(ঊনচল্লিশ)

দিনে দিনে হায়রে ভাল দিন চইলা যায়। বিহানের শিশির ধারা দুপুরে শুখায়। বারো জঙ্গ করে মদ্দ কিতাবে খবর, তের জঙ্গ লেখা যায়রে টঙ্গির শহর। জেলা স্কুল হইতে পাশ করিয়া বছির ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ হইতে জলপানি পাইয়া আই, এস, সি, পাশ করিয়া বিলাত চলিল জীবাণু বিদ্যার উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করিতে। এত পথ সে কি করিয়া পার হইবে? কোন-জাহাজের খালাসী হইয়া যাইবে। বিলাতে যাইয়া সে প্রথমে সিলেটিদের হোটেলে কাজ করিবে? তারপর সুযোগ মত পড়াশুনা করিবে।

তার জীবনের সুদীর্ঘ কাহিনীর সঙ্গে কতক তার নিজের অক্লান্ত তপস্যা, কতক তার অভাব অনটনকে জয় করার অপরিসীম ক্ষমতা মিশিয়া রহিয়াছে। তাহার সঙ্গে আরও রহিয়াছে তাহার অশিক্ষিত গ্রামবাসীদের শুভকামনা। তাই তাহার এই সাফল্যে সমস্ত গ্রাম গৌরবান্বিত।

রাত্রে গ্রামের সকল লোক আসিয়া জড় হইল তাহাদের উঠানে। গরীবুল্লা মাতবর, তাহের লেংড়া, মাকিম, তমু সকলের আগে আসিল।

গরীবুল্লা মাতবর বলিল, “তা বাবা বছির! তুমি আমাগো গিরামের নামডা আসমানে। উঠাইলা। বিদ্যাশে বিভূঁইয়ে চলছাও। আমাগো কথা মনে রাইখ।”

বছির উত্তর করিল, “চাচা! আমার জীবনের যত সুখ্যাতি তার পিছে রইছে আপনাগো দোয়া আর সাহায্য। আপনারা যদি আমারে সাহায্য না করতেন তয় আমি এতদূর যাইতি পারতাম না। ফইরাতপুরির ইস্কুলে পড়নের সময় যহন বাজান গামছায় বাইন্দা পাটালী গুড় নিয়া গ্যাছে আর আমারে কইছে, মাতবরের বউ দিছে তোরে খাইবার জন্যি; তহন আমার মনে যে কত কথার উদয় হইতে তা আপনাগো বুজাবার পারব না। গিরামের সবাই আমারে কিছু না কিছু সাহায্য করছে। আপনারা সগলে চান্দা তুইলা আমার পড়ার খরচ দিছেন। আপনাগো উপকারের পরিশোধ আমি কুনুদিন দিতি পারব না।”

গরীবুল্লা মাতবর বলিল, “বাজান! তোমার কুনু পরিশোধ দিতি অবি না। তুমি সগল। বিদ্যা শিখা বড় হয়া আইস, তাতেই আমাগো পরিশোধ হবি।”

আজাহের আওগাইয়া আসিয়া বলিল, “ওসব পরিশোধের কথা আমি বুজি না। আমাগো গিরামের লোক অর্ধেক হয়া গ্যাল ম্যালোয়ারী জ্বরে। তুই বিলাত গুণা ম্যালোয়ারী জ্বরের ওষুধ শিহা আসতি পারবি কিনা তাই সগলরে ক? এমুন দাওয়াই শিহা আসপি যা খাইলি কাউরও ম্যালোয়ারী অবি না।”

বছির উত্তর করিল, “আমি ত ম্যালোয়ারী জ্বরের উপর গবেষণা করতিই বিলাত যাইতাছি। আপনারা দোয়া করবেন, আমি যেন সগল কাম হাছিল কইরা আসতি পারি। দ্যাশে আইসা অনেক কাম করতি হবি। এই গিরামে একটা ইস্কুল অবি। একটা হাসপাতাল অবি। আর অবি একটা কৃষি বিদ্যালয়। আরো অনেক কিছু করতি অবি। তার। আগে আমার বড় ঐতি অবি। অনেক টাহা উপার্জন কইরা তবে এই সব কামে হাত দিতি। অবি।”

