিকে গর্ভবতী করতে আমার ইচ্ছে করে না। ওই মসৃণ বস্তু ছাড়া আজো আমি প্রবেশ করি নি, আমার ভয় করে, কোনোদিন পারবো না; ডলি আর আমার মধ্যে মসৃণ বস্তুর দূরত্ব রয়ে গেছে, ওই দূরত্বই আমাকে নির্ভয় রাখে, আমি আমাদের মধ্যে মসৃণ দুর্ভেদ্য দূরত্ব রাখতে চাই। মসৃণ বস্তু নেই, প্রবেশ করছি, ভাবতেই ভেতরে একটা আর্ত চিৎকার শুনতে পাই। ডলির সর্বাঙ্গের স্পর্শ আমাকে উল্লসিত উত্তপ্ত কোমল কাতর সুখী করে, তবু মসৃণ বস্তু ছাড়া আমি প্রবেশ করছি, ভাবতেই মনে হয় আমি অন্ধকারতম। অন্ধকারে ঢুকছি, যেখানে কখনো আলোক ছিলো না, আলো জ্বলবে না, ওই অন্ধকার থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারবো না; ওই অন্ধকারে আমি লুপ্ত হয়ে যাবো। আমি গভীর কৃষ্ণ অন্ধকার দেখতে পাই, অন্ধকারকে আমি বাল্যকাল থেকেই ভয় করি। ডলি বারবার বলে সে-ই ব্যবস্থা নেবে, বটিকা খাবে; আমার সম্পূর্ণ সংস্পর্শ সে পেতে চায়, সে অনুভব করতে চায় মসৃণতাহীন আমার উপস্থিতি, সে বোধ করতে চায় বজ্রপাতের মতো প্রচণ্ড বর্ষণের স্বাদ। আমি তা পেতে চাই না; আমি তার মাংসের সাথে জড়িত হ’তে চাই না। আমার কি ঘেন্না লাগে? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। ডলি বারবার জানায় যখন সে প্লাবিত পলিমাটির মতো বোধ করতে চায়; যখন সে পদ্মার স্রোতে জন্মজন্মান্তর ধরে ভিজতে চায়, হারিয়ে যেতে চায় প্লাবনের তলে, প্লাবন থেকে জেগে উঠতে তার ইচ্ছে করে না, তখন সে, ওই মসৃণ বস্তুর জন্যে, মরুভূমির মতো শুষ্ক বোধ করতে থাকে; সে মরুভূমি হয়ে ওঠে। মরুভূমি হতে তার ভালো লাগে না, সে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি খুব যত্নের সাথে মসৃণ বস্তুটি পরখ করি, কোথাও ফেড়ে গেছে কি না, দেখি; তার ভেতর নিরাপদে ঘোলামলিন শাদা বস্তু রয়েছে দেখে আমি স্বস্তি পাই। ডলি যখন প্লাবিত হওয়ার কথা বলে, আমার মনে পড়ে নর্দমার কথা; কখনো উর্বর জমির কথা। উর্বর জমিতে বীজ ছড়ানোর কথা ভাবলে আমি ভয় পাই, আবাদ করতে আমার সাহস হয় না; নর্দমাও আমাকে অসুস্থ করে তোলে, মলভাণ্ডে নিজেকে বিগলিত করে দিতে আমি ঘেন্না বোধ করি।

ডলি, দেখতে পাই, মৃদু রাজনীতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে; মাকে দলে নিয়ে এসেছে। এতে তার কোনো কষ্ট হয় নি, বুঝতে পারি আমি; সবাই মানুষের পক্ষে; মানুষের কাজ মানুষ উৎপাদন করা, মাও তা বিশ্বাস করে।

মা এক সন্ধ্যায় জানতে চায়, তুমি না কি ছেলেমেয়ে চাও না?

আমি কোনো কথা বলি না। মা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার একই কথা বলে। আমার কোনো উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না, তবে উত্তর ছাড়া মা নড়বে না আমি বুঝতে পারি।

আমি বলি, না।

মা বলে, এটা কেমন কথা?

আমি বলি, ছেলেমেয়ে আমার ভালো লাগে না।

আমার কথা শুনে মা ভয় পায়।

মা বলে, একটা বেড়ালের জন্যে তুমি অনেক দিন কেঁদেছিলে, যখন ছোটো ছিলে, আর এখন তোমার ছেলেমেয়ে ভালো লাগে না?

আমি বলি, বেড়াল আমার এখনো ভালো লাগে।

ডলি বলে, কিন্তু মানুষ তোমার ভালো লাগে না।

আমি বলি, মানুষও আমার কখনো কখনো ভালো লাগে।

মা বলে, আমরা নাতিনাতনি দেখতে চাই, নাতিনাতনি দেখার সখ তো আমাদের আছে।

আমি বলি, কিছু মনে কোরো না মা, ছেলেমেয়ে নাতিনাতনি এসব কথা আমার ভালো লাগে না।

মা বলে, আমার আর তোমার বাবার যদি ছেলেমেয়ে ভালো না লাগতো তুমি হতে কোথা থেকে?

