শ্লোক – ২৬

তত্রাপশ্যৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান।

আচার্যান্মাতুলান ভ্রাতৃন পুত্রান পৌত্রান সখীসংস্তথা।

শ্বশুরান সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি ।। ২৬ ।।

তত্র- সেখানে; অপশ্যৎ- দেখলেন; স্থিতান- অবস্থিত; পার্থঃ- অর্জুন; পিতৃন- পিতৃব্যদের; অথ- ও; পিতামহান- পিতামহদের; আচার্যান- শিক্ষকদের; মাতুলান- মাতুলদের; ভ্রাতৃন- ভ্রাতাদের; পুত্রান- পুত্রদের; পৌত্রান- পৌত্রদের; সখীন- বন্ধুদের; তথা- ও; শ্বশুরান- শ্বশুরদের; সুহৃদঃ- শুভাকাঙ্ক্ষীদের; চ- ও; এব- অবশ্যই; সেনয়োঃ- সেনাদলের; উভয়োঃ- উভয়; অপি- অন্তর্ভুক্ত।

গীতার গান

তারপর দেখে পার্থ যোদ্ধৃপিতৃগণ।

আচার্য মাতুল আদি পিতৃসম হন।।

দেখে পুত্র পৌত্রাদিক যত সখাজন।

আর সব বহু লোক আত্মীয়স্বজন।।

শ্বশুরাদি কুটুম্বীয় নাহি পারাপার।

উভয়পক্ষীয় সৈন্য সে হল অপার।।

অনুবাদঃ তখন নরজুন উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যে পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, শ্বশুর, মিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিত দেখতে পেলেন।

তাৎপর্যঃ যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পেলেন। তিনি ভুরিশ্রবা আদি পিতৃবন্ধুদের দেখলেন; ভীষ্মদেব, সোমদত্ত আদি পিতামহদের দেখলেন; দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য আদি শিক্ষা-গুরুদের দেখলেন; পুত্রতুল্য লক্ষ্মণকে দেখলেন; অশ্বত্থামার মতো বন্ধুকে দেখলেন; কৃতবর্মার মতো শুভাকাঙ্ক্ষীকে দেখলেন। এভাবে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের মধ্যে তিনি কেবল আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরই দেখলেন।

শ্লোক – ২৭

তান সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান বন্ধুনবস্থিতান।

কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ ।। ২৭ ।।

তান- তাঁদের; সমীক্ষ্য- দেখে; সঃ- তিনি; কৌন্তেয়ঃ- কুন্তীপুত্র; সর্বান- সব রকমের; বন্ধুন- বন্ধুদের; অবস্থিতান- অবস্থিত; কৃপয়া- কৃপার দ্বারা; পরয়া- অত্যন্ত; আবিষ্টঃ- অভিভূত হয়ে; বিষীদন- দুঃখ করতে করতে; ইদম- এভাবে; অব্রবীৎ- বললেন।

গীতার গান

তাদের দেখিল পার্থ সবই বান্ধব।

কাঁপিল হৃদয় তার বিষণ্ণ বৈভব।।

কৃপাতে কাঁদিল মনঃ অতি দয়াবান।

বিষণ্ণ হইয়া বলে শুন ভগবান।।

অনুবাদঃ যখন কুন্তীপুত্র অর্জুন সকল রকমের বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাবিষ্ট ও বিষণ্ণ হয়ে বললেন।

শ্লোক – ২৮

অর্জুন উবাচ

দৃষ্টেমং স্বজনং কৃষ্ণ যুযৎসুং সমুপস্থিতম।

সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি ।। ২৮ ।।

অর্জুনঃ উবাচ- অর্জুন বললেন; দৃষ্টা- দেখে; ইমম- এই সমস্ত; স্বজনম- আত্মীয়-স্বজনদের; কৃষ্ণ- হে কৃষ্ণ; যুযুৎসুম- যুদ্ধাভিলাষী; সমুপস্থিত-সমবেত; সীদন্তি- অবসন্ন হচ্ছে; মম- আমার; গ্রাত্রাণি- সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ; মুখম- মুখ; চ- ও; পরিশুষ্যাতি- শুষ্ক হচ্ছে।