গরীবুল্লা মাতবর বলিল, “বাবা বছির! আমরা সগলে দোয়া করি তোমার মনের ইচ্ছা যেন হাসেল হয়।”

গ্রামের সকলে একে একে বিদায় হইয়া চলিয়া গেল। হুঁকো টানিতে টানিতে আজাহের ছেলেকে বলিল, “বাজান! আর কয়দিন পরে তোমার বিলাত যাইতি অবি?”

বছির উত্তর করিল, “আরও পনর দিন পরে আমাকে রওয়ানা ঐতি অবি।”

“বাজান! একটা কতা আমাগো মনের মদ্দি অনেকদিন দইরা আনাগোনা করতাছে। আইজ তোমারে কইবার চাই। মাতবরের ম্যায়া ফুলীরে ত তুমি জানই। আমাগো দুইজনের ইচ্ছা, ফুলীরে বউ কইরা গরে আনি। মাতবরেরও মনে বড় আশা।”

বছিরের মা সামনে বসিয়া বসিয়া সুতলী পাকাইতেছিল। সে কান পাতিয়া রহিল বছির কি উত্তর করে।

বছির বলিল, “বাজান! আমার জীবনডারে আগে গইড়া নিতি দ্যান। এহন আমি কাটার উপর দিয়া পথ চলতাছি। আপনারা জানেন না এই লেহাপড়া শিখতি আমারে কত দুস্কু কষ্ট সইতি ঐছে। আইজ আমার কাছে বিয়া করার কথা একটা হাসি-তামাসার মত মনে হয়।”

বছিরের মা বলিল, “বাবা বছির! তুই না করিস না। ফুলুরে গরে আইনা আমি .. আমার বড়র শোগ পাশরি। বড়র বড় আদরের সাথী ছিল ফুলু।”

বছির নত হইয়া উত্তর করিল, “মা! আমি যাইত্যাছি সাত সমুদ্র তের নদীর উপারে। বাজান যা কামাই করে তাতে তোমাগো দুইজনের খাওনই জোটে না। এর উপর আমার একটা বউ আইলে তারে তোমরা কেমন কইরা খাওন দিবা?”

আজাহের বলিল, “আমাগো কি খাওন দিবার শক্তি আছেরে বাজান? খাওন আল্লায় দিব।”

বছির উত্তর করিল, “না বাজান! আল্লায় খাওন দেয় না। মানুষের খাওন মানুষের জোগাড় কইরা নিতি অয়। তোমাগো পায়ে ধরি, তোমরা আর আমারে এ সগল কথা কইও না।”

আজাহের বুঝিল ছেলের এখন বিবাহ করিবার ইচ্ছা নাই। ছেলে লেখাপড়া শিখিয়াছে। বই পুস্তক পড়িয়া তার অনেক বুদ্ধি হইয়াছে। সে যাহা বুঝিয়াছে হয়ত তাহাই তাহার পক্ষে ভাল। তাই বউকে বলিল, “বছিরের মা! তুমি ওরে আর পীড়াপীড়ি কইর না। ও লেহাপড়া শিখ্যা মানুষ হয়া আসুক। তখন ওর বউ ও নিজেই বাইছা নিতি পারবি।”

