দ্বিতীয় খণ্ড

ভাগ : ৫ – পরিস্থিতি

পরিচ্ছেদ – ৪

বিয়ে ও বেশ্যাবৃত্তি, আমরা দেখেছি, সরাসরিভাবে পরস্পরসম্পর্কিত; বলা হয়ে থাকে যে প্রাচীন থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তি পরিবারপ্রথার ওপর একটি তমিস্র ছায়ার মতো অনুসরণ করছে মানবজাতিকে। পুরুষ, দূরদর্শিতাবশত, তার স্ত্রীকে দীক্ষিত করে সতীত্রতে, কিন্তু সে নিজে সন্তুষ্ট নয় স্ত্রীর ওপর আরোপ করা ব্যবস্থায়। মতেইন একে সমর্থন করে আমাদের বলেছেন :

পারস্যের রাজারা ভোজোৎসবে তাদের স্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানাতে অভ্যস্ত ছিলো; তবে মদ যখন তাদের সুচারুরূপে উত্তেজিত করে তুলতে এবং যখন তারা প্ররোচিত হতো কামের লাগাম ঢিলে করে দিতে, তখন স্ত্রীদের তারা পাঠিয়ে দিতো তাদের নিজেদের শয্যাকক্ষে, যাতে তারা অংশ নিতে না পারে তাদের অসংযত কামক্ষুধায়, এবং তাদের বদলে আনার ব্যবস্থা করতো অন্য নারীদের, যাদের প্রতি তারা এমন সম্মান দেখানোর প্রয়োজনবোধ করতো না।

গির্জার পিতাদের মতে, প্রাসাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্যে পয়ঃপ্রণালি দরকার। এবং প্রায়ই বলা হয় যে নারীদের একাংশকে রক্ষা এবং এর থেকেও নিকৃষ্ট বিপদ প্রতিরোধের জন্যে দরকার আরেক অংশকে বলি দেয়া। দাসপ্রথার পক্ষে মার্কিন দাসপ্রথার সমর্থকদের একটি যুক্তি ছিলো যে দক্ষিণাঞ্চলের শাদারা সবাই যেহেতু মুক্ত ছিলো দাসত্বের দায়িত্বগুলো থেকে, তাই তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো সর্বাধিক গণতান্ত্রিক ও পরিশীলিত সম্পর্কগুলো রক্ষা করা; একইভাবে, একগোত্র ‘নির্লজ্জ নারী’ থাকলে ‘সতীনারীদের’ প্রতি চরম বীরত্বব্যঞ্জক সম্মান দেখানো সম্ভব হয়। বেশ্যা একটি বলির পাঠা; পুরুষ তার দুশ্চরিত্রতার নির্গমন ঘটায় বেশ্যার ওপর, এবং তাকে বর্জন করে। তাকে আইনগতভাবে পুলিশের তত্ত্বাবধানেই রাখা হোক বা সে অবৈধভাবে গোপনেই কাজ করুক, তাকে গণ্য করা হয় ব্রাত্য রূপেই।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে তার অবস্থান বিবাহিত নারীর অবস্থানের সমতুল্য। ল্য পিউবার্তেতে মারো বলেন : ‘যারা নিজেদের বিক্রি করে বেশ্যাবৃত্তিতে ও যারা নিজেদের বিক্রি করে বিয়েতে, তাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু দামে ও চুক্তির সময়ের দৈর্ঘ্যে’। উভয়ের জন্যেই যৌনকর্ম একটা সেবামূলক কাজ; একজনকে একটি পুরুষ ভাড়া করে সারাজীবনের জন্যে; আরেকজনের আছে নানা খদ্দের, যারা প্রত্যেকবার তাকে মজুরি দেয়। একজনকে অন্যান্য পুরুষ থেকে রক্ষা করে একটি পুরুষ; আরেকজনকে তারা সবাই রক্ষা করে তাদের প্রত্যেকের স্বৈরাচার থেকে। যা-ই ঘটুক না কেননা তাদের দেহদানের বিনিময়ে প্রাপ্ত সুযোগসুবিধা সীমাবদ্ধ হয়েপড়ে বিদ্যমান প্রতিযোগিতার ফলে; স্বামীটি জানে যে সে গ্রহণ করতে পারতো ভিন্ন একটি স্ত্রী; ‘দাম্পত্য দায়িত্ব’ পালন একটা ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়, এটা একটি চুক্তিপূরণ। বেশ্যাবৃত্তিতে, পুরুষের কাম চরিতার্থ হতে পারে যে-কোনো দেহে, কেননা এ-কামনা বিশেষ হলেও তা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু চায় না। একটি পুরুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে স্ত্রীও পারে না হেইরাও পারে না, যদি না স্ত্রীটি বা হেইরাটি পুরুষটির ওপর তার প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। তাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে বৈধ স্ত্রী, যে উৎপীড়িত হয় বিবাহিত নারী হিশেবে, সে একটি মানুষ হিশেবে সম্মান পায়। যত দিন বেশ্যা মানুষ হিশেবে তার অধিকার না পাবে, ততো দিন সে একাধারে নির্দেশ করবে নারীর সব ধরনের দাসীত্ব।

কী প্রেষণা নারীকে চালিত করে বেশ্যাবৃত্তিতে, এ-সম্পর্কে বিস্ময় বোধ করা বোকামি; আজকাল আমরা আর মেনে নিই না লোম্রোসের সে-তত্ত্ব, যা বেশ্যা ও অপরাধীদের জড়ো করে এক জায়গায় এবং উভয়ের মধ্যেই দেখতে পায় অধঃপতিতদের; হতে পারে, পরিসংখ্যান যেমন নির্দেশ করে যে বেশ্যাদের মানসিক স্তর গড়মানের থেকে কিছুটা নিচে এবং তাদের মধ্যে কিছু নিশ্চিতভাবেই দুর্বলচিত্ত, কেননা মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরা বেছে নিতে চাইবে এমন পেশা, যাতে কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার পড়ে না; তবে তাদের অধিকাংশই স্বাভাবিক, কিছু আছে অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তাদের নেই কোনো বংশগতিক দোষ, কোনো শারীরবৃত্তিক ক্রটি। সত্য হচ্ছে যে এমন একটি বিশ্বে, যেখানে দুর্দশা ও বেকারত্ব ব্যাপক, সেখানে যেপেশাই খোলা পাওয়া যায় তাতেই ঢুকতে চাইবে কিছু মানুষ; যত দিন আছে। পুলিশবাহিনী ও বেশ্যাবৃত্তি ততে দিন থাকবে পুলিশ ও বেশ্যারা, আরো বিশেষভাবে এজন্যে যে এ-পেশায় অন্য বহু পেশার থেকে আয় বেশ ভালো। পুরুষের চাহিদা যেসরবরাহ উদ্দীপ্ত করে, তাতে বিস্ময় বোধ করা নিছক ভণ্ডামো; এটা নিতান্তই এক প্রাথমিক ও সর্বজনীন আর্থনীতিক প্রক্রিয়ার ক্রিয়া। ‘পতিতাবৃত্তির সমস্ত কারণের মধ্যে’, ১৮৫৭ অব্দে তাঁর প্রতিবেদনে পারে-দুশাতেলে লিখেছেন, ‘কম মজুরির ফলে উৎপন্ন বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের থেকে অন্য কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়’। সচ্চিন্তাশীল নীতিবানেরা বিদ্রুপের হাসি হেসে অবজ্ঞাভরে উত্তর দেন যে বেশ্যাদের কাঁদুনেকাহিনীগুলো অনভিজ্ঞ খদ্দেরদের সুবিধার জন্যে অলীক কল্পনারঞ্জিত বর্ণনামাত্র। এটা সত্য যে বেশ্যারা অনেকেই অন্য উপায়েও জীবিকা নির্বাহ করতে পারতো। তবে সে যে-পথটি বেছে নিয়েছে, তা যদি তার কাছে নিকৃষ্টতম মনে না হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে তার রক্তেই আছে পাপ; এটা বরং নিন্দা জ্ঞাপন করে সে-সমাজের প্রতি, যেসমাজে এ-পেশাটি এখনো সে-সব পেশার অন্যতম, যা বহু নারীর কাছে মনে হয়। ন্যূনতমভাবে অনাকর্ষণীয়। প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয় : কেননা সে এটা বেছে নিয়েছে? বরং প্রশ্নটি হচ্ছে : সে কেননা এটা বেছে নেয় নি?

