(তেরো)

দুপুর বেলা মিনাজদ্দী মাতবর নিজের বাড়ি হইতে ভাত পাকাইয়া আনিয়া বলিল, “আজাহের বাই! আর বাইব না। ভাত খাও।”

আজাহের বলিল, “মোড়ল সা’ব! কয়দিন আপনি এমন কইরা আমাগো খাওয়াইবেন? আমার ত কিছুই রইল না।” আজাহের হামলাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।

মোড়ল তাহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিল, “বাইরে! আল্লা যখন মুখ দিছেন, তিনিই খাওয়াইবেন। কাইন্দা করবি কি?”

“না মোড়ল সা’ব! আর কাম না।” মোড়লের হাত ধরিয়া আজাহের বলিতে লাগিল, তাহার চোখ দুইটি হইতে যেন আগুন বাহির হইতেছে; “আর কান্দুম না, মোড়ল সাব! আমার ত সবই শ্যাষ। পুলা–ম্যায়ারা না খাইয়া মরবি। কিন্তুক তাগো মরণ আমি খাড়ায়া খাড়ায়া দেখপার পারব না। তাগো মরার আগে ওই শরৎ সার গলাডা আমি টিপা তারে জন্মের শোধ শেষ কইরা দিয়া আসপ।”

মোড়ল বলিল, “আজাহের! এমন চিন্তা মুখেও আইন না। মানুষরে মানুষ মারলি আল্লার কাছে দায়ী হবা। দোজগে যায়া পুড়বা।”

“কিন্তুক মোড়ল সাব! আল্লার দোজগের জ্বালা কি দুনিয়ার দোজগের চায়াও বিষম? আমার পুলা–ম্যায়ারা কুনুদিন বাতের দুঃখু পায় নাই। কাইল তারা যখন বাত বাত কইরা কানবি, আমি খাড়ায়া খাড়ায়া তাই হুনব, আল্লার দোজগে কি ইয়ার চায়াও দুস্কু?”

“হত্যি কথাই কইছসরে বাই আজাহের! মানুষ মানুষির জন্যি যে দোজগ বানাইছে, আল্লার সাধ্যও নাই তেমন দোজগের আগুন বানায়।”

“তয় মোড়ল সাব। আমারে কি করবার কন আপনি? আগুনে পুইড়া যাইত্যাছে আমার সব্ব শরীল। ওই শরৎ সার মুণ্ডডা কাইটা না আনতি পারলি আমার এই অন্তরডা জুড়াবি না। আমার এই শূন্য বাড়ি–গরের দিগে যখন আমি চাই, ঘরের আসবাব পত্রের কথা যখন বাবি, আমার গরু দুইডার কতা যখন মনে আসে তহন কে যিনি আমার কানের কাছে কেবলই কয়া বেড়ায়, শরৎ সাহার মুণ্ডটা কাইটা আন।”

“আজাহের বাই! তোমার ত মাথা খারাপ হয়া গ্যাল। একটু ঠিক অও।”

“ঠিক আর কি মোড়ল বাই! কাইল যখন দেখপ, আমার চাষ দেওয়া খ্যাতে অন্য মানষী হাল জুড়ছে, আমার এত আদরের গরু দুইডি অন্য লোকের খ্যাত চাষ করতাছে, ক্যামন কইরা তা আমি সহ্য করব মোড়ল বাই?”

“কি করবা আজাহের! রাজার আইন।”

“আচ্ছা মোড়ল সাব! এ কেমুন আইন? পোনর টাহা কর্জ দিছিল ওই বেটা চামার। তারপর কত পোনর টাহা তারে দিছি, তবু আইজ সেই পোনর টাহা ফুরাইল না। বাইড়্যা পাঁচশ’ টাহা ঐল।”

“আজাহের! হুনছি এই আইনের বদল অবি। দেশে সুদখোর মহাজন থাকপি না।”

“কিন্তুক যহন বদল ঐব তহন আমরাও থাকপ না। আমাগো উপর যা ঐল তার কুনু। বিচার অবি না।”

“আজাহের বাই! সবুর কর। সকল দুরই শেষ আছে। যাই দেখি, ছ্যামড়ারা কি করতাছে। তুমি বইস।”

মোড়ল চলিয়া গেল। আজাহের বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল। দুপুরের দিন গড়াইয়া সন্ধ্যা হইল। রাত্রের পিশাচিনী তার অন্ধকারের কথা বিস্তার করিয়া সমস্ত পৃথিবী ঢাকিয়া ফেলিল। চারিধারের বনে ঝিঁঝিপোকার আর্তনাদ আজাহেরের ব্যথা–বিক্ষিপ্ত অন্তরখানি। যেন ছিন্ন ভিন্ন করিয়া দিতেছিল।

