বিষ-পাথরে সাপের বিষ নষ্ট করা যায়, এই ধরনের বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। আদিবাসী ওঝা গুণীনের পাশাপাশি অ-আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিষ-পাথরের প্রচলন রয়েছে।

বিষ-পাথর ব্যবহার করা হয় এইভাবে। সাপে কাটা রোগীকে আনার পর তার ক্ষতস্থানে পাথর ধরা হয়। পাথর নাকি ক্ষতস্থান থেকে দ্রুত বিষ শুষে নিতে থাকে। পাথরটাকে বিষমুক্ত করতে এক বাটি দুধে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা হয়। দুধের রং সাপের বিষে নীল হতে থাকে। পাথরটা তুলে আবার ক্ষতস্থানে বসান হয়। কিছু পরে পাথরের বিষ নামাতে আবার চলে পাথরের দুধ স্নান। এমনি চলতেই থাকে। এরই মাঝে রোগীকে গোলমরিচ খাওয়ানো হয়। রোগীকে জিজ্ঞেস করা হয় ঝাল লাগছে কি না। রোগী জানান, ঝাল লাগছে না। আবারও চলতে থাকে বিষ পাথরের বিষ তোলা। এক সময় রোগী জানান, গোলমরিচ ঝাল লাগছে। আনা হয় আর এক বাটি দুধ। এবার ক্ষতস্থানে বিষ বসিয়ে পাথর দুধে ফেলা হয়। দর্শকরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেন দুধ আর নীল হচ্ছে না। পাথরের অদ্ভুত ক্ষমতায় প্রতিটি প্রত্যক্ষদর্শী অবাক মানেন। রোগীও বাড়ি ফেরেন সুস্থ শরীরে।

বিষ পাথর বিষ তোলে না। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক তবে দুধ কেন নীল হয়? উত্তর একটাই- ওঝা বা গুণীন দুধে ছোট্ট একটি নীলের টুকরো ফেলে দেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুধে নীল দ্রবীভূত হতে থাকে এবং দুধও গভীর থেকে গভীরতর নীল রং ধারণ করতে থাকে।

রোগী কেন তবে গোলমরিচের ঝাল অনুভব করতে পারেন না? উত্তর এখানেও একটাই- গোলমরিচ বলে রোগীকে খাওয়ানো হয় পাকা পেঁপের বীচি। ঝাল লাগবে কি করে?

কিন্তু অসুস্থ সাপে কাটা রোগী সুস্থ হয় কি করে? উত্তর এখানেও একটাই- কামড়ে ছিল নির্বিষ সাপ। তাই, বিষে অসুস্থ হওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না।

গোলমরিচ পরে কেন ঝাল লেগেছে বা দুধ পরে কেন নীল হয়নি, এর উত্তর নিশ্চয়ই আপনারা পেয়েই গেছেন, ঝাল লেগেছে তখনই, যখন  গোল মরিচই খেতে দেওয়া হয়েছে। দুধ সাদা থাকে তখনই, যখন দুধে নীল পড়েনি।

এও তো ঠিক, নির্বিষ সাপের কামড় চিনতে না পারলে মৃত্যু-ভয়ে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়তেই পারে। আবার বিষ-পাথরের পুরো কর্মকাণ্ড দেখার পর বিষ-মুক্ত হয়েছেন বিশ্বাসেই মানসিক অসুস্থতা বিদায় নেয়।

এই প্রসঙ্গে জানাই, কৃষ্ণনগরে জনৈক পাদ্রী সাহেব দাবি করেন, তিনি বিষ পাথরে রোগীর দেহ থেকে সাপের বিষ টেনে নিয়ে সক্ষম। ওই দাবীদারকে আমাদের সমিতির তরফ থেকে বার বার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি। আমাদের সহযোগী সংস্থা কৃষ্ণনগরের ‘বিবর্তন’ পত্রিকা গোষ্ঠি আয়োজিত কৃষ্ণনগরেরই বিভিন্ন প্রকাশ্য সভায় আমরা এই চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছি। নদীয়া জেলার বেথুয়াডহরী বিজ্ঞান পরিষদ আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় ‘৮৮ ও ৮৯’ সালে পোস্টার নিয়ে বিশাল পদযাত্রাও হয়েছে। সেখান থেকেও ঘোষিত হয়েছে আমাদের সমিতির সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরও আর এক চিকিৎসক উত্তম কুমার বিশ্বাস একইভাবে বিষ-পাথরের সাহায্যে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইনিও নাকি কৃষ্ণনগরের পাদ্রী সাহেবের মতই বেলজিয়ামের বিষ-পাথর দিয়ে সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা করেন। দাবি করেন, হাসপাতাল যে রোগীকে ভর্তি করতে সাহস করেননি, সেইসব রোগীদেরও তিনি ভাল করে দেন।

