শ্লোক – ১৯

স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ।

নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন ।। ১৯ ।।

সঃ- সেই, ঘোষঃ- শব্দ স্পন্দন; ধার্তরাষ্ট্রাণাম- ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; হৃদয়ানি- হৃদয়; ব্যদারয়ৎ- চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল; নভঃ- আকাশ; চ- ও; পৃথিবীম- পৃথিবীকে; চ- ও; এব- অবশ্যই; তুমুলঃ- প্রচন্ড; অভ্যনুনাদয়ন- অনুরণিত হয়ে।

গীতার গান

সে শব্দ ভাঙ্গিল বুক ধার্তরাষ্ট্রগণে।

আকাশ ভেদিল পৃথ্বী কাঁপিল সঘনে।।

অনুবাদঃ শঙ্খ-নিনাদের প্রচন্ড শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদারিত করতে লাগল।

তাৎপর্যঃ ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা যখন শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পান্ডবদের বুক ভয়ে কেঁপে উঠেনি। কিন্তু এই শ্লোকে আমরা দেখছি যে, পাণ্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোন ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত। ভগবানের কাছে যিনি আত্মসমর্পণ করেন, তাঁর মনে কোন ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচলিত।

শ্লোক – ২০

অথ ব্যবস্থিতান দৃষ্টা ধার্তরাষ্ট্রান কপিধ্বজঃ।

প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পান্ডবঃ।

হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ।। ২০ ।।

অথ- অতঃপর; ব্যবস্থিতান- অবস্থিত; দৃষ্টা- দেখে; ধার্তরাষ্ট্রান- ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের; কপিধ্বজঃ- যার পতাকায় হনুমান চিহ্ন শোভা পায়; প্রবৃত্তে- প্রবৃত্ত হওয়ার সময়; শস্ত্রসম্পাতে- অস্ত্র নিক্ষেপ করতে; ধনুঃ- ধনুক; উদ্যম্য- তুলে নিয়ে; পান্ডবঃ- পান্ডুপুত্র (অর্জুন); হৃষীকেশম- শ্রীকৃষ্ণকে; তদা- তখন; বাক্যম- বাক্য; ইদম- এই; আহ- বললেন; মহীপতে- হে মহারাজ।

গীতার গান

কপিধ্বজ দেখি ধার্তরাষ্ট্রের গণেরে।

যুদ্ধের সজ্জায় সেথা মিলিল অচিরে।।

নিজ অস্ত্র ধনুর্বাণ যথাস্থানে ধরি।

যুদ্ধের লাগিয়া সেথা স্মরিল শ্রীহরি।।

অনুবাদঃ সেই সময় পান্ডুপুত্র অর্জুন হনুমান চিহ্নিত পতাকা শোভিত রথে অধিষ্ঠিত হয়ে, তাঁর ধনুক তুলে নিয়ে শর নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হলেন। হে মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের সমরসজ্জায় বিন্যস্ত দেখে, অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণকে এই কথাগুলি বললেন –

তাৎপর্যঃ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, পান্ডবদের অপ্রত্যাশিত সৈন্যসজ্জা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উপস্থিত থেকে পান্ডবদের পরিচালিত করেছিলেন, তাই কৌরবদের এই হৃদকম্প হওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্জুনের রথে হনুমান অঙ্কিত ধ্বজাও একটি বিজয়সূচক ইঙ্গিত, কারণ রাম-রাবনের যুদ্ধে হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অর্জুনকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর রথে শ্রীরামচন্দ্র ও হনুমান দুজনকেই উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র এবং যেখানে শ্রীরামচন্দ্র, সেখানেই তাঁর নিত্য সেবক ভক্ত-হনুমান এবং নিত্য সঙ্গিনী সীতা লক্ষ্মীদেবী উপস্থিত থাকেন। তাই, অর্জুনের কোন শত্রুর ভয়েই ভীত হবার কারণ ছিল না, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরিচালিত করবার জন্য স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এভাবে, যুদ্ধজয়ের সমস্ত শুভ পরামর্শ অর্জুন পাচ্ছিলেন। তাঁর নিত্যকালের ভক্তের জন্য ভগবানের দ্বারা আয়োজিত এই রকম শুভ পরিস্থিতিতে সুনিশ্চিত জয়েরই ইঙ্গিত বহন করে।