রাত অনেক হইয়াছে। বছির শুইয়া পড়িল। মা বছিরের পাশে শুইয়া পাখার বাতাস করিতে লাগিল। ছেলে আর মাত্র পনরটা দিন তাহার কাছে থাকিবে। তারপর চলিয়া যাইবে সেই কত দূরের দেশে। সেখান হইতে কবে ফিরিতে পারিবে কে জানে? ছেলের ফেরার আগে যদি মায়ের মরণ হয়, তবে ত মরিবার আগে ছেলের মুখ দেখিতে পাইবে না! তবুও যাক–ওর জীবনের উদ্দেশ্য সফল করিয়া দেশে ফিরিয়া আসুক। ছেলেকে বাতাস করিতে করিতে মায়ের কত কথাই মনে পড়ে। ও যখন এতটুকু ছিল। শেষ রাত্রে জাগিয়া উঠিয়া খেলা করিত। তারা স্বামী স্ত্রী দুইজন ছেলের দুই পাশে বসিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিত। ভাঙা ঘরের ফাঁক দিয়া চাঁদের আলো আসিয়া ছেলের মুখে পড়িত। ভাবিতে ভাবিতে মা স্বপ্ন দেখে বছির যেন আবার এতটুক হইয়া গিয়াছে। পাঠশালা হইতে ফিরিয়া আসিয়াই তাহার ঘরের মেঝেয় বসিয়া পিঠা খাইতেছে। তারপর সে বড় হইয়া শহরে গেল লেহাপড়া করিতে। কে যেন যাদুকর বছিরের বিগত জীবনের সমস্ত কাহিনী পুতুল নাচের ছবিতে ধরিয়া মায়ের চোখের সামনে মেলিয়া ধরিয়াছে।

পরদিন সকালে ভোরের পাখির কলকাকলীতে বছিরের ঘুম ভাঙিয়া গেল। উঠিয়া মুখ হাত ধুইয়া বেড়াইতে বাহির হইবে এমন সময় ফুলী আসিয়া উপস্থিত। এতদিন সে ফুলীর চেহারার দিকে লক্ষ্য করে নাই। তার মৃত বোন বড়ুরই প্রতীক হইয়া সে তাহার মনের স্নেহধারায় সিঞ্চিত হইত। তাহা ছাড়া নানা অভাব-অভিযোগ, দৈন্য-অবহেলার সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াই তাহার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়া গিয়াছে। কোন মেয়েকে সুন্দর বলিয়া দেখিবার সময় তাহার কখনো হয় নাই। সেই ছোটবেলা হইতে ফুলীকে যেমনটি দেখিত, তাহার মনে হইত সে যেন তেমনটিই রহিয়াছে। কাল পিতার নিকট ফুলীর সঙ্গে তাহার বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখান করিয়া আজ ফুলীকে সে নতুন দৃষ্টি লইয়া দেখিল।

মরি! মরি! কি লাবণ্যই না ফুলীর সারা দেহে ফুটিয়া উঠিয়াছে। কে যেন দীঘির কলমী ফুলটি আনিয়া তাহার সুন্দর হাসিভরা মুখে ভরিয়া দিয়াছে। হলুদে আর লালে মেশান অল্প দামের শাড়ীখানা সে পরিয়া আসিয়াছে। সেই শাড়ীর আড়াল হইতে তার হলুদ রঙের বাহু দুইখানা যেন আকর্ষণের যুগল দুইখানা ধনু তাহার দিকে উদ্যত হইয়া রহিয়াছে। মুগ্ধ হইয়া বছির অনেকক্ষণ তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। এই চাঁদ হয়ত আকাশ ছাড়িয়া আজ তাহার আঙিনায় আসিয়া খেলা করিতেছে। হাত বাড়াইলেই তাহাকে ধরা যায়; তাহাকে বুকের অন্ধকার ঘরের প্রদীপ করা যায়; কিন্তু বিলম্ব করিলে এই চাঁদ যখন আকাশে চলিয়া যাইবে, তখন শত ডাকিলেও আর ফিরিয়া আসিবে না। কিন্তু বছির এ কি ভাবিতেছে! তার জীবনের সম্মুখে যে সুদীর্ঘ পথ এখনও পড়িয়া রহিয়াছে। সে পথে কত বিপদ, কত অভাব-অনটন, তার গতিধারা সে ত এখনও জানে না। সে জীবন পথের যোদ্ধা। সংগ্রাম শেষ না হইলে ত তাহার বিশ্রাম লইবার ফুরসত হইবে না।

এই সরলা গ্রাম্য-বালিকার মনে সে যদি আজ তার প্রতি এতটুকুও আকর্ষণের ফুল ফুটিবার সুযোগ দেয় তবে যে জাহান্নামেও তার স্থান হইবে না।