এই দুই বেলজিয়াম বিষপাথর প্রয়োগকারী যে ভাবে বিষ-পাথর ব্যবহার করেন সেটা খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করছি। রোগীর সাপেকাটা জায়গাটার আশেপাশে কয়েকটা স্থান নতুন ব্লেড বা ধারাল অস্ত্র দিয়ে চিরে ফেলেন। চেরা জায়গায় উপর বিষ-আপ্তহ্র বসিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। ব্যান্ডেজ খুলে আমাকে এবং ‘ইন্ডিয়া টু-ডের’ প্রতিনিধি দেখিয়েছেন, বিষ-পাথর শরীরে লেগে রয়েছে। বিষ পাথরগুলোকে দেখে আপাতভাবে পাথর বলে মনে হয়নি। একটা স্লেটকে বহু ছোট ছোট টুকরো করলে যে ধরনের দেখাবে, বিষ-পাথরগুলো অনেকটা সে ধরনের। পার্থক্য এই বিষ-পাথর কিছুটা আঠা আঠা তেলতেলে ও চকচকে। শরীরে একটু চেপে দিয়ে দেখেছি, কিছুক্ষনের জন্য বসে যায়। পাথরের তিনটে টুকরো সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। ভূতত্ত্ববিদ সংকর্ষণ রায়কে একটি পাথর দিয়েছিলাম। তার অভিমত- ন্যাচারাল পাথর নয়। কৃত্রিমভাবে তৈরি। আঠাজাতীয় কিছু রয়েছে।

৩ জুন ৯০। বিকেলে ডাক্তার বিশ্বাসের চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেদিন তাঁর চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ন’জন। তাদেরই একজন সাধনা মণ্ডল। থাকে, ঠাকুরনগর চিকনপাড়ায়- কিশোরী। ডাক্তারবাবু জানালেন, ‘সাধনাকে পদ্ম-গোখরো কামড়ে ছিল। খুব যন্ত্রণা ফিল করছিল।’ সাধনাও জানাল, ‘যখন কামড়েছিল তারপর থেকে যন্ত্রণা প্রচণ্ড বেড়েই যাচ্ছিল।’

অথচ মজা হল, এই পদ্ম-গোখরো কামড়ালে যন্ত্রণা বাড়ত না। কারণ এই সাপে বিষ স্নায়ুগুলোকে অসাড় করে। ডাঃ বিশ্বাস এই জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই কেমন পসার জমিয়ে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করে চলেছেন। কারণ ৯০ সালের জুনেই তাঁর কাছে চিকিৎসিত হতে এসে কয়েকজন রোগী মারা যান। মৃতেরা বিষাক্ত সাপের কামড় খেয়েছিলেন এবং ডাক্তার বিশ্বাসের পক্ষে বা বিষ-পাথরের পক্ষে রোগীকে বিষ-মুক্ত করা সম্ভব নয় বলেই রোগীদের মৃত্যু হয়েছিল।

ডাঃ বিশ্বাস ও কৃষ্ণনগরের পাদ্রী নিঃসন্দেহে ঘাতকের ভূমিকাই পালন করে চলেছেন। রোগী ও তার আত্মীয়দের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে শোষণ ও হত্যা চালিয়েই যাচ্ছেন।

আমাদের সামিতির তরফ থেকে এই দুই ডাক্তার সহ বিষ-পাথরের দাবীদারদের জানাচ্ছি খোলা চ্যালেঞ্জ। তাঁরা প্রমাণ করুণ তাঁদের বিষ-পাথরের বিষ শোষণের ক্ষমতা আছে। শর্ত এই- আমরাই বিষাক্ত সাপ সরবরাহ করবো। একই সঙ্গে সরকারী প্রশাসনের কাছে দাবী- মানুষের জীবন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।

এমন শর্তের পিছনে কারণটি হল- বিষ থলে অপারেশন করে বাদ দেওয়া সম্ভব। দক্ষিণ ২৪ পরগণার নাজির আলির কাছে অনেক সাপের ওঝা ও তথাকথিত সর্পবিশারদ এসে বিষের থলিহীন বিষ দাঁতওয়ালা সাপ কিনে নিয়ে যান। এক্ষেত্রে সাপটি বিষাক্ত এবং বিষ দাঁতওয়ালা হলেও বাস্তবে কিন্তু নির্বিষ। তাই সাপটি সরবরাহের দায়িত্ব রাখতে চাই নিজেদের হাতে। পশুটিকেও আমরাই হাজির করতে চাই এ জন্যে, যাতে বিষ প্রতিষেধক ব্যবস্থা একটু একটু করে পশুর শরীরে গড়ে তুলে সেই পশুটিকে হাজির করে বিষ-পাথরের কারবারিরা আমাদের মাৎ না করতে পারেন।

অনেকের বিশ্বাস ওঝা, গুনীনদের হাত চেলে সাপের বিষ নামাতে সক্ষম। ধারণা অমূলক। মন্ত্র পড়ে হাত চালিয়ে ওঝারা তাঁদেরই সুস্থ করতে সক্ষম যাঁদের বিষাক্ত সাপ দংশন করেনি।

বিষাক্ত সাপ কামড়েছে অনুমান করে মানসিকভাবে যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁরা

বাঁ দিক থেকে ডাঃ সন্দীপ পাল, লেখক, বিষপাথর চিকিৎসক ডাঃ উত্তমকুমার বিশ্বাস ও যুক্তিবাদী সমিতির সহ-সভাপতি ডাঃ বিরল মল্লিক।

যখন দেখেন হাত চেলে দুধে হাত ধুয়ে ফেলতেই দুধ নীল হয়ে যাচ্ছে, গোল মরিচ কামড়েও ঝাল না পাওয়া অসাড় জিভ একটু একটু করে সার ফিরে পাচ্ছে, অনুভব করতে পারছে গোল-মরিচের ঝাল স্বাদ, তখন স্বভাবতই হাত-চলার অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ফেলেন।