এটা উল্লেখযোগ্য যে, একদিকে, বেশ্যাদের একটি বড়ো অংশ প্রাক্তন চাকরানি। কোনো চাকরানির ঘরের দিকে একবার তাকালেই এর কারণ বোঝা যায়। শোষিত, দাসীত্বে আবদ্ধ, যাকে মানুষ হিশেবে না দেখে দেখা হয় বস্তু হিশেবে, সব ধরনের কাজের এ-চাকরানি, শয্যাকক্ষের পরিচারিকা, ভবিষ্যতে তার নিজের ভাগ্যের কোনো উন্নতির লক্ষণই সে দেখতে পায় না; অনেক সময় তার ওপর পড়ে গৃহস্বামীর চোখ, তাকে তা মেনে নিতে হয়। এ-ধরনের গার্হস্থ্য দাসীতু ও যৌন অধীনতা থেকে সে পিছলে পড়ে এমন এক দাসত্বে, যা আগের থেকে হীন নয় এবং সে স্বপ্ন দেখে যে এটা হবে অনেক বেশি সুখের। তাছাড়া, গৃহদাসীরা থাকে তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে; হিশেব করে দেখা গেছে যে প্যারিসের শতকরা ৮০ ভাগ বেশ্যাই আসে দূরাঞ্চল বা গ্রাম থেকে। পরিবারপরিজন যদি কাছাকাছি থাকে, তাহলে কোনো নারী সর্বজনীনভাবে ধিকৃত একটি পেশায় ঢুকতে গেলে বাধার সম্মুখিন হয় এবং তাকে তার মানসম্মান রক্ষা করে চলতে হয়; কিন্তু সে যখন হারিয়ে যায় কোনো মহানগরে এবং সমাজের সঙ্গে সংহতি লাভ করে না, তখন ‘নৈতিকতা’র বিমূর্ত ধারণাটি আর কোনো বাধাই হয় না।

যতো কাল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা যৌনক্রিয়াকে বিশেষ করে কুমারীত্বকে ঘিরে রাখবে প্রচণ্ড ট্যাবুতে, ততো কাল বহু কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে একে মনে হবে একটা ঔদাসীন্যের ব্যাপার। অজস্র অনুসন্ধান একমত যে বিপুল সংখ্যক তরুণী প্রথম আগন্তুকের কাছেই সতীত্বমোচনের জন্যে দান করে নিজেদের এবং তারপর যেকারো কাছে দেহদান তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। ডঃ বিজার একশো বেশ্যাকে তদন্ত করে পেয়েছেন এ-তথ্য : একজন তার কুমারীত্ব হারায় সাত বছর বয়সে, দুজন বারো বছর বয়সে, দুজন তেরো বছর বয়সে, ছ-জন চোদ্দো বছর বয়সে, সাতজন পনেরোতে, একুশজন ষোলোতে, উনিশজন সতেরোতে, সতেরোজন আঠারোতে, ছ-জন উনিশে; বাকিরা একুশ বছর বয়সের পর। তাই পাঁচ শতাংশ কুমারীত্ব হারিয়েছে বয়ঃসন্ধির আগেই। অর্ধেকের বেশি বলেছে যে তারা প্রেমের জন্যে দেহদান করেছে, কেননা তারা দেহদান করতে চেয়েছে; অন্যরা দেহদান করেছে অজ্ঞতাবশত। প্রথম রমণকারী প্রায়সই হয়ে থাকে অল্পবয়স্ক। সাধারণত সে হয়ে থাকে কোনো দোকান বা কর্মস্থলের সহকর্মী, বা কোনো বাল্যবন্ধু; তারপর পৌনপুনিকভাবে আসে সৈনিকেরা, শ্রমিকপ্রধানেরা, পরিচারকেরা, এবং ছাত্ররা; ডঃ বিজারের তালিকায় আছে দুজন আইনজীবী, একজন স্থপতি, একজন ডাক্তার, এবং একজন ঔষধবিদ। নিয়োগদাতার নিজের এ-ভূমিকা পালনের ঘটনা বরং দুর্লভ, যদিও জনপ্রিয় কিংবদন্তিতে এটা ব্যাপক; তবে প্রায়ই এ-কাজটি করে তার পুত্র বা ভ্রাতপুত্র বা তার কোনো বন্ধু। অন্য একটি সন্দর্ভে কঘেঁজ বারো থেকে সতেরো বছরের। পঁয়তাল্লিশটি তরুণীর কথা বলেছেন যাদের সতীত্বমোচন ঘটে এমন অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা, যাদের সঙ্গে তাদের আর কখনো দেখা হয় নি; তারা নিরাসক্তভাবে দেহদান করেছে, কোনো সুখ পায় নি। এসব প্রতিবেদনে প্রত্যেকের ঘটনার যেবিস্তৃত বিবরণ দেয়াহয়েছে, তাতে দেখা যায় কতো ঘন ঘন এবং কতো বিচিত্র পরিস্থিতিতে মেয়েরা ও তরুণী নারীরা দেহদান করে হঠাৎ আগন্তুকদের, নতুন পরিচিতদের, ও বয়স্ক আত্মীয়দের কাছে, এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তারা থাকে অজ্ঞ বা উদাসীন।

এ-মেয়েরা অক্রিয়ভাবে দেহদান করলেও সতীচ্ছদছিন্নকরণের যন্ত্রণা তারা ঠিকই ভোগ করেছে, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি; জানা বাঞ্ছনীয় এ-পাশব অভিজ্ঞতা। তাদের ভবিষ্যতের ওপর ফেলেছে কী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব; তবে বেশ্যাদের মনোবিশ্লেষণ প্রথানুগ নয়, এবং আত্ম-বর্ণনায় তারা বিশেষ ভালো নয়, সাধারণত তারা আশ্রয় নিয়ে থাকে বাঁধাবুলির। কিছু ক্ষেত্রে প্রথম আগন্তুকের কাছেই তাদের দেহদানের আগ্রহকে ব্যাখ্যা করতে হবে আমার উল্লেখিত বেশ্যাবৃত্তি-ফ্যান্টাসির সাহায্যে, কেননা বহু অতি অল্পবয়স্ক মেয়ে তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে, তাদের নবোদিত কামের বিভীষিকায়, বা প্রাপ্তবয়স্কের ভূমিকা নেয়ার বাসনায় অনুকরণ করে বেশ্যাদের। তারা উগ্র প্রসাধন করে, ছেলেদের সাথে চলাফেরা করে, ছেনালিপনাপূর্ণ ও প্ররোচনাদায়ক আচরণ করে। যারা এখনো শিশুসুলভ, অযৌন, শীতল, তারা মনে করে আগুন নিয়ে তারা খেলতে পারে নিরাপদে; একদিন কোনো পুরুষ তাদের কথা পুরোপুরি সত্য বলে গ্রহণ করে, এবং তারা স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে বাস্তবে।

‘যখন কোনো দরোজা একবার ভেঙেচুরে খোলা হয়েছে, তখন সেটি বন্ধ রাখা কঠিন’, বলেছে চোদ্দো বছরের এক কিশোরী বেশ্যা, যা উদ্ধৃত করেছেন মারো। তবে অল্প বয়সের কোনো মেয়ে সতীত্বমোচনের সাথে সাথেই কদাচিৎ শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক সময় সে অনুরক্ত থাকে তার প্রথম প্রেমিকের প্রতি এবং তার সঙ্গে বসবাস করতে থাকে; সে একটা ‘নিয়মানুগ’ চাকুরি নেয়: প্রেমিক তাকে ছেড়ে গেলে সে আরেকটিকে ধরে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। এখন যেহেতু সে আর কোনো একটি পুরুষের সম্পত্তি নয়, সে বোধ করে সে সকলের কাছে দান করতে পারে নিজেকে; অনেক সময় তার প্রেমিকটিই—প্রথম বা দ্বিতীয়টি পরামর্শ দেয় এ-পথেঅর্থ উপার্জনের। বহু মেয়েকে বেশ্যাবৃত্তিতে লাগায় তাদের পিতামাতারা; কিছু পরিবারে–আমেরিকার বিখ্যাত জিইকদের মতো–সব নারীর নিয়তিই এ-ব্যবসা। তরুণী নারী-ভবঘুরের মধ্যে আছে বহু ছোটো বালিকা, যাদের ত্যাগ করেছে তাদের আত্মীয়রা; তারা ভিক্ষা করতে শুরু করে ঢুকে যায় বেশ্যাবৃত্তিতে। তার যে-সন্দর্ভের প্রতি ইতিমধ্যেই নির্দেশ করা হয়েছে, তাতে পারে-দুশাতেলে দেখিয়েছেন যে ৫,০০০ বেশ্যার মধ্যে ১,৪৪১ জন বেশ্যা হয়েছিলো দারিদ্র্যের কারণে, ১,৪২৫ জন হয়েছিলো ধর্ষিত ও পরিত্যক্ত, ১,২৫৫ জন ভরণপোষণের কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই পরিত্যক্ত হয়েছিলো পিতামাতাদের দিয়ে। এটা ঘটেছিলো ১৮৫৭ অব্দে, তবে সমসাময়িক সন্দৰ্ভগুলো নির্দেশ করে প্রায় একই ফলাফল। অসুস্থতা প্রায়ই সে-নারীদের ঠেলে দেয় বেশ্যাবৃত্তিতে, যারা দৈহিক কাজ করতে পারে না বা যারা চাকুরি হারিয়েছে; এটা বিপর্যস্ত করে দেয় নাজুকভাবে তৈরি সুষম বাজেট এবং নারীদের বাধ্য করে দ্রুত নতুন অর্থসম্পদ সংগ্রহ করতে। অবৈধ সন্তান ধারণের ফলও একই। সাঁৎ-লাজার কারাগারে অর্ধেকেরও বেশি নারীর ছিলো একটি করে সন্তান, কমপক্ষে। অনেকের ছিলো তিন থেকে ছ-টি, অনেকের আরো বেশি। কমসংখ্যক নারীই ত্যাগ করে তাদের সন্তানদের; প্রকৃতপক্ষে, কিছু অবিবাহিত মা তাদের সন্তান লালনপালনের জন্যেই ঢোকে বেশ্যাবৃত্তিতে। এটা সুবিদিত যে যুদ্ধ ও পরবর্তী সামাজিক বিশৃঙ্খলার সময় বেশ্যাবৃত্তি বৃদ্ধি পায়।

