অনেকেই বোধহয় দেখেছেন রাস্তার পাশে, বাজার হাটে, মাঠে-ময়দানে, খোলা জায়গায় এক ধরনের বেদে-সম্প্রদায়ের লোকে শূন্যে ভাসবার খেলা দেখায়। তবে ওরা দাবি করে- এটা ম্যাজিক নয়, অলৌকিক ঘটনা। সত্য সাঁই-এর ছোট একটা বাঁধানো ছবি, দু-একটা হাড়, মড়ার খুলি ও ছোট্ট একটা টিনের বাক্সে কিছু তাবিক সাজিয়ে সত্য সাই-এর অপার কৃপায় নানা ধরনের ‘অলৌকিক’ খেলা দেখায়।

এই বেদে-সম্প্রদায় অবশ্য সবসময়ই লোক ঠকানোর জন্য ওদের বিভিন্ন খেলাকেই অলৌকিক আখ্যা দিয়ে থাকে। যুক্তি দিয়ে খেলাগুলোর ব্যাখ্যা না পেলে দর্শকরা অনেক সময় ওদের কথায় বিশ্বাস করে ফেলেন এবং চটপট নগদ দামে অলৌকিক মাদুলিও কিনে ফেলেন। অনেকে না কিনলেও এইটুকু অন্তত বিশ্বাস করে ফেলেন, ওরা তন্ত্র-মন্ত্র ও তুক-তাকে সিদ্ধ কিনলেও এইটুকু অন্তত বিশ্বাস করে ফেলেন, ওরা তন্ত্র-মন্ত্র ও তুক-তাকে সিদ্ধ মানুষ। অবশ্য এই বইটি লেখার পর লক্ষ কোটি মানুষ এখন কৌশলটি জেনেছেন।

আমাকে অনেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করেছেন, ব্ল্যাক-আর্ট, ঘরের দেওয়ালের সাহায্য বা কোন ডান্ডার সাহায্য ছাড়াই অনেক বেদে-সম্প্রদায়ের লোকেরা খোলা জায়গায় মানুষকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখে। এটা কি করে সম্ভব?

আমি বলি, এটাও একটা লৌকিক খেলা। আরও অনেক অত্যাশ্চর্য ‘অলৌকিক’ ঘটনার মতোই এর পেছনেও রয়েছে অতি সাধারণ কৌশল। অথচ, আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও খেলাটি দেখে সাধারণ দর্শক কেন, অনেক বিশেষজ্ঞ জাদুকরকেও আশ্চর্য হতে দেখেছি। ঠিক কি ভাবে খেলাটা দর্শকের কাছে হাজির কি হয় তার একটু বর্ণনা দিলে বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

খোলামাঠে শূন্যে ভাসানো হচ্ছে

সত্য-সাঁই বা অন্য কোনও ঈশ্বরের কৃপায় অলৌকিক ক্ষমতাধর বেদে তার এক সহকারীকে মাটির ওপর শুইয়ে বিশাল এক চাদর দিয়ে তাকে ঢেকে দেয়। চাদরে থাকে একটা ফুটো, যা দিয়ে মাথাটা শুধু বেরিয়ে থাকে। তারপর ডমরু বা বাঁশি বাজিয়ে বেদেটি সহকারীটির চারপাশে ঘুরতে থাকে। একসময় মড়ার হাড় বা খুলি নিয়ে নানা মন্ত্রপাঠ করতে থাকে। বেদেটির আহ্বানে ওর আরও দু’জন সহকারী বা দু’জন দর্শক (এরাও বেদেটিরই লোক) এগিয়ে এসে শুয়ে থাকা দেহটির মাথা ও পায়ের দিকে চাদরটা ধরে একটু নেড়ে দেয়। কি আশ্চর্য! সহকারীর চাদরে ঢাকা দেহ একটু একটু করে শূন্যে উঠতে থাকে এবং একসময় দেহটা শূন্যে দেড়-ফুটের মতো উঁচুতে ভাসতে থাকে।

ছবিটিতে দেখিয়েছি বেদেটির সহকারীর শরীর শূন্যে ভেসে রয়েছে, এবং ওর শরীর ঢেকে দেওয়া চাদরটা মাটি পর্যন্ত লুটিয়ে রয়েছে।

শূন্যে ভেসে থাকার নেপথ্যে

মাটি পর্যন্ত লুটিয়ে থাকা চাদরের তলায় রয়েছে ভেসে আসল রহস্য। চাদরের তলায় সহকারী হকিস্টিক ও ঐ ধরনের কোন লাঠির সাহায্য নিয়ে যা করে তা পরের ছবিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন।

