নিধা গাঁয়ের মানুষ। প্রতিদিন বিশাল ধূ-ধূ মাঠটা পারাপার করছে এবেলা ওবেলা। হঠাৎই এক ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে মাঠ পার হয়ে বাড়ি আসতে গিয়ে কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। কোথায় বাড়ি? কোথায়ই বা গাঁ? সেই সকালে চাট্টি আমানি পেটে ঢুকেছিল, যাতে ভাতের চেয়ে জলই ছিল বেশি। তিন ক্রোশ পথ হেঁটে টাঙ্গির কোপে জ্বালানী কাঠ জোগাড় করে মাথায় বোঝাটা চাপাবার আগে গলায় ঢেলে নিয়েছিল এক বোতল তরল আগুন। এই আগুন শরীরে না ঢেলে দিলে তিন ক্রোশ পথের আকাশের আগুনকে শরীরকে সামাল দেবে কেমন করে? বেচাল আগুনে হাওয়া ঠেলে চলেছে- সে অনেক্ষণ। এতক্ষণে ছ’ক্রোশ পথ বোধহয় হাঁটা হয়ে গেছে। কিন্তু কোথায় রাংচিতা আর ঢোলকমলির বেড়ায় ঘেরা গাঁয়ের বাড়িগুলো? ভয় ধরে মনে। পথ ভুল হচ্ছে। এত দিনের চেনা পথ, তবে তো ভোলায় ধরেছে। ভোলায় ভুলিয়ে মারতে চায়। গরম গা ভয়ের ঠেলায় ঠান্ডা মেরে যায়। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। জ্বালানির খোঁজে আসা কয়েকটি কিশোরী ও বৃদ্ধা ওঁকে অমন পানা পড়ে থাকতে দেখে দৌড় লাগায় গাঁয়ে। ধাঁ-ধাঁ করে খবরটা ছড়িয়ে পড়ে। নিধাকে গাঁয়ের লোকেরা নিয়ে আসে বাড়ি। কিন্তু এ কোন নিধা? ডাকাবুকো মানুষটা কেমন হয়ে গেছে। হাবার মত চেয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। কোন কিছুই ঠাওর করতে পারছে না। নিধার বউ গোপা অমন অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। নিধার ছেলে-মেয়েগুলো বড়দের ভিড় ঠেলে বাপের কাছে এগুতে সাহস পেল না। অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে সকলের কান্ড-কারখানা দেখছিল। নিধার বাপ হরি বাউড়ি মেলা সোরগোল তুলে চেঁচাল, ‘ওরে নিধাকে ভোলায় ধরেছে, জল নিয়ে আয়।‘ পুরুলিয়া জেলার এমন শুখো জায়গা জলের অভাবে মাটিতে ফাটল ধরে। শীর্ণ গরুগুলো জল-ঘাসের অভাবে ধুঁকছে। তবু জল হাজির হয়। নিধাকে দাওয়ায় কিছুক্ষণ বসিয়ে গায়ের ঘামটা মেরে দাঁড় করিয়ে দেয় পাড়াপড়শীরা। মাথায় জল ঢালা হতে থাকে। তারই মাঝে শ্বশুরের আদেশে নিধার কাপড়ের কসিতে টান মারে গোপা। একেবারে পুরুষ মা কালী। ঠা-ঠা করে হাঁসতে থাকে দু-চারজন মেয়ে মর্দ। নিধা চমকে উঠে গোপার হাত থেকে কাপড় টেনে নিয়ে আব্রু বাঁচাতে তৎপর হয়। গোপার আতঙ্ক দূর হয়। মুখে হাঁসি ফোটে। ‘ভোলা’ ছেড়ে দিয়েছে।

এতক্ষণ যে ঘটনাটি বললাম, তাতে স্মৃতির সঙ্গে সামান্য কল্পনার মিশেল দিয়েছি পাঠক-পাঠিকাদের ভোলায় পাওয়া মানুষটির মানসিকতা বোঝাতে। ঘটনাস্থল পুরুলিয়া জেলার আদ্রা শহরের উপকন্ঠের বাউড়ি পল্লী। ওই মাঠ পার হতে গিয়ে অনেককেই নাকি ভোলায় পেত, শৈশবে এমন গল্প অনেক শুনেছি। আমার জ্যাঠতুতো মেজদাও যখন ষন্ডা চেহারার এক প্রখর জেদি যুবক, তখন এক সন্ধ্যায় ওই মাঠ পার হতে গিয়ে তিনিও নাকি একবার ভোলার পাল্লায় পড়েছিলেন। যে মাঠ অগুণতি বার হতে গিয়ে তিনিও নাকি একবার ভোলার পাল্লায় পড়েছিলেন। যে মাঠ অগুণতি বার পার হয়েছেন, সে মাঠের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুন হরিতকির গাছের কাছে পথ ভুলেছিলেন। এদিক-ওদিক উল্টোপাল্টা ছোটাছুটি করে যখন শীতের সন্ধ্যাতেও ঘেমে নেয়ে একশা তখন সাউথ ইন্সটিটিউটের বনাদা আবিষ্কার করলেন মেজদাকে। বিহ্বল মেজদার গায়ে শীতের রাতেও বালতি বালতি কুয়োর জল ঢালতে দেখেছি।

