(ঊনত্রিশ)

উকিল সাহেবের বাসায় ফিরিয়া আসিয়া বছিরের কিছুতেই পড়াশুনায় মন বসে না। সব সময় আরজান ফকিরের সৌম-মূর্তিখানি তাহার মনে উদয় হয়! আহা! হাতের সারিন্দাটি ভাঙিয়া ফেলায় তার যেন কতই কষ্ট হইতেছে। কি বাজাইয়া সে এখন ভিক্ষায় যাইবে। তার বাজনা শুনিয়াই ত লোকে তাহাকে দুচার পয়সা দেয়। এখন কি আর লোকে তাহাকে সাহায্য করিবে?

উকিল সাহেবের বাড়ির ভাত যেন তার গলা দিয়া যাইতে চাহে না। গ্রামে গ্রামে তাহাকে সঙ্গে লইয়া উকিল সাহেব কোরান কেতাবের দৃষ্টান্ত দিয়া বিচারের নামে যে সব অবিচার করেন, সেজন্য সে যেন নিজেই দায়ী। তাহাকে চাকরের মত খাটাইয়া রোজ দুইবেলা চারটে ভাত দেওয়া হয়। ইহাতেও গ্রাম্য সভায় যাইয়া উকিল সাহেবের কত বাহাদুরী। ছোট হইলেও সে এসব বোঝে। কিন্তু সকল ছাপাইয়া সেই গ্রাম্য-গায়ক আরজান ফকিরের কথা। কেবলই তাহার মনে হয়।

সেদিন কি একটা উপলক্ষ করিয়া স্কুল ছুটি হইয়া গেল। বছির বই-পুস্তক রাখিয়া আরজান ফকিরের বাড়ি বলিয়া রওনা হইল। লক্ষ্মীপুর ছাড়াইয়া সতরখাদা গ্রাম। তার উত্তরে পদ্মানদী। সেখানে খেয়া-পার হইলে মাধবদিয়ার চর। খেয়া নৌকায় কত লোক জমা হইয়াছে। আজ হাটের দিন। চরের লোকেরা হাট করিয়া বাড়ি ফিরিয়া যাইতেছে। সারি সারি ধামায় বাজারের সওদা রাখিয়া হাটুরে-লোকেরা গল্প-গুজব করিতেছে। কারো ধামায় ছোট্ট মাটির পাত্রে খেজুরের গুড়। দু’একটি পাকা আতা বা বেল। কেউ ইলিশমাছ কিনিয়া আনিয়াছে। বছির মনে মনে ভাবে এরা যখন বাড়ি পৌঁছিবে তখন হাটের সওদা পাইয়া এদের ছেলে-মেয়েরা কত খুশীই না হইবে। চরে ফল-ফলারির গাছ এখনও জন্মে নাই। তাই কেহ কেহ বেল কিনিয়া আনিয়াছে–কেহ খেজুর গুড় কিনিয়া আনিয়াছে। কি সামান্য জিনিস! ইহাতেই তাহাদের বাড়িতে কত আনন্দের হাট মিলিবে। যাহাদের আলতো পয়সা নাই, তাহারা শুধু তেল আর নুন কিনিয়া আনিয়াছে। হয়ত বাড়ির ছেলে-মেয়েদের কান্দাইয়া গাছের কলাগুলি, পাকা পেঁপেগুলি সমস্ত হাটে আনিয়া বেচিয়া শুধু তেল আর নুন কিনিয়াছে। শূন্য দুধের হাঁড়িগুলির মধ্যে নদীর বাতাস ঢুকিয়া হু হু করিয়া কাঁদিতেছে। দুধের অভাবে ওদের ছেলে-মেয়েদের যে কান্না–এ যেন সেই কান্না। সবাই কিছু না কিছু কিনিয়া আনিয়াছে। আহা! আরজান ফকিরের বুঝি আজ হাট হয় নাই! সারিন্দা বাজাইয়া গান করিতে পারিলে ত লোকে তাহাকে পয়সা দিবে?