ফুলী অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিল, “কি বছিরবাই! কথা কও না ক্যান? কাল । রাইতিই আমি তোমার সঙ্গে দেখা করবার আসত্যাছিলাম।”

বছির বলিল, “মা ওইখানে পাকের ঘরে আছে। যাও ফুলী। মার কাছে যাও।”

“তা তো যাবই বছিরবাই। কিন্তুক কাইল রাইতি আইলাম না ক্যান হেই কথাডা আগে কই। তোমার জন্যি আইজ ছয়মাস ধইরা একখানা কাঁথা সিলাই করত্যাছিলাম। আইজ সারা রাইত জাইগা এডারে শেষ করলাম। দেখত বছির বাই কেমন ঐছে?”

এই বলিয়া ফুলী তার আঁচলের তলা হইতে কাঁথাখানা মেলন করিয়া ধরিল। দেখিয়া বছির বড়ই মুগ্ধ হইল। কোন শিল্প বিদ্যালয়ের শিক্ষা পাইয়া এই গ্রাম্য মেয়েটি অঙ্কন পদ্ধতির সীমা-পরিসীমার (Proportion) জ্ঞান লাভ করে নাই। নানা রঙ সামনে লইয়া এ-রঙের সঙ্গে ওরঙ মিশাইয়া রঙের কোন নতুনত্বও সে দেখাইতে পারে নাই। ছেঁড়া কাপড়ের পাড় হইতে লাল, নীল, হলুদ ও সাদা–মাত্র এই কয়টি রঙের সূতা উঠাইয়া সে এই নক্সাগুলি করিয়াছে। শিল্প-বিদ্যালয়ের সমালোচকেরা হয়ত ইহার মধ্যে অনেক ভুলত্রুটি ধরিতে পারিবেন কিন্তু তাহার সাধারণ সৌন্দর্য অনুভূতি লইয়াই সে বুঝিল এমন শিল্পকার্য সে আর কোথাও দেখে নাই। কাঁথার মধ্যে অনেক কিছু ফুলী আঁকে নাই। শুধু মাত্র একটি কিশোর-রাখাল বাঁশী বাজাইয়া পথে চলিয়াছে। আর একটি গ্রাম্য-মেয়ে কাঁখে কলসী লইয়া সেই বাঁশী মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছে। পুকুরে কয়েকটি পদ্মফুল ভাসিতেছে। তাহাদের দলগুলির রঙে বংশীওয়ালার প্রতি সেই মেয়েটির অনুরাগই প্রকাশ পাইতেছে। বছির বুঝিল, তার জীবনের সুদীর্ঘ পথের কাহিনী বাঁশীর সুরে ভাসিয়া বহুকাল ধরিয়া ওই জল-ভরণ-উদ্যতা মেয়েটির অন্তরে প্রবেশ করিতেছে। তারই মনের আকুতি রূপ পাইয়াছে ওই চলন্ত মাছগুলির মধ্যে, ওই উড়ন্ত পাখিগুলির মধ্যে এই ক্ষুদ্র কাঁথার উপরে ফুলী এতগুলি নক্সা এবড়ো থেবড়ো ভাবে বুনোট করে নাই। যেখানে যে নকসাটি মানায়—যে রঙটি যে নকসায় শোভা করে সেই ভাবেই ফুলী কাঁথাখানি তৈরী করিয়াছে। আর সবগুলি নকসই বাঙালীর যুগ যুগান্তরের রস-সৃষ্টির সঙ্গে যোগ–সংযোগ করিয়া হাসিতেছে। বছির অনেক বড় বড় কেতাবে সূচিকার্য রূপান্তরিত রাফেলের ভুবন বিখ্যাত ছবিগুলির প্রতিচ্ছবি দেখিয়াছে। এখানে যাহারা সূচিকার্য করিয়াছে তাহারা বহু বৎসর সুদক্ষ শিক্ষকের অধীনে থাকিয়া শিক্ষালাভ করিয়াছে। তাহাদের শিল্প কার্যে নিজস্ব কোন দান নাই। রাফেল যেমনটি আঁকিয়াছেন তাহারই অনুকৃতি করিয়াছে। কিন্তু এই অশিক্ষিতা পল্লী বালিকার নকসায় যে অপটু হাতের ভুলত্রুটি রহিয়াছে তাহারই গবাক্ষ পথ দিয়া মনকে শিল্পীর সৃজিত রসলোকে লইয়া যায়। সৃষ্টিকার্য মেয়েটি করিয়াছে শুধুমাত্র তাহারই জন্য। কতদিনের কত সুদীর্ঘ সকাল দুপুরে সূক্ষ শুই ধরিয়া একখানা মূক-কাপড়ের উপর সে তাহার অনুরাগের রঙ মাখাইয়া দিয়াছে। জীবনে বহু ভাগ্যের অধিকারী না হইলে এই। অপূর্ব দানের উপযুক্ত হওয়া যায় না। তবু এই দানকে তাহার প্রত্যাখান করিতে হইবে। এই সরলা পল্লী-বালিকার মনে তাহার প্রতি যে অনুরাগের রঙ লাগিয়াছে তাহা নিষ্ঠুর হাতে মুছিয়া যাইতে হইবে। নতুবা পরবর্তী জীবনে এই ভোরের কুসুমটি যে দুঃখের অগ্নিদাহনে জ্বলিবে, তাহার হাত হইতে কেহই তাহাকে নিস্তার করিতে পারিবে না।

