(চৌত্রিশ)

ফতেহায়ে দোয়জ দাহম উপলক্ষে ফরিদপুরে বিরাট সভা হইবে। কলিকাতা হইতে ইসলাম প্রচারক মাওলানা আলিম উদ্দীন সাহেব, মাওলানা তোফেল আহমদ সাহেব প্রভৃতিকে দাওয়াত দেওয়া হইয়াছে। এই উপলক্ষে রমিজদ্দীন সাহেব একটি কমিটি গঠন করিয়াছেন। ফোরকানিয়া মাদ্রাসার তালেব-এলেমরা রঙিন ব্যাজ পরিয়া এ-কাজে ছুটাছুটি করিতেছে।

একদিন রমিজদ্দীন সাহেব মাদ্রাসার স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে বছিরকে দেখিতে পাইলেন। তিনি চোখ দুটি লাল করিয়া রাগের সঙ্গে বছিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এখানে এলে কেমন করে?”

শুনিয়া বছির ভ্যাবাচেকা খাইয়া গেল। সঙ্গের তালেম-এলেমরা বলিল, “বছির ত আমাগো এহানে মসজিদে থাইকা পড়াশুনা করে। ইস্কুলে যায়।”

শুনিয়া উকিল সাহেবের রাগে যেন আরও ইন্ধন পড়িল। তিনি মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডাকিয়া গোপনে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলিয়া চলিয়া গেলেন।

ইমাম সাহেব বছিরকে ডাকিয়া বলিলেন, “দেখ বছির! তুমি এখনই মসজিদ হইতে চইলা চাও।” বছির তাহার কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করিল। ইমাম সাহেব বলিলেন, “আমি ত তোমারে থাকনের জায়গাই দিছিলাম। কিন্তুক উকিল সাহেব ত মানেন না। তুমি তানার বিপক্ষ লোকের বাড়ি যাও। সমাজে যাগো তিনি বন্ধ থুইছেন, তাগো বাড়ি যায় খাও। সেই জন্যি উকিল সাহেব তোমারে তানার বাসায় ত্যা খ্যাদায়া দিছিলেন। তিনি যহন তোমার উপর বিরূপ, আমি কেমন কইরা জাগা দেই?”

বছিরের চোখ দুটি হইতে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরিতে লাগিল। ইমাম সাহেব তার গামছা দিয়া বছিরের মুখ মুছাইতে মুছাইতে বলিলেন, “বাবা বছির! আল্লার উপর ভরসা রাইখ। তানি যখন মুখ দিছেন খাওনও তানিই দিবেন। তুমার মনে যদি বড় হবার খাহেছ থাকে কেউ তুমার পথে বাধা ঐতি পারবি না।” মসজিদের তালেব-এলেমরা নিকটে দাঁড়াইয়া সবই শুনিতেছিল। তাহারা বছিরকে কোন সান্ত্বনাই দিতে পারিল না।

ধীরে ধীরে বছির ইমাম সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া তাহার আধ-ছেঁড়া লুঙ্গিখানার মধ্যে বই-পত্রগুলি বাধিতে লাগিল। সেই বন্ধনের এক একটি মোচড়ে কে যেন তাহার সমস্ত দেহ-মনকে বাঁকাইয়া দুমড়াইয়া দিতেছিল। বই-পত্র বাধিয়া বছির ভাবিতে বসিল, এখন সে কোথায় যাইবে? কোথায় যাইয়া সে আশ্রয় পাইবে? মুর্শীদার ফকির গান গায়–

আমি আশা কইরা বাঁধলাম বাসা,
পুরিল মনে আশারে;–
আমার আশা-বৃক্ষের ডাল ভাঙ্গিয়া গেলরে।

আজ বছিরের কেবলই মনে হইতেছে, তার মত মন্দভাগ্য বুঝি পৃথিবীতে আর কেহ নাই। সে যেন অচ্যুৎ পারিয়ার চাইতেও অধম। আকাশ, বাতাস, সমস্ত পৃথিবী যেন তাহাকে বেড়িয়া কেবলই বলিতেছে, ধিক্কার, ধিক্কার! কোথায় সে যাইবে! কার কাছে গেলে তার দুঃখ জুড়াইবে!