মারি তেরেস ছদ্মনামে এক বেশ্যা তে মদার্নে সাময়িকীতে বর্ণনা করেছে তার জীবনকাহিনী; তার শুরুটা এমন :

ষোলো বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়েছিলো আমার থেকে তেরো বছরের বড়ো একটি লোকের সাথে। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্যে আমি এটা করেছিলাম। আমার স্বামীর একমাত্র চিন্তা ছিলো আমার পেট বানিয়েরাখা, ‘যাতে আমি বাড়িতে থাকি’, সে বলতো। সে ছিলো প্রসাধনের ও সিনেমার বিপক্ষে, এবং আমার শাশুড়ি সব সময়ই আমাকে বলতো আমার স্বামীই ঠিক। দু-বছরে আমার দুটো বাচ্চা হয়… আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং সেবিকা হওয়ার শিক্ষা নিই, যা ছিলো আমার পছন্দ… হাসপাতালে এক বেহায়া তরুণী সেবিকা আমাকে এমন কিছু কথা বলে, যা আমি জানতাম না, কিন্তু ছ-মাস আমি পুরুষদের সাথে কিছু করি নি। একদিন একটা সুল, তবে সুদর্শন যুবক আমার ঘরে আসে এবং আমাকে বোঝায় যে আমি আমার জীবন বদলে দিতে পারি, তার সাথে প্যারিসে যেতে পারি, আমাকে আর কোনো কাজ করতে হবে না… মাসখানেক তার সাথে আমি সত্যিই সুখী ছিলাম। একদিন সে একটি ফিটফাট মহিলাকে নিয়ে আসে, সে বলে যে ওই মহিলা নিজেকে নিজেই চালাতে পারে। প্রথমে আমি রাজি হই নি। আমি রাস্তায় যাবো না এটা দেখানোর জন্যে এমনকি আমি একটি ক্লিনিকেও কাজ নিই। তবে আমি বেশি দিন বাধা দিতে পারি নি। সে বলে যে আমি তাকে ভালোবাসি, নইলে তার জন্যে আমি কাজ করতাম। আমি চিৎকার করতে থাকি; ক্লিনিকে আমি সব সময় বিষন্ন থাকতাম। শেষে আমি রাজি হই, সে আমাকে কেশবিন্যাসকারীর কাছে নিয়ে যায়… আমি সংক্ষিপ্ত কাজ করতে শুরু করি! জুলো আমাকে পিছে পিছে অনুসরণ করে, এটা দেখার জন্য আমি ঠিকঠাক কাজ করছি কি-না এবং পুলিশ এলে আমাকে সাবধান করে দেয়ার জন্যে।

এটি অনেকটা খাপ খায় সে-মেয়ের চিরায়ত গল্পের সাথে যাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে তার দালাল। কখনো কখনো স্বামীই পালন করে এ-ভূমিকা। কখনোবা পালন করে কোনো নারী। ৫১০জন তরুণী বেশ্যাসম্পর্কিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে তাদের মধ্যে ২৮৪জন থাকে একলা, ১৩২জন থাকে কোনো পুরুষ বন্ধুর সাথে, এবং ৯৪জন থাকে কোনো নারীর সাথে, যার সঙ্গে তারা সাধারণত সমকামী সম্পর্কে জড়িত। এ-মেয়েদের অনেকে বলেছে যে তারা চরিত্রভ্রষ্ট হয়েছে অন্য নারীদের দ্বারা, এবং তাদের কেউ কেউ বেশ্যাবৃত্তি করেছে নারীদের কাছে।

সাহিত্য ‘জুলো’কে পরিণত করেছে একটি সুপরিচিত চরিত্রে। সে বেশ্যার জীবনে পালন করে রক্ষকের ভূমিকা। কাপড়চোপড় কেনার জন্যে সে টাকা অগ্রিম দেয়, তারপর নারীটিকে রক্ষা করে অন্য নারীদের প্রতিযোগিতা থেকে, পুলিশের থেকেঅনেক সময় সে নিজেই পুলিশ–এবং তার খদ্দেরদের থেকে, যারা খুবই সুখ পায় নারীটির প্রাপ্য টাকা শোধ না করতে এবং তাদের অনেকে পরিতৃপ্তি পেতে চায় তার ওপর তাদের ধর্ষকাম চরিতার্থ করে। কয়েক বছর আগে মাদ্রিদের ফ্যাশিবাদী শৌখিন বিত্তবান যুবসম্প্রদায় মজা পেতে শীতের রাতে বেশ্যাদের নদীতে ছুঁড়ে ফেলে : ফ্রান্সে অনেক সময় ছাত্ররা প্রমোদের উদ্দেশ্যে মেয়েদের নিয়ে যায়পল্লীগ্রামে এবং সেখানে তাদের ফেলে রেখে আসে, ন্যাংটো। টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্যে এবং পীড়ন এড়ানোর জন্যে বেশ্যাদের একটি পুরুষ দরকার পড়ে। পুরুষটি তাদের নৈতিক সমর্থনও দেয়। বেশ্যাটি প্রায়ই থাকে তার সাথে প্রেমে জড়িত; এবং প্রেমের মাধ্যমেই সে এসেছে এ-কাজে, বা প্রেম দিয়েই সে তার কাজের যাথার্থ প্রতিপাদন করে। তার পরিবেশে পুরুষ নারীর থেকে বিপুলভাবে শ্রেষ্ঠ, এবং এ-বিচ্ছিন্ন প্রতিবেশে গড়ে ওঠে এক ধরনের প্রেম-ধর্ম, এটাই ব্যাখ্যা করে কোনো কোনো বেশ্যার সংরাগপূর্ণ। আত্মবলিদানকে। এ-ধরনের মেয়ে তার পুরুষটির বল ও হিংস্রতার মধ্যে দেখতে পায় তার পৌরুষের লক্ষণ এবং অবলীলায় আত্মসমর্পণ করে তার কাছে। তার সাথে থেকে সে বোধ করে ঈর্ষা ও যন্ত্রণা, তবে পায় প্রেমিকার সুখও।

তবে বেশ্যা অনেক সময় তার পুরুষটির প্রতি বোধ করে শত্রুতা ও বিরক্তি; তবে ভয়ে সে থাকে তার পুরুষটির অধীনে, কেননা পুরুষটি তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাখে। তাই অনেক সময় তার খদ্দেরদের মধ্যে থেকে একটি প্রেমিক নিয়ে সে সান্ত্বনা দেয় নিজেকে। মারি-তেরেস লিখেছেন;

তাদের জুলোরা ছাড়াও সব মেয়েরই ছিলো প্রেমিক; এবং আমারও। সে ছিলো নাবিক, খুবই চমৎকার মানুষ। যদিও সে ছিলো একটি ভালো প্রেমিক, তবু আমি তার সাথে জড়িয়ে পড়তে পারি নি, তবে আমরা ভালোবন্ধু ছিলাম। সে প্রায়ই আমার সাথে ওপরতলায় আসতো, সঙ্গম নয় শুধু কথা। বলার জন্যে; সে বলতো যে আমার ওখান থেকে বেরিয়ে পড়া উচিত, ওটা আমার উপযুক্ত স্থান নয়।

তারা প্রায়ই আকৃষ্ট হয় নারীদের প্রতি। বহু বেশ্যাই সমকামী। আমরা দেখেছি যে মেয়েদের জীবনের শুরুতে প্রায়ই ঘটে সমকামিতার অভিজ্ঞতা এবং অনেকে বসবাস করতে থাকে কোনো বান্ধবীর সাথে। আন্না রিউলিংয়ের মতে জর্মনির প্রায় বিশ শতাংশ বেশ্যা সমকামী। ফাইর্ড জানিয়েছেন কারাগারে তরুণী নারী-বন্দীরা বিনিময় করে অশ্লীলবৃত্তিক চিঠিপত্র, যেগুলোর স্বরগ্রাম খুবই সংরাগপূর্ণ এবং তাতে স্বাক্ষর থাকে ‘আজীবনতোমার’। এসব চিঠি ‘প্রেম-ভাবে-ভাবিত’ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের চিঠির মতো; পরেরগুলো অনেক কম অভিজ্ঞ, অধিকতর ভীরু; আগেরগুলো অনিয়ন্ত্রিত তাদের আবেগে, যেমন শব্দে তেমনি কর্মে।

মারি-তেরেসের জীবনে–যিনি এতে দীক্ষিত হয়েছিলেন একটি নারীর দ্বারা আমরা দেখতে পাই ঘৃণ্য খদ্দের ও স্বৈরাচারী দালালের থেকে কতোটা বিশেষ সুবিধাজনক ভূমিকা পালন করে বান্ধবী:

জুলো একটি মেয়েকে নিয়ে এলো, একটা গরিব গৃহস্থঘরের মেয়ে, যার পায়ে এমনকি জুতোও ছিলো না। তার দরকারি সব জিনিশপত্র কেনা হলো একটা পুরোনো জিনিশের দোকান থেকে, এবং তারপর সে আমার সাথে কাজ করতে এলো। সে খুবই প্রীতিকর ছিলো, উপরন্তু, সে যেহেতু নারীদের ভালোবাসতো, তাই আমাদের দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হলো। সেবিকাটির কাছে আমি যা-কিছু শিখেছিলাম, সে তার কিছু আমার মনে পড়িয়ে দিলো। আমরা প্রায়ই মজা করতাম এবং, কাজের বদলে, সিনেমায় যেতাম। আমাদের মাঝে তাকে পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম।

যে-‘সতী’ নারী বাস করে নারীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তার পুরুষ প্রেমিকটি যেভূমিকা পালন করে, বেশ্যার বান্ধবীও পালন করে প্রায়ই একই ভূমিকা : সে প্রমোদের সঙ্গী, সে এমন একটি মানুষ যার সাথে সম্পর্কগুলো অবাধ ও নিরাসক্ত, তাই অনেকটা স্বেচ্ছাকৃত। পুরুষে ক্লান্ত হয়ে, তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে বা নিতান্তই নিছক একটু ভিন্নতার জন্যে বেশ্যা বিনোদন ও সুখ খোঁজে নারীর বাহুতে। তা যা-ই হোক, যে-দুষ্কর্মে সহযোগিতার কথা আমি বলেছি, যা সরাসরি সম্মিলিত করে নারীদের, তা অন্য কোনোখানের থেকে এখানে বিরাজ করে অনেক বেশি সবলভাবে। মানবজাতির অর্ধেকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেহেতু ব্যবসার ধরনের এবং সমাজ যেহেতু সামগ্রিকভাবে তাদের গণ্য করে ব্রাত্যরূপে, বেশ্যাদের নিজেদের মধ্যে থাকে একটা দৃঢ় সংহতি; তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, ঈর্ষাবোধ করতে পারে, পরস্পরকে অপমান করতে পারে, মারামারি করতে পারে; তবে একটা প্রতি-বিশ্ব তৈরির জন্যে তারা সুগভীরভাবে বোধ করে পরস্পরের প্রয়োজন, যে-বিশ্বে তারা ফিরে পায় তাদের মানবিক মর্যাদা। সহযোদ্ধাই বিশ্বাসভাজন ও সাক্ষী হিশেবে শ্রেয়।

বেশ্যা ও তার খদ্দেরদের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে মতামত বহুবিচিত্র এবং সন্দেহ নেই যে আছে নানা ভিন্নতা। প্রায়ই জোর দিয়ে বলা হয় যে স্বেচ্ছাকৃত প্রীতির নিদর্শন হিশেবে বেশ্যা শুধু তার প্রেমিকের জন্যেই সংরক্ষিত রাখে মুখচুম্বন, এবং সে প্রেমের আলিঙ্গন ও পেশাগত আলিঙ্গনকে দুটি ভিন্ন জিনিশ বলেই গণ্য করে। পুরুষেরা যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ দেয়, সেগুলো সন্দেহজনক, কেননা তাদের অহমিকার ফলে তারা। সহজেই বোকা বনে মেয়েটির আনন্দ উপভোগের ভান দিয়ে। বলা দরকার যে ব্যাপারটি যখন দ্রুত ও ক্লান্তিকরভাবে এক খদ্দের থেকে আরেক খদ্দেরে যাওয়ার, বা একজন পরিচিত খদ্দেরের সাথে বারবার সম্পর্কের, তখন সব কিছুই ভিন্ন। মারিতেরেস সাধারণত তার ব্যবসা চালাতেন উদাসীনভাবে, তবে তার মনে পড়ে যে কিছু কিছু রাত ছিলো আনন্দদায়ক। এটা অজানা নয় যে কোনো কোনো মেয়ে টাকা নিতে অস্বীকার করে তার সে-খদ্দেরের থেকে, যে তাকে সুখ দিয়েছে, এবং অনেক সময়, খদ্দেরটি যদি অর্থসংকটে পড়ে, তখন মেয়েটি তাকে উদ্ধার করে টাকা দিয়ে।

তবে সাধারণভাবে পেশাগত কাজের সময় নারী থাকে ‘শীতল’। ঘৃণাভরে, তাদের অনেকে তাদের সমগ্র খদ্দেরপালের প্রতি নিরাসক্তি ছাড়া আর কিছু বোধ করে না। ‘আহা, পুরুষ কী রকম বেকুব! নারীদের যা ইচ্ছে হয় তাতেই পুরুষের মাথা ভরাট তোলা নারীদের পক্ষে কত সহজ!’ লিখেছেন মারি-তেরেস। কিন্তু অনেকেই পুরুষের প্রতি পোষণ করে তিক্ত ক্ষোভ; একদিকে, তাদের বমি পায় পুরুষের অস্বাভাবিক রুচি বা অনাচার-এ। পুরুষ তাদের কলুষিত রুচি, যা তারা স্ত্রীদের বা উপপত্নীদের কাছে স্বীকার করতে সাহস করে না, তা চরিতার্থ করার জন্যেই বেশ্যালয়ে যাক, বা। বেশ্যালয়ে যাওয়ার ফলেই মুহূর্তের ঝোঁকে তারা অনাচারের নতুন ফন্দি আঁটুক, সত্য হচ্ছে যে বহু পুরুষ চায় যে নারীরা অংশ নিক বিচিত্র বিকৃতিতে। মারি-তেরেস অভিযোগ করেছেন যে ফরাশি পুরুষদের, বিশেষ করে, আছে চির-অতৃপ্ত কল্পনাপ্রতিভা। বেশ্যার সহানুভূতিশীল চিকিৎসকের কাছে বলবে যে ‘সব পুরুষই কম বা বেশি কলুষিত’।

আমার এক বন্ধু বজো হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ করেছে এক তরুণী বেশ্যার সাথে; সে ছিলো খুবই বুদ্ধিমান, সে কাজ শুরু করেছিলো চাকরানি হিশেবে, এবং থাকতো একটি দালালের সাথে, যার প্রতি সেপোষণ করতে অনুরাগ। ‘প্রত্যেক পুরুষই নষ্ট,’ সে বলেছে, ‘শুধু আমারটি ছাড়া। এজন্যেই আমি তাকে ভালোবাসি। তার মধ্যে কখনো কোনো পাপের চিহ্ন দেখা গেলে আমি তাকে ছেড়ে দেবো। খদ্দের প্রথমবার সব সময় যা-তা করার সাহস করে না, সে স্বাভাবিক থাকে; কিন্তু যখন সে আবার আসে, তখন সে এমন সব কাজ করতে চায়… তুমি বলছো যে তোমার স্বামীর কোনো দোষ নেই, কিন্তু তুমি একদিন দেখতে পাবে। তার আছে সব দোষই’। এসব দোষের জন্যে সে অপছন্দ করতো তার খদ্দেরদের। আমার আরেক বন্ধু ফ্রেসনেতে ১৯৪৩ অব্দে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে একটি বেশ্যার সাথে। ওই মেয়েটি বলে যে তার। খদ্দেরদের শতকরা নব্বই ভাগই নষ্ট, শতকরা পঞ্চাশ ভাগ পায়ুকামী।

এসব নারী তাদের খদ্দেরদের প্রতি যে-বৈরিতা বোধ করে, তাতে প্রায়ই থাকে শ্রেণীগত ক্ষোভের ব্যাপার। হেলেন ডয়েটশ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন রূপসী আন্নার ইতিহাস, যে সাধারণত ছিলো ভদ্র, কিন্তু মাঝেমাঝে ক্রোধে হয়ে উঠতো উন্মত্ত, বিশেষ করে কর্মকর্তাদের ওপর, যার ফলে তাকে চিকিৎসার জন্যে আনা হয় একটি মানসিক হাসপাতালে। সংক্ষেপে, তার গৃহজীবন এতো অসুখী ছিলো যে চমৎকার সুযোগ সত্ত্বেও সে কখনোই বিয়ে করতে রাজি হয় নি। সে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো তার বেশ্যার জীবনের সাথে, তবে যক্ষ্মার জন্যে তাকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সে চিকিৎসকদের ঘৃণা করতো, যেমন ঘৃণা করতে সমস্ত সম্রান্ত ব্যক্তিদের। ‘কেনো নয়?’ সে বলতো। ‘আমরা কি অন্য যে-কারো থেকে ভালোভাবে জানি না যে এসব লোক কতো সহজেই ছুঁড়ে ফেলে তাদের দ্রতা, আত্মসংযম, ও প্রতিপত্তির মুখোশ এবং পশুদের মতো আচরণ করে?’ এ-মনোভাব ছাড়া সে ছিলো মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। আরেকজন তরুণী বেশ্যা, জুলিয়া, পনেরো বছর বয়স থেকেই যে ছিলো কাম-উচ্ছল, সে শুধু তাদের প্রতিই ছিলো কোমল, মধুর, ও উপকারী, যাদের সে মনে করতো দুর্বল, বা দরিদ্র এবং অসহায়। ‘সে অন্যদের মনে করতো নীতিবিগর্হিত পশু, যাদের প্রাপ্য কঠোর শাস্তি’।