এই ধরণের খেলা বসে এবং দাঁড়িয়ে দুভাবেই দেখানো সম্ভব। দাঁড়িয়ে দেখালে উচ্চতা বাড়বে।

এই প্রসঙ্গে একটি জার অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। একটি স্ব-ঘোষিত যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান-মনস্ক, সমাজ সচেতন মাসিক পত্রিকার (বর্তমানে উঠে গেছে) জনৈক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আমাকে অনুরোধ করলেন, তাঁদের পত্রিকার জন্য ‘শূন্যে ভাসার কৌশল’ নিয়ে একটা লেখা তৈরি করে দিতে। সম্পাদককে লেখাটি দিলাম। আমার এই বইতে এতক্ষণ শূন্যে ভাসার যে-সব কৌশলগুলোর সঙ্গে আপনারা পরিচিত হলেন, সেগুলোই লিখেছিলাম ওই লেখাটিতে। লেখাটি খুব শিগগিরই ফেরত পেলাম ওই পত্রিকারই সম্পাদকমণ্ডলীর আর এক সদস্যের হাত থেকে। তিনি জানালেন, “লেখাটা মনোনীত হয়নি। কেন মনোনীত হয়নি, তা ওপরের পাতাতেই লিখে দিয়েছি।“

কারও লেখাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমার লেখা অমনোনীত হাওয়ার মধ্যে বিস্ময়ের কিছুই ছিল না। কিন্তু আমার জন্য এক রাশ শঙ্কা ও বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছিল অমনোনীত লেখার প্রথম পৃষ্ঠাটি। তাতে লেখাটি প্রসঙ্গে সম্পাদকমণ্ডলীর তিনজনের স্বাক্ষরিত মন্তব্য রয়েছে।

একজন লিখেছেন, “কৌশলগুলো কতখানি নির্ভরযোগ্য সে সন্দেহ থাকে।“

দ্বিতীয় জনের মন্তব্য, “শূন্যে ভাসার technique গুলি convincing নয়। কাপড় ঢাকার কায়দাটাও ফাঁকিবাজিতে সারা হয়েছে।“

তৃতীয় সম্পাদকের সিদ্ধান্তে ঘোষিত হয়েছে, “চাদর ঢাকার ব্যাপারটা ভুল describe করেছেন। sorry।“

যুক্তিবাদী বলে স্ব-ঘোষিত মানুষগুলোর এমন যুক্তিহীন মনগড়া মন্তব্যে যতটা বিস্মিত হই, শঙ্কিত হই তার চেয়েও বেশি।

তিন সম্পাদক শূন্যে ভাসার কৌশলগুলো অসার, মিথ্যে বলে মন্তব্য করার আগে তাঁরা দু’টি পথের যে কোনও একটিকে বেছে নিতে পারতেন।

একঃ ‘হাতে-কলমে’ আমার বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখতে পারতেন, এগুলো সত্যিই শূন্যে ভাসার কৌশল কি না?

দুইঃ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কোনও প্রতিষ্ঠিত জাদুকরের কাছ থেকে মতামত নিতে পারতেন।

১১ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সাংবাদিক সম্মেলনে শূন্যে ভাসা

দু’টির কোনও পথকেই গ্রহণ না করে এই ধরনের অন্ধ-বিশ্বাস মিশ্রিত সিদ্ধান্তে পৌছোনো আর যাকেই শোভা পাক, কোনও যুক্তিবাদী বলে স্ব-বিজ্ঞাপিত মানুষদের শোভা পায় না।

১৯৮৬-র কলিকাতা পুস্তক মেলায় বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের সমিতি, বহু সহযোগী সংস্থা, বিভিন্ন বিজ্ঞান ক্লাব ও যুক্তিবাদী সংগঠন অন্তত কয়েক হাজার অলৌকিক বিরোধী প্রদর্শনীতে আমার বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করে চাদরে ঢেকে শূন্যে ভাসার ঘটনাটি দেখিয়ে স্ব-ঘোষিত তিন যুক্তিবাদী সম্পাদকের মন্তব্যের অসারতা এবং যুক্তিহীনতাকে প্রমাণ করে দিয়েছে।