ফুলী অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল,”বছির বাই! আমার কাঁথাখানা কেমন ঐছে কইলা না ত?”

বছির বলিল, “মন্দ হয় নাই। এখানা তুমি যত্তন কইরা রাইখ। একদিন কামে দিবি।”

এ কথা শুনিয়া ফুলীর মনটা কেমন করিয়া উঠিল। সে আশা করিয়াছিল বছির তাহার এত যত্নে তৈরী করা কথাখানা পাইয়া কতই না উচ্ছ্বসিত হইয়া তাহা গ্রহণ করিবে। সেবার একখানা রুমালের উপর মাত্র একটা ফুল তুলিয়া ফুলী তাহাকে দিয়াছিল। তাই পাইয়া বছিরের কত আনন্দ। সে শহরে যাইয়াও বন্ধু-বান্ধবদের তাহা দেখাইয়া বলিয়াছে, আমার বোন এই ফুলটি করিয়া দিয়াছে। সেই খবর আবার বছির বাড়ি আসিয়া তাহাকে শুনাইয়াছে। কিন্তু এতদিন ভরিয়া যে কথাখানা সে এত সুন্দর করিয়া তৈরী করিয়াছে, যাহা দেখিয়া পাড়ার সকলেই তাহাকে কত প্রশংসা করিয়াছে–সেই কথাখানা দেখিয়া বছির ভাই কিনা বলিল–মন্দ হয় নাই।

ম্লান হাসিয়া ফুলী বলিল, “আমি কেন তোমার কথাখানা যত্তন কইরা রাখতি যাব? তোমার জন্যি বানাইছি। তোমার যদি মনে দরে যা খুশী তাই কর এটা নিয়া।” বলিতে। বলিতে ফুলী প্রায় কাঁদিয়া ফেলিল।

কিন্তু বছিরকে আজ নিষ্ঠুর হইতেই হইবে। কিছুতেই সে তার মনের দৃঢ়তা হারাইবে না।

সে বলিল, “আমি ত কয়দিন পরে বিলাত চইলা যাব। তোমার কথা দিয়া করব কি? সে দ্যাশের লোক এটা দেখলি হাসপি ঠাট্টা করবি।”

ম্লান মুখে ফুলী কাঁথাখানা গোটাইয়া ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়াইল। বছিরের মা বলিল, “ও ফুলী! এহনই আইলি আর চইলা গেলি। আয়-আয় হুইনা যা।” ফুলী ফিরিয়াও চাহিল না।