অধিকাংশ বেশ্যাই নৈতিকভাবে খাপ খাইয়ে নেয়া তাদের জীবনধারার সাথে। এমন নয় যে তারা জন্মত বা উত্তরাধিকারসূত্রে অনৈতিক, তবে যৌক্তিকভাবেই তারা সে-সমাজের সাথে নিজেদের সংহত মনে করে, যেখানে তাদের সেবার চাহিদা আছে। তারা বেশ ভালোভাবেই জানে যে পুলিশ সার্জেন্টের নৈতিক উন্নতিসাধক শব্দবহুল গলাবাজিভরা বক্তৃতা আর বেশ্যালয়ের বাইরে তাদের খদ্দেরদের ঘোষিত মহৎ ভাবাবেগগুলো তাদের বিশেষ ভয় দেখাতে পারে না। মারি-তেরেস ব্যাখ্যা করেছেন যে তাঁকে টাকা দেয়া হোক বা না হোক, তাঁকে একই রকমে বেশ্যাই বলা হয়, তবে যদি টাকা দেয়া হয়, তখন তাকে বলা হয় একটা অতিচতুর বেশ্যা; যখন তিনি টাকা চান, তখন লোকটি ভান করে যে সে তাকে ওই ধরনের মেয়ে মনে করে নি।

তাদের নৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি যে বেশ্যাদের ভাগ্যকে দুর্বহ করে তোলে, তা নয়। তাদের পার্থিব অবস্থাই অধিকাংশ সময় শোচনীয়। তাদের দালাল ও বাড়িওয়ালিদের দ্বারা শশাষিত হয়ে তারা বাস করে একটা নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে, এবং তাদের তিন-চতুর্থাংশই থাকে কপর্দকহীন। যে-চিকিৎসকেরা হাজার হাজার বেশ্যা পরীক্ষা করেছেন, তাঁদের মতে জীবনের পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ আক্রান্ত হয়উপদংশে। অনভিজ্ঞ অল্পবয়স্করা, উদাহরণস্বরূপ, ভয়াবহভাবে সংক্রমণগ্রাহী; পঁচিশ শতাংশকে অস্ত্রোপচার করতে হয় গনরিয়াঘটিত জটিলতার জন্যে। বিশজনের মধ্যে একজনের আছে যক্ষ্মা; ষাট শতাংশ হয়ে ওঠে অতিপানাসক্ত বা মাদকাসক্ত; চল্লিশ শতাংশ মারা যায় চল্লিশ বছর বয়সের আগেই। আরো বলা দরকার যে, পূর্বসতর্কতা সত্ত্বেও, যখন তখন তারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং তারা নিজেরা নিজেদের অস্ত্রোপচার করে, সাধারণত খুবই খারাপ পরিবেশে। সাধারণ বেশ্যাবৃত্তি একটা শোচনীয় বৃত্তি, যাতে যৌন ও আর্থিকভাবে শোষিত হয়ে, পুলিশের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে, অপমানজনক চিকিৎসামূলক পরিদর্শনের নিচে থেকে, খদ্দেরদের খেয়ালখুশির খাদ্য হয়ে, অবধারিত সংক্রমণ ও ব্যাধি, দুর্দশায় আক্রান্ত হয়ে নারী প্রকৃত অর্থেই হীন হয়ে নেমে যায় বস্তুর স্তরে।

সাধারণ বেশ্যা ও উচ্চ-শ্রেণীর হেতাইরার মধ্যে আছে বহু মাত্ৰাভেদ। মৌলিক পার্থক্যটি এখানে যে প্রথমটি ব্যবসা চালায় সরল সাধারণত্বের মধ্যে নারী হিশেবেযার ফল হচ্ছে প্রতিযোগিতা তাকে আটকে রাখেশোচনীয় অস্তিত্বের স্তরে; আর সেখানে দ্বিতীয়টি প্রচেষ্টা চালায় নিজের স্বীকৃতি লাভের জন্যে একজন ব্যক্তি হিশেবে–এবং যদি সে সফল হয়, তাহলে সে উচ্চাভিলাষ পোষণ করতে পারে। রূপ ও মোহনীয়তা বা যৌনাবেদন এখানে আবশ্যক, তবে তা-ই যথেষ্ট নয় : নারীটিকে অবশ্যই হতে হবে বিশিষ্ট। একথা সত্য, তার গুণাবলি প্রায়ই প্রকাশিত হতে হবে কোনো পুরুষের কামনার মধ্য দিয়ে; তবে সে তখই ‘পৌছোবে’, তখনই সূচনা হবে তার কর্মজীবনের, বলতে গেলে, যখন পুরুষটি বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করবে তার যোগ্যতার প্রতি। গত শতকে তার নিজ শহরের বাড়ি, তার গাড়ি, তার মণিমুক্তো সাক্ষ্য দিতে রক্ষকের ওপর রক্ষিতা নারীর প্রভাবের এবং তাকে উন্নীত করতো দেমি-মদের স্তরে; যতো দিন পুরুষেরা তার জন্যে ধ্বংস করতে থাকতো নিজেদের ততো দিন দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন হতো তার যোগ্যতা। সামাজিক ও আর্থনীতিক পরিবর্তন লোপ করেছে এ-জৌলুসপূর্ণ ধরনটি। এখন আর এমন কোনো দেমি-মদ নেই, যার মধ্যে কোনো খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। উচ্চাভিলাসীরা নারীরা আজকাল খ্যাতি অর্জনের প্রচেষ্টা চালায় একটা ভিন্ন রীতিতে। হেতাইরার সাম্প্রতিক প্রতিমূর্তি চিত্রতারকা। পাশে একটি স্বামী নিয়ে যা কঠোরভারে আবশ্যক হলিউডে বা একটি দায়িত্বশীল পুরুষ বন্ধু নিয়ে, সে আছে ফ্রাইনি ও ইম্পেরিয়ার ধারায়। পুরুষের স্বপ্নে সে দান করে নারী, আর পুরুষ এর মূল্য পরিশোধ করে তাকে অর্থ ও খ্যাতি দিয়ে।

বেশ্যাবৃত্তি ও শিল্পকলার মধ্যে সব সময়ই আছে এক অস্পষ্ট সম্পর্ক, এ-কারণে যে সৌন্দর্য ও কামসুখ দ্ব্যর্থবোধকভাবে সম্পর্কিত। তবে, প্রকৃতপক্ষে, সৌন্দর্য কামনা জাগায় না; তবে প্রেমের প্লাতোনীয় তত্ত্ব কামুকতার যে-সত্যতাপ্রতিপাদন প্রস্তাব করেছে, তা ভণ্ডামোপূর্ণ। ফ্রাইনি যখন অ্যাথেন্সের আরিপাগাসের বিচারকদের সামনে উন্মোচন করে তার বক্ষ এবং নিরপরাধ মুক্তি লাভ করে, তখন সে তাদের নিবিষ্টভাবে অবলোকন করতে দেয় একটি বিশুদ্ধ ভাব। অনাবৃত একটি দেহপ্রদর্শন হয়ে ওঠে এক শিল্পকলা প্রদর্শনী; মার্কিন বার্লেক ন্যাংটো হওয়াকে পরিণত করেছে নাটকে। ‘নগ্নিকা নিস্পাপ’, ঘোষণা করে সে-বুড়ো ভদ্রলোকেরা, যারা ‘শিল্পসম্মত নগ্নিকা’র নামে সংগ্রহ করে অশ্লীল ছবি। বেশ্যালয়ে বাছাইয়ের প্রথম দৃশ্যটি হচ্ছে একদল লোকের প্রদর্শনী; তা যদি একটু বেশি জটিল হয়, তাহলে এসব প্রদর্শনী খদ্দেরদের কাছে হয়ে ওঠে ‘জীবন্ত ছবি’ বা ‘শিল্পভঙ্গি’।