মজিদ আর করিম আসিয়া বছিরের পার্শ্বে বসিল। “ভাই বছির! ভাইব না। হাফিজ মিঞার হোটেলে যদি থাকনের জায়গা করতি পারি, এ বাড়ি ও-বাড়ি দাওয়াত খাওয়াইয়াই আমরা তোমারে চালায়া নিব। তুমি আমাগো লগে চল!

বছির তাহাদের সঙ্গে হাফিজ মিঞার হোটেলে চলিল। সমস্ত শুনিয়া হাফিজ মিঞা বলিল, “আমার হৈটালে উয়ারে আমি জাগা দিতে পারি, যদি নগদ পয়সায় দুই বেলা ও আমার এহানে ভাত খায়।”

এই অসহায় ছাত্রটিকে আশ্রয় দিলে তাহার কত ছওয়াব হইবে কোরান কেতাবের আয়াত আবৃত্তি করিয়া তাহারা ইহার মনোরম বর্ণনা দিল, কিন্তু হাফিজ মিঞা কিছুতেই টলিল না। বই-পত্রের বোঁচকা কাঁধে লইয়া বছির সেখান হইতে বাহির হইল। মজিদ আর করিম তাহার পাছে পাছে আগাইতে লাগিল।

ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বছির বলিল, “ভাই! তোমরা আমার জন্যি আর চেষ্টা কইর না। দেখছও না, আমি যে ডাল ধরি সে ডাল ভাইঙ্গা যায়। আমার মত বদ-নছিবের সঙ্গে তোমরা আর জড়াইয়া থাইক না।”

মজিদ বলিল, “ভাই বছির! আমাগো কোন খ্যামতাই ঐল না যে তুমার কোন উপকার করি। আমরাও তুমার মত নিরাশ্রয়।” বলিয়া মজিদ কাঁদিয়া ফেলিল।

করিম বলিল, “দেখ ভাই! যখন যেহানে থাহ আমাগো কথা মনে কইর। আমাগো দুস্কের দিন। তবু মনে কইর, আমাগো সেই দুস্কির মদ্দিও তোমার কথা বুলব না।” বছির ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “ভাই! তোমাগো কথা আমি কুনু দিনই বুলব না। তোমরা যে পক্ষি-মার মত ঠোঁটের আধার দিয়া প্রতিদিন আমারে পালন করছ, তাকি বুলবার? যাও ভাই, তোমরা মসজিদে ফিরা যাও। জীবনে যদি কুনু দিন বড় ঐবার পারি তোমাগো পাশে আবার আইসা খাড়াব।” এই বলিয়া বছির পথ চলিতে লাগিল। করিম আর মজিদ সেইখানেই দাঁড়াইয়া রহিল।

চলিতে চলিতে বছির ভাবে, “এখন আমি কোথায় যাই! বাড়ি যদি ফিরিয়া যাই সেখানে আমার পড়াশুনা হইবে না। আমার পিতা আমার মা কত আশা করিয়া আছে, লেখাপড়া শিখিয়া আমি বড় হইব। আমার জন্য তাহারা কত কষ্ট স্বীকার করিতেছে। আজ আমি ফিরিয়া গেলে তাহারা আশা ভঙ্গ হইয়া কত দুঃখ পাইবে। কিন্তু কোথায় আমি যাইব? রহিমদ্দী দাদার ওখানে গেলে আশ্রয় মিলিবে। কিন্তু তাহারা নিজেরাই খাইতে পায় না। আমাকে খাওয়াইবে কেমন করিয়া? এক আছে আরজান ফকির আর তার বউ। তারা কি আমাকে আশ্রয় দিবে?” কিন্তু তাদের অবস্থা এখন কেমন তাও সে জানে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া বছির পদ্মানদী পার হইয়া চরের পথ ধরিল। যেখানে একদিন সরষে ফুলের বাহার দেখিয়াছিল আজ সেখানে মাটি ফাটিয়া চৌচির হইয়াছে। এখানে সেখানে কাটা সরিষার গোড়াগুলি দাঁত বাহির করিয়া যেন তাহাকে উপহাস করিতেছে। তাহারই নিরাশ হৃদয়ের হাহাকার যেন দূর্ণী হাওয়ায় ধূলি উরাইয়া মাঠের মধ্যে বৈশাখ-রৌদ্রে দাপাদাপি করিতেছে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x