ফুলীর চলিয়া-যাওয়া পথের দিকে বছির চাহিয়া রহিল। তাহার প্রতিটি পদাঘাতে সে যেন বছিরের মনে কোন অসহনীয় বিষাদের কাহিনী লিখিতে লিখিতে তাহার দৃষ্টির আড়ালে চলিয়া গেল। কিন্তু ইহা ছাড়া বছির আর কিইবা করিতে পারিত। তবু ফুলীর সুন্দর মুখোনি কে যেন রঙিন তুলি দিয়া তার মনের পটে আঁকিয়া দেয়। সেই ছবি সে জোর করিয়া মুছিয়া ফেলে কিন্তু আরও উজ্জ্বল হইয়া–আরও জীবন্ত হইয়া সেই ছবি আবার তাহার মনের-পটে আঁকিয়া ওঠে। এ যেন কোন চিত্রকর জোর করিয়া তাহার মনের-পটে নানা চিত্র আঁকিতেছে। তাহাকে থামাইতে গেলেও থামে না।

কলমী ফুলের মত সুন্দর মেয়েটি ফুলী! গ্রামের গাছপালা লতা-পাতা তাদের গায়ের যত মায়া-মমতা সব দিয়া যেন তাহার সুন্দর দেহটিকে আরও পেলব করিয়া দিয়াছে। বনের পাখিরা দিনের পর দিন এ-ডালে ও-ডালে গান গাহিয়া তার কণ্ঠস্বরটিকে আরও মিষ্ট করিবার শিক্ষা দিয়াছে। তার সারা গায়ে রঙ মাখাইয়াছে সোনালতা। রঙিন শাড়ীর ভাঁজে ভাঁজে সেই রঙ যেন ঈষৎ বাহির হইয়া আকাশে বাতাসে ছড়াইয়া যায়। যে পথে দিয়া সে চলে সে পথে সেই রঙ ঝুমঝুমি হইয়া বাজিতে থাকে।

এই ফুলীকে সে যেন কোনদিনই দেখে নাই। ও যেন গাজীর গানের কোন মধুরতর সুরে রূপ পাইয়া তাহার সামনে আসিয়া উদয় হইয়াছিল। রহিমদ্দী চাচার সেই গানটি আজ বার বার বছিরের কণ্ঠ হইতে কোন সাত সাগরের কান্না হইয়া বাজিয়া উঠিয়াছিল।

‘ও আমি স্বপ্নে দেখলাম
মধুমালার মুখহে।’

এই মধুমালাকে পাইবার জন্য সে সপ্তডিঙা মধুকোষ সাজাইয়া সাত সাগরে পাড়ি দিবে–কত পাহাড়-পর্বত ডিঙাইবে–কত বন-জঙ্গল পার হইবে। মধুমালা! মধুমালা! মধুমালা! যেমন করিয়াই হোক এই মধুমালাকে সে লাভ করিবেই করিবে। কিন্তু তার জীবনের যে সুদীর্ঘ পথ এখনও পড়িয়া রহিয়াছে। দেবলোক হইতে অমৃত আনিয়া যে তাহার দেশবাসীকে অমর করিয়া তুলিতে হইবে। শত শত মূঢ় ম্লান মুক মুখে ভাষা ফুটাইয়া তুলিতে হইবে। যুগে যুগে যাহারা বঞ্চিত হইয়াছে–নিপীড়িত হইয়াছে–শোষিত হইয়াছে, তাহারাই আজ মূর্ত হইয়া আছে তার পিতার মধ্যে, তার মায়ের মধ্যে, তার শত শত গ্রামবাসীদের মধ্যে। স্বর্গ হইতে বিদ্যার অমৃত আনিয়া যে তাহাদিগকে মৃত্যুর হাত হইতে–পীড়নের হাত হইতে রক্ষা করিতে হইবে। তবু ফুলী! ফুলী! আমার সোনার ফুলী! তোমাকে বছির ভূলিতে পারে না। সরলা কিশোরী বালিকা। যৌবনের ইন্দ্রপুরী আজ তার সম্মুখে তোরণদ্বার সাজাইয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। মরি! মরি! কি সুন্দর রূপ! তার সুন্দর দেহের সারিন্দা হইতে কোন অশরীরী সুরকার দিন রজনীর দু’খানা পাত্র ভরিয়া কোন অনাহুত সুরের মদিরা চারিদিকে ছড়াইয়া দিতেছে। ফুলী! ফুলী–আমার সুন্দর ফুলী! সরষে খেত রচনা করিব আমি তোমার গায়ের বর্ণ ফুটাইতে। পাকা পুই-এর রঙে তোমার অধরের লালিমা ধরিয়া রাখিব। কলমী ফুলের রঙিন পাত্রে তোমার হাসিখানি ভরিয়া দেখিব। ফুলী! ফুলী! তুমি আমার! তুমি আমার! আকাশের চঁদ তুমি মাটির আঙিনায় নামিয়া আসিয়াছ। হাত বাড়াইলেই তোমাকে ধরিতে পারি। আর তোমাকে আকাশে ফিরিয়া যাইতে দিব না।