যে-বেশ্যা ব্যক্তিগত মূল্য অর্জন করতে চায়, সে নিজেকে অক্রিয় মাংস প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; সে চেষ্টা করে বিশেষ প্রতিভা দেখানোর। প্রাচীন গ্রিসের। মেয়ে বাঁশরিবাদকেরা নাচগানে মুগ্ধ করতে পুরুষদের। আলজেরিয়ার আরব নারীরা দেখায় দাঁস দ্য ভাত্র (উদরনৃত্য); স্পেনের যে-মেয়েরা নাচে ও গান গায় বারিও চীনোতে, তারা নিতান্তই সুকুমারভাবে নিজেদের দান করে রসজ্ঞদের কাছে। জেলার নানা মঞ্চে আবির্ভূত হয় ‘রক্ষক’ পাওয়ার জন্যে। কিছু সঙ্গীতশালা–আগে যেমন ছিলো কিছু নৈশক্লাব–নিতান্তই বেশ্যালয়। যে-সব বৃত্তিতে নারীরা প্রদর্শনীয়, সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে নাগরালির জন্যে। প্রশ্নাতীতভাবে আছে অনেক মেয়েট্যাক্সি নর্তকীরা, ফ্যান নর্তকীরা, ডিকয় মেয়েরা, দেয়ালে টাঙানোর ছবির মেয়েরা, মডেলরা, গায়িকারা, অভিনেত্রীরা–যারা পৃথক রাখে প্রেমের জীবন ও পেশা; পেশায় যতো বেশি দরকার পড়ে কৌশল ও সৃষ্টিশীলতা, তখন তাকেই লক্ষ্য বলে গণ্য করা যায়; কিন্তু যে-নারী জনসাধারণের কাছে উপস্থিত হয় জীবিকার জন্যে প্রায়ই সে তার রূপকে অধিকতর অন্তরঙ্গভাবে ব্যবসায় খাটানোর প্ররোচনা বোধ করে। উল্টোভাবে, বারবনিতা তার আসল ব্যবসা ঢাকার জন্যে চায় একটা বৃত্তি রাখতে। কলেতের লি, এক বন্ধু যাকে সম্বোধন করেছে ‘প্রিয় শিল্পী’, তার মতো কমই আছে যে উত্তর দিতে পারে : ‘শিল্পী? সত্যিই, আমার প্রেমিকেরা চরম অবিবেচক!’ আমরা দেখেছি যে হেতাইরার খ্যাতিই তাকে দেয় বিপণনযোগ্য দাম, এবং আজকাল মঞ্চে বা পর্দায়ই এমন একটা ‘নাম’ করা যায়, যা হয়ে উঠবে ব্যবসার পুঁজি।

সিন্ডেরেলা সব সময় মনোহর রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে না; স্বামী বা প্রেমিক যা-ই হোক, নারী ভয় পায় যে তারা পরিণত হতে পারে স্বৈরাচারীতে; সে অনেক বেশি পছন্দ করে এটা স্বপ্ন দেখতে যে বিশাল প্রেক্ষাগারের দরোজার পাশে লাগানো আছে তার সহাস্য মুখচ্ছবি। তবে প্রায় অধিকাংশ সময়ই সে তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে পারে পুরুষের ‘রক্ষণ’-এর মাধ্যমে; এবং পুরুষেরাই–স্বামী, প্রেমিক, প্রণয়প্রার্থীরা তাকে বিজয়মুকুটেশোভিৎ করে তাদের অর্থ বা খ্যাতির অংশী করে। বিভিন্ন ব্যক্তি, বা জনতাকে খুশি করার এ-আবশ্যকতাই ‘তারকা’কে সম্পর্কিত করে। হেতাইরার সঙ্গে। তারা সমাজে পালন করে সমতুল্য ভূমিকা।

হেতাইরা শব্দটি আমি ব্যবহার করি সে-সব নারীদের বোঝনোর জন্যে, যারা শুধু দেহ নয়, বরং তাদের সমগ্র ব্যক্তিত্ব নিয়োগ করে শোষণের পুঁজি হিশেবে। হেতাইরা বিশ্বকে প্রকাশ করে না, সে মানবিক সীমাতিক্ৰমণতার কোনো সরণি উন্মুক্ত করে না; এর বিপরীতে, সে নিজের লাভের জন্যে সম্মোহিত করতে চায় বিশ্বকে। অনুরাগীদের কাছে সম্ভোগের জন্যে নিজেকে দান করে, সে ত্যাজ্য করে না তার সে–অক্রিয়নারীত্বকে, যা তাকে উৎসর্গিত করে পুরুষের কাছে : সে একে সমৃদ্ধ করে এক ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতায়, যা তাকে সমর্থ করে পুরুষদের তার রূপের ফাঁদে ধরতে ও তাদের ওপর ফায়দা লুটতে; সে নিজের সঙ্গে তাদের গ্রাস করে সীমাবদ্ধতায়।

যদি সে এ-পথ ধরে, তাহলে নারী সফল হয় কিছুটা স্বাধীনতা অর্জনে। বহু পুরুষের কাছে নিজেকে ভাড়া দিয়ে সে বিশেষ কারো অধীনে থাকে না; সে জমায় যে-টাকা ও যে-নাম ‘বিক্রি করে’, যেমন কেউ বিক্রি করে পণ্যসামগ্রী, তা তার। আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। প্রাচীন গ্রিসের নারীদের মধ্যে যারা সর্বাধিক স্বাধীনতা ভোগ করতো, তারা মাতৃকাও ছিলো না সাধারণ বেশ্যাও ছিলো না, তারা ছিলো হেতাইরা। রেনেসাঁসের বারবনিতারা ও জাপানের গেইশারা তাদের কালের অন্য নারীদের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতো। যে-ফরাশি নারীর স্বাধীনতাকে আমাদের কাছে পুরুষের স্বাধীনতার সমতুল্য বলে সবচেয়ে বেশি মনে হয়, তিনি সম্ভবত সতেরো শতকের বুদ্ধিমান ও রূপসী নারী নিনো দ্য ক্ল। স্ববিরোধীরূপে, যেনারীরা তাদের নারীত্বকে চূড়ান্তরূপে ব্যবহার করে, তারা এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজেদের জন্যে, যা প্রায় পুরুষের পরিস্থিতির সমতুল্য; তারা শুরু করে সে-লিঙ্গ দিয়ে, যা তাদের কর্মরূপে সমর্পণ করে পুরুষদের কাছে, তারপর তারা হয়ে ওঠে কর্তা। তারা শুধু পুরুষদের মতো নিজেদের জীবিকাই অর্জন করে না, তারা বিরাজ করে এমন এক গোষ্ঠির ভেতরে, যা প্রায়-একান্তভাবে পুরুষের; তারা আচরণে ও আলাপচারিতায় স্বাধীন, তারা অর্জন করতে পারে–নিনো দ্য ক্লর মতো–বিরলতম বুদ্ধিবৃত্তিগত মুক্তি। সবচেয়ে সম্মানিতরা প্রায়ই পরিবৃত থাকে শিল্পী ও লেখকদের দিয়ে, যারা ক্লান্তি বোধ করে ‘সতী’ নারীতে।

পুরুষদের কিংবদন্তি চরম মনোমমাহন প্রতিমূর্তি লাভ করে হেতাইরায়; দেহে ও চেতনায় সে সকলের অপ্রাপণীয়, সে প্রতিমা, অনুপ্রেরণা, শিল্পকলার দেবী; চিত্রকর ও ভাস্কররা তাকে চাইবে মডেলরূপে; সে স্বপ্নযোগাবে কবিদের মনে; তার ভেতরের বুদ্ধিজীবীটি সদ্ব্যবহার করবে নারীর ‘বোধি’র সম্পদগুলো। সমতকার থেকে তার পক্ষে বুদ্ধিমান হওয়া সহজ, কেননা তার ভণ্ডামো কম। তাদের মধ্যে যারা প্রতিভায় শ্রেষ্ঠ, তারা শুধু পুরুষদের বিশ্বস্ত মন্ত্রণাদাতা ইজেরিয়ার ভূমিকায়ই সন্তুষ্ট থাকবে না; তারা চাইবে তাদের অক্রিয় গুণগুলোকে কর্মে রূপান্তরিত করতে। সার্বভৌম কর্তারূপে বিশ্বে বেরিয়ে এসে, তারা লেখে কবিতা ও গদ্য, ছবি আঁকে, সঙ্গীত সৃষ্টি করে। এভাবে ইতালীয় বারবনিতাদের মধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ইম্পেরিয়া। নারীর পক্ষে পুরুষকে হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার করা এবং পুরুষটির সহায়তায় তার পক্ষে পুরুষের কাজ সম্পন্ন করাও সম্ভব; ক্ষমতাশালী পুরুষদের প্রিয় রক্ষিতারা, তাদের শক্তিমান প্রেমিকদের মাধ্যমে, সব সময়ই অংশ নিয়েছে বিশ্বশাসনে।

এ-ধরনের নারীমুক্তি কার্যকর হতে পারে কামের স্তরেও। পুরুষের থেকে সে পায় যে-অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা, তা দিয়ে সে ক্ষতিপূরণ করতে পারে তার নারীধর্মী। হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষার; টাকার আছে একটি পবিত্রকর ভূমিকা; এটা অবসান ঘটায় দুলিঙ্গের যুদ্ধের। বহু নারী, যারা পেশাদার নয়, তারা যখন তাদের প্রেমিকদের কাছে থেকে চেক ও উপহার লাভের জন্যে চাপ দেয়, তারা এটা শুধু ধনসম্পত্তির লোভে করে না; কেননা পুরুষটিকে অর্থ ব্যয়ে বাধ্য করা এবং তার জন্যেও ব্যয় করা, আমরা দেখতে পাবো–হচ্ছে তাকে একটি হাতিয়ারে রূপান্তরিত করা। এভাবে নারীটি এড়িয়ে যায় তার নারী হওয়ার ব্যাপারটি। পুরুষটি হয়তো ভাবতে পারে যে নারীটি ‘আছে’ তার, তবে এ-যৌন অধিকারকরণ একটি প্রতিভাস; বরং অধিকতর দৃঢ় আর্থিক ক্ষেত্রে নারীটির অধিকারেই আছে পুরুষটি। তৃপ্ত হয়েছে নারীটির গর্ব। সে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে প্রেমিকের আলিঙ্গনে; এমন কোনো ইচ্ছের কাছে সে ধরা দিচ্ছে না, যা তার নিজের নয়; তার সুখ কোনো অর্থেই তার ওপর ‘হানা’ যাবে; বরং এটাকে মনে হবে একটি অতিরিক্ত সুবিধা; সে ‘নীত’ হবে না, কেননা এর জন্যে তাকে দাম দেয়াহয়েছে।