শ্লোক ২১-২২

অর্জুন উবাচ

সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যূত।

যাবদেতান্নিরীক্ষেহহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান ।। ২১ ।।

কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন রণসমুদ্যমে ।। ২২ ।।

অর্জুনঃ উবাচ – অর্জুন বললেন; সেনয়োঃ- সৈন্যদের; উভয়োঃ- উভয়; মধ্যে- মধ্যে; রথম- রথ; স্থাপয়- স্থাপন কর; মে- আমার; অচ্যুত- হে অচ্যুত; যাবৎ- যাতে; এতান- এই সমস্ত; নিরীক্ষে- দেখতে পারি; অহম- আমি; যোদ্ধুকামানময়া- আমাকে; সহ- সঙ্গে; যোদ্ধব্যম- যুদ্ধ করতে হবে; অস্মিন- এই; রণ- সংগ্রাম; সমুদ্যমে- প্রচেষ্টায়।

গীতার গান

মহীপতে। পান্ডুপুত্র কহে হৃষীকেশে।

উভয় সেনার মাঝে রথের প্রবেশে।।

যাবৎ দেখিব এই যুদ্ধকামীগণে।

তাবৎ রাখিবে রথ অচ্যুত এখানে।।

দেখিবারে চাহি কেবা আসিয়াছে হেথা।

কাহার সহিত হবে যুঝিবারে সেথা।।

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে অচ্যুত। তুমি উভয় পক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে আমার রথ স্থাপন কর, যাতে আমি দেখতে পারি যুদ্ধ করার অভিলাষী হয়ে কারা এখানে এসেছে এবং এই মহাসংগ্রামে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।

তাৎপর্যঃ যদিও শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তবুও তিনি অহৈতুকী কৃপাবশে তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনের রথের সারথী হয়ে তাঁর সেবা করছেন। ভক্তের প্রতি করুণা প্রদর্শনে ভগবান কখনো চ্যুত হন না, তাই তাঁকে এখানে অচ্যুত বলে সম্ভাষণ করা হয়েছে। অর্জুনের রথের সারথী হবার ফলে তাঁকে অর্জুনের আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে হয়েছিল এবং যেহেতু তা করতে তিনি কুন্ঠিত হননি, তাই তাঁকে অচ্যুত বলে সম্ভাষণ করা হয়েছে। যদিও তিনি তাঁর ভক্তের রথের সারথী হয়েছেন, তবুও তাঁর পরম পদ কেউ দাবী করতে পারে না। সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ ভগবান বা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর হৃষীকেশ। ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক মধুর ও অপ্রাকৃত। ভক্ত সর্বদাই ভগবানের সেবায় উন্মুখ, ঠিক তেমনই ভগবানও তাঁর ভক্তের কোন রকম পরিচর্যা করতে সুযোগের অন্বেষণ করেন। ভগবান যখন তাঁর শুদ্ধ ভক্তের আদেশ অনুসারে তাঁকে পরিচর্যা করার সুযোগ পান, তখন তিনি অসীম আনন্দ উপভোগ করেন। ভগবান হচ্ছেন সর্বলোক-মহেশ্বর। যেহেতু তিনি হচ্ছেন প্রভু, প্রত্যেকেই তাঁর আদেশের অধীন, এবং তাই তাঁকে আদেশ দেবার মতো তাঁর ঊর্ধ্বে আর কেউ নেই। কিন্তু যখন তিনি দেখেন যে, কোন শুদ্ধ ভক্ত তাঁকে আদেশ করছেন, তখন তিনি দিব্য আনন্দ লাভ করেন, যদিও সকল অবস্থাতেই তিনি হচ্ছেন অভ্রান্ত প্রভু।

ভগবানের শুদ্ধ ভক্তরূপে অর্জুন কখনোই কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি, কিন্তু কোন রকম শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে আগ্রহী দুর্যোধনের দুর্দমনীয় মনোভাব তাঁকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেছিল। তাই, তিনি যুদ্ধের আগে একবার দেখে নিতে চেয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কে কে সেই রণাঙ্গনে উপস্থিত হয়েছিল। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তি স্থাপন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না, তবুও যুদ্ধের আগে অর্জুন একবার সকলকে দেখতে চেয়েছিলেন এবং তিনি দেখে নিতে চেয়েছিলেন সেই অন্যায় যুদ্ধে কৌরবেরা কতখানি উৎসাহী ছিল।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x