নদী পার হইয়া বছির চরের পথ দিয়া হাঁটিতে লাগিল। বর্ষা কবে শেষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ছোট ছোট ঢেউগুলি বালুর উপর যে নকসা আঁকিয়া গিয়াছিল, তাহা এখনও মুছিয়া যায় নাই। কত রকমেরই না নকসা। কোথায় বালুর উপর এঁটেল মাটির প্রলেপ। রৌদ্রে ফাটিয়া নানা রকমের মূর্তি হইয়া আসিতেছে। তার উপর দিয়া পা ফেলিতে মন চায় না। দুএক টুকরা মাটির নকসা হাতে লইয়া বছির অনেকক্ষণ দেখিল। প্রকৃতির এই চিত্রশালা কে আসিয়া দেখিবে! হয়ত কোন অসাবধান কৃষাণের পায়ের আঘাতে একদিন এই নকসাগুলি গুঁড়ো হইয়া ধূলিতে পরিণত হইবে। সেই ধূলি আবার বাতাসে ভর করিয়া নানা নকসা হইয়া সমস্ত চর ভরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবে। এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া বছির পথ চলে, নকসাগুলো যাহাতে পায়ের আঘাতে ভাঙিয়া না যায়। তবুও দোমড়ানো মাটি পায়ের তলায় মড় মড় করিয়া ওঠে। মূক-মাটি যেন তাহার সঙ্গে কথা বলিতে চায়। চরের পথ ছাড়িয়া নলখাগড়ার বন। তারপর চৈতালী খেত। তার পাশ দিয়া পথ গরুর পায়ের ক্ষুরে ক্ষত-বিক্ষত। সেই পথ দিয়া খানিক আগাইয়া গেলে নাজির মোল্লার ডাঙি, তারপর মোমিন আঁর হাট। তার ডাইনে ঘন কলাগাছের আড়াল দেওয়া ওই দেখা যায় আরজান ফকিরের বাড়ি। বাড়ি ত নয়, মাত্র একখানা কুঁড়ে ঘর। উঠানে লাউ-এর জাঙলা কত লাউ ধরিয়া আছে। শিমের জাঙলায় কত শিম ধরিয়া আছে।

দুর হইতে বছির গান শুনিতে পাইল :

“যে হালে যে হালে রাখছাওরে
দয়ালচান তুই আমারে
ও আমি তাইতে ভাল আছিরে।
কারে দিছাও দালান কোঠা।
ও আল্লা আমার পাতার ঘররে।
কারে খাওয়াও চিনি সন্দেশ
ও আল্লা আমার খুদের জাওরে।

ফকির গান করিতেছে আর কাঁদিতেছে। বছির অনেকক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়াইয়া তাহার গান শুনিতে লাগিল। এ ত গান নয়। অনাহারী সমস্ত মানবতার মর্মন্তুদ আর্তনাদ। কিন্তু দুঃখে এরা শুধু কাঁদে-আল্লার কাছে মূক-মনের কথা নিবেদন করে। কাহারো প্রতি ইহাদের কোন অভিযোগ নাই। শুধু একজনের কাছে দুঃখের কথা কহিয়া শান্তি পায়। যুগ যুগ হইতে ইহারা নীরবে পরের অত্যাচার সহ্য করিয়া চলিয়াছে। সমস্ত দুনিয়ার যে মালিক সেই কম্পিত একজনকে তাহাদের দুঃখের কথা বলিয়া তাহারা হয়ত কিঞ্চিৎ শান্তি পায়। আহারে! সেই দুঃখ প্রকাশের গানও তাহাদের নিকট আজ নিষিদ্ধ হইল!

গান শেষ করিয়া ফকির বছিরকে দেখিয়া গামছা দিয়া চক্ষু মুছিয়া বলিল, “বাজান! আরও কি অপরাধের বিচার করনের আইছেন? আমার শাস্তির কি শেষ ঐল না?” এবার বছির ফুপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। মুখ দিয়া বলিতে পারিল না, “ফকিব সাহেব! আপনার সারিন্দা যাহারা ভাঙিয়াছে আমি তাহাদের দলে নই।” ছেলেমানুষ এখনও মনের কথা গুছাইয়া বলিতে শেখে নাই। আরজান ফকির সবই বুঝিতে পারিল। বছিরকে বুকের কাছে লইয়া তার ছেঁড়া কাঁথার আসনে আনিয়া বসাইল। কিন্তু বছিরের কান্না আর কিছুতেই আসে না। ফকির গামছা দিয়া বছিরের মুখোনি মুছাইয়া বলিল, “বাজান! তোমার রূপ ধইরা আল্লা আমার গরে আইছেন। যেদিন ওরা আমার সারিন্দা বাঙল সেদিন বুঝলাম আমার দরদের দরদী এই সয়াল সংসারে কেওই নাই। আইজ তুমারে দেইখা মনে ওইল, আছে–আমার জন্যিও কান্দুইনা আছে।”

এমন সময় ফকিরের বউ আসিয়া বলিল, “আমাগো বাড়ির উনি কার সঙ্গে কতা কইত্যাছে?” দরজার সামনে যেন পটে আঁকা একটি প্রতিমা। পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধা। সমস্ত গায় চম্পকবর্ণ যেন ঝকমক করিতেছে। রাঙা মুখোনি ভরা কতই স্নেহ। দেখিয়া ‘মা’ বলিতে প্রাণ আঁকুবাকু করে?

