প্রথম প্রকাশঃ

অগ্রহায়ণ, ১৩৪৭

 

প্রকাশকঃ ময়ুখ বসু

বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রীট

কলিকাতা- ১২

 

মুদ্রকঃ

শিশির কুমার সরকার

শ্যামা প্রেস

২০ বি, ভুবন সরকার লেন,

কলিকাতা- ৭

 

প্রচ্ছদ শিল্পীঃ

রবীন দত্ত

 

 

(এক)

আজাহেরের কাহিনী কে শুনিবে?

কবে কোন্ চাষার ঘরে তার জন্ম হইয়াছিল, কেবা তার মাতা ছিল, কেবা তার পিতা ছিল, সে কথা আজাহের নিজেও জানে না। তার জীবনের অতীতের দিকে যতদূর সে চাহে, শুধুই অন্ধকার আর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের এক কোণে আধো আলো আধো ছায়া এক নারী-মূর্তি তার নয়নে উদয় হয়। তার সঙ্গে আজাহেরের কি সম্পর্ক তাহা সে ভাল করিয়া বুঝিতে পারে না কিন্তু সেই নারী-মূর্তিটি বড়ই করুণ, বড়ই মমতাময়ী। তার কথা ভাবিতে আজাহেরের বড়ই ভাল লাগে। তার মনে বলে সেই করুণ নারী-মূর্তিটি অবলম্বন করিয়া সে যেন অনেক স্নেহের,অনেক মমতার সম্পর্ক পাতাইতে পারে। কিন্তু দিন উপার্জন করিয়া যাহাকে পেটের অন্ন জোগাইতে হয়, এ সব ভাবিবার অবসর তার কোথায়? সংসারে নানা কাজের নিষ্পেষণে সেই নারী-মূর্তিটি কোন্ অনন্ত অন্ধকারে মিলাইয়া যায়।

গ্রামের ফকির সারিন্দা বাজাইয়া গান করে :

নাইকা মাতা, নাইকা পিতা, নাইকা সোদ্দের ভাই,
সেঁতের শেহলা হয়া ভাসিয়া বেড়াই।

তেমনই স্রোতের শেহলার মত সে ভাসিয়া আসিয়াছে। এক ঘাট হইতে আর এক ঘাটে, এক নদী হইতে আর এক নদীতে। যতদূর তার মনে পড়ে সে কেবলই জানে, এর বাড়ি হইতে ওর বাড়িতে সে আসিয়াছে; ওর বাড়ি হইতে আর একজনের বাড়িতে সে গিয়াছে। কেহ তাহাকে আদর করিয়াছে–কেহ তাহাকে অনাদর করিয়াছে, কিন্তু সবাই তাহাকে ঠকাইয়াছে। খেত-খামারের কাজ করাইয়া, গরু বাছুরের তদারক করাইয়া মনের ইচ্ছামত সবাই তাহাকে খাটাইয়া লইয়াছে। সে যখন বেতন চাহিয়াছে তখন গলাধাক্কা দিয়া বাড়ির বাহির করিয়া দিয়াছে।

এমনি করিয়া নানা লোকের কাছে ঠকিতে ঠকিতে এখন তার বয়স পঁচিশের কোঠায়। আর সে কাহারো কাছে ঠকিবে না। নিজের বেতন ভালমত চুকাইয়া না লইয়া সে কারো বাড়িতে কাজ করিবে না–কিছুতেই না। এই তার প্রতিজ্ঞা।

কিন্তু নিজের বেতন চুকাইয়া লইয়া সে কি করিবে? তার মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, ছোট একটি বোনও নাই। বেতনের টাকা লইয়া সে কার হাতে দিবে?