স্ব-ঘোষিত জ্যোতিষ সম্রাটদের মতো করে ‘যুক্তিবাদী’ ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ ইত্যাদি কথাগুলো নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে প্রচারের মাধ্যমে কিছু মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাদের কাছে যুক্তিবাদী সাজা যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের যুক্তিবাদী হওয়া যায় না। কারণ-

যুক্তিবাদী সাজা যায় না। শুধুমাত্র জীবনচর্যার মধ্য দিয়েই যুক্তিবাদী হতে হয়। যুক্তিবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হলে নিজেকে যুক্তিবাদী হতে হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম সম্ভব  নয়।

যুক্তিকে বাদ দেওয়া যুক্তিবাদী মানুষগুলো যখন যুক্তিবাদী আন্দোলনের নেতা সাজে, তখন শঙ্কিত হই। শঙ্কার কারণ, এঁদের যুক্তিহীন চিন্তাধারা, চিন্তার অস্বচ্ছতা, ঈর্ষাকাতরতা, মানুষদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে প্রবলতর ভূমিকা নেবে।

ভূমিকা

কিছু কথা

নতুন ‘কিছু কথা’

১. অধ্যায়ঃ এক

২. অধ্যায়ঃ দুই

৩. অধ্যায়ঃ তিন

৩.১ ব্রক্ষ্মচারী বাবা

৩.২ বিখ্যাত মহারাজের শূন্যে ভাসা

৩.৩ ব্ল্যাক আর্ট ছাড়া সাধিকার শূন্যে ভাসা

৩.৪ লাঠিতে হাতকে বিশ্রাম দিয়ে শূন্যে ভাসা

৩.৫ বেদে-বেদেনীদের শূন্যে ভাসা

৩.৬ মন্ত্রে যজ্ঞের আগুন জ্বলে

৩.৭ সাঁই বাবাঃ সাঁইবাবার অলৌকিক ঘড়ি-রহস্য

৩.৮ কেন এমন হয়

৩.৯ সাঁইবাবার ছবিতে জ্যোতি

৩.১০ সাঁইবাবার বিভূতি

৩.১১ শূন্য থেকে হার আনলেন ও হার মানলেন সাঁই

৩.১২ সাঁইবাবার চ্যালেঞ্জঃ পেটে হবে মোহর!

৩.১৩ ছবি থেকে ছাই

৩.১৪ শূন্য থেকে হিরের আংটি

৩.১৫ কৃষ্ণ অবতার কিট্টি

৩.১৬ যে সাধকরা একই সময়ে একাধিক স্থানে হাজির ছিলেন

৩.১৭ অতিন্দ্রীয় ক্ষমতার তান্ত্রিক ও সন্ন্যাসীরা

৩.১৮ কামদেবপুরের ফকিরবাবা

৩.১৯ আগরতলার ফুলবাবা

৩.২০ অবতারদের নিজদেহে রোগ গ্রহণ

৩.২১ বিশ্বাসে অসুখ সারে

৩.২২ ফুঁ বাবা

৩.২৩ ডাব বাবা

৩.২৫ ডাইনি সম্রাজ্ঞী ইপ্সিতা

৩.২৬ বকনা গরুর অলৌকিক দুধ ও মেহবেব আলি

৩.২৭ বাবা তারক ভোলার মন্দির ও শ্রীশ্রীবাসুদেব

৩.২৮ যোগে বৃষ্টি আনলেন শিববাল যোগী

৩.২৯ চন্দননগরে সাধুর মৃতকে প্রাণ-দান

৩.৩০ ভগবান শ্রীসদানন্দ দেবঠাকুর

৩.৩১ আগুনে হাঁটার অলৌকিক ঘটনা

৪. অধ্যায়ঃ চার

৫. অধ্যায়ঃ পাঁচ

৬. অধ্যায়ঃ ছয়

৭. অধ্যায়ঃ সাত

৮. অধ্যায়ঃ আট

৯. অধ্যায়ঃ নয়

১০. অধ্যায়ঃ দশ

১১. অধ্যায়ঃ এগারো

১২. অধ্যায়ঃ বার

১৩. অধ্যায়ঃ তেরো

১৪. অধ্যায়ঃ চোদ্দ

১৫. অধ্যায়ঃ পনের

১৬. অধ্যায়ঃ ষোল

১৭. অধ্যায়ঃ সতেরো

১৮. অধ্যায়ঃ আঠারো

১৯. অধ্যায়ঃ ঊনিশ

২০. অধ্যায়ঃ কুড়ি

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x