না–না–না, এ কি ভাবিতেছে বছির? জীবনের পথ যে আরও–আরও দুর-দুরান্তরে বাঁকাইয়া গিয়াছে? এ পথের শেষ অবধি যে তাহার্কে যাইতে হইবে? একটা মেয়ের মোহে ভুলিয়া সে তার জীবনের সব কিছু বিসর্জন দিবে? তাই যদি হয় তবে এতদিন কষ্ট করিয়া অনাহারে থাকিয়া আধপেটা খাইয়া সে কেন এত তপস্যা করিয়াছে? বড়র কবরে বসিয়া সে যে তার দেশবাসীর কাছে নিজেকে উৎসর্গীকৃত করিয়াছে। সে কে? তার নিজস্ব বলিতে ত সে নিজের কিছুই রাখে নাই। আনন্দ বিশ্রামের সুখ, নিদ্রার স্বপ্ন সবকিছু যে তার আদর্শবাদের কাছে উৎসর্গীত। তার সেই বিপদসঙ্কুল দুঃখ-দৈন্য অভাবময় জীবনের সঙ্গে এই সরলা গ্রাম্য বালাকে সে কিছুতেই যুক্ত করিয়া লইবে না।

তবু ফুলু-ফুলের মত ফুলুর মুখখানা বছিরের মনে ভাসিয়া ওঠে। না-না এ কখনো হইতে পারিবে না। যেমন করিয়া বছির অনাহার জয় করিয়াছে, নানা লোকের অপমান অত্যাচার সহ্য করিয়াছে, তেমনি করিয়া সে আজ ফুলর চিন্তা তাহার মন হইতে মুছিয়া ফেলিবে। বার বার বছির তার বিগত দিনগুলির কথা চিন্তা করে। তারা যেন শক্তি-উদ্দীপক মন্ত্র। সেই মন্ত্রের জোরে সে সম্মুখের ঘোর কূজাটি পথ অতিক্রম করিয়া। যাইবে।

পরদিন সকালে বছির বড়ুর কবরে আসিয়া দেখিল, কোন্ সময় আসিয়া ফুলু তাহার রঙিন কাঁথাখানা ঘরের উপর মেলিয়া দিয়া গিয়াছে। সে যেন তার মনের সকল কথা এই কথার উপর অঙ্কিত করিয়া গিয়াছে। এই পল্লী-বালার যে অনুরাগের নিদর্শন বছির গ্রহণ করে নাই তাই যেন সে কবরের তলায় তার ঘুমন্ত বোনটির কাছে জানাইয়া দিয়া গিয়াছে। সেই মেয়েটির কাছে জানাইয়া গিয়াছে হাসি খেলায় যে তার সব সময়ের সঙ্গিনী ছিল, যার কাছে সে তার মনের সকল কথা বলিতে পারিত।