সবারই বাড়ি আছে–ঘর আছে। ঘরে বউ আছে। আচ্ছা এমন হইতে পারে না? মাঠটির মাঝখান দিয়া পথটি চলিয়া গিয়াছে–সেই পথের শেষে, ওই যে গ্রামখানা, তারই এক কোণে ছোট্ট একখানা ঘর,নল-খাগড়ার বেড়া। চার ধারের মাঠে সরিষার ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে–সেই ছোট্ট ঘরখানিতে ঘোমটা পরা একটি বউ। ভাবিতে আজাহেরের মুখখানা লজ্জায় রাঙা হইয়া যায়। ঘোমটা পরা একটি বউ, না-ফর্সা, না-কালো, না-সুন্দর, না-কুৎসিত। এ সকল সে চিন্তাও করে না। একটি বউ–সমস্ত সংসারে যে শুধু তাকেই আপন বলিয়া জানে। বিপদে আপদে যে শুধু তাকেই আশ্রয়দাতা বলিয়া মনে করে; এমনই একটি বউ যদি তার হয়! ভাবিতে ভাবিতে তার দেহ-মন উৎসাহে ভরিয়া উঠে। যেমন করিয়াই হোক সে তিনকুড়ি টাকা জোগাড় করিবেই। টাকা জোগাড় হইলেই সে মিনাজদী মাতব্বরের বাড়ি যাইবে। মাতব্বর টাকা দেখিলেই তার একটি বিবাহের। বন্দোবস্ত করিয়া দিবে। তিনকুড়ি টাকার আড়াই কুড়ি টাকা সে ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করিয়া ফেলিয়াছে, আর দশ টাকা হইলেই তিনকুড়ি টাকা হয়।

গ্রামের চাষীদের যখন কাজের বাড়াবাড়ি তখন তাহারা বেতন দিয়া পৈড়াত বা জন খাটায়। আজাহের এইরূপ পৈড়াত বেচিয়া জীবিকা নির্বাহ করে। সারাদিন গৃহস্থ বাড়ি কাজ করে, তাহাতে চার আনা করিয়া সে পায়। এমনই করিয়া যদি তাহার উপার্জন চলে তাহা হইলে আর চল্লিশ দিন পরে তাহার হাতে দশ টাকা হইবে। আড়াইকুড়ি আর দশ,–তিনকুড়ি। কিন্তু আরও চল্লিশ দিন পরে–আরও একমাস দশদিন পরে–সে কত দূর? দুই হাতে টানিয়া টানিয়া সে যদি দিনগুলিকে আরও আগাইয়া আনিতে পারিত?

সারারাত জাগিয়া জাগিয়া আজাহের পাটের দড়ি পাকায়। বাঁশের কঞ্চি দিয়া ঝুড়ি তৈয়ার করে। এ সব বিক্রি করিয়া সে যদি আরও চার পাঁচ টাকা বেশী জমাইতে পারে; তবে মাতব্বরের নির্দিষ্ট তিনকুড়ি টাকা জমাইতে তাহার আরো কয়েকদিন কম সময় লাগিবে।

আজাহের দ্বিগুণ উৎসাহের সঙ্গে কাজ করে। কাজকর্মের মধ্যে যখন একটু ফুরসৎ পায়–সামনের তাঁতীপাড়ার রহিমদ্দী কারিকরের বাড়িতে যাইয়া সে বসে। লাল, হলুদ, নীল, কত রঙের শাড়ীই না কারিকরেরা বুনাইয়া চলিয়াছে। কোথাও গাছের গোড়ার সঙ্গে নানা রঙের তেনা বাধিয়া মাজন দিতেছে। ফজরের রঙীন মেঘ আনিয়া এখানে কে যেন মেলিয়া ধরিয়াছে। বেহেস্ত হইতে লাল মোরগেরা যেন এখানে আসিয়া পাখা মেলিয়া দাঁড়াইয়া আছে। চাষার ছেলে আজাহের–সে অত শত ভাবিতে পারে না। শাড়ীগুলির দিকে সে চাহিয়া থাকে–আর মনে মনে ভাবে এর কোন্ শাড়ীখানা তার বউকে মানাইবে ভাল। মনে মনে ভাবিতে ভাবিতে তার মনটি শাড়ীরই মত রাঙা হইয়া ওঠে।

রহিমদ্দী কারিকর তার মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করে, “আরে কি মনে কইরা, আজাহের? বইস, বইস। তামুক খাও।”