দিনের আলোকে মানুষের যে সব অন্যায় অবিচারের আঘাত সে অনুভব করিতে পারে নাই, রাত্রের অন্ধকারে তাহারা সহস্র ক্ষত হইয়া তাহার শরীর–মনকে বিষাইয়া তুলিতেছিল। এই অন্ধকারের আশীতে সে যেন আজ স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছিল, কৌশলের পর কৌশল–জাল বিস্তার করিয়া এই লোভী মহাজন ধীরে ধীরে কেমন করিয়া তাহার সমস্ত ঘর–বাড়ি জমি–জমা দখল করিয়া লইয়াছে। সেই সঙ্গে তার জীবনের সমস্ত আশার প্রদীপ নিষ্ঠুর হাতের থাপড় মারিয়া নিবাইয়া দিয়াছে। তাহার জীবনের ভবিষ্যৎ ভাবিয়া আজাহের শিহরিয়া উঠিল। দিনের পর দিন, ধীরে ধীরে তার এত আদরের ছেলে–মেয়েরা না খাইয়া মরিয়া যাইবে তারপর সে, তার স্ত্রী, তাহারাও ধরাপৃষ্ঠ হইতে একদিন চিরদিনের জন্য মুছিয়া যাইবে। আর এই লোভী শয়তান মহাজন দিনে দিনে তাহার সম্পদ–জাল বিস্তার করিয়া তাহারই মত বহু নির্দোষী লোককে আবার গৃহহীন। সর্বস্বহীন করিবে। ইহার কি কোনই প্রতিকার নাই? আজাহের মরিবে কিন্তু তার আগে সে ইহার কিছুটা প্রতিকার করিয়া যাইবে!

ঘরের বেড়া হইতে সে তাহার দাখানি বাহির করিয়া বহুক্ষণ বসিয়া তাহাতে ধার দিল। অন্ধকারে বালুর উপর ঘসা পাইয়া ইস্পাতের দা চকমক করিয়া উঠিতেছিল, আর তারই চমকে আজাহেরের অন্তরের কি এক বীভৎস ক্ষুধার যেন তৃপ্তি হইতেছিল। অনেকক্ষণ দাখানি বালুর উপর ঘসিয়া আজাহের তাহাকে মনের মত করিয়া পরীক্ষা করিল। তারপর। মালকোছা দিয়া কাপড় পরিয়া চারিদিকের শুচিভেদ্য অন্ধকার–সাগরের মধ্যে ঝাপাইয়া পড়িল। সারাদিনের কান্নাকাটির পর বউ তাহার ছেলে–মেয়েগুলিকে লইয়া ঘরের মেঝেয় শুইয়া একটু তন্দ্রাতুর হইয়াছিল। সে টের পাইল না।

সেই ভীষণ অন্ধকারের মধ্যে চলিতে চলিতে আজাহের নিজেকে যেন দেখিতে পাইতেছিল। তাহার নিজের এই ভীষণতর চেহারা দেখিয়া যেন নিজেই সে শিহরিয়া উঠিতেছিল। কিন্তু ইহা ছাড়া তার আর ত কোন উপায় নাই। ওই শয়তান সুদখোর মহাজনটাকে একটু শিক্ষা না দিয়া গেলে সে কিছুতেই শান্তি পাইবে না।

দেখিতে দেখিতে আজাহের শরৎ সাহার দরজায় আসিয়া পোছিল। চারিদিকে ভীষণ অন্ধকার। একখানা ঘরে একটি মাটির প্রদীপ টিমটিম করিয়া জ্বলিতেছিল। বেড়ার ফাঁক দিয়া আজাহের দেখিতে পাইল, একটা বিছানার উপর সেই সুদখোর মহাজন পড়িয়া ঘুমাইতেছে। পাশে কতকগুলি মহাজনী খাতা–পত্র ইতস্ততঃ ছড়ান। বোধ হয় সেগুলি পড়িতে পড়িতে, তারই মত কোন সরল–প্রাণ নিরীহ কৃষাণের সর্বনাশের ফন্দী বাহির করিয়া সে শ্রান্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। হয়ত ঘুমাইয়া ঘুমাইয়াই তাহার বিনাশের নূতন নূতন কৌশল–জালের স্বপ্ন দেখিতেছে। এই উপযুক্ত সময়, আস্তে আস্তে নিশ্বাস বন্ধ করিয়া একটা বাখারীর চাড়া দিয়া আজাহের কপাটের খিল খুলিয়া ফেলিল। তারপর ধীরে ধীরে নিঃশব্দ–পায়ে যাইয়া বিছানার সামনে হাঁটু–গাড়া দিয়া বসিল। নিজের কোমর হইতে দাখানা খুলিয়া ভালমত আর একবার তাহার ধার পরীক্ষা করিয়া লইল। এইবার মনের মত করিয়া তাহার গলার উপরে একটা কোপ বসাইয়া দিতে পারলেই হয়। কিন্তু একি! ছোট একটি মেয়ের কচি দুখানা হাত ওই সুদখোর মহাজনের গলাটি জড়াইয়া ধরিয়াছে। মাঠের কলমী ফুলের মতই রাঙা টুকটুকে সেই শিশু–মুখোনি। কত

আদরেই সে তার বাপের গলাটি ধরিয়া রহিয়াছে। দেখিতে দেখিতে আজাহেরের হাতের দাখানি শিথিল হইয়া আসিল। সে এক নিমিষে অনেকক্ষণ সেই সুন্দর শিশু–মুখোনির দিকে চাহিয়া রহিল। তারপর ধীরে ধীরে দাখানি হাতে লইয়া ঘরের দরজা অবধি ফিরিয়া আসিল।