কাঁথাখানির দিকে চাহিয়া আবার ফুলুর সুন্দর মুখোনির কথা বছিরের মনে পড়িল। কিন্তু কিই বা সে করিতে পারে? তাহার জীবন-তরী যে কোন গাঙে যাইয়া কোথায়। ভিড়িবে সেই অনিশ্চিতের খবর সে নিজেও জানে না। সেঁতের শেহলার মত সে ভাসিয়া বেড়াইতেছে। সেই সুদূর লণ্ডন শহরে যাইয়া সে নিজে উপার্জন করিয়া পড়াশুনার খরচ চালাইবে। সেখানে কত অভাব, কত দৈন্য, কত অনাহার তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। এই জীবন সংগ্রামে সে টিকিয়া থাকিবেনা পথের মধ্যেই কোথাও শেষ হইয়া যাইবে তাহাই বা কে বলিতে পারে? আহা! এই সরলা গ্রাম বালিকা! একে সে তার সংগ্রাম-বহুল জীবনের সঙ্গে কিছুতেই জড়াইবে না। ফুল–আমার সোনার ফুল? তুমি আমাকে ক্ষমা করিও। হয়ত তোমাকে ব্যথা দিয়া গেলাম, কিন্তু তোমার ব্যথার চাইতেও অনেক ব্যথা আমি আমার অন্তরে ভরিয়া লইয়া গেলাম।

ভাবিতে ভাবিতে বছিরের মনে ছবির পর ছবি উদয় হয়। কোন গ্রাম্য-কৃষাণের ঘরে যেন ফুলুর বিবাহ হইয়াছে। কলা পাতায় ঘেরা ছোট্ট বাড়িখানি। খড়ের দু’খানা ঘর। তাহার উপরে চালকুমড়ার লতা আঁকিয়া বাকিয়া তাহারই মনের খুশীর প্রতীক হইয়া যেন এদিক ওদিক বাহিয়া চলিতেছে! দুপুরে সুগন্ধি আউস ধানের আঁটি মাথায় করিয়া তাহার কৃষাণ স্বামী বাড়ি ফিরিবে। লেপা-পোছা আঙিনায় তাহার মাথার বোঝা নামাইয়া হাতে বোনা রঙিন পাখা দিয়া সে তাহাকে বাতাস করিবে। মরাই-ভরা ধান-গোয়াল-ভরা গরু। বারো মাসের বারো ফসল আসিয়া তাহার উঠানে গড়াগড়ি করিবে। সন্ধ্যাবেলা আঁকা বাঁকা গেঁয়ো পথ দিয়া কাখে কলস লইয়া সে নদীতে জল আনিতে যাইবে। ধানের ক্ষেতের ওধার দিয়া কোড়াকুড়ী ডাকিয়া দিগদিগন্ত মুখর করিবে। পাট ক্ষেতের মাঝখান দিয়া যাইতে সে ক্ষণেক পঁড়াইয়া একগুচ্ছ বৌটুনী ফুল তুলিয়া খোঁপায় গুজিবে। তারপর গাঙের ঘাটে যাইয়া ও-পাড়ার সম-বয়সিনী বউটির সঙ্গে দেখা হইবে। দুইজনের কারো কথা যেন ফুরাইতে চাহিবে না। হয়ত বিগত রাতের কোন সুখ স্বপ্নের কথাযা ভাষায় প্রকাশ করা। যায় না; আকারে ইঙ্গিতে একের কথা অপরে বুঝিতে পারে। তারপর ভরা কলস কাঁখে করিয়া ঘরে ফিরিতে পথের মধ্যে কোথাও কার্যরত তাহার কৃষাণ স্বামীর সঙ্গে দেখা হইবে। চকিতে তাহাকে একটি চাহনী কুস উপহার দিয়া সে ত্বরিতে ঘরে ফিরিবে! আহা! এই স্বপ্ন যেন ফুলুর জীবনে নামিয়া আসে! এই সুখ-স্বর্গ হইতে বছির কিছুতেই এই মেয়েটিকে নামাইয়া আনিয়া তাহার দুঃখময় জীবনের সঙ্গে গ্রথিত করিবে না। নানা-না, কিছুতেই না।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x