ফকির হাসিয়া বলিল, “দেখ আইসা, আমার বাজান আইছে।”

বউ বলিল, “না, তোমার বাজান না আমার বাজান?”

বউ দুইহাত দিয়া বছিরের মুখোনি মুছিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কও ত বাজান! তুমি আমার বাজান না ওই বুইড়া ফকিরের বাজান?”

লজ্জায় বছির মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছিল।

ফকির বলিল, “তোমার বাজান না আমার বাজান সে কথা পরে মিমাংসা করবানে। এবার বাজানের জন্যি কিছু খাওনের জোগাড় কর।”

কথাটি শুনিয়া যেন ফকির-গৃহিণীর মুখখানা কেমন হইয়া গেল। ফকির বলিল, “বউ! তুমি অত বাবছ ক্যান। জান না কেষ্ট ঠাকুর কত বড়লোকের দাওয়াত কবুল না কইরা। বিদুরের বাড়িতে খুদের জাউ খাইছিল। যা আছে তাই লয়া আস। আমি এদিকে বাজারে। গীদ হুনাই।” ফকির গান ধরিল–

“আমি কি দিয়া ভজিব তোর রাঙা পায়;
দুগ্ধ দিয়া ভজিব তোরে
সেও দুধ বাছুরিতে খায়।
চিনি দিয়া ভজিব তোরে
সেও চিনি পিঁপড়ায় লয়া যায়।”

গান শেষ হইতে না হইতেই ফকিরের স্ত্রী সামান্য খুদ ভাজিয়া লইয়া আসিল। দুইটি শাখআলু আগেই আখায় পোড়ানো হইয়াছিল। একটি পরিষ্কার নারিকেলের আচিতে ভাজা খুদ আর মাটির সানকিতে সেই পোড়া শাখআলু দুইটি আনিয়া বছিরের সামনে ধরিল। আগের মতই দুই হাত দিয়া তাহার মুখ সাপটাইয়া বলিল, “বাজান! গরীব ম্যায়ার বাড়ি আইছাও। এই সামান্য খাওয়াটুকু খাও।”

অনেক সাধ্য-সাধনা করিয়া ফকির-বউ সেই ভাজা খুদটুকু সব বছিরকে দিয়া খাওয়াইল। তারপর নিজের হাতে সেই পোড়া আলু দুইটার খোসা ছাড়াইয়া বছিরের মুখে তুলিয়া দিল। খাওয়া শেষ হইলে বছির আরজান ফকিরকে বলিল, “বেলা পইড়া যাইতাছে। আমি এহন যাই।”

ফকিরের বউ বলিস, “ক্যা বাজান! আইজ আমাগো এহানে থাকলি অয় না?” বছির বলিল, “থাকুনের যো নাই। উকিল সাহেবের কাছে না কয়া গোপনে আপনাগো এহানে আইছি। তিনি জানতি পারলি আর রক্ষা থাকপি না।”

ফকির বলিল, “না বউ! উনারে থাকুনের কইও না। আমরা উনারে রাইখা কিবা খাওয়াব। আর কিবা আদর করব।”

বছির বলিল, “আপনারা আমারে যে আদর করলেন, এমন আদর শুধু মা-ই আমারে করছে। আমার ত ইচ্ছা করে সারা জমন আপনাগো এহানে থাহি। কিন্তুক উকিলসাব যদি শোনেন আমি আপনাগো এহানে আইছি তয় আমারে আর আস্ত রাখপি না। ফকির সাব! ওরা আপনার সারিন্দাডারে ভাইঙা ফালাইছে। আমি এই আট আনার পয়সা আনছি। আমার বাপ-মাও বড় গরীব। এর বেশী আমি দিবার পারলাম না। এই আটআনা দিয়া একটা কাঁঠাল গাছের কাঠ কিন্যা আবার সারিন্দা বানাইবেন।”

ফকির বছিরকে আদর করিয়া ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কও ত বাজান! এই পয়সা তুমি কোথায় পাইলা?”