ঘরের বেড়ার সঙ্গে লটকান কোটি লইয়া কলিকার উপরে ফুঁ দিয়া প্রথমে আজাহের কলিকার ছাইগুলি উড়াইয়া দেয়। তারপর কলিকার গুলটুকু ভাল জায়গায় ঢালিয়া রাখিয়া কলিকার মধ্যে খানিকটা তামাক ভরিয়া অতি সন্তর্পণে সেই গুলটুকু নিপুণ হস্তে তাহার উপর সাজাইয়া দেয়, যেন এতটুকুও নষ্ট না হইতে পারে। তাহার উপরে সুন্দর করিয়া আগুন ধরাইয়া রহিমদ্দী কারিকরের দিকে কোটি বাড়াইয়া ধরে।

কারিকর বলে–”আরে না, না, তুমি আগে টাইনা ধূমা বাইর কর।”

কারিকর যে তাকে এতটা খাতির করিয়াছে, আগে তাকে তামাক টানিতে বলিয়াছে এ যে কত বড় সম্মান! আজাহেরের সমস্ত অন্তর গলিয়া যায়। সে রহিমদ্দীর দিকে কোটি আরও বাড়াইয়া বলে, “কারিকরের পো, তা কি অয়? মুরব্বি মানুষ। তুমি আগে টাইনা দাও।”

খুশী হইয়া কারিকর হুঁকোটি হাতে লইয়া টানিতে আরম্ভ করে, তার তত চলা বন্ধ হয়। তামাক টানিতে টানিতে রহিমদ্দী জিজ্ঞাসা করে, “তা কি মনে কইরা আজাহের?”

যে কথা মনে করিয়া সে আসিয়াছিল লজ্জায় সে কথা আজাহের কিছুতেই বলিতে পারে না। অন্য কথা পাড়ে, “তা চাচা, একটা গীদ-টীদ গাও না শুনি? অনেক দিন গীদ শুনি না, তাই তুমার কাছে আইলাম।”

রহিমদ্দী খুশী হয়। তার গান শোনার জন্য ওই ও-পাড়া হইতে একজন এ-পাড়ায় আসিয়াছে, একি কম সম্মানের কথা! থাক না হয় আজ তাঁতের কাজ বন্ধ। রহিমদ্দী গান আরম্ভ করে। আমির সাধুর সারিন্দার গান। নদীর ঘাটে স্নানে যাইতে আমির সাধুর বউ বেলোয়া-সুন্দরীকে মগ জলদস্যুরা ধরিয়া লইয়া গিয়াছে। পাগলের বেশে আমির সাধু তার সন্ধান করিয়া দেশে দেশে ফিরিতেছে। আমির সাধু সারিন্দা বানাইল–ছাইতানের কাঠ, নীলা ঘোড়ার বাগ। অপূর্ব সারিন্দা। নীলা ঘোড়ার বাগ বাকাইয়া সে সুর ধরিল?

“প্রথমে বাজিলরে সারিন্দা আমির সাধুর নামরে;
হারে তারিয়া নারে।”

আমির সাধু সেই সারিন্দা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। আবার সে নতুন করিয়া সারিন্দা গড়িয়া তাহাতে সুর দিল ।

“তারপর বাজিলরে সারিন্দা–দেশের রাজার নামরে;
হারে তারিয়া নারে।”

তবু সেই সারিন্দা ও আমির সাধু ভাঙ্গিয়া ফেলিল। এবার আরো সুন্দর করিয়া অতি নিপুণ হস্তে ধনষ্টরী পাখির হাড় তাহাতে বসাইয়া, নীলা ঘোড়ার বাগ আরো বাঁকাইয়া সেই সারিন্দায় আবার সুর ধরিল। হেলিয়া দুলিয়া সারিন্দা বাজিয়া উঠিল,

“তারপর বাজিলরে সারিন্দা বেলোয়া সুন্দরীরে!
হারে তারিয়া নারে।”

এবার আমির সাধু খুশী হইল। সেই সারিন্দা বাজাইয়া আমির সাধু নদীর কিনারা দিয়া চলে। এ-দেশে সে-দেশে নানান দেশে সে ঘুরিয়া বেড়ায়। তার হাতের সারিন্দা গুমরিয়া গুমরিয়া কাঁদিয়া উঠে,–

“আজ কোথায় রইল আমার বেলোয়া সুন্দরীরে–”