বারবনিতা, অবশ্য, সুখ্যাত কামশীতল বলে। তার হৃদয় ও তার কামের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারা তার জন্যে উপকারী, কেননা সে যদি ভাবাবেগী বা কামনাপরায়ণ হয়, তাহলে তার ঝুঁকি থাকে একটা পুরুষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার, যে তাকে শোষণ করবে বা তার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে বা তাকে দুঃখযন্ত্রণা দেবে। যে-সব আলিঙ্গন সে গ্রহণ করে। বিশেষ করে তার কর্মজীবনের শুরুতে সেগুলোর অনেকগুলোই অবমাননাকর; পুরুষের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ প্রকাশ পায় তার কামশীতলতায়। হেতাইরারা, মাতৃকাদের মতো, যথেচ্ছ নির্ভর করে ‘ছলচাতুরী’র ওপর, এর ফলে তারা ভাওতাবাজের মতো আচরণ করে। পুরুষদের প্রতি এ-ঘৃণা, এ-বিরাগ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে শোষক-শশাষিতের খেলায় জয় সম্পর্কে এ-নারীরা আদৌ নিশ্চিত নয়। এবং, প্রকৃতপক্ষে, পরনির্ভরতা এখনো তাদের বিপুলসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাগ্য।

কোনো পুরুষই চূড়ান্তরূপে তাদের প্রভু নয়। কিন্তু পুরুষ পাওয়া তাদের জন্যে অতিশয় জরুরি। বারবনিতা তার ভরণপোষণের উপায় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে যদি পুরুষ তার প্রতি আর কামনা বোধ না করে। নতুন পেশাগ্রহণকারী জানে তার সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ পুরুষের হাতে; এমনকি পুরুষের সমর্থন বঞ্চিত হয়ে চিত্রতারকাও দেখতে পায় যে ম্লান হয়ে উঠছে তার মর্যাদা। এমনকি সবচেয়ে রূপসীটিও কখনো আগামী কালের জন্যে নিশ্চিত থাকতে পারে না, কেননা তার অস্ত্রগুলো যাদুধর্মী, আর যাদু অস্থিরমতি। সে দৃঢ়ভাবে বাধা তার রক্ষকের–স্বামী বা প্রেমিকের সাথে, যেমন ‘সতী’ স্ত্রী বাঁধা থাকে স্বামীর সাথে। শয্যাসঙ্গিনী হিশেবেই শুধু পুরুষটিকে তার সেবাদানে বাধ্য নয়, তাকে সহ্য করতে হয় পুরুষটির চালচলন, তার আলাপচারিতা, তার বন্ধুদের, এবং বিশেষ করে তার শ্লাঘার দাবিগুলো। মেয়েটির উঁচুখুড়ের জুতো বা সাটিনের স্কার্টের দাম শোধ করে তার পৃষ্ঠপোষক বিনিয়োগ করে একটা পুঁজি, যা থেকে সে লাভ তুলবে; শিল্পপতি, প্রযোজক তার রক্ষিতাকে মুক্তো ও পশমে ঢেকে দিয়ে তার মধ্য দিয়ে করে নিজের সম্পদ ও ক্ষমতার ঘোষণা; তবে নারীটি টাকা বানানোর একটা উপায়ই হোক বা টাকা ব্যয়ের একটা ছুতোই হোক, দাসত্বশৃঙ্খলটা একই। তার ওপর ঢেকে দেয়া উপহারগুলো শৃঙ্খল। আর এ-গাউনগুলো, এ-রত্নাবলি, যা সে পরে, সে কি আসলেই তার মালিক? অনেক সময় সম্পর্কচ্ছেদের পর পুরুষটি সেগুলো ফেরত চায়, যদিও খুবই ভদ্রভাবে।

তার আনন্দগুলো ছেড়ে না দিয়ে তার রক্ষককে ‘ধরে রাখা’র জন্যে নারীটি প্রয়োগ করবে একই কূটকৌশল, ছলচাতুরি, মিথ্যাচার, ভণ্ডামো, যেগুলো কলুষিত করে বিবাহিত জীবনকে; সে যে শুধু ভান করে দাসত্বের, তার কারণ এ-খেলাটিই দাসত্বের। যতো দিন সে টিকিয়ে রাখে তার রূপ ও সুখ্যাতি, যদি তখনকার প্রভু ঘৃণ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সে তার স্থানে নিতে পারে আরেকটি। তবে রূপ একটা দুশ্চিন্তা, এটা একটি ঠুনকো সম্পদ; হেতাইরা একান্তভাবেই নির্ভর করে তার দেহের ওপর, সময়ের সাথে নির্মমভাবে যার দাম পড়ে যায়; বুড়ো হওয়ার বিরুদ্ধে তার সগ্রাম। ধারণ করে চরম নাটকীয় রূপ। যদি তার মহামর্যাদা থাকে, তাহলে সে তার মুখমণ্ডল ও দেহকাঠামোর ধ্বংসপ্রাপ্তির পরও টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু খ্যাতি টিকিয়ে রাখা, যা তার সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সম্পত্তি, তাকে অধীনস্থ করে নিকৃষ্টতম স্বেচ্ছাচারিতার : জনমতের। হলিউডের তারকাদের অধীনতা সুবিদিত। তাদের দেহ তাদের নিজেদের নয়; প্রযোজক ঠিক করে তাদের চুলের রঙ, তাদের ওজন, তাদের দেহবল্লরী, তাদের ধরন; গালের বাঁক বদল করার জন্যে তুলে ফেলা হতে পারে তাদের দাঁত। স্বল্পাহার, শরীরচর্চা, লাগসই থাকা, হয়ে ওঠে এক দৈনিক ভার। পার্টিতে যাওয়া ও ফষ্টিনষ্টি করার নাম দেয়া হয় ‘সশরীরে আত্মপ্রকাশ’; ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে বাহ্যজীবনের একটি দিক। ফ্রান্সে কোনো লিখিত নিয়ম নেই, তবে ধূর্ত ও চতুর নারী জানে তার ‘প্রচার’ কী দাবি করে তার কাছে। যে-তারকা এসব প্রয়োজনের কাছে সুনম্য হতে অস্বীকার করে, সে ভোগ করে একটি নৃশংস বা ধীর, তবে অবধারিত, সিংহাসনচ্যুতি। জনগণের মনোরঞ্জন যে-নারীর পেশা, তার থেকে সম্ভবত কম ক্রীতদাস একটি বেশ্যা, যে দান করে তার দেহ। কোনো নারী, যে ‘আবির্ভূত’ হয়েছে এবং যাকে বিশেষ। কোনো পেশায় অভিনয়, গান, নাচে–প্রতিভাসম্পন্ন বলে গণ্য করা হয়, সে মুক্তি পায়হেতাইরার অবস্থান থেকে; সে উপভোগ করতে পারে প্রকৃত স্বাধীনতা। কিন্তু অধিকাংশই তাদের জীবনভর থাকে এক আশঙ্কাজনক অবস্থায়, তারা থাকে জনগণের ও পুরুষদের নব নবরূপে মনোরঞ্জনের অন্তহীন আবশ্যকতার নিচে।

প্রায়ই রক্ষিত নারী আত্মস্থ করে নেয় তার পরনির্ভরতা; জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সে মেনে নেয় এর মূল্যবোধগুলো; সে অনুরাগী হয় ফ্যাশনদুরস্ত সমাজের এবং গ্রহণ করে এর রীতিনীতি; সে চায় যে তাকে মূল্যায়ন করা হোক বুর্জোয়া মানদণ্ডের ভিত্তিতে। ধনশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর একটি পরগাছা হয়ে সে গ্রহণ করে মধ্যবিত্তের ভাবনাচিন্তা; সে ‘সৎ-চিন্তাশীল’; কিছুকাল আগে সে তার কন্যাকে পড়াতো কনভেন্টে এবং বুড়ো হওয়ার পর, যথোচিত প্রচারের মধ্যে ধর্মান্তরগ্রহণ করে, যোগ দিতো খ্রিস্টের নৈশভোজপর্ব উদযাপনে। সে থাকে রক্ষণশীলদের পক্ষে। জোলা এ-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন নানার নায়িকার মধ্যে :

বই ও নাটকের বিষয় সম্পর্কে নানার ছিল সুনির্দিষ্ট মত : সে চাইতো কোমল ও মানসিক উন্নতিসাধক শৈলির বই, এমন সব জিনিশ যা তাকে স্বপ্ন দেখাতো ও তার আত্মার নৈতিক উন্নতিসাধন করত… সে ক্ষুব্ধ ছিলো প্রজাতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। ওই শুয়োরগুলো যারা কখনো স্নান করতো না, কী তারা চেয়েছিলো? জনগণ কি সুখী ছিলো না, সম্রাট কি সব কিছু করে নি তাদের জন্যে? আস্ত শুয়োরের পাল, এই জনগণ! সে তাদের চিনতো, সে আপনাকে তাদের সম্পর্কে সব কিছু বলে দিতে পারতো…না, সত্যিই, তাদের প্রজাতন্ত্র সকলের জন্যে হতো একটা মহাবিপর্যয়। হে আমার ঈশ্বর, যতো কাল সম্ভব আমার সম্রাটকে রক্ষা করো।