আমি বলি, আমি তো হতে চাই নি।

মা নিস্তব্ধ হয়ে যায়, কোনো কথা বলে না।

ডলি বলে, কিন্তু তুমি হয়েছে আমি হয়েছি, আমাদের থেকে আরো মানুষ হবে। আমি মানুষ হওয়াতে চাই।

আমি বলি, মানুষ হওয়ানোর কথা ভেবে আমি কোনো সুখ পাই না।

ডলি চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু প্রত্যেক রাতেই তো করতে চাও, শুয়োরের মতো সুখ পাও।

আমি বলি, আমি হয়তো শুয়োর, আমার পক্ষে মানুষ জন্ম দেয়া সম্ভব নয়।

ডলি কাঁদে, আমাকে একটি শিশু দাও।

আমি বলি, হয়তো কোনো শুয়োর জন্ম দিয়ে ফেলবো।

ডলি চিৎকার করে, আমাকে একটা শুয়োরই দাও।

মা চলে গেছে, ডলিও চলে গেলে আমি স্বস্তি পেতাম; সে যায় না, তার যাওয়ার কথা নয়, এটা তারই কক্ষ। সে উঠে আলমারি খোলে, আমি বুঝতে পারি না কেনো হঠাৎ আলমারি খুলছে; তবে আলমারি খোলা আমার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে মনে হয় না। তার আলমারি সে খুলবে, তার যদি ইচ্ছে হয় রাত দুপুরে কাতান পরতে, পরবে। ডলি হঠাৎ মসৃণ বস্তুর প্যাকেটগুলো আমার সামনে ছুঁড়ে দেয়, আমি চমকে উঠি, বুঝতে পারি না আমার সামনে এগুলো কী এসে পড়ছে। পাঁচ-ছটি প্যাকেট সে ছুঁড়ে মেরেছে আমার সামনে; বস্তুগুলো মসৃণ হ’লেও মোড়কগুলো অতো মসৃণ নয়, সেগুলো বেশ শব্দ করে আমাকে চমকে দেয়। অল্প পরই আমি বস্তুগুলো চিনতে পারি। ডলি ছুটে এসে একটির পর একটি মোড়ক খুলতে থাকে, খুলে মসৃণ বস্তুগুলো ছেঁড়ার চেষ্টা করতে থাকে। এর আগে ডলি কখনো ওই বস্তু ধরে নি, মোড়ক খোলে নি; আমি শুরুতেই বুঝতে পারি ডলি যদি সবগুলো মোড়ক খুলে সবগুলো বস্তু ছিঁড়ে ফেলতে চায়, তাহলে তার কয়েক সপ্তাহ লাগবে। সে প্রথম নখ দিয়ে মোড়ক খোলার চেষ্টা করে, তার নখ তা পেরে ওঠে না; সে দাঁত দিয়ে মোড়ক কাটার চেষ্টা করতে থাকে, তার দাঁত ওই মোড়ক কাটতে পারে না; তখন সে উন্মত্ত হয়ে ওঠে, একটির পর একটি প্যাকেট খুলে গুচ্ছগুচ্ছ মসৃণ বস্তু বের করতে থাকে, নখ দিয়ে ছেঁড়ার চেষ্টা করতে থাকে, দাঁত দিয়ে কাটতে চায়; কিন্তু একটি মসৃণ বস্তুও সে বের করতে পারে না। সবগুলো জড়ো করে সে পা দিয়ে পিষতে থাকে। ডলি জানে না ওই মসৃণ বস্তুগুলো অবিনশ্বর, মাটির নিচে পুঁতে রাখলে সৌরজগতের ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে; ওগুলোর ক্ষয় নেই, বিনাশ নেই-এজন্যেই ওগুলোকে আমার ভালো লাগে; শুধু আগুনই ওগুলোকে ধ্বংস করতে পারে।

আমি বলি, আমি বের করে দিচ্ছি।

ডলি আমার দিকে তাকায় না।

আমি তার কাছে গিয়ে মোড়ক ছিঁড়ে একটি একটি করে গোলাপি মসৃণ বস্তু তার হাতে তুলে দিতে থাকি; সে টেনে সেগুলো ছেঁড়ার চেষ্টা করে। প্রথমটি ছিঁড়তে না পেরে সেটি ছুঁড়ে দিয়ে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়; সেটিও ছিঁড়তে না পেরে আরেকটি নেয়। সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তার ঘুম পায়; সে মেঝেতে এলিয়ে পড়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি গোলাপি বস্তু আর মোড়কগুলো নিয়ে বাথরুমে ঢুকি; কমোডে গোলাপি বস্তুগুলো ছেড়ে দিয়ে ফ্লাশের পর ফ্লাশ টানতে থাকি। একেকবার হল্লা করে পানি আসতে থাকে; আমার মনে হয় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি গোলাপি মসৃণ শাপলা ভাসছে কমোড়ে, পদ্ম ফুটে আছে কমোডে, তার রঙে কমোড রঙিন হয়ে গেছে;–আমি কি কখনো শাপলা দেখেছি, শুনেছি বিলে শাপলা ফোটে, আমি কি কখনো পদ্ম দেখেছি?–ওগুলোকে ফ্লাশ টেনে মাটির অতলে পৌঁছে দিতে হবে; আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, হল্লা করে পানি আসে, আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, আমার চোখের সামনে হাজার হাজার কুমুদ শাপলা ভাসতে থাকে, আমি ফ্লাশ টানতে থাকি, গোলাপি কুমুদের কোলাহলে আমার রক্ত বিবশ হয়ে যেতে থাকে; মনে হয় পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত ফ্লাশ টেনে যেতে হবে, নইলে এই শাপলাগুলো এভাবেই ভাসতে থাকবে কমোডের সরোবরে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x