গানের পর গান চলিতে থাকে। দুপুরের বেলা গড়াইয়া পড়ে। স্নানের বেলা যায়। তবু তাদের নেশা থামে না। আজাহের মনে মনে ভাবে সে নিজেই যেন আমির সাধু, তার সেই অনাগত বউ-এর খোঁজে সে যেন এমনি করিয়া সারিন্দা বাজাইয়া বাজাইয়া ফিরিতেছে।

রহিমদ্দীর বউ ঘরের আড়াল হইতে কয়, “বলি আমাগো বাড়ির উনি কি আইজ দিন ভইরা গীদই গাবি নাকি? ওদিক যে বাত জুড়ায়া গ্যালো!”

রহিমদ্দী তাড়াতাড়ি স্নান করিতে রওয়ানা হয়। স্নানের ঘাট পর্যন্ত আজাহের তার সঙ্গে সঙ্গে যায়। কিছুতেই কথাটা সে ভালমত করিয়া গুছাইয়া বলিতে পারে না। কোথাকার লজ্জা আসিয়া সমস্ত মুখখানা চাপিয়া ধরে। রহিমদ্দী পিছন ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করে, “কিরে আজাহের, আর কুনু কতা আছে নাকি?”

আজাহের বলে,–“তুমি যে ওই লালে আর নীলে মিশায়া একখানা শাড়ী বুনাইছাও না? পাইড়ে দিছাও সোনালী সূতা, ওখানার দাম কতো?”

“তা তুই কাপড় দ্যা করবি কি? বিয়া ত করিস নাই?”

লজ্জায় একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়াই আজাহের বলে, “বিয়া ত একদিন করবই।”

রহিমদ্দী হাসিয়া উত্তর করে, “তা যহন তোর বিয়া অবি, কাপড় নিয়া যাইস। তোর কাপড়ের দামে আট আনা কম নিব।” কৃতজ্ঞতায় আজাহেরের সমস্ত অন্তর ভরিয়া ওঠে।

রহিমদ্দী স্নান করিতে নদীতে নামে। তাঁতীপাড়া এখন নিস্তব্ধ। তাঁতীরা কেহ স্নান করিতে গিয়াছে, কেহ স্নান করিয়া কাঠের চিরুণী দিয়া মাথা আঁচড়াইতেছে। কেহ খাইতে বসিয়াছে। বাড়ির বাহিরে রঙ বেরঙের কাপড় মাড় লাগাইয়া গাছের ডালে বাধিয়া রৌদ্রে শুখাইতে দেওয়া হইয়াছে।

আজাহের কাপড়গুলির পানে চায়, আর মনে মনে চিন্তা করে, কোন্ কাপড়খানা তার বউকে মানাইবে ভাল। তার বউ যদি ফর্সা হয়, একেবারে সরষে ফুলের মতো ফর্সা, তবে ওই নীলের উপর হলুদের ডোরাকাটা শাড়ীখানা সে তার জন্য কিনিয়া লইবে। কিন্তু বউ যদি তার কালো হয়, তা হোক, ওই যে কালোর ওপর লাল আর আছা হলুদের। ফুল-কাটা পাড়ের শাড়ীখানা, ওইখানা নিশ্চয় তার বউকে মানাবে ভাল। আচ্ছা, বরান খার মেয়ে আসমানীর মত পাতলা ছিপছিপে যদি তার গায়ের গড়ন হয়, তবে ওই যে পাড়ের উপর কলমীফুল আঁকা শাড়ীখানা, ওইখানা তার বউ-এর জন্য কিনিলে হয় না? কিন্তু তার বউ যদি দেখিতে খারাপ হয়? তা যেমন কেন হোক না, তাঁতীপাড়ার সব চাইতে সুন্দর শাড়ীখানা সে তার বউ এর জন্য কিনিয়া লইবে। একটা বউ তার হইলেই হয়। রাঙা শাড়ীর ঘোমটার আড়ালে সে তার মুখখানা ঢাকিয়া বাড়ির উঠানে ঘুরিবে ফিরিবে। কি মজাই না হইবে! শিস দিয়া গান গাহিতে গাহিতে আজাহের তাঁতীপাড়া ছাড়িয়া চাষীপাড়ার দিকে যায়।