যুদ্ধের সময় এ-সহজ সতী নারীদের থেকে অধিকতর আক্রমণাত্মক দেশপ্রেম আর কেউ দেখায় না; ভাবালুতার যে-প্রভাব তারা বিস্তার করে, তা দিয়ে তারা আশা করে তারা উঠবে ডাচিসের স্তরে। জনসভায় তাদের বক্তৃতার ভিত্তি হয় গতানুগতিকতা, বহুলব্যবহৃত ধরতাই বুলি, পক্ষপাতদুষ্টতা, এবং প্রথাসম্মত ভাবাবেগ, এবং প্রায়ই তারা হারিয়ে ফেলে আন্তর আন্তরিকতা। মিথ্যাচারিতা ও অতিরঞ্জনের মধ্যে তাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে সর্ববিধ অর্থ। হেতাইরার সমগ্র জীবনটিই একটা প্রদর্শনী; তার মন্তব্যরাশির, তার তোতাপাখির মতো বুলি আবৃত্তির লক্ষ্য চিন্তা প্রকাশ করা নয়, বরং একটা প্রভাব সৃষ্টি করা। তার রক্ষকের সাথে সে অভিনয় করে প্রেমের কমেডির। কখনো কখনো সে এটাকে গ্রহণ করে গুরুত্বের সাথে। জনমতের কাছে সে অভিনয় করে শ্রদ্ধেয় ও মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ার কমেডির, এবং পরিশেষে সে বিশ্বাস করতে থাকে যে সে নিজে হচ্ছে সদগুণের পরমোকর্ষের এক মূর্ত রূপ এবং একটি পবিত্র মূর্তি। প্রতারণা করার এক অনড় উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণ করে তার অন্তর জীবনকে এবং তার ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারগুলোকে প্রতিভাত করে সত্য বলে।

হেতাইরার সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য শুধু এটাই নয় যে তার স্বাধীনতা হচ্ছে সহস্র পরাশ্রিততার প্রতারণামূলক মুদ্রার নকশাখচিত পিঠ, বরং এটাও যে এ-স্বাধীনতা নিজেই নেতিবাচক। রাশেলের মতো অভিনেত্রীদের, আইসোডোরা ডাঙ্কানের মতো নর্তকীদের, যদিও তারা পুরুষদের আনুকূল্য পেয়েছিলেন, আছে এমন এক পেশা, যার জন্যে দরকার যোগ্যতা এবং এটাই তাদের যাথার্থ প্রতিপাদন করে। তারা যেকাজ করেন ও ভালোবাসেন, তার মধ্যে অর্জন করেন সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক স্বাধীনতা। তবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর জন্যে কোনো শিল্পকলা, কোনো পেশা, একটা উপায় মাত্র : এর চর্চার মধ্যে তারা কোনো প্রকৃত কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত থাকে না। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে, যাতে তারকা থাকে পরিচালকের অধীনে, তার পক্ষে কোনো উদ্ভাবনই সম্ভব নয়, কোনো সৃষ্টিশীল কাজ সম্ভব নয়। সে যা, তা ব্যবহার করে অন্য কেউ, সে নতুন কিছু সৃষ্টি করে না। তবু নারীর পক্ষে তারকা হওয়াও খুবই বিরল ঘটনা। নাগরালির ক্ষেত্রে সীমাতিক্ৰমণতার অভিমুখে কোনো রকমের পথ খোলা নেই। এখানে আবার সীমাবদ্ধতায় বন্দী নারীর সঙ্গী হয়ে ওঠে অবসাদ। নানা সম্পর্কে জোলা এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন :

কিন্তু তার বিলাসব্যসনের মধ্যে, এ-রাজসভার মধ্যে নানা বোধ করতো মৃত্যুর ক্লান্তি। রাতের প্রতিটি মুহূর্তে তার পাশে ছিলো পুরুষ এবং সবখানে ছিলো টাকা, এমনকি তার আলমারির দেরাজের ভেতরেও, কিন্তু এসব আর তাকে সুখী করতো না, সে বোধ করতো একটা আন্তর শূন্যতা, এমন একটা শূন্যতাবোধ যাতে সে হাই তুলতো। একই একঘেয়ে সময়ের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আলস্যের মধ্যে মন্থরগতিতে চলতো তার জীবন… সে সময় কাটতো তুচ্ছ হাস্যকৌতুকের মধ্যে তার একমাত্র প্রত্যাশায়, পুরুষের।

মার্কিন সাহিত্যে পাওয়া যায় এ-ঘন অবসাদের বহু বর্ণনা, যা বিহ্বল করে। হলিউডকে ও পৌছানোর সাথেসাথে দখল করে ভ্রমণকারীকে। অভিনয়কারীরা এবং অতিরিক্তরাও ক্লান্ত হয়ে ওঠে সে-নারীদের মতে, যাদের পরিস্থিতির তারা অংশীদার। যেমন ঘটে ফ্রান্সে, অফিসীয় পার্টিগুলোর প্রকৃতি প্রায়ই হয় ক্লান্তিকর দায়িত্বপালন। কোনো ‘ক্ষুদে তারকা’র জীবন নিয়ন্ত্রণ করে যে-পৃষ্ঠপোষক, সে সাধারণত হয় বয়স্ক পুরুষ, যার বন্ধুরা তার বয়সের; তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো তরুণীটির কাছে অপরিচিত, তাদের আলাপচারিতা ভয়াবহ; সাধারণ বিয়ের থেকেও গভীরতর একটি ফারাক থাকে বিশ বছরের একটি শিক্ষানবিশ ও পঁয়তাল্লিশ বছরের একটি ব্যাংকব্যবসাদারের মধ্যে, যারা একত্রে কাটায় তাদের রাত্রিগুলো।

হেতাইরা যে-মোলোকের কাছে উৎসর্গ করে তার সুখ, প্রেম, স্বাধীনতা, তা হচ্ছে তার কর্মজীবন। মাত্র আদর্শ হচ্ছে সুখসমৃদ্ধির একটি স্থিত জলবায়ু, যা ঢেকে রাখে স্বামী ও সন্তানদের সাথে তার সম্পর্ককে। ‘কর্মজীবন’ সময়ের সাথে বৃদ্ধি পায়, তবে এটাও একটি সীমাবদ্ধ লক্ষ্য, যা সংহতরূপ নেয় একটি নামে। সামাজিক মানদণ্ড বেয়ে যতোই ওপর থেকে ওপরে উঠতে থাকে নামটি ততোই বৃহত্তর হতে থাকে বিজ্ঞাপনমঞ্চে ও সর্বসাধারণের মুখে। আরোহণকারিণী তার ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে, তার মেজাজ অনুসারে, দূরদর্শিতা বা স্পর্ধার সাথে। এক নারী তার কর্মজীবনে আলমারিতে চমৎকার পোশাকপরিচ্ছদ ভাঁজ করে রেখে উপভোগ করে গৃহিণীর সুখ; আরেকজন, উপভোগ করে অভিযাত্রার মাদকতা। কিছু নারী নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে নিরন্তর আক্রান্ত একটি পরিস্থিতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার জন্যে, যা অনেক সময় ভেঙেচুরে পড়ে; অন্যরা অন্তহীনভাবে গড়তে থাকে তাদের খ্যাতি, আকাশ-অভিমুখি বাবেলের অট্টালিকার মতো নিরর্থকভাবে। অনেকে, যারা নাগরালির সাথে যুক্ত করে তাদের অন্যান্য কর্ম, তাদেরই মনে হয় প্রকৃত অভিযাত্রিণী : এরা হচ্ছে গুপ্তচর, মাতা হারির মতো, বা নিজ সরকারের পক্ষে গুপ্তচর। সাধারণভাবে তাদের পরিকল্পনাগুলো সূচনার দায় তাদের নয়, তারা বরং পুরুষের হাতে হাতিয়ারের মতো। তবে, মোটের ওপর, হেতাইরার মনোভাব কম-বেশি অভিযাত্রীর মনোভাবের সমগোত্রীয়; তার মতো, সে প্রায়ই একাগ্রচিত্ত ও রোমাঞ্চ-এর মাঝামাঝি; তার লক্ষ্য গতানুগতিক মূল্যবোধ, যেমন টাকা ও খ্যাতি। পুরুষের প্রতি নিবেদিত নারীর নিয়তি হচ্ছে তার মনে হানা দিতে থাকে প্রেম; তবে যে-নারী শোষণ করে পুরুষকে, সে তার নিজের প্রতি ভক্তিনিবেদনের ফলে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। তার খ্যাতির কারণে যদি সে বিবেচিত হয় অতিশয় মূল্যবান বলে, তবে তা একান্তভাবে আর্থিক কারণে নয়–সে খ্যাতির মধ্যে চায় তার আত্মরতিকে মহিমান্বিত করতে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x