বছির বলিল, “আমি যখন বাড়ি থইনে আসি তহন আমার মা আমারে দিছিল। আর কয়া দিছিল এই পয়সা দিয়া তোর ইচ্ছামত কিছু কিন্যা খাইস। আমি ত উকিলসাবের বাড়িই দুই বেলা খাই। আমার আর পয়সা দিয়া কি অবি? তাই আপনার জন্যি আনলাম।”

শুনিয়া ফকির কাঁদিয়া ফেলিল, “বাজান! আপনার পয়সা লয়া যান। ওরা আমার কাঠের সারিন্দা বাঙছে কিন্তুক মনের সারিন্দা বাঙতি পারে নাই। সারিন্দা বাঙা দেইখা ও-পাড়ার ছদন শেখ আমারে কাঁঠালের কাঠ দিয়া গ্যাছে। দু’এক দিনির মদ্দিই আবার সারিন্দা বানায়া ফেলাব। একদিন আইসা বাজনা শুইনা যাইবেন।”

ফকিরের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বছির আবার সেই আঁকা-বাঁকা গেঁয়ো-পথ ধরিয়া খেয়াঘাটের দিকে চলিল। তাহার মনে কে যেন বসিয়া আনন্দের বাঁশী বাজাইতেছে। দুই পাশে মটরশুটির খেত। লাল আর সাদায় মিলিয়া সমস্ত খেত ভরিয়া ফুল ফুটিয়া আছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মটরশুটির ফুলগুলি। প্রত্যেক ফুলের দুইটি পর সাদা! মাঝখানে সিঁদুরে রঙের বউটি যেন বসিয়া আছে। বাতাসে যখন মটরশুটির ডগাগুলি দুলিতেছিল বছিরের মনে হইতেছিল তার বোন বড় বুঝি তার হাজার হাজার খেলার সাথীদের লইয়া সেই খেতের মধ্যে লুকোচুরি খেলিতেছিল। মরিয়া সে কি এই খেতে আসিয়া ফুল হইয়া ফুটিয়া আছে?

অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া বছির এই খেতের পানে চাহিয়া রহিল। তারপর একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া সামনের দিকে আগাইতে লাগিল। এবার পথের দুই পাশে সরিষার খেত। সমস্ত খেত ভরিয়া সরিষার হলদে ফুল ফুটিয়া চারিদিকে গন্ধ ছড়াইতেছে। সমস্ত চর যেন আজ বিয়ের হলদী কোটার শাড়ীখানা পরিয়া বাতাসের সঙ্গে হেলিতেছে দুলিতেছে। ফকিরের বাড়ি যাইবার সময় বছির এই খেতের মধ্য দিয়াই গিয়াছে। কিন্তু তখন এই খেতে যে এত কিছু দেখিবার আছে তাহা তাহার মনেই হয় নাই। গ্রাম্য-ফকিরের স্নেহ-মমতা যেন তার চোখের চাহনিটিতে রঙ মাখাইয়া দিয়াছে। সেই চোখে সে দেখিতেছে, হাজার হাজার নানা রঙের প্রজাপতি ডানা মেলিয়া এ-ফুল হইতে ও-ফুলে যাইয়া উড়িয়া পড়িতেছে। তাহাদের পাখায় ফুলের রেণু মাখানো! ফোঁটা সরিষার গন্ধে বাতাস আজ পাগল হইয়াছে। সেই গন্ধ তাহার বুকে প্রবেশ করিয়া সমস্ত চরখানিতে যেন হলুদের ঢেউ খেলিতেছে। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস আসিয়া চরের উপর দিয়া বহিয়া যাইতেছিল। সেই বাতাসে সরষে গাছগুলি হেলিয়া যাইয়া আবার খাড়া হইয়া উঠিতেছিল। বছির দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ এই ছবি দেখিল। বাতাস যেন হলুদ শাড়ী-পরা, চরের মেয়ের মাথায় চুলগুলিতে বিলি দিতেছে। খেতের মধ্যেও কত কি দেখিবার! দুধালী লতাগুলি সরষে গাছের গা বাহিয়া সাদা ফুলের স্তবক মেলিয়া হাসিতেছে। মাঝে মাঝে মটরের লতা, গা ভরা লাল ফুলের গহনা। সেখান দিয়া লাল ফড়িংগুলি রঙিন ডানা মেলিয়া নাচিয়া বেড়াইতেছে। দেখিয়া দেখিয়া বছিরের সাধ যেন আর মেটে না। ওদিকে বেলা পশ্চিম আকাশে হেলিয়া পড়িয়াছে। আর ত দেরী করা যায় না। আস্তে আস্তে বছির খেয়াঘাটের দিকে পা বাড়াইল। চলিতে চলিতে তার কেবলই মনে হইতেছিল, এমন সুন্দর করিয়া মাঠকে যাহারা ফুলের বাগান করিতে পারে কোন অপরাধে তারা আজ পেটের ভাত সংগ্রহ করিতে পারে না?

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x