গীতার গান

অর্জুন কহয়ে কৃষ্ণ এরা যে স্বজন।

রণাঙ্গনে আসিয়াছে করিবারে রণ।।

দেখিয়া আমার গাত্রে হয়েছে রোমাঞ্চ।

মুখমধ্যে রস নাই এ যে মহাবঞ্চ।।

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে প্রিয়বর কৃষ্ণ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।

তাৎপর্যঃ যিনি প্রকৃত ভগবদ্ভক্ত তাঁর মধ্যে সদগুণগুলিই বর্তমান থাকে, যা সাধারণত দেবতা ও দৈবী ভাবাপন্ন মানুষের মধ্যে কেবল দেখা যায়। পক্ষান্তরে যারা অভক্ত, ভগবৎ-বিমুখ, তারা জাগতিক শিক্ষা-সংস্কৃতির মাপকাঠিতে যতই উন্নত বলে প্রতীত হোক, তাদের মধ্যে এই সমস্ত দৈব গুণগুলির প্রকাশ একেবারেই দেখা যায় না। সেই কারণেই, যে সমস্ত হীন মনোভাবাপন্ন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবেরা অর্জুনকে সব রকম দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি, যারা তাঁকে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার জন্য এই যুদ্ধের আয়োজন করেছিল, এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদেরই দেখে অর্জুনের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল। তাঁর স্বপক্ষের সৈন্যদের প্রতি অর্জুনের সহানুভূতি ছিল অতি গভীর, কিন্তু যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে এমনকি শত্রুপক্ষের সৈন্যদের দেখে এবং তাদের আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অর্জুন শোকাতুর হয়ে পড়েছিলেন। সেই গভীর শোকে তাঁর শরীর কাঁপছিল, মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কুরুপক্ষের এই যুদ্ধলালসা তাঁকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল। বাস্তবিক পক্ষে সমস্ত শ্রেণীর লোকেরা এবং অর্জুনের রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত আত্মীয়-স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছে। তাদের এই নিষ্ঠুর মনোভাব অর্জুনের মতো দয়ালু ভগবদ্ভক্তকে অভিভূত করেছিল। এখানে যদিও এই কথার উল্লেখ করা হয়নি, তবু আমাদের অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, অর্জুনের শরীর কেবল শুষ্ক ও কম্পিতই হয়নি, সেই সঙ্গে অনুকম্পা ও সহানুভূতিতে তাঁর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জলও পড়ছিল। অর্জুনের এই ধরণের আচরণ তাঁর দুর্বলতার প্রকাশ নয়, এ হচ্ছে তাঁর হৃদয়ের কোমলতার প্রকাশ। ভগবানের ভক্ত করুণার সিন্ধু, অপরের দুঃখে তাঁর অন্তর কাঁদে। তাই, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্ত অর্জুন বীরশ্রেষ্ঠ হলেও তাঁর অন্তরের কোমলতার পরিচয় আমরা এখানে পাই। তাই শ্রীমদ্ভগবতে বলা হয়েছে-

যস্যাস্তি ভক্তির্ভগবত্যকিঞ্চনা

সর্বৈগুণৈস্তত্র সমাসতে সুরাঃ।

হরাবভক্তস্য কুতো মহদগুণা

মনোরথেনাসতি ধাবতো বহিঃ।।

“ভগবানের প্রতি যার অবিচলিত ভক্তি আছে, তিনি দেবতাদের সব কয়টি মহৎ গুণের দ্বারা ভূষিত। কিন্তু যে ভগবদ্ভক্ত নয়, তার যা কিছু গুণ সবই জাগতিক এবং সেগুলির কোনই মূল্য নেই। কারণ, সে মনোধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সে অবধারিত ভাবেই চোখ-ধাঁধানো জাগতিক শক্তির দ্বারা আকর্ষিত হয়ে পড়ে।” (ভগবত ৫/১৮/১২)

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x