ভোলায় ধরা যুবতীকে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে তার মাথায় অনবরত জল ঢালতে দেখেছি। আর একগাদা নানা বয়সী নারী-পুরুষের সামনে বয়স্কা মহিলাকে দেখেছি যুবতীটির অনাবৃত স্তন টিপতে। তাদের ধারণা, এই ভাবে বিভিন্ন বয়সী বিভিন্ন সম্পর্কের নারী-পুরুষদের সামনে ভোলায় ধরা মানুষটিকে লজ্জা পাইয়ে দিতে পারলে ভোলায় ধরা ছেড়ে যায়।

পথিকের আত্মবিস্মৃত হওয়া বা ভুলে যাওয়া থেকেই ভোলায় ধরা কথাটি এসেছে। বিশাল ফাঁকা মাঠ অতিক্রম করতে গিয়ে কিছু কিছু সময় কারও কারও দিক বিভ্রম ঘটতেই পারে। ঠা-ঠা রোদ্দুর ও অন্ধকার রাতে এমন ধরনের দিক-বিভ্রম ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। তার ওপর আবার মাঠটির যদি ‘ভোলায় ধরার মাঠ’ হিসেবে কুখ্যাতি থাকে, তবে তো সোনায় সোহাগা। ভোলায় ধরার আতঙ্ক থেকেই তাকে ভোলায় ধরে- ভূতে ধরার মতই। ভোলায় ধরার ভয় আদৌ না থাকলে দিকবিভ্রম ঘটলেও ভোলায় ধরে না কখনোই।

রাত দুপুরে অতি পরিচিত পথ চলতে গিয়ে দিক ভুল করার অভিজ্ঞতা কম বেশি অনেকেরই আছে। ধরুন শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছেন আরও পাঁচটা দিনের মত। রাতের আলো ঝলমল শিয়ালদহ। আপনার সঙ্গী যে দিকে এগুলোক তা দেখে অবাক হলেন। ‘ওদিকে যাচ্ছিস কেন?’ জিজ্ঞেস করতেই জবাব পেলেন, ‘গেট দিয়ে বেরুবো না।‘ আবার আপনার অবাক হওয়ার পালা। গেট আবার ওদিকে কোথায়? ওতো গেটের ঠিক উল্টো দিকে হাঁটছে। আপনি কিছুটা হতভম্ব, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ পায়ে সঙ্গীকে অনুসরণ করতে গিয়ে আবারও অবাক হলেন। অতি স্থির ভাবে মনে হচ্ছে উল্টো দিকে হাঁটছেন কিন্তু মোড় বা পৃথিবীর যে কোনও স্থানেই হতে পারে। এই সাময়িক দিক নির্ণয়ে ভুল করাকেই কিছু কিছু মানুষ ভাবেন- কোনও অতিপ্রাকৃতিক শক্তি তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল মৃত্যুর গভীরে। ভোলায় মারার আগে অন্যের নজরে পড়ায় জীবনটা বেঁচেছে, কিন্তু ভোলায় ধরার পরিণতিতেই এমন স্মৃতিভ্রংশ ঘটেছে।

ভোলা নামক অলীক কিছুর জন্য দিক খুঁজে পাচ্ছে না ভেবে দিক-হারা মানুষটি কেবলমাত্র ভয়েই মারা যেতে পারে। ভয়ে মস্তিষ্ক কোষের ভারসাম্য সাময়িকভাবে নষ্ট হতেও পারে। ‘ভোলায় ধরলে সব ভুলে যায়’ এমন একটা ধারণা শোনা কিছু কাহিনী বা দেখা কিছু ঘটনা থেকে পথিক প্রভাবিত হতেই পারে। প্রভাবিত পথিক যদি তীব্র আতঙ্কে ভাবতে শুরু করেন, আমাকে ভোলায় ভুলিয়ে নিয়ে ঘোরাচ্ছে, আমাকে হয় মেরে ফেলবে নতুবা সব কিছু ভুলিয়ে দেবে- তবে পথিকের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যেমন বন্ধ হতে পারে, তেমনই ঘটতে পারে সাময়িক স্মৃতিভ্রংশের ঘটনা।

আবারও বলি দিক বিভ্রমের মত ঘটনাকে ভোলায় ধরার মত অতিপ্রাকৃত ঘটনা বলে ভয় না খেলে মৃত্যু বা স্মৃতিভ্রংশতা দেখা দেয় না কখনোই।