কিন্তু ফিরিয়া সে যাইবে না। তারও ঘরে ত অমনি ছোট্ট সোনার শিশুকন্যা রহিয়াছে। আজ যখন সে নিলামে তাহার যথাসর্বস্ব লইয়া আসিয়াছে তখন কি একবারও ওই নিষ্ঠুর মহাজন তার ছেলে–মেয়ের কথা ভাবিয়াছে? না! না! কিছুতেই সে ফিরিয়া যাইবে না। এই গোখুরা সাপকে সে চিরকালের মত দুনিয়ার বুক হইতে নিঃশেষ করিয়া যাইবে।

ধীরে ধীরে আবার আসিয়া আজাহের সেই বিছানার সামনে পূর্বের মতই হাঁটু–গাড়া দিয়া বসিল। মওতের ফেরেস্তা আজরাইল যেন তার সামনে আসিয়া খাড়া হইয়াছে। আস্তে আস্তে অতি সাবধানে শরৎ সাহার গলা হইতে তার ছোট্ট মেয়েটির একখানা হাত খুলিয়া লইল। অপর হাতখানা খুলিতে সেই হাতের তপ্ত স্পর্শ যেন আজাহেরকে মুহূর্তে কি করিয়া দিল।

সেই হাতখানা মুঠির মধ্যে লইয়া আজাহের ধীরে ধীরে নাড়া চাড়া করিতে লাগিল। তাহার হাতের আদর পাইয়া ছোট মেয়েটি ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট ভাবে বলিয়া উঠিল, “আমার থেলনা আমি কাউকে নিতে দিব না।” কি মিষ্টি এই কণ্ঠস্বর! খোদার দুনিয়া বুঝি বহুদিন এমন সুর শোনে নাই। সমস্ত আকাশ বাতাস নীরব নিস্তব্ধ হইয়া সেই স্বর যেন বুকের মধ্যে পুরিয়া লইল। এমনি করিয়া বহুক্ষণ কাটিয়া গেল। আজাহেরের মনে ছবির পর ছবি ভাসিয়া উঠিল। ওমনি একটি ছোট খুকী–ফেরেস্তা তাহারও ঘরে আছে। ওমনি করিয়া সারাটি রাত তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া ঘুমাইয়া থাকে। আজ ওই নিষ্ঠুর মহাজনটিকে হত্যা করিয়া গেলে তাহারই মেয়ের মত একটি ছোট্ট মেয়ে কাল এবাড়ি ও বাড়ি তাহার আদরের বাপটিকে খুঁজিয়া ফিরিবে। রাতের বেলা ঘুমাইতে যাইয়া ওই ছোট মেয়েটি তার কচি বাহু দুটি জড়াইয়া ধরিবার এমনি আদরের বাপটিকে আর পাইবে না। আজাহেরের উপর যাহা হইয়াছে হউক, ওই কচি মেয়েটিকে কিছুতেই কাঁদাইবে না।

নিজের হাতের দা–খানিকে অতি সন্তর্পণে কোমরে খুঁজিয়া আজাহের ঘরের দরজা পার হইয়া বাহিরে উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল। তখন আকাশের চাঁদ পশ্চিমে হেলিয়া পড়িয়াছে। রহিয়া রহিয়া দুই একটি রাতজাগা পাখি নিস্তদ্ধ রাত্রির মৌনতা ভঙ্গ করিতেছিল। মহাজনের উঠানের শেফালি গাছটি হইতে অজস্র ফুল ঝরিয়া পড়িয়া অর্ধেক অঙ্গনখানি ভরিয়া তুলিয়াছে।

কি জানি কেন আজাহের সেই গাছের তলায় যাইয়া দাঁড়াইল, গামছার খেটে আস্তে আস্তে অনেকগুলি ফুল টুকাইয়া লইল। তারপর ধীরে ধীরে সন্তর্পণে দরজা পার হইয়া সেই সুপ্ত মেয়েটির বিছানার পার্ধে আসিয়া আবার বসিয়া রহিল। রাঙা টুকটুকে আলতা মাখান পা দু’টি। সরু সরু কোমল দুখানি হাত গলায় জড়াইতে ইচ্ছে করে। অতি ধীরে ধীরে আজাহের তার সেই হাত দুখানি লইয়া পূর্ববৎ সেই নিষ্ঠুর মহাজনের গলায় পরাইয়া দিল। মহাজন ঘুমের ঘোরে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়িল। তারপর গামছার খোট হইতে ফুলগুলি লইয়া সেই ছোট্ট খুকী–মেয়েটির সারা গায়ে ছড়াইয়া দিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া আসিল।

রাত্র তখন শেষ হইয়াছে। মহাজনের সেই খুকী–মেয়েটির মতই আর একটি লাল টুকটুকে মেয়ে ফজরের আসমানের কিনারায় আসিয়া উঁকি দিতেছে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x