বিশ্বজগত এখনো দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাসের ভিত্তির উপর। গত তিন শতকে বিজ্ঞান বেশ এগিয়েছে, পৃথিবীকে মহাজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছে এক গৌণ এলাকায়, মহাজগতকে এক বদ্ধ এলাকার বদলে ক’রে তুলেছে অনন্ত; এবং মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, অমৃতের পুত্র প্রভৃতিআত্মগর্বিত সুভাষণ থেকে বিচ্যুত করে পরিণত করেছে নগ্ন বানরে; কিন্তু মানুষের চেতনায় বিশেষ বদল ঘটে নি। মানুষ আজো আদিম। মানুষের চোখে আজো সব কিছুই অলৌকিক রহস্যে পরিপূর্ণ; আকাশে আজো তারা অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জ  বা নিরন্তর বিস্ফোরিত গ্যাস কুন্ডের বদলে দেখতে পায় বিভিন্ন বিধাতা; দেখতে পায় মনোরম স্বর্গ আর ভীতিকর নরক। সভ্যতার কয়েক হাজার বছরে মানুষ মহাজগতকে উদঘাটিত করার বদলে তাকে পরিপূর্ণ করেছে অজস্র রহস্যে, ধারাবাহিকভাবে ক’রে চলছে বিশ্বের রহস্যীকরণ; বা সত্যের অসত্যীকরণ। মহাজগতের রহস্যীকরণে অংশ নিয়েছে মানুষের প্রতিভার সব কিছুঃ পুরাণ, ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, এবং আর যা কিছু আছে। তার শক্তির সব কিছুই মানুষ ব্যবহার করেছে মজাজগতকে রহস্যে ভরে তুলতে; তাকে পরিচিত করার বদলে করে তুলেছে অপরিচিত, আলোকিত করার বদলে করেছে তমসাচ্ছন্ন। আদিম মানুষ যখন রহস্যীকরণ শুরু করেছিলো, তার কোন দূরভিসন্ধি ছিল না, সে শুধু গিয়েছিল ভুল পথে; কিন্তু পরে সমাজপ্রভুরা দেখতে পায় বিশ্বের সত্য বের করার বদলে তাকে রহস্যে বোঝাই ক’রে তুললেই সুবিধা হয় তাদের। মহাজগতের রহস্যীকরণে ধর্ম নেয় প্রধান ভূমিকা; তার কাজ হয়ে ওঠে রহস্যবিধিবদ্ধকরণ, আলো সরিয়ে অন্ধকার ছড়ানো, মানুষের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি করা সে-সব সম্বন্ধে যা সম্পূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন। ওই রহস্যের পায়ের নিচে নানা তাত্ত্বিক কাঠামো স্থাপন করে দর্শন, জন্ম দেয় বহু বিখ্যাত ধাঁধাঁ, করে রহস্যের দর্শনীকরণ। দর্শনের লক্ষ্য ছিল সত্য আবিষ্কার, কিন্তু দর্শন আসলে বেশি সত্য বের করতে পারে নি; কিন্তু মিথ্যে প্রতিষ্ঠায় তারা আজ অতুলনীয়। প্লাতো-আরিস্ততল সত্য বের করেছেন খুবই কম, তবে মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিপুল। সাহিত্য ও শিল্পকলা রহস্যকে রূপময় করে তীব্র আবেগের সাথে সঞ্চার করেছে মানুষের  মনে। বিশ্বসাহিত্যের বড় অংশই দাঁড়িয়ে আছেভুল ভিত্তির ওপর। তাই মহাজগত এখনো রহস্যময়; মহাজগতকে এখনো বোঝার উপায় হচ্ছে বিশ্বাস। এই রহস্যময়তা ও বিশ্বাস ক্ষতিকর মানুষের জন্যে; এখন দরকার মহাজগত ও মানুষের মনকে অলৌকিক রহস্য থেকে উদ্ধার করা, অর্থাৎ দরকার মহাজগতের বিরহস্যীকরণ। মানুষের জন্যে যা কিছু ক্ষতিকর, সেগুলোর শুরুতেই রয়েছে বিশ্বাস; বিশ্বাস সত্যের বিরোধী, বিশ্বাসের কাজ অসত্যকে অস্তিত্বশীল করা। বিশ্বাস থেকে কখনো জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না; জ্ঞানের বিকাশ ঘটে অবিশ্বাস থেকে, প্রথাগত সিদ্ধান্ত দ্বিধাহীনভাবে না মেনে তা পরীক্ষা করার উৎসাহ থেকে। বাংলার মহাপুরুষগণ, বিদ্যাসাগর ও আরো দু-একজন বাদে, সবাই বিশ্বাসী; তাঁরা আমাদের জন্য সৃষ্টি করে গেছেন ভুল কল্পজগত। রাজনীতিবিদেরা আজ মেতে উঠেছে বিশ্বাস ও মিথ্যের প্রতিযোগিতায়। তারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর মানবগোত্র। আমার অবিশ্বাস –এ সাতটি প্রবন্ধ রয়েছে, তবে বইটি  প্রবন্ধের বই নয়; আমি ধারাবাহিকভাবে একটি বই-ই লিখতে চেয়েছিলাম, তবে পাঠকদের কথা ভেবে বইটিকে সাত শিরোনামে ভাগ করে দিলাম। আমি আনন্দিত যে বইটি বিপুল সাড়া জাগিয়েছে, বাঙ্গালির বিশ্বাসের মেরুদন্ডে কিছুটা ফাটল ধরাতে পেরেছে। সংশোধিত এ-সংস্করণে শুদ্ধ করে দেয়া হল কয়েকটি মুদ্রণ ত্রুটি, বদল করা হল একটি বাক্য, কবিতার অনুবাদেও বদল করা হল কয়েকটি শব্দ। নতুন অক্ষরে বইটি এবার বিন্যস্ত হল ব’লে কয়েকটি পাতা কমলো, কিন্তু আর কিছু ক্মে নি, বরং কিছুটা বেড়েছে।

হুমায়ুন আজাদ

১৩ই ফুলার রোড

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা

৪ আষাঢ় ১৪০৪: ১৮ জুন